পর্ব:০২
–তোমার প্রাক্তন এত রাতে তোমাকে এতগুলো ফোনকল আর টেক্সট কেন দিচ্ছে ধ্রুব?
আবৃতি ফোনটা ধ্রুবর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো।বড্ড শান্ত সে আওয়াজ। ধ্রুব আবৃতির হাত থেকে ফোনটা একপ্রকার ছিনিয়ে নিল। চারদিকে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে কঠিন গলায় বললো,
— তোমাকে কতবার বলেছি আবৃতি না বলে আমার ফোনে হাত দেবেনা।
— তোমার ফোনে হাত দেওয়ার অধিকার আমার আছে ধ্রুব। ফোনটা অনেকক্ষণ ধরে রিং হচ্ছিল। তাই আমি নিয়েছি।
ধ্রুব ভয় পেল একটু। ঢোক গিলে বললো,
–ওই একটু প্রয়োজন ছিল আরকি।
–তোমার সাথে এখন নতুন করে আবার তার কি প্রয়োজন পড়লো?
ধ্রুব মেজাজের খেই হারিয়ে বললো,
–ভুলে যেওনা ইরা আমার বন্ধু আবৃতি। আর বন্ধুর কাছে বন্ধু নিশ্চয়ই প্রয়োজন ছাড়া কল দিবেনা তাইনা?
আবৃতি নিস্পৃহ গলায় বললো,
— সোটাই তো জানতে চাইছি ধ্রুব। কি প্রয়োজনে সে তোমাকে এতরাতে কল করলো।
ধ্রুব আমতা আমতা করে বললো,
— ইয়ে মানে ওর কিছু টাকার হেল্প লাগবে।
আবৃতি ফের কিছু বলতে নেবে এমন সময় দুই বছরের আরশান তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠে। ছেলের কান্নায় উদ্বিগ্ন আবৃতি ও বেলা সব ভুলে ছেলের দোলনার কাছে ছোটে আর ধ্রুব অগোচরে কপালের ঘাম মুছে হাফ নিঃশ্বাস ছাড়ে।
বর্তমান……
শীতের বিকেলের বরফের মতো ঠান্ডা পানির স্রোতের নিচে আবৃতি স্তব্ধ হয়ে বসে আছে৷ প্রায় আধাঘন্টা যাবত ও একিভাবে বসে একনাগাড়ে ভিজছে। কোন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এতক্ষণ এই বরফ শীতল পানির নিচে বসে থাকা সম্ভবপর ছিলনা৷ কিন্তু জীবনের প্রচন্ড ধাক্কায় হয়তো অনূভুতি, বাহ্য জ্ঞান সব লোপ পেয়েছে আবৃতির। মানস্পটে ভেসে চলেছে অতীতের কালো পাতার স্মৃতিগুলো। ওইদিন রাতে ধ্রুবর ফোনে ইরার ওতগুলো কল থেকেই আবৃতির মনে প্রথম সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। বলা হয় নারীদের ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় নাকি পুরুষের চোখের ভাষা খুব সহজেই পড়তে পারে। ধ্রুব হয়তো খেয়াল করেনি ততটা কিন্তু ওইদিনের পর থেকেই আবৃতি ধ্রুবর অগোচরে ওর উপর নজর রাখা শুরু করে।
অনেকক্ষণ যাবত বাথরুমের দরজায় কড়া নাড়ছেন আবৃতির মা জাহানারা বেগম। এতবড় একটা কান্ড করে এসে আবৃতি কারো সাথে কোন কথা বলেনি, না দিয়েছে কাউকে নিজের কর্মের কৈফিয়ত। সোজা গোসল করব বলে যে বাথরুমে ঢুকেছে বের হওয়ার নামই নেই৷ জাহানারা বেগমও সাহস করে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেননি। কিন্তু মাতৃ মন ঠিকই বুঝেছেন মেয়ে সবকিছু শেষ করে এসেছেন। এতক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরও যখন মেয়ে বাথরুম থেকে বের হচ্ছেনা তখন জাহানারা বেগমের পৌঢ় কপালে চিন্তার ভাজ ফুটে ওঠে। এমনিতেই অনেকক্ষণ যাবত মেয়ের জন্য কাঁদছিলেন। এখন মেয়ের চিন্তায় পৌঢ় শরীরটা কাঁপছে ভদ্রমহিলার। মেয়েটা আবার না নিজের সাথে কিছু করে বসে।
অনাবরত দরজার শব্দে আবৃতি চোখ তুলে তাকায় আবৃতি। অনেকক্ষণ ধরে ভেজার দরুণ চোখদুটো টকটকে লাল হয়ে আছে! হঠাৎ চোখ বেয়ে দু ফোঁটা জল সেই ঠান্ডার পানির সাথে মিশে তার অস্তিত্ব হারালো। যেমন ভাবে আজ আবৃতি সারাজীবনের জন্য হারালো নিজের স্ত্রী নামক স্বত্তা। জাহানারা বেগম এবার ভয়ে চিৎকার করতে যাবেন এমন সময় হাট করে বাথরুমের দরজাটা খুলে যায়। একটা সাদা রঙা সালোয়ার-কামিজ পরনে আবৃতির। চুল বেয়ে টপ টপ করে পানি ঝরছে। জাহানারা বেগম মেয়েকে দেখে আঁতকে উঠে! কেননা সাদা রঙা জামাটার মতই ওর সারা মুখশ্রী সাদাটে হয়ে আছে। যেন মৃত কোন লাশ দাড়িয়ে আছে জাহানারা বেগমের সামনে! তিনি মেয়ের দুগালে হাত বুলিয়ে কেঁদে ফেলেন।
–একি মা তোর শরীরটা এত ঠান্ডা হয়ে আছে কেন। তুই কতক্ষণ ধরে পানিতে ভিজেছিস? চুলের পানিগুলোও তো মুছিসনি।
জাহানারা বেগম আবৃতিকে টেনে নিয়ে খাটে বসালেন। তস্থ শাড়ির আঁচল টেনে মেয়ের চুলগুলো মুছে দিতে লাগলেন। মুছতে মুছতে মেয়েকে বকুনি দিতেও ভুলছেন না। যেন কিছুই হয়নি। সব একদম স্বাভাবিক। আগে যেমন কলেজে যাওয়ার আগে আবৃতির ভেজা চুল মুছে দিতেন, ঠিক তেমন ভাবেই বকতে বকতে আবৃতির চুলগুলো মুছে দিচ্ছেন তিনি। কিন্তু ঠিকই চোখদুটো অশ্রুসিক্ত।
–মা?
জাহানারা বেগম চোখের পানি মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করলেন। বললেন,
–হ্যাঁ মা বল।
–আরশান কই?
–ও ঠিক আছে। আহানের কাছে।
— একটা কথা বলি শোন?
জাহানারা বেগম গলা ঝেঁড়ে বললেন,
–হ্যাঁ হ্যাঁ বলনা। মা শুনছি।
–আমার ইদ্দত শেষ হলেই চাচ্চুকে বলবে পাত্র দেখতে। আমি বিয়ে করব।
★★★
শহরের বুকে আলো আঁধারিতে মাথা তুলে দাড়িয়ে আছে এক রাজকীয় বাড়ি। শেষ বিকেলের সূর্যের ম্লান আলোয় জ্বলজ্বল করছে বাড়ির নেমপ্লেটটা । বাড়ির নাম চৌধুরী ভিলা।
–আম্মাজান?
লনের সবুজ ঘাসের উপর সূর্যের লাল আভা আড়াআড়ি ভাবে পড়ছে। সেখানে রাখা ছোট্ট টি টেবিলটার চেয়ারে একটা বছর পাঁচেকের মেয়ে বুকে হাত বেঁধে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। পরনে একটা স্কাই কালারের স্কার্ট আর সাদা টপ। বেশ লম্বা চুলগুলো একটা বো ক্লিপে আটকানো। যে কেউ প্রথম দেখাতেই আদুরে এই বাচ্চাটিকে দেখে মুগ্ধ হতে বাধ্য!
কেউ তার ভরাট কন্ঠে আদুরে স্বরে আম্মাজান বলে সম্বোধন করলেও সেই অতি নাদুসনুদুস বাচ্চাটার কোন ভাবাবেগ নেই তাতে। সে পূর্বের মতই লাল স্ট্রবেরির ন্যায় গালদুটো ফুলিয়ে বসে আসে। একটা টাউজার আর কালো টিশার্ট পরিহিত উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের লম্বাটে এক পুরুষ হাটু গেড়ে মেয়েটার সম্মুখে বসলো। বড্ড আদুরে সুরে ফের ডেকে উঠলো,
–আম্মাজান কথা বলবেন না পাপার সাথে?
বাচ্চা মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে নিল। ঈষৎ রাগান্বিত গলায় বললো,
–না তোমার সাথে কোন কথা নেই পাপা। তুমি আজ আমাকে ক্লাস থেকে আনতে যাওনি।
মানবটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কৈফিয়তের সুরে বললো,
–পাপা রাতে অনেক লেইট করে ঘুমিয়ে ছিলাম তো, তাই উঠতে পারিনি সময়মতো।
পাশে প্রোটিন শেইক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ঐশি বিড়বিড়িয়ে বললো,
–দেরী করে ঘুমিয়েছে না ছাই। মাল খেয়ে টাল হয়ে শুয়ে ছিলরে মা তোর পাপা।
মেয়েটার মায়াবী চোখদুটো এবার ভরে উঠে নোনাজলে। অভিমানী কন্ঠে বলে,
–তুমি কোনদিনও আমাকে নিতে আসনা পাপা। সবার মাম্মা-পাপা অলওয়েজ ওদেরকে স্কুল থেকে নিতে আসে। কিন্তু আমাকে সবসময় সাবের চাচ্চু নিয়ে আসে।। কাল বলেছিলে ডান্স ক্লাস থেকে নিয়ে আসবে। তাও নিয়ে আসনি।
এই বলে মেয়েটা ঠোঁট ভেঙ্গে কাঁদতে লাগলো। মানবটির বুক মুচড়ে উঠলো বাচ্চাটির এমন করুণ কান্নায়। মানবটি তড়িঘড়ি করে বাচ্চাটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ঢোক গিললো। হাতের মুঠিদ্বয় ক্রমেই শক্ত হয়ে উঠছে তার। শুক্রবারে সে সারাদিন বাড়িতে থাকে। এই একদিনেই কর্মব্যস্তময় জীবনে তার জীবনের সবচেয়ে দামী অংশটাকে সময় দেওয়ার সময়টুকু হয়। নাহলে প্রতিদিন বাড়িতে ফিরে মেয়েটাকে ঘুমন্ত অবস্থায় পায়। কাল মেয়েকে কথা দিয়েছিল ক্লাস শেষে মেয়েকে আনতে ডান্স স্কুলে যাবে। সাথে কতশত পরিকল্পনা করেছিল বাবা মেয়ে ঘুরবে, ফিরবে, খাবে। কিন্তু কিছুই তো হলোনা। বাবা হিসেবে সে বরাবর ব্যর্থ। না তার মেয়েটাকে পুরোপুরি পিতার স্নেহ, যত্ন দিতে পারছে আর না খুশি রাখতে পারছে। সে তো এরকম জীবন চায়নি৷ চেয়েছিল পুরোদস্তুর একজন ফ্যামিলি ম্যান হতে। একজন বেস্ট বাবা হতে। কিন্তু তবুও কেন সে বাবা হিসেবে ব্যর্থ? ঐশি কোমল চোখে দেখে তার অভাগা ভাইকে। যে কিনা একবুক যন্ত্রণা আর ব্যর্থতা পুষে মরছে।
–ঐক্য?
কারো ডাকে সবার ধ্যান ফিরে। সবাই একযোগে পিছনে ফিরে তাকায়। সাদা মসলিন শাড়ি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা পরিহিত একজন বৃদ্ধা মহিলা ধীর পায়ে লনের দিকে এগিয়ে আসছেন। চলন-বলনে তার অভিজাত্যের এক অদ্ভুত গরিমা। মহিলাটার ডাকে তৎক্ষণাৎ ঐক্য উঠে দাড়ালো। বাধ্যের ন্যায় বললো,
–জি আম্মু।
মহিলাটি সম্পর্কে ঐক্যর মা মিসেস জোবায়দা চৌধুরী। মিসেস জোবায়দা ঐক্যর সম্মুখে দাড়ালেন। থমথমে স্বরে বললো,
–কথা দিয়ে কথা না রাখতে পারলে সে কথা দাও কেন?
ঐক্য মাথা নিচু করে বললো,
–ভুল হয়ে গিয়েছে আম্মু।
মিসেস জোবায়দা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কালকের ঘটনার সবকিছু সম্পর্কে অবগত তিনি। কাল রাত তিনটের দিকে ঐক্যর পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট রবিন মাতাল ঐক্যকে বাড়িতে দিয়ে গিয়েছিল। ঐক্য হয়তো ভেবেছে জোবায়দা বেগম রোজকার মতো ঘুমের ঔষধ খেয়ে গভীর ঘুমে। কিন্তু আজ তিন বছর যে জোবায়দা বেগম রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না! নিজ ছেলের এমন করুণ অবস্থায় কোন মা কি শান্তিতে ঘুমাতে পারে?
–ঠিক আছে ভুল করেছ তুমি। এখন ওয়াফা দাদুমনির কাছে কান ধরে মাফ চাও। আর এক্ষুনি তাকে পার্ক থেকে ঘুরিয়ে আন৷
দিদুনের কথায় এবার ওয়াফা কান্নাকাটি ভুলে কান খাঁড়া করলো। ঐক্য মেয়ের মুখ দেখে ঠোঁট চিপে হাসলো। ওয়াফা চোখ পিটপিট করে উৎসুক নয়নে বাবার পানে বড় আশা নিয়ে চেয়ে আছে৷ জোবায়দা বেগম ধমকে বললেন,
–কি হলো মাফ চাও দাদুমনির কাছে।
ঐক্য ধমক শুনে তড়িঘড়ি করে নিজের কান ধরলো। অসহায় গলায় বললো,
— এই অধমকে মাফ করে দিন আম্মাজান। আর কোনদিন এমন ভুল হবেনা প্রমিস। এখন কি কৃপা করে পার্কে ঘুরতে যাবেন পাপার সাথে?
ওয়াফা বড়দের মতো করে হাত ঝেড়ে ঝেড়ে বললো,
–ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করো। আমার আবার ফিরে অনেকগুলো হোমওয়ার্ক করতে হবে।
সবাই মিটিমিটি হাসলো ওয়াফার পাকা পাকা কথায়। ঐক্য টুপ করে মেয়েকে কাঁধে তুলে টপাটপ কয়েকটা চুমু খেয়ে নিল। ওয়াফা খিলখিলিয়ে হাসলো। ঐক্য যেতে যেতে বললো,
–চলুন আম্মাজান। আজ আমরা অনেক জায়গায় ঘুরব।
অনেকক্ষণ যাবত ঐশির ফোনটা বেজে চলেছে। নাম্বারটা আননোন। ঐশি একটু সাইডে এসে ফোন রিসিভ করে।
–হ্যালো, কে বলছেন?
–কেমন আছো ঐশি?
ঐশির ভ্রু কুঁচকে যায়। ফোনের ওপারে নারী কন্ঠটি বেশ পরিচিত ঠেকলো ওর কাছে। মনে হচ্ছে চেনা পরিচিত কেউ। কে এই নারী? ওর নাম জানলোই বা কি করে? অবাক স্বরে প্রশ্ন করে সে,
–কে বলছেন আপনি?
— ওয়াফা কেমন আছে ঐশি।
ঐশির কুঁচকানো ভ্রু যুগল টানটান হয়ে পড়ে। বুকটা অযাচিত আশঙ্কায় ধ্বক করে উঠে। দীর্ঘ চারবছর পর আবার সেই অশনী কন্ঠ! ঐশি বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
–মাহিরা!
চলবে…….