গল্প:বিদেশ বাবু বাঙালি ম্যাম(০৩)

লেখিকা:তাছমিয়াতুল জান্নাত

পর্ব :০৩

   

ডাক্তার এবার বিস্ময়ে আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি কিছুক্ষণ গোধূলি আর

মিথনের দিকে তাকিয়ে থেকে অবিশ্বাসের সুরে বললেন,

“বিশ্বাস করেন, আপনাদের পরিচিত কেউ দেখলে বলবে আপনারা নীলক্ষেতের দুইটা খুনি! আপনারা যেভাবে মারপিট করছিলেন, এটা কোনো সুস্থ দম্পতি করতে পারে না।
নীলক্ষেতের মারপিটও এর চেয়ে ভালো হয়।”

​মিথন আর গোধূলি একে অপরের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল।

ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“যাই হোক, বাচ্চাটার জ্ঞান ফিরেছে। তবে ওর অনেক যত্ন প্রয়োজন। আপনারা কি সত্যিই ওর দায়িত্ব নেবেন?”

গোধূলি যেই না খুশিতে ডগমগ হয়ে বাচ্চাটার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য ‘হ্যাঁ’ বলতে যাবে, অমনি মিথন বাজের মতো ছোঁ মেরে গোধূলির মুখটা দুই হাতে চেপে ধরল। গোধূলি হাত-পা ছুড়ছে, কিন্তু মিথনের শক্ত হাতের প্যাঁচে তার কথাগুলো অস্ফুট গোঙানিতে পরিণত হলো।

​মিথন বড় বড় চোখ করে ডাক্তারকে বলতে শুরু করল,

“আরে ডক্টর , ও যা বলবে সব সিরিয়াসলি নেবেন না। বাচ্চাটাকে যে আমরা নেব, তার আগে তো কোর্টের হাজারটা ফর্মালিটি আছে। হুট করে বাসায় নিয়ে গেলে তো আবার কিডন্যাপার ভেবে পুলিশে ধরিয়ে দেবে! তবে হ্যাঁ, একটা কথা… আপনাদের কাছে যদি কোনো কড়া ‘ইঞ্জেকশন’ থাকে, তবে আমাকে এক বস্তা দিয়ে দিন। এই বাঁদর মেয়েটাকে শান্ত রাখার জন্য প্রতিদিন একটা করে দিতে হবে!”

​গোধূলি এবার মরণপণ শক্তিতে মিথনের হাতটা সরিয়ে দিল। রাগে তার নাক-মুখ লাল হয়ে গেছে, বুকটা ওঠানামা করছে।

সে মিথনের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল—

​”দেখুন বিদেশী বাবু! অনেকক্ষণ ধরে আপনাকে সম্মান করে গেছি। এবার কিন্তু একদম কষে দুইটা থাপ্পড় মারব! এরপর সোজা মিডিয়াতে গিয়ে বলব— আপনি আমাকে না জানিয়ে বিয়ে করেছেন। আপনার সব ফ্যান ফলোয়াররা তখন দেখবে তাদের ‘কাং হুয়ান’ আসলে কত বড় পাষাণ!”

​মিথন একটা শুকনো ঢোক গিলল। গত ৪-৫ ঘণ্টায় এই ‘বাঙালি ম্যাম’ কে তার বেশ ভালোই চেনা হয়ে গেছে। সে জানে, এই মেয়ে যতটা নরম, খেপলে ততটাই ভয়াবহ।

​পুরো দৃশ্য দেখে ডাক্তার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

তিনি চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে অবিশ্বাসের সুরে বললেন—

​”মিস্টার কাং হুয়ান, আমার তো মনে হয় না এই নবজাতককে আপনাদের কাছে নিরাপদ রাখা যাবে। আপনারা নিজেরাই সারাক্ষণ মারামারি করছেন, তার ওপর আপনার ওয়াইফ নিজেই তো ছোট বাচ্চাদের মতো বিহেভ করছেন! এত বড় দায়িত্ব আমি আপনাদের ওপর কীভাবে ছাড়ি?”

​মিথন এবার অসহায় হয়ে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করল।

সে গোধূলির দিকে ইশারা করে বলল

, “আমি জানি না ও কী করবে। ও কী দিয়ে কী করে ফেলবে তা ওকে জিজ্ঞাস করেন।”

​ডাক্তার এবার খুব গম্ভীরভাবে গোধূলির দিকে তাকালেন। গোধূলি বুঝতে পারল এবার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

সে মুহূর্তের মধ্যে সুর পাল্টে একদম বাধ্য মেয়ের মতো কাঁচুমাচু হয়ে বলতে শুরু করল—
​”আরে না না ডাক্তার সাহেব! আমি বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি করব না। আমি ওকে কোলে নেব, সময়মতো খাওয়াব, রূপকথার গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াব, আবার সাবান দিয়ে গোসলও করিয়ে দেব। আসলে তো সব কাজ করবে এই ‘বিদেশী সাহেব’, আমি শুধু ওকে পাহারা দেব। প্লিজ, ওকে আমাদের সাথে যেতে দিন!”

​গোধূলির এমন অনুনয় দেখে ডাক্তার একটু নরম হলেন বটে, কিন্তু মিথনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তিনি বুঝতে পারছেন, এই দম্পতির ঘরে বাচ্চা যাওয়া মানে এক মহাযুদ্ধের নতুন শুরু।

​ডাক্তার ফাইলটা বন্ধ করতে করতে বললে:—

​”ঠিক আছে, আপাতত আপনাদের জিম্মায় দিচ্ছি। তবে কালই লিগ্যাল পেপারস রেডি করতে হবে। আর হ্যাঁ, বাসায় গিয়ে দয়া করে বাচ্চার সামনে চুল টানাটানি করবেন না!”

ডাক্তারের অনুমতি পেয়ে গোধূলি প্রায় দৌড়ে এনআইসিইউ-র ভেতরে ঢুকে পড়ল। কাঁচের ওপারে ছোট্ট এক টুকরো প্রাণ দেখে গোধূলির চোখ দুটো ছলোছলো করে উঠল। বাচ্চা মেয়েটা অসম্ভব ফর্সা, আর জন্মের পর এই ধকলের কারণে কান্নাকাটি করায় তার সারা শরীর টকটকে লাল হয়ে আছে। তার চিকন সরু নাক আর ছোট ছোট হাতের আঙুলগুলো যেন কোনো নিপুণ শিল্পীর কারুকাজ।

​গোধূলি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলল,

“দেখুন বিদেশী বাবু, কেমন রাজকন্যের মতো দেখতে! আচ্ছা, বাচ্চাটার কী নাম রাখা যায় বলুন তো?”

​মিথন কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

“আমিতো এখন পর্যন্ত তোমার নামটাই ঠিকমতো জানি না। আগে তোমার পুরো নামটা বলো।”

​গোধূলি একটু থতমত খেয়ে চট করে বলল,

“আমার নাম গোধূলি ইসলাম লিরা।”

​মিথন এবার একটা মৃদু হাসি দিল। তার সেই চাইনিজ ধাঁচের চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা খেলে গেল।

সে বলল, “তাহলে বাচ্চাটার নাম আমাদের দুজনের নামের সাথে মিলিয়ে রাখলে কেমন হয়? কী বলো বাঙালি ম্যাম?”

​গোধূলি উৎসাহিত হয়ে মাথা নাড়াল,

“ঠিক আছে বিদেশী বাবু। আপনিই একটা নাম ঠিক করুন।”

​মিথন কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করে বলল,

“তাহলে ওর নাম হোক— লাজওয়া নাওশাদ মাহারু। নামটা কেমন লেগেছে তোমার, লিরা?”

​হঠাৎ মিথনের মুখে ওই “লিরা” শব্দটা শুনে গোধূলির বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এক অজানা কম্পন বয়ে গেল তার সারা শরীরে। এই নামে শুধু একজনই তাকে ডাকত—তার মৃত স্বামী জেহের। গোধূলির মনে হলো, সময়ের চাকা কি তবে ঘুরে যাচ্ছে?

​সে মানুক আর না মানুক, এটাই এখন ধ্রুব সত্য যে এই অদ্ভুত মেজাজী মানুষটা, এই মিথন নাওশাদই এখন তার স্বামী। আর এই ছোট্ট মাহারু হতে চলেছে তাদের অগোছালো জীবনের নতুন এক অধ্যায়।

​গোধূলি নিজেকে সামলে নিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,

“নামটা খুব সুন্দর হয়েছে। লাজওয়া নাওশাদ মাহারু… আমাদের মাহারু।”

​মিথন দেখল গোধূলির চোখে জল চিকচিক করছে।

সে আলতো করে গোধূলির কাঁধে হাত রেখে বলল, “

চলো লিরা, মাহারুকে এবার আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করি। অনেক তো হলো হসপিটাল ড্রামা, এবার আসল যুদ্ধ শুরু হবে ঘরে গিয়ে।”
★★★*

হাসপাতালের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মাহারুকে নিয়ে ওরা যখন গাড়িতে উঠল, তখন রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে। গোধূলির কোলে মাহারু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

গাড়ি স্টার্ট দিতেই গোধূলি শাসনের সুরে বলল,

“শুনুন বিদেশী বাবু, আগে আমাদের একটা বড় শপিংমলে যেতে হবে। মাহারুর জন্য জামাকাপড়, ওষুধ, ডায়াপার আর সবচেয়ে জরুরি হলো দুধ কিনতে হবে। বাচ্চাটা উঠলেই তো খিদেয় চিল্লানো শুরু করবে।”

​মিথন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি ঘুরাল। রাত জাগা আর এই ধকলের পর তার মেজাজ এমনিতেই খিটখিটে হয়ে আছে।

ওরা যখন বড় একটা সুপারশপে পৌঁছাল, তখন সেখানেও শুরু হলো নতুন নাটক।
​বাচ্চাদের সেকশনে গিয়ে ওরা যখন ফিডিং মিল্ক খুঁজছিল, তখন গোধূলি হুট করে মিথনের হাতে বড় একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিল।

মিথন প্যাকেটটার দিকে তাকিয়েই ভ্রু কুঁচকে চিৎকার করে উঠল—

​”বাঙালি ম্যাম, আপনি কি নিশ্চিত যে এই দুধটাই মাহারুর লাগবে? এটা তো বড়দের জন্য হাই-ক্যালসিয়াম দুধ! আপনি কি বাচ্চাটাকে দুই দিনে বডি বিল্ডার বানাতে চান?”

​গোধূলি বিরক্তি নিয়ে বলল

“আরে বিদেশী বাবু, আপনি তো দেখছি একদমই জ্ঞানহীন! দেখুন এখানে লেখা আছে ‘ফুল ক্রিম মিল্ক’। বাচ্চা মানেই তো ক্রিম খাবে। আর আপনি যেটা দেখাচ্ছেন, ওটা তো একদম পানির মতো পাতলা।”

​মিথন স্বাভাবিকভাবে বলল

“আপনার ওই উপন্যাসের লজিক দয়া করে এখানে খাটাবেন না। বাচ্চার জন্য ‘ইনফ্যান্ট ফর্মুলা’ লাগে, বড়দের এই চায়ের দুধ নয়! আপনি কি চান মাহারুর পেট খারাপ হয়ে ও আবার হসপিটালে ভর্তি হোক?”

​গোধূলি কোমর বেঁধে দাঁড়িয়ে বলল

“আপনি বেশি বুঝবেন না তো! আপনি তো সারাদিন ডায়েট করেন, আর রোবটের মতো প্রোটিন শেক খান। আপনি দুধের কী বুঝবেন? আপনি তো মনে হয় গরুর দুধ আর পাউডার দুধের পার্থক্যও জানেন না। দেখুন, এই প্যাকেটটা কত সুন্দর, এটাই ভালো হবে।”

​মিথন বিরক্ত কণ্ঠে বললো

প্যাকেট সুন্দর দেখে আপনি দুধ কিনবেন? আপনি কি পাগল? এই তো সমস্যা আপনাদের মতো পাঠিকাদের নিয়ে, মলাট সুন্দর হলেই আপনারা ভাবেন ভেতরের গল্পও ভালো! এটা বাচ্চার দুধ নয়, এটা দিয়ে আপনি চা বানিয়ে খান গে।”

​গোধূলি একটু চিৎকার করে বলল

চুপ করুন তো কাং হুয়ান সাহেব! আপনার এই চাইনিজ বুদ্ধি দিয়ে আমাকে শেখাতে আসবেন না। আমি মাহারুর মা, আমি ভালো জানি ওর জন্য কোনটা পুষ্টিকর।”

​মিথন তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল

“মা হতে পারেন, কিন্তু আপনি তো আসলে একটা আস্ত বাঁদর! যান, ওই পাশের তাকে দেখুন, সেখানে ছোট ছোট বাচ্চার ছবি দেওয়া কৌটা আছে। ওটাই হলো মাহারুর খাবার।”

​দুজনের এই ঝগড়া দেখে দোকানের সেলসম্যানরা হাবার মতো তাকিয়ে রইল। দেশের এক নম্বর সুপারস্টার আর তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী মাঝরাতে সুপারশপে দাঁড়িয়ে ‘বড়দের দুধ বনাম বাচ্চাদের দুধ’ নিয়ে মহাযুদ্ধে লিপ্ত! অবশেষে মিথন যখন সঠিক কৌটাটা টেনে বের করল,

গোধূলি মুখ ঝামটা দিয়ে বলল—

​”ঠিক আছে, এবারের মতো মেনে নিলাম। তবে মনে রাখবেন, বাসায় গিয়ে যদি মাহারু এটা খেতে না চায়, তবে এই পুরো কৌটা আমি আপনাকে গুলিয়ে খাইয়ে দেব!”

​মিথন একটা করুণ চাহনি দিয়ে ট্রলিটা ঠেলতে ঠেলতে বিড়বিড় করল,

“আমার কপালে যে কী আছে! বউ পেলাম তো পেলাম, একটা সাক্ষাৎ ডাইনি আর বাচ্চার কম্বিনেশন প্যাক পেলাম।”

★★★
বাড়িতে ফেরার পর সারা রাতের ধকল যেন মিথনের শরীরের ওপর পাথরের মতো চেপে বসেছে। সে ধীর পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে ঝটপট শাওয়ার নিয়ে নিজের কমফোর্টেবল ড্রেস পরে বাইরে এল। টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে লক্ষ্য করল, গোধূলি তখনও সেই ধুলো-ময়লা মাখা শাড়িটা পরে মাহারুর দোলনার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত শূন্যতা।

​মিথন একটু অবাক হয়ে কর্কশ কিন্তু কিছুটা কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—

​”বাঙালি ম্যাম লিরা! এভাবে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? জামাকাপড় চেঞ্জ করবেন না? এই ময়লা শাড়ি পরে তো মাহারুর কাছে যাওয়াও ঠিক হবে না।”

​গোধূলি মাথা নিচু করে খুব ম্লান স্বরে উত্তর দিল—

​”আমি তো বাড়ি থেকে আসার সময় আমার কোনো জামাকাপড় নিয়ে আসিনি। এখন কী পরব?”

​মিথন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করতে করতে বলল—

​”সেটার ব্যবস্থাও হয়ে গেছে। আপনার বড় ভাসুর ফারুক আরহাম অনেক আগেই আপনার ট্রলি পাঠিয়ে দিয়েছেন। সম্ভবত আপনার নীলা সব গুছিয়ে পাঠিয়েছে। পাশের রুমে আপনার সব প্রয়োজনীয় জিনিস রাখা আছে। যান, ফ্রেশ হয়ে নিন।”

গোধূলি কোনো পাল্টা যুক্তি দেখাল না, কোনো উপন্যাসের কাহিনী শোনাল না, এমনকি মিথনকে ‘বিদেশী বাবু’ বলে খ্যাপালও না। সে শুধু নিঃশব্দে মাথা নেড়ে পাশের রুমের দিকে পা বাড়াল। তার চলে যাওয়ার ভঙ্গিটা এতই বিষণ্ণ ছিল যে মিথন হাতের টাওয়ালটা থামিয়ে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল।

​মিথনের মাথায় তখন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—

​”এই মেয়েটা কি আসলেই সেই মেয়ে, যে কিছুক্ষণ আগে সুপারশপে দাঁড়িয়ে আমার সাথে বিশ্বযুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছিল? হঠাৎ এই শান্তশিষ্ট রূপ কেন? ফারুক সাহেব কি ফোনে এমন কিছু বলেছেন যাতে ওর ভেতরের সেই দস্যি মেয়েটা হঠাৎ মরে গেল?”

​মিথন বুঝতে পারছিল না, গোধূলির এই নীরবতা কি তার মৃত স্বামীর স্মৃতির কারণে, নাকি এই নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার এক নীরব লড়াই। তবে সে এটুকু অনুভব করল যে, গোধূলি ইসলাম লিরা এমন এক রহস্যময়ী চরিত্র, যার প্রতিটি পাতা পড়ার জন্য তাকে অনেক ধৈর্য ধরতে হবে।
​মিথন দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহারুর দিকে তাকাল। মাহারু তখন হাত-পা ছুড়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে।

মিথন বিড়বিড় করে বলল—

​”বাঙালি ম্যাম তো শান্ত হলেন, এবার মনে হয় মাহারু ম্যাডাম তার তান্ডব শুরু করবেন।”

★★*
মিথন নিজের ল্যাপটপটা নিয়ে বিছানায় মাহারুর পাশেই বসল। মাহারু তখন জ্বরে বা ঠান্ডায় কিছুটা অস্থির হয়ে ঘুমাচ্ছিল। মিথন স্ক্রিন অন করে তার ইন্ডাস্ট্রির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নায়ক-নায়িকা আর ডিরেক্টরের সাথে ভিডিও কলে যুক্ত হলো।
​মিথন যেখানেই থাকুক, সে নিজের শেকড়কে ভুলতে পারে না। তার মা বাঙালি ছিলেন, তাই সে সব সময় বাংলা ভাষাতেই কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তার এই ভালোবাসার কারণে ইন্ডাস্ট্রির পরিচিত বন্ধুরাও তার সাথে কথা বলার জন্য টুকটাক বাংলা শিখে নিয়েছে।

​কথার মাঝখানে হঠাৎ মাহারু ডুকরে কেঁদে উঠল। ঘুমের ঘোরে হয়তো বাচ্চাটা ভয় পেয়েছে। মিথন ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে তাড়াহুড়ো করে মাহারুকে কোলে তুলে নিল। ওপাশ থেকে ওর চাইনিজ কো-স্টার

এলিকা অবাক হয়ে ভাঙা ভাঙা বাংলায় জিজ্ঞেস করল

​”কাং… কে কান্না করেছে? তোমার ওখানে ছোট বাচ্চা কোথায়?”

​মিথন তখন এলিকার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেল না।

সে মাহারুকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে খুব নরম স্বরে বলতে শুরু করল—

​”উমম… সোনা আমার, কান্না করে না। এই তো আমি আছি তো। ভয় নেই, একদম ভয় নেই।

​আশ্চর্যের বিষয় হলো, মাহারু মিথনের কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই কান্না থামিয়ে দিল। এই দুই দিনের ছোট্ট শিশুটা হয়তো অবুঝ মনে মিথনের শরীরের উষ্ণতাকে নিজের বাবার নিরাপদ আশ্রয় বলে চিনে নিয়েছে। সে মিথনের শার্টের কলারটা ছোট ছোট হাত দিয়ে খামচে ধরে একটা তৃপ্তির “কুর” শব্দ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments