গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (২৬)

পর্বঃ২৬

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

[সবাই বেশি বেশি শেয়ার করুন।❤️]

 

ঘড়িতে বেলা এগারোটা।আজ চৌধুরী ভিলায় আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই বাড়ির প্রথম এবং একমাত্র আদরের দুলালীর আজ জন্মদিন। তাই বাড়ির কর্তী জোবায়দা চৌধুরী থেকে কন্যার পিতা ঐক্য চৌধুরী অব্দি সবাই মহা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। যার জন্য এত আয়োজন সেই ছোট্ট ওয়াফা ভীষণ খুশি খুশি মনে তার জন্য সবার এত তৎপরতা আর আয়োজন দেখছে। যদিও প্রতি জন্মদিনেই ঐক্য তার কলিজার টুকরা আম্মাজানের বিশেষ দিনটিতে আয়োজনের কোন কমতি কোনদিন রাখেনি। কিন্তু ছোট্ট ওয়াফা তখন এতটা বুঝতো না জন্মদিনের মানে। তবে ছয়বছরের একটু একটু বুঝদার ওয়াফা এবার বেশ উচ্ছ্বাসিত তার জন্মদিন নিয়ে। কারণটা বিশেষ কি?
তন্মধ্যে জোবায়দা চৌধুরী একটা বিশাল থালা রেডি করে টেবিলে রাখেন। আদুরে স্বরে নাতনিকে ডাকলেন,

— কই আমার ওয়াফা দাদু সোনা কই?

ঐক্য হেসে ওয়াফাকে কোলে তুলে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বললো,

— আসুন আম্মাজান। আপনার দাদুমনি আপনার জন্য অনেক ডেজার্ট আইটেম করেছে।

জোবায়দা চৌধুরী দশ বারো পদের আইটেম দিয়ে একটা থালা সাজিয়ে এনেছেন। ঐশী ফ্রিজ থেকে একটা রেড বেলবেট কেক এনে টেবিলে রাখে। বলে,

–মামনি আগে কেকটা কাটো৷

ওয়াফা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে শুধায়,

— কেক পার্টিতে কাটব না পিপ্পি?

— তখন তো আরেকটা কাটবে মামনি। এখন এটা কাটো। তুমি তো বারোটার আগেই ঘুমিয়ে গেলে। তাই এখন বাসি কেকটা কাটতে হবে। নাও ক্যান্ডেলে ফুঁ দাও।

ওয়াফা খুশি মনেই কেকটা কাটলো। সবাই সমস্বরে তাকে হ্যাপি বার্থডে উইশ জানায়। ওয়াফা নিজেও খুশিতে হাত তালি দেয়। ঐক্যর বুক জুড়িয়ে যায় মেয়ের হাসিমুখ দেখে। ঐক্য দোয়া করে তার আম্মাজানের এই অকৃত্রিম নিষ্পাপ হাসিটা যেন সবসময় খেলে যায় অধরে।ওয়াফা উদগ্রীব স্বরে বললো,

— আমার বার্থডের গিফ্টটি দেবে না তোমরা?

জোবায়দা চৌধুরী অধর বিস্তৃত করে হেসে বলেন,

— অবশ্যই দেব দাদুভাই। রেণু আমার রুম থেকে ব্যাগটা নিয়ে আয় তো।

— আসতাছি আম্মা।

রেণু রুম থেকে একটা ব্যাগ নিয়ে জোবায়দা চৌধুরীর হাতে দেয়। তিনি ব্যাগটা ওয়াফার দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন,

— এই নাও দাদুভাই। তোমার জন্মদিনে দাদুমনির তরফ থেকে ছোট্ট তোহফা।

ওয়াফা একপ্রকার ছিনিয়ে নেয় সুন্দর মতো রেপিং করা ব্যাগটা। কৌতুহল আর উত্তেজনার সহিত ছোট্ট ছোট্ট হাতে টেনে হিঁচড়ে খুলতে চায়। সবাই হাসলো ওর কান্ডে। ঐক্য টেবিল থেকে কাঁচি নিয়ে সুন্দর করে ব্যাগটার রেপিং পেপারগুলো কেটে দিল। ভেতর থেকে বের হলো একটা হাতে বোনা উলের সুন্দর সোয়েটার। তার উপর অনেক সুন্দর কুশিকাটার তৈরী রোজের ডিজাইন করা। বোঝাই যাচ্ছে জোবায়দা চৌধুরী অনেক যত্ন আর সময় নিয়ে এটি তৈরী করেছেন।

— পছন্দ হয়েছে দাদু?

— অন্নেক পছন্দ হয়েছে দিদুন।

ওয়াফা দেরী না করে সাথে সাথে এটা পরে নেয়। যদিও ওর ছোট শরীরে সোয়েটারটা একটু বড় হয়ে গিয়েছে। তবুও নাদুসনুদুস ওয়াফার শরীরে সোয়েটার সৌন্দর্য দ্বিগুণ বৃদ্ধি করেছে৷ ঐশী ওয়াফার হাসিমুখ দেখে বললো,

— মামনি পিপ্পির থেকে গিফ্টটি নেবে না?

ওয়াফা উৎসুক চোখে চেয়ে বললো,

— দাও দাও আমার গিফ্টটি দাও।

ঐশী সারভেন্ট দুজনকে ইশারা করে। তারা ওর ইশারা পেতেই রুমে ছোটে। যেন আগে থেকেই ওদের বলে রাখা হয়েছে সব। কিছু পল ব্যায়ে চারজন মিলে একটা বড় রেপিং পেপারে মোড়ানো বক্স ধরে সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নামায়। ওয়াফা হা করে তাকিয়ে বললো,

— ওমা পিপ্পি এত্ত বড় বক্স?

ঐক্য নিজেও অবাক হয় এত বড় একটা বক্স দেখে। বক্সটা মেঝেতে রেখে ওরা সরে দাঁড়ায়। ঐশী হাসিমুখে বললো,

— নাও মামনি এবার তোমার গিফ্টটি আনবক্স করো।

ওয়াফা দু’হাত হাত বাড়িয়ে দেয় ওকে চেয়ার ছেড়ে নামিয়ে দেওয়া জন্য৷ ঐক্য কোলে তুলে ওকে নামিয়ে দিতে দেরী ওর দৌড়ে বক্সটার উপর হামলে পড়লে দেরী হয়না৷ হাঁপাতে হাঁপাতে শুধায়,

— এত্ত বিগ বক্সটায় কি আছে পিপ্পি?

— তুমি নিজেই খুলে দেখ। এই নাও সিজার?

ঐশী কাঁচি এগিয়ে দিয়ে বললো। ওয়াফা কাঁচিটা হাতে নিয়ে রিবন দিয়ে বক্সটায় বাঁধা বো’টায় কাঁচি চালায়। হঠাৎ ঝপাৎ করে চারদিক থেকে কার্টুন পেপার গুলো সরে যায়। দৃশ্যমান হয় একটা ছোট্ট মেনিকুইন যার শরীরে জড়ানো ডার্ক রেড কালারের একটা পাল্পি ফ্লোরাল গাউন। ড্রেসটা ঐশী স্পেইশাল ভাবে ডিজনি প্রিন্সেস থিমের বানিয়েছে৷ ওয়াফা ডিজনি প্রিন্সেসদের ডাই হার্ট ফ্যান৷
ওয়াফা নিজের নরম গালে দু’হাত রেখে বিস্ময় জানান দিলো,

— ও মাই গড৷ এটা তো অরোরা!

সবাই হেসে দিল ওর ঢঙ্গ দেখে। ঐশী ওর গাল টেনে বললো,

— পছন্দ হয়েছে ঢঙ্গী রাণী?

ওয়াফা খুশিতে ঐশীর কোমর জড়িয়ে ধরে পা দুটো উপর নিচ নাচিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বললো,

— অনেক পছন্দ পছন্দ হয়েছে পিপ্পি? এটা একদম স্লিপিং বিউটির অরোরার ড্রেসটার মতো। মেনি মেনি থাংকস।

— ইটস থ্যাংকস আম্মাজান।

— হ্যাঁ হ্যাঁ থাংকস।

ঐক্য হতাশ শ্বাস ফেলে আবার হেসে দিল। বাড়ির মেইডসরাও যে যার সাধ্যমত ওয়াফাকে ডল, চকোলেট, ড্রেস ইত্যাদি গিফট দিল।
ঐক্য ঐশীকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

— তুই জানলি কি করে বুড়ির পছন্দের কথা?

ঐশী মুখ বেঁকিয়ে বললো,

— ওসব মেয়েদের ব্যাপার স্যাপার তুমি বুঝবেনা। আগে বিয়ে করে মেয়ের জন্য একটা মা নিয়ে আসো। দেখবে মেয়ের কি পছন্দ মা ই বলে দেবে।

ঐক্য কিছু বললোনা৷ ভেতর থেকে চাপা দীর্ঘশ্বাস বের হলো৷ সবাই তো নিজেদের গিফট দিয়ে দিল। কিন্তু ঐক্যর গিফট? যেটা তার মেয়ে কাল অবচেতন মনে তার কাছে চেয়েছে। কিভাবে পাইয়ে দেবে তার কলিজার অতি আকাঙ্খিত উপহারটা? কিভাবে?
.

আয়নার সামনে আনমনা হয়ে তৈরী হচ্ছে ঐক্য। চারদিকে তার বিশেষ খেয়াল নেই। শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে।

— ভাইয়া আম্মু বলেছে গেস্টদের লিস্টটা আরেকবার চেইক করতে।

বলতে বলতে ঐশী ঘরে প্রবেশ করে দেখে ঐক্য ভাবনার জগতে হারিয়ে আছে। ঐশী ভ্রু কুঁচকে ফের ডাকলো,

— ভাইয়া কোথায় হারালে?

ঐক্যর সম্বিৎ ফেরে। ব্যস্ত হাতে শার্টের অবশিষ্ট বোতামগুলো লাগিয়ে বললো,

— লেট মি চেইক।

ঐক্য লিস্টটা নিয়ে কাউচে বসে চোখ বোলায়। শহরের পরিচিত রিলেটিভ, অফিসের স্টাফ, ওয়াফার ফ্রেন্ডস মিলে প্রায় বারোশো প্লাস ইনভাইট করা হয়েছে। ঐক্য আয়োজনের কোন কিছুতেই ত্রুটি রাখতে চায়না৷ ঐশী রুমের চারদিকে তাকায়৷ হঠাৎ ওর লোচন স্থির হয় ড্রেসিং টেবিলের উপর রেপিং করা ছোট্ট একটা বক্সে। ঐশী ব্যগ্র পায়ে বক্সটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে আগ্রহী গলায় জিজ্ঞেস করে,

— ভাইয়া এটা কি? তুমি কিনেছ ওয়াফার জন্য?

ঐক্য সেদিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে স্থির হয়ে যায়৷ ঐক্যর থেকে কোন জবাব না পেয়ে ঐশী ফের শুধায়,

— কি হলো ভাইয়া?

ঐক্য থমথমে মুখে বললো,

— এটা মাহিরা দিয়েছে। ওয়াফার জন্মদিনের উপহার।

ঐশী হতবাক বনে যায়৷

— মা..হিরা দিয়েছে মানে? কখন?

ঐক্যর মনে পড়ে কালকের ঘটনাটি…..

অফিসে নিজের কেবিনে বসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল চেইক করছিল ঐক্য। এমন সময় সামনের টেলিফোনটা বেজে উঠে তারস্বরে৷ ঐক্য কাজ জারী রেখে ফোন রিসিভ করে কানে ধরে হ্যালো বললো। ওপাশে কর্মরত রিসেপশনিস্ট বলে উঠলো,

— স্যার। একজন আপনার সাথে মিট করতে চায় ইমারজেন্সি।

ঐক্য কপলা কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

— কে?

— নাম বলেনি স্যার৷ বলেছে আপনার ফ্রেন্ডস৷

ঐক্য আপনমনে বিড়বিড়ায়,

— ফ্রেন্ডস?

তারপর বললো,

আচ্ছা পাঠিয়ে দাও৷

.

কাঁচের দরজাটা খুলে হিলের ঠকঠক শব্দ মেঝে মাড়িয়ে কেউ ঐক্যর কেবিনে প্রবেশ করে। নিমিষেই মেয়েলি পারফিউমের মৃদু সুগন্ধে ভরে উঠে ঐক্যর শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষটি। মেয়েলি সুবাস নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করতেই ঐক্য ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে তাকিয়ে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। চোখের সামনের দৃশ্যটি ওর কাছে নিছক স্বপ্ন মনে হয়। মাহিরা! তার এক কালের প্রেয়সী, তার প্রাক্তন অর্ধাঙ্গিনী। যাকে হৃদয়ের সবটুকু অনুরাগ দিয়ে ঐক্য ভালোবেসেছিল। বিনিময় পেয়েছিল জঘন্যরকম ধোঁকা। যার অনলে ঐক্য নিজেকে পুড়িয়েছে বছরের পর বছর৷ মাহিরা মুখের মাক্সটা নামিয়ে মুচকি হাসলো। ঐক্য ঢোক গিলে তৎপর চোখ নামিয়ে নিল৷ আজ প্রায় চার বছর পর ওরা সরাসরি একে অপরকে দেখছে। যদিও জনপ্রিয় মডেল হওয়ার সুবাদে বহুবার চাকচিক্যময় মাহিরাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুবার দেখা হয়েছে। কিন্তু সামনাসামনি চারবছর পর এই প্রথম দেখলো। মাহিরা নিজের লিপস্টিক পরা ঠোঁট নাড়িয়ে হেসে জিজ্ঞেস করলো,

— কেমন আছিস ঐক্য?

সেই পুরনো সম্বোধন। যেন এখনো দুজন একে অপরের পুরনো বন্ধুটি রয়ে গিয়েছে । ঐক্যর হাঁসফাঁস লাগতে শুরু করে। অনুভব করলো প্রাক্তনকে সামনাসামনি ফেইস করার মতো মানসিক শক্তি ঐক্য এখনো যুগিয়ে উঠতে পারেনি। পরক্ষণেই মানস্পটে অকস্মাৎ ভেসে ওঠে আবৃতি নামক এক রমনীর তেজীয়ান আনন। নিজের প্রাক্তনের সামনেও আবৃতির নিজেকে কঠোরভাবে সামলে রাখার অটুট শক্তি ঐক্যকেও মুহূর্তে শক্তি দিল । ওই মুহুর্তের আবৃতির সেই কঠোর ভাবমূর্তি ঐক্যকেও দারুণ ভাবে প্রভাবিত করলো। তড়িৎ নিজেকে সামলে নিল সে। মাহিরার প্রশ্নের স্বাভাবিক প্রতিত্তোরে নিজেও বললো,

— আ’ম ভেরী ফাইন টুডে৷

ব্যস বিপরীতে মাহিরাকে ভাল খারাপ কিছু জিজ্ঞেস করলোনা। মাহিরা মনে মনে বেশ অপমানিত হলো। ভাবেনি ওকে চাক্ষুস দেখেও ঐক্য এতটা নির্লিপ্ত থাকবে। । ( তুই কি ভেবেছিলি কুটনি? ঐক্য তোকে দেখে কোলে তুলে নাচবে?😒)। মাহিরা জোরপূর্বক হেসে বললো,

— বসতে বলবিনা?

ঐক্য মনে পড়ার মতো করে বললো,

— ওহ প্লিজ সিট৷ তা কি দরকারে এসেছিস? প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড আমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। সো কিছু বলার থাকলে জলদি বললে ভাল হয়।

অপমানে সুন্দর মুখটা লাল হয়ে উঠে মাহিরার। কি ভেবে এখানে এসেছিল আর হলো কি। ও তো ভেবেছিল ঐক্য ওকে দেখে ইমোশনাল হয়ে পড়বে। কিন্তু এই ঐক্য যেন বহু অচেনা৷ মাহিরা আগের ঐক্যর সাথে মেলাতে পারেনা কিছুই। কেন ওর এত পরিবর্তন হঠাৎ? ও যতদূর খবর নিয়ে জানতে পেরেছে ঐক্য নেশা করে ক্লাবে পড়ে থাকে। মাহিরা কত খুশি ছিল এতদিন এই ভেবে যে ঐক্য তাকে ভুলতে না পেরে, ওকে হারিয়ে ফেলার আফসোসে নেশায় এডিক্টেড হয়ে পড়েছে। কিন্তু এখানে ওর করা ব্যবহার তো ভিন্ন কথা বলছে।

— কি হলো? হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট টু স্যা? যা বলার জলদি বলে প্লিজ লিভ৷

মাহিরার কান দিয়ে ধোঁয়া ছুটে যাচ্ছে। এখানে এভাবে চলে আসা যে কতবড় বোকামি হয়েছে তা এখন হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে। নিজেকে লজ্জা থেকে বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে পার্স থেকে একটা বক্স বের করে টেবিলে রাখে। ঐক্য জিনিসটা দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

— হেয়াট ইজ দিজ?

মাহিরা গদগদ বচনে বললো,

— কাল তো মেয়ের জন্মদিন। এই বারে যেহেতু বিডিতে আছি তাই ভাবলাম ওর জন্য একটা গিফট কিনি। এখানে অনেক এক্সপেন্সিভ একটা ডায়মন্ডের প্যান্ডেট আছে৷

মাহিরা মনে মনে ভীষণ ভয় পাচ্ছে। ঐক্যর যা হাবভাব দেখছে বক্সটা না আবার ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তাহলে অপমানের যে টুকু বাকি আছে সেটুকুও পুরো হয়ে যাবে। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে ঐক্য তেমন কিছুই করলোনা৷ বরং শান্ত কন্ঠে বললো,

— উপহার দামী বা কমদামি দিয়ে বিচার হয়না। এটার পিছনে কতটুকু ভালবাসা আছে সেটাই মূখ্য। কিন্তু কিছু অল্প পানির মাছেদের কাছে জীবন,আবেগ, অনুভূতি মানেই টাকা৷ এরা টাকার জন্য সব করতে পারে।

মাহিরা লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। ঐক্যর প্রতিটা কথা ওর কানে শূল হয়ে বিঁধছে। ইচ্ছে করছে এক ছুটে পালাতে এখান থেকে।

— গিফট দেওয়া হয়েছে?

মাহিরা বিভ্রান্ত হয়ে তাকায়। ঐক্য নিজের সিংহাসনের ন্যায় চেয়ারে মাথা এলিয়ে বললো,

— নাও ইউ ক্যান গো। প্লিজ।

হাত দিয়ে দরজার দিকে ইশারা করে বললো ঐক্য। মাহিরা থমথমে মুখে নিজের পার্সটা হাতে নিয়ে বিড়াল পায়ে বের হয়ে যায়৷

মাহিরা যেতেই ঐক্য টেবিলে থাকা পেপার ওয়েটটা প্রচন্ড রাগে মেঝেতে ছুঁড়ে মারে। শরীরের কোর্ট টা খুলে ছুঁড়ে মারে ডিভানে। হাঁপাতে হাঁপাতে বিড়বিড় করে আওড়ায়,

— প্রতারক!

— তুই ওই স্লাটটার থেকে গিফট কেন নিলি ভাইয়া? এখন কি নিজের মেয়েকে তুই এই গিফট টা দিবি?

প্রচন্ড রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো ঐশী। ঐক্য ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বললো,

— এই নেক পিসটা রেণুকে দিয়ে আয় যা।

— মানে?

ঐশীর বিভ্রান্ত গলা। ঐক্য নিজ কাজে মগ্ন থেকেই শান্ত স্বরে বললো,

— মানে হলো আমার আম্মাজানের এত আকাল পড়েনি যে তার মায়ের শরীর বেঁচা টাকায় কেনা গিফট নিতে হবে।

ঐশী মনে মনে ভীষণ সন্তুষ্ট হলো। ঐক্যর এমন কঠোর প্রতিক্রিয়া আশা করেনি ও। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো তার ছ্যাকাখোর ভাই ওই মাহিরারে এত কোল্ডলি ফেইস করে এসেছে৷ ইনক্রেডিবল! কিন্তু সাহেবের হঠাৎ এত পরিবর্তনের কি সেই বিশেষ কারণ?

উজ্জ্বল ফর্সা শরীরে কালো মসলিন শাড়িটা জড়িয়ে আবৃতি নিজেকে আয়নায় দেখে। ফর্সা বরণ গায়ে রঙটা একদম ফুটে আছে। আজ বহুদিন বাদে শাড়ি নামক বস্তুটা আবার জড়িয়ে আবৃতির অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। এই শাড়ি নামক বস্তুটা ছিল তার অধিকার যেটা পরিধানের আবৃতির বৈধ হক ছিল। কিন্তু ভাগ্য ও কিছু মানুষের নোংরামি ওর বদন থেকে জোরপূর্বক এই মূল্যবান বস্ত্রটিকে ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে৷ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চুলে খোপা করতে গিয়েও কি মনে করে যেন আবৃতি চুলগুলো আজ খোলাই রাখলো। বহুদিন বাদে পছন্দের মেরুন রঙে কমলার কোয়ার মতো ওষ্ঠদুটিকে রাঙালো। হাতে পড়লো সেই কলেজ জীবনে কেনা এক গাঁছি কালো রেশমি চুড়ি। ব্যাস এই সাধারণ সাজেও যেন আবৃতিকে অসাধারণ করে তুলেছে। আয়নায় নিজের লাস্যময়ী প্রতিচ্ছবি দেখে আবৃতি আজ প্রথমবার অনুধাবন করে, ‘ও সুন্দর! খুব খুব সুন্দর!’ ওর সৌন্দর্য ওর সরলতায়, ওর সৌন্দর্য ওর মাতৃত্বে ওর সৌন্দর্য ওর ব্যাক্তিত্বে। মুচকি হেসে আবৃতি ফোন চেইক করলো। সন্ধ্যা সাতটা বাজতে আর মিনিট বিশেক বাকি। ওয়াফার বার্থডে পার্টি শুরু হবে রাত আটটায়। ভেন্যু রয়্যাল কনভেনশন হল।

— মাম্মা দেখতো আমায় কেমন দেখাচ্ছে।

আরশানের আধো স্বর আবৃতির কর্ণে পৌঁছাতেই পিছু ফিরে তাকালো। কালো স্যুট প্যান্ট পরনে ছোট্ট আরশান। ছেলের এই রুপে আবৃতি মুগ্ধতার চেয়েও কষ্ট অনুভব বেশি করলো। কেননা ছেলের আদলে যেন সাক্ষাৎ ধ্রুব ওয়াহিদ তার সামনে। আবৃতির বুক ছিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হলো। মেঝেতে হাটুগেড়ে বসে দুহাত বাড়াতে দেরী আরশানের ঝাপিয়ে পড়তে দেরী হয়নি। জোরপূর্বক ঠোঁট মেকি হাসি ঝুলিয়ে আবৃতি বললো,

— একদম রাজপুত্রের মতো দেখাচ্ছে আমার বাবাকে!

দপ করে আরশানের ঠোঁটের হাসি নিভে যায়। আরশানকে হঠাৎ ই মুখ গোমড়া করতে দেখে আবৃতি কপাল কুঁচকে বললো,

— কি হয়েছে বাবা?

আরশান ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,

— মামু বলেছে আমাকে অন্নেক হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে। একদম হিরোর মতো। তাহলে তুমি বলছো কেন রাজপুত্রের মতো?

ছেলের রাগের অদ্ভুত কারণ দেখে ফিক করে হেসে ফেলে আবৃতি,

— হ্যাঁ তো হিরোর থেকেও সুন্দর লাগছে মাশাল্লাহ।

— না না বলো হিরোর মতো লাগছে। বলো।

আবৃতি কপাল চাপড়ায় নিজের,

— হ্যাঁ বাবা ধন আপনাকে হিরোর মতো লাগছে। আপনার সামনে তো বলিউড,হলিউডের হিরোরাও কম পড়বে।

— কি এত কথা বলছিস দুজন? যাবি না দেরী হচ্ছে তো।

আবৃতি তাকিয়ে দেখে একই রকম স্যুট সেট পড়ে আহান তৈরী হয়ে এসেছে। নিজের সুদর্শন ভাইকে দেখে আবৃতি মনে মনে মাশাল্লাহ পড়ে নিল। বললো,

— এই তো আমার হিরোর প্রশংসা করছিলাম। তুইও একটু কর।

আহান হেসে আরশানকে কোলে তুলে নেয়,

— হিরোদের এত প্রশংসা করতে হয়না। তারা জন্মগত হ্যান্ডসাম। এখন চল দেরী হচ্ছে।

আবৃতি হেসে পার্সটা তুললো। বললো,

— গিফট বক্সটা?

— ওটা অন দ্য ওয়ে পিক করে নেব।

ওরা ড্রয়িংরুমে আসতেই বাসার কলিং বেলটা বেজে উঠে। জাহানারা বললেন,

— এ সময় আবার কে হলো। আচ্ছা দেখছি আমি। তোরা নাহয় বের হয়ে যায়।

জাহানারা বেগম দরজা খুলতেই আবৃতি থমকে যায়। ভীষণ অপ্রত্যাশিত কিছু দেখার মতো চমক দেখা যায় সবার নয়ন যুগলে। হতভম্ব হয়ে আওড়ায়,

— আপনি?

অসুস্থ বিধ্বস্ত ইরা দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জীর্ণশীর্ণ গাত্রে ভারী পেটটা স্পষ্ট। আবৃতি সেদিকে তাকিয়ে ব্যাথাতুর ঢোক গিলে৷ জাহানারা বেগম মাথায় হাত দিয়ে আর্তনাদ করে বলেন,

— ইয়া আল্লাহ এই কালনাগিনী আমার দরজায় কেন আসলো?

আবৃতির হুশ ফিরে। অবুঝ চোখে ইরার দিকে তাকিয়ে থাকে। ইরাকে এখানে দেখে কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে বুঝতে পারছেনা। ইরা ভগ্নপ্রায় গলায় বলে উঠলো,

— আবৃতি আমার তোমার সাথে কিছু কথা আছে।

জাহানারা বেগম তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন,

— এই এই এতকিছুর পরোও কিসের কথা আমার মেয়ের সাথে তোর? হ্যাঁ? ওর স্বামী, সংসার খেয়েও তোর শান্তি মিলেনি? এসেছিস আমার মেয়ের বাকি শান্তিটুকু নষ্ট করতে?

আবৃতি আরশানের দিকে তাকাল। বাচ্চাটা চোখ বড় বড় করে অবুঝ চোখে দেখছে সব।

–আহ মা থামো তো। আহান প্লিজ মা আর আরশানকে নিয়ে ভেতরে যা। আমি কোন সিনক্রিয়েট চাইছিনা।

আহান দাঁত চেপে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নারীদের ভীষণ সম্মান করে আহান৷ কিন্তু ইরাকে দেখে এই মুহুর্তে ওর ঘৃণা হচ্ছে। ভীষণ ঘৃণা। আহান ভাগ্নেকে কোলে তুলে জাহানারা বেগমকে জোরপূর্বক ভেতরের রুমে নিয়ে দরজা আটকে দিল।

— ভেতরে আসুন।

আবৃতির শান্ত গলা। ইরা ঢোক গিলে গুটি গুটি পায়ে ভেতরে আসে। সাজ সজ্জিত আবৃতিকে দেখে অস্থিরতা অনুভব করে ভেতর থেকে। এই মেয়েটার ঘর ভেঙ্গেছে ইরা পরিকল্পনা করে। ভয়ংকর পরিকল্পনা। অস্বীকার করবেনা ধ্রুবকে পাওয়ার পাশাপাশি আবৃতির প্রতি হিংসাত্মক মনোভাব ওর সেই ঘৃণ্য পরিকল্পনাকে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু কি হলো? সব হারিয়েও আবৃতিকে কোন মলিনতা স্পর্শ করতে পেরেছে কি? আর ও? ও যেন সব পেয়েও কিছুই পায়নি ।

— এখানে বসুন।

ইরা বসতেই আবৃতি শান্ত স্বরে শুধায়,

— তা কোনো বিশেষ প্রয়োজনে আসা হয়েছে ? তাও এই ভর সন্ধ্যায়। আপনার স্বামী জানে?

— কেউ কিছু জানেনা।

— কেন এসেছেন?

ইরা অস্ফুটে বললো,

— ক্ষমা চাইতে।

— কিসের ক্ষমা?

— তোমার সাথে যা কিছু করেছি তার জন্য।

— ওহ আচ্ছা। কিন্তু আজ হঠাৎ করে কি মনে করে ক্ষমা চাইতে এলেন মিসেস ওয়াহিদ?

এই পর্যায়ে ইরার চোখজোড়া ছলছল করে উঠে। বুজে আসা গলায় হঠাৎ বললো,

— আমি আর পারছিনা। সবকিছু থেকেও অতৃপ্তির গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি আমি। আবৃতি আমাকে বাঁচাও। ক্ষমা করো। মুক্তি দাও এই দহন থেকে।

চলমান…..

( আসসালামু আলাইকুম পাঠক। অনেক বড় পর্ব দিয়েছি আজ। প্রায় আড়াই হাজার শব্দ। গোটা তিনদিন থেকে সময় বের করে লিখেছি। আগের একটা গল্প রিচেইক করে ই-বুকে জমা দেওয়ার কথা ছিল আজ। বাট পারলাম না। হ্যাপি রিডিং। সবাই সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করবেন কেমন?🙂)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x