লেখিকা:ফাতেমা তুজ নৌশি
পর্ব:০৭
পুরো সময় নীরবতা চলেছে। ইয়াজ গাড়িটা হঠাৎ করেই থামিয়ে দিল। তারপর ইশারা করল রেহানকে। রেহান পেছনে তাকিয়ে দেখল বাইরে দৃষ্টি দিয়ে আছে শিমাত। মেয়েটার চোখে মুখে ক্ষুধার যন্ত্রণা। খাবার আনতে গেল রেহান। লুকিং গ্লাসে মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে। চোখ মুখ ফুলে গিয়েছে। তবে শান্ত নির্মল চেহারা। ইয়াজ দৃষ্টি অবনত করে শুধাল,”ঐ ছেলেকে বিয়ে করতে চাও?”
মেয়েটি হয়ত শুনল না। ইয়াজ একটু অপমানিত বোধ করে। তার কথা গুরুত্ব সর্বস্থলে। একা হাতে কত কিছুই না সামলে চলেছে।
“শিমাত, শুনতে পাচ্ছ?”
এবার হয়ত শুনল মেয়েটি। তবে কিছু বলল না। ইয়াজ সেটা লক্ষ্য করে বলল,”ঐ ছেলেকে পছন্দ কর?”
মেয়েটি কথা বলতে পারল না। উত্তর আসছে না মুখ দিয়ে। ততক্ষণে চলে এল রেহান। হাতে খাবার। শিমাতের দিকে এগিয়ে বলল,”নাও। খেয়ে নাও।”
ক্ষুধার যন্ত্রণা সব যন্ত্রণাকেই হয়ত হার মানায়। মেয়েটি খাবার দেখতে পেয়ে সব দুঃখ ভুলে গেল। যতটা দ্রুত পারছে খাচ্ছে। রেহান এক দৃষ্টিতে দেখল। মেয়েটিকে খুব ছোট বেলায় দেখেছিল। সুন্দরী বলে ডাকত সে। অথচ সেই সুন্দরীর আজ কেমন হাল হলো! দুঃখে কান্না পাচ্ছে ওর।ছেলে বলেই হয়ত কাঁদতে পারল না। ইয়াজ গাড়ি চালাতে শুরু করেছে। অনেকটা সময় ড্রাইভ করে পৌছাল ওরা।
“ভেতরে নিয়ে যা। আমি গাড়ি পার্ক করে আসছি।”
শিমাতকে নামিয়ে নিল রেহান। ওর বিশাল হাতটা পেয়ে লুফে নিতে ভুল হয় নি মেয়েটির। কেন যেন বহুদিন পর আপন মানুষকে ফিরে পাওয়ার লোভ সামলাতে পারছে না। অথচ এত গুলো বছরে এই মানুষ গুলো কোনো খোঁজ ই নিল না। শিমাতের কান্না আসছে। হয়ত কেঁদেও ফেলত। তবে রেহান কাঁদতে দিল না।
“সুন্দরীর চোখে পানি কেন? আর কাঁদবে না। এখন থেকে সব ভালো হবে।”
এই ভরসাই এতিম মেয়েটির দরকার ছিল। সে শক্ত করে রেহানের হাতটা ধরে রাখল। এতে মুচকি হাসল রেহান। বাড়ির চৌকাঠ পেরোতেই একটি সতেরো আঠারো বছর বয়সী মেয়ে ছুটে এল। নাম রুহি। রেহান ইশারায় বলল কাছে আসতে। রুহি কাছে এসেই শিমাতকে জড়িয়ে ধরল। অপরিচিত মেয়েটিকে চিনতে পারছে না শিমাত। মেজো মামার বড়ো কোনো মেয়ে ছিল কি? উহু না। যে ছিল তার বয়স এখন বারো তেরো হওয়ার কথা। কিন্তু ওরা তো শুনেছিল মেয়েটি বাঁচে নি। তবে এ কে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পূর্বেই ড্রয়িং রুমে আরো মানুষ উপস্থিত হলো। তবে একটি মুখ ব্যতীত আর কাউকেই চিনতে পারল না ও। রেহানের মা রুকসানা এসে জাপটে ধরলেন শিমাতকে। একদম বুকের সাথে মিশিয়ে নিবেন যেন। বহু দিন পর মা মা গন্ধ পাচ্ছে শিমাত। ওর চোখে জল নেমে এল। মুখ দিয়ে উচ্চারণ হলো ‘মামি মা।’
ভদ্রমহিলা আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। মেয়েটিকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
“তোর মনে আছে শিমু? মনে আছে আমাকে? সত্যিই মনে আছে মামি মা কে?”
“কেন থাকবে না? তোমরা ভুলে গেলে কি হবে আমি তো ভুলি নি।”
অভিমান খসে পড়ছে যেন। রুকসানা কিছু বললেন না। মেয়েটির মুখ টেনে নিয়ে চুমু খেতে লাগলেন।
“মাফ করে দে মা। এতটা কষ্টে আছিস সত্যিই জানতাম না। তোর বাবা, আমাদের এতটা পর করল যে, থাক সেসব তুই একটু রেস্ট কর। সন্ধ্যায় তোর মামা আসবে। অনেক কথা হবে।”
মেয়েটিকে রুমে নিয়ে আসা হলো। শিমাতের পছন্দ সম্পর্কে অবগত তিনি। তাই রান্নার তদারকি করতে গেলেন। রুহি এসে শিমাতকে সাহায্য করতে লাগল। কোথায় কি আছে সব দেখাতে লাগল। ফ্রেশ হওয়ার জন্য নিজের জামা ও দিল। সব কেমন স্বপ্নের মতো। শিমাত যেন ঘোরে ডুবে। জীবন বদলে গেল তার? সত্যিই তার জীবনে সুখের বর্ষণ হচ্ছে? নাকি এর পেছনের ঘটনা আরো করুণ হবে। শিমাত জানে না। জানতেও চায় না। শুধু চাচ্ছে, সময় থেমে যাক। আপন মানুষ গুলো ফিরে আসুক। মায়া না করুক, অন্তত কেউ অবহেলার চোখে না দেখুক।
ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল শিমাত। তাকে ডাকতে এসে ফিরে গেল রুহি। ডাইনিং এ বসে ফল কা ট তে লাগল। এটা তার অভ্যাস। রকমারি ফল কা ট তে পছন্দ করে সে। দিনের মোট আহারের বেশিরভাগ অংশতেই থাকে ফল।
“রুহি,ইয়াজ কে ডেকে আনো।”
“যাচ্ছি মা।”
রুহি হাত ধুয়ে চলে গেল। ভাইয়ের ঘরে এসে দেখল তার হ্যান্ডসাম ভাই শাওয়ার রোব পড়ে বসে আছে। মিটিমিটি হাসল রুহি।
“কি?”
“ব্রো,এভাবে কোনো মেয়ে তোমায় দেখলে পাগল হয়ে যাবে।”
“দুষ্টু মেয়ে!”
“আসলেই। ট্রাস্ট হয় না? জাস্ট আমার ফ্রেন্ডদের একটা সুযোগ দিয়ে দেখো।”
“বুঝেছি,এসব ছাড়। এখন বল কি বলতে এলি।”
“মা ডাকছে। লাঞ্চ করবে না?”
“না। কাজ আছে। বের হব।”
“মা রাগ করবে। না খেয়ে যেতে নেই।”
ইয়াজ উঠে গিয়ে ড্রেস পরে নিল। রুহি তখনো বসে।
“যা, আসছি।”
রুহি এবার গেল শিমাতের ঘরে। তাকে ডেকে দিয়ে গেল রেহানের ঘরে। ডাকাডাকির কাজটা সে খুব ভালো পারে।
ডাইনিং এ বসে অস্বস্তিতে নুয়ে পড়ল শিমাত। গ্রাম্য জীবনে অভ্যস্ত সে। শহুরে কালচার তার জানা নেই। এত বড়ো বাড়িতে আগে কখনো থাকা ও হয় নি। তাই ভেতরে ভেতরে ভয় যেন একটু বেশি। তবে স্বস্তি নিয়ে এলেন রুকসানা। তিনি মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ইয়াজ নেমে আসতেই সকলের নজর পড়ল ওর দিকে। ছেলেটার পার্সোনালিটি মুগ্ধ করার মতো। শিমাত চুপচাপ খাচ্ছে। এত সব পছন্দের খাবারের প্রতি যতটা লোভ জাগছে,ততটা খেতে পারছে না। মনে হচ্ছে রুচি নেই। টেবিলের আয়োজন ইয়াজকে মুগ্ধ করতে পারল না। সে গোরুর মাং স খায় না। চিং ড়ি মাছ ছুঁয়ে ও দেখে না। এ সব বাদেও যেসব রান্না হয়েছে তার কিছুই ওর পছন্দের নয়। তবে ডাইনিং এ এসে পড়েছে বিধায় খেতে বসল। দেখা গেল ফল ছাড়া আর কিছুই মুখে দিল না। শিমাতের বরাবর বসায় নজরটা লাগল। সে দেখল ছেলেটার মুখে হাসি নেই। এই মানুষটা কি হাসে না কখনো?
