গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (২৪)

পর্বঃ২৪

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

[গল্প চুরি করে,পেইজ, টিকটক বা ইউটিউবে নিজেদের নামে চালানো থেকে বিরত থাকুন।নতুবা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।⛔]

ঐক্যর গাড়িটা যখন আবৃতিদের পুরনো দোতলা বিল্ডিংটার সামনে ব্রেক কষে তখন গড়িতে দুপুর দুটো প্রায়। তেজস্বী সূর্য তখন খাড়া মাথার উপরে। রোদের তাপে উত্তপ্ত পিচ ঢালা রাস্তা। আবৃতি পেছনে তাকিয়ে দেখে ক্লান্তিতে বাচ্চাদুটো গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আবৃতি নিভৃতে মুচকি হাসলো তা দেখে। ঐক্য আবৃতির মৃদু হাসি লক্ষ্য করে নিজেও পিছু ফিরে। দেখে বিচ্চু দুটোতে একে অপরের সাথে জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়ে আছে। দু’জনে যে কিছুক্ষণ আগেই এক প্রস্থ খুঁটোখুটি করেছে এখন এদের দেখে তা বোঝার উপায় নেই। আবৃতি সিট বেল্ট খুলতে খুলতে মিহি স্বরে বললো,

— ঐক্য সাহেব ভেতরে আসুন। দুপুরে খাবারটা খেয়ে যাবেন।

ঐক্য মুখ খুলে কিছু বলবে এর আগেই আবৃতি ফের অনুরোধ করে বলে,

— প্লিজ না করবেন না৷ দুপুরের সময়টায় আপনি ওয়াফা আমার বাড়ির সামনে থেকে অভুক্ত চলে যাবেন। এটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক আমার জন্য।

— কিন্তু এভাবে কিভাবে? মানে…….

— কোন কিন্তু নয়। আপনার পক্ষ থেকে আমি দু’বার লাঞ্চের ট্রিট নিয়েছি। আর ওয়াফাও অনেক খুশি হবে। মা তো প্রায়শই বলে ওয়াফা বেবিকে একবার অন্তত যেন নিয়ে আসি বাসায়।

এদিকে ওদের কথাবার্তায় ওয়াফার সবে নেমে আসা নিদ্রা উবে যায়। তন্দ্রাঘোরে চোখ পিটপিট করে চেয়ে দেখে আরশান ওর কাঁধে মাথা রেখে হা করে ঘুমাচ্ছে। ওমনি দপ করে জ্বলে উঠে ওর হিংসুটে বাচ্চা মন। ছোট হাতটা তুলে একটা চাটি মারে আরশানের মাথায়। ঘুমন্ত আরশান কপাল কুঁচকে চোখ খুলে দেখে ওয়াফা সরু লোচনে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ঐক্য পিছু ফিরে স্মিত হেসে বললো,

— কি আপনাদের ঝগড়াঝাঁটির ম্যাচ আবার শুরু হয়ে গিয়েছে?

আবৃতি হেসে গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে পিছনের ডোর ওপেন করে ওদের দুজনকে নামায়। ওয়াফাকে কোলে তুলে বলে,

— আজ আপনার সুইটি আন্টির তরফ থেকে আপনাকে দাওয়াত করা হয়েছে। আপনি কি তা গ্রহণ করবেন?

ওয়াফা সজল চোখে আশা নিয়ে নিজের পাপার দিকে তাকায়। দৃষ্টিতে জানতে চায় পাপার অনুমতি আছে কিনা? ঐক্য ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। বললো,

— কি আম্মাজান প্রতিদিন তো আরশানের টিফিনে ভাগ বসান। আজ নাহয় একদম পেটভরে তার বাড়িতেই খাবেন।

ওয়াফা বুঝলনা এতকিছু। শুধু এটা বুঝলো আজ সে তার সুইটি আন্টির সাথে অনেক সময় কাটাতে চলেছে। ওর বাচ্চা মন সর্বদা যেই সময়টুকুর প্রতীক্ষায় রত।

.

আবৃতিদের বাড়িটা তিনতলা বিশিষ্ট। এই বাড়িটার নিচতলা তৈরী করে দিয়ে গিয়েছিলেন আবৃতির দাদা আনোয়ার খন্দকার। বাকি দুটো তলা আবৃতির বাবা আনিসুল খন্দকার আর ছোট চাচা মিলে গড়েছেন। কিন্তু আফসোস বাবা নামক মানুষটা বেশি দিন থাকতে পারেননি নিজে তোলা বাড়িটিতে। পাড়ি জমিয়েছেন স্থায়ী ঘরে।
নিচ তলা দুটে ইউনিট ভাড়া দেওয়া। তিন তলায় ওর ছোট চাচারা থাকেন দুই ছেলে নিয়ে। আর দোতলায় থাকে আবৃতিরা।

এক্য চোখ বুলিয়ে চারদিকে তাকায়। বেশ সুন্দর বাড়িটা৷ এদিকটায় এত কোলাহল বা শব্দ নেই। একদম নিরিবিলি প্রশান্ত পরিবেশ বিরাজমান। আবৃতি দোতলায় বাসার কলিং বেল বাজায়। জাহানারা বেগম তখন রান্নাঘরে ছিলেন৷ মেয়ে এসেছে মনে করে তস্ত পায়ে শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে দরজা খুলে দেন। দরজা খুলতেই বেশ অবাক হন তিনি। মেয়ে আর নাতির সাথে অপরিচিত একজন পুরুষ আর একটি পুতুলের মতো হৃষ্টপুষ্ট মেয়ে বাচ্চাকে দেখে প্রশ্নবোধক চাহনিতে মেয়ের দিকে তাকায়। আবৃতি মুচকি হেসে বলে,

— মা অতিথি এসেছে তোমার৷

আবৃতির মা বুঝলো তারা মেয়ের পরিচিত জন। অমায়িক হেসে দরজা থেকে সরে তটস্থ হয়ে বললেন,

— আসো তোমরা ভেতরে।

ঐক্য ভেতরে ঢুকে সলজ্জে সালাম দেয় ওনাকে। ওর হঠাৎ বেশ লজ্জা লাগছে। এভাবে খালি হাতে চলে আসাটা কেমন হলো? মিস আবৃতিও না! আবৃতি ওয়াফাকে সামনে এনে হেসে শুধালো,

— মা দেখতো চিনতে পারো কিনা?

ভদ্রমহিলা কতক্ষণ নিবিষ্ট মনে দেখলেন মায়ামায়া আদলের মেয়েটিকে। বাচ্চাটা চোখ পিটপিট করে ওনার দিকেই তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ কিছু মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে জাহানারা বললেন,

— ওয়াফা? আরশান যার সাথে রোজ ঝগড়া করে?

ভদ্রমহিলা সরল মনেই বলেছেন কথাটা। কিন্তু আরশান তা মানতে পারলো কই। তাইতো দপ করে জ্বলে উঠে বলে,

— আমি একদম ওয়াফার সাথে ঝগড়া করিনা৷ ওয়াফা পঁচা।ও সবসময় আমার সাথে ঝগড়া করে।

বেচারি ওয়াফা ভদ্রতার খাতিরে চোখ কটমটিয়ে চুপ করে থাকলো। নাহয় নির্ঘাত এখানে আবার যুদ্ধ সংঘটিত হতো।

আবৃতি হেসে উপরনিচ মাথা নাড়াল। ভদ্রমহিলা টুপ করে ওয়াফাকে কোলে তুলে নিল। চোখে একরাশ মায়া নিয়ে দেখলেন ওকে। মনে মনে ভাবলেন কেমন কঠোর মা হলে এত আদুরে বাচ্চাটির মায়া ছেড়ে চলে যেতে পারে। এ কেমন পাষন্ডী মা? ওনার আজ থেকে অনেক বছর পূর্বের কথা মনে পড়লো। বিয়ের ছয় বছরেও উনি গর্ভধারণ করতে পারছিলেন না ওভারিয়ান সিস্টের কারণে। এমনিতেই আবৃতির বাবা আনিসুল খন্দকারের সাথে ওনার প্রণয়ের বিয়ে। তার উপর পারিবারিক সম্পদের উত্তরাধিকার পাওয়ার তাগিদে শশুর বাড়ির চাপ ওনাকে মানসিকভাবে প্রচন্ড ভেঙে দেয়। সে সময় বিধ্বস্ত জাহানারার পাশে ঢাল হয়ে ছিলেন আনিস। হঠাৎ একদিন উপরওয়ালা মুখ তুলে চাইলেন।জাহানারা গর্ভধারণ করলেন। কিন্তু উপরওয়ালা ওনাদের খুশিকে দ্বিগুণ করে দিলেন যখন আল্ট্রাসাউন্ড করে যখন জানতে পারলেন একজন নয় বরং দুজন সন্তান ওনার গর্ভে বেড়ে উঠছে। সেদিন কোন কিছুর পরোয়া না করে উনি হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন। কত শত শুকরিয়া জ্ঞাপন করেছিলেন উপরওয়ালার প্রতি ওনাকে এই সুখটুকু দান করার জন্য। তারপর ওনার কোল আলো করে যখন আহান আবৃতি এলো নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হলো। ওদের বুকে নিয়ে মনে হলো এই দুজনের জন্য বুঝি উনি জীবনটাও হাসতে হাসতে বিলিয়ে দিতে পারবেন। এমন পরীর মতো দেখতে এত ছোট একটা বাচ্চাকে ফেলে কিভাবে থেকেছে ওই মা। বুক কি এক মুহুর্তের জন্যও কাঁপেনি?

— কোথায় হারিয়ে গেলে মা?

জাহানারা বেগমের ধ্যানচূত হয়৷ সামান্য হেসে চঞ্চল গলায় বললেন,

— আসো বাবা। এখানে বসো তোমরা।

ঐক্য সোফায় বসলো। জাহানারা বেগম ঝটপট চার গ্লাস সরবত নিয়ে আসলেন। দুপুরে খাওয়ার সময় হয়ে যাওয়াতে আর কোন পাকোয়ান আনলেন না সাথে৷ ঐক্য সরবত টুকু খেয়ে তৃপ্ত হলো৷ তেষ্টায় এতক্ষণ গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। জাহানারা বেগম ব্যস্ত কন্ঠে বললেন,

— বাবা ওদিকে বাথরুম। যাও হাতমুখ ধুয়ে আস। আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি৷

ঐক্য বিনম্র কন্ঠে বললো,

— প্লিজ আন্টি এত ব্যস্ত হবেন না দয়া করে। এমনিতেই এই সময় এসে আপনাকে খুব বিড়ম্বনায় ফেলে দিলাম।

— এভাবে বলোনা বাবা। তুমি আমার ছেলের মতো। আবৃতি মা তুই বাচ্চাদুটোকে ফ্রেশ করিয়ে নিয়ে আয় তো। অনেক বেলা হয়েছে। খিদে পেয়েছ ওদের। আমি যাই।

আবৃতি মাথা নাড়ল। ঐক্যকে উদ্দেশ্য করে ক্ষীণ স্বরে বললো,

— আপনি বসুন। আমি ওদের ফ্রেশ করিয়ে আনি।

ঐক্য স্বায় জানালো মাথা নাড়িয়ে। চোখ ঘুরিয়ে ছিমছাম বাসাটা দেখলো এক পলক। হঠাৎ চোখ আটকালো সামনের টি টেবিলে। কিছু একটা চোখে পড়তেই ঐক্যর মসৃণ ললাট গুটিয়ে গেল। টি টেবিলের উপরে একটা ফাইল আর সাথে দুটো ছবির কপি পাশাপাশি চাপা দিয়ে রাখা টিভির রিমোট দিয়ে। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক একটি বিষয় সেটা। কিন্তু ঐক্যর দৃষ্টি আর কপালে জমে উঠা স্বেদ জলের কণাগুলো দেখে একদমই মনে হচ্ছেনা ব্যাপারটা স্বাভাবিক কিছু। কেননা সিভি ফাইলের পাশেই জ্বলজ্বল করছে একজন ভদ্রলোকের ছবি। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে ছবির লোকটিকে ঐক্য খুব ভালো করেই চেনে।
ড.আরিফুল আদনান। ঐশীর মেডিকেল কলেজের লেকচারার। লোকটা সম্পর্কে যতটুকু ঐক্য জানে তা হলো লোকটা বিপত্নীক। একটা ছেলেও আছে শুনেছিল। আবৃতির বাসায় বিপত্নীক ড. আদনানের বায়োডাটা আর ছবি কেন থাকবে তা বুঝতে বুদ্ধিমান ঐক্যের কিঞ্চিৎ পরিমাণ অসুবিধে হলোনা। ঠিক এই জঘন্য ব্যাপারটা উপলব্ধি করেই ওর নিঃশ্বাস ভারী হলো। নিজের হৃদয় অলিন্দে এতদিনে বোনা স্বপ্নগুলো ধুলিষ্মাৎ হওয়ার শঙ্কায় কামড়ে ধরলো বুক। ও কি তবে দেরী করে ফেললো?

আবৃতি ওয়াফা আর আরশানকে ফ্রেশ করিয়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসে। সাথেও নিজেও একেবারে গোসল সেরে এসেছে ঝটপট। ওদেরকে দুটো চেয়ারে পাশাপাশি বসিয়ে দিয়ে আদুরে শাসনে বলে,

— বাচ্চারা তোমরা এখানে বসো। একদম ঝগড়া করবে না দু’জনে। কেমন? আমি দুই মিনিটে গোসল সেরে আসছি।

দু’জনে লক্ষী বাচ্চার মতন নিজেদের মাথা নাড়ালো। আবৃতি দেখলো ঐক্য এখনো ফ্রেশ না হয়ে সোফায় ঠাঁয় বসে আছে পূর্বের ন্যায়। আবৃতি এগিয়ে এসে মিহি স্বরে ডাকলো,

— ঐক্য সাহেব?

ঐক্যর পিলে চমকে উঠে বলে,

–হ… হ্যাঁ।

ঐক্য সামনে তাকাতেই চমকে উঠে সঠান দাঁড়ানো আবৃতিকে দেখে। সদ্য স্নাত আবৃতির পরনে একটা জারুল রঙা চুড়িদার আর সাদা ওরনা। মুখটাতে এখনো বিন্দু বিন্দু পানি জমে আছে। পিঠ বেয়ে নামা কেশরাশি হতে টপটপিয়ে পানির বিন্দুকণা ফ্লোরে পড়ছে। বোঝা যাচ্ছে ব্যস্ততার ছোটে নিজের চুলগুলোও ভাল করে মোছেনি সে। ঐক্য অজান্তেই মুগ্ধ হলো এই অতি সাধারণ অথচ ঐক্যর চোখে সর্বদা অসাধারণ নারীটির প্রতি৷ এই নারীটির সৌন্দর্য্য আগে কখনো পরখ করে দেখা হয়নি। নারীটির অসামান্য ব্যক্তিত্ব আর বুক ভরা মমতা দেখে ঐক্য পিছলেছে। কিন্তু আজ প্রথমবার আবৃতির রুপেও ঐক্যর দৃষ্টিতে মুগ্ধতা খেলে গেল! সবেগে কেঁপে উঠলো ভেতরটা। বিবশ হলো হৃদয় গহন!

ঐক্যর কোন হোলদোল না দেখে আবৃতি ফের বললো,

— ওদিকে ওয়াশরুম। ফ্রেশ হয়ে আসুন ভাল লাগবে।

ঐক্য নিজেকে ধাতস্থ করে মাথা ঝাঁকায়। আবৃতির দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে নেয়। হঠাৎ ভারী হওয়া পা দুটো টেনে ওয়াশরুমের দিকে যায়। ঐক্য যেতেই আবৃতি এগোলো রান্নাঘরের দিকে।
কি রান্না হয়েছে কে জানে? ভাবলো ওয়াফার জন্য ঝটপট কিছু একটা বানাবে ওর পছন্দের। কিন্তু রান্নাঘরে আসতেই আবৃতি অবাক হলো।
জাহানারা খুবই ব্যস্ত দেখাচ্ছেন রান্নাঘরে। ভাগ্য ভাল ছিল আজ বাসায় সবার জন্য গরুর মাংস, পাতলা টমেটোর টক আর বাসমতী চালের ভাত রেঁধেছিলেন। আহান কাল হসপিটাল থেকে স্যালারী পেয়েই বাড়িতে ভালমন্দ বাজার করে এনেছিল। চার কেজি গরুর মাংস, বড় গলদা চিংড়ী মাছ আর সাড়ে তিন কেজি ওজনের একটা মাঝারী সাইজের ইলিশ মাছও এনেছিল। ছেলের বেতনের টাকার সিংহ ভাগ এসব বাজারে খরচ করাতে অনেক গজগজ করেছিলেন তিনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বাজারগুলো না করলে অতিথিদের পাতে আজ কি দিতেন তিনি৷ মনে মনে ছেলের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে প্রফুল্লচিত্তে কড়াইতে তেল গরম করতে দিয়ে ইলিশ মাছের পিস গুলোতে মসলা মাখাতে লাগলেন। ইলিশ গুলো গরম গরম ভেজে দেবেন। ইশ তার বাড়িতে আজ পর্যন্ত কোন অতিথির জন্য এত অল্প আয়োজন করা হয়নি৷

–মা তুমি এত ব্যস্ত হচ্ছো কেন? উনি খুবই অমায়িক একজন মানুষ। আমাদের জন্য যা রেঁধেছ তাই দাও।

— কি যে বলিস না। ছেলেটা কি আর প্রতিদিন আমার বাড়িতে খেতে আসবে বল। ইশ যদি একটু কল করে জানাতি ওয়াফার জন্য আমার হাতের চিংড়ীর মালাই কারী করতাম৷

আবৃতি হেসে বললো,

— তুমি চিন্তা করোনা। ওর জন্য আমি একটা আইটেম বানাব। ওটা পেলেই ওর আর কিছু লাগবেনা।

— কি বানাবি?

— খেজুরের রসের শিন্নি। ওইদিন কি মজা করে খেয়েছে জানো। খাওয়া শেষে আবার হা করেছিল।

— আহারে!মেয়েটাকে এত মায়া লাগে। কি করে যে ওর মা এই বাচ্চাটাকে ছেড়ে যেতে পারলো। সংসার, বাচ্চার মায়া কি এদের আল্লাহ দেয়নি। শুনেছি ছেলেটা খুব ভাল।

আবৃতি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কাজ করতে করতে মলিন হেসে বললো,

— কেউ পেয়েও হারায় আর কেউ না পেয়ে গুমরে মরে।

জাহানারা বেগম চুপ করে গেলেন। বুঝলেন মেয়ের কথাটার ভাবার্থ। আবৃতি বলে গেল,

— যে মেয়ে গুলোর একটা সংসার করার শখ। তারা কেন যেন তা পায়না!

— এভাবে বলিস না মা। তোর সংসার হবে। আল্লাহ চাইলে তুই দ্বিতীয় বার নতুন করে একটা প্রকৃত সংসারের স্বাদ আস্বাদন করবি।

আবৃতি কিছু বললোনা। জাহানারার কথা এড়াতে বললো,

— মা তুমি এদিকটা দেখ। আমি ঝটপট শিন্নিটা বসিয়ে দিই।

— আচ্ছা শোন না মা।

— বলো।

— বেশি করে চাল নিয়ে নে। একটা বক্স ভরে ওদের বাসার জন্যও দিয়ে দিস৷

— দেখুন যা বলার খোলাখুলিই বলি। মিসেস ইরার পিজিক্যাল কন্ডিশন খুবই নাজুক। বেবির পজিশন ও ঠিক নেই। টোটালি ব্রিচ পজিশনে আছে বাচ্চাটা। এডিমা মানে হচ্ছে অতিরিক্ত পানি জমে গিয়েছে ওনার শরীরে। সাথে এক্লাম্পসিয়ার জটিলতা তো আছেই। তাই আই ওয়ান্ট টু সে বাচ্চাটার সার্ভাইব করার চান্স খুবই কম।

ধ্রুবর হাত পা জমে যাচ্ছে। ডাক্তারের বলা অকপটে বলা কথাগুলো ওর বুকে তীরের ফলার ন্যায় বিঁধছে। গা কাঁপছে ভীষণভাবে। ডক্টর তহমিনা নিজের প্রপেশনালিজম বজায় রেখে সাবলীলভাবে বললেন,

— ওনাকে কয়েকদিন হসপিটালে অবজারভেশনে রাখতে হবে। আমরা গতিবিধি বুঝে দেখি। যদি অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যায় তাহলে সি সেকশন করে ফেলতে হবে।

ধ্রব কাঁপা গলায় বললো,

— কিন্তু ডক্টর ইরার তো সবে সাতমাস।

— কিছুই করার নেই। ওনার প্লেসেন্টা অ্যাবরেশন (প্লেসেন্টা নিচে নেমে খুলে যাওয়া) । সাথে বেবি ব্রিচ পজিশনে বুঝতেই পারছেন। বেবিটা নিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় দেখছিনা। আর যদি অবস্থা ভাল থাকে তবে তো ভালোই। যথা সময়েই ডেলিভারী হবে। এখন এই ঔষধ গুলো খাওয়ান। নিন।

প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিয়ে বললেন ডক্টর তহমিনা।
ধ্রুব প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে নড়ে চড়ে উঠে দাঁড়াল। চেম্বার থেকে টালমাটাল পায়ে বের হয়ে অগ্রসর হলো ইরাকে জরুরী অবস্থায় যে কেবিনে এডমিট করা হয়েছে সেখানে। ভেতরে ইরা অচেতন হয়ে পড়ে আছে। পাশে ধ্রুবর মা বসে তসবী জপ করছেন বিড়বিড়িয়ে। কেবিনের সামনে এসেও আর ভেতরে কেন যেন আগাতে পারলোনা ধ্রুব। একটা ব্যাথাতুর শ্বাস ফেলে ভারী পা দ্রুত টেনে উদ্দেশ্যহীন বের হয়ে গেল হসপিটাল থেকে।

*

– মে আই কাম ইন ম্যাম?

ভেতর থেকে উত্তর এলো,

— ইয়েস কাম।

— হ্যালো ম্যাম।

ডক্টর তহমিনা ফাইলে মুখ গুঁজে বসে ছিলেন। মাথা তুলে দেখলেন ওনার কৃতী ছাত্র ড. আহান খন্দকার।

— আরে আহান যে। প্লিজ সিট৷

আহান বসতেই তিনি বললেন,

–তা কেমন চলছে ইন্টার্নিং লাইফ?

আহান মৃদু হেসে বললো,

— জি আলহামদুলিল্লাহ ভাল ম্যাম।

— আজ তো মনে হয় তোমার প্লেচমেন্ট গাইনি এন্ড অবস এ?

— জি।

— কোন প্রকার সমস্যায় পড়লে উইথ আউট হেজিটেশন আমাকে জানাবে।

আহান স্মিত হেসে মাথা নাড়াল। উশখুশ করে বললো,

— ম্যাম ক্যান আই আস্কড সামথিং?

— ইয়াহ শিওর।

— ম্যাম কেবিন নাম্বার ৩০৫ এর পেশেন্টার সমস্যা গুরুতর মনে হচ্ছে। আমি এই মাত্র রোটেশনে গিয়েছিলাম।

ড. তহমিনা নাকের ডগার চশমাটা ঠেলে গম্ভীর গলায় বললেন,

— মেয়েটার কান্ডিশন বেশ সংকটাপন্ন তাতো দেখতেই পাচ্ছ। যে কোন কিছু হয়ে যেতে পারে। মেয়েটাকে দেখে অনেক মায়া লাগে৷ মনে হয় কোন কিছু নিয়ে খুব ডিপ্রেশনে আছে।

আহান থমথমে মুখে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

— ম্যাম কর্মফল জিনিসটা না খুব খারাপ। আমরা মানুষরা মনে করি পাপ করলেই বা কি? কিন্তু এটা ভুলে যাই স্বীয় বিবেক হলো সবচেয়ে ভয়ংকর! যার দংশনে ক্ষণে ক্ষণে তড়পে মরতে হয়!

এই বলে আহান প্রস্থান নিল। ড. তহমিনা বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে ওর গমন পথে চেয়ে রইলেন৷ কি বললো ছেলেটা?আর কাকে উদ্দেশ্য করে বললো?

.

ধ্রুব ফুটপাত উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে। গন্তব্য ঠিক কোথায় সে নিজেও অবগত নয়। হঠাৎ অদূরে মসজিদ হতে মুয়াজ্জিনের সুমধুর কন্ঠে আজানের ডাক ভেসে আসে। সারাজীবন নামাজে গাফিলতি করা ধ্রুবর আজ কি যেন হলো। অবচেতন মনে পা ঘুরিয়ে চললো সৃষ্টিকর্তার নিবিষ্ট আরাধনায়। নামাজ শেষ করে মোনাজাতে ধ্রুব ঝরঝরিয়ে কাঁদলো। নিজের করা পাপ গুলোর প্রায়শ্চিত্ত ও কোনভাবেই নিজের অনাগত সন্তানকে হারিয়ে করতে চায়না। একজনকে ধ্রুব না চাইতেও হারিয়ে ফেলেছে। ছাড়তে হয়েছে তার উপর নিজের পিতৃত্বের অধিকার৷ আর না৷ ধ্রুবর মাঝে আর সামান্যতম কিছু হারানোর শক্তি অবশিষ্ট নেই। একদম নেই। আল্লাহ’র কাছে নাকি সবকিছুর মাফ পাওয়া যায়। তিনি রহমান, তিনি দয়ালু। হয়তো তিনি এই পাপী বান্দার প্রতি একটু দয়া করবেন।

চলমান…

[ আসসালামু আলাইকুম পাঠক। আজ অনেক বড় পর্ব দিয়েছি। প্লিজ সবাই মন্তব্য করবেন। আমি দেখতে চাই গল্পটার আসল পাঠক কয়জন। আর প্লিজ ২৫০০ রিয়েক্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। পেইজের রিচ আজ হুট করে কমে গিয়েছে। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ❤️🤍]
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x