“শুনলাম আপনি নাকি লোকের চাল, ডাল, তেল এসব চু*রি করেন। কথা কি সত্য, মশাই?”
তাহরিমের ফোনে এমন আজগুবি লেখাটা পড়ে তাহরিমের দিকে চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে তাকালো কুশন। গুরুত্বপূর্ণ মিটিং শেষ করে সবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছে তাহরিম তালুকদার। সামনে থাকা পানির বোতলের ক্যাপ খুলতে খুলতে তার ব্যাক্তিগত এসিস্ট্যান্ট কুশনের দিকে কপাল কুঁচকে তাকালো,
” লা*ল পানি খেয়েছিস নাকি কুশন? কি আবল তাবল বকছিস?”
কুশন তাহরিমের ফোনের স্ক্রিন তার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলল,
” ভাই, এটা আপনার ফোনে কেউ পাঠিয়েছে, আননোন নাম্বার। কিন্তু কথা হলো আপনার ঘরের খবর পরে জানলো কেমনে? “
তাহরিম কপালে ভাজঁ ফেলে লেখাটা পরপর দু বার পড়লো। না জেনে এতো বড়ো অপবাদ? এমন উদ্ভট মেসেজ কেউ কাউকে পাঠায় নাকি? তার মতো সাধু পুরুষের নামে এতো বড়ো অপবাদ! মেসেজ আসা নাম্বার টাও এক পলক দেখে নিলো সে। এটা কেমন বাঁ*দ*রা*মি! সে একজন সম্মানিত মানুষ, তাকে সোজা চো*র উপাধি দিয়ে দিলো!
” ভাই, আমার মনে হয় লোকটা ভবিষ্যত বলে দিতে পারে। আবার এটাও মনে হচ্ছে আপনাকে কেউ আপনার উপর নজর রাখছে। দেখেন না এটা কেমন কনফিডেন্সের সাথে কথাটা বলল। “
” তো?”
কুশন খানিকটা এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
” ভাই ইদানীং কা*লা যাদুর সমস্যা গুলো বেশি হছে। আমার মনে হয় আপনার গতিবিধি নজর রেখে কেউ কা*লো যাদু মালো যাদু করতে চাচ্ছে”
তাহরিম পানি খেয়ে বোতলের ক্যাপটা ঠিক করে লাগিয়ে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকালো কুশনের দিকে, শান্ত গলায় বলল, ” ফালতু প্যাচাল পারবি না কুশন।”
কুশন দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, ” না না সত্যি বলছি। লোকজন এভাবেই পিছু পিছু ঘুরে সব খবর নিয়ে পরে ক্ষ*তি করে দেয়। তাই আমার মনে হচ্ছে আপনাকে কেউ কা*লো যাদু করার চেষ্টা করছে । “
তাহরিম নাক মুখ শক্ত করে তাকালো কুশনের দিকে, পৃথিবীতে যত উদ্ভট আর আজাইরা যুক্তি আছে তার সবই কুশনের ভান্ডারে ভরপুর।
তাহরিম নিজের খিটখিটে রাগ সংবরন করে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো কুশনের দিকে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল ” তোর মাথায় হকিস্টিক দিয়ে দুইটা দিতে পারলে ভালো হতো। এটলিস্ট বুদ্ধি টা খুলতো তোর। গ*র্ধ*ব কোথাকার! “
তাহরিমের ধমকে চুপসে গেলো কুশন তবে মনের খচখচানিটা দুর হলো না।
” নাম্বার টা ট্র্যাক করে দেখবি এটা কার নাম্বার। আর আমি বাসায় যাচ্ছি, তুই সবটা গুছিয়ে চলে আসিস।”
তাহরিম তালুকদার উঠে দাঁড়ালো কালো রঙের পাঞ্জাবি সাথে সাদা রঙের পাজামা। ফর্সা শরীরে কালো রঙটা বেশ মানিয়েছে তার। চোখের পাশে কা*টা দাগ বেশ গভীর। চুল গুলো বেশ এলোমেলো। মিটিং ফিটিংয়ের চক্করে ভালো ঘুম হয় না আজ কত রাত! তবুও শরীর ক্লান্ত হয় না তেমন। দায়িত্ব, কর্তব্য সবটা মাথায় রাখতে হয়।
” ভাই মজুমদার সাহেব আসবেন বলেছিলেন। আপনি দেখা না করেই চলে যাবেন? “
তাহরিম নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ” “মানুষের জন্য কিছু করতে হতে হলে আগে সময় সচেতন হতে হবে। মজুমদার সাহেব এতো বছরেও সময় নিয়ে সচেতন হতে পারলো না। এমন একজন অসচেতন মানুষের জন্য আর যায় হোক তাহরিম তালুকদার অপেক্ষা করবে না। উনার দরকার পরলে উনি নিজেই খুঁজে নিবে আমাকে। তোকে যেই কাজ দিয়েছি সেটা মনোযোগ দিয়ে কর। “
তাহরিম চলে যেতে নিয়েও থমকে দাঁড়ালো, ঘাড় ঘুরিয়ে কুশনের দিকে তাকিয়ে বলল, ” আননোন নাম্বারের মালিকের খোঁজ কর। কার পেটে এতো শ*য়*তা*নি আমিও বের করছি! “
_____________
মোবাইল হাতে নিয়ে নিজের লিখা মেসেজটা পড়ছে আর মিটমিট করে হাসছে ইলমি। পাশের ডেস্কে বসে থাকা পূর্ণা চোখ কুঁচকে তাকালো ইলমির দিকে। পূর্ণার তাকানো দেখে খিলখিল করে হাসতে হাসতে চেয়ারে বসে পড়লো ইলমি। অযথা কারণ ছাড়া পা*গলের মতো হাসতে দেখে পূর্ণা কপাল কুঁচকালো। ইলমির হাতে নিজের ফোন দেখে বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,
” ইলু আমার ফোন দিয়ে কি করছিস তুই? আমার নতুন সিমের নতুন নাম্বার যদি উল্টা পাল্টা কিছু করিস তো খবর আছে। “
ইলমি কোন রকম হাসি থামিয়ে পূর্ণার ফোন তার দিকে এগিয়ে দিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, ” এতো ভাউ খাস না তো পূর্ণ । আমি কি ওমন মেয়ে নাকি যে আজেবাজে কাজ করব? তুই সবসময় বেশি ভাবিস পূর্ণ। তার চেয়ে বরং যেই আর্টিকেল লেখছিলি সেটাই লেখ। “
পূর্ণা ইলমির দিক থেকে নজর সরিয়ে নিজের ডেস্কের উপর কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বলল, ” আমার ডেস্কে যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নাম্বার লিখা প্যাডটা ছিল ওটা কোথায় ইলু? তুই নিয়েছিস? সত্যি করে বল।”
ইলমি চোর ধরা পড়ার মতো মুখ করে নিজের ডেস্কের উপর বইয়ের ভাজ থেকে মাঝারি সাইজের প্যাড টা নিয়ে পূর্ণার ডেস্কে রেখে বলল, ” এই যে তোর প্যাড। কিভাবে যেন আমার ডেস্কের উপর চলে আসছে! মাত্র দেখলাম।”
পূর্ণা ইলমির দিকে তাকিয়ে ভ্রু বাঁকিয়ে নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল, ” হ্যা হ্যা খাতা কলমের তো হাত পা আছে যে হেঁটে হেঁটে চলে গেছে। নাটক করার আর জায়গা পাস না? সবসময় বাঁদরামি! কানের নিচে একটা দিব না! বিটিভির মতো ঝিরঝির করবি। “
পূর্ণার ঝাড়ি শুনে ইলমি মুখ লটকিয়ে বসে রইলো নিজের চেয়ারে। অফিস টাইম প্রায় শেষের দিকে। অফিসে আপাতত এই দুইজনই আছে। পূর্ণার একটা আর্টিকেল শেষ করার কথা ছিল সেটার জন্য ই বসে ছিল তারা। পেশায় দুইজন ই সাংবাদিক। মাস ছয়েক হয়েছে জয়েন করেছে।
পূর্ণা ডেস্ক গুছিয়ে প্রয়োজনিয় ডকুমেন্টস ব্যাগে ভরে রেডি হলো বের হওয়ার জন্য। পাশে তাকিয়ে দেখে ইলমি এখনো মুখ লটকিয়ে বসে আছে। পূর্ণা ঠোঁট চেপে হেঁসে ইলমির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, পূর্ণা এক পাশে দাড়ায় তো ইলমি আরেক পাশে ঘুরে বসে। এভাবে বার তিনেক চলার পর পূর্ণা পরপর বলতে শুরু করলো,
” অনেক দিন আগে শুনেছিলাম এই জায়গাতে নাকি শ্ম*শা*ন ছিলো, শ্ম*শা*নের উপর এই অফিসটা করা হয়েছে। সূর্য ডোবার পর কেউ যদি একা থাকে তাহলে তাকে নাকি কে নাম ধরে ডাকে। আবার ঘাড় ও ম*টকে দিতে পারে।
আমার দায়িত্ব ছিল তোকে জানানোর আমি জানালাম। এখন তুই এখানে বসে থাকলে থাকতে পারিস। রাত হয়ে এসেছে আমি বরং যাই “
বলেই পূর্ণা পিছনে ঘুরতেই ইলমি ঝড়ের বেগে এসে পূর্ণার হাত চেপে ধরলো।
আশেপাশে তাকিয়ে আমতাআমতা করে বলল,
” এই তুই কি সত্যি বলছিস? এখানে সত্যি ই ভু*ত প্রে*ত থাকে নাকি?”