পড়ন্ত বিকেল। শহরের এই অঞ্চলটায় ঘনবসতি নেই। বিশাল বাড়ি রেহানদের। অবশ্য বাড়িটা তাদের একার নয়। বাড়ির অর্ধেক দাবিদার ইয়াজের ফ্যামিলি। দুই পরিবার বহু বছর ধরে বিজনেস পার্টনার। সম্পর্ক ভালো বিধায় এক সঙ্গে বসতি গড়ে তোলা। এ যেন একটাই পরিবার। রুহি,রেহান আর শিমাত। তিন জন বের হয়েছে বাড়িটা ভ্রমণ করতে। বাসাটার আনাচে কানাচে বিলাসিতার ছোঁয়া। দেখলেই মনে হয় আহা!
“শিমাত মনে আছে, ছোট সময় তুমি আমাকে খুব পছন্দ করতে। আমার কোল থেকে যেতেই চাইতে না।”
শিমাতের আসলে মনে নেই। অনেক বছর আগের কথা। তবে রেহান ভাইকে মনে আছে তার। যার পিছু পিছু পুরো গ্রাম ঘুরত সে।
“সত্যি?”
“তো, মিথ্যে বলব?”
রুহি দমে গেল। রেহান পুনরায় বলল,”শিমাত কে আমি সুন্দরী বলে ডাকতাম। আর ও খিলখিল করে হাসত।”
এই মুহূর্তে মেয়েটির লজ্জা লাগল। সে একটু লাজুক হয়ে পড়ল। রুহি বলল,”কোন ক্লাসে পড়ো শিমাত?”
“কলেজে ভর্তি হয়েছি। তবে পড়া হয় নি।”
“তাহলে তো তুমি আমার এক ব্যাচ ছোট হবে। ওকে আমার কলেজে ভর্তি করালে কেমন হয় রেহান ভাইয়া?”
“সেটাই ভেবেছি। তোমার সাথে থাকলে চিন্তা মুক্ত হব।”
“তাহলে বড়ো পাপার সাথে কথা বোলো। আর আমার কলেজেই এডমিট করাবে।”
“আচ্ছা।”
এত উচ্ছাস, আনন্দ শিমাতের কেমন ঘোরের মতো লাগছে। সে কিছুতেই কিছু মিলাতে পারছে না। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেন মেজো মামা আনিসুল রহমান। তিনি শিমাতকে দেখে আবেগঘন হয়ে পড়লেন। তবে সেটা কাউকে বুঝতে দিলেন না। সময়ের স্রোতে শিমাত ও অতটা সহজ হতে পারল না। শুধু তাকিয়ে রইল মামার দিকে। এই মামার পিঠে চড়ে মেলায় ঘুরেছে সে। পিঠের উপর কত ঘুমিয়েছে। এসব মনে হলেই ভেতরটা কেমন করে উঠে।
তখন প্রায় অনেক রাত। রুকসানা ঘুমিয়ে পড়েছেন কী না সেটা জানার জন্য আনিসুল বললেন,”ঘুমিয়ে পড়লে?”
“না। কিছু বলবে?”
“হুম।”
রুকসানা এ পাশ ঘুরলেন। তারপর স্বামীর মুখের দিকে চাইলেন।
“চিন্তিত তুমি?”
“না,তবে একটা বিষয় ভেবেছি।”
“কি?”
“শিমাত জীবনে অনেক কষ্ট করেছে। যদি আগে জানতাম,তাহলে আগেই নিয়ে আসতাম।”
“সেটা নিয়ে কম তো দুঃখ করলে না। ওসব অতীত। মেয়েটা এখন ভালো থাকবে।”
“হুম। সেটা তো থাকবেই। তবে আমি অন্য কথা ভেবেছি।”
“কি?”
“মেয়েটা পরের ঘরে কেমন থাকবে সেটা তো জানি না। তার থেকে ভালো না নিজেদের কাছে রেখে দেওয়া?”
রুকসানা বুঝতে পারলেন। শিমাত সুন্দরী, ভদ্র। তার থেকে বড়ো কথা ওনাদের নিজেদের মেয়ে। ছেলের বউ হিসেবে ভালো বৈ খারাপ হবে না। রেহান ছোট থেকেই ভীষণ স্নেহ করত শিমাত কে। সেই হিসেবে সম্পর্কটা খারাপ হবে না। সুন্দর একটা ভবিষ্যত হবে। সে কথা চিন্তা করে রুকসানা হাসলেন। স্ত্রীর সম্মতি পেয়ে, আনিসুল যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।