গল্প: মায়াবিনী(০৬)


 লেখিকা:Ayrah Rahman

পর্ব:০৬

 

আয়াত! মামনি উঠো অনেক বেলা হলো তো, ভার্সিটি তে যাবে না?

ছোট ফুপির ডাকে কিছু টা নড়ে চড়ে উঠলাম কিন্তু ঘুমের রেস টা তখন ও ভালো ভাবে কাটে নি,

ছোট ফুপি দরজার কাছে দাড়িয়ে আমাকে ডাকছিলো,

চোখ বন্ধ করে ই বললাম,,

“ফুপি তুমি যাও আমি উঠছি তো”

আমার কথা শুনে ফুপি দরজা ছেড়ে আমার কাছে এসে আমার মাথা টা ধরে নিজের কোলে নিয়ে কপালে একটা গাঢ় চুমু খেলো,

” মা আমার উঠো তো, না হলে আবার দেরি হবে”

আজ কি হলো তোমার সবসময় তো সবার আগে উঠো আজ এত দেরি হলো কেন? রাতে দেরি করে ঘুমিয়ে ছিলে?

— উহুম, রাতে তো ভাইয়া ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল

— তাহলে উঠো উঠো,

বুঝতে পারলাম এখন আর ফুপি আমাকে না উঠিয়ে এখান থেকে যাবে না, অগত্যাই আমাকে উঠে বসতে হলো,

আমি উঠে সোজা হয়ে বসে চুল গুলো খোঁপা করতে লাগলাম,

চুল গুলো আমার ছোট থেকে ই বেশ বড় ছিলো, অনেক টা কোমড় পর্যন্ত, অনেক বার চেষ্টা ও করে ছিলাম চুল গুলো কেটে ঘাড় অবদি নিয়ে আসতে তবে শেষে হার মানতে হয়েছে এই ছোট ফুপির জন্য কারণ আমাদের বংশে নাকি আমার চুল ই মোটামুটি লম্বা, ফুপির লম্বা চুল খুব পছন্দ তাই ফুপি আমার চুলের অনেক যত্ন ও করতো,

আমাকে উঠে বসতে দেখে,

— আমি নাস্তা নিয়ে আসি তুমি ফ্রেস হও,

ফুপি কথা টা বলেই ঘর থেকে বের হয়ে গেলো,

আমিও ফুপির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললাম,

এই মহিলা টা আমাকে কেন জানি মাত্রা অতিরিক্ত ভালোবাসে। আমি কখন কি খেলাম না খেলাম, কি করলাম, চুল বাঁধলাম নাকি সব কিছুর খবর রাখে, অথচ আমার মা বাবা দেখো আমি মরে গেলেও তাদের কিছু যায় আসবে না।

কথা গুলো মনে মনে বলেই তাচ্ছিল্যের হাসি দিলাম,

আর কিছু না ভেবে কাপড় নিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলাম,

গোসল শেষে বের হয়ে দেখি ফুপি খাবার নিয়ে বসে আছে,

— ভাইয়া কোথায় ফুপি?

— কে, মাহির?

— হুম

— ও তো সেই সকালে কোথায় যেনো গেলো, বলতে পারছি না

— ওহ্ আর আরাফ ভাইয়া?

— আরাফ তো রুমে ঘুমাচ্ছে কাল রাতে রাত জেগে পড়েছে এখন ঘুমাচ্ছে, ডেকেছিলাম উঠে নি।

— ও আচ্ছা,

আমি গিয়ে ফুপির সামনে গিয়ে বসলাম,

— দাও আমাকে দাও আমি খাচ্ছি

— জ্বি না, তা হচ্ছে না, আপনার মহামান্য ভাইজান আমাকে আদেশ করে গেছেন যেন আমি আপনাকে যেন নিজের হাতে খাইয়ে দেই,

ফুপির কথা শুনে বেশ হাসি পেলো,,ল

আমি হেসে হা করলাম, ফুপিও মুচকি হেসে আমাকে খাইয়ে দিতে লাগলো,

খাওয়া শেষে আমি ভার্সিটির জন্য রেডি হয়ে নিচে নামলাম,

গাড়ির চাবি নিতে গিয়ে দেখি চাবি নেই, আমি ভ্রু কুঁচকে চার পাশ টা ভালো ভাবে খুঁজে দেখলাম, কোথাও চাবি নেই।

— ফুপি ফুপি

আমার চিৎকার শুনে ছোট ফুপি বের হয়ে আসলো সাথে আমার মা বাবা আর বড় ফুপি,

আমি ছোট ফুপি কে উদ্দেশ্য করে বললাম,

— ফুপি আমার গাড়ির চাবি টা কোথায় পাচ্ছি না,

— খুঁজে দেখো না আছে হয়তো কোথাও,

— সব জায়গায় খুঁজেছি পাই নি,

আমার কথার মাঝখান দিয়ে বড় ফুপি বলে উঠলো,

— এই গাড়ির চাবি আর তুমি পাবে না, এটা তোমার বাবার গাড়ি তাই সে নিয়ে নিয়েছে।

আমি বেশ খানিকটা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালাম,

আমার তাকানোর মানে বুঝতে পেরে বাবা বলল,

— এভাবে তাকানোর কিছু হয় নি, আমার গাড়ি আমার ইচ্ছে আমি যাকে খুশি তাকেই দেবো কাউকে কৈফিয়ত দিবো না,গাড়ি আছে বলে যা খুশি তাই করবে যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাবে সেটা হতে দেওয়া যাবে না, তাই গাড়ি আজ থেকে আমার কাছে ই থাকবে।

আমি এবার ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকালাম,

মায়ের মুখে না কোন দুঃখ দেখতে পাচ্ছি আর না কোন অভিযোগ বেশ ফুরফুরে মেজাজে ই আছেন তিনি তাই এবার ঘাড় কাত করে বড় ফুপির দিকে তাকালাম,

দেখি তার মুখে লেগে আছে বিজয়ের হাসি,,

এবার তাকালাম ছোট ফুপি র দিকে দেখি বেচারি নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ দুটো জলে টলমল করছে যেন পলক ফেললেই জল গড়িয়ে পড়বে,

আমি একটা হাসি দিয়ে ছোট ফুপি র দিকে এগিয়ে গেলাম,

ছোট ফুপি র মুখ টা আজলে তুলে চোখের কোনায় লেগে থাকা জল মুছে দিলাম,

সে আমার দিকে মায়া দৃষ্টিতে তাকালো।

— তুমি মন খারাপ করছো কেন? দেখো আমি কিন্তু কিছুই মনে করি নি, যারা দিতে পারে তারা নিতে ও পারে।

গাড়ি টা আমার খুব প্রিয় ছিলো, আমার ১৫ বছরের জন্ম দিনে বাবা আমায় উপহার দিয়ে ছিল, এটা আমার খুব শখের ছিলো, এটা ঠিক। কিন্তু তারা হয়তো জানে না মাহাবীন খান আয়াত অনেক কিছু ই হারিয়ে অভ্যস্ত,এটুকু তেই সে ভেঙে পরে না।

আমি গিয়ে সোজা বাবার সামনে দাড়ালাম,

— তো মিস্টার খান, এই সামান্য গাড়ি কেড়ে নিয়েই ভেবেছেন আয়াত কে থামিয়ে দেবেন,তাহলে সেটা আপনার নিতান্তই কল্পনা, আপনার এটা জানা উচিত ছিল যে আমি যেখানে ই যাই আপনার সেই বিরাট গাড়ি নিয়ে যায় না, যায় আমার ভাইয়ের দেওয়া বাইক দিয়ে,

আর এই সামান্য গাড়ি র জন্য আমি মন খারাপ করে বসে থাকবো?
ব্যাপার টা হাস্যকর না?

আয়াত এই রকম দু পয়সার জিনিসের জন্য মন খারাপ করে না আর হে এটাও মাথায় রাখবেন,, লল

আপনি গাড়ি দিয়েছিলেন গাড়ি নিয়ে ও নিয়েছেন, তবে আমার কিন্তু বেকআপ হিসেবে বাইক আছে,, তবে আমি যদি এই মুহূর্তে চাই আপনাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারি, দিলে কিন্তু আপনাদের যাবার কোন জায়গা নেই তাই যা করবেন সাবধানে করবেন, কি জানি বাবা কখন কি থেকে কি হয়ে যায়,

বলেই বাবার দিকে এক নজর তাকিয়ে ফুপির দিকে তাকালাম,,

বেচারির মুখ টা দেখার মতো ছিলো,

আমি বাসা থেকে বের হয়ে গ্যারেজ থেকে বাইক আর হেলমেট নিয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হই,

ভার্সিটির গেট দিয়ে ঢুকতে যাবো এমন সময় চোখ পড়ে রাস্তার পাশে থাকা এক বৃদ্ধ ভিক্ষুকের দিকে,

আমি বাইক টা গেইটের পাশে রেখে এগিয়ে যেতেই

হঠাৎ খেয়াল করলাম লোকটা হাটতে গিয়ে একটা ছেলের গায়ে ধাক্কা লেগে ছেলেটি পড়ে যায়,

ছেলেটি রেগে থাপ্পড় মারতে হাত তুলতেই আমি পিছন থেকে হাত টা ধরে নামিয়ে দেই।

ছেলে টা বয়সে আমার ছোট হবে তবে মুখে ভেসে উঠছে আভিজাত্যপূর্ন অহংকার।

ছেলেটা আমার দিকে রেগে তাকাতেই আমি ওই দাদা কে উদ্দেশ্য করে বললাম

— কি হয়েছে দাদা?

দাদা নিরব দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,

–বুবুজান. আসলে বয়স হয়ছে তো তাই চোখে ভালো দেখি না,,হাটতে গিয়া কিয়ের লগে যানি উস্টা খাইয়া উনার উপ্রে পড়তে আছিলাম, আমি কোন মতে সামলাইলেও ধাইক্কা লাইগা উনি পইড়া গেছে,আমি তো দেখবার পারছি না,

বলেই উনি মাথা নীচু করে ফেললেন.

আমি মুচকি হেসে দাদার কাছে গিয়ে দাদার হাত ধরে বললাম,

— কিছু হয়নি দাদা, মানুষ মাত্র ই তো ভুল। না জেনে ভুল হয়ে গেছে আপনি তো আর ইচ্ছে করে করেননি, সমস্যা নেই।

বলেই পকেট থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট দাদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম,

— দাদা এটা দিয়ে চা খাবেন আর দাদির জন্য কিছু নিয়ে যাইয়েন,

— তুমি খুব ভালা গো বুবু,,আল্লাহ তোমারে হাজার বছর হায়াত দেক দোয়া করি, স্বামী পোলা নিয়া সুখে সংসার করো।

— আচ্ছা দাদা,

দাদার সাথে কথা বলে ঘাড় ঘুরিয়ে ওই ছেলে টার দিকে তাকালাম,

— কি হয়েছে এখানে, উনার গায়ে হাত তুলছিলি কেন?

— সেই কৈফিয়ত কি আমার আপনাকে দিতে হবে?

–যদি বলি দিতে হবে!

— আমি মনে করি না,

ছেলেটার কথা শুনে মেজাজ চরম খারাপ করলো, আশেপাশে তাকিয়ে দেখি কিছু ছেলেপেলে দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে তামাশা দেখছে এর মাঝে একটা ছেলে হকিস্টিক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,

আমি ওই ছেলেটার কাছে গিয়ে হকিস্টিক নিয়ে আবার ওর সামনে দাড়ালাম,,

— তো কি বলছিলি জানি?

— আপনি আমার সাথে এভাবে ব্যবহার করছেন কেন? আপনি জানেন আমি কে? আমার বাবা কে চেনেন আপনি?

আমি ধাম করে ছেলেটার পায়ের হাঁটু বরাবর আঘাত দিয়ে বললাম,

— এক তো নিজের দাদার সমান বয়সি লোকের গায়ে হাত তুলছিলি,তার উপর আমার সাথে বাপের ক্ষমতা দেখাস!

অপর হাঁটুতে আরেক টা আঘাত করে বললাম,,

— বাবার ক্ষমতা দেখাচ্ছিস তুই সাহস কত!

হাটুতে আঘাত পেয়ে ছেলেটি রাস্তার মাঝে উপুড় হয়ে পরে গেলো,

আমি ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলাম..

— তুই কে সেটা আমার জানার কোন দরকার নাই,আমি কে সেটা জেনে রাখ, মাহাবীন খান আয়াত, আয়াত আমার নাম।

আর কোন দিন কোন বৃদ্ধ মানুষের সাথে বা কোন মেয়ের সাথে বাজে আচরণ করলে তার ফল কিন্তু এরচেয়ে ও ভয়াবহ হতে পারে সেটা মাথায় রাখিস,

বলেই উঠে দাড়ালাম,

“কি হচ্ছে এখানে?”

কোন পুরুষালি কন্ঠ পেয়ে পিছনে তাকালাম,

দেখি ওই দিনের সেই ছেলেটা, মানে রাইসার ভাই,,

কি যেন নাম টা বলে ছিলো!

আবরার.

আমি ভ্রু কুচকে ছেলেটির দিকে তাকালাম,তার চোখে রাগ স্পষ্ট,

আবরার আমার দিকে এগিয়ে আসলো,,

— এই মেয়ে তোমার সমস্যা কি? রাস্তাঘাটে গুন্ডামী করার মানে কি? এটা কি গুন্ডামি করার জায়গা? মিনিমাম কমনসেন্স নেই তোমার? বাজে মেয়ে কোথাকার, অসভ্য বেয়াদব। গুন্ডামী করতে হলে অন্য কোথাও গিয়ে করো, এটা ভদ্র লোকদের রাস্তা, তোমার বাবার কেনা নয়, যে যেখানে খুশি সেখানে ই তোমার ক্ষমতা দেখাবে।

নিচে পরে থাকা ছেলেটা র দিকে তাকিয়ে বলল,

— নিজের থেকে কম বয়সী ছেলের সাথে গুন্ডামী মাস্তানী করতে লজ্জা করে না? সেদিন বাবার বয়সী লোকের সাথে বাজে ব্যবহার আজ আবার এর সাথে! সমস্যা কি তোমার হে?

আবরারের কথার কোন রুপ প্রতিবাদ করলাম না, যে যা ভাবছে ভাবুক তাতে আই ডোন্ট কেয়ার,

হঠাৎ ভীড় থেকে একটা ছেলে বলে উঠলো,,

— ভাইয়া আপনি যা ভাবছেন ভুল ভাবছেন, আপনি পুরো ঘটনা টা দেখেন নি তাই এমন বলছেন।

ছেলেটাকে থামিয়ে দিয়ে আবরার বলে উঠলো..

-না আমি কোন প্রকার ভুল ভাবছি না, এমন মেয়েদের আমার খুব ভালো ভাবেই চেনা আছে,

আবরারের কথা শুনে আমি মুচকি আসলাম,,

চলে আসার সময় তার সামনে গিয়ে বললাম,,

— ধন্যবাদ..

ভার্সিটি তে…..

 

চলবে……

[ রিয়েক্ট প্লিজ 🥺]

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments