গল্প:বিদেশ বাবু বাঙালি ম্যাম(০৪)

লেখিকা:তাছমিয়াতুল জান্নাত

পর্ব :০৪

মিথনের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া আচরণ আর রূঢ় কথাগুলো গোধূলির বুকে সজোরে আঘাত করল। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বন্ধ দরজার দিকে। গোধূলি বুঝতে পারল, মিথন নওশাদ পর্দার নায়ক হিসেবে যতটা জনপ্রিয়, বাস্তবের মানুষ হিসেবে সে ততটাই নিষ্ঠুর হতে পারে।
​মিথন মাহারুকে নিয়ে অন্য রুমে চলে যাওয়ার সময় যে কথাটি বলে গেল,

তা গোধূলির কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল:

​”আমার মাহারু শুধু আমার। একে তোমার কাছে রাখা যাবে না বাঙালি ম্যাম লিরা, নয়তো পরে আমার মাহারুও তোমার মতো এই ওল্ড বাঙালি কালচারাল হয়ে যাবে।”

​গোধূলি স্তব্ধ হয়ে মাঝঘরে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল না, বরং এক চরম অপমানের জ্বালা তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।

সে মনে মনে বলল—

​”যে সংস্কৃতি আমাকে বড় হতে শিখিয়েছে, যে ভালোবাসা দিয়ে আমি আজ এক অনাথ বাচ্চাকে আপন করে নিলাম, তাকে আপনি ‘ওল্ড কালচার’ বলে অপমান করলেন?

আপনি বড় মাপের অভিনেতা হতে পারেন মিথন সাহেব, কিন্তু মানুষের মন পড়ার ক্ষমতা আপনার নেই।”

​এদিকে বন্ধ দরজার ওপাশে মিথন মাহারুকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে পায়চারি করছিল। তার নিজের ভেতরেও এক অস্থিরতা কাজ করছে। সে এলিকাকে খুশি করতে গোধূলিকে অপমান তো করল, কিন্তু মাহারুর সেই নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকালে তার কেন জানি মনে হচ্ছে সে খুব বড় কোনো ভুল করে ফেলছে।

​গোধূলি দরজার ওপার থেকে চিৎকার করে বলল—

​”শুনুন বিদেশী বাবু! দরজা বন্ধ করে আপনি মাহারুকে আমার থেকে আলাদা করতে পারবেন না। মাহারু আপনার বিলাসিতা চেনে না, ও চেনে মাতৃত্বের ওম। আজ রাতে আপনি ওকে সামলান, কাল সকালে যখন ও কান্নায় আপনার ওই মডার্ন কালচার ধুলোয় মিশিয়ে দেবে, তখন এই বাঙালি ম্যামকেই আপনার খুঁজতে হবে!”

​গোধূলি আর সেখানে এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে তার নিজের ঘরে গিয়ে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। রাতের নিস্তব্ধতায় আরহাম বাড়িতে এখন দুই মেরুর দুই মানুষের মাঝে এক বিশাল দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, আর তার মাঝে পড়ে আছে ছোট্ট মাহারু।
★★*

রাত তখন প্রায় তিনটা। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ, শুধু এসির মৃদু আওয়াজ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। মিথন মাহারুকে নিয়ে অন্য রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেও তার মনে শান্তি নেই। সে ভেবেছিল মাহারু শান্তিতেই ঘুমাবে, কিন্তু হঠাৎ করেই মাহারু
আকাশ-পাতাল ফাটানো চিৎকার শুরু করল।
​মিথন লাফিয়ে উঠল। সে কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি একটা ছোট বাচ্চা এত জোরে কাঁদতে পারে। সে মাহারুকে কোলে নিল, পিঠে হাত বুলিয়ে দিল, এমনকি তার সেই দামী ল্যাপটপে কার্টুন চালিয়ে দেখানোর চেষ্টা করল—কিন্তু মাহারুর কান্না থামার কোনো নাম নেই। বাচ্চাটা যেন তার ‘বাঙালি ম্যাম’-এর সেই উষ্ণতা আর গোধূলির মায়াবী স্পর্শ না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠেছে।
​মিনিট পনেরো পর মিথনের সেই তথাকথিত ‘মডার্ন কালচার’ আর আভিজাত্যের দম্ভ একেবারে ধুলোয় মিশে গেল। মাহারুর কান্নায় তার নিজেরই এখন কান্না পাওয়ার দশা। নিরুপায় হয়ে মিথন গোধূলির রুমের দরজায় নক করল। কিন্তু গোধূলি দরজা খুলল না।

​মিথন এবার বাধ্য হয়ে খুব নিচু গলায় ডাকল—

“বাঙালি ম্যাম… লিরা! প্লিজ শুনুন। মাহারু খুব কান্না করছে। আমি কোনোভাবেই ওকে থামাতে পারছি না। প্লিজ একবার আসুন।”

​ওপার থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে মিথন আরও কাকুতি-মিনতি শুরু করল—

“লিরা, আমি আগের কথাগুলোর জন্য দুঃখিত। আসলে এলিকার সামনে আমি কী বলছিলাম আমি নিজেও জানি না। প্লিজ, এই বাচ্চাটার জন্য হলেও একবার বাইরে আসুন। ও তো কিছু বোঝে না।”

​গোধূলি আসলে দরজার ওপাশেই কান পেতে সব শুনছিল। মাহারুর কান্না তার বুকেও তীরের মতো বিঁধছিল। সে দরজাটা খুলে সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখমুখ তখনও পাথরের মতো শক্ত। সে মিথনের কোল থেকে মাহারুকে ছোঁ মেরে কেড়ে নিল।
​গোধূলি মাহারুকে নিয়ে বিছানায় বসল। খুব অদ্ভুত এক জাদুকরী ছোঁয়ায় মাহারুকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। এরপর তার সেই প্রিয় উপন্যাসের স্টাইলে গুনগুন করে একটা গান গাইতে শুরু করল। আশ্চর্যজনকভাবে, এক মিনিটের মধ্যে মাহারুর কান্না থেমে গেল। সে গোধূলির জামাটা ছোট ছোট হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুমিয়ে পড়ল।
​মিথন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অপরাধীর মতো দৃশ্যটা দেখছিল।

গোধূলি মাহারুর কপালে চুমু খেয়ে মিথনের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল

​ “দেখলেন তো বিদেশী বাবু? আপনার মডার্ন হসপিটালিটি আর চাইনিজ স্টাইল মাহারুকে শান্ত করতে পারেনি। এই ‘ওল্ড কালচার’ না হলে মাহারুর মতো বাচ্চাদের চলে না। এখন যান, নিজের রুমে গিয়ে শান্তিতে এলিকার সাথে চ্যাট করুন। মাহারু আজ আমার কাছেই থাকবে।”

​মিথন মাথা নিচু করে রইল। সে বুঝতে পারল, গোধূলি ইসলাম লিরা এই বাড়ির নিছক কোনো সদস্য নয়, বরং সে এই অগোছালো জীবনের সবচেয়ে জরুরি একটা অংশ।

মিথন ধীর স্বরে বলল—

“সরি লিরা। আমাকে মাফ করে দাও।”
​গোধূলি কোনো উত্তর দিল না। সে মাহারুকে নিয়ে শুয়ে পড়ল। তবে তার মনে মনে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি খেলা করছিল। সে জানত, এই ‘বিদেশী বাবু’কে জব্দ করার এটাই ছিল সেরা উপায়।

মিথনের এই রূপ গোধূলির কল্পনারও বাইরে ছিল। সে ভেবেছিল মিথন হয়তো ক্ষমা চেয়ে নিজের রুমে চলে যাবে, কিন্তু মিথন কোনো কথা না বাড়িয়ে গোধূলির পাশেই বিছানায় শুয়ে পড়ল। একপাশে মাহারু, আর অন্যপাশে নিজের ‘বাঙালি ম্যাম’—মাঝখানে ছোট্ট প্রাণটাকে নিয়ে মিথন যেন এক মুহূর্তেই সব দেয়াল ভেঙে দিল।

