Story: You And I(01)

— ভাইয়া বা’সর করবা না? আজকে না আমাদের বা’সর…।” কথাটা শেষ করার আগেই ১৫ বছর বয়সী কিশোরী মেয়েটার গালে শক্তপোক্ত একটা থাপ্পর পরে। থাপ্পর খেয়ে মেয়েটার মাথা যেন ভনভন করে উঠে। গালে হাত দিয়ে ছলছল চোখে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাগী গম্ভীর পুরুষটার দিকে তাকায় শিতুল। কান্নামাখা কন্ঠে কিছু বলার আগেই ওপাশের ব্যাক্তি তড়িৎ বেগে এসে তার গলা চেপে ধরে শক্ত করে।

রাগী কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলে হিমাদ্র,
— তুই! তুই! তোর কারণে সব হয়েছে। তুই আমার রিলেশনের ব্যাপারে সবাইকে বলে দিছিস শিতুল। তোর কারণে আমি ওকে হারিয়েছি। তুই এমন করলি কেন তুই?”

প্রথম কথাগুলো রাগী কন্ঠে বললেও শেষের কথাটুকু মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে বলে।শিতুল ভয়ে ভয়ে হিমাদ্রর চোখে তাকাতেই জমে যায়। চোখ লাল হয়ে আছে রাগে। হাতের পেশিগুলো ফুলে ওঠেছে।

— বল তুই এমন কেন করেছিস? কি ক্ষতি করেছি আমি তোর?” কথাটা বলেই আগের তুলনায় আরো জোরে শিতুলের গলাটা চেপে ধরে। শিতুলের মনে হলো দমটা এক্ষুনি আটকে আসছে। শ্বাস নিতে পারছে না। ছুটার জন্য ছটফট করছে। চোখের কর্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরে। বিরবিরিয়ে কিছু বলতে চায় কিন্তু হিমাদ্র এমনভাবে গলা চেপে ধরেছে যে কিছু বলতেও পারছে না।

হিমাদ্র আবারো বলে,
— বাসর করবি তুই? বাসর! এই বাসরের কি বুঝিস তুই? তারচেয়ে বড় কথা আমি তোকে আমার বউ হিসাবে মানি না আর কখনো মানবোও না। নিজের চেহারা দেখছিস আয়নায়। কি আছে তোর মাঝে? খবরদার আমার বউ হওয়ার চেষ্টা করবি না। একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ আমি শুধু একজনকেই ভালোবাসি আর সেটা হলো মুসকান। আমার লাইফে তোর কোন জায়গা নাই আর না আমি তোকে জায়গা দিতে চাই। তুই আমার সৎ চাচাতো বোন।বোন হয়েই থাকবি বউয়ের অধিকার ফলাতে আসবি না। তুই আমার বাবার সৎ ভাইয়ের মেয়ে। আপন চাচাতো বোনও না যে তোর সাথে আমি ভদ্রতার খাতিরে ভালো ব্যবহার করবো। সো নিজের লিমিটের মধ্যে থাকবি। আর আমার সামনে খবরদার আসবি না। তোর ওই সো কল্ড চেহারা আমি দেখতেও চাই না। তুই কই যাবি বা থাকবি সেটা আমার দেখার বিষয় না। তুই আমার রুমে থাকতে পারবি না। তোর কোন জায়গা নেই আমার রুমে। বুঝতে পেরেছিস তুই। আমার কথা কি কান দিয়ে গেছে তোর? কি বলছি বুঝতে পেরেছিস? অবশ্য তোর কাছে থেকে আর কিই বা আশা করা যায়। অথচ কথার ধরন দেখলে মনে হয় কোথাকার পিএইচডি করা মানুষ। “

একদমে কথাগুলো বলে থামে হিমাদ্র। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। ২৩ বছরের জীবনে এই প্রথম এতো রেগে গেছে সে। তার ভালোবাসার মানুষ থেকে সে আলাদা হয়ে গেছে তাও এই স্টুপিড মেয়ের জন্য কথাটা ভাবতেই রাগে তার সবকিছু ধ্ব-ংস করে দিতে মন চাচ্ছে। তারমধ্যে আবার যখন মনে পরছে এই বাচ্চা স্টুপিডের সাথে তার বিয়ে হয়েছে তখন মন চাচ্ছে একদম মে’রে ফেলতে। নিজের বাবার উপর উঠা রাগ, মায়ের উপর উঠা রাগ সমস্তটা গিয়ে পরে কিশোরী শিতুলের উপর।রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তার। শিতুলের গলা ছেড়ে মুখ চেপে ধরে শক্ত করে। শিতুলের এবার মনে হলো তার মুখ ভেঙে যাচ্ছে। মুখের ভিতর তরল পদার্থের আভাস পায় সে।চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পরছে। হিমাদ্রর বলা বেশিরভাগ কথাই তার কিশোরী মস্তিষ্কের উপর দিয়ে গেছে। তার কাজিনদের বলতে শুনেছিল আজকে তাদের বাসর রাত তাইতো কৌতুহল দমাতে না পেরে হিমাদ্রকে এই কথা বলেছিল। কিন্তু এই কথার বিনিময়ে যে এতো কিছু হবে এটা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি সে।

দরজা ধাক্কানোর শব্দে হিমাদ্র শিতুলকে ছেড়ে দেয়। ছাড়া পেয়ে শিতুল বড় বড় করে শ্বাস নেয়। এতোক্ষণ যেন ভাবছিল এই বুঝি তার আয়ু শেষ ‌। হিমাদ্র গটগট পায়ে দরজা খুলে দেখে তার একমাত্র শা’লা দাঁড়িয়ে আছে হাতে ক্যামেরা নিয়ে।
হিমাদ্রকে গম্ভীর মুখে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শাহাব দাঁত কেলিয়ে হাত নেড়ে ” হাই ” বলে।শাহাব শিতুলের জমজ ভাই। শিতুল থেকে সে দুই মিনিটের বড়। দু’জনে সারাদিন ঝগড়া করলেও একে অপরের প্রতি অনেক টান।

হিমাদ্র কিছু না বলে বিরক্তি চোখে তাকিয়ে আছে। শাহাব হিমাদ্রকে একপলক দেখে নিয়ে হালকা কেশে নেয়। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
— আসলে দুলাভাই কি হয়েছে বলুন তো জীবনে প্রথমবার বোনের বিয়া দিলাম তারউপর আবার নিজেও বিয়া করি নাই সেজন্য আপনার বাসর ঘরে আসছি ব্লগ করার জন্য। যদিও আমি দর্শকদের বলেছিলাম আজকে কীভাবে হাগতে হয় সেটার সঠিক পদ্ধতি দেখিয়ে দিবো কিন্তু মাঝখান দিয়ে আপনার বিয়েটা প্যাঁচ লাগিয়েছে। যাইহোক সরেন তো আপনি।”
কথাটা বলেই হিমাদ্রকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হিমাদ্রর হাতের নিচে দিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। হিমাদ্র বিরক্তিতে মাথা ঝাঁকায়। এরা ভাই-বোন মানেই ঝামেলা।

শাহাব মাথা উঁচিয়ে জোরে ডাক দেয়,
— ও চিকার মা কই তুই!”

শিতুল কান্নামাখা গলায় বলে,
— এইযে এখানে আমি ব্যাঙের ছাও।

— ওই চিকার মা কান্দস ক্যান? ওরে আল্লাহ তোর গালে দেখি থাপ্পরের দাগ। এক মিনিট। খাঁড়া আমি ভিডিও করতাছি।

— হ্যালো গাইস। আমি আপনাদের সবার প্রিয় ব্যাঙের ছাও। আমার ব্লগে আপনাদের সবাইকে জোনাকির পুটকির আলোর সুস্বাগতম। আপনারা এখন দেখবেন সাপের মামাতো ভাই কুইচ্চা চ্যানেলের ব্লগ। তো আপনাদের এখন দেখাবো থাপ্পর কীভাবে দিতে হয় এবং দেওয়ার পর কীভাবে গালে আঙুলের ছাপ বসাবেন।তো থাপ্পর মারার সঠিক পদ্ধতি শিখার আগে আমার চ্যানেলে ফলো দিয়ে পাশে থাকবেন। মনে রাখবেন ফলো যখন দিয়েছি লাইক কমেন্ট সব করবো। এই কুইচ্চা চ্যানেলকে দেশের নাম্বার ওয়ান চ্যানেল বানিয়ে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।তো এখন ভিডিও শুরু করা যাক। এই চিকার মা তুই তোর গোলাপ ফুলের মালা পরিয়ে বিয়ে করা স্বামী মহাশয়কে একটা থাপ্পর মেরে দেখা তো থাপ্পরের নিয়ম-কানুন। কীভাবে ঠিক করে থাপ্পর মারতে হয়। বলছি লাল মুলা ওরফে গাজর আপনি কিন্তু কিছু মনে করবেন না। দিজ ইজ ভেরি বিউটিফুল ব্লগ।”

এবার হিমাদ্র বিরক্ত হয়ে শাহাবের থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে একটা আছাড় মারে। মুহূর্তের মধ্যে ফোনটা ভেঙে খন্ড খন্ড হয়ে যায়।

শাহাব ফ্লোরের মধ্যে হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে জোরে কান্না করতে করতে বলে,
— ও চিকার বাপ গো এইডা কি করলেন আপনি? আমার কুইচ্চা চ্যানেল টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আমার পেইজ ব্যাথা পাইছে। ভেঙে যাওয়ার আগে আমার টুন্টুমুন্টু নিশ্চিত বলে গেছে আমি মা*রা যাচ্ছি শাহাব। তুমি আমার আত্মার মাগফেরাত কইরো। থাক টুন্টুমুন্টু আমি তোমার জন্য মিলাদ পড়াবো।

— এই স্টুপিড ছেলে? এগুলো কী করছো? আর টুন্টুমুন্টু কে?”

— হি ইজ মাই ফার্স্ট লাভ?”

— হোয়াটটট?”

— হো গো চিকার বাপ। আমার মোবাইল আমার ফার্স্ট লাভ। ইস আমার জানটা ভেঙে গেলো গো। আমি তোমারে ছাড়া কেমনে বাঁচব সুইটহার্ট। ইয়া মাবুদ আমার কেন এতো কষ্ট হচ্ছে গো।

— গেট আউট। গেট আউট ফ্রম হেয়ার। সাথে তোর ওই সো কল্ড বোনকেও নিয়ে যা।”

শাহাব এবার উঠে বসে সিরিয়াস কন্ঠে বলে,
— এহ যেই না চেহারা নাম হিমাদ্র। আবার সাথে ইংরেজি মা*রায়। কচুবনে তো তাও কালো কুকুরে হেগেছে কিন্তু আপনারে তো কালো কুকুরেও পাত্তা দিবে না।এই চিকার মা উঠ তো। লেটস গো।চল গিয়া চিকার দাদা দাদির সাথে গিয়ে একটু দুঃখ সুক্কের আলাপ আলোচনা করি। অফকোর্স ওই আর বাঙ্গুলাদেশী।

শাহাব শিতুলকে ধরে বাইরে যেতে যেতে শিষ দেয়। হিমাদ্র যখন বুঝতে পারে ওরা তার বাবা মায়ের কাছে যাচ্ছে ততক্ষণাৎ ডাক দেয়,

— এই দাঁড়া।

শাহাব পিছনে ফিরে হিমাদ্রর দিকে তাকিয়ে বলে,

— চিকার বাপের মুখে হেগে গেল
চিকার বাপের মুখে হেগে গেল
লাল শিয়ালে
চিকার বাপের মুখে হেগে গেল লাল শিয়ালে।

___________________

শিতুলের বাবা আর হিমাদ্রর বাবা সৎ ভাই। হিমাদ্রর বাবা বড় আর শিতুলের বাবা ছোট।

শিতুলের মায়ের নাম প্রিয়তা খান আর শিতুলের বাবার নাম শাফায়াত খন্দকার। শিতুল আর শাহাব জমজ ভাই বোন। দুই মিনিটের ছোট বড়।

হিমাদ্রর বাবা দেলোয়ার খন্দকার।আর মা জেরিন তালুকদার। হিমাদ্র বড় তার ছোট একটা বোন আছে। তার নাম হুযাইফা খন্দকার হিমা।বয়স ১৮ ।

লুবাবা বিনতে শিতুল। শ্যামলা গায়ের রং। নাকটা উঁচু। যে কেউ দেখলেই বলবে ফক্স চোখ। চোখের রং হালকা বেগুনি। চুলগুলো কাঁধ পর্যন্ত। উচ্চতা ৫’১” । ঠোঁটজোড়া একদম চিকন তবে হালকা কালচে। এরমধ্যে তার বিশেষত্ব হচ্ছে হাসলে তার গালে টোল পরে। যদিও তার টোল পরা হাসি সবাই দেখতে পায় না কারণ শিতুল যখন কারো সামনে থাকে তখন হো হো করে মুখ খুলে হাসে। যেন হাসতে হাসতে ভিতর থেকে সবকিছু বের করে ফেলবে।

হিমাদ্র খন্দকার হিমেল । ২৩ বছর বয়সী একজন আর্মি অফিসার। সদ্য জয়েন করেছে। গায়ের রং ফর্সা। নাকটা উঁচু খাড়া। ক্লিন সেভ মুখ তার। তবে হালকা হালকা দাঁড়ি আছে যা বিশেষভাবে খেয়াল না করলে বোঝা যায় না। চওড়া প্রশস্ত কাঁধ । উচ্চতা ছয় ফুট। সুঠাম দেহে যেকোন পোষাক আকর্ষণীয়ভাবে ফুটে ওঠে। চোখদুটো টানাটানা আর চোখের মণি গাড় কালো। চোখের চাহনি সবসময় শান্ত ও দৃঢ়।হাসার সময় দাঁতগুলো একদম মুক্তার মতো থাকাটা তাকে আরো বেশি আকর্ষণীয় লাগে।ফেস কাটিং বেশ শার্প। বিশেষ করে চোয়াল।যা মেয়েদেরকে আরো বেশি করে তার প্রতি আকৃষ্ট করে।

__

হিমাদ্রদের পরিবারের সাথে শিতুলদের পরিবারের সম্পর্ক ভালো ছিল না কখনো। তবে ব্যাবসায়িক খাতিরে দুই পরিবারের সাথে ভালোই সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সাথে শাফায়াত খন্দকার আর দেলোয়ার খন্দকার ব্যাবসায়িক লাভের জন্য দুই পরিবারের সম্পর্ক আরো মজবুত করতে শিতুলের সাথে হিমাদ্রর বিয়ে দিবেন বলে ঠিক করেন। তবে হিমাদ্রর প্রেম ঘটিত বিষয় জানার পর একপ্রকার জোর করেই তাদের দুজনের বিয়ে দেন।

লিভিং রুমে আলোচনায় বসেছে দেলোয়ার খন্দকার আর শাফায়াত খন্দকার। আলোচনার মধ্যে হঠাৎ বাড়ির কাজের মহিলা হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলে,
— বড় ভাইজানের ঘরে আগুন লাগছে স্যার। তাড়াতাড়ি আসুন। ভিতরে ভাইজান আর শিতুল মামুনি ছিল।

চলবে!!!

সবাই ইট্টু রেসপন্স কইরেন প্লিজ। রেসপন্স না পেলে লিখতে ভালো লাগে না।

 

★কপি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। চাইলে শেয়ার করতে পারেন।

 

সূচনা পর্ব

গল্প:You and I

লেখিকা:নুসরাত জাহান তীব্রতা

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x