গল্প: এলাচ দারুচিনি (০২)

লেখনীতে:তাছমিয়াতুল জান্নাত

পর্ব:০২

সকাল গড়িয়ে তখন প্রায় ১১টা।
রোদের তাপ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। বারান্দার সাদা মেঝেতে জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে লম্বা ছায়া ফেলেছে।
নিচতলা থেকে থালা-বাসনের শব্দ ভেসে আসছে। কোথাও কেউ হাসছে, কেউ গল্প করছে। নতুন বউয়ের বাড়িতে আত্মীয়দের ব্যস্ততা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও সৌদামিনীর পৃথিবীটা অদ্ভুত চুপচাপ।

সে এখনও বারান্দার কোণটাতেই বসে আছে। লাল জামদানির আঁচল গুছিয়ে দুই হাতের মাঝে চেপে রেখেছে। হালকা বাতাসে মাথার সামনে ছোট ছোট চুল উড়ছে। চোখ দুটো ক্লান্ত, যেন রাতভর ঘুম আসেনি।

টেবিলের উপর ইশিতা ইমতিহান রেখে যাওয়া নাস্তাটা ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেক আগেই। এক কাপ চায়ের উপর পাতলা সর জমেছে। কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল নেই সৌদামিনীর।

তার মাথার ভেতর এখনও ঘুরছে মায়ের বলা কথাগুলো।
প্রতিটা শব্দ যেন কাঁটার মতো বিঁধছে।

এই বাড়িতে সবাই তাকে যত্ন করছে, তবুও বুকের ভেতরের ভয়টা কিছুতেই কমছে না।
মনে হচ্ছে, একটু অসাবধান হলেই আবার অন্ধকার কোনো স্মৃতি এসে তাকে গিলে ফেলবে।

দূরে কোথাও একটা ঘুঘু ডেকে উঠল।
সৌদামিনী ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তারপর খুব আস্তে নিজের দুই হাত জড়িয়ে ধরল নিজেকেই—

যেন পৃথিবীতে এই মুহূর্তে নিজেকে আগলে রাখার মতো আর কেউ নেই।

রুমে ঢুকেই অনিরুদ্ধ চারপাশে তাকাল।
খাট খালি। জানালার পাশে কেউ নেই।

ভ্রু কুঁচকে উঠল তার।

— “প্রিয়…?”

কোনো উত্তর নেই।

অনিরুদ্ধ আবার ডাকল—

— “এই প্রিয়… কই তুই?”

তার কণ্ঠে অজানা অস্থিরতা।

দ্রুত রুম পেরিয়ে বারান্দায় এসে থামতেই দেখল, কোণের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে সৌদামিনী। মাথা নিচু। দুই হাত আঁচলের উপর গুটিয়ে রাখা।

অনিরুদ্ধ ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

— “সই, খাবার খাসনি কেন?”

সৌদামিনী ধীরে মুখ তুলল। চোখদুটো শান্ত, কিন্তু ভেতরে অদ্ভুত সরলতা।

খুব আস্তে বলল—

— “আম্মু বলল তোমার চাহিদা মেটাতে…”

একটু থেমে আবার প্রশ্ন করল—

— “কিন্তু তোমার কী চাই?”

প্রশ্নটা শুনে অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল—

— “ভালোবাসা।”

সৌদামিনী ভ্রু কুঁচকে তাকাল। যেন শব্দটার মানে বুঝতে চেষ্টা করছে।

— “ভালোবাসা কেন চাহিদা, ইরফান?”

অনিরুদ্ধ হালকা হেসে রেলিংয়ে হেলান দিল।

— “ভালোবাসা হলো… যাকে তুমি খুঁজবে। যাকে মিস করবে। যাকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে। যাকে না দেখলে কিছুই ভালো লাগবে না…”

সৌদামিনী চুপ করে শুনল।

তারপর একদম নিশ্চিন্ত গলায় বলল—

— “তাহলে আমার ভালোবাসার চাহিদা জামিনি।”

অনিরুদ্ধ থমকে গেল।

মুহূর্তেই তার মাথায় যেন পুরোনো সব কথা একসাথে ভেসে উঠল।

সে ভুলেই গিয়েছিল—
ছয় বছর বয়সের পর থেকে সৌদামিনী কখনও স্বাভাবিকভাবে কারও সাথে মিশেনি।

স্কুলে গেলেও শুধু পরীক্ষার সময় যেত। পরীক্ষা শেষ হলেই বাসায় ফিরে আসত। কোনো বন্ধু ছিল না। সারাদিন নিজের রুমে বসে ছবি আঁকত, কল্পনার জগতে হারিয়ে থাকত।

ফোন পর্যন্ত ব্যবহার করতে জানে না মেয়েটা। শুধু নানি, ফুফু বা খালার ফোন এলে ধরত।

এই পুরো পৃথিবীতে মাত্র একজন মানুষের সাথে একটু মিশেছিল সে—
তাদের বাড়ির কাজের খালা নাছিমার মেয়ে, জামিনি।

তাই সৌদামিনীর ছোট্ট পৃথিবীতে “ভালোবাসা” মানেই জামিনি।

— “জামিনি আমার ভালোবাসা, ইরফান…”

সৌদামিনীর শান্ত কণ্ঠে বলাটা শুনে অনিরুদ্ধর ধ্যান ভাঙল।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটার দিকে তাকাল।

তার সামনে বসে থাকা ১৭ বছরের মেয়েটা বয়সে বড় হলেও ভেতরে এখনও ভয় পাওয়া ছোট্ট এক শিশু হয়ে আছে।অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে সৌদামিনীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
তার চোখে ছিল শুধু মায়া।

খুব নরম গলায় বলল—

— “সই… তোকে একটু জড়িয়ে ধরি?”

কথাটা শোনা মাত্রই যেন আচমকা বদলে গেল সৌদামিনী।

তার চোখে ভয় নেমে এলো মুহূর্তের মধ্যে। নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে গেল।

পরের সেকেন্ডেই সে চিৎকার করে উঠল—

— “আসবে না…!”

হঠাৎ পাশের ফুলের টবটা তুলে মেঝেতে ছুঁড়ে মারল সে।

ঝনঝন শব্দে টব ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

সৌদামিনী যেন নিজের ভেতরে নেই আর। পাগলের মতো রুমে ঢুকে যা সামনে পাচ্ছে তাই ভাঙতে শুরু করল।

— “আসবে না…! বললাম তো আসবে না…!”

তার কণ্ঠ কাঁপছে। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।

— “ব্যাড টাচ করলে মিনির কষ্ট হয়…! ব্যথা পায় মিনি… রক্ত আসে… মিনি ব্যথা পায় তো…!”

কথাগুলো শুনে অনিরুদ্ধর বুক হিম হয়ে গেল।

সে বুঝতে পারছে—
এই ভয় কোনো কল্পনা না।
কোনো এক ভয়ংকর সত্য এত বছর ধরে মেয়েটার ভেতর জমে আছে।

— “সই… শান্ত হ…”

অনিরুদ্ধ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাকে থামানোর চেষ্টা করল।

কিন্তু সৌদামিনী তখন পুরো আতঙ্কে ডুবে গেছে। সে হাত ছুঁড়ছে, কাঁদছে, নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

হঠাৎ তার হাতের আঘাত গিয়ে লাগল অনিরুদ্ধর কপালে।

টক করে শব্দ হলো।

অনিরুদ্ধ কয়েক সেকেন্ড থমকে গেল। তারপর ধীরে ধীরে কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করল।

রক্ত দেখামাত্রই জমে গেল সৌদামিনী।

তার চোখ বড় হয়ে উঠল আতঙ্কে।

— “র… রক্ত…”

পরের মুহূর্তেই সে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

অনিরুদ্ধ পেছন থেকে ডাকল—

— “সই!”

কিন্তু সৌদামিনী থামল না।

দৌড়ে নিচে ড্রয়িংরুমে গিয়ে ডাইনিং টেবিলের নিচে গুটিসুটি মেরে ঢুকে পড়ল সে। দুই কানে হাত চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

— “মিনি খারাপ না… মিনি ইচ্ছে করে করে নাই…”

তার পুরো শরীর কাঁপছে।

অনিরুদ্ধও দ্রুত নিচে নেমে এলো। কপাল থেকে এখনও রক্ত ঝরছে।

★★★*

ড্রয়িংরুমে এসে টেবিলের নিচে কাঁদতে থাকা সৌদামিনীকে দেখে তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

এই মেয়েটা শুধু ভয় পায় না—
সে প্রতিটা মুহূর্তে নিজের অতীতের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে।পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে ভারী নীরবতা।

কিছুক্ষণ আগেও বাড়িভর্তি মানুষ ছিল, কিন্তু ইশিতা ইমতিহান সবাইকে উপরে চলে যেতে বলেছে। এখন নিচতলায় শুধু চারজন মানুষ।

ইশিতা ইমতিহান।
ইশরাক ইমতিহান বাদল।
অনিরুদ্ধ।
আর সৌদামিনী।

ডাইনিং টেবিলের পাশের সোফার কোণে বসে আছে সৌদামিনী। দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে ইশিতা ইমতিহানকে। যেন ছেড়ে দিলেই আবার কেউ তাকে টেনে নিয়ে যাবে।

ইশিতা বারবার তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। চোখে পানি জমে আছে তারও।

আর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে অনিরুদ্ধ।

ফর্সা মুখটা রাগে টকটকে লাল হয়ে আছে। চোখ দুটো রক্তবর্ণ। চোয়াল শক্ত। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ। পুরো শরীর কাঁপছে ক্রোধে।

ইশরাক ইমতিহান বাদল নিঃশব্দে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। জীবনে অনেকবার অনিরুদ্ধকে রাগতে দেখেছেন তিনি, কিন্তু আজকের এই রাগ আলাদা। ভয়ংকর।

হঠাৎ অনিরুদ্ধ পাশের জগটা তুলে পুরো শক্তিতে ছুঁড়ে মারল মেঝেতে।

ঝনঝন শব্দে কাঁচ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

সৌদামিনী ভয় পেয়ে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ইশিতাকে।

অনিরুদ্ধ দাঁত চেপে কটমট করে বলল—

— “আমার সইয়ের সাথে কে করেছে এইসব…?”

তার কণ্ঠ কাঁপছে।

— “আমার ছোট্ট সই এগারো বছর ধরে চাতক পাখির মতো ভয় নিয়ে বেঁচে আছে…!”

এক মুহূর্ত থেমে সে নিজের দুই হাত মাথায় চেপে ধরল।

— “আমি সেই জানোয়ারটাকে ছাড়ব না…”

তার চোখে তখন শুধু আগুন।

অনিরুদ্ধ ইশরাক আর ইশিতার দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল—

— “পাপা… মাম্মা… তোমরা সৌদামিনীকে বলো ওই জানোয়ারের নাম বলতে!”

ঘরের বাতাস পর্যন্ত যেন জমে গেল কথাটায়।

সৌদামিনী কেঁপে উঠল।

তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। ঠোঁট কাঁপছে।

কিন্তু ভয়টা এখনও এত গভীর…
যে সেই নামটা উচ্চারণ করার সাহসও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে।

চলবে……….

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments