পর্ব:১০
লেখিকা:নুসরাত পুতুল
ডি*ভোর্স পেপারটা রেখে দিল রুমি।
এমন হুটহাট সাইন করবে না সে। একবার কথা বলে নিবে নিজের স্বামীর সাথে। কিন্তু বাড়িতে ভাই ভাবিকে বলে যাওয়া যাবে না। বন্ধু মতো ভাবিকে ইদানীং ভয় পেতে শুরু করেছে রুমি।
যে ভাবি আগে তার সাথে গল্প করে কাটিয়ে দিতে পারতো সারা দিন। যত্ন করে মাথায় তেল দিয়ে দিতো। সে ভাবি যেন এখন তাকে সহ্যই করতে পারে না৷
ইদানীং ভারির থেকে আড়ালে থাকতেই পছন্দ করে রুমি। গা ডাকা দিয়ে থাকতে চায় ভাবির থেকে।
সে ভাবির সামনে দিয়ে ছামিরের বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া যেন একটা কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাড়িয়েছে রুমির পক্ষে ।
কি করবে কি ভাবে যাবে, সে সব ভাবনায় যখন মুজগুল। তখন হঠাৎ মনে পরলো।
শুক্রবার ভাবির ভাইপোয়ের সুন্নতে খাতনার দাওয়াত সকলের।
সেখানে যাবে না রুমি৷ যে করে হোক বুঝিয়ে ভাই ভাবিকে পাঠাতে হবে। ভাবি মনে হয়না জোর করবে তেমন কিন্তু ভাই তো তাকে রেখে যেতে চাইবে না। তবুও যে করেই হোক ভাইকে বুঝাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।
কিন্তু শুক্রবারের আরও দু দিন বাকি।
এ দুই দিন অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই আর।
____________
শাড়ি পরে তার উপর বোরকা পরে নিয়েছে হাসনা বেগম।
বাঙালি মুসলিম নারীদের অন্যতম পোশাক এটি। যতো সাজগোছ করুক না কেন ভিতরে। কোথাও বের হওয়ার সময় নিজেকে পর্দার ভিতর ডেকে রাখতে অব্যস্ত তারা
বোরকা পরে লিহাব সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো
” কই হলো তোমার? আমি তৈরি হয়ে গেছি।
” হ্যা আমার হয়েছে, রুমি কোথায়?
” তা আমাকে কেন জিগ্যেস করছো? নিজে গিয়ে দেখে আসো।
সে কি ঘর থেকে বের হয় নাকি? আমার সামনে আসলে তো আমি খেয়ে নিব তাকে, যদি কোনো কাজ করতে বলে ফেলি। তাই আমার সামনেই আসে না।
লিহাব বিরক্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
রুমির দরজা সামনে গিয়ে ডাকছে,
” রুমি, কই তারাতাড়ি কর, দুপুর হয়ে যাচ্ছে তো।
বলতে বলতে রুমির ঘরে ডুকলো।
সে তখনও শুয়ে আছে তনিমাকে নিয়ে।
লিহাবকে দেখে নড়েচড়ে উঠে বসলো।
লিহাব অবাক হয়ে বললো
” সে কি কান্ড, এখন ও রেডি হস নাই তুই?
” না ভাইয়া আমি যাব বা।
” কিন্তু কেন?
” আমার শরীরটা বেশি ভালো লাগতেছে না। তোমরা যাও।
” তা কি করে হয়। তোকে রেখে আমরা কি ভাবে যাই। একা বাড়িতে বাচ্চা নিয়ে কি করে থাকবি?
আমাদের তো আসতে কাল বিকেল হবে,
” সমস্যা নেই ভাইয়া যাও। আমি থাকতে পারব।
” না তা হয়না। তোকে রেখে আমি যেতে পারব না।
তাহলে আমিও যাব না,
” অমন কথা বলো না। ভাবি রাগ করবে। পা*গলামু করো না তোমরা যাও।
হাসনার ডাক পরলো পাশের রুম থেকে।
” কি হলো যাবে না নাকি তেল সিন্ধুর মেখে নিয়ে যেতে হবে।
লিহাব বেরিয়ে গেলো রুমির ঘর থেকে।
হাসনাকে উদ্দেশ্য করে বললো
এ ভাবে বলছো কেন?
” তো কি করবো? , জানা ই তো আজ দাওয়াত আছে এখন নাটক করে বলতাছে ক্যান যাইব না।
” শোনতে পাওনি বলছে শরীর খারাপ লাগতেছে।
” এগুলা সব মিথ্যা কথা।
লিহাব আর কথা বাড়ালো না। এখানে থাকলেই ঝামেলা বাধাবে হাসনা। ইদানীং যে বউটার কি হলো। বুঝে না সে।
রুমিকে বলে গেলো যেন সাবধানে থাকে।
রুমি দুপুরে গোসল করে তৈরি হয়ে নিলো।
চোখে গাঢ় কাজলের প্রলেপ দিতেও ভুলল না।
এর পর তনিমাকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো সেই বাড়ির উদ্দেশ্যে।
প্রায় ঘন্টা দেড়েক পর বেলা আড়াইটার দিকে এসে পৌঁছে গেল শশুর বাড়ি।
শুক্রবার আজ।
সিয়াম বাড়িতেই থাকবে। তাই আর কোনো চিন্তা নেই।
রুমি ধীর পায়ে এগিয়ে আসতেছে বাড়ির দিকে।
বাড়িতে পা রাখতেই দেখা হলো ঝুমুরের সাথে। দেখে মনে হচ্ছে কোথাও বের হবে বাইরে। সুন্দর করে সেজেগুজে আছে মেয়েটা।
রুমিকে এক পলক দেখেই ঝুমুর দৌড়ে ভিতরে চলে গেলো।
মামি মনি এসেছে, ছামির ভাইয়া তোমার মা এসেছে দেখ দেখ।
সেখানে সকলেই উপস্থিত ছিল।
ঝুমুরের কথায় টনক নরলো সবার মাঝে ৷।
ইতোমধ্যে রুমি এসে উপস্থিত হয়েছে রুমে।
যে যার যায়গা থেকে ঘুরে তাকালো।
সিয়াম ছামিরের বাবা বলে উঠলো তুমি এখানে?
বাবার কথায় মা তখন মুচকি হাসলেন,
বাবার কথার জবাব না দিয়ে সকলের দিকে তাকিয়ে বললো,
” সবাই সাজগোছ করে আছে নতুন পোশাক পড়ে আছে। কোথাও বের হবে নাকি? মা কেমন আছেন?
ছোট আপা আপনি কবে আসলেন?
ছোট ফুপু ভ্রু কুঁচকে বলল,
” এই মহিলা এখানে কি করতে এসেছে?
ভাই তুমি কি ডি*ভোর্স লেটার পাঠাওনি?
” হুম , পাঠিয়ে দিয়েছি তে আরও কদিন আগেই,
” এই এখানে কেন আসলে?
” তোমার সাথে কথা আছে আমার,
” আমার কোনো কথা নেই তেমার সাথে,
” ভিতরে চলো প্লিজ শোনো আমার কথা।
বলে মা যখন বাবার হাতটা ধরলো বাবা তখন এক হেঁচকায় ছাড়িয়ে নিল।
” ধ্যাত। কি বলবে এখানে বলে।
তুমি আমার প্রাক্তন স্ত্রী। আমার শরীরে টাচ করার অনুমতি তোমায় কে দিল?
মা হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,
” আমি এখনও সাইন করিনি ঐ পেপারে।
” আমি করে দিয়েছি। হিসাব মোতাবেক আমার তরফ থেকে তালাক প্রাপ্ত স্ত্রী তুমি। সুতরাং কিছু বলার থাকলে বলে বিদায় হও এখান থেকে
” দেখ আমাকে বুঝার চেষ্টা করো। কি অপরাধ আমার বলে আমাকে,
দেখ তোমার মেয়ে,
তাকে একবার কোলে নাও। তার মুখের দিকে তাকাও একবার। তার দিকে চেয়ে অন্তত আমায় তারিয়ে দিও মা। তাকে বাবার আদর থেকে বঞ্চিত করো না।
বলেই চোখের পানি ছেড়ে দিল মা।
বাবা চুপ করে আছে দেখে ছোট ফুপু ফেড়ন কাটলো।
” এখানে কি নাটক করবে নাকি? ঐ দিকে গাড়ি এসে পরেছে সেই কখন।
দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।
বাবা মায়ের দিকে তাকালো না,
না তাকিয়ে বললো,
” এখান থেকে চলে যাও। আজ আমার বিয়ে।
তোমার সাথে আমার আর কোনে সম্পর্ক নেই।
বলেই এখান থেকে চলে গেলেন বাবা।
মা নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
যেন এই মাত্র একটা ঝর এসে বয়ে গেলো তার উপর থেকে।
তনিমাকে কোলে নিয়ে দাড়িয়ে আছে মা। চোখ থেকে পানি পরছে না এখন আর। যেন সকল পানি শুখিয়ে মরুভূমি।
ফুফু সকলকে তাড়া দিল তারাতাড়ি করার জন্য। সকলে নিজের কাজে ব্যস্ত।
মা কে এখানে রেখেই সকলে চলে গেলেন বাবার দ্বিতীয় বিয়ে করাতে।
আমি আর দাদি বাড়িতে,
মা এখানেই ঠাই দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় আধঘন্টা।
আমিও একই ভাবে দাড়িয়ে ছিলাম মায়ের দিকে তাকিয়ে।
তনিমার কান্নার শব্দে মায়ের শরীর কেঁপে উঠে।
তার দিকে তাকিয়ে থেকে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। যাওয়ার আগে আমার দিকে তাকিয়েছিল একবার।
মুখে কিছু বলেনি আমায় আজ আর। যে খানি কথা চোখে চোখে হয়েছিল।
মা চলে গেলে আমি বেরিয়ে পরি ঘর থেকে।
মনটা বড়ই উদাসিন লাগছে
__________
পরন্ত বিকেলের বাতাসে বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে আছে একরা মহিলা।
দার থেকে সে দৃশ্য দেখে মলিন হাসলো একজন লোক।
কিছুক্ষণের মধ্যে মহিলাটি দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে।
রুমি ছিল দাঁড়িয়ে। মন মানছে না। তাই লেকের পার এসেছিল একটু। সন্ধ্যা নেমে এসেছে প্রায় , তাই দাঁড়িয়ে না থেকে এসে বাসে চরে বসলো।
সমস্ত টা রাস্তা সে নিজেকে বুঝিয়েছে।
মানিয়ে নিতে চাইছে ভাগ্যকে। কিন্তু মন মানতেছে না।
গলা বয়ে আসছে তার।
নাড়ি গিয়ে তালা খোলে নিজের রুমে চলে গেলো।
মেয়েটা কাঁদছে, বিছানায় পরে। রুমি বসে আছে তার পাশে, মেয়ের কান্না যেন তার কানে পৌঁছাতে পারলো না।,
বেশ খানিকক্ষণ কেঁদে ঘুমিয়ে গেলো তনিমা।
রুমির হুস ফিরলো এবার। মেয়েকে ছু মেরে কোলে তুলে নিল। চিতকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করলো তার। কাদলো না তবুও।
তনিমাকে আগের ন্যায় শুয়িয়ে দিয়ে বাথরুম থেকে অজু করে আসলো।
ডি”ভোর্স পেপার টা নিয়ে টেবিলের সামনে বসে পরলো।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে, এমনই এক সন্ধ্যায় সিয়ামের সাথে বিয়ে হয়েঢ়িল তার।
ঘড়ির কাটায় ৬ টা বেঝে ৪৮ মিনিট।
রুমি অপেক্ষা করছে ৭ টা কখন বাজবে।
কিছু বিচ্ছেদ ঘটা করে করা উচিৎ। সেই জন্য অপেক্ষা। ঘড়ির কাটায় যখন ৬:৫৯। রুমি কলম টা তুলে নিল হাতে।
এবার সাইন করে দিবে এখানে।
যে চায়না সেখানে জোড় করতে নেই।
কাগজে কলম ছুয়াতেই দরজায় কেউ শব্দ করলো। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে দরজার উপার থেকে।
রুমির হাতটা থেমে গেছে। ভাই ভাবি তো কাল আসবে। তাহলে এ সময় আবার কে