পর্ব:০৩
মিডনাইট স্পার্কল ক্লাব। শহরের বুকে বেশ নামীদামী একটা বারক্লাব। ঘড়িতে তখন রাত বারোটা। স্লো মোশনে মিউজিক বাজছে পুরো ক্লাব জুড়ে। বাহারী রঙিন লাইটের রোশনাইতে ক্লাবটা জ্বলজ্বল করছে। চারদিকে মদ্যপ নরনারী হাতে মদের গ্লাস নিয়ে ফূর্তিতে মেতে উঠেছে।
বার কাউন্টারের একটা টুলে বসে সমানে মদ গিলে যাচ্ছে ঐক্য। গায়ে একটা সাদা শার্ট। শার্টের উপরের তিনটে বাটন খোলা। পাশে ঐক্যর ব্লেজারটা হাতে নিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর পিএ রবিন৷বেচারা লাগাতার মদ গিলতে থাকা ঐক্যকে দেখে বিড়বিড়িয়ে বলে,
–আজ আবার এই মাতাল হাতিকে আমাকে টেনে নিয়ে যেতে হবে। উফ বাঁচিনা এই যন্ত্রণা থেকে। এই ছ্যাঁকাখোর আমার বসই হতে হলো?
ক্লাবের একপাশে সেম্পেইনের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে কয়েকজন অতি আধুনিকা রমনী। পরনে আঁটোসাটো ওয়েস্টার্ন ড্রেস। তাদের মধ্যে একজন সুন্দরী রমনী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছে ঐক্যকে।
— এভাবে তাকিয়ে লাভ নেই।
লাল মিনি স্কার্ট পড়া সুন্দরী রমনীর হুঁশ ফিরে। যে এতক্ষণ বাজপাখির ন্যায় তাকিয়ে ছিল ঐক্যর খোলা বুকে। ভ্রু কুঁচকে মেয়েটি জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
— যা আ্যাটিটিউড পাশে কোন মেয়ে পাশে ঘেষতে পারেনা।
মেয়েটি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
— হ্যান্ডসাম ছেলেদের একটু আটটু আ্যাটিটিউড থাকবেই। ইটস্ মেকস হিম মোর ড্যাশিং!
— নে ধর।
মেয়েটা পাশের জনের হাতে গ্লাসটা দিয়ে এগিয়ে যায় ঐক্যর দিকে। সাথের সবাই অবুঝ চোখে নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।
— উড ইউ লাইক টু ড্যান্স উইথ মি?
নিজের দিকে বাড়িয়ে রাখা হাতটা দেখে ভ্রু
কুঁচকে তাকায় ঐক্য। রিয়ানা নামক মেয়েটি ঠোঁটে আবেদনময়ী হাসি নিয়ে হাত বাড়িয়ে আছে। ঐক্য ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে হাতে রাখা পেগটা গিলে নিল। তারপর মেয়েটার হাতটা নিজের হাতে পুরে নিয়ে রহস্যময় কন্ঠে বলে,
–লেটস্ গো।
রবিন গোলগোল চোখে তাকিয়ে আছে। চোখেমুখে আকাশসম বিভ্রম নিয়ে বিড়বিড়ায়,
— কি হলো এটা?
মেয়েগুলো ফিসফিসিয়ে বলে,
— রিয়ানার সাহস আছে বলতে হবে। দেখলি কিভাবে ঐক্যকে ড্যান্স পার্টনার বানিয়ে নিল।
রিয়ানা ঐক্যকে টেনে নিয়ে ড্যান্স ফ্লোরে নিয়ে আসলো। ঐক্যর কাঁধে একহাত দিয়ে আরেক হাতে ঐক্যর হাতটা নিজের কোমরে রাখলো। ঐক্য লাল চোখে নিজের হাতের দিকে তাকায়। স্লো মোশনে তখন সফট্ মিউজিক চলছে। মিউজিকের তালে তালে ডান্স করতে করতে ঐক্য মুখে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে বলে,
— তুমি মনে হয় ঐক্য চৌধুরীকে চিনো না ভাল করে?
মেয়েটা ঐক্যর সারা মুখে মুগ্ধ দৃষ্টি বুলিয়ে বলে,
— খুব ভাল করে চিনতে চাই৷ দেবে আমাকে সেই সুযোগ?
নিঃশব্দ পরিবেশে হঠাৎ বাজ পড়ার মতো শব্দ হলো। সবাই একপ্রকার আঁতকে উঠে চারদিকে ছিটকে পড়ে। তড়িৎ ক্লাবে লাইট জ্বলে উঠলে সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো৷ ডান্স ফ্লোরে কোমরে হাত চেপে কাঁতরাচ্ছে রিয়ানা। পায়ের পেন্সিল হিল ভেঙ্গে পাশে পড়ে আছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে কোমরের হাড়টা আর আস্ত নেই। ঐক্য মদ্যপ কন্ঠে হুংকার ছুঁড়ে,
–নারী মানেই ছলনাময়ী!
আর কোনদিন এই ছলনাময়ীদের জায়গা ঐক্য চৌধুরীর জীবনে হবেনা! সো বি কেয়ারফুল।’
এই বলে একটা টাকার বান্ডেল রিয়ানার পাশে মেঝেতে ছুঁড়ে মারে। তারপর ঢুলতে ঢুলতে এক্সিটের দিকে এগোয়। রবিন হতভম্বতা কাটিয়ে ঐক্যর পিছনে ছোটে। যেতে যেতে রিয়ানার দিকে তাকিয়ে মিটমিটিয়ে হাসে।
★
বিলাসবহুল এপার্টমেন্টের বারান্দায় ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক লাস্যময়ী নারী। পরনে একটা হাতাকাটা টপ। ঘাড় পর্যন্ত চুলগুলোতে আর্টিফিশিয়াল কালার করা। নারীটি মলিন দৃষ্টিতে সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে চেয়ে আছে। হঠাৎ একটা খরখরে হাত সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরলো নারীটির লতানো কোমর। নারীটির মনোযোগে বিঘ্ন ঘটে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তিকর কন্ঠে নারীটি বলে উঠে,
— ছাড় রাজ। ভাল লাগছেনা আমার।
রাজ নামের লোকটি নারীটির গলায় নাক ঘসে বললো,
— খোঁজ নিয়েছো ওয়াফার?
— না আমার কন্ঠ চিনতে পেরেই কল কেটে দিয়েছে। কতগুলো বছর পর মেয়েটাকে দেখলাম!
— মন খারাপ করছে মেয়ের জন্য?
নারিটি উদাস গলায় বলে,
–আমি ওর মা রাজ!
— আরে চিল চিল। এত টেনশন নিয়োনা। ওয়াফা কোন স্কুলে পড়ে আমি কাল খোঁজ নিচ্ছি। তুমি নাহয় স্কুলে গিয়ে দেখা করো ওর সাথে৷
–কিন্তু?
রাজ নারীটিকে নিজের দিকে ফেরালো। খানিকটা রেগে বললো,
— ওফ মাহিরা। এখন এসব বাদ দাও তো। চলোনা একটু কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করি। কাল থেকে আবার শ্যুটের কাজ শুরু হয়ে যাবে। তখন দু’জনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ব৷
এই বলে লোকটি চুমু খেতে নিল। মাহিরা হঠাৎ শান্ত কন্ঠে বলে উঠে,
— আমাকে বিয়ে কবে করছো রাজ?
রাজের মুখটা বিবর্ণ হলো মাহিরার কথা শুনে। মাহিরা এখনো উত্তরের আশায় চেয়ে আছে। রাজ আমতাআমতা করে কিছু বলতে নিবে এমন সময় মাহিরা হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দেয়,
— প্লিজ রাজ। রাখো তোমার পুরনো অজুহাত। বিগত একবছর যাবত তুমি এই সেই বলে আমাকে বুঝ দিচ্ছো। এসব এবার আর চলবেনা। তোমাকে এবার আমাকে বিয়ে করতেই হবে।
★
আবৃতি?
মায়ের বুক থেকে মুখ তুলে চোখ দুটো মুছলো আবৃতি। আরশানকে কোলে নিয়ে দরজায় একটা বছর পঁচিশের ছেলে দাড়িয়ে আছে। দেখতে হুবহু আবৃতির মতো। চেহারার গঠন, গাঁয়ের রঙ থেকে শুরু করে সবকিছুতেই আবৃতির সাথে সাদৃশ্যতা রয়েছে। যেন আবৃতির মেল ভার্সন। দীর্ঘ সময় বাদে মাকে দেখতেই আরশান ছেলেটার কোল থেকে নেমে দৌড়ে মায়ের বুকে ঝাপ দিল।
–মাম্মাম।
আবৃতির বুকটা হু হু করে উঠে। দুহাতে আষ্টেপৃষ্টে বুকে জড়িয়ে নেয় তার বুকের ধনকে। চোখেমুখে চুমু খেয়ে বলে,
— কোথায় ছিলে বাবা?
–মামুর সাথে ছিলাম। জান মামা আমাকে কত্ত জায়গায় ঘুরিয়েছে। তুমি রাগ করোনা কিন্তু। বাড়ি ফিরে পাপাকে বলব আমাদের জয়ল্যান্ডে নিয়ে যেতে।
আরশানের চোখেমুখে উচ্ছ্বাস! আবৃতির বুক ফেটে কান্না পেল। চোখদুটো ভরে উঠে নোনাজলে। ছেলেটাকে কি করে বলবে তারা আর কোনদিন ওই বাড়ি ফিরবেনা। ছেলেটি হুট করে আরশানকে কোলে তুলে নেয়,
–মামু আজ অনেক ঘুরেছো। নাউ ইউ নিড টু স্লিপ।
তারপর আবৃতির মাকে ধরিয়ে দিয়ে বলে,
— তুমি যাওতো আম্মু। আজ আরশান নাহয় তোমার সাথে ঘুমাক।
আবৃতির মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরশানকে নিয়ে চলে যায়। আজ মেয়েটাকে একা ছেড়ে দেওয়াই ভাল হবে।
তারা যেতেই ছেলেটা আবৃতির মাথায় একটা চাটি মেরে পাশে বসলো। অন্যসময় হলে হয়তো আবৃতি রেগে নিজেও একটা দিত, কিন্তু আজ কোন প্রতিক্রিয়া দেখালনা। ছেলেটা আবৃতিকে পরখ করে রাশভারী আওয়াজে বলে,
— এত সহজে ছেড়ে দিলি বাস্টার্ডটাকে?
— কেন দেওয়া উচিত হয়নি?
— জানিনা।
আবৃতি হাসলো। বললো,
— শোন যে থাকতে চায়না। তাকে কখনো বেঁধে রাখতে নেই। নাহয় প্রতিদিন একটু একটু করে হাজারবার মরতে হয় বুঝলি?
— হুম বুঝলাম।
অতঃপর পিনপতন নিরবতা নেমে আসলো। দুজনেরই দৃষ্টি জানালার অন্ধকার ভেদ করে ওই দূর আকাশে। হঠাৎ আবৃতি উদাস গলায় বলে উঠে,
— আহান?
–হুম।
— তুই যে হসপিটালে ইন্টার্নি করিস সেখানে আমাকে একটা জবের ব্যবস্থা করে দিতে পারবি?
আহান প্রথমে অবাক হলো। পরক্ষণেই রেগে গিয়ে বললো,
— পাগল হয়েছিস? তুই কেন জব করবি? আমার বোন ভাগ্নেকে খাওয়ানোর মতো মুরোদ আমার আছে।
— তুই ভুল বুঝছিস আহান। এভাবে ঘরে বসে থেকে কি করব। আরশানও স্কুলে চলে যাবে। তার থেকে আমি কিছু একটা করলে সময়ও চলে যাবে।
— না। সময় কাটার জন্য অনেক কিছু আছে। দরকার হলে আরশানের স্কুলে গিয়ে আগের মতে বসে থাকবি। তুই কয়টাদিন একটু স্থির হ। তারপর তোর জন্য ছেলে দেখব আমি৷ তোর জীবনের সব রঙ আবার ফিরে আসবে। আসতেই হবে!
চলবে…….
(আসসালামু আলাইকুম। সবাই মন্তব্য করবেন আশা করি।)