লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী
পর্ব:১০
কায়েশী ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই এক মুহূর্ত দেরি না করে সোজা নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। খুব ভোরও নয়,ঘড়ির কাঁটায় তখন মাত্র সাতটা। তবু বুকের ভেতর অকারণ তাড়া বাচ্চাটার জন্য। তাই হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকেই তার চোখ পড়ে কায়ানের দিকে। বাচ্চাটা এখনো গভীর ঘুমে মগ্ন। কাল রাতে কায়ানের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল কায়েশী। এবার মনে মনে স্বস্তির শ্বাস ফেলে সে। ভাগ্য ভালো, আগেই উঠে যায় নি কায়ান। নাহলে মাকে কাছে না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়তো। একফোঁটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিশ্চিন্ত হয়ে দু’কাপড় হাতে সরাসরি বাথরুমে ঢুকে পড়ে সে।
কনকনে শীত, তবু মটর চালিয়ে ঠান্ডা পানিতেই গোসল করলো সে। গরম পানি কায়েশীর সহ্য হয় না, শীত হোক বা গ্রীষ্ম, তার গোসল আয়েশ করে করতে কেবল ঠান্ডা পানিই লাগবে। আজ শীত একটু বেশিই, তাই তাড়াতাড়ি গোসল সেরে কোনোমতে কাপড় পরে বেরিয়ে আসে।
ঠিক তখনই কায়ান নড়েচড়ে উঠে বসে। ঘুম ভেঙেছে তার। ঘুমজড়ানো চোখে ছোট ছোট হাতমুঠো দিয়ে চোখ কচলায়, উল্টোপিঠে বসে পড়ে। ব্যস্ত হাতে শাড়ি পরতে পরতেই কায়েশীর চোখ পড়ে ওর দিকে।
“আরে আব্বু যে! এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছো কেন? আরেকটু ঘুমাও, এখনো তো খুব সকাল হয়নি।”
মায়ের কন্ঠ পেয়ে পেছন দিকে তাকিয়ে ফোকলা দাঁত বের করে হাসে কায়ান। শিশুসুলভ টানে বলে,
“আ’ল ঘুমু দিবো না। ঘুম সে’স! “
শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতেই কায়েশী তাকে কোলে তুলে নেয়। ঠোঁটে নরম হাসি দিয়ে বলে,
“আচ্ছা, তাহলে চলো। আগে হাতমুখ ধুইয়ে দিই। তারপর একটু আরবি শিখবো। কেমন?”
কায়ান ভদ্র শিশুর মতো মাথা দোলায়। উষ্ণ পানির সাথে ঠান্ডা পানি মিশিয়ে মায়ের হাতেই ধুয়ে নেয় তার হাতমুখ। এরপর সাদা উলেন কার্পেটের উপর বসে মুখে মুখে আরবির ছোট ছোট শব্দ বলে কায়েশী৷ কায়ান মন দিয়ে শোনে, অনুকরণ করে। শুধু আরবি নয়, স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ, সংখ্যা- সবই কায়েশীর ঘরোয়া পাঠেই শেখাচ্ছে।
কায়ানের বয়স পাঁচ হলেই স্কুলে দেবে। তার আগে এই ঘরটাই হবে তার পাঠশালা। অযথা প্লে কিংবা নার্সারি নয়, একেবারে প্রথম শ্রেণিতেই ভর্তি করাবে কায়ানকে। এই সিদ্ধান্তে কায়েশী অটল।
পড়ার পাঠ শেষ হলে কায়ানকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে সে। রান্নাঘরে ঢুকে সিঙ্কের পাশের খালি জায়গায় ছেলেকে বসিয়ে দেয়। মাথা চুলকাতে চুলকাতে কায়ান আধো আধো স্বরে বলে,
” মা, ডোডো কাবো। কিদে পাচ্ছে! “
চুলায় তখন দুধ বসানো হয়েছে। কায়েশী মৃদু হেসে বলে,
“জানি বাবা, খিদে পেয়েছে। কাল রাতেও ঘুমের মাঝে এইটুকুনি খেয়েছো! তাই তো তোমার ডোডো আগেই বসিয়েছি।”
এরপর সেলফ থেকে কিছু কিসমিস নামিয়ে পানিতে ভিজিয়ে বাটিতে দেয় কায়ানের হাতে,
“নাও, এগুলো আগে খেয়ে নাও।”
বাটি হাতে নিয়ে কায়ান খুশিতে বলে,
” ওহ! কি’চ’মি’চ!”
” হ্যাঁ, এখন খাওয়া শুরু করো। আমি দুধটা নামাই।”
দুধ নামিয়ে ফিডারে ঢালে কায়েশী। এখনো ফিডার ছাড়েনি কায়ান। গ্লাসে দিলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, খেতে চায় না। কায়েশী অবশ্য কিছু বলে না, একভাবে খেলেই হলো। কাজের মাঝে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে কায়রা। এক লাফে এসে কায়ানের পাশে বসে, চোখমুখে দুষ্টুমি ভাব। কায়ানের দুগালে দুটো চু’মু দিয়ে কায়রার চোখ পড়ে কায়েশীর ভেজা চুলে, যা তোয়ালে দিয়ে এখনো অর্ধেক বাধা রয়েছে। কায়েশী তখন চা বানাচ্ছিলো দুজনের জন্য। সকাল সকাল ননদ-ভাবী চা খায় প্রতিদিন। এদিকে কায়রা ভাবছে অন্যকিছু। সে জানে তার ভাবীর সকালে গোসল করার অভ্যাস তাই বিষয়টাতে সহজভাবে নিলেও পরক্ষণেই চোখ পরে যায় গলার কাছটায়। এবার সব স্পষ্ট হয়ে যায়। কায়রা ছোট ছোট চোখে পরোখ করে নেয় একবার। তারপর সব বুঝে হাসতে হাসতে বলে,
“কি ব্যাপার ভাবি! সকাল সকাল গোসল!”
দুধের ফিডারটা কায়ানের হাতে ধরিয়ে দেয় এবার। তারপর চা-য়ে চিনি দিতে দিতে স্বাভাবিক স্বরেই বলে,
” সকাল সকাল গোসল নতুন কি! আমি তো সকালে উঠেই গোসল করি, নতুন জানলে নাকি? আজ অবশ্য দেরি হয়েছে। এমনিতে ফজরের আগেই উঠে যাই। আর পারলে তুমিও ফজরের আগে উঠে নামাজ পড়বে। তারপর পড়তে বসলে দেখবে পড়া তারাতাড়ি কমপ্লিট হয়ে যাবে। বেলা অব্দি ঘুমানো ভালো নয়।”
কায়েশী এখনো বুঝতে পারেনি কায়রার খুনসুটির আভাস। কায়রা তার দুষ্টুমি বজায় রেখেই হেসে ফিসফিস করে বলল,
“সে উঠবো না হয়। কিন্তু ভাবী, আজ তো তুমি অন্যরকম গ্লো করছো। হয়তো আমার ভাইজানের ভালোবাসায়। না জানি আমি কবে এমন গ্লো পাবো? ই’স, দুঃখ!”
কায়েশী এমন কথায় ভ্রু কুচকে তাকালো। এবার বুঝতে পারল বোধহয়। ছোট ছোট চোখে কায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমরা তিন ভাইবোন এত বদমা’শ কেন? মানে এত মিল কিভাবে তোমাদের? রক্তের সম্পর্কের বড় উদাহরণ তোমরা।”
কায়রা ভ্রু কুচকিয়ে হেসে বলল,
“আমাদের চিনে গেছো, বুঝলাম। কিন্তু ছোট ভাইজানের সঙ্গে কথা হয়েছে তোমার? নাহলে কিভাবে বুঝলে ছোট ভাইজানও বদমাশ?”
কায়েশী আলতো শ্বাস ফেলে মাথা নামিয়ে নিল। তারপর দুটো কাপে চা ঢেলে বলল,
“বলেছি কথা। তোমার বড় ভাই নিজেই দেখা করিয়েছে।”
কায়রা চা হাতে নিয়ে বলল,
“ওহ, তাহলে ঠিক আছে। এক দেখাতেই ছোট ভাইজানকে সবাই চিনে ফেলে। আর শোনো ভাবী, তুমি বললে না আমরা এক লেভেলের বদমাশ? উহু, ভুল জানো তুমি। ছোট ভাইজানের ধারে কাছেও নেই আমরা দুজন। সে টপনো’চ লেভেলের বদমাশ।”
এ কথা বলে কায়রা উচ্চস্বরে গা দুলিয়ে হেসে উঠল। কায়েশী কিছু বলল না, সে সাধারণ হাসি হেসেই চা-তে চুমুক দিল। ইতিমধ্যে কায়ানের ফিডার শেষ।
কায়ানের খাওয়া শেষ হতেই তাকে কায়রা বসার রুমে সোফায় বসিয়ে টিভি চালু করে দিয়ে চলে যায়। তারপর কায়রা আবার রান্নাঘরে ফিরে আসে। এতক্ষণ চা খেতে খেতে কায়েশী সকালের রান্না সাজিয়ে নিচ্ছে। কায়েশী কায়রাকে দেখে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি আজ ভার্সিটি যাবে না?”
কায়রা তখন সবজি কাটছিলো, ভাবীর হাতে হাত সাহায্য করতে। উত্তরে বলল,
“ নাহ, আজ যাব না, ফার্স্ট ইয়ারদের নবীনবরন আজ।আমি গিয়ে কি করবো!”
কায়েশী মাথা নাড়ায়। ঠিক সেই সময় কায়রাভ রান্নাঘরে প্রবেশ করল। সে পেছন থেকে কায়েশীকে ডাকলো প্রতিদিনকার ন্যায়,
“কায়েশী…আমি বেরোচ্ছি।”
কায়েশী আর কায়রা দুজনেই পেছনে তাকাল পরিচিত পুরুষালী আওয়াজে। দেখলো, কায়রাভ সাদা পাঞ্জাবি আর কোট-প্যান্ট পরে, সম্পূর্ণ রেডি। বিবাহিত জীবনে এই প্রথমবার বোধহয় কায়েশী নরম গলায় বলল,
“আব… দশ মিনিট ওয়েট করতে পারবেন? ভাত তো হয়ে গিয়েছে। আপনি খেয়েই যান? খুব তাড়া আছে কি?”
এই কথায় কায়রাভ বড় বড় চোখে তাকাল সামনে থাকা মেরু’ন রাঙা শাড়ি পরা রমনী’র পানে। কায়রাও তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর দুই ভাইবোন নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে নিল। এই অদ্ভুত দৃশ্য কায়েশীকে বিস্মিত করে দেয়। এভাবে কেন তাকাচ্ছে? সে কি এমন বলেছে? আজব! কায়রাভ হা হওয়া অবস্থাতেই বলে,
“এই কায়রা! আমার বউকে দেখেছিস? আমার বউ কই? কে এটা? আমার বউয়ের মতো দেখতে!”
কায়রাও একইভাবে হা হয়ে উত্তর দিল,
“ভাবী কোথায় আমি জানি না, ভাইজান?”
দুই ভাইবোনের হালকা ছলে তুচ্ছ ঠাট্টা শুনে কায়েশীর মুখে অপ্রকাশ্য রাগ ভাসল। সে বলল,
“এত অভিনয় করার দরকার নেই। আমি তো ভালোভাবেই জিজ্ঞেস করেছি। কিন্তু নাহ! আজকাল আমার ভালো কথাও যেন সবার খারাপ লাগছে।”
কায়রাভ কায়েশীর দিকে এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বলল,
“রাগ করো না। আমরা শুধু মজা করছিলাম। কিন্তু সত্যি বলতে কি, যেই তুমি আমার সঙ্গে দুটো কথা ঠিকমতো বলতে পারো না, সেই তুমি আমাকে খেয়ে যেতে বলছো! অথবা জীবনে কখনো বলেছিলে কি?”
কায়েশী কিছু বলল না। চুপ হয়ে গেলো। এদিকে কায়রা ধিমি আওয়াজে বলল,
“দেখো ভাবী, সত্যি বলছি। তোমার আচরণ হঠাৎ বদলে গেলে, আমরা তো এমন রিয়েকশনই দেবো। আর এটাই স্বাভাবিক নয় কি?”
কায়েশী ধীরে ধীরে বলল,
“বুঝতে পেরেছি। আমি ততটাও খারাপ নই, যতটা তোমরা ভাবো। একটু সময় দাও। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সব গুছিয়ে নেব।”
কায়রা হেসে বলল,
“যাক, অবশেষে বুঝতে পারলে। আর কে বলেছে আমার ভাবী খারাপ? তুমি শুধু একটু অভিমানী আর রাগী।”
কায়রাভ হাস্য মিশ্রিত স্বরে বলল,
“আর এই অভিমান ও রাগ যুক্তিযুক্ত হলেও তা বছরখানেক ধরে জমে পরে আছে। তবে এবার মনে হচ্ছে, একটু একটু গলছে বৈকি!”
এই কথায় কায়রা মৃদু হেসে রান্নাঘর ছেড়ে ডাইনিং-এ চলে গেল। কিন্তু কায়রাভ তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে।
অতি নিরেট স্বরে বলল,
“আমার তাড়া নেই, এবার খাবার নিয়ে এসো আমাদের জন্য… সাথে নিজের জন্যও।”
কায়েশী মৃদু হেসে ভাত পরিবেশন করতে লাগল। অনেকদিন পর শান্তি শান্তি মুহূর্ত দেখা দিলো খান বাড়িতে। ঘরটা হালকা উষ্ণতায় ভরে উঠল যেন।
********************
প্রীতিষা আজ নীল শাড়ি আর নীল গাজরা চুড়িতে ঠিক যেন পরীর মতোই সেজেছে। নবীনবরণের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে নিজেকেও আজ একটু অন্যরকম লাগছিল তার। তার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়, নতুন বন্ধুত্ব হয়েছিল। তবে আজ ভিন্নতা। পরিচিত সহপাঠীরা তো প্রশংসায় একেবারে মুখর সাথে তারই মাঝে একজনের সঙ্গে বেশ আপন হয়ে উঠেছে সম্পর্কটা। মেয়েটির নাম ইসরাত। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইসরাত হেসে বলে উঠল,
” ওহ বান্ধবী! ইউ জাস্ট লুক টু মাচ প্রি’টি!”
প্রীতিষা দাঁত বের করে হাসল প্রতিউত্তরে। মজার স্বরে বলে,
” আসার পর থেকে শুধু প্রশংসাই করে যাচ্ছিস। আর করিস না তো! নজর লেগে যাবে! “
ইসরাত আলতো করে ধাক্কা দিয়ে চোখ টিপে বলল,
” নজর লাগাচ্ছি না রে! কিন্তু কী করব বল, চোখ এমনিতেই আটকে যাচ্ছে, তোর ওই ছাম্মাক ছাল্লো রুপে! “
প্রীতিষা ফিক করে হেসে উঠল এরুপ সম্মোধনে। তার এই বান্ধবীটা একটু পাগলাটে হলেও মনটা ভীষণ ভালো। সকাল থেকে বিকেল, খাওয়া, আড্ডা, হাসাহাসিতে সময় কীভাবে যে কেটে গেছে টেরই পায়নি সে। দিনটা সত্যিই সুন্দর কেটেছে। নবীনবরণের কনসার্ট চলবে সারারাত। কিন্তু এতক্ষণ থাকার অনুমতি নেই ভাইয়ের। আর থাকবার ইচ্ছেটাও খুব একটা ছিল না প্রীতিষার। তাই বিকেল গড়াতেই ইসরাতের সঙ্গে বিদায় নিয়ে কলেজের গেট পেরিয়ে বেরিয়ে এল সে। ইসরাতও নিজের বাসায় চলে গিয়েছে। প্রীতিষা বাইরে এসে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে কাবিরের নাম্বার ডায়াল করল। কয়েকবার রিং হতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল ঘুমজড়ানো কণ্ঠ,
” ক্যারা রে?”
প্রীতিষা কন্ঠ শুনেই বুঝলো, ব্যাটা নির্ঘাত ঘুমাচ্ছিল! তবুও হাসিমুখে বলল,
” আমি… প্রীতিষা। “
কাবির ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়। গভীর ঘুমে ছিল সে। সকাল থেকে একটা বিল্ডিংয়ের কাজে হাড়ভাঙা খাটুনি গেছে। বাসায় ফিরেই বিছানায় ঢলে পড়েছিল। এটা তো তার নিত্যদিনকার অভ্যাস।
” ফোন দিছো ক্যান? কী হইছে?”
” আজ তোমার কি কোনো কাজ আছে? মানে… তুমি বিজি নাকি?”
কাবির একটা বড় হাই তুলে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল,
” না, আজ আর কাম-কাজ নাই। কিন্তু এইডা জিগাইলা ক্যান?”
এই কথায় প্রীতিষার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আশানুরূপ কথা শুনে। তাই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
” তাহলে এক কাজ করো, ভাসানীর সামনে চলে এসো তারাতাড়ি। আমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছি। বানিজ্য মেলায় যাব, একসাথে।”
কাবির মুখ কুঁচকে ফেলল।
” মেলা-টেলায় এখন যাইতে পারুম না। অন্য কাওরে নিয়া যাওগা। আমি ঘুমামু।”
আরও একটা হাই তুলে সে যেন ফোন নামিয়ে রাখতেই চাইছিল। প্রীতিষা তা বুঝে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
” কাবির, তুমি আসবে। আমি দাঁড়িয়ে আছি তোমার অপেক্ষায়। আর আমি অন্য কারো সাথে যাব না।”
” থাকো দাঁড়াইয়া। আমার কী! আমি আইমুনা। “
এই কথা শুনে প্রীতিষা শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তুমি না আসা পর্যন্ত আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব।”
কাবির আর কিছু না বলে বিরক্তির সঙ্গে ফোন কেটে দিল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হঠাৎ এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আলনা থেকে একটা ভালো শার্ট গায়ে চাপাতে চাপাতে বিড়বিড় করে বলল,
” উ’ফ-ফ! বুঝতাছি, এই মেয়া ভালোই যন্ত্রণা দিব!”
সাথে পুরনো বাটন ফোন পকেটে গুজে দরজায় তালা লাগাল সে। চাবির রিং এ আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে বেরিয়ে পড়ল। গন্তব্য এখন আপাতত, ভাসানীর সামনে।
————————–
অন্যদিকে প্রীতিষা জানতো, কাবির আসবেই। যতই ত্যাড়া কথা বলুক, যতই না-আসার ভান করুক, শেষমেশ সে ঠিক চলে আসবে। ভাবনার মাঝেই সত্যি সত্যিই তাকে দেখতে পেল প্রীতিষা। কাবির একটা মেরু’ন শার্টের ওপর কালো জ্যাকে’ট পরেছে, সাথে চেনা সেই উদা’স ভঙ্গি। আবার কপালে সানগ্লা’স তুলে রেখেছে! এ কেমন স্টাই’ল! অবশ্য এসব কাবিরের দ্বারাই সম্ভব! ভিড়ের মধ্যে থেকেও কাবিরকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল। কাছে এসে কাবির একটু বিরক্ত, নিত্য অভ্যাসের সুরে বলল,
” আমার লগে এত ঘুরাঘুরি করা লাগে ক্যান? আর একটা কথা খেয়াল করলাম, আমারে না তুমি ‘আপনি’ কইতা আগে? আজকে ফোন দিয়া ডাইরেক্ট ‘তুমি’ কইলা কেমনে?”
প্রীতিষা হেসে ফেলল।
” ওই যে, সেদিন না বন্ধু হলাম! বন্ধুদের মাঝে আবার ‘আপনি’ আসে নাকি?”
কাবির হালকা করে ঘাড় নাড়াল। তখনই যেন নতুন করে চোখে পড়ল প্রীতিষার উপর। নীল শাড়িতে, তার সামনে ঠিক যেন কোনো নীল হুর দাঁড়িয়ে আছে! কাবির প্রশংসা করতে জানে না, এই সত্যটা তার নিজের কাছেই পরিষ্কার। তাই মুখ ফুটে কিছু বলল না। কিন্তু কাবিরের এই নীরব তাকিয়ে থাকাটা এড়ালো না প্রীতিষার চোখ। সামনের মানুষটার দৃষ্টিতে খারাপ কিছু নয় বরং মুগ্ধতাই খুঁজে পেলো সে। তাই একটুও অপ্রস্তুত না হয়ে স্বাভাবিক হয়েই বলল,
” এইভাবে কী দেখছো? “
ততক্ষণে দুজন হাঁটা শুরু করেছে রাস্তায়। কাবির দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বলল,
” উম… কিছু না। আবার ভাইবো না তোমার থোবরা দেখতাছি। অতও সুন্দর না তুমি! তা সোয়েটার বা চাঁদর কিছু পরোনাই ক্যান? সারাদিনে ঠান্ডা না লাগলেও বিকাল থেকে তো ঠান্ডা ধরবোই।”
প্রীতিষা লাজুক গলায় উত্তর দিল,
“মাথা থেকেই বেরিয়ে গেছে। শাল রেডি করাই ছিল আসার সময়, কিন্তু তাড়াহুড়োয় বেরিয়ে পড়েছি।”
কাবির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তোমার আক্কেল কবে হইবো বলো তো?”
প্রীতিষা শুধু হাসল। কথার ফাঁকে ফাঁকে সত্যিই ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে তার। তাই দু-হাত আড়াআড়িভাবে বাহুতে ঘষে একটু উষ্ণতা খুঁজল প্রীতিষা। ঠিক তখনই কাবির জ্যাকেট খুলে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
” পইরা নেও। আর ঠান্ডা লাগবো না।”
প্রীতিষা অবাক হলেও জ্যাকেট’টা পরে নিল। কাবিরটাকে বোঝা বড় দায়! জ্যাকেট’টা পরতেই একটা চেনা-অচেনা পুরুষালি ঘ্রান এসে নাকে লাগল। কেন জানি না, ভালো লাগল তার। আবেশিত হয়ে হঠাৎ নিজের অনুভূতিটা বুঝে উঠতেই সে নিজে নিজে হেসে উঠল। তারপর কাবিরের দিকে তাকিয়ে বলল,
” তোমার ঠান্ডা লাগবে না?”
কাবির হালকা ভঙ্গিতে বলল,
” পোলা মাইনসে’র সব সইয়া যায়। আর এইডা তো সামান্য ঠান্ডাই! আর তাছাড়াও ফুল হাতা শার্ট পরছি, সমস্যা নাই।”
প্রীতিষা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তখন কাবির একটু গম্ভীর হয়ে বলা শুরু করল,
” আর শোনো, সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরাঘুরির ইচ্ছা থাকলে বাদ দেও। এখন চারটা বাজে। ঠিক সাড়ে পাঁচটায় মেলা থেকে বের হইবা। কোনো তেড়িবেড়ি কথা শুনমু না। তারপর রিকশায় উঠায় দিমু, সোজা বাড়িত যাবা।”
প্রীতিষা মুচকি হেসে বলল,
” আমারও রাতে ঘোরার প্ল্যান নেই। কিন্তু রাতে থাকতে মানা করছো কেন? মানুষ তো রাতেই বেশি মেলায় যায়। “
কথা বলতে বলতেই তারা মেলার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। চারপাশে আলো, শব্দ, মানুষের ভিড়। কাবির গম্ভীর গলায় বলল,
” রাতে আজাই*রা-ফাত*রা পোলাপান বেশি থাকে, গেঞ্জাম করে। বুঝছো তো? নাকি আরও ডিটেইলস কমু?”
প্রীতিষা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল। বলল,
” না না, থাক। বুঝেছি। “
চলমান…….