পূর্ণা বিপরীত দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হেঁসে স্বাভাবিক হয়ে বলল, ” সত্যি মিথ্যা কিভাবে বলব? আমি কি দেখেছি নাকি? আমি যা শুনেছি তাই বলেছি। থাকলেও থাকতে পারে। তুই বরং আজকে রাতটা এখানে থেকে সত্যি মিথ্যা যাচাই করে নে।”
ইলমি এক হাতে নিজের ব্যাগ আরেক হাতে পূর্ণার বাহু চেপে ধরে আছে।
” দরকার নেই বাবা। আমি থাকব না এখানে। চল চল রাত হয়ে আসছে। “
ভু*তে মারাত্মক ভয় তার। পূর্ণা ইলমির হাত ধরে বের হয়ে আসলো অফিস থেকে। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এক পলক সময়টা দেখে নিলো, ঘড়ির কাটা সাতের ঘর ছাড়িয়ে আটের ঘরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আজ বেশ দেরি হয়ে গেছে, সারাদিনের ব্যস্ততা, নিউজের কিছু কাজ আবার আর্টিকেল লেখা সব মিলিয়ে ক্লান্ত লাগে ভীষণ। বস যদিও সময় সীমা বেঁধে দেয় নি জমা দেওয়ার তবুও হাতের কাজ ফেলে রাখা মোটেও ঠিক না।
এমনিতেই ক্লান্ত তার উপর বাসায় গেলে দেরি হওয়ার জন্য হাজারো কৈফিয়ত দিতে হবে এসব ভেবে বিরক্ত লাগছে পূর্ণার। প্রতিদিন এতো কটু কথা, এতো কৈফিয়ত দিতে ভালো লাগে না তার। কিন্তু মা কে তো কিছু বলাও যায় না। শেষে না আবার চাকরি করতেই না দেয়! এসব ভাবতে ভাবতে পূর্ণা একটা রিকসা ডেকে তাতে উঠে বসলো সাথে ইলমি ও। পূর্ণা আর ইলমির বাসা একই কলোনীতে। ইলমি বাসা পেরিয়ে পাঁচ মিনিট হাঁটলে ই পূর্ণাদের পুরনো দোতলা বাড়ি। যদিও ভাড়া থাকে তারা বহু বছর হলো। সেখান থেকেই ইলমি আর পূর্ণার বন্ধুত্ব।
প্রায় মিনিট বিশেকের মধ্যে সে পৌঁছে গেলো নিজের বাসার সামনে। ইলমিকে নামিয়ে দিয়েই এসেছে। ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে দোতলায় এসে দরজায় কড়া নাড়তেই সেকেন্ড পাঁচেকের মধ্যে দরজা খুলে দিলো লাবনী বেগম। কড়া গলায় বললেন,
” কি নবাবনন্দিনী, বাড়ি ফেরার সময় হলো আপনার রাজকার্য শেষ করে! তা কোন চুলোয় গিয়েছিলেন যে এতো দেরি হলো? “
পূর্ণা মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে ধীর কন্ঠে বলল, ” মা একটা বিশেষ আর্টিকেল কমপ্লিট করা লেগেছে তাই দেরি হয়েছে। “
লাবনী বেগম কিড়মিড়িয়ে উঠে বলল, ” ওসব নতুন বাহানা মাত্র। আসলে তো বাড়ির কাজ করবি না বলে এতো দেরি করলি। খালি তো পায়ের উপর পা তুলে গিলতেই পারিস। অন্নধ্বং*স করছিস বসে বসে। এই যে বলি মেয়ের বয়স হয়েছে এবার বিয়েসাদী দেও। আমার কথা তো গায়েই লাগায় না মশাই। একদিন একটা আ*কা*ম কু*কা*ম করে বাড়ি ফিরবে পরে তেনার চোখ খুলবে। যত্তসব আ*দি*খ্যে*তা! “
” আহহ লাবনী! কি শুরু করেছো? মেয়েটা সবে অফিস থেকে এসেছে। একটু জিরিয়ে নিক তারপর বাকি সব বলো। “
মাজহারুল ইসলামের কথায় লাবনী বেগম চোখ পাকিয়ে তাকালো তার দিকে,
” লাই দাও আরোও। মাথায় তুলে নাচো। লাই দিতে দিতে ই তো আজ এতো দুর। “
পূর্ণা মাথা নিচু করে নিজের রুমে যেতে যেতে শুনলো, মা তাকে ডেকে বলছে,
” নবাবজাদী, কাপড় পাল্টে ভিজিয়ে রাখা কাপড় গুলা কেঁচে শুকাতে দিয়েন। ঘর দোয়ার ঝাঁট দিয়ে মুছে তারপর গিলতে বসবেন। “
পূর্ণা শুনলো কিন্তু কিচ্ছু বলল না। চুপচাপ রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। শত হোক মা তো মাই হয়। দশ মাস দশ দিন পেটে ধরেছে। সে কি কখনো তার খারাপ চাইবে? কখনো না।