​গোধূলি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মিথনের দিকে। চাঁদের আলো জানালার পর্দা চিরে মিথনের মুখে এসে পড়েছে। সিল্কি চুলগুলো কপালে ছড়িয়ে আছে, আর চোখ দুটো বন্ধ। গোধূলির মনে হলো, এই মানুষটা যখন ঘুমায়, তখন তাকে ঠিক মাহারুর মতোই নিষ্পাপ লাগে। কোথায় সেই দাম্ভিক অভিনেতা, আর কোথায় এই শান্ত মানুষটা!
​মিথনের নিয়মিত নিশ্বাসের শব্দ আর মাহারুর ছোট ছোট হাতের নাড়াচাড়া দেখে গোধূলির বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।

সে আনমনে বিড়বিড় করে বলল—

​”জেহের থাকলে হয়তো আমাদেরও ঠিক এমনই একটা সুন্দর সংসার হতো। এমনই এক নিঝুম রাতে আমরা তিনজন একসাথে থাকতাম।”

​স্মৃতির জানলা দিয়ে এক পলক অতীতকে দেখে গোধূলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জেহের নেই, কিন্তু ভাগ্যের এক অদ্ভুত খেলায় আজ সে অন্য একজনের ঘরণী, আর কোলে তার এক পরিচয়হীন কুড়িয়ে পাওয়া সন্তান। জীবন বোধহয় কোনো উপন্যাসের চেয়েও বেশি অনিশ্চিত।
​গোধূলি আর কথা বাড়াল না। সে নিজের গায়ের পাতলা কম্বলটা টেনে মাহারু আর মিথনের গায়ের ওপরও একটু তুলে দিল। এক অদ্ভুত মায়ার চাদরে ঢাকা পড়ে গেল তিনজন। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে অপমানের আগুন জ্বলছিল, সেখানে এখন রাজ্যের প্রশান্তি।

★★*

ভোরবেলা জানালার পর্দা চিরে সূর্যের হালকা আলো যখন ঘরে ঢুকল, তখন আরহাম বাড়ির সেই বেডরুমের দৃশ্যটা ছিল দেখার মতো। রাতের কোনো এক সময় ঘুমের ঘোরে গোধূলি অবচেতনভাবেই মিথনের শক্তপোক্ত হাতের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়েছে।
​বেচারা মিথন! তার অবস্থা এখন শোচনীয়। একদিকে তার ডান হাতটা মাহারু আঁকড়ে ধরে আছে, আর বাম হাতের ওপর গোধূলির একরাশ লম্বা চুলে ঢাকা মাথা। মাঝখানে আটকা পড়ে মিথনের নাড়াচাড়া করারও কোনো উপায় নেই। ঘুমের ঘোরেই তার কপালে ভাঁজ পড়ে আছে, মুখটা হয়ে আছে মারাত্মক বিরক্তিকর—যেন কোনো সিনেমার হিরো ভুল করে কমেডি রোলে অভিনয় করতে গিয়ে ফেঁসে গেছে।
​মিথনের যখন আধো-আধো ঘুম ভাঙল, সে অনুভব করল তার বাম হাতটা একদম অবশ হয়ে গেছে। রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার জোগাড়! সে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখল, তার সেই ‘বাঙালি ম্যাম’ ওরফে গোধূলি একদম নিশ্চিন্তে তার হাতের ওপর নাক ডুবিয়ে ঘুমাচ্ছে। গোধূলির শান্ত চেহারাটা দেখে মিথন একবার ভাবল ঝাড়ি দিয়ে উঠিয়ে দেয়,।

কিন্তু পরক্ষণেই মাহারুর ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে সে থেমে গেল।

​মিথন বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল—

​”এই মেয়েটা কি ঘুমন্ত অবস্থাতেও আমাকে জব্দ করার শপথ নিয়েছে নাকি? একপাশে মাহারু ডন, আর অন্যপাশে গোধূলি ডাইনি—মাঝখানে আমি যেন স্যান্ডউইচ হয়ে গেছি!”

​সে খুব সাবধানে নিজের হাতটা বের করার চেষ্টা করল, কিন্তু গোধূলি ঘুমের ঘোরে আরও শক্ত করে তার হাতটা জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করে উঠল, “জেহের… যেও না…”

​গোধূলির এই অস্ফুট আর্তনাদ শুনে মিথনের হাতটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটা হাসিখুশি চঞ্চলতার অভিনয় করলেও তার ভেতরটা জেহেরের স্মৃতিতে কতটা হাহাকার করে। মিথনের বিরক্তিটা এক নিমেষে মায়ার রূপ নিল। সে আর হাত সরাল না, বরং নিজের শরীরের অবশ হয়ে যাওয়া কষ্টটা সহ্য করেই চুপচাপ শুয়ে রইল।

​ঠিক তখনই মাহারু একটা ছোট্ট হাত দিয়ে মিথনের গালে আলতো করে টোকা দিল।

মিথন মাহারুর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—

​”দেখলে মাহারু? তোমার এই বাঙালি ম্যাম কিন্তু খুব একগুঁয়ে। আমাদের দুজনকে তো দেখছি সারা জীবন এভাবেই পাহারা দিয়ে রাখতে হবে।”

মিথন বিছানা থেকে নামার আগে মাহারু আর গোধূলির দিকে একবার তাকাল। নিজের মনের ভেতর এক অদ্ভুত

অপরাধবোধ দানা বাঁধছে। সে বিড়বিড় করে নিজেকেই বলল—

​”আমি এলিকাকে ঠকালাম। মাহারু মেয়েটা আমাকে বিশ্বাস করত, ভালোবাসত। কিন্তু এই পরিস্থিতির গোলকধাঁধায় পড়ে আমি তো সব তালগোল পাকিয়ে ফেলছি।”

​সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহারুর কপালে আলতো করে ছুঁয়ে বিছানা থেকে নামল। শরীরটা অবশ হয়ে ছিল, কিন্তু তার হাতে এখন সময় খুব কম। ওয়াশরুমে গিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এল মিথন। আজকে তার এক নামী শোরুমের গ্র্যান্ড ওপেনিংয়ে চিফ গেস্ট হিসেবে থাকার কথা। মিডিয়া, ক্যামেরা আর ফ্যানদের সামনে তাকে আবার সেই আত্মবিশ্বাসী ‘কাং হুয়ান’ হয়ে দাঁড়াতে হবে।
​সে তার দামী স্যুটটা পরে দ্রুত হাতে রেডি হয়ে নিল। যাওয়ার আগে মাহারুর দিকে তাকিয়ে দেখল বাচ্চাটা নড়াচড়া করছে, হয়তো খিদের সময় হয়েছে। গোধূলি তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মিথন নিজেই কিচেনে গিয়ে খুব সাবধানে পরিমাণমতো দুধ দিয়ে মাহারুর ফিডারটা বানিয়ে আনল।
​মাহারুকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিয়ে দুধটা খাইয়ে দিল মিথন। বাচ্চাটা আধবোজা চোখে ফিডারটা শেষ করে আবার শান্ত হয়ে গেল। এরপর মাহারুকে বিছানায় গোধূলির একদম গা ঘেঁষে শুইয়ে দিল সে, যাতে বাচ্চাটা মায়ের উষ্ণতা পায়।

​মিথন তার পারফিউমটা শেষবারের মতো স্প্রে করে আয়নায় নিজেকে দেখল। তারপর একটা চিরকুটে লিখল—

​”বাঙালি ম্যাম, মাহারু দুধ খেয়েছে। আমি একটা শোরুম ওপেনিংয়ে যাচ্ছি। ফেরার সময় ফারুক সাহেবের বাড়ির জন্য মিষ্টি নিয়ে আসব। দেরি করবেন না।”

​চিরকুটটা টেবিলের ওপর চাপা দিয়ে মিথন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার দামি গাড়ির স্টার্ট দেওয়ার আওয়াজ পাওয়ার কিছুক্ষণ পরই গোধূলির ঘুমটা ভেঙে গেল। সে চোখ মেলেই দেখল বিছানায় সে একা নয়, পাশে মাহারু পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে—আর পুরো ঘরে মিথনের সেই সিগনেচার পারফিউমের ঘ্রাণ মিশে আছে।
​গোধূলি উঠে বসে চিরকুটটা হাতে নিল।

চিরকুটটা পড়ে সে মৃদু হাসল আর নিজের মনেই বলল—

​”বিদেশে বাবু দেখি দায়িত্বশীল বাবা হয়ে গেছেন! কিন্তু এলিকার কথা কি সত্যিই আপনি ভুলতে পারবেন?”

চলবে…..…

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments