গল্প: অপেক্ষার প্রহর (০৬)

লেখিকা:ফাতেমা তুজ নৌশি

পর্ব:০৬

বিচার বসেছিল। সেই বিচারে শিমাতকে হারতে হলো। তার বোন তার দিকে আঙুল তুলেছে। মনসুর নিজে থেকে স্বীকার করেছে। বিলকিস যদিও নীরবতা পালন করেছেন তবে তিনি যে শিমাতের পক্ষে নন তা ছিল নিশ্চিত। বিচারে ঠিক হলো শিমাতের সাথে মনসুরের বিয়ে দেওয়া হবে। আর বিনির ক্ষতি করতে চাওয়ার অপরাধে এক লক্ষ টাকা জরিমানা দিবে। এতে ভয় পেয়েছিল বিনি। যদি টাকার জন্য পিছিয়ে যায় মনসুর? তখন তো আরেক ঝামেলা। তবে মনসুর পিছু হটে নি। সে টাকা দিতে প্রস্তুত। নগদ টাকার লোভেই হোক, কিংবা শিমাতকে বিদায় করার লোভেই হোক। বিলকিস কিন্তু রাজি হয়ে গেলেন। শিমাত ভরা সভায় ডুকরে কেঁদে উঠল। অথচ কেউ ওর পক্ষে নেই। শিলা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। শিমাত কাঁদছে।

“ভাবি সব শেষ।”

“কি করব,বলব বুঝতে পারছি না শিমাত।”

“আমার সব শেষ ভাবি।”

“আল্লাহ কে স্মরণ কর বোন।”

“এতিমের কেউ কেন থাকে না ভাবি? কেন থাকে না।”

বুক ভা ঙা কান্নায় শিলার ও খুব কান্না পাচ্ছে। সন্ধ্যায় চলে গেল শিলা। ঘরের মধ্যে বসে রইল শিমাত। ওর মস্তিষ্কে কি চলছে বোঝা যাচ্ছে না। দায় থেকে ঘরে খাবার দিয়ে গেলেন বিলকিস। তবে কথা বললেন না। যে ওনার মেয়ের ক্ষতি করতে চেয়েছে তাকে তিনি দু চোখে দেখতে চান না। সে রাতে প্রচুর বৃষ্টি হলো। ভাতের থালা ওভাবে রয়ে গেল। শিমাতের ও ধ্যান নেই। ও তাকিয়ে আছে। পলক পড়ছে তো পড়ছে না। কেমন যেন পাথরের মতো। সকাল হতেই অল্প বিস্তর আয়োজন শুরু হলো। সকাল সকাল ই হজুর ডেকে বিয়ে পড়ানো হবে। সবটা দ্রুত করতে চাইছিল মনসুর। তবে শিমাতের জন্য লাল শাড়ি এল না। কোনো কিছুই এল না। শিমাত ঘরে বসে সবটা দেখছে। পাত্র পক্ষ আসার কিছু সময় পূর্বে দুজন ছেলে বাড়িতে প্রবেশ করল। বিনি তখন বারান্দায় বসে ফোন চাপছিল। ছেলে দুটোকে দেখে উঠে দাঁড়াল। এরা কি ছেলে পক্ষ? মনসুরের কোনো আত্মীয় কি এত সুন্দর,স্মার্ট হতে পারে? বিনির মাথায় এল না। ততক্ষণে বিলকিস ও চলে এসেছেন। ছেলে দুটোকে আপাদমস্তক দেখে বললেন,”কে তোমরা? ছেলে পক্ষের কেউ?”

আশে পাশে কিছু মানুষ জন ছিল। কিছু আয়োজন চলছে বোঝা যাচ্ছে। রেহান হেসে বলল,”দুঃখিত। এখানে কী অনুষ্ঠান চলছে?”

“হ্যাঁ। কিন্তু তোমরা?”

“আমি রেহান। এটা তো নাসিম আহমেদের বাড়ি?”

“জি।”

“তাকে একটু ডেকে দিবেন?”

“সে মা রা গেছেন এক বছর হলো। কিন্তু তোমরা কেন খোঁজ করতেছ?”

“কিছু দরকার ছিল। আপনি কে?”

“আমি ওনার বউ।”

“ও, শিমাত এখানেই তো থাকে?”

শিমাতের নাম শুনে চমকে গেলেন তিনি। একটু অস্বস্তি নিয়ে বললেন,”হ্যাঁ। কিন্তু কে তোমরা। এত খোঁজ নিতেছ কেন?”

“ওকে একটু ডেকে দিন।”

“পরিচয় দেও আগে।”

“ওকে একটু ডেকে দিন। তারপর বলছি।”

কথার এক পর্যায়ে বরযাত্রী বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। পেছন ঘুরে তাকাল রেহান ও ইয়াজ। দুজনেই চোখে মুখেই চিন্তা দেখা গেল। একদল মানুষ এসে গান বাজনা আর নাচানাচি শুরু করল। একজন মুরব্বি গোছের লোক বললেন,”কই মেয়ে কই। তাড়াতাড়ি আনো। বিয়াটা শেষ হোক।”

রেহান আর ইয়াজ অপ্রস্তুতবোধ করল। বিলকিস কি করবেন বুঝলেন না। এই ছেলে দুটো ওনাকে চিন্তায় ফেলে দিলেন।

মনসুর বর সেজে এসেছে। তাকে বর কম মাতাল বেশি দেখাচ্ছে। পাগলের মতো নাচানাচি করছে। বিনি এত সময় কথা গুলো শুনছিল। ওর দৃষ্টিতে দুটো ছেলেই আটকে আছে। এমন গুড লুকিং স্মার্ট পুরুষ এ জীবনে দেখে নি ও। তবে ভয় ও কাজ করছে। এরা কেন শিমাতকে খুঁজছে?

মনসুর বিলকিসের কাছে আসতেই বোটকা গন্ধটা পেলেন তিনি। মুখ সরিয়ে নিলেন।
“চাচি মাইয়া বের কর। কই রে শিমাত। বের হ, আমি আইয়া পড়ছি।”

শিমাতের নাম শুনে চমকে উঠল রেহান ও ইয়াজ। চট করেই ধরে ফেলল বিষয়টা। এই ছেলের সাথে শিমাতের বিয়ে হচ্ছে? রেহান এবার বিচলিত হলো। ঘরের কাছে এসে ডাকতে লাগল।

“শিমাত, শিমাত, বেরিয়ে আসো। কোথায় তুমি?”

সব গুলো মানুষের নজর পড়ল রেহানের উপর। ছেলেটাকে দেখেই সবাই বিস্মিত। বিলকিস কি করবেন বুঝতে পারলেন না। রেহান পুনরায় ডাকতে লাগল।

“শিমাত, শিমাত। কোথায় আছ?”

ছেলেটার অধৈর্যতা দেখে সবাই অবাক হলো। ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল বিনি। রেহান ওর নিকট এল।

“তুমি, তুমি শিমাত?”

বিনি ভয় পেয়ে গেল। কথা খুঁজে পেল না।

“কথা বল। তোমার নাম কী শিমাত?”

“জি,না মানে।”

“শিমাত কোথায়? বল, কি হলো। বলছ না কেন?”

ধমকে কেঁপে উঠল বিনি। সকলে কানাঘুষা শুরু করেছে। ইয়াজ উঠে এল বারান্দায়।

“রেহান, এমন করছিস কেন?”

“আরে ভাই। দেখো, এরা কি করছে। ঐ মাতালটার সাথে ওর বিয়ে দিচ্ছে।”

রেহানের চিন্তাটা সকলের নজরে এল। ও আবার ডাকতে লাগল। ইয়াজ ওকে চুপ করতে বলে বিলকিসের কাছে এল।

“শিমাতকে ডেকে দিন। ওর সাথে আমাদের দরকার আছে।”

বিলকিস ঘরের কাছে এসে শিমাতকে ডাকলেন তবে মেয়েটি আওয়াজ করল না। রেহান ধৈর্য হারিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। শিমাত উল্টো হয়ে বসেছিল। হাঁটুতে মুখ রাখা। কোনো কথা ছাড়াই মেয়েটাকে দু হাতে দাঁড় করিয়ে নিল রেহান।

“চিন্তা নেই। ভয় পেও না। আমি তো এসে গেছি।”

সবটা সবার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। শিমাত একটু চমকে তাকাল। তারপর দেখতে পেল রেহানকে। রেহান ও ওকে দেখতে পেল।

“তুমি?”

শিমাত নিজেও কথা হারিয়ে ফেলল। ইয়াজ এসে মেয়েটিকে দেখে অবাক হলো। সবটা সামলে বলল,”কথা বাড়ানোর দরকার নেই। উঠে আয়।”

এর ই মধ্যে মনসুর সহ সকলে ঘরের কাছে এসে দাঁড়াল। রেহান সকলের দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।

“তামাশা হচ্ছে? একটা মাতালের সাথে ছোট্ট অনাথ মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন আপনারা?”

রেহান নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। ও চেচাচ্ছে। শিমাত খোলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে। সবটা মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। মনসুর এবার কাছে এল। রেহানকে দেখে নিয়ে বলল,”এই হিরো। কে তুমি? ওর বয়ফ্রেন্ড?”

ছেলেটাকে সহ্য হলো না ওর। কলার চেপে ধরে বলল,”আমি যেই হই। তোকে বলার প্রয়োজন মনে করছি না।”

এবার বিলকিস কথা বললেন। তবে ওনার কণ্ঠ নামানো।

“তোমরা কে? ঝামেলা করতেছ কেন? আর শিমাতের পছন্দেই বিয়ে হচ্ছে।”

হেসে উঠল রেহান। শিমাতের দিকে তাকিয়ে বলল,”ওর পছন্দে বিয়ে হচ্ছে? যদি তেমনই হত তবে ওর চেহারার এই হাল কেন?”

বিলকিস এবার কথা খুঁজে পেলেন না। ইয়াজ চুপ থাকতে পছন্দ করে। এই ঝামেলা ভালো লাগছে না। ও বলল,”কথা বাড়ানোর দরকার নেই। ওকে নিয়ে আয়।”

এবার সবাই বাঁধা দিতে লাগল। একটা মেয়েকে এভাবে নিয়ে যাওয়া সাধারণ বিষয় না। রেহান এবার উত্তর করল।

“আমি ওর কাজিন ব্রাদার। আশা করছি আর কারো কথা নেই।”

শিমাত সহ প্রায় সকলেই অবাক হলো। রেহান শিমাতের নিকট এসে দাঁড়াল।

“আমি রেহান। মনে পড়ে আমায়?”

দশ বছর আগের কথা। তবে রেহান নামের মামাতো ভাইকে মনে আছে ওর। ও অস্পষ্ট করে বলল,”মেজো মামার ছেলে?”

রেহান মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝাল। শিমাত অনেক মনে করেও দশ বছর পূর্বের সেই রেহান ভাই এর সাথে এই রেহানের মিল পেল না। ইয়াজ তাড়া দিল।

“সময় নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত আয়।”

শিমাতকে বের করে আনা হলো। সকলের চোখে মুখে বিস্ময়। এবার কথা উঠল। এভাবে নিতে পারবে না ওরা। এক পর্যায়ে টাকা পয়সার কথা ও উঠল। ইয়াজ এদের মানসিকতা দেখে অবাক হয়। সাধারণ ভাবেই ক্যাশ লাখ টাকা সাথে নিয়ে ঘুরে না ওরা। তবে হাতের কাছে বিশ হাজার টাকা ছিল। সেটা বিলকিসের হাতে তুলে দেওয়া হলো আয়োজনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে। আর লাখ টাকার চেক দেওয়া হলো মনসুরের হাতে। সবটা এত দ্রুত হলো যে কারোই বোধগম্য হলো না। শুধু দেখা গেল খানিক আগের এতিম মেয়েটির দু পাশে দুটি পুরুষ। যারা আগলে ধরেছে নুয়ে পড়া ফুলটিকে।

চলবে……

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments