গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (০৮)

পর্বঃ০৮

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ⛔]

সকাল সাড়ে ছয়টা। চারদিকে এখনো ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন। কুয়াশার আবরণে ঢেকে আছে সমস্ত গাছপালা। নেই কোথাও একফোঁটা রোদের কণা। সূর্যি মামাও অলস সময় কাটাচ্ছেন বোধকরি। বেশ রাত করে ঘুম আসার কারণে আরশান আর তার মাম্মামের ঘুমটা বেশ গাঢ়। যার ফলে নামাজের সময় আর উঠা হয়নি। হঠাৎ পাশে থাকা টেবিলের উপর আবৃতির ফোনটা তারস্বরে বেজে ওঠে। আবৃতির ভারী ঘুমটা কিছুটা পাতলা হয়ে আসে। ঘুম কাতুরে আবৃতি কপাল কুঁচকে পাশ ফিরে আরশানকে জড়িয়ে ধরে আবার ঘুমিয়ে পড়ে৷ কিন্তু নাছোড়বান্দা যন্ত্রটা থামলে তো? ঘুমঘুম চোখে টেবিল হাতড়ে আবৃতি ফোনটা নিল। না দেখেই রিসিভ করে কানে ধরে ঘুম ঘুম কন্ঠে বলো,

–হ্যালো।

অপরপাশে থাকা ধ্রুবর বুকটা ধ্বক করে উঠে আবৃতির ঘুম ঘুম মিষ্টি স্বরে। আজ প্রায় ছয়দিন পর এই কন্ঠটা ও শুনলো। কিন্তু মনে হচ্ছে কত যুগ পেরিয়ে গিয়েছে ধ্রুব এই কন্ঠ শোনেনি আর এই কন্ঠের মালকিনকে দেখেনি।
ধ্রুব ঢোক গিলে নিচু স্বরে বললো,

— কেমন আছো আবৃতি?

আবৃতির পিলে চমকে উঠে। এতক্ষণের ঘুম কাতরতা কোথায় যেন ছুটে পালিয়ে গেল। ফোনটা সামনে এনে দেখে কল লগে ধ্রুব নামটা ভাসছে। বিছানায় বসে ও কতক্ষণ থম মেরে বসে রইল। এই সময়ে ধ্রুব নামক ব্যক্তি যে কিনা তার আর তার সন্তানের জীবনটা এক নিমিষেই ধ্বংস করে দিয়েছে তার কলটা একদমই অপ্রত্যাশিত ছিল। ফোন থেকে অনবরত হ্যালো হ্যালো শব্দ ভেসে আসছে৷ আবৃতি ফোনটা আবার কানে চেপে ধরে নিরেট ঠান্ডা স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

— কেন ফোন দিয়েছেন?

ওপাশের ধ্রুব থমকালো কিছুটা আবৃতির এমন ঠান্ডা আওয়াজে। ইতস্ততভাবে বললো,

— তুমি….মানে আরশান কেমন আছে।

আবৃতি সাবলীল ভাবেই বললো,

— আলহামদুলিল্লাহ খুব ভাল আছে।

ধ্রুব কি বলবে ভেবে পেলোনা। ও বসে আছে নিজেদের বাড়ির লনের একপাশের দোলনায়৷ কাল রাতে এত ধাক্কাধাক্কির পরেও ইরা দরজাটা খোলেনি। ধ্রুব জানে ইরা খুব জেদী। পুরো রাত যে আর দরজাটা খুলবেনা ও জানত। তাইতো বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে ও রাত থেকে এখানে এসে বসে আছে। হঠাৎ করে ওর ভীষণ খারাপ লাগা শুরু করছিল। মনে হচ্ছিল দম আটকে এই বুঝি মরে যাবে। কি করবে, কি করলে মনটা একটু শান্তি পাবে কূল খুঁজে পাচ্ছিলনা৷ আগেপিছে কিছু না ভেবে ঘোরের মধ্যেই আবৃতিকে এত সকালে ফোন করে বসলো। মনে হচ্ছিল আবৃতি আর আরশানের সাথে কথা বললেই মনটা একটু শান্ত হবে। ধ্রুবর ঘোর ভাঙে আবৃতির কন্ঠে,

— কি হলো? কিছু না বললে ফোন কেন দিয়েছেন?

ধ্রুব আমতাআমতা করে বললো,

— আরশানের সাথে একটু কথা বলা যাবে?

আবৃতি কপাল কুঁচকে ঘড়ি দেখলো। সকাল পৌনে সাতটা বাজে। এত সকালে ধ্রুব যে আরশানের সাথে কথা বলার জন্য ফোন করেনি এটা বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা না। কেননা ধ্রুব জানে এত সকালে আরশান ঘুমে থাকারই কথা৷ তাহলে?

