গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (২৩-১)

পর্বঃ২৩(১ম অংশ)

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔

— তোমার প্রাক্তন স্ত্রী ধ্রুব। মিস আবৃতি এখন তোমার প্রাক্তন৷ আর হতে পারে উনি কারো ভবিষ্যৎ স্ত্রী। তাই এটা মাথা রেখেই ওনার সাথে ট্রিট করবে আশা করি।

ধ্রুবর মুখের রক্ত সরে গেল সহসা। হতবাক চোখ থমকে তাকিয়ে দেখলো সটান হয়ে নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে থাকা ঐক্যকে। ওই কন্ঠে যেন কিছু একটা ছিল যা ধ্রুবকে মুহুর্তেই চুপ করিয়ে দিল। চেষ্টা করেও আর কোন শব্দ উচ্চারণ করতে পারলনা৷ কেন যেন ঐক্যর উপস্থিতি ওকে ভীত করে তুললো। কি তার কারণ জানা নেই ধ্রুবর! তারপর আর কিছুই বলার শক্তি বা সাহস অবশিষ্ট রইলনা ধ্রুবর জন্য। অনুশোচনায় জর্জরিত চোখজোড়া তুলে এক পলক দেখল আবৃতির অশ্রুসিক্ত পেলব আনন। সূক্ষ্ম ব্যথায় চিনচিন করে উঠল হৃদয়।
ক্লান্ত শ্বাস ফেলে নিঃশব্দ পায়ে চোরের মতো করিডোর ত্যাগ করলো।
ধ্রুব যেতেই নির্লিপ্ত চোখজোড়া তুলে আবৃতিকে দেখলো ঐক্য। কেন যেন আবৃতির ছলছল চোখজোড়া ভাল লাগলোনা দেখতে। এই নারীর চোখের অশ্রু কেন ঝরবে একজন প্রতারকের জন্য? অবশ্য সেই বা কি করেছে। কোন এক ছলনাময়ীর ছলনা আর বিশ্বাসঘাতকতায় নিজের জীবনের তিন তিনটে বছর অন্ধকারে নিমজ্জিত রেখেছে। না আর না। এবার ঐক্য চৌধুরী লাইফে মুভ অন করবে। নিজের মতো চরমভাবে ঠকে যাওয়া আরেকটা ভঙ্গুর নারীর ভরসাস্থল হবে। তার জীবনের দ্বিতীয় সূচনা হয়ে তার বেরঙ ভুবনটা আবার রাঙিয়ে দেবে। দেবেই দেবে। এত সুন্দর একটি সিদ্ধান্ত ঐক্য কি মাত্র মাত্র দুইমিনিটে নিয়েছে। নাহ! ঐক্য এই সিদ্ধান্ত গত দুইদিন দুইরাত সুদীর্ঘ আটচল্লিশ ঘন্টা ধরে ভেবে নিয়েছে। নিজের উচ্ছনে চলে যাওয়া জীবনটাকে নিয়ে ওকে ভাবতে বাধ্য করেছে আবৃতি নামক এই অদ্ভুত রমনী। যাকে ঐক্যর নিকট কখনো পর্বতের মতো অটল আবার কখনো আবার ভগ্নপ্রায় মানবী মনে হয়। কখনো মনে হয় দুরন্ত কিশোরীর ন্যায় উচ্ছ্বল, কখনো আবার একজন নরম কোমলমতি জননী। আবৃতি এখনো স্থির চোখে ধ্রুবর গমন পথে চেয়ে আছে। ঐক্য দু পা এগিয়ে আবৃতির মুখোমুখি দাঁড়ায়। এবার না চাইতেও আবৃতির দৃষ্টি ঘুরে এসে ঐক্যতে স্থির হয়। লম্বাটে ঐক্যর সাথে চোখ মেলাতে আবৃতিকে খানিকটা মাথাটা উপরে তুলতে হয়। ঐক্য আবৃতির অশ্রুসিক্ত হরিণী নয়ন যুগলে নিজের নিগুঢ় দৃষ্টি রেখে ভরাট কন্ঠে বলে উঠে,

–তুমি নারী, তুমি মা, তুমি তেজস্বী! তোমার এই চোখের প্রতিটা অশ্রু মূল্যবান! তাহলে কেন সেই অমূল্য অশ্রুকণা কোন এক অযোগ্যের তরে ঝরাও?

ঐক্যর কথায় কি ছিল জানা নেই। আবৃতি ব্যতিব্যস্ত হাতে চোখ উপচে আসা নেত্রজল মুছে নেয়। ঠিকই তো ও কেন কাঁদবে? কোন প্রতারকের জন্য কাঁদা মানে নিজেকে নিজেই অপমান করা৷

— আমি ধ্রুবর জন্য কাঁদছিনা। ওর জন্য কাঁদার দিন আমার বহু আগেই ফুরিয়েছে।

— এ দুটো চোখ ভরে উঠল কেন তবে?

আবৃতি মলিন হেসে বলে,

— জানেন পুরুষের সুখ খুবই সস্তা এবং সহজলভ্য। তাদের কেবল নারী আর শরীর ভরা যৌন তৃপ্তি বাদে আর কিছুই লাগে না। তাদের কাছে মায়া, ভালবাসা, ইমোশন নামক কোন অনুভুতি আশা করা বোকামি। নাহলে একটা নারীর হৃদয় ভেঙ্গে খানখান করার আগে তাদের বুকটা ক্ষীণ সময়ের জন্য হলেও কাঁপতো।

কথাগুলো বলে আবৃতি শ্বাস নেয় খানিকটা। ঐক্য স্তব্ধ হয়ে শোনে আবৃতির কথাগুলো। টানটান কঠোর মুখটা শিথিল হয়ে আসে কথাগুলোর বানে। একদৃষ্টিতে চেয়ে দেখে আবৃতির লালাভ কান্নাসিক্ত মুখশ্রী। কথাগুলো বলার সময় আবৃতির ঈষৎ রক্তিম ওষ্ঠজোড়া তিরতিরিয়ে কাঁপছে। ও এসব ঐক্যকে কেন বলছে জানেনা। হয়তো ঐক্য পুরুষ বলে। কিন্তু আবৃতি হয়তো জানেনা পৃথিবীর সব পুরুষ এক নয়। তাদের মধ্যে বিচিত্রতা আছে বলেই পৃথিবীতে ভালবাসা নামক মূল্যবান অনুভূতিটা এখনো টিকে আছে। আবৃতি বিমর্ষ চিত্তে বলে গেল নিজের মতন করে,

— আমার এই চোখের জল শুধুমাত্র নিজের প্রতি হতাশায়। কেন আমি শুধু শুধু জীবনের পাঁচটা বছর নষ্ট করলাম।

— লাইফ ইজ টু সর্ট মিস আবৃতি।

আবৃতি অবাক চোখ তুলে তাকায়। অবোধ গলায় শুধায়,

— মানে?

— মানেটা হচ্ছে এই যে আপনি জীবনের হারিয়ে যাওয়া সময় গুলো নিয়ে আফসোসে ভুগছেন। আর সেই আফসোস মনে পুষে নিজের বর্তমানটা নষ্ট করছেন।

আবৃতি কিছু বললোনা। ঐক্য ফের বললো অস্ফুটে,

— আমি জানি মিস আবৃতি ফেলে আসা অতীত আপনি চাইলেও ভুলতে পারবেন না। কারণ সেই অতীত বর্তমানেও আপনাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তাই ভাল হয় আপনি অতীত আর বর্তমানকে এড়িয়ে ভবিষ্যতের পথে হাঁটুন। আই রিপিট মিস আবৃতি লাইফ ইজ টু সর্ট।

এক চোট মুগ্ধতায় আবৃতির দু’নয়ন ছলকে উঠে। ডিভোর্সের পর অনেক জনে অনেক রকম কথাই ওকে বলেছে, ও শুনেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মিথ্যা আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছে আবার কেউবা খোঁচা মেরে ওর দগদগে ঘা আরো খুঁচিয়েছে। কিন্তু ঐক্যর মতো কেউ কোনদিন বলেনি আবৃতিরও নিজের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবা উচিত৷ ওর নিজেরও অধিকার আছে জীবনে সুখে থাকার৷ আবৃতির হঠাৎ ভীষণ অদ্ভুত লাগলো একটা বিষয়৷ যে লোক ওকে লাইফে মুভ অন করার জন্য অনুপ্রেরণা দিচ্ছে সেই লোক কেন তবে নিজের অতীতের বিভীষিকায় এখনো ডুবে আছে? অন্তরের তাড়নায় না পারতে প্রশ্নটা করেই বসলো আবৃতি,

— তবে আপনি কেন এখনো নিজের জীবনে মুভ অন করতে পারেননি ঐক্য সাহেব?

ঐক্য তিল পরিমাণ ভড়কালো না প্রশ্ন টিতে। যেন ও জানতো আবৃতি এমন একটা প্রশ্ন ওকে করবে। ঐক্য ঠোঁট টেনে হাসলো। আবিষ্ট নয়নে আবৃতির দিকে তাকিয়ে মিহি স্বরে বললো,

— তখন এমন কোন নারীকে পাইনি যাকে দেখে মনে হয়েছে, “ঐক্য এবার তোর জীবনে মুভ অন করা উচিত।”

আবৃতির বুকটা ধুকপুক করে ওঠে কেন জানি। ঐক্য পুরোটা কথা একদৃষ্টিতে আবৃতির চোখে চেয়ে বলে। আবৃতির হঠাৎ শরীরটা ছেড়ে দেয়। টাল হারিয়ে পড়ে যেতে নিলেই হঠাৎ ধড়ফড়িয়ে ওকে আগলে নেয় ঐক্য। আবৃতির রক্ত ছলকে উঠে। কোন পর পুরুষের বাহুতে আছে অনুধাবন হতেই তটস্থ নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। ঐক্যকে আর কোন কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই টালমাটাল পায়ে মিটিং কক্ষের দিকে অগ্রসর হয়। ঐক্য আবৃতির গমন পানে চেয়ে বিরবির করে বলে,

— খুব শীঘ্র আপনাকে ছোঁয়ার হালাল সার্টিফিকেট আমার হাতে থাকবে আবৃতি।

.

আবৃতি মিটিং রুমে প্রবেশ করতেই সবার ফিসফিসানি থেমে গেল। আবৃতি তাকিয়ে দেখলো কোণার একটা চেয়ারে ধ্রুব আরশানকে কোলে নিয়ে থমথমে মুখে বসে আছে। আরশান ধ্রুবর ফোনটা নিয়ে বিভোর হয়ে গেইমস খেলছে। আবৃতি আসতেই চোখ উঁচিয়ে এক পলক দেখে সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিল। চোখ মুখ বেশ গম্ভীর। তাকে দেখে উপস্থিত সবার ফিসফিসানি থেমে যাওয়া, ধ্রুবর রগরগে চেহারা পরখ করেই আবৃতি যা বোঝার বুঝে গেল। এতক্ষণ যে এখানে ওকে নিয়েই গসিপ হচ্ছিল ও নিশ্চিত। আবৃতি এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত বোধ করলোনা। মহিলা অভিভাবকদের নিকটে আরেকটা চেয়ার টেনে বসলো। ও বসার সাথে সাথেই আরশানের ক্লাস মেট টুসুর মা ফিসফিসি করে শুধালেন,

— আরশানের মাম্মি? শুনলাম আপনার আর আরশানের পাপার নাকি ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছে।

উপস্থিত সকল এলিট শ্রেণীর মহিলা গণের সমস্ত আগ্রহ আবৃতির দিকে। এতগুলো তীরের মতো চাহনীর বিপরীতেও আবৃতি ঘাবড়ালো না। ধীরস্থির কন্ঠে সাবলীল কন্ঠে বললো,

— জি আপনি ঠিক ই শুনেছেন।

মহিলাগণ বেশ অবাক হলো আবৃতির নির্লিপ্ত উত্তরে। অবাক চোখে একে অপরের দিকে তাকালো সবাই। মহিলাটি আর কোন প্রশ্ন করার সাহস পেল না। কিন্তু পাশের আরেকজন থেমে থাকলো না। খোঁচা মেরে বলে উঠলো,

— আহারে! কেন হলো? মানে আপনার প্রাক্তন দেখছি খুব সুদর্শন। কেয়ারিং ও মনে হচ্ছে। তাহলে বিচ্ছেদ কেন হলো বুঝলাম না।

আবৃতির পেট ফেঁটে হাসি পেল মহিলাটির কথা শুনে। এরা নাকি আবার নিজেকে শিক্ষিত দাবী করে। আবৃতি ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি রেখেই প্রতিত্তোর করলো কাটকাট গলায়,

— আপু একটা কি জানেন। চকচক করলেই সোনা হয়না৷ কারো বাহ্যিক সৌন্দর্য অবলোকন করে অন্তত তার ব্যক্তিত্ব বা চরিত্র বিচার করবেন না। এটা আপনার নিচু আর নোংরা মানসিকতার পরিচয় দেবে।

মহিলাটি চোখ নামিয়ে নেয় বিস্তর লজ্জা আর অপমানে। বাকিরা সবাই হতবাক হয়ে বসে থাকে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার মুগ্ধ হয় আবৃতির তেজীয়ান গলার প্রতিবাদে। ধ্রুব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবৃতির দিকে। ওখানে কি কথা হচ্ছে তা ওর কানে না গেলেও আবৃতির বাচনভঙ্গি, ঠোঁট নাড়ানোতে ওর মনটা অশান্ত হচ্ছে। মাত্র দুইমাস হয়েছে তাদের বিচ্ছেদের। ধ্রুব এখনো নিজের মনকে শক্ত করতে পারছেনা। বাকি জীবন কিভাবে কাটাবে আবৃতিকে ভুলে? গুমোট পরিস্থিতির ইতি টানে হেড মিসের আগমনে। ততক্ষণে ঐক্য এসে বসে পড়ে মেয়ের পাশে। ওয়াফা পাপাকে দেখে টুপ করে তার কোলে বসে যায়। বিপরীতে ঐক্য মুচকি হেসে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বসে থাকে৷ হেড মিস ও বাচ্চাদের শিক্ষকদের নিয়ে আসন্ন পরীক্ষার বিষয়ে অনেক কথা বললেন তিনি। তারপর আমন্ত্রণিত অতিথিদের জন্য হালকা স্নাক্স এর ব্যবস্থা করলো স্কুল কর্তৃপক্ষ। মিটিং শেষ হওয়ার বাচ্চারা সবাই পর যে যার ক্লাসে চলে গেল।

চলবে…..

( আসসালামু আলাইকুম পাঠক। রিচেইক করিনি। শরীরের অবস্থা ভাল না। এটুকুই লিখেছি বহু কষ্টে। এই পর্বের বাকি টুকু দ্রুত দেওয়ার চেষ্টা করব৷ হ্যাপি রিডিং। আর সবাই মন্তব্য করবেন কেমন আগাচ্ছে বা আপনাদের কোন মতামত আছে কিনা।)
0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x