গল্প:মায়াবিনী(০১)

Writer :Ayrah Rahman

পর্ব:০১


 

 

 

 

বয়সটা আমার বিশের কৌটাতেই আপাতত আটকে আছে। বয়স আমার খুব বেশি বলে আমার মনে হয় না, আবার সবার দিক বিবেচনা করতে গিয়ে আমার নিতান্ত ই ছোট ও বলা চলে না।

কথায় আছে না, বাঙালি মেয়েরা কুড়ি তেই বুড়ি। সবে মাত্র অনার্স ২য় বর্ষে উঠলাম কিছু দিন ই হলো বটে। তবে মাঝে মাঝে ই আশ্চর্য হই এই ভেবে আমি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করলাম তো মাত্র কয়েকদিন ই হলো, এত বড় হলাম কবে যে ভার্সিটি তে পড়ি তাও যেই সাব্জেক্ট আমার সবচেয়ে অপছন্দের সেটা নিয়েই পড়াশোনা করছি, “বাংলা” হ্যা এই বাংলা আমার সবচেয়ে অপছন্দের একটা সাব্জেক,এই বাংলাই কখনোই আমি ভালো করতে পারিনি,বাকি সবকটা বিষয়ে ৯০+ মার্ক থাকলেও বাংলাই সবসময় ই ডাব্বা মেরে আসছি, বাংলাই হায়েস্ট মার্ক আমার যতদুর মনে পরে ৭২ ছিলো,

“পিচ্চি এই পিচ্চি কই গেলি? নিচে আয় তো একটু”

নিচ থেকে আমার গুনধর ভাইয়ের কন্ঠ শুনতে পেয়ে আমার পরিচয় পর্ব টা আপাতত স্টপ রেখে নিচে গেলাম।

” কি হয়েছে ছাগলের মতো ম্যা ম্যা করছো কেন?”

ভাইয়া চোখ পাকিয়ে বলল,

“কি আমি ছাগলের মতো ম্যা ম্যা করি?”

“তা নয় তো কি? তাহলে এসেই চিল্লাচ্ছো কেন?”

“তুই সানজুর মাথা ফাঁটালি কেন?”

“বেশ করেছি,আমার সাথে ত্যাড়ামি করতে আসে কেন,ও জানে না, ও যদি ঘাড়ত্যাড়া হয় আমি ঘাড়ত্যাড়া র নানি”

বলেই নাক ফুলিয়ে ঠাস করে সোফায় বসে পড়লাম,

ভাইয়া ও আমার সাথে সোফায় বসে পড়লো,কিছুক্ষন আমার দিকে কেবলা কান্তের মতো তাকিয়ে থেকে হো হো করে হেসে দিলো,

ভাইয়ার এভাবে হাসার কোন কারণ খুঁজে পেলাম না।
আমি ভাইয়ার দিকে তাকাতেই ভাইয়া হাসি অফ করে আমাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে ভাইয়ার এক হাত আমার মাথায় রেখে আদুরে কন্ঠে বলল,

-“আজ পর্যন্ত তোর কোন কাজে আমি বাঁধা দিয়েছি বল তো? না কিছু বলেছি? আমি জাস্ট মজা করছিলাম তুই তো দেখি পুরো সিরিয়াস,পাগলি বোন আমার, যা নিজের কাজ কর, আর সানজু কে যদি তুই সাতদিন হসপিটালে ভর্তি করিয়ে রাখতি তবুও আমি কিছু ই বলতাম না, আমি জানি আমার পিচ্চি কোন ভুল করতে পারে না।”

বলেই ভাইয়া রুমে চলে গেলো,

এই যে এতক্ষণ কথা বললাম ইনি হলেন আমার গুনধর বড় ভাই, মেহেরাব খান মাহির। আমার থেকে মাত্র ১বছর ৪ মাস ১১ দিন ১৩ ঘন্টা ৪৪ মিনিটের বড়, যদি ও সেকেন্ডের হিসেবটা করতে পারি নি, আর আমার আরেকজন ভাই আছে সেহেজাদ খান আরাফ আমার থেকে ১ বছর ৪ মাস ১১ দিন ১৩ ঘন্টা ৪৫ মিনিটের বড়।

হ্যা ঠিকই বলেছি ওরা জমজ ভাই ,যদিও ওরা জমজ তাও আমার ঢের সন্দেহ আছে তাদের নিয়ে, তারা কি আদৌও জমজ কি না,সন্দেহ করার যথেষ্ট কারন ও আছে কারণ আরাফ আর মাহির জমজ হলেও তাদের না আছে কোন চেহেরা গত মধ্যে মিল আর না স্বভাবে, পুরোটাই বিপরীত।

মাহির ভাইয়া যতটা চঞ্চল আরাফ ভাইয়া ঠিক তার বিপরীত।
সারাক্ষণ মুখ গম্ভীর করে রাখে তবে যখন মজা করে বিশেষ করে আমার সাথে তখন বেশ হাসি খুশি থাকে কেউ বুঝতে ই পারবে না আরাফ ভাইয়া এতটা রগচটা স্বভাবের।

এত এত কথা মাঝে আমি আমার পরিচয় টা দিতেই ভুলে গেছি, আমি মাহাবীন খান আয়াত।
খান তকমাটা যদিও আমার পারিবারিক ভাবে দেওয়া তবে মাহবীন আর আয়াত আমার দুই ভাইয়ের দেওয়া নাম, মাহির ভাইয়ের নামের সাথে মিল রেখে রাখা হয়েছে মাহাবীন আর আরাফ ভাইয়ের নামের সাথে মিল রেখে রাখা হয়েছে আয়াত।

ভাইদের সাথে আমার সম্পর্ক টা বেশ গাঢ়। সারাদিন হাসি, ঠাট্টা, একজন কে আরেকজন খোঁচা মেরে কথা বলা যেন নিত্যদিনের স্বভাব।
মাহির ভাইয়ের সাথে যেমন আমার সাপে নেউলে সম্পর্ক আবার আরাফ ভাইয়ের সাথে তেমনি মাখনের সম্পর্ক।
দুই ভাইয়ের একমাত্র ছোট বোন হওয়াই আদরের কুল কিনারা হয়তো আমি নিজেও পাবোনা। তবে যদিও পরিবারে আমার ছোট অনেকেই আছে। আমার বাবা রা ২ভাই আর ২ বোন।

আমার বাবা ভাইবোনদের মধ্যে ৩য় স্থানেই আছে। বাবার ছোট এক ফুপি।

বড় চাচার এক মেয়ে এক ছেলে, বর্ষা আপু আর বিশাল ভাইয়া, ভাইয়া এবার অনার্স শেষ করে মাস্টার্স করছে,
আর আপু বিয়ে হয়ে গেছে, সে এখন শশুর বাড়ি তে।
বড় ফুপির ২ মেয়ে এক ছেলে, সায়রা জামান আর সাফা জামান ওরা এবার অনার্স ১ম বর্ষের,যদিও সায়রা থেকে সাফা এক বছরের বড়, বয়স যখন ওর ৭ তখন একটা এক্সিডেন করার কারনে এক বছর পিছতে হয়,আর ভাইটা সাফুয়ান জামান এবার ক্লাস ৮ম এ পড়ে।

আর আমার ছোট ফুপি বিয়ে করে নি,ওনার সাথে আমার সম্পর্ক টা টোটালি ফ্রেন্ডের মতো, বলতে গেলে বেস্ট ফ্রেন্ড।

কোন এক অজ্ঞাত কারণে বড় ফুপি আমাকে সহ্য করতে পারে না,তার কারণ টা আমি আজও জানতে পারলাম না।

সব মিলিয়ে খুব ভালো মন্দে মিল রেখেই কাটছিলো দিন,সবাই দেখে বলতো আমাদের বাকি সুখি পরিবার তবে জীবনে যেমন সুখ আছে তেমনি দুঃখ ও আছে।

ভাইদের সাথে আমার সম্পর্ক যেমন ই হোক না কেন,আর কারো সাথে সম্পর্ক ভালো বলে আমার মনে হয় না।

শহুরে কালচারে বড় হওয়া সত্যেও তা খুব একটা প্রভাব আমার মাঝে আগে ছিলো বলে আমার মনে হয় না যতটুকু এখন আছে।

যদিও সব টাই পরিস্থিতির কারণে,পরিস্থিতি আমাকে এমন হতে বাধ্য করেছে, তবুও আমার ভাইয়েরা আমাকে কখনো কোন কাজে বাধা দেয় নি।

আমাকে সকল দিক দিয়ে সকল কাজে সাপোর্ট করেছে।

সকাল সকাল ভার্সিটির জন্য রেডি হচ্ছিলাম,

ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঘরে ছোট ফুপি ঢুকে,

“মাহাবীন নাস্তা করবে না? চলো নিচে চলো”

“ফুপি তুমি মনে হয় মাঝে মাঝে ভুলে যাও আমি নিচে গিয়ে খাই না, নাস্তা টা উপরে পাঠিয়ে দাও, অবশ্য এখন খাবার টাইম ও নেই এমনি তেই দেরি হয়ে যাচ্ছে”

চুল গুলোতে ক্লিপ লাগাতে লাগাতে কথা গুলো বলল আয়াত।

ফুপির দিকে তাকিয়ে মুচকি একটা হাসি দিয়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরুতে যাবো অমনি মাহির ভাইয়া দরজা ঢেলে ঘরে ঢুকে।

” কেউ কোথাও যাচ্ছে না, আর মাহাবীন তুই নাস্তা না করে এক পা ও এখান থেকে নড়বি না, চুপচাপ বস এখানে “

বলেই খাটে বসিয়ে রুটি আর ভাজি নিয়ে আমার মুখের সামনে ধরলো।
অগত্যা ই আমাকে খেতে হলো, ভাইয়া এমন ই করে প্রতিদিন সকালে মাহির ভাইয়া আর না হয় আরাফ ভাইয়া এসে আমাকে নাস্তা খাইয়ে তারপর তারা গিয়ে নাস্তা করে।

মাঝে মাঝে তো দুই জনই খাবার নিয়ে আমার রুমে হাজির। ছোট ফুপি, মাহির ভাইয়া আর আরাফ ভাইয়া ছাড়া আমার রুমে প্রবেশ নিষিদ্ধ।

ব্যাগ নিয়ে নিচে নেমে দেখি,সবাই বসে নাস্তা করছে, আমি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো গাড়ির চাবি নিয়ে চলে গেলাম।

আমাকে এভাবে চলে যেতে দেখে বড় ফুপি বলে উঠলো,


“দেখেছো দেখেছো মুখপুরির কাজ দেখেছো, এখানে বড় রা যে বসে আছে সেদিকে কোন খেয়াল আছে, আহনাফ তোর মেয়েটাকে আর ভালো শিক্ষা দিতে পারলিনা। বড়দের কিভাবে সম্মান করতে হয় সেটাও জানে না, বেয়াদব অসভ্য মেয়ে’

ফুপির কথা শুনে বাবা কিছু না বলে খেতে লাগলো,এটা যেন তার নিত্যদিন ই শুনতে হয়।

‘ফুপি তোমাকে এত কিছু বিচার করতে কেউ বলে নি, আমার বোন আমি দেখবো কি শিক্ষা দিতে হবে আর কি দিতে হবে না”

কথাটি বলেই আরাফ ভাইয়া খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলো।

এই মহিলা প্রতিদিন একই কথা না বললে যেন পেটের ভাত হজম হয়না

আরাফ উঠার সাথে সাথে ই মাহির ও উঠে গেলো। এখানে বসে খাওয়া আর সম্ভব না।

___________

আয়াত আপন মনে গাড়ি চালাচ্ছে হঠাৎ সামনে তাকিয়ে তার মেজাজ চরম খারাপ করে ফেলে,

চলবে….

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Most Voted
Newest Oldest
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x