— আরশান ঘুমোচ্ছে। আপনি বিকেলে ফোন করলে ওকে পাবেন। আচ্ছা রাখছি এখন।

এই বলে ধ্রুবকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আবৃতি খট করে লাইনটা কেটে দিল। আর ধ্রুব হতাশ চিত্তে ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইলো। আজ নিজের ছেলেটার সাথে কথা বলতেও ওকে অপেক্ষা করতে হবে। মন চাইলে আর আরশানকে ছোঁয়া যাবেনা, আদর করা যাবেনা। শুধুই কি আরশান? অবচেতন মনে ওর কি আবৃতির জন্য বুকটা কি একটু হলেও পুড়ছে না? ধ্রুবর ইচ্ছে করছে সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে। যেখানে ওকে মন মস্তিস্কের এই দ্বন্দ্বে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবেনা।

★★

ঐক্য কিছুক্ষণ হতবুদ্ধের ন্যায় জোবায়দা বেগমের পৌঢ় সুশ্রী মুখটায় ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে। ঐক্যর ওমন দৃষ্টি দেখে জোবায়দা চৌধুরী গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,

— কি? এভাবে দেখে কিছু হবেনা৷ এবার তোর কোন বারণ শুনছিনা আমি। অনেক হয়েছে নাটক।

ঐক্য নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,

— আম্মু আমিতো আপনাকে অনেকবার বলেছি আমি আর বিয়ে করতে চাইনা।

জোবায়দা চৌধুরী থমথমে মুখে বললেন,

— কেন বিয়ে করতে চাওনা তুমি? একটা কারণ বলো।

ধ্রুব ভাবলেশহীন গলায় বললো,

— এমনি।

জোবায়দা চৌধুরী এবার নিজের মেজাজ হারিয়ে ধমকে বললেন,

— ঐক্য একটা মেয়ে তোমার জীবনে ক্ষণিকের সুখ হয়ে এসেছিল। এখন সেই হারিয়ে ফেলা ক্ষণিকের সুখের তরে তুমি নিজের জীবনটা এভাবে বরবাদ করতে থাকবে।

ঐক্যর মুখের রঙ বদলে যায় জোবায়দা চৌধুরীর কথাটা শুনে,

— আম্মু প্লিজ। এসব পুরনো কথা এখন তুলবেননা প্লিজ। আর আপনাকে কে বলেছে আমি তার জন্য বিয়ে করছিনা৷

— তাহলে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছোনা কেন বলো?

ঐক্য অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আনমনে বলে উঠে,

— আম্মু আমি চাইনা আমার কলিজাটা সৎমায়ের অনাদরে বড় হোক। আমি ওর জন্য যত যাই করি। কিন্তু ওয়াফা সবসময় তো আমার সামনে বা আমি ওর পাশে থাকবনা। তখন আমার অগোচরে ও সৎমায়ের অত্যাচারে পিষ্ট হবে এমনটা আমি কখনোই হতে দেবনা৷ আমার আম্মাজানই আমার জীবনের একমাত্র প্রায়োরিটি। আর সারাজীবন ওই থাকবে।

জোবায়দা চৌধুরী ঐক্যকে টেনে নিজের দিকে ফেরালেন। ছেলের অসহায় পিতৃসুলভ চোখের দিকে তাকিয়ে নরম সুরে বললেন,

— বাবা যদি ওয়াফাকে সত্যিকার অর্থেই কেউ নিজের সন্তানের মতো করে আগলে নেয় তখন?

ঐক্য মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসলো। বললো,

— এমন কেউ এই দুনিয়াতে নেই আম্মু৷ যেখানে নিজের আপন মাই দুধের সন্তানকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। সেখানে আপনি ওর জন্য ভালো সৎমা খুঁজে আনবেন হাস্যকর।

জোবায়দা বেগম অনড় গলায় বললেন,

— হ্যাঁ আনব। দুনিয়াতে কোথায় না কোথাও এমন কেউ নিশ্চয়ই আছে। যে কিনা আমার দাদুমনিকে ঠিক মায়ের মতোই আগলে নেবে।

ঐক্য অকপটে বললো,

— তবে সেদিন না হয় বিয়ের কথা ভাবব৷ এখন এই বিষয় বাদ দিন। ওয়াফার স্কুলের দেরী হচ্ছে। আমার ওকে ঘুম থেকে তুলতে হবে।

এই বলে ঐক্য ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
জোবায়দা চৌধুরী ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলেন,

–দেখিস বাবা আল্লাহ তোকে আর তোর মেয়েকে আগলে রাখার জন্য কাউকে ঠিকই মিলিয়ে দেবেন। যে তোর জীবনটা আবার রাঙিয়ে দেবে। আমার মা হারা নিষ্পাপ নাতনি একজন মা ঠিকই পাবে এ আমার বিশ্বাস।

★★

— মাম্মাম নতুন স্কুলে কি হোয়াইট কালার ড্রেস?

আবৃতি আরশানের গলার টাইয়ের নট বাঁধতে বাঁধতে বললো,

— হ্যাঁ বাবা৷

— আগের স্কুলের ড্রেসটা অনেক সুন্দর ছিল।

— স্কুলের ড্রেস একটা হলেই হয়।

— মাম্মাম পাপা দিয়ে আসবেনা?

আবৃতি আরশানের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,

— না আরশান আমি দিয়ে আসব নাহলে তোমার মামু। তোমার পাপার কাজ আছে সে আর পারবেনা।

আরশান মুখটা ভার করে ফেললো। আবৃতি দেখেও কিছু বললোনা। আহান রেডি হয়ে আবৃতিকে তাড়া দিল। ওদের নামিয়ে আবার ওকে হসপিটালের জন্য ছুটতে হবে। আরশানের ব্যাগ একহাতে নিয়ে আরেকহাতে ওকে নিয়ে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে গেল ওরা।



স্কুলে গেইটের কাছে আহানের বাইকটা ব্রেক কষলো। ঠিক সেই সময় বিপরীত রাস্তা ধরে একটা কালো রঙের কার এসে গেইটের সামনে দাঁড়ালো। কার থেকে একটা লোক বের হয়ে পেছনে দরজা খুলে দিল। ভেতর থেকে স্যুটব্যুট পরা ঐক্য বের হলো। চোখে কালো রোদচশমাটা পরে নিয়ে কার থেকে ওয়াফাকে কোলে নিয়ে গটগট পায়ে হাঁটা ধরলো। সাবের হাতে ওয়াফার ব্যাগ নিয়ে ঐক্যর পেছন পেছন এগোলো। হঠাৎ ঐক্যর চোখ আবৃতিদের দিকে পড়ে। ঐক্যর সাথে চোখাচোখি হওয়ায় আবৃতি সংকোচে চোখ নামিয়ে নিল। ওয়াফা ড্যাবড্যাব করে আবৃতির দিকে তাকিয়ে আছে। আবৃতি ইতস্তত পায়ে হাঁটা ধরলো। ইশ পাকা মেয়েটা ওইদিন ওকে কি বিব্রতকর অবস্থায় না ফেলেছিল। হঠাৎ পেছন থেকে ওয়াফার চিৎকার শোনা যায়,

— ওমা সুইটি আন্টি। তুমি আমার সাথে কথা না বলে যাচ্ছ কোথায়?

ঐক্যর কোল থেকে মুচড়িয়ে নেমে ওয়াফা দোড়ে এসে আবৃতির ওরনার কোণা টেনে ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো। আবৃতি ভীষণরকম বিব্রত হলো। আচ্ছা মুশকিল তো। এই অতি পাকনি মেয়েটাতো ওর পিছুই ছাড়ছেনা। ঐক্য চোখ মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে মেয়ের কান্ডে সে বেশ বিরক্ত।

— আম্মাজান কি হচ্ছে এসব? তোমার ক্লাসের দেরী হচ্ছে।

আহান ওয়াফার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,

— হাই কিউটি! কেমন আছো তুমি?

ওয়াফা ঠোঁট এলিয়ে হেসে বলে,

— আ’ম ফাইন আঙ্কেল। হাউ আর ইউ?

— আমিও খুব ভাল আছি৷

ওয়াফার চোখ হঠাৎ আহানের হাত ধরে মুখ ফুলিয়ে রাখা আরশানের দিকে যায়৷ যে কিনা সরু চোখে ওয়াফার দিকে এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল। ওমনি কালকের ঘটনাটা ছোট্ট ওয়াফার মনে পড়ে মাথাটা দপ করে জ্বলে উঠে। ওয়াফা একপ্রকার তেড়েমেড়ে গিয়ে আঙুল উঁচিয়ে শাসিয়ে বলে,

— এই দুষ্টু ছেলে তুমি কাল আমার চুল টেনে দিয়েছিলে কেন?

আরশান নাক ফুলিয়ে বললো,

— তুমি আমার মাম্মামের কোলে উঠেছিলে কেন? তোমার কি মাম্মাম নেই?

আবৃতি ধমকে উঠে আরশানকে,

— এসব কেমন কথা আরশান? ওর মাম্মাম থাকলেই কি ও আর কারো কোলে চড়তে পারবেনা?
মায়ের ধমক খেয়ে আরশান। এদিকে আরশানকে ধমক খেতে দেখে ওয়াফা খিলখিল করে হেসে উঠে। হাততালি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বলে,

— একদম ভাল হয়েছে৷ একদম ভাল হয়েছে। দুষ্ট ছেলে বকা খেয়েছে।

এদিকে ঐক্য কপাল চাপড়ালো। এই মেয়েকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছেনা৷

চলমান………

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments