গল্প:অমৃত্যু তোকে চাই (০৫)

লেখিকা:রাহি চৌধুরী তোহা

 

পর্ব :০৫

 

 

রিয়া বিদায় বেলা কান্না করছে।
রিয়া সোহেল আহামেদ কে জরিয়ে দরে ফুপিয়ে বলে „“   আব্বু আমি যেতে চাই না।আমি তো আপনাদের বুকেই থাকতে চাই.……”

সোহেল আহামেদ কান্না ভরা কন্ঠে বলে „“ তুই তোর জায়গায়ই থাকবি মা সারা জীবন।”

রিক্তা রিতু মনির আহমেদের বুকের সঙ্গে লেপ্টে হাউমাউ করে কান্না করছে „“ও আম্মু প্লিজ আপুকে যেতে দিও না প্লিজ……”

এদের কান্না করতে দেখে রিয়া ওদের কাছে আসতেই ওরা ঝাপিয়ে পড়ে রিয়ার বুকে।
রিক্তা সেই অবস্থায় বলে „“ প্লিজ আপু তুমি যেও না আমরা তিন বোন একসাথে থাকবে।”

রিয়া রিক্তার মাথা সেনহের হাত রেখে বলে „“ পাগলী আমি কালই আসছি তোদের কাছে।”
রিয়ার কথা শেষ হতেই রিক্তা নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
রিয়া আঁতকে উঠে „“ রিক্তা …………”

শুভ দাড়িয়ে দাড়িয়ে সব দেখছিল। রিক্তা পড়ে যেতেই রাহাদ, শুভ দৌড়ে আসে।
শুভ রিক্তা কে কোলে তুলে নিয়ে সবার উদ্দেশ্য বলে„“ তোমরা এখানের কাজ করো আমি রিক্তার সাথে আছি।”
শুভ এক মুহূর্ত দেরি না করে রিক্তাকে কোলে তুলে নিয়ে উপরের রুমে চলে যেতে থাকে।
সবাই শুভকে ভরসা করে ছেড়ে দেয় তার উপর।

রিয়াকে গাড়িতে বসানো হলো। এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না রাহাদ। ফুপ্পির বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পরে। তারপর রিয়া কে বলে „“ আপু তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?  আমাদের খাইয়ে দিবে কে আপু?  তোমার কলিজার ভাই যে এখনো খায় নি চলো খাইয়ে দিবে? আপু আমাদের গল্প শুনিয়ে ঘুম পারাবে কে?  ও আপু তুমি চলে গেলে আমাদের সামলাবে কে?  আপু প্লিজ তুমি যেও না প্লিজ…….”

ভাইয়ের আহাজারি দেখে রিয়াও পাগলের মতো কান্না করছে।

আকলিমা খান রাহাদের পিঠে হাত রাখতেই রাহাদ আকলিমা খানের বুকে মাথা রেখে বলে „“ ফুপ্পি প্লিজ। তোমরা আমার আপু কে আমাদের কাছে ফিরে দাও। আপু ছাড়া আমরা নিঃস।  আমাদের এখন খাইয়ে দিবে কে ফুপ্পি?  গল্প শুনাবে কে?  দুষ্টুমি করবে কে?  ফুপ্পি তোমরা আমার আপুকে যেতে দিয় না।”

আকলিমা খান রাহাদের পিঠে হাত রেখে বলে „“বাবা তুমি এখন এ বাড়ির বড় ছেলে। তোমার উচিৎ সবাইকে সামলানো তুমি ভেঙে পরলে হবে। নিজেকে সামলাও।”

সৈয়দ আহামেদ ইশারা দিতেই গাড়ি ছেড়ে দিলো।
রিয়া গাড়ির কাচ দিয়ে সবাই কে এক পলক দেখে নিল তাকে ছাড়া তার পরিবার কেমন আহাজারি করছে।
সবাই কান্না ভেঙে পরেছে।

ওইদিকে শুভ রিক্তাকে জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা করছে। শুভ রিক্তার হাত ধরে মেজেতে বসে মোলায়েম কন্ঠে বলতে শুরু করে „“ প্লিজ রিক্তা একবার চোখ খুল। তুই কি আমায় শান্তিতে থাকতে দিবি না?  কেনো এমন পাগলামি করিস?  তোর জন্য আমি দূরে কোথাও যেতে পারি না?  ভয় হয় কখন কি না করে বসিস তার জন্য?  রিক্তা?  রিক্তা উঠ একবার চোখ খুল।”

পিছন থেকে  এনিফা খান শুভর কাদে হাত রেখে বলে„“দাদু ভাই ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা করো না।”

শুভ এবার অসহায় কন্ঠে বলে „“ আমি কি করবো দাদিজান না পারছি বলতে না পারছি সহ্য করতে?”

এনিফা খান বলে „“মনে রেখো হাল ছাড়লে সব শেষ।”

রিক্তার জ্ঞান ফিরতেই। সে উঠো দৌড়ে নিচে যায়। গিয়ে দেখে যে যার মতো কাজে ব্যস্ত।  রিক্তা সানজিদক আহমেদের কাছে দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে „“ বড় আম্মু আপু কই?”

সানজিদা আহমেদ ঠান্ডা স্বরে বলে „“তোমার আপু চলে গেছে। আবার আসবে।”

রিক্তা চুপ হয়ে বসে পরে সোফায়। মাথা টা খুব ব্যথা করছে। সোফায় বসে চোখ বন্ধ করে নেয়
আকলিমা খান দুকাপ চা নিয়ে আসে। একটা রিক্তা দিলো আর একটা সে নিজে নিল। তারপর রিক্তার পাশে বসে বললেন „“কি অবস্থা তোর?”

রিক্তা চায়ের কাপ চুমুক দিয়ে বলে „“মাথা ব্যথা করছে।”

আকলিমা খান পুনরায় শুধালো „“ আমার সাথে চল। আমাদের বাড়ি কয়েক দিন ঘুরে আসবি?”

রিক্তা মন মরা হয়ে বলে „“পরে যাবো এখন ভালো লাগছে না।”

আকলিমা খান বুঝে যায় রিক্তার মন এখন খুব খারাপ।
রিক্তা চা শেষ করে কাপ টেবিল রেখে উপরে চলে যায়।
রুমে গিয়ে শিখাকে জিজ্ঞেস করে „“ কাল কলেজে যাবি?”

শিখা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়।

রিক্তা খাটে বসে ফোন নিয়ে ফোন করে নাসরিনের কাছে।
নাহিদা তাদের  বেস্ট ফ্রেন্ড।
ফোন দরতেই রিক্তা বলল „“ হ্যালো নাহিদা?”

ওপাশ থেকে নাহিদা বলল „“ হ্যাঁ বল।  কি খবর তোর?”

রিক্তা পূনরায় বলল „“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোর কি খবর,?”

নাহিদা বলল „“ ভালো। কাল কলেজে আসবি?”

রিক্তা বলল „“ তার জন্যই ফোন করেছি।”

নাহিদা বলল „“ শিখা আসবে?”

রিক্তা শিখার দিকে তাকিয়ে বলে „“হ্যাঁ। জায়গায় রাখিস।”

নাহিদা বলল „“ আচ্ছা।”

রিক্তা বলল „“ আচ্ছা আল্লাহ হাফেজ।”

নাহিদা বলল„“ আল্লাহ হাফেজ।”

রিক্তা ফোন কেটে। ফেচবুকে ঢুকলো। সেই অচেনা আইডি থেকে মেসেজ „“মায়াবিনী মায়াবী লতা। তোমার মন কি খুব খারাপ?”

রিক্তা কোনো উওর না দিয়ে সোজা ফোন ছুরে মারলো খাটের উপর।
রিক্তার মিনি তার কাছে ছুটে আসে। রিক্তা তাকে কোলে নিয়ে বিছানায় আধ সোয়া হয়ে বসে তার সাথে কথা বলে।

রিক্তা যখন ফোন ছুরে মেরেছে। তখন শিখা কাছে ফোন পরতেই সে ফোন কেচ করে ধরলো। ফোন নিয়ে দেখলো সেই মেসেজ  শিখা মেসেজ গুলো পড়ে। তার পর সে মেসেজ করে „“ কে আপনি?

ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসে „“ হবো কোনো এক মায়াবিনীর মায়াবী পুরুষ।””

শিখা আর মেসেজ দিল না।
শিখা রিক্তা ফোন থেকে শুভকে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠায়।
শিখা রিক্তার পানে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে আসছে।

রিক্তা ভ্রু কুঁচকে বলে „ “এমন হাসছিস কেনো?”

শিখা হাসি লুকিয়ে বলে „“এমনি।”

কিছু সময় পড় শুভ ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট এক্সেপ্ট করে। শিখা রিক্তার হয়ে মেসেজ দিলো „“আসসালামু আলাইকুম।”

শুভ রিপ্লাই দিল „“ওয়ালাইকুম সালাম?  কে রিক্তা?”

শিখা মেসেজ দিল „“ হুম। কোথায় আছেন।”

শুভ উওরে বলে „“ আছি আশে পাশে। কেনো?”

শিখা বলল „“এমনি দেখতে মন চাচ্ছিল তাই।”

শুভ রিপ্লাই দিল „“থাপ্পড় দিয়ে ৩২ টা দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব। বাঁদরামি করার জায়গা পাস না ?”

শিখা ভয় পেয়ে আর মেসেজ দিল না। সে যেই মেসেজ দিছি তা সব কেটে রিক্তার দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলে „“ নে ভাবি।”

রিক্তা বিরক্ত হয়ে ফোন নেয়৷ নিয়ে পাশে ফোন রেখে।
রিতু ছুটে আসে জানায়„“  নিচে খেতে ডাকছে।”

শিখা বলল „“ আসছি তুমি যাও।”

রিতু চলে যায়। শিখা রিক্তাকে বলে „“চল কিছু খেয়ে ঔষধ খেয়ে ঘুমাবি।”

রিক্তা বলল „“খাবো না। তুই যা।”

শিখা হতে ধরে টেনে নিচে দাড় করিয়ে বলে„“ খাবি না কেনো চল। অল্প হলেও খেতে হবে।”

শিখার জোরাজোরিতে রিক্তা খাওয়ার জন্য রাজি হয়।
রিক্তা শিখা নিচে নামে দেখে সবাই খাবার খাচ্ছে।
রিক্তা ও শিখা দুজনে  দু’টো  চেয়ার টেনে বসে পরে। রিক্তার পাশে রাহাদ আর রিতু। রাহাদ একটা প্লেটে ভাত আর মাংস নিয়েছে। ভাত মাখিয়ে রিক্তার মুখের দিকে দরে বলে „“আপু চলে গিয়েছে তাতে কি ভাইয়া তো আছে ভাইয়া ভাত খাইয়ে দিবে।”

রিক্তার গাল বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু পরে। রিয়ার কথা খুব মনে পরছে। সব বাদ দিয়ে রিক্তা ভাত মুখে নেয়। রাহাদ রিতুকেও ভাত খাইয়ে দেয়। শিখা আড়ালে চোখের জল মুছে। রাহাদ শিখাকে বলে „“ এদিকে ঘুরো।”

শিখা চোখের পানি মুছে রাহাদের দিকে তাকায়। রাহাদ শিখার মুখে কাছে ভাত নিয়ে বলে „“ হা করো।”

শিখা প্রথমে মুখে নেয় না। তা দেখে রিক্তা বলে „“ হা কর।”

শিখা লজ্জা নিয়ে ভাত টা মুখে নেয়।

বাড়ির সবার চোখে অশ্রু চলে আসে।
আকলিমা খান বলে „“তোদের এই ভালোবাসা সারাজীবন থাকুক।”

শুভ মাথা নিচু করে ভাত খাচ্ছে।
রিতু শুভকে বলে „“ভাইয়া তুমি শিখা আপুকে খাইয়ে দাও?”

শুভ ভাত খেতে খেতে জবাব দেয় „“ কেন ওর কি হাত নেই?”

শিখা রাগ দেখিয়ে  বলল „“রিতু কাকে কি বলো এই ছেলেতো নিজেই খেতে পারে না আবার আমাকে খাইয়ে দিবে।”

সবাই হেসে উঠে।
শুভ শিখাকে বলে „“তুই খাইয়ে দিস?”

আকলিমা খান দুজকে বলে „“এই তোরা কি কখনো ভালো হবি না।”

খাবার টেবিলে হাসি খুশি ভাবে সবার খাওয়া হয়।

আকলিমা খান সৈয়দ আহামেদ কে বললেন „“সৈয়দ!  কাল রিক্তাকে আমার সাথে নিযে যাবো।”

সৈয়দ আহামেদ বলেন „“না আপা দুদিন পর নেও। আজ রিয়া চলে গেছে। কাল রিক্তা চলে গেলে ঘর খালি হয়ে যাবে।”

আকলিমা খান বললেন „“ আচ্ছা দুদিন পর নিয়ে যাবো। কয়েক দিন গিয়ে ঘুরে আসবে৷”

” আচ্ছা আপা নিও।”

খাবার খেয়ে যে যার মতো চলে যায়।

রিক্তা সাকলে উঠে দেখে শিখারা চলে গেছে তাই রিক্তা ফ্রেশ হয়ে রিতুকে নিয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।
রিতুর স্কুল রিক্তার কলেজের পাশে হওয়া রিক্তা নিয়ে যায়।
রিক্তা একটা রিক্সা ডেকে উঠে পরে। রিক্তাদের গাড়ি থাকা সরতেও রিক্তা রিক্সা করেই কলেজ যায়।
রিতুর স্কুলের সামনে আসতেই রিক্তা রিক্সা ওয়ালা মামাকে বলে „“এখানে রাখেন।”

রিক্সা থামতেই রিক্তা রিতুকে বলে „“ যা। আর শুন আমি বা ভাইয়া আসবো নিতে একা বাড়ি যাওয়া লাগবে না।”

রিতু আচ্ছা বলে চলে যায়।
রিক্তাও রিক্সা করে কলেজে চলে যায়।
কলেজে আসেতেই আরশি, নাহিদা, রাফি, কবিতা, নাইম ছুটে আসে রিক্তার কাছে।
রিক্তা রিকশা ওয়ালা মামার ভাড়া দিয়ে ওদের দিকে যেতে থাকে।
কবিতা রিক্তাকে জরিয়ে দরে জিজ্ঞেস করে „“কেমন আছিস?”

রিক্তাও হাসি দিয়ে বলে „“ ভালো। তোদের খুব মিস করছি রে….”

রাফি ভেংচি কেটে বলে „“একটা ফোন করে কথা বলছিস?আবার বলোস মিস করছি।”

রিক্তা রাফিকে চিমটি কেটে বলে „“ তোদের ফোন দিলে তোরা ফোন ধরিস?”

রিক্তা তার ব্যাগ থেকে ফোন বের করে শিখাকে ফোন করে „“কি রে কই?”

শিখা বলে „“ এইতো তোদের পিছনে।”

রিক্তা কানে ফোন রেখে ঘুরে তাকিয়ে দেখে শিখা এদিকে আসছে। সবাই শিখাকে দেখে বলে „“কি রে ভাবি ননদ একসাথে।”

রিক্তা ভাব নিয়ে বলে „“ দেখতে হবে না কার ননদ।”

শিখাও বলে „“ রিক্তার ননদ বলে কথা।”

নাহিদা বলে „“  কি রে শুনলাম শুভ ভাইয়া আসছে।”

রিক্তা ভ্রু কুঁচকে বলে „“  তোদের কে বলল,?”

নাহিদা বলল „“ ফেচবুকে দেখলাম শুভ ভাইয়া লিখছে ৬ বছর পর বাড়ি ফিরছি এরকম আরো অনেক কিছু। আর তুইও তো লিখেছিস অবশেষে অপেক্ষা দর প্রহর শেষ আমার রাজা আবার বাড়ি ফিরলো।”

রিক্তা লাজুক হেসে উওর দেয় „“ হুম লিখছি।”

নাইম বিরক্ত হয়ে বলে „“ তোদের পেঁচাল শেষ হলে ক্লাসে যাই।”

শিখাও বলে „“ চল। আজ রাজ আসেনি?”

রাফি বলে „“  না।”

তারা সবাই ক্লাসে গিয়ে মন দেয়।
ক্লাস শেষ হতে যে যার মতো চলে গেলো।
রিক্তা রাহাদকে ফোন করে „“ ভাইয়া?”

রাহাদ বলে „“ হুম বল বোনু।”

রিক্তা বলে„“রিতুকে বাড়ি নিয়েছো?”

রাহাদ বলে „“না বোনু আজ তুই নিয়ে যা কাল আমি নিবো।”

রিক্তা বলে„“  আচ্ছা ভাইয়া।”

রিক্তা ফোন কেটে দিল।

 

 

চলবে………

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments