গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (০১)

[ক্যাটাগরিঃ মনস্তাত্ত্বিক, রোমান্টিক,দ্বিতীয় বিয়ে রিলেটেড।]

 

 

 

ডিভোর্স পেপারটা হাতে নিয়ে নির্লিপ্ত চোখে সামনে নত মুখে দাড়িয়ে থাকা সুদর্শন পুরুষটিকে দেখলো আবৃতি। পুরুষটি সম্পর্কে আবৃতির স্বামী। একটু পর যে কিনা আবৃতির প্রাক্তন হতে চলেছে। তারপর কোণা চোখে তাকালো অদূরে ওয়েটিং চেয়ারে উঁচু পেট আগলে ধরে বসে থাকা এক রমনীকে। বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো আবৃতির। যার কারণে আবৃতির সংসারটা ভাঙলো আজ সেই নারীই তার বিচ্ছেদের সাক্ষী হতে এসেছে। ভাগ্যের সবচেয়ে নির্মম পরিহাস বলতে বোধহয় এটাই বোঝায়! একটা দীর্ঘশ্বাস আবৃতির বুক বিদীর্ণ করে বের হলো।

 

আজ তার দীর্ঘ ছয় বছরের নড়বড়ে সম্পর্কের সুতোটা কাটা হবে। ততটা নড়বড়েও ছিলনা বোধহয়। কিন্তু হঠাৎ সেই ঝড়টা যদি না আসতো!

ডিভোর্স পেপারে কলম টা ধরতে যেন জোর পাচ্ছেনা আবৃতি। ধ্রুব তাকিয়ে দেখলো আবৃতির চুড়ি পড়া গোলগাল ফর্সা হাতের কম্পন। ঢোক গিলে চোখ সরিয়ে পাশে ইরার দিকে তাকালো। যে কিনা সরু চোখে ধ্রুবর দিকে চেয়ে আছে। ধ্রুব চোখ সরিয়ে নিচু গলায় বললো,

 

–আরেকবার ভেবে দেখ আবৃতি। ইরার তো তোমাকে নিয়ে কোন সমস্যা নেই। কি হয় একটু কোঅপারেট করলে?

 

ধ্রুবর কন্ঠে স্পষ্ট আকুতি। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চরম মাত্রার ঠকবাজ পুরুষটিকে নির্নিমেষ দেখলো আবৃতি। ওর এখন ধ্রুবর প্রতি সহানুভূতি আসছে। সত্যিটা জানার পর থেকেই বেচারার একটাই মিনতি। একটু মানিয়ে নাও। কেন? আবৃতি কেন মানিয়ে নেবে? ওর কিসের ঠ্যাঁকা? এই কথাগুলো বহু পুরনো। তাই আবৃতির উপর তেমন কোন প্রভাব পড়লোনা একই কথার পুনরাবৃত্তিতে। আবৃতি অবিচল গলায় বললো,

 

–আমি তোমাকে সহজে মুক্তি দিয়ে দিচ্ছি, তাতে শুকরিয়া আদায় করো ধ্রুব। এখন যত সহজ ভাবছো সবটা এতটা সহজ না। আমাকে হয়তো অজ্ঞাতে সহজভাবে ঠকাতে পেরেছো। কিন্তু জ্ঞানত সহজভাবে পালতে পারবেনা। শত ধর্ম, জ্ঞান, নীতির বাণী ঝাড়। কিন্তু দুই নোকায় পা দিয়ে আজ অবধী কোন পুরুষ নারীকে শান্তিতে রাখতে পারেনি। আর না নিজে থাকতে পেরেছে। এবং এটা চিরন্তন সত্য!

 

বলে আবৃতি চোখের পলকে ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিল। আবৃতির সাইনের পর কলমটা ধ্রুবর দিকে বাড়িয়ে দিল। ওর মুখটা হাসিহাসি। ধ্রুব ঢোক গিলে নিজেও সাইন করে দিল। একটা সামান্য সাদা কাগজে দুটো সই বদলে দিল একটা সম্পর্ক। যে সম্পর্কের সুতো মাত্র পাঁচবছরের মাথায়ই ছিঁড়ে গিয়েছে। অদূরে বসে থাকা ইরা বুকে হাত চেপে এতক্ষণের আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা ছাড়ল। মনে হয় এতক্ষণ দম আটকে বসে ছিল বেচারী৷

 

–আবৃতি প্লিজ টাকা গুলো নাও। এগুলো তো তোমার হক।

 

ধ্রুবর গলাটা বোধকরি একটুখানি কাঁপল। স্বাভাবিক কোন ভালোবাসা না থাক। একটা জলজ্যন্ত মানুষের সাথে পাঁচ পাঁচটা বছর এক ছাদের নিচে কাটিয়েছে। মায়া না আসাটাই অস্বাভাবিক। আবৃতি কাটকাট গলায় বললো,

 

–টাকাগুলো আমার দরকার নেই। যে সারাজীবন নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ছিল সে তো দিলনা। তাহলে এই সামান্য অর্থ আমাকে কি নিরাপত্তা দেবে। এগুলো নাহয় আপনি কাউকে দান করে দিয়েন।

 

ধ্রুব মাথা নিচু করে নিল। ওর চোখদুটো হঠাৎ কেন যেন জ্বলছে। ইরা নিজের উঁচু পেট সামলে উঠে দাড়াল। এগিয়ে এসে আবৃতির একদম মুখোমুখি দাড়াল। মেকি স্বরে বললো,

 

–মেনে নিলেই পারতে।

 

আবৃতি বহুকষ্টে নিজেকে শক্ত করলো। ওর জায়গায় অন্য কোন নারী থাকলে হয়তো এই অনাচার সহ্য করতো না। কিন্তু আবৃতি করছে। স্বইচ্ছায়ই করছে। ও স্বইচ্ছায়ই নিজের সতিনকে অবলীলায় স্বামীর ভাগ দিয়েছে। এখন স্বইচ্ছায়ই নিজের স্বামীকে মুক্ত করে দিয়েছে। তাতে যদি তার প্রাক্তনের বর্তমান স্ত্রী দুটো কটু কথা বলে, বলুক না। সে সয়ে নেবে। সব সয়ে নেবে। কিন্তু কিছুতেই তার প্রাণ ভোমরাকে কাউকে দেবে না৷ আবৃতি নিজের হাতের মোটা সোনার বালা দুটো দেখল । যেগুলো ওর শশুর বৌভাতে বড্ড ভালোবেসে ওর হাতে পড়িয়ে দিয়েছিল। যেগুলো এই পাঁচবছর ওর হাতদুটোতে শোভা বর্ধন করেছে।

সেই শশুর নামক মানুষটাই তো আবৃতির দীর্ঘ পাঁচবছরের সংসার জীবনের খুঁটি ছিল। এখন না আছে সেই মানুষটা, আর না আছে বালা গুলোর স্বত্বাধিকারী। তাহলে এগুলো রেখে নিজেকে অপমানিত করে কি লাভ? আবৃতি হাত থেকে বালা দুটো খুলে ইরার হাতে তালুতে রেখে বললো,

 

–নিন এখন স্বামীও আপনার আর এগুলোও।

 

বালাগুলো দেখে ইরার চোখজোড়া চকচক করে উঠে। ধ্রুবর সাথে যখন ওই বাসায় যেত আন্টি সবসময় বালা গুলো দেখাত। ইরার কত শখ ছিল এই বালা গুলোর প্রতি। কিন্তু কেউ একজন কয়েকবছর বালাগুলো ভোগ করলেও অবশেষে এগুলোর প্রকৃত হকদার বালাগুলো পেয়েছে। ইরা বালাগুলো একপ্রকার ছিনিয়ে নিল আবৃতির হাত থেকে। আবৃতি হাসলো,একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো ইরাকে। হঠাৎ আবৃতির সাথে চোখাচোখি হতেই ইরা গমগমে আওয়াজে বলে,

 

–প্লিজ আবৃতি। আমার দিকে অন্তত এমন ভাবে তাকিয়ো না। নিজেকে কেমন ভিলেন ভিলেন মনে হয়। মনে রাখবে ধ্রুব অলওয়েজ আমারই ছিল। আর তোমাকে তো ধ্রুব থেকে যেতে বলেছে। শত হোক একটা বাচ্চা আছে তোমার।

 

–কারো সাথে স্বামী, ভালোবাসা শেয়ার করার মত নিম্ন মানসিকতা আমার নেই মিসেস ধ্রুব ওয়াহিদ।

 

ইরার দাঁতে দাঁত পিষলো। কথাটা আবৃতি যে ওকে মিন করেই বলেছে বুঝতে বাকি রইলনা। আবৃতি ফের অপরাধী মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ধ্রুবকে দেখলো। ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,

 

–আপনার ভালোবাসার স্বামীকে আপনিই রাখুন। এরকম ব্যক্তিত্বহীন কারো সাথে থাকার রুচি আমার আর নেই।

 

ইরা চিড়বিড়িয়ে উঠে বলে,

 

–মুখ সামলে কথা বলো আবৃতি। আমার ধ্রুবকে তুমি কোন সাহসে ব্যক্তিত্বহীন বলছ? ধ্রুব সবসময় আমাকে ভালোবেসেছিল। মাঝখানে তুমি উড়ে এসে ওকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলে।

 

আবৃতি উপহাসের সুরে বলে,

 

–আপনার স্বামী আপনাকে খুব ভালোবাসে দেখলেন না তার মহান ভালোবাসার নমুনা। একদিন ভালোবাসাকে ছেড়ে বাবার পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করে নিল। তার সাথে পাঁচবছর সংসার করে, তার গর্ভজাত সন্তান রেখে আবার পুরনো প্রেমিকাকে মনে পড়ল। তাকেও বিয়ে করে প্রেগন্যান্ট করে ফেললো । বাহ কি মধুর ভালোবাসা আপনাদের! আনপ্রেডিক্টেবল!

 

এই বলে আবৃতি ফাইলটা নিয়ে প্রস্থান করল।

 

অপমানে মুখটা থমথমে হয়ে যায় ইরার। সাথে অত্যাধিক রাগে ওর ভেতরটা কিড়মিড়িয়ে উঠে।

 

আবৃতি যাওয়ার আগে ফের ওদের দিকে তাকায়। বজ্র কঠিন গলায় হুমকি দেয়,

 

–আমি সাফ সাফ বলে দিচ্ছি৷ ডিভোর্স পেপারে সই করার আগে আমি আপনার স্বামীকে বলে দিয়েছি যাতে আমার সন্তানের কোন দাবি সে না রাখে। শুধুমাত্র এজন্যই আপনারা জেলের ঘানি টানা থেকে রেহাই পেয়েছেন মনে রাখবেন। আসি।

 

এই বলে আবৃতি গটগট পায়ে হেঁটে চলে গেল। ধ্রুব মলিন চোখে সেই প্রস্থান দেখলো। ওর বুকটা হঠাৎ খা খা করে উঠে। চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে আবৃতির সাথে কাটানো একেকটা স্মৃতি। আবৃতির প্রতি ধ্রুবর হয়তো কোন ভালোবাসা তৈরী হয়নি। কিন্তু তবুও বুকের কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে। আরশানের মায়াবী মুখটা ভেসে উঠে। এখন নিজের ছেলেটাকে দেখতে হলে ধ্রুবর এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। দরজা খুলে এখন আর ছোট্ট দুটি পা দৌড়ে আসবেনা পাপা বলে। আর কেউ রোজ রাতে চকলেট না আনলে গাল ফুলিয়ে থাকবেনা।

এসব মনে পড়তেই ধ্রুবর বুকটা ভার হয়ে আসে। এসব না হলে কি খুব বড় ক্ষতি হয়ে যেত?

 

 

আধো অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরটা! দিনের বেলায়ও ঘরটা থেকে একটা গা ছমছমে ভাব আসছে। ঐশি ঠেলে দরজাটা খুলতেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ এসে নাকে বাড়ি খেল। অনেকদিন বন্ধ কোন ঘর খুললে যেমন উটকো গন্ধ আসে ঠিক তেমনটাই। ঐশির চোখ গেল সরাসরি বিছানার দিকে। সেখানে এক দীর্ঘশদেহী বিশাল মানব বিছানায় উল্টো হয়ে এলোমেলো ভাবে ঘুমিয়ে আছে। ফর্সা উদাম শরীর। পরনে শুধুমাত্র একটা থ্রী-কোয়ার্টার শর্ট প্যান্ট। ঐশি হতাশ শ্বাস ফেলে। বেলা বারোটা বাজতে চললো। এখনো জনাবের উঠার নাম নেই। ওদিকে মা চিল্লিয়ে তার কানের পোকা নাড়িয়ে দিচ্ছে। ঐশি এগিয়ে এসে মানবটির কাঁধ ঝাকালো,

 

–এই ভাইয়া উঠ না। আর কতক্ষণ ঘুমাবে? একটু পর তো বিকেল হয়ে যাবে।

 

ঐশির চিৎকারে মানবটি বোধহয় মহা বিরক্ত হলো। চোখমুখ কুঁচকে পিটপিট করে চোখ খুললো। ঐশি চোখদুটো দেখে ভয় পেয়ে গেল। অতিরিক্ত লাল চোখদুটো! মানবটি বিরক্তি নিয়ে চোখ ঢলে উঠে বসলো।

 

–কয়টা বাজে?

 

গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে মানবটি। ঐশি বলে,

 

–বারোটা বেজে বিশ। ওদিকে তোমার আম্মাজান ফিরে এসে গাল ফুলিয়ে বসে আছেন। তোমার সাথে নাকি আর কোন কথাই বলবেননা তিনি।

 

মানবটি এ কথা শুনে চিন্তিত মুখে উঠে দাড়াল।

উঠার সাথে সাথেই একটা বোতল গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। তা দেখে ঐশি গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। টাওয়াল টা নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে নিলে ঐশি বিষাদ মাখা গলায় বলে উঠে,

 

–ভাই আর কত? এভাবে আর কতদিন চলবে?

 

মানবটি ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো,

 

–যতদিন এই দেহে প্রাণ আছে!

 

ঐশি কাঁপা গলায় বললো,

 

–আর আম্মাজান? তার কি হবে?

 

মানবটি মলিন হেসে বললো,

 

–তার জন্যই তো এখনো নিঃশ্বাস টুকু নিচ্ছি।

 

এই বলে মানবটি ওয়াশরুমের দরজাটা ঠাস করে লাগিয়ে দিল। আর ঐশি ছলছল চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল। কোথায় গেল তার হাসিখুশি,সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখা ভাইটা? তার ভাইটা তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে। আর বোন হয়ে সে কিছুই করতে পারছেনা। ওই কালনাগিনীটার জন্য ওর মন থেকে শুধু অভিশাপ আসে। শুধু অভিশাপ!

 

চলবে ………….

 

গল্প:দ্বিতীয় সূচনা

সূচনা পর্ব

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

 

[বিশেষ নোটঃ

আসসালামু আলাইকুম পাঠক। চলে এলাম নতুন গল্প নিয়ে। আশাকরি ভিন্নধর্মী এই প্লটটি পড়ে আপনাদের ভালো লাগবে। সবাই প্লিজ পড়ে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার করে দিবেন।আপনাদের রেসপন্সের ভিত্তিতে পরবর্তী পর্ব আসবে। আর যদি সন্তোষজনক সাড়া না পাই তাহলে কন্টিনিও করবনা।কেননা আপনাদের পছন্দ না হলে শুধু শুধু এত কষ্ট করে কি লাভ। ]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments