পর্বঃ৩০
লেখনীতেঃআফসানা শোভা
[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]
— মা শাড়ি না পরলে হয়না?
— ওমা কেনরে মা? এই রকম জায়গায় শাড়ি হচ্ছে মানানসই পোশাক। তোকে শাড়িতে কত সুন্দর লাগে দেখতে তুই জানিস?
— ভাবি দেখেন তো আট কেজি মিষ্টি নিয়েছি।
আবৃতির চাচা হাতে মিষ্টি, ফলমূল নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বললেন।
— একেবারে দশ কেজিই নিয়ে নিতে ভাই। শুনেছ তো মেয়েটার পরিবার উচ্চবিত্ত। আমার তো ভয় হচ্ছে আমার স্বল্প বেতনের ছেলেটার কাছে তারা মেয়ে দেবে তো?
মায়ের কথা শুনে আবৃতি ‘চ’ সূচক শব্দ করে বললো,
— মা এভাবে কেন বলছো? নিজেকে কখনো ছোট করে দেখোনা। আর মেয়ে দেবে না কেন? আমার ভাই একজন সফল ডাক্তার। ইনশাআল্লাহ কোন একদিন জীবনে অনেক অনেক শাইন করবে ও আমার বিশ্বাস।
জাহানারা এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন,
— এখন ঐশী মাকে দেখে এসে আংটি পরিয়ে রাখব।
— কেন? ওনারা রাজি থাকলে একেবারে বৌ নিয়ে আসব।
আবৃতি হেসে বললো। জাহানারার মেয়ের হাসিমুখ ছুঁয়ে বললেন,
— আগে যে আমি তোর বিয়েটা দিতে চাই মা।
— আহ মা। আমার শুরু হলে তুমি? আমার বিয়ে নিয়ে এত ভাবতে হবে না তোমায়। নাকি আমাকে বোঝা মনে হচ্ছে কোনটা?
— এসব তুই কি বলছিস মা? তুই আমার কাছে বোঝা হওয়ার আগে আমার মরণ হোক। যদি সম্ভব হতো আমি তোকে সারাজীবন আমার বুকে রেখে দিতাম৷ আমার কত সাধনার সন্তান তোরা।আল্লাহর থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে এনেছি তোদের আমি। কিন্তু মা মেয়েদের যে আসল শান্তি, সুখ নিহিত তার স্বামী, সংসারের মাঝে। আমার মেয়ের সেই সুখটুকু নিশ্চিত না করে যে আমি মরেও শান্তি পাব নারে।
বলতে বলতে জাহানারার গলা ধরে আসে। আবৃতি মাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
— হবে মা সব হবে। এখন তুমি কেঁদোনাতো। একটা ভাল কাজে কেঁদেকেটে যাবে নাকি?
জাহানারা চোখ মুছে বললেন,
— যা শাড়িটা পড়ে নে। নানুভাইকেও রেডি করিয়ে দে।
আরশান হাতের বলটা পাশে রেখে আগ্রহী স্বরে বললো,
— আচ্ছা নানুমনি? আমরা ওয়াফাদের বাসায় কেন যাচ্ছি?
আবৃতি হেসে ছেলের গাল টেনে বলে,
— বৌ আনতে।
আরশান চোখ বড় বড় করে বলে,
— কিন্তু ওখানে তে বৌ দেখতে পাইনি মাম্মাম।
— উম দেখতে পাবে আব্বু। আগে তো পয়গাম নিয়ে যাই।
— পয়াগাম কি মাম্মাম?
— পয়াগাম না বাবা। পয়গাম।
— হ্যাঁ ওটাই। কিন্তু আমরা পয়াগাম কেন নেব ওদের জন্য। মাম্মাম পয়াগাম না নিয়ে ওয়াফার জন্য আইসক্রিম, ওয়াফেল আর চকোলেট নিয়ে যাই চলো। ও এত্ত এত্ত খুশি হবে।
আবৃতি হেসে দিল ছেলের কথায়। কি বলে এই ছেলে?
.
হালকা ঘিয়ে রঙের এই কাতান শাড়িটা আবৃতির মায়ের। এই বাড়িতে আবৃতির তেমন ভাল শাড়ি নেই। ছয় বছরের সংসার জীবনে যতগুলো শাড়ি ছিল সবগুলো ওই বাড়িতে নিজের আলমারি না না ধ্রুবর আলমারিতে রেখে এক কাপড়ে আরশানকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলে ওই বিদঘুটে সত্যটা জানার পর৷ শাড়ি নামক এই বস্ত্রটি ছিল একসময় তার পছন্দের তালিকার শীর্ষে। শাড়ি গায়ে জড়ালে কেমন কনফিডেন্ট অনুভব হতো ওর। কিন্তু এখন এই শাড়িটা গায়ে জড়াতে ও কুণ্ঠাবোধ করে। মনে হয় লোকে ওকে দেখলে উপহাস করবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবৃতি লিপবাম টা হাতে নিয়ে সামান্য ঠোঁটে ঘষল।
— মাশাল্লাহ কত মিষ্টি দেখাচ্ছেরে মা তোকে। রঙটা ফুটেছে ভাল। অবশ্য আমার মেয়েকে সব রঙেই ফুটে।
জাহানারা গদগদবচনে বললেন। আবৃতি স্মিত হেসে বললো,
— আরশানক…
— এইতো আমি মাম্মাম।
আবৃতি তাকিয়ে দেখে একটা ছোট্টো পাঞ্জাবি পরনে আরশান দাঁড়িয়ে আছে।
— মাম্মাম দেখ আমি ওয়াফা মনির জন্য গিফট নিয়েছি।
— তাই। কি গিফট নিয়েছ বাবা?
— এই যে চকোলেট আর আমার রোবট ডলটা। এই ডল তো কথা বলতে পারে ওয়াফা খুব পছন্দ করবে তাইনা মাম্মাম।
আবৃতি হাসল ছেলের সরলতায়। তার ছেলে কি জানে এমন শত শত টয় দিয়ে ওয়াফার ঘর ভর্তি। তার মধ্যে তার সস্তা এই টয়টা বিশেষ প্রভাব ফেলবেনা হয়তো। তবুও ছেলের আগ্রহকে মাটি করলোনা। বললো,
— হ্যাঁ বাবা খুব পছন্দ করবে।
তন্মধ্যে আবৃতির ফোন বেজে উঠে। আহান কল করেছে। ফোন রিসিভ করতেই আহানের তীব্র উৎকন্ঠিত গলা শোনা গেল,
— হ্যালো আবৃতি? তোরা রওনা দিয়েছিস? এই ঐশীকে আজ ক্লাস, ব্লক পোস্ট কোথাও দেখলাম না।
— দেখবি কি করে। সে মনে হয় বাড়িতে শাড়ি পড়ে সেজেগুজে আমাদের অপেক্ষায় বসে আছে।
আহান লজ্জা পেয়ে হাসলো। বললো,
— সে যাই হোক। খালি হাতে ফিরে আসিসনা প্লিজ। এই মেয়েটাকে না পেলে আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাব।
আবৃতি চোখ কপালে তুলে বললো,
— বাপরে। প্রেমে পড়ে তোর ভালোই উন্নতি হয়েছেরে আহান। কেমন ফিল্মি ডায়ালগ মারতে শিখে গিয়েছিস।
— প্রেমে পড়লে সবাই একটু আকটু এরকম ডায়ালগ মারে। ইটস নরমাল।
— কি জানি। কখনো কারো প্রেমে পড়া হয়নি তাই জানিওনা।
আবৃতি খানিক উদাস গলায় বললো। আহান বললো,
— তোর জীবনেও প্রেমে পড়ার কেউ আসুক। জলদি আসুক। এই অবর্ণনীয় অনুভূতির তাড়না তোর মধ্যেও জাগুক।
আবৃতি কথা কাটাতে ক্ষীণ স্বরে বললো,
— আচ্ছা রাখছি এখন। আমাদের বের হতে হবে।
— আচ্ছা। সাবধানে যাস সবাই।
ফোন কেটে আবৃতি মলিন হাসলো। বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,
— ভালোবাসার মতো স্বর্গীয় অনুভূতি সবার জন্য আসেনারে আহান। সবার কপালে এই সুখটুকু লেখা থাকেনা।
.
— কিরে ক্লাস না করে এখানে আর কতক্ষণ বসে থাকবি ঐশী?
ঐশী কপিতে একটা চুমুক দিয়ে বললো,
— ভাল লাগছেনা আজকে ক্লাস করতে।
— ভাল লাগছেনা নাকি আহান স্যারকে ফেইস করতে ভয় পাচ্ছিস? আমরা কিছু জানিনা ভেবেছিস?
ঐশী গাল দুটো লজ্জায় রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। কথা ঘুরাতে বলে,
— তুই যাচ্ছিস না কেন। যা তো আমি কতক্ষণ বসে তারপর আসব।
— কথা ঘোরাবি না একদম৷ আহান স্যারকে বল বিয়ের প্রফোজাল নিয়ে যেতে তোর ফ্যামিলির কাছে।
— আমার ভয় হচ্ছেরে অনেক?
— কি নিয়ে?
— জানিনা। কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে৷ আজ সকালে আবৃতি আপু কল করেছিল।
— আবৃতি কে? ওহ আহান স্যারের টুইন?
ঐশী ক্ষীণ গলায় বললো,
— হুম৷ আপু বললো আজ নাকি আসবে আমাদের বাসায়।
— ওমা তাহলে খুব ভাল। তুই ভয় পাচ্ছিস কেন অযথা?
— না মানে ভাইয়া বা আম্মু মানবে তো?
— আশ্চর্য মানবে কেন। আহান স্যার কোন দিক থেকে তো কম নয়। সুদর্শন, ওয়েল এডুকেটেড। না মানার তো কিছু দেখছিনা এখানে তুই অযথা টেনশন নিচ্ছিস ঐশী। চিল থাক। আর মনে মনে আহান স্যারের বৌ হওয়ার প্রস্তুতি নে।
ঐশী তবুও নিশ্চিন্ত হতে পারলনা।
★
— ইয়া আল্লাহ এটা বাড়ি না রাজ প্রাসাদ। হ্যাঁ রে মা ওমন বড় ঘরের মেয়েকে দেবে তো আমাদের কাছে?
— ভাবি আগে তো ভেতরে চলুন। তারপর না হয় দেখি ওনারা কি বলেন।
বাড়িতে এই সময় এতগুলো অতিথি দেখে বাড়ির কাজের লোক জোবায়দা চৌধুরীকে ডাকতে গেলেন। জোবায়দা চৌধুরী আবৃতি আর সাথের অপরিচিত একজন ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলাকে দেখে বেশ অবাক হলেন। সাথে এও আবিষ্কার করলেন ভদ্রমহিলার আদলের সাথে আবৃতির ব্যাপক সাদৃশ্যতা রয়েছে। আবৃতি ওনাকে দেখে মৃদু স্বরে সালাম দিল। জোবায়দা চৌধুরী সালামের জবাব দিলেন। নিজের বিভ্রান্তি লুকিয়ে অমায়িক হেসে বললেন,
— সেকি আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেন। বসুন বসুন। রিমলি স্নাকস আর ঠান্ডা কিছুর ব্যবস্থা কর জলদি।
— রেণু আনতাছে আম্মা।
— প্লিজ ব্যস্ত হবেন না আন্টি। আপনি এদিকে আসুন।
আবৃতি টেনে ওনাকে নিজের পাশে বসালো। বললো,
— আন্টি সব পরে হবে। আপনার কাছে আমরা একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
জোবায়দা চৌধুরী মনে মনে একটু আশংকা করেছেন যদিওবা তবুও শুধালেন,
— কি প্রস্তাব মা?
আবৃতি চোখ দিয়ে ইশারা করলো মাকে। জাহানারা বেগম নড়েচড়ে বসলেন। স্মিত হেসে বসলেন,
— আপা আপনার ছোট মেয়ে ঐশীকে আমার ছেলে আহানের জন্য খুব পছন্দ হয়েছে। যদি আপনি মত দেন আমি ঐশী মাকে আমার ছেলের বৌ করে নিতে চাই।
জোবায়দা চৌধুরি থমকালেন। আহান তো ঐশীর টিচার। তার মানে? ওনাকে আর কষ্ট করে ভাবতে হলোনা। আবৃতি বললো,
— আন্টি আহান আর ঐশী দু’জনে দু’জনকে অনেক দিন থেকে পছন্দ করে। তাই আমার মনে হয় দু’জনের চারহাত এক করে দাওয়া ভালো হবে। যদি আপনারা রাজি থাকেন তো।
— আপা আমার ছেলেটা খুব ভাল। এটা আমি হলফ করে বলতে পারব। আপনি এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখেন কেউ আমার সন্তানদের নামে খারাপ বলতে পারবেনা৷
— ছিঃ ছিঃ আহান বাবাকে আমি কাছ থেকে দেখেছি। আর সবচেয়ে বড় কথা ছেলেমেয়ে যদি একে অপরকে চায় তবে আমি কেন বাঁধা হব? তার আগে আমার একমাত্র ছেলে ঐক্য ঐশীর বড় ভাই। বলতে পারেন ওই ঐশীর আরেকজন অভিভাবক। আমার ছেলেমেয়ে দুটো আহান আবৃতির মতোই এতিম৷
— দাঁড়াও মা। ঐক্য বাড়িতেই আছে। ছেলের অনুমতি না নিয়ে আমি কোন সিদ্ধান্ত তোমাদের জানাতে পারছিনা।
— জি জি আন্টি আপনি ডাকুন ওনাকে।
জোবায়দা চৌধুরী জোরে জোরে একজন সার্ভেন্টকে ডাকলেন। বললেন,
— ঐক্য টেরেসে আছে। ওকে বলো আমি ডাকছি।
মহিলাটি স্বায় জানিয়ে চলে গেল।
.
ওয়াফাকে কোলে নিয়ে ঐক্য বড়বড় পা ফেলে নিচে নামল। সিঁড়ির দোর গোড়ায় শাড়ি পরিহিত আবৃতিকে দেখে থমকে গেল এক প্রকার। ঐক্যকে আসতে দেখে আবৃতি একটু জড়োসড়ো হয়ে বসলো। আবৃতিকে দেখেই ‘সুইটি আন্টি’ বলে ওয়াফা একপ্রকার লাফিয়ে নেমে গেল ঐক্যর কোল থেকে। আবৃতি হেসে দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে আগলে নিল ওকে।
ঐক্য সালাম দিয়ে বসলো সোফায়। আরশানকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে আদর করে দিল। জোবায়দা চৌধুরী বললেন,
— আরশান ওয়াফা দাদুভাই তোমরা লনে গিয়ে খেলো কেমন?
দুজন স্বায় জানিয়ে দৌড়ে চলে গেল। আবৃতি উৎকন্ঠিত হয়ে বললো,
— ধীরে সোনারা। আস্তে যাও।
ওরা যেতেই জোবায়দা চৌধুরী ঐক্যকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
— ঐক্য ঐশী আর আহান দুজন দু’জনকে পছন্দ করে অনেক আগে থেকে। এখন ওনারা পয়গাম নিয়ে এসেছেন তোমার বোনের জন্য। দেখ আমার কোন আপত্তি নেই এখানে। তুমি কি বলো?
ঐক্য অবাক হতেও হলোনা। ও আগে থেকেই কিছুটা আন্দাজ করেছিল কাল ঐশীর অদ্ভুত আচরণ দেখে। তারপর নিজের সোর্স লাগিয়ে খোঁজ নিয়েছিল মেডিকেলে কারো সাথে সম্পর্ক আছে কিনা। ওর বিশ্বস্ত লোকটা এটুকু তথ্যই দিতে পেরেছে যে ঐশীর সাথে ওর কোন এক টিচারের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সেই টিচার যে আহান এটা জানতে পারেনি। ঐক্য এক পলক আবৃতির দিকে চাইল। আবৃতি চোখে আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। ঐক্য মৃদু হেসে বললো,
— আন্টি, আঙ্কেল আপনারা তো জানেনই সামনে ঐশীর ফাইনাল প্রফ এক্সাম। তাই আমি চাইছি ওদের বিয়ে নিয়ে নাহয় আমরা পরীক্ষার পর ভাবি?
আবৃতির বুকের উপর থেকে মনে হয় একটা বিশাল পাথর নেমে গেল। কৃতজ্ঞতায় চকচক করে উঠলো চোখ জোড়া। জাহানারা গদগদ হেসে বললেন,
— আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ। সমস্যা নেই বাবা। আমরা নাহয় আরো কিছু মাস অপেক্ষা করব। কিন্তু আপা এখন বাগদানটা সেরে রাখতে চাই। আমার বৌমাকে নিয়ে আমি কোন ঝুঁকি নিতে চাইনা।
জোবায়দা চৌধুরী বিস্তর হাসলেন ওনার কথায়। বললেন,
— আচ্ছা আপা। আপনি যা ভাল মনে করেন।
জাহানারা মিষ্টিমুখ করা জন্য একটা মিষ্টি এগিয়ে ধরলেন। বিগলিত হেসে বললেন,
— নিন আপা মিষ্টিমুখ করুন। আমরা বেয়াইন হতে চলেছি।
জোবায়দা চৌধুরী জাহানারার হাতটা রোধ করলেন। সবাই অবাক হলো ওনার কান্ডে। জাহানারা বিভ্রান্ত হয়ে বললো,
— কি হয়েছে আপা?
জোবায়দা একপলক আবৃতি আর নিজের ছেলের দিকে তাকালেন। তারপর নরম গলায় অনুরোধ মিশিয়ে বললেন,
— আপা আপনি তো আমার মেয়ে চেয়ে নিলেন। এবার আমাকেও যে দিতে হবে।
— মা..নে কি দেব আপা?
— আমার আবৃতি মাকে আমার ঐক্যর জন্য চাই।
আবৃতি হতবাক হয়ে ত্রস্ত ঐক্যর দিকে তাকাল। ঐক্য অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে নিল। এখানে বসে থাকবে নাকি চলে যাবে বুঝতে পারলনা। জাহানারা বিস্ময়ে কথা বলতে ভুলতে গিয়েছেন৷ চোখ ঘুরিয়ে তাকালেন মাথা নুয়ে রাখা ঐক্যর দিকে। যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না কিছুই। আমতাআমতা করে বললেন,
— আপা আবৃতি..
— আমি সব জানি আপা৷ আমার মনে হয় আপনিও আমার ছেলের ব্যাপারে অবগত। আপা আমি আজকে আমার বড় ভাইজানকে পাঠাতাম আপনার দুয়ারে। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা দেখেছেন? তিনি আমাদের আরো দুইজন ছেলেমেয়ের উসিলায় আমাদের এত সুন্দর সাক্ষাৎ করিয়ে দিলেন। আপা বিশ্বাস করুন আমার নাতনি মা হারা হওয়ার পেছনে আমার ছেলের কোন ভূমিকা নেই। আমার ছেলে সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখেনি। আমি নিজে তার সাক্ষী।
আবৃতি মাথা নিচু করে সোফার কভার খামচে ধরলো। ওর টানা চোখ দুটো কখন যে ভরে উঠেছে টের পেলনা।
জাহানারা বেগম এক পলক সোফায় স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা মেয়েকে দেখলেন। ধরা গলায় বললেন,
— আপা একবার মেয়ের অনুমতি না নিয়ে বিয়ে দিয়ে অনেক বড় ভুল করেছি। এবার অন্তত সেই ভুল আর করতে চাইনা। আপনি আবৃতিকে জিজ্ঞেস করুন। ও যদি রাজি থাকে আমার আপত্তির প্রশ্নই আসেনা।
জোবায়দা চৌধুরী উঠে আবৃতির পাশে বসলেন। ওর নিচু করে রাখা মুখটা তুলে সরব গলায় বললেন,
— মা মানুষের জীবনে সবসময় ভুল মানুষ আসেনা। কখনো কখনো দ্বিতীয় সূচনা জীবনে নতুন করে পরিপূর্ণতা নিয়ে আসে।
আবৃতি ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করে বললো,
— আমার একটু ভাববার জন্য সময় চাই আন্টি প্লিজ।
জোবায়দা চৌধুরী হেসে বললেন,
— সমস্যা নেই মা। তুমি নাও যত সময়। কিন্তু উত্তরটা যেন হ্যাঁ হয় মা।
আবৃতি ফের মাথা নিচু করে নিল। না তাকিয়েও অনুভব করলো ঐক্যর নিবিড় দৃষ্টি ওর পানেই নিবদ্ধ। জাহানারা বেগম ব্যস্ত পায়ে উঠে দাড়িয়ে বললেন,
— আজ তাহলে আসি আপা। বিদায় দিন আমাদের।
জোবায়দা চৌধুরী হাত টেনে ওনাকে বসিয়ে দিলেন। রয়েসয়ে বললেন,
— না আপা। এখন তো ছাড়ছিনা আপনাদের। একেবারে লাঞ্চের পর ফিরবেন।
— না না আপা একি বলছেন।
ঐক্য নম্র গলায় অনুরোধ করে বললো,
— প্লিজ আন্টি। আমি একবার আপনার বাড়িয়ে তৃপ্তি করে খেয়েছি। আজ অন্তত আমাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করুন৷
জাহানারা আর না করতে পারলেন না। অগত্যা ফের খোশ আলাপে মেতে উঠলেন সবাই। শুধুমাত্র ঐক্য আর আবৃতিই চুপচাপ থম মেরে বসে ছিল। ঐক্য হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে কাচুমাচু ভঙ্গিতে বললো,
— আম্মু আমি মিস আবৃতির সাথে কিছু কথা বলতে চাই। আমি ছাদে অপেক্ষা করছি।
এই বলে ঐক্য নিরবে প্রস্থান নিল। আবৃতি মায়ের দিকে তাকাল। জাহানারা মেয়েকে বললেন,
— যা মা। আলাদা একটু কথা বলে নে।
— হ্যাঁ মা নিজেরা নিজেদের মধ্যে একটু বোঝাপড়া করে নাও।
.
ধীর পায়ে ছাদে প্রবেশ করে আবৃতি দেখে ঐক্য ছাদের রেলিং আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে ওপাশ ফিরে। পরনো একটা সাদা টিশার্ট আর কালো টাউজার। মাথা নিচু করে নিচে কি যেন দেখছে মনোযোগ সহকারে। আবৃতি সন্তর্পণে গুটি গুটি পায়ে ঐক্যর নিকট এগিয়ে আসলো। আবৃতির উপস্থিতি লক্ষ্য করেও ঐক্যর মধ্যে ভাবাবেগ দেখা গেলনা৷ কুণ্ঠিত আবৃতি ঐক্যর দৃষ্টি লক্ষ্য করে নিচে তাকালো। দেখলো ওয়াফা আরশান ছোটাছুটি করছে আর খিলখিল করে হাসছে। আবার একজন আরেকজনকে ধরে ফেললে হাসতে হাসতে নরম ঘাসে হাত-পা ছড়িয়ে বসে যাচ্ছে। ওদের দেখে আবৃতির মুখে অটোমেটিক হাসি ফুটে উঠলো।
— দৃশ্যটা অনেক সুন্দর তাইনা?
আবৃতিকে অবাক করে দিয়ে ঐক্য হঠাৎ বলে উঠে। আবৃতি তড়াক চোখ ঘুরিয়ে ঐক্যর দিকে তাকায়। ঐক্যও সাথে সাথে আবৃতির চোখে চোখ রাখল। আবৃতি ইতস্ততভাবে চোখ নামিয়ে বললো,
— খুব সুন্দর!
— আমার আঙিনায় প্রতিদিন এই আই সুদিং দৃশ্যটা আমি দেখতে চাই মিস আবৃতি৷ যদি আপনি সেই সুযোগটা দিন তো। ওয়াফা আরশান এভাবে ছোটাছুটি করবে আর আমরা দু’জন পাহারা দেব। সুন্দর হবে না?
আবৃতি শাড়ির আঁচল খামচে ধরলো। ঠোঁট কামড়ে নিজের উগলে আসা অশ্রু নিবারণের চেষ্টায়। ঐক্য কেমন যেন অনুনয় করে বললো,
–আবৃতি চলুন না দু’জনে এই ঘুণে ধরা জীবনটাকে দ্বিতীয়বার একটা সুযোগ দিয়ে দেখি। আমার না মনে হচ্ছে এবার আমরা কেউই ঠকবনা।
আবৃতির টলমল অশ্রুতে ভাসা চোখের কার্ণিশ টপকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। ঐক্য বড্ড সাহস করে সেই জলটুকু নিজের দুই আঙুল দিয়ে মুছে দিল।
— কাঁদবেন না আবৃতি। নিজের সাথে লড়তে লড়তে আমরা ভুলেই গিয়েছি আমাদেরও অনুভূতি আছে, আছে সুখে থাকার অধিকার। এভাবে একাকী নিঃসঙ্গ জীবনটা বয়ে নিয়ে আমরা শুধুমাত্র নিজেকেই ঠকাচ্ছি। আর নয় চলুন এবার দু’জন দুজনকে আঁকড়ে ধরে দেখি। একটু সাহস করে শুরু করি জীবনের দ্বিতীয় সূচনা।
চলমান…..