পর্ব:০৮
লেখিকা:নুসরাত পুতুল
মায়ের শেষ ডাকটি যেন ধারালো কোনো অস্ত্র হয়ে এসে বিদল আমার হৃদয়ের গভীরে। পিছন ফিরে তাকাবার সাহসটুকুও আর অবশিষ্ট রইল না। তার আগেই চোখের কোণে জমে থাকা জলেরা বাঁধ ভেঙে টপটপ করে ঝরে পড়ল।
হঠাৎই মা পেছন থেকে এসে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর শুরু হলো তাঁর কান্না—এক নির্মম, হৃদয়বিদারক কান্না। সেই কান্নার প্রতিটি ধ্বনি যেন প্রতিধ্বনিত হয়ে আমার বুকের ভেতর র*ক্তক্ষরণ ঘটাতে লাগল। আমিও আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। মায়ের বুকের ভেতর মুখ গুঁজে শিশুর মতো কেঁ’দে উঠলাম।
মা আমার কপালে একটি ছোট্ট চুমু এঁকে দিয়ে ভাঙা গলায় বললেন,
” ভালো থাকিস। বড়রা যা বলে মেনে চলবি। মন দিয়ে লেখাপড়া করবি।
তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
” ঠিকমতো খাস না, তাই না? মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে। নিয়ম করে খাবি। আর বাবারর দিকে খেয়াল রাখবি।
আমি বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। যে মানুষটির কারণে তাঁর নিজের সংসার ভেঙে গিয়েছে, তাকেই আবার যত্নে রাখার উপদেশ দিচ্ছেন, সত্যি আশ্চর্য।
মায়ের হৃদয় যে কত বিশাল, সে কথা বুঝবার মতো বয়স তখনো হয়নি আমার।
তবু বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার জেগে উঠল।
আরও কত কথা বলে, কত উপদেশ দিয়ে, অশ্রুসিক্ত চোখে মা আমাকে বিদায় দিলেন। ভারাক্রান্ত মন আর ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে আমি বিদায় নিয়েছিলাম।
মনমরা হয়ে উঠে বসলাম বাসে। সারা পথ একটি শব্দও করিনি।
বাড়ি ফিরেও যেন নীরবতার এক অদৃশ্য দেয়াল আমাকে ঘিরে রাখল। সেদিন মেডাম পড়াতে এলে বই খুলিনি, পড়তে যাইনি মেডামের সামনে, ।
রাতে খাবারটা ও খাইনি আর।
অভিমানে, শোকে, না-বলা কষ্টে গুমরে গুমরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
অদ্ভুতভাবে সেদিন নাদিম ভাইও কিছু বলল না। অন্য দিন হলে সামান্য কারণেই দু-একটা ধমক জুটতই। সেদিন সে-ও নীরব, কোনো ধমক দেয়নি আমায়। বিষয়টা খেয়াল করলাম আমি।
পরদিন সকালে স্কুলে গেলাম। মনটা খানিকটা হালকা। নিজেকেই বুঝ দিলাম,
যখন খুব মন চাইবে নাদিম ভাইকে বলব মায়ের কাছে নিয়ে যেতে। সে নিশ্চয়ই নিয়ে যাবে।
এই ছোট্ট আশাতেই মুখে একফোঁটা হাসি ফুটে উঠল।
স্কুল ছুটি হলে দেখি ভাইয়া গাড়ির দিকে না গিয়ে হাঁটা ধরেছে বাড়ির পথে। বিস্মিত হয়ে বললাম,
“হেঁটে যাব? পৌঁছাতে তো অনেক সময় লাগবে!
সে গম্ভীর গলায় বলল,
” চুপচাপ হাঁট। বেশি কথা না।
রাগে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। সকালে তো বাবাকে নিজ চোখে টাকা দিতে দেখেছি। তাহলে হেঁটে কেন? সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেললাম,
“বাবা যে টাকা দিলেন,টাকা কী করলে?
সে কপাল কুঁচকে তাকাল আমার দিকে। ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের হাসি।
” আমার কাছে জবাব চাইছিস? দিব এক চড়।
ইচ্ছে হলে আয়, না হলে দাঁড়িয়ে থাক। বেশ বড় হয়েছিস দেখছি , আমার কাছে জবাব চাইছিস এটুকু হয়ে,
আমি আর কিছু বললাম না। ভেতরে ভেতরে আ*গুন জ্ব*লতে লাগল, আর পা দুটো আপন গতিতে চলতে থাকল।
বিকেলে লিভা মেডাম এলেন। পড়ার মাঝখানে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,
” কাল কী হয়েছিল? পড়তে বসোনি কেন?
..মায়ের কাছে গিয়েছিলাম,
এই গোপন কথাটি এখনো কেউ জানে না। দ্বিধায় পরে গেলাম।সত্যি টা কি বলব মপডামকে?
না না, ঠিক হবে না
মিথ্যা বললাম
” এমনি,
বললাম মাথা নিচু করে।
তিনি মৃদু হেসে বললেন,
“মিথ্যে বলছো। সত্যি বলো, কী হয়েছে? তেমার দাদি বকা দিয়েছিল? নাকি অন্য কিছু?
শেষ পর্যন্ত আর গোপন রাখতে পারলাম না। মিথ্যা ধরে ফেলেছে মেডাম। সত্যি বলা ফরজ এখন।
ফিসফিস করে বললাম,
“মায়ের কাছে গিয়েছিলাম।
তিনি যেন চমকে উঠলেন। যেন অপত্যাশিত কিছু শোনলেন এই মুহুর্তে ।
“কী বলছো? মজা করছো ছামির? কি আবোল তাবোল বলছো। এতদূর তুমি একা যাবে কি করে?
” মজা কেন করব, আর আমি একা যাইনি তো।
কিন্তু আমার মামা বাড়ি যে দূরে তা আপনি কি করে জানলেন? আমি তো বলিনি এ বেপারে এর আগে।
মেডাম থতমত খেয়ে গেলেন।
না মানে শোনেছিলাম হয়তো আগে,
” তা তুমি একা যাওনি তো কি তোমার বাবা নিয়ে গিয়েছিলেন?
“না না বাবা নিয়ে হায়নি। আমি গিয়েছি সে কথা তো বাবা জানেও না।
” তাহলে?
” , নাদিম ভাইয়া নিয়ে গিয়েছিল।।
আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। চোখে যেন অদ্ভুত এক ভাব। তারপর স্বাভাবিক গলায় বললেন,
— আচ্ছা, এবার পড়ায় মন দাও।
সেদিনের পড়া শেষ করে তিনি চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টির সেই অদ্ভুত ছায়া যেন রয়ে গেল মনে।
রাতে বাবা ফেরার আগেই ছোট ফুফু এলেন আমাদের বাড়িতে। সঙ্গে ঝুমুর ও।
ফুফুর মুখ ভার, যেন কোনো অঘটনের পূর্বাভাস।
একটু পর ঝুমুর এগিয়ে এসে কয়েকটি চকলেট বাড়িয়ে দিল।
” তোমার জন্য এনেছি।
আমি গম্ভীর গলায় বললাম,
‘ লাগবে না।
সে অবাক হয়ে বলল,
” কেন? কত শখ করে এনেছি
আমি ভান করা রাগে বললাম,
“আমি তো তোর বড়। চকলেট দেওয়ার কথা আমার।
আমার কথা শুনে সে হেসে গড়িয়ে পড়ল। তার সেই খিলখিল হাসি বিদখুটে লাগলো আমার কাছে
আমি নাদিম ভাইয়ের মতো ভাব নিয়ে তাকে অনুকরণ করে বললাম
” ছাগলের মতে হাসবিনা,
এতে হাসির শব্দ আরও বাড়লে,
কপাল কুঁচকে বললাম
” থামাবি হাসি? নাকি দিব এক চর? ।
সে হাসি কিছুটা থামিয়ে তারপর বলল,
” বড় হয়ে আমি তোমার বউ হব। তখন অনেক চকলেট এনে দেবে আমায়, কেমন? এখন আমার দেওয়া চকলেট গুলো রাখ
আমি হতভম্ব।
” তোকে কে বলল, বড় হয়ে তুই আমার বউ হবি? ?
সে লজ্জা মাখা গলায় বলল,
“সে সব জানার দরকার নেই তোমার। বউ হব মানে হব।
বলেই দৌড়ে চলে গেল।
ঠিক তখনই বাবা ফিরলেন। বসার ঘরে দাদি, ফুফু, বাবা, সবার মুখে গম্ভীর ছায়া।
ফুফু কঠোর গলায় ঝুমুরকে বললেন,
” দুই নবাবকে ডেকে আনো।
আমাকে আর নাদিম ভাইকে ডাকা হলো। দাদি মিনতি করে বললেন,
“ছোট মানুষ, ছেড়ে দে। বেশি কিছু বলিস না।
কিন্তু ফুফুর মুখের কঠোরতা আরও গাঢ় হলো।
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। আবার কী ঘটতে চলেছে? কী ভুল করেছি আমরা? মনে করতে চেষ্টা করলাম.
কোনো অপরাধ কি সত্যিই করেছি?
কিছুই মনে পড়ল না।
তবু এই নীরবতার ভেতর যেন ঝড়ের পূর্বাভাস লুকিয়ে আছে।