গল্প:বিরহ বৃত্তান্ত(০১)

লেখিকা:জান্নাতুলফারিয়া প্রত্যাশা

পর্ব:০১

বিয়েটা হয়েছে একেবারে হুট করেই। মেহেরুন লোকটাকে চেনে না। কেবল জানে, সে সম্পর্কে তার চাচাতো ভাই। আপন নয়। সেই লোকের বাবা তার বাবার আপন চাচাতো ভাই। সেই হিসেবেই সেই লোকও তার চাচাতো ভাই হয়। তবে মেহেরুন তার চাচাকে দেখলেও সেই চাচাতো ভাইকে সেভাবে কখনো দেখেনি। আবার দেখলেও তার মনে নেই খুব একটা।

ঈদের আর ছয় দিনের মতো বাকি। পুরো পরিবার নিয়ে গ্রামে এসেছেন নিয়াজ সাহেব। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ঈদটা গ্রামেই করবেন। তার একটা ছেলে আর একটাই মেয়ে। মেয়েটা বড়ো। এবার অনার্স শেষ করেছে। তার বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছেন ভালো। তবে মন মতো মিলছে না খুব একটা। তার আপন চাচাতো ভাই মামুন শিকদার। বিরাট ব্যবসায়ী। ভদ্রলোকও অনেক বছর পর তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে এবার গ্রামে এসেছেন ঈদ করতে। ছোট ভাই নিয়াজ আসার খবরেই ইফতারের পর তিনি ছেলেকে নিয়ে ছুটে আসেন তাদের বাড়িতে। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় সময় নেয় কয়েক মিনিট।

বাড়িতে আয়োজন কম করা হয় না। মামুন শিকদারের গ্রামে ভীষণ খাতিরদারি। সবার বড্ড প্রিয় লোকও বটে। এখানেও তার ব্যবসা আছে। বেকারদের কাজের সুযোগ বেড়েছে তাতে। জায়গা-জমিও অঢেল। তাছাড়া আচার-আচরণও মুগ্ধ হওয়ার মতোই। তাকে পেয়ে নিয়াজ সাহেবের খুশির কমতি নেই। নাস্তার আয়োজন করেছেন হরেক। ঘরের রমণীরা সকলে ব্যস্ত আরও কিছু করতে।

কথার ফাঁকেই মামুন সাহেব বলে উঠলেন, ‘অতো ভণিতা আমি করি না, জানিসই। ছেলেটার বিয়ের বয়স হয়েছে। মেয়ে দেখছিলাম। পছন্দ হচ্ছিল না তেমন। তোর মেয়েটাকে আজ মাঠে দেখলাম। মাশা-আল্লাহ বড়ো হয়ে গিয়েছে। বিয়ে টিয়ে দিবি না-কি? রাজি থাকলে ভাই থেকে বেয়াই হয়ে যেতাম।’

নিয়াজ সাহেব প্রথমে থতমত খেলেন। কথার প্রসঙ্গ হুট করেই কোথায় চলে গিয়েছে সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে খানিকটা হেসে বললেন,

‘তুমি কি মজা করছ, ভাই?’

‘তোর কি তাই মনে হয়? এমন একটা ব্যাপার নিয়ে আমি মজা করব?’

নিয়াজ সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন,

‘আমাদের মেহেরুনকে তোমার পছন্দ?’

‘হ্যাঁ।’

সাবলীল স্বরে জবাব দিলেন মামুন শিকদার। পরপর বললেন,

‘যা মেয়েটাকে এই ঘরে নিয়ে আয়। একটু কথা বলি।’

নিয়াজ ভাইকে চেনে। চেনে তার পুরো পরিবারকে। তার একমাত্র ছেলে ওয়াহীদকেও তার চেনা বেশ। ছেলেটা বাবার মতোই দূরদর্শী, জ্ঞানী। তাছাড়া দেখতেও মাশা-আল্লাহ। তাকে নাকচ করার কোনো কারণ তিনি দেখছেন না। বরং প্রসন্ন চিত্তে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

‘আমি এক্ষুনি মেহেরুনের মা’কে জানাচ্ছি। তোমরা নাস্তা করো।’

নিয়াজ বেরিয়ে গেলেন। ঘরে আর কেউ নেই। ওয়াহীদ বাবার দিকে চাইল। এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল সব।

‘আমার মত-অমতের কোনো প্রয়োজন বোধ করছেন না, আব্বা?’

ভদ্রলোক ছেলের দিকে ফিরলেন। হেসে জিজ্ঞেস করলেন,

‘তুমি কি আমার মতের বিরুদ্ধে যাবে?’

‘যাব। আমি কোনো বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াতে চাই না।’

ছেলের রাশভারী জবাব পেয়ে খানিকটা স্তম্ভিত হলেন মামুন শিকদার। ছেলে কখনো তার অবাধ্য হয় না। কিন্তু এই বিয়ের কথা উঠলেই এমন বেঁকে বসে। বিয়ে নিয়ে ছেলেটার এত কী সমস্যা কে জানে। তিনি যথেষ্ট শান্ত গলায় বলে উঠলেন,

‘আমার অসম্মান কোরো না, ওয়াহীদ। তুমি বিয়েটা করলে আমি একটু নিশ্চিন্ত হতে পারব।’

‘আমাকে ক্ষমা করবেন, আব্বা।’

ওয়াহীদ মুখ ঘুরাল। মামুন শিকদার কপাল কুঁচকে ছেলের দিকে চাইলেন। তীক্ষ্ণ সুরে বললেন,

‘তোমার কাছে আমি আজ অবধি কিছু চাইনি। এই প্রথম চেয়েছি, ফিরিয়ে দিবে?’

‘আব্বা, চাওয়ার পাওয়ার একটা সীমাবদ্ধতা থাকে। আপনি সেই সীমা অতিক্রম করেছেন।’

‘বাবা হিসেবে কি এইটুকু অধিকার আমার নেই?’

ওয়াহীদ চোখ বুজল। নিঃশ্বাস ফেলল জোরে। বাবা বলে কর্কশ গলায় কিছু বলতেও পারছে না। অসহ্য লাগছে তার। মামুন সাহেব ফের বললেন,

‘মেহেরুনকে আমি চিনি। ভারী মিষ্টি একটা মেয়ে। তোমারও হয়তোবা দেখা। তাও আরেকবার দেখো। পছন্দ না হলে না করে দিও।’

‘যার মিষ্টি পছন্দ নয় তাকে অমৃত এনে দিলেও সে মুখ ফেরাবে। বিয়েতে আমার মত নেই, আব্বা।’

বলে উঠে দাঁড়াতে নিলেই সেখানে একটা মেয়ে আসে। হাতে চায়ের ট্রে। একপলক তাকে দেখে নিয়ে মামুন শিকদারের দিকে তাকায়। সুন্দর করে হেসে সালাম দেয়। শিকদার সাহেব জবাব দেন আমোদ গলায়। বলে উঠেন, ‘বসো, মা।’

মেহেরুন চায়ের ট্রে নামিয়ে এক কোণে রাখা চেয়ারে বসল। বাধ্য হয়ে তখন ওয়াহীদকেও বসতে হলো নিজের জায়গায়। শিকদার সাহেব মেহেরুনকে বেশ কিছু প্রশ্ন করলেন। মেয়েটা কোথায় পড়েছে, কী নিয়ে পড়েছে, ভবিষ্যতে কী করার ইচ্ছে—এই সবই। মেহেরুনও হেসে হেসে জবাব দিয়েছে সবকিছুর। এরপর অন্য ঘরে চলে গিয়েছে সে। শিকদার সাহেব চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে বলে উঠলেন,

‘আর দেরি করব না। কাজী ডাক, নিয়াজ। ছোট পরিসরে বিয়েটা আজই হবে।’

ওয়াহীদ থমথমে মুখে বাবার দিকে তাকাল। চোয়াল দৃঢ় তার। দৃষ্টি কঠিন। শিকদার সাহেব ছেলের সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করলেন সূক্ষ্ম ভাবে। উল্টো ব্যস্ততা দেখিয়ে বললেন,

‘আমিই বরং কল দিচ্ছি। তুই বাড়ির মানুষদের হালকা পাতলা আয়োজন করতে বল।’

নিয়াজ যদিও এত তাড়াতাড়ি চাচ্ছিলেন না। তাও সবটা মন-মতো হওয়ায় আর বাগড়া দিলেন না। দ্রুত বাইরে গেলেন সবাইকে জানানোর জন্য।

‘আব্বা, কাজটা আপনি ঠিক করলেন না। পরবর্তিতে যা যা হবে তার সম্পূর্ণ দায়ভার আপনার।’

ভদ্রলোক হাসলেন আবার। সোফায় গা এলিয়ে বসলেন আরাম করে। মোবাইলে কারোর নাম্বার খুঁজতে খুঁজতে বললেন,

‘ঐটুকু ভরসা আমার আছে তোমার উপর।’

‘ভরসা ভালো, তবে এই মুহূর্তে আপনি আমাকে অন্ধ-বিশ্বাস করছেন।’

‘বড়ো করেছি আমার শিক্ষায়। অন্ধ-বিশ্বাস করার মতো যোগ্য তুমি।’

ওয়াহীদ আর কিছু বলল না। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসিটুকু খেলে গেল কেবল।


‘বললেই হলো, না? এভাবে বিয়ে হয় না-কি?’

মেহেরুন মুখ লটকাল। সাবিনা মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। নিচু সুরে বললেন,

‘শান্ত হো। ঐ ঘরে উনারা বসে।’

‘তো? এভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার মানে কী? আর কেবল প্রস্তাব না, আজ, এখনই কেন বিয়ে করতে হবে? এত তাড়া কীসের উনাদের?’

মেহেরুন রেগে যাচ্ছে। তার দাদি এগিয়ে এলেন। পাশে বসলেন তার। বললেন,

‘সমস্যা কী ওতে? পোলা কি দেখতে খারাপ? না-কি বংশ খারাপ? সব ঠিকঠাক, তাহলে বিয়া করতে অসুবিধা কীসের?’

‘দাদি, পোলা দেখতে সুন্দর, আর বংশ ভালো হওয়াটাই বিয়ের মতো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। আমি ঐ ছেলেকে চিনি না ভালো মতো, না ঐ ছেলে আমাকে চিনে। আমাদের দুজনের একটা মত অমতের ব্যাপার আছে না?’

‘ওয়াহীদ নিজের বাবার কথার উপরে যায় না, মেহেরুন। যথেষ্ট নম্র আর ভদ্র একটা ছেলে। তোকে ও ভালো রাখবে।’

‘এত ভরসা, বাবা? অথচ আজকাল মানুষ নিজের ছেলেকেই চিনতে পারে না।’

‘তুমি খুব জটিল করছ বিষয়টাকে, মেহেরুন। বিয়ে তো তোমাকে আজ নয় কাল করতেই হবে। আর এত ভালো একটা সম্বন্ধ, অযথা নাকচ করার কী দরকার?’

ছোট চাচির কথায় খানিকটা দমল মেহেরুন। ছোট ছোট নিঃশ্বাস ফেলল কয়েকটা। বিয়ে সে করতে চায় ঠিক, তবে এভাবে না। একটু গুছিয়ে, সুন্দরমতো। কিন্তু এখন উপায় কই! বাড়ির মানুষগুলো মানবে না। তাই রয়ে সয়ে মন খারাপ করে বলল,

‘তাই বলে আজই বিয়ে করতে হবে? ঈদের পর করলে হয় না?’

‘ভাই চাইছেন, মা। শুধু কবুলটুকু বলে দে। পরে তোর ইচ্ছে মতো সমস্ত আয়োজন করা হবে।’

ব্যস, এইটুকুই। মায়ের এক শাড়িতেই বিয়েটা হয়ে গেল মেহেরুনের। মেয়েটা একটু কাঁদার সুযোগটুকুও পেল না। চোখের পলকে ঘরের মেয়ে থেকে কারোর বিয়ে করা বউ হয়ে গেল সে। অথচ যার বউ হলো ভালো করে তার নামটা অবধি জানা হলো না।

মেহেরুন নিচু মুখে বসে আছে। তার চাচাতো বোন ফিহা এল মিষ্টির বাটি হাতে। তার পাশে বসে হাসি হাসি মুখে বলে উঠল,

‘ভাইয়াকে মিষ্টি খাইয়ে এলাম। দারুণ হ্যান্ডসাম কিন্তু। তোমার পাশে চমৎকার মানাবে।’

মেহেরুন কপাল কুঁচকে তাকাতেই ফিহা দাঁত বের করে হাসল। একটা মিষ্টি তার মুখের সামনে ধরে বলল,

‘ওভাবে তাকাচ্ছ কেন? তোমার বরের দিকে নজর দিইনি। শুধু একটু মিষ্টিই খাইয়েছি।’

বলে মেহেরুনের মুখেও মিষ্টি পুরে দিল মেয়েটি। এরপর উঠে দাঁড়াল। বলল,

‘খেয়ে ওঠো, এক্ষুনি ঐ ঘরে নিয়ে যাব।’

মেহেরুনকে তার ভাইবোনেরা পাশের ঘরে নিয়ে গেল। সেখানে আপাতত ওয়াহীদ ছাড়া আর কেউ নেই। তারা মেহেরুনকে সেখানে রেখে চলে এল ঝটপট। ওয়াহীদ সোফায় বসা। ফোন দেখছে। মেহেরুন আস্তে করে সালাম দিল তাকে। ওয়াহীদ চোখ তুলল। নজর তাক করল তার সদ্য বিয়ে করা বউটার দিকে। সে জলপাই রঙের একটা শাড়ি পরেছে। হাতে একই রঙের অল্প কয়টা চুড়ি। মুখে সাজ নেই। চোখের দৃষ্টি মেঝেতে। ওয়াহীদ হাসল অল্প। ফোনটা পকেটে পুরে উঠে দাঁড়াল সটান। এগিয়ে এল মেহেরুনের দিকে। ধীর গলায় বলে উঠল,

‘স্বামীকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে হয়।’

মেহেরুন অপ্রস্তুত হলো খানিক। কিন্তু পরপরই নিজেকে সামলে অল্প ঝুঁকে মাথা সোজা রেখে সালাম করল তার স্বামীকে। ওয়াহীদের ঠোঁটের কোণে হাসিটুকু চওড়া হলো এবার। বলল,

‘সালামি কত চাও? কত দিলে তোমার এক্সপেক্টেশন ফিল আপ হবে, বলো?’

মেহেরুন বুঝল না। মাথা তুলল। জিজ্ঞেস করল,

‘মানে?’

‘মানে বড়োলোক ছেলে দেখে বিয়ে করেছ, তোমার এক্সপেক্টেশন নিশ্চয়ই খুব হাই! আর সেটা তো এখন আমাকে ফিল আপ করতেই হবে, তাই না?’

বলেই ওয়াহীদ তার পকেট থেকে পাঁচশত টাকার একটা বান্ডিল বের করল। সেটা মেহেরুনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

‘আপাতত এটাই আছে। বাড়িতে গিয়ে বাকিটা পাবে।’

মেহেরুন হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে বান্ডিলটার দিকে। লোকটা এমন ভাবে তাকে টাকা দিচ্ছে যেন সে কোনো ভিখারী। আশ্চর্য! মেহেরুন চোখ তুলল এবার। লোকটা তার থেকে লম্বায় অনেক। সে চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করল। ধারাল করল গলার স্বর।

‘আপনার কী মনে হয়, আমরা ভিখারী? আমার বাবা রাস্তার ফকির? আর আপনি আমাকে দয়া করে বিয়ে করে আমার বাবাকে উদ্ধার করেছেন?’

মেহেরুনের গলার স্বরের তেজ মুগ্ধই করল ওয়াহীদকে। হাসল সে। বলল,

‘মনে হবে কেন? আমি তো নিশ্চিত। নয়তো কীসের ভিত্তিতে তুমি আর তোমার পরিবার এই বিয়েতে রাজি হলে? আমাকে তো তুমি ভালো মতো চেনোও না।’

লোকটার কথাবার্তা মেহেরুনকে বিস্মিত করছে। কোনো ভদ্র ছেলে কি তার সদ্য বিয়ে করা বউয়ের সাথে এভাবে কথা বলে? এটা কি আদতে ভদ্রতার বহিঃপ্রকাশ? মেহেরুন কিছু বলার আগেই ওয়াহীদ তার হাতে টাকাটা চেপে ধরে বলল,

‘দশ মিনিট সময় দেওয়া হলো। তৈরি হও, আমি এখনই ফিরব।’

মেহেরুনের সবকিছু এখনো বিস্ময়কর লাগছে। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে বুঝতে পারছে না সে। কোনোমতে জিজ্ঞেস করল,

‘কোথায় যাব?’

‘আমার বাড়িতে। এখন অবশ্য তোমার শ্বশুরবাড়িও।’

‘কিন্তু আমাকে তো বলা হয়েছে, প্রোগ্রামের পর আপনাদের বাড়িতে তুলে নেওয়া হবে।’

ওয়াহীদ হাসল। ভারী তাচ্ছিল্য সেখানে। বলল,

‘ওসব প্রোগ্রাম কবে হবে না হবে তার জন্য আমি বসে থাকব না-কি? আমার বিয়ে করা বউ তুমি, আজ থেকে আমি যেখানে থাকব তোমাকেও সেখানেই থাকতে হবে। গো ফাস্ট। দশ মিনিট থেকে অলরেডি দু’মিনিট চলে গিয়েছে।’

চলবে………

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x