গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (২২)

পর্বঃ২২

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

 

(নিচের নোট টুকু মনোযোগ সহকারে পড়বেন।)

 

 

রাতের নিকষ কালো অন্ধকার পেরিয়ে ধরণী আলোকিত হতে শুরু করেছে সবে।সকালের অংশুমালীর মৃদু কিরণ সরাসরি বিছানার উপর পড়ছে। সেই মৃদু রোদের আঁচ বড্ড আরামদায়ক! তাই আরামের লোভে ঘুম ছুটে যাওয়া স্বত্বেও বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে হচ্ছেনা আবৃতির। মনের কোণে আরামদায়ক ঘুমের লোভ উঁকি দিলেও মস্তিষ্কে অনবরত কড়া নাড়ছে দায়িত্ববোধ। আরশানকে স্কুলে নিতে হবে। অতঃপর বহু কষ্টে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো সে । টের পেল মাথাটা খুব ভার হয়ে আছে। স্বাভাবিক এত অল্প ঘুম আর অনবরত কান্না মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করেছে। আবৃতি চোখ ঢলে পাশে তাকালো। তার আদরের ছেলের পা তার দিকে আর মাথাটা তার পায়ের কোণায় পড়ে আছে। ছেলের এমন বেহাল ঘুমের স্টাইলে আবৃতি আনমনে হাসল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলের নিকট এগিয়ে গিয়ে মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিল৷ আদুরে সুরে ডাকলো,

— আরশান? আব্বু উঠবেনা? স্কুলে যেতে হবে তো।

আরশান কপাল খানিকটা কুঁচকে বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে গেল। আবৃতি ঘড়ির দিকে চাইলো। আজ ওর নিজেরই উঠতে দেরী হয়ে গিয়েছে। মা তো প্রতিদিন সাতটায় উঠিয়ে দেয়। আজ উঠালোনা কেন? এখন রোজকার মতো এত সময় ও কোথায় পাবে এই ছেলেকে ঘুম থেকে উঠানোর জন্য যুদ্ধ করতে? এই মা টাও না। হতাশ নিঃশ্বাস ছেড়ে ফের লেগে পড়লো আরশানের ঘুম ভাঙার যুদ্ধে,

— আরশান তোমার লেইট হচ্ছে। আজ না স্কুলে পেরেন্টস মিটিং আছে কিসের?

আরশান চোখ পিটপিট করে খুললো। আবৃতি ওকে ধরে উঠে বসালো। আরশান চোখ কচলে ঘুম ঘুম গলায় বললো,

— হ্যাঁ আছেতো। সবার মাম্মা পাপাকে আসতে বলেছে। এক্সাম নিয়ে কি যেন বলবে বলছিল।

আবৃতি তাড়া দিয়ে বললো,

— তাহলে তো তাড়াতাড়ি রেডি হতে হবে। উঠো উঠো ব্রাশ করবে চলো ।

— পাপা আসবেনা মাম্মাম?

আবৃতি থমথমে মুখে বললো,

— না।

— বাট হোয়াই? সবার মাম্মা পাপা আসবে?

— আমি যাচ্ছি তো আব্বু।

–কিন্তু তুমি একা কেন? পাপা কেন আসবেনা সাথে?

আবৃতি জবাবা না দিলনা৷ আরশান কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল,

— আমার পাপা কেন আসবেনা? বলোনা মাম্মাম? আগে তো তোমরা দু’জনই যেতে। পাপা এখন আমাদের সাথে থাকেওনা। কি হয়েছে পাপার?রাগ করেছে? তোমরা কি কাট্টি করেছ? মান্ম…

— আরশান চুপ!

আবৃতি অতিষ্ট হয়ে ধমকে উঠে। এমনিতেই মাথা প্রচন্ড
ধরে আছে। তার উপর আরশানের লাগাতার প্রশ্নগুলো যেন মাথায় কোন ভারী বস্তু হয়ে আঘাত করছে৷ ওর ধমকে কেঁপে ওঠে আরশান। ফ্যালফ্যাল করে সেকেন্ড খানিক তাকিয়ে হঠাৎ ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দেয়। আবৃতি পড়লো বিপাকে। এই ছেলে এবার আয়োজন করে কাঁদতে বসেছে। ও জানে এই কান্না শুধুমাত্র আজকের জন্য না। বিগত একমাস ধরে ধ্রুব কেন তাদের সাথে থাকেনা তার কোন যুক্তিগত জবাব আবৃতির নিকট হতে পায়নি। সেই জেদ মিলিয়ে এই কান্না।
এখন কি করে এই ছেলেকে থামাবে৷ ও কি ইচ্ছে করে আলাদা করেছে বাবা ছেলেকে? তাহলে এখন ছেলের রোষে কেন শুধুমাত্র সে পড়ছে?

আবৃতি নিস্পন্দ দৃষ্টিতে আরশানের কান্না দেখল। আরশানের প্রতিটা অশ্রুকণা যেন ওর বুকে ফলা হয়ে বিঁধল৷ কি দোষ এই অবুঝ বাচ্চাটার? কেন এত ছোট বয়সেই ওকে বাবা মায়ের বিচ্ছেদের মতো জঘন্য সম্পর্কের যাতাকলে পিষ্ট হতে হলো? শত ভেবেও মস্তিষ্কের এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেলনা আবৃতি। আজকাল নিজের জন্য না এই অবুঝ শিশুটার জন্য ওর কষ্ট হয় । মনে হয় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে ওর এই নিষ্পাপ বাচ্চাটা। কি করবে আবৃতি? কিভাবে জীবনের বাকিটা পথ ও একা পাড়ি দেবে? আরশানের কান্নার শব্দে রুমে চলে আসেন আবৃতির মা। নাতির কান্না দেখে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে চিন্তিত স্বরে শুধায়,

— কি হয়েছে কাঁদছে কেন নানু ভাই? বকেছিস?

আবৃতি জবাব না দেয়না। হঠাৎ কিছু একটা ভেবে যন্ত্রের ন্যায় আওড়াল,

— মা তোমার ফোনটা নিয়ে আসো তো?

–আনছি দাঁড়া।

ফোনটা এনে দিতেই আবৃতি কাঙ্ক্ষিত নম্বরটিতে ডায়াল করে ফোনটা আরশানের দিকে বাড়িতে ধরে। ফোপাঁতে ফোঁপাতে সে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকায়। আবৃতি অবিচল গলায় বলল,

— নাও তোমার পাপাকে বলো আজ স্কুলে আসতে ।

আরশানের এতক্ষণের ফ্যাচফ্যাচে কান্না নিমিষেই থেমে গেল। ফোনটা নিয়ে নাক টেনে কানে ধরল। আবৃতি হতাশ শ্বাস ফেলে ওর পাশে বসলো। অনেক হয়েছে? আর পালিয়ে বেড়াবে না ও ধ্রুবর থেকে। আরশান ধ্রুবর সন্তান এ সত্যিটা তো বদলে যাবেনা। তাছাড়া ধ্রুবর পাপের শাস্তি তার অবুঝ বাচ্চাটা কেন পাবে? ওর ধ্রুবকে এড়িয়ে চলা মানে নিজেকে ছোট করা, নিজের সন্তানকে কষ্ট দেওয়া৷

ওপাশে ফোন রিসিভ হয় একবারেই। ধ্রুব ঘুম ঘুম কন্ঠে শুধায়,

— হ্যালো কে বলছেন?

— পাপা আমি আরশান।

ধ্রুবর ঘুমের রেশ যেন ছুটে পালালো। তন্দ্রা ভেঙে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো সে। উদগ্রীব স্বরে আওড়ায়,

— বাবা তুমি? কেমন আছে আমার বাবাইটা?

আরশান বুড়ো আঙুল দিয়ে নাকের ডগা কচলে মিহি স্বরে বলল,

— আ’ম ফাইন পাপা। আজ স্কুলে পেরেন্টস মিটিং আছে। তুমি আসবেনা পাপা?

ধ্রুব এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল। পেরেন্টস মিটিং? কই আবৃতি তো ওকে কিছু জানালনা। নিজে না জানাক। অন্তত কাউকে দিয়ে জানাতে পারতো। এরকম তো কথা ছিলনা ওর সাথে।

— পাপা শুনছো?

— হ্যাঁ শুনছি বাবাই৷ পাপা সময়মতো চলে আসব কেমন?

আরশান উচ্ছ্বসিত গলায় বললো,

— থ্যাংক ইউ পাপা।

ধ্রুব হেসে বলে,

— ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম মাই বয়। আচ্ছা তোমার মাম্মাম…?

পুরো কথাটা বলার আগেই ওপাশে খট করে লাইনটা কেটে গেল। ধ্রুব ফোনটা হাতে নিয়ে থম মেরে বসে রইল। নিশ্চয়ই আবৃতি ফোনটা কেটে দিয়েছে। ধ্রুবর বুকে চিনচিনে ব্যথা জাগলো। আজ যদি ও ঘৃণ্য পাপ টা না করতো তাহলে হয়তো ওর আবৃতি আর নিজের সন্তানের সাথে একটা সুখের সংসার রচিত হতো। সবকিছু পেয়েও হারিয়ে ফেলার আফসোসের মতো কঠিন যন্ত্রণা পৃথিবীর আর কারো না হোক! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধ্রুব বেড থেকে নেমে দাঁড়ালো।কিছু একটা মনে পড়তেই সারা রুমে চোখ বুলিয়েও ইরাকে কোথাও দেখতে পেলনা৷ বুক ছিঁড়ে একটা হতাশা মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস নির্গত হলো তার। কি করছে ও? কাল দীপ্তর কথাগুলো মনে পড়ল তার। আসলেই ও কি চায়? কেন করছে এসব? এই জীবন তো ধ্রুব নিজে বেছে নিয়েছিল। তাহলে এখন ইরার সাথে এইরকম ব্যবহারের তো কোন মানে নেই। ক্লান্ত শ্বাস ফেলে নিজের ল্যাপটপে ছুটির ইমেইল পাঠিয়ে ধ্রুব দীপ্তর রুমে গেল ইরাকে আনতে।

ঐক্যর রুমের কিং সাইড বিছানায় বাবু হয়ে চুপচাপ বসে আছে ওয়াফা। স্কুলের জন্য একেবারে তৈরী সে। গোলগাল মুখে আকাশসম মায়া নিয়ে চোখ পিটপিট করে দেখে চলেছে নিজের পাপাকে। যে কিনা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরী হচ্ছে। শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে আয়নায় নিজের অংশকে তার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে দেখে ঐক্যর ঠোঁট মৃদু হাসিতে প্রসারিত হলো। হঠাৎ ওয়াফাকে চমকে দিয়ে ঐক্য চোখ মারল। ওয়াফা চোখ বড় বড় করে ফেললো ঐক্যর কান্ডে। ঐক্য মেয়ের বিহ্বল আদুরে মুখটা দেখে দুষ্ট হেসে আবার চোখ মারল। ওয়াফা খিলখিলিয়ে হেসে খাটে উল্টো হয়ে শুয়ে পড়ল। ঐক্যর হৃদয় সহ গোটা কক্ষটা জুড়িয়ে যায় ওয়াফার অকৃত্রিম হাসির ঝংকারে! ঘড়িতে তাকিয়ে নিজের হাতের গতি বাড়ায়৷ মেয়েকে খাইয়ে রেডি করিয়ে নিজে রেডী হতে হতে বেশ লেইট হয়ে গিয়েছে। শার্টের উপর ব্লেজার পরে নিয়ে ঐক্য এখনো হাসতে থাকা মেয়েকে টুপ করে কোলে তুললো৷ ওয়াফার গালে চুমু খেয়ে বললো,

— ব্যস আম্মাজান। হয়েছে আর না। চলুন দেরী হচ্ছে স্কুলের জন্য।

ওয়াফাকে নিয়ে নিচে নামতেই মিসেস জোবায়দা চৌধুরী আর ঐক্যর বড় ফুফু ওয়াহিদা চৌধুরীকে চোখে পড়ল। বোঝা যাচ্ছে ক্ষণিক পূর্বেই তার আগমন ঘটেছে চৌধুরী ভিলায়। ঐক্যকে নামতে দেখে গদগদ হেসে তিনি শুধালেন,

— কেমন আছ বাবা?

— এইতো আলহামদুলিল্লাহ ফুপি। আপনি কেমন আছেন?

— খুব খুব ভাল আছি। ওয়াফা দাদুমনি কেমন আছে?

— মা দাদু মনিকে সালাম দাও।

— আসসালামু আলাইকুম দাদুমনি৷

— ওয়ালাইকুমুস সালাম। স্কুলে যাচ্ছে ওয়াফা মনি?

ওয়াফা উপর নিচ মাথা নাড়াল।

ওয়াহিদা চৌধুরীর সাথে কুশলাদি বিনিময়ের পর ঐক্য কব্জিতে বাঁধা লক্ষ টাকা মূল্যের ঘড়িতে সময় দেখে ব্যস্ত স্বরে বললো,

— আচ্ছা আম্মু, ফুপি? আমি আসছি। ওয়াফার লেইট হয়ে যাবে তাহলে।

— সাবধানে যেও।

ঐক্য যেতেই ওয়াহিদা চৌধুরী জোবায়দা বেগমকে চেপে ধরলেন।

— ভাবি ঐক্যকে বলেছ মেয়েটার কথা?

জেবায়দা চৌধুরী বললেন,

— বলেছি ওয়াহিদা কিন্তু ঐক্য মানা করে দিয়েছে।

— ওমা কেন? এত ভাল পাত্রী তার উপর সিঙ্গেল হয়েও বিয়েতে কোন আপত্তি নেই তাদের। এখানে তোমার গুণধর ছেলে কেন বেঁকে বসলো?

জোবায়দা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— ঐক্য বলেছে বিয়ে যদি করতেই হয় তাহলে ডিভোর্সী কোন মেয়েকেই বিয়ে করবে। জানিনা এতবছর পর হঠাৎ কেন, কি বুঝে ও বিয়েতে মত দিয়েছে? আর কেনইবা তালাকপ্রাপ্তা কাউকেই বিয়ে করতে চায় ? কিন্তু আমিও ওর সাথে একমত ওয়াহিদা৷ সমাজের একটা ডিভোর্সী মেয়ের দায়িত্ব যদি আমার ছেলে নেয় তাতে ক্ষতি কিসের? একজন ডিভোর্সী মেয়ের জন্য এই সমাজ কতটা বিষাক্ত তা খুব করেই জানো তুমি।

— কিন্তু ভাবি…

— কোন কিন্তু নয় ওয়াহিদা। ছেলে আমার বিয়েতে মত দিয়েছে এই ঢের৷

— আচ্ছা তাহলে কি ডিভোর্সী মেয়ে দেখতে বলব ঘটককে?

— দাঁড়াও ঐশী ওয়াফা দাদুমনির স্কুলের একটা মেয়ের কথা বলেছিল গতকাল। আগে ওই মেয়েটাকে দেখে নিই।

**
ম্যাফল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।

স্কুলের সামনে পার্কিং এরিয়ায় থামলো ঐক্যর কার। সচারাচর নিজে ড্রাইভ করলেও আজ ড্রাইভার সাবেরকে নিয়ে এসেছে। পেছনের সিটে বাবা মেয়েতে রাজ্যের গল্প করতে করতে স্কুলে এসে পৌঁছেছে। গল্প বলতে শুধু ওয়াফাই হাজার খানেক বাচ্চাসুলভ কথা বলে গিয়েছে। আর ঐক্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছে তার পাখিটার কিচিরমিচির। যদিও ওয়াফার ইদানীং সকল কথার কেন্দ্রবিন্দু আবৃতি নামক রমনী। ঐক্য ভাবে তার ওয়াফা হয়তো এই নারীটির কাছে মাতৃস্নেহের সুধা আস্বাদন করেছে তাই এত মায়া ওই রমনীর প্রতি! গাড়ি থেকে নেমে ঐক্য মেয়েকে কোলে নিয়ে নামাল। সেই সময় বিপরীত পাশ হতে একটা সিএনজি থামলো স্কুলের সামনে।

— পাপা দেখ সুইটি আন্টিরা এসেছে।

ঐক্য কিছু বললনা। কিন্তু ভেতরেও চলে গেলনা। কি মনে করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। আবৃতি নেমে আরশানকে সাবধানে ধরে নামাল। আরশান নেমে স্কুলের সামনে তাকাতেই ওয়াফাকে চোখে পড়ল। আবৃতিকে রেখেই দৌড়ে ওয়াফাদের কাছে চলে গেল। আবৃতি পিছু ফিরে আরশানকে ডাকতে নিলে ঐক্যর সাথে চোখাচোখি হয়ে যায় ।ভাড়া মিটিয়ে না চাইতেও ঐক্যর সামনে আসতে হলো৷ আবৃতি আসতেই ওয়াফা ছুটে আবৃতির দু পা জড়িয়ে ধরল। আবৃতি হেসে কোলে তুলে নিল বাচ্চাটাকে। ওয়াফা আবৃতির মসৃণ গালদুটো ধরে আধো গলায় বলে উঠে,

— তোমাকে আজ অন্নেক সুন্দর লাগছে সুইটি আন্টি।

আবৃতি সেই প্রথম দিনের মতো থতমত খেল। ও তো ভুলেই যায় ওয়াফাকে কোলে নেওয়া মানে আরেকবার নতুন করে বিব্রত হওয়া। আবৃতির অপ্রস্তুত মুখভঙ্গি লক্ষ্য করে ঐক্য ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। বিড়বিড় করে বললো,

— সুইটি আন্টিকে তোমার কাছে কোনদিন সুন্দর লাগেনা আম্মাজান?

ঐক্য আজ কি মনে করে হুট করে আরশানকে কোলে তুলে নিল। আরশান চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে রইল। গম্ভীর মুখো ঐক্য আদুরে সুরে জিজ্ঞেস করলো,

— কেমন আছ চ্যাম্প?

— খুব ভাল আঙ্কেল৷

ঐক্য এক পলক আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আবৃতির দিকে চাইলো। বললো,

— আপনি কেমন আছেন মিস আবৃতি…?

— খন্দকার। আমি ভাল আছি আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?

— জি আমিও ভাল আছি।

ঐক্য নিজের ব্লেজারের পকেট থেকে দুটো চকোলেট বের করে আরশান আর ওয়াফাকে দিল। ওরা নিজেদের মতো ব্যস্ত ছিল কিন্তু খেয়াল করলোনা দূর হতে ধ্রুব স্থির চোখে তাদের দিকেই চেয়ে আছে। চোখে একটু হিংসা ফুটলো কি? কে জানে!

স্কুলের সামনে নিজের প্রাক্তন স্ত্রী আর সন্তানকে নিজের অফিসের বসের সাথে দাঁড়িয়ে হেসে হেসে কথা বলতে দেখে ধ্রুবর বুকটা ধ্বক করে উঠে। আবৃতির কোলে ওয়াফা আর ঐক্যর কোলে আরশানকে দেখে অদ্ভুত অস্থিরতা অনুভব হচ্ছে । মনে কোন আগাম শঙ্কা জাগছে। ওর তাকিয়ে থাকার মাঝেই ওরা স্কুল গেইট পেরিয়ে ভেতরে চলে গেল। ধ্নিজেকে সামলে ধ্রুব নিজেও এগোলো। আজ আবৃতির সাথে ওকে কথা বলতেই হবে। যেভাবেই হোক।

.

স্কুলের পেরেন্টস মিটিং রুমে সব স্টুডেন্টসদের পেরেন্টস অলরেডি চলে এসেছে। মিটিং শুরু হতে এখনো কিছু সময় বাকি আছে বিধায় সব অভিভাবকরা একে অপরের সাথে খোশ আলাপে মেতে আছে।

ঐক্য আর আবৃতি আরশান ওয়াফাকে নিয়ে একসাথে ডুকে। সকলে ফিরে তাকায় ওদের দিকে। এর মধ্যে একজন নতুন স্টুডেন্টস এর মা হেসে দাঁড়িয়ে বলে,

— মাশাল্লাহ আপু ওরা আপনাদের টুইন বেবি? অনেক কিউট দুজনে। আ হ্যাপি ফ্যামিলি। কি নয়নাভিরাম লাগছে পুরো পরিবারকে!

ঐক্য আবৃতি দু’জনেই বেশ অপ্রস্তুত হলো।কিছু বলার হঠাৎ পেছন থেকে কেউ ঠান্ডা গলায় বলে উঠে,

— আরশান ইজ মাই সান। মিসেস? হোয়াট এভার।

মহিলাটি থতমত খেল। সবাই সামনে তাকিয়ে গোলগোল চোখে ব্ল্যাক কোর্ট প্যান্ট পরে সাহেব সেজে আসা সুদর্শন ধ্রুবকে দেখলো। আরশান উৎফুল্ল গলায় চিৎকার করে উঠে,

— পাপা!

উপস্থিত সকলে অবাক চোখে একে অপরের দিকে চেয়ে নিরব দৃষ্টি বিনিময় করলো। ধ্রুব সেই দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে একদম ঐক্যর সামনে সটান হয়ে দাঁড়াল। ভদ্রতার বালাই ছাড়াই ঐক্যর কোল থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নিল আরশানকে। ঐক্য ভ্রু কুঁচকে চেয়ে দেখল শুধু। ধ্রুবর সাথে কোনরূপ বাক্যবিনিময় ছাড়াই একটা চেয়ার টেনে বসলো একপাশে।

আবৃতি সকলের দিকে এক পলক চেয়ে একটু সাইডে চলে গেল। যেন বাঁচতে চাইছে সবার কৌতুহল পূর্ণ দৃষ্টি থেকে। ধ্রুব সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিছু পল বাদেই সবাই পুনরায় যে যার মতো আবার আড্ডায় মেতে উঠে। ধ্রুব মাথা নিচু করে বসে থাকে।হালকা আসমানি রঙের চুড়িদারে আবৃতিকে অবিবাহিত মেয়েদের মতো দেখতে লাগছে। বিয়ের পর থেকে সবসময় আবৃতিকে শাড়িয়ে দেখে অভ্যস্ত ধ্রুব। শাড়ি পড়ে কোমরে আঁচল গুঁজে দিনের বেশিরভাগ সময় রান্নাঘরে কাটিয়ে দেওয়া আবৃতিকে দেখে না চাইতেও মুগ্ধতায় ভরে উঠতো ধ্রুবর দু’চোখ। কেন যেন এই পোশাকে আবৃতিকে দেখে ধ্রুবর ভেতরটা পুনরায় বিদগ্ধ হলো। হঠাৎ চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে আরশানকে বললো,

— আরশান। তুমি এখানে তোমার ফ্রেন্ডসদের সাথে খেলো। পাপা আসছি কেমন?

– আচ্ছা পাপা।

*

— আবৃতি?

অতি পরিচিত কন্ঠে নিজের নামটা শুনে আবৃতি চমকে উঠে পেছনে ফিরে। দেখে ধ্রুব একদম তার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে অপছন্দের মানুষটিকে নিজের এত সন্নিকটে অনুভব করে অজান্তেই আবৃতির ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠলো। ডিভোর্সের পর থেকেই ধ্রুবকে এড়িয়ে চলে আবৃতি। পালাতে নয় ওকে দেখলেই ওর ঘৃণ্য অতীতটা মনে পড়ে যায় আবৃতির। গা গোলাতে শুরু করে ভীষণভাবে। আবৃতিকে সম্পূর্ণ হতবাক করে দিয়ে ধ্রুব অকস্মাৎ বলে উঠল,

–তোমাকে শাড়ি ছাড়া অসম্পূর্ণ দেখতে লাগছে আবৃতি।

— শাড়ি জড়ানোর অধিকারটা তুমি নিজে কেড়ে নিয়েছ ধ্রুব। শাড়ি নামক বস্ত্রটা মিসেস ধ্রুব ওয়াহিদের জন্য মানানসই ছিল। আমি এখন শুধুমাত্র মিস আবৃতি খন্দকার। আর ডিভোর্সী মেয়েদের বদনে যে শাড়ি মানায়না!

আবৃতির নিরেট স্বর। কোন জড়তা নেই তাতে।
ধ্রুব থমকে দাঁড়িয়ে রইলো দুপল৷ টলটলে চোখে আবেগ মিশিয়ে শুধালো,

–আমাকে অনেক ঘৃণা করো তাইনা?

— উঁহু। আপনার প্রতি আমার সকল অনুভূতি বহু আগেই নিঃশেষ হয়েছে। তাছাড়া ঘৃণা তার প্রতিই আসে যার প্রতি আমাদের কোন প্রকার অনুভুতি থাকে। আপনি আমার ঘৃণা টুকুরও যোগ্য না ধ্রুব ওয়াহিদ।

আবৃতির সদা নির্লিপ্ত স্বর। ধ্রুব বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আবৃতি স্নিগ্ধ অথচ তেজদীপ্ত পেলব আননে। সূক্ষ্ম ব্যথারা কামড়ে ধরলো হৃদয়। আবৃতির সুশ্রী অবিচল মুখটাতে ধ্রুব হতবাক নেত্রে চেয়ে থাকে মূর্তির মতন।

— ধ্রুব?

অতি চেনা পরিচিত পুরুষ কন্ঠের গম্ভীর আওয়াজে আবৃতি, ধ্রুব দু’জনই চমকে উঠে। পেছন ফিরে দেখে ঐক্য সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে করিডোরের সামনে।
ঐক্য সামনে এগিয়ে আসে। পকেটে এক হাত গুঁজে থমথমে মুখে ধ্রুবর অস্থির মুখটা পরখ করে রাশভারী আওয়াজে বলল,

–এটা পাবলিক প্লেস ধ্রুব। এই স্থানে একজন নারীকে উত্যক্ত করা নিশ্চয়ই কোন ভদ্র পুরুষের কাজ নয়?

ধ্রুব উত্তেজিত কন্ঠে বলতে চাইলো,

— আবৃতি আমার স…

ঐক্য ধ্রুবকে দেয়না কথাটা সম্পূর্ণ করতে৷ নিরেট ঠান্ডা গলায় বলল,

— তোমার প্রাক্তন স্ত্রী ধ্রুব। মিস আবৃতি এখন তোমার প্রাক্তন৷ আর হতে পারে উনি কারো ভবিষ্যৎ স্ত্রী। তাই এটা মাথা রেখেই ওনার সাথে ট্রিট করবে আশা করি।

ধ্রুবর মুখের রক্ত সরে গেল সহসা। হতবাক চোখে থমকে তাকিয়ে দেখলো সটান হয়ে নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে থাকা ঐক্যকে। ওই কন্ঠে যেন কিছু একটা ছিল যা ধ্রুবকে মুহুর্তেই চুপ করিয়ে দিল। চেষ্টা করেও আর কোন শব্দ উচ্চারণ করতে পারলনা৷ কেন যেন ঐক্যর উপস্থিতি ওকে ভীত করে তুললো। কি তার কারণ জানা নেই ধ্রুবর!

চলমান……..

 

 

[ নোটঃ মনস্তাত্ত্বিক জনরার গল্পগুলো মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয়, আশা, আকাঙ্ক্ষা, আর সংঘাত নিয়ে লিখা হয়। এগুলোতে বাইরের ঘটনার চেয়ে মানুষের মনের ভেতরের জটিলতা বেশি ফুটে ওঠে।
১)চরিত্র বিশ্লেষণঃ মনস্তাত্ত্বিক গল্পে চরিত্রদের মনের গভীরে ঢুকে তাদের ভয়, আশা, আর লুকানো সত্য খুঁজে বের করা হয়। এদের চরিত্রায়ন খুবই জটিল আর বহুমাত্রিক হয়।
২) অনিশ্চয়তা আর টানাপোড়েন: এই গল্পগুলোতে প্রায়ই পাঠককে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা হয়। চরিত্ররা নিজেরাই হয়তো জানেনা তারা আসলে কী চায় বা কী করছে।
৩)সম্পর্কের জটিলতা: সম্পর্কের মধ্যে লুকিয়ে থাকা দ্বন্দ্ব, ভালোবাসা, ক্ষমতার লাগামহীন খেলা—এই সবকিছুই মনস্তাত্ত্বিক গল্পের উপজীব্য।
৪)চরিত্রদের মনের ভেতরের দ্বন্দ্ব, ভয়, আর লুকানো সত্য প্রকাশ পায়।সম্পর্কের জটিলতা, প্রেম, ক্ষমতা, আর প্রতিশোধের বিষয়বস্তুর জটিলতা গল্পগুলোর মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
৫) চরিত্ররা প্রায় নিজের সাথে লড়াই করে, সমাজের সাথে না।
★পাঠক হা হুতাশ করবেন না। লেখাগুলো বিস্তারিত এবং গভীরভাবে পড়ুন। আর আমাকে প্লিজ এটুকু স্বাধীনতা দিন যেন গল্পটার মূল থিম থেকে যেন আমি সরে না যাই। এই মনস্তাত্ত্বিক গল্প গুলো লিখা আর যুদ্ধ করা প্রায় সমান। তার উপর আপনাদের অনেকে যেভাবে আমাকে চাপে রাখেন আমি রীতিমতো ডিপ্রেশড হয়ে পড়ি। আজ অনেক বড় পর্ব দিয়েছি।তাই লেইট হয়েছে। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ❤️🥰

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x