গল্প: চলো না আজ এ রুপকথা তোমাকে শোনাই (১৩)

পর্বসংখ্যা:১৩

 

লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী

নির্বাচন শেষ। ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই শহরের বাতাস বদলে গেল। কায়রাভ তাজওয়ার খান চব্বিশ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলো। অবশেষে সে বিজয়ী, নির্বাচিত হয়েছে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পাঁচ আসনের এমপি হিসেবে। খান বাড়িতে বসার ঘরে টিভির পর্দায় ঝলমল করছে ব্রেকিং নিউজ। কায়রা আর কায়েশী পাশাপাশি সোফায় বসে দেখছিল। আর কায়েশীর কোলে কায়ান বসেছিলো। কায়রাভকে যতবার টিভির পর্দায় দেখাচ্ছিলো ততবার কায়ান বাবা-বাবা বলে লাফিয়ে উঠে খুশিতে। আবার কায়রার বুক ঢিপঢিপ করছিল উত্তেজনায়। ফলাফল কি হবে তাই ভেবে। কিছু মুহূর্ত পরেই কায়রাভের বিজয়ের খবর শুনলে সে সোফা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। আঙুল গোল করে সিটি বাজাতে বাজাতে কায়ানকে উঁচু করে তুলে ধরে নিয়ে ঘুরতে লাগলো। তার চোখে মুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস, যে তার ভাইজান জিতেছে!

কিন্তু কায়েশী স্বভাবসুলভ নিরুত্তাপ। তার মধ্যে কোনো হম্বিতম্বি নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে যেতে উদ্যত হতেই কায়রা খপ করে কায়েশীর হাত ধরে ফেলল।
“আরে ভাবী, কোথায় যাচ্ছো? সেলিব্রেট করতে হবে তো নাকি? জানি, এসব তোমার ভালো লাগবে না, কিন্তু আমার লাগবে। এখন চুপচাপ বসো, নড়বে না একদম। আমি ফ্রিজ থেকে মিষ্টি আনছি। “

কায়েশী কিছু বলল না। কায়রার জেদ ঠেলতে না পেরে অগত্যা ধীর পায়ে আবার সোফায় বসল। এক পলক টিভির দিকে তাকাল। পর্দায় কায়রাভ শুভ্র পাঞ্জাবির ওপর সাদা শাল গায়ে জড়িয়েছে, আর হাসিমুখে হাত নেড়ে মানুষকে অভিবাদন জানাচ্ছে। এসব দেখতে দেখতে কায়েশীর মনে হলো, লোকটাকে এখন পাক্কা নেতা লাগছে, নাহ সে তো আর নেতা নয়। এমপি হয়ে গেছে। হেডলাইন, ব্রেকিং নিউজ সবখানেই শুধু তার নাম জপছে সবাই। কায়রা ফিরে আসার আগ পর্যন্ত কায়েশীর দৃষ্টি সেই পর্দার ওপারে কায়রাভের উপরই আটকে রইল। আশ্চর্য, সামনাসামনি নিজ ইচ্ছায় লোকটাকে কখনো এমন করে দেখার আগ্রহ জাগেনি তার। ভাবনার ফাঁকে কায়রা এসে মুখের সামনে মিষ্টি ধরল। বলল,
” নাও, হা করো।”

কায়েশী হা করতেই কায়রা পুরো মিষ্টি মুখে গুজে দিল। তারপর নিজেও খেল একটা মিষ্টি। কায়েশীর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে নাচিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“তো বলুন ম্যাডাম, এমপির বউ হয়ে অনুভূতি কেমন?”

কায়েশী মেকি হাসি হেসে উত্তর দিল,
” অনুভূতি…শূন্য।”

কায়রা চোখ ছোট করে তাকাল।
“তুমি তো বলেছিলেভাবী, সব ঠিক করে নেবে, চেষ্টা করবে। তাহলে এসব কি কথা? “

কায়েশী ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়ল।
“চেষ্টা তো করছি। তাই তোমার ভাইয়ের সাথে গত দুদিন ধরে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছি, ঝগড়া করিনি এখনো। আর কি করতে বলো? “

কায়রা হেসে ফেলল। সেই হাসির মানে কায়েশীকে কোনো কিশোরীর চেয়ে কম লাগল না তার কাছে। যেন অনেক বড় কিছু করে ফেলেছে সে এমনভাবে কথা বলল। কায়রা বলে,
” করতে তো অনেক কিছুই হবে, ভাবী। এক কাজ করো, আজ একজন ভালো বউয়ের দায়িত্ব পালন করো। “

কায়েশী ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকতেই কায়রা মিষ্টির বাক্সটা তার হাতে ধরিয়ে দিল।
“এইটা রাখো। ভাইজান আসলে তুমি নিজ হাতে তাকে বিজয়ের মিষ্টি খাইয়ে দেবে।”

কায়েশী সরাসরি বলল,
“তুমি খাইয়ে দিও। আমি পারবো না। রাজনীতিই আমার অপছন্দ, তার ওপর সেই বিজয়ের মিষ্টি! না, আমি পারবো না।”

কায়রার রাগ হলো এবার। এত হঠকারিতা মানতে পারবে না সে। তাই দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এই জন্যই তোমাদের সম্পর্ক কোনোদিন ঠিক হবে না। আমার ভাইজান দশ পা এগোলেও তুমি এক পা বাড়াও না। সম্পর্কটাকে একা আর কত টানবে সে? এখনো সেই সো কলড অতীত নিয়ে পরে আছো।থাকো, আর কিছু বলবো না তোমাকে। থাকো তোমরা যেমন আছো, আমার কি! “

এই বলে রেগেমেগে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল কায়রা। আর কায়েশী, মিষ্টির বাক্স হাতে অপলক দৃষ্টিতে শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রইল।

——————————–

ওদিকে আলতাফ মির্জা আবারও হারলো হাঁটুর বয়সী এক ছেলের কাছে। আবার! আবার! আলতাফের চোখে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন। মনে মনে বদলার নকশা এঁকে সে দলবল নিয়ে স্থান ত্যাগ করল।

আর কায়রাভের দলে উচ্ছ্বাসের ঢেউ। তিন-চারটা গাড়ি, দশ-পনেরোটা বাইক নিয়ে রাস্তায় নামলো সবাই। সব মিলিয়ে বিজয় মিছিল চলছিলো।কায়রাভও তাদের সঙ্গে বিজয়ের আনন্দে যোগ দিল। হাসিমুখে মানুষের দিকে হাত নাড়িয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো। তাকে বড্ড স্নিগ্ধ লাগছিল, কারণ শুভ্র পাঞ্জাবির সাদা শাল জড়ানো। আর মুখভরা আত্মবিশ্বাসের ছাপ। দু’চক্র ঘুরে গাড়ি থামাতে বলল কায়রাভ। গাড়ি থেকে নেমে দলের উদ্দেশ্যে বলল,
“তোরা মজামাস্তি কর, তবে সামলে। আমি এখন বাড়িতে যাবো। আর এই টাকাটা রাখ।”

ওয়ালেট থেকে মুঠোভর্তি হাজার টাকার নোট এগিয়ে দিতেই দলের এক ছেলে বলল,
” লাগবো না ভাই। আমাগো যা আছে, এতেই চইলা যাবো।”

কায়রাভ জোর করেই হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে বলল,
“বেশি কথা বলিস না। তোরা আমার জন্য অনেক খাটিস। মুলতঃ তোরা না থাকলে এই কায়রাভ কিছুই না। তোদের নিজের ভাইয়ের চেয়ে কম কিছু ভাবিনি কোনোদিন। এখন কথা না বলে রাখ টাকাটা। “

যাওয়ার আগে সবুজের উদ্দেশ্যে বলল,
” আর সবুজ শোন, “

সবুজ বলল,
“জ্বি ভাই, কন… “

কায়রাভ বলে,
“কাল পোলাপান নিয়ে পার্টি অফিসে থাকবি সকালে।
কাল সভা আছে, এলাকাভিত্তিক কিছু ইউনিটের কাজ দেখতে হবে। আর আলতাফের ব্যাপারটা পরে দেখছি। একটু গুছিয়ে বসি আগে। ওদের রয়েসয়ে ধরবো। “

শেষের কথায় ক্রুর হাসলো কায়রাভ। সবুজসহ বাকি সদস্যরা বুঝে গেলো কি হবে বা হতে পারে। এরপর আর কেউ কোনো কথা বলল না। কায়রাভ নিজের গাড়িতে উঠল আর খান বাড়ির দিকে রওনা দিল জয়ের উল্লাস আর অদৃশ্য ভার দুটোই বুকে নিয়ে।

——————————–

বাড়িতে পৌঁছে কায়রাভ দেখে বেজমেন্টে কেউ নেই। নিস্তব্ধতার ভেতর এক কোণে একা বসে আছে কায়ান। খেলনা গাড়িগুলোকে সারিবদ্ধ করে আপন মনে খেলছে সে দিনদুনিয়া ভুলে। কায়রাভকে দেখামাত্রই কায়ানের চোখদুটো ঝলমল করে উঠল। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে কায়রাভ এগিয়ে গিয়ে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিল। বাবার গলায় ছোট্ট দু’হাত জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে কায়ান বলে উঠল,
“বাবা, আজকে তুমাকে দেকচি… টিবিতে!”

কায়রাভ আদর করে কায়ানের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতে হেসে বলল,
“তাই নাকি আব্বা? টিভিতে আমাকে দেখেছো?”

“হুম।”

মাথা নেড়ে গর্বের সঙ্গে উত্তর দেয় কায়ান। কায়রাভ আস্তে স্বরে জানতে চায়,
“আপনার মা কোথায়?”

“লান্না শেষ করে ঘরে চলি গেচে।”

কায়রাভ মৃদু হেসে ছেলের কপালে এক চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“তাহলে আমরাও ঘরে যাই, চলুন।”

কায়ানকে কোলে নিয়েই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল কায়রাভ। ঘরে ঢুকেই তার চোখে পড়ল কায়েশীর উপর। বিছানার এক পাশে হেলান দিয়ে বসে আছে সে। শরীরটা নির্জীব, চোখদুটি মেঝের দিকে স্থির করা। কায়রাভ কায়ানকে তার পাশে বসিয়ে দিল খেলনাগুলো দিয়ে। কায়রাভকে দেখামাত্রই কায়েশী উঠে দাঁড়াল। টেবিলের ওপর রাখা মিষ্টির বাক্স থেকে একটা মিষ্টি তুলে নিল হাতে। তারপর সেটি কায়রাভের মুখের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
” নিন, আপনার বিজয়ের মিষ্টি। এটা না খাওয়ালে নাম হবে কায়রার ভাবী খারাপ! “

কায়রাভ সামান্য ভ্রু কুঁচকে দুষ্টু হেসে বলল,
“বিষ-টিষ মিশিয়েছো নাকি মিষ্টিতে? না মানে… এত আদর করে খাওয়াচ্ছো তাই!”

কায়েশী চোখ তুলে তাকাল। ভালো কিছু করলেও যেন তার দোষ! তার ভাইয়ের শয়তানিগুলো কায়রা কোনোদিন দেখবে না। দেখবে শুধু তার ভাবীর খুঁত, তার ভাবীর দোষ! রাগ চাপা রাখতে না পেরে কটু স্বরে বলে উঠল,
” হ্যাঁ, মিশিয়েছি বিষ।”

কায়রাভ হেসে তৎক্ষনাৎ কায়েশীর হাত থেকে মিষ্টিটা নিয়ে মুখে পুরে নিল। খাওয়া শেষে এক ঢোক পানি গলায় ঢেলে শান্ত কণ্ঠে বলল,
” তুমি দিলে বিষও আমি সাদরে গ্রহণ করব, কায়েশী। কিন্তু মরার আগে একটা চু’মু চাই।”

কায়েশী হতবাক হয়ে ততৎক্ষনাৎ পেছনে সরে যায় এমন কথায়। আর অপলক তাকিয়ে রইল তার দিকে। এসব কী কথা! এ কি নিছক হেয়ালি, নাকি তার প্রতি অবজ্ঞা? অথচ সবার সামনে নিঃশর্ত ভালোবাসার কোনো প্রমানের অভাব রাখে না সে। কায়রাভ কায়েশীকে আর কিছু না বলে কায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আব্বা, মিষ্টি খাবেন একটা? দেই? “

কায়ান মাথা নাড়িয়ে খেলতে খেলতে নিষ্পাপ কণ্ঠে বলল,
” না, খেয়েচি। মা খাইয়ে দিচে। “

কায়রাভ মৃদু হেসে বলল,
“আচ্ছা।”

এরপর কায়রাভ ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।
কায়েশী সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল, চুপচাপ তবে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে। বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা আর সহ্য হচ্ছে না। আজ কিছু একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। এই নীরবতা, হেয়ালি, এই অব্যক্ত ক্ষোভ, এইসব কিছু মিলিয়ে তার ভালো লাগছে না একদম। সবাই পেয়েছেটা কি তাকে! আজ কথা বলতেই হবে কায়রাভের সাথে। সব বলবে সে।

**************************

প্রীতিষা টিউশন করিয়ে ফিরছিল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে, রাস্তার ধুলোয় ক্লান্তিটা আরও বাড়ছে। মাঝপথে উঁচু সিমেন্টের ঢিবির ওপর বসে পড়ল সে। হঠাৎ করেই শরীরটা ক্লান্ত লাগছে, যেন কাঁধে অদৃশ্য বোঝার ভার। নিজের জন্য দু’মিনিট সময়ও তার নেই, এই ভাবনাটাই তার বোঝা। চুপচাপ বসে বসে ডান হাতটা তুলে ধরল চোখের সামনে। হাতের তালুর মাঝ বরাবর কাটা, ক্ষতস্থান। কাল রাতে দা দিয়ে সবজি কাটার সময় হাত পিছলে গিয়ে এমনভাবে কেটেছে যে এখনো জ্বালা কমছে না। ব্যথা ঢেকে রাখতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।

ঠিক তখনই পাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত একটা গলার স্বর,
“এনে একা একা বইসা আছো ক্যান?”

প্রীতিষা মুখ তুলে তাকাল। কাবির এসেছে! মুহূর্তেই তার মুখের ভাবমুর্তি পাল্টে গেল। ক্লান্তি ঢেকে দিয়ে হালকা হাসি টেনে আনল ঠোঁটে। ঢিবি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলল,
“কেমন আছো তুমি?”

“ভালো। হাতে কী হইছে? ব্যান্ডেজ ক্যান? আবার কোন আকাম করছো?”

কাবিরের চোখ হাতের দিকেই পড়েছে প্রথমে। প্রীতিষা দ্রুত হাতটা আড়াল করে ফেলল।
“ও কিছু না। সামান্য কেটে গেছে। তুমি কি কাজ থেকে ফিরছিলে? বাসায় যাবে না?”

কাবির কপাল থেকে চশমা নামিয়ে শার্টে বুকের কাছটায় গুজলো। এরপর হঠাৎ জোর করেই প্রীতিষার হাতটা সামনে টেনে ধরল।
“উ-হু! কথা ঘুরাইয়ো না, বেডি। আগে হাত দেখবার দেও!”

প্রীতিষা চোখ তুলে তাকাল। বড্ড মনোযোগ দিচ্ছিলো কাবির প্রীতিষার হাতের দিকে তাকিয়ে। তা দেখে কি ভেবে যেন প্রীতিষা বলল,
“এই যে হাত ধরেছো, সেটা কোন অধিকারে? খবরদার এড়াবে না কথাটা! ”

এইবার কাবির থামল। চোখে চোখ রেখে সে নিজেও বলল,
“সম্পর্কের নাম চাইতাছো? কি নাম চাও, প্রেমিকা?”

প্রীতিষা একটুও দমল না। হুট করেই তার সাহস বেড়ে গেছে আজ। সাহস করেই বলল,
“নাহ। আমি কারো প্রেমিকা হতে চাই না। বউ হতে চাই।”

কাবির হাত ছেড়ে দিল। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“ওইডা বহুত জটিল বিষয়। আমার কিন্তু বিয়া-সাদির কোনো প্ল্যান নাই।”

প্রীতিষা চোখ সরু করে তাকাল। বলল,
“বিয়ের প্ল্যান করবে কেন? তুমি তো ভণ্ডামি করেই বেশ আছো! তোমার বিয়ের প্রয়োজন কি? ”

কাবির হো হো করে হেসে উঠল। প্রীতিষার বাহুতে জোরে চাপড় দিয়ে বলল,
“এই তো, ছেমরি! ঠিক চিনছো আমারে।”

প্রীতিষা হতভম্ব হয়ে রইল। কাবিরের আস্তে চাপড়ও জোরেই লেগেছে প্রীতিষার বাহুতে। রীতিমতো হাত দিয়ে চেপে ধরতে হয়েছিলো ব্যাথা পাওয়া হাতে। এই মানুষটাকে কীভাবে শোধরাতে হবে, সে নিজেও জানে না। শুধু জানে, চেষ্টা না করলে নিজের কাছেই হেরে যাবে সে। তবে মানুষ তো করতেই হবে বুনো ষাড়টাকে, সে যেভাবেই হোক। কাবির হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল,
“একসময় আমিও বিয়া-সাদির স্বপ্ন দেখছিলাম একজনের লগে, তাও বড় ভাইয়ের জোরে। কিন্তু আনফরচুনেটলি সেইডা হয় নাই। এক হিসাবে, ভালোই হইছে। সে আমার থেকেও ভালো একজন পাইছে। এখন তারা সুখে থাকলেই হইলো। ”

প্রীতিষা অবাক চোখে তাকাল।
“তোমার কি গার্লফ্রেন্ড ছিলো? কই আগে তো কখনো বলো নি! ”

“ধুর! গার্লফ্রেন্ড-টালফ্রেন্ড না। জীবনে প্যারা নেই নাই ওইসব, কারণ লুতুপু’তু আমার দ্বারা হইতো না। তবে ভালো লাগা আছিলো। সে খুব চাইতো আমারে। তার ভালোবাসার অনুভূতিটা আছিলো তীব্র। সেই তীব্র ভালোবাসার মায়ায় পরছিলাম, না চাইতেও।”

প্রীতিষা ব্যাথাতুর দৃষ্টিতে তাকায়। চোখে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। প্রীতিষার চোখে অদ্ভুত যন্ত্রণা কাবির টের পেয়ে বলল,
“আরে! আগেই প্যা-পু কইরা কাইন্দো না। পুরাডা শুনবা তো! ভালো লাগা আছিলো কইছি, ভালোবাসা না। দুইটা কিন্তু আলাদা জিনিস। তাছাড়া, ভালোবাসা থাকলে আমি তারে কখনো ভুলতে পারতাম না। এইডা ফ্যাক্ট। ”

কথা বলতে বলতে তারা হাঁটছিল। প্রীতিষার বুকটা ধীরে ধীরে হালকা হলো। কাবিরের আশ্বস্ত করায়। তবুও কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে সে জিজ্ঞেস করল,
“মেয়েটা কি খুব সুন্দরী ছিলো? আমার থেকেও অনেক সুন্দর?”

কাবির মুচকি হেসে বলল,
“সুন্দর? হ, মেলা সুন্দর আছিলো। এক্কেরে ধবধবা সাদা যারে কয়। চোখ-মুখ-নাক-কান সব একেবারে আল্লাহ ঠিকঠাক জাগায় বসায়া তারে যত্ন করে পাঠাইছিলো, এমন লাগে দেখলে।”

প্রীতিষা নিজের হাতের দিকে তাকাল। সে-ও ফর্সা, তবে অত ধবধবা সাদা নয়। নাকটাও একটু বোচা। ভাবতে ভাবতে অজান্তেই নাকে হাত দিল। সব লক্ষ্য কাবির বলল,
“কিন্তু আমার অত সুন্দর মেয়া পছন্দ না। আমার পছন্দ ডাগরডোগর চোখ আলা, বোচা নাক আলা মেয়া। আর এত ফর্সা দিয়া কী হইবো? ফর্সা ধুইয়া ধুইয়া পানি খামু?”

প্রীতিষা এবার হেসে ফেলল।
“কিহ! বোচা নাকওয়ালা মেয়ে পছন্দ কেন?”

কাবির বড্ড গুরুতর ভঙ্গিমায় নাক কুচকে বলল,
“ কারণ, চু’কা নাক আলা মেয়ারা স্বামীর অবা’ধ্য হয়।”

এই শুনে হাসতে হাসতে প্রীতিষার চোখ বুজে এলো। প্রীতিষা মুহুর্তেই যেন সব ভুলে বসলো। সেই হাসির আড়ালে কাবির তাকিয়ে রইল তার দিকে,প্রীতিষার অগোচরে। সেই মুগ্ধ দৃষ্টির কথা জানলো না প্রীতিষা। এইযে হাসছে মেয়েটা, এখনই প্রীতিষাকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে হিসেবে মনে মনে আখ্যায়িত করলো কাবির। এই মুহূর্তে, এই হাসিটুকুই তার চোখে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। প্রীতিষা তো আর জানে না, কাবিরের চোখে সে কেমন? ছোটখাটো গড়নের মেয়েটা চট করেই যেন কাবিরের হৃদয় ফেঁড়েফুঁড়ে ঢুকে পড়লো এবার। এখান থেকে বেরোনোর আর পথ নেই তার।

প্রীতিষা হাসির থামিয়ে হালকা স্বরে বলল,
” হয়েছে চলো, সন্ধ্যা নেমে আসছে। এবার বাড়ি ফেরা দরকার। নাহলে, লেট হবে বাসায় ফিরতে।”

কাবির নীরবে মাথা নেড়ে হাঁটা ধরল। পাশে পাশে প্রীতিষাও। রাস্তার আলো তখনো পুরো ফুরায়নি, চারপাশে কেমন এক অস্থির গোধূলি। হঠাৎ করেই প্রীতিষার মাথার ভেতর যেন ঘূর্ণি তুলল। চোখের সামনে ঝাপসা অন্ধকার নেমে এলো মুহূর্তে। কিছু সেকেন্ডের ব্যবধানে সে চারপাশে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। মাথায় হাত দিয়ে সামলে নিতে গিয়েও পারল না। পা দুটো শক্তি হারিয়ে ফেলল। পড়ে যাবে ঠিক তখনই কাবিরের বলিষ্ঠ দু’হাত তাকে আঁকড়ে ধরল, শক্ত করে। প্রীতিষা অবচেতনে শরীর ছেড়ে দিয়েছে ততক্ষণে। আকস্মিক ঘটনায় কাবির থমকে প্রীতিষাকে ডাকে,
” প্রীতি! কী হইলো? এই… অসুস্থ তুমি?”

কথা বেরোল না প্রীতিষার মুখ দিয়ে। হঠাৎ করেই বাকশক্তি যেন কেড়ে নিল অদৃশ্য কিছু। কাবির তাকে ধীরে করে পাশে একটা বেঞ্চের ওপর বসাল আর নিজে হাঁটু গেড়ে মাটিতেই বসল। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। নিস্তব্ধ, শ্বাসের শব্দ ছাড়া কিছুই নেই। অবশেষে চেতনা ফিরতেই প্রীতিষা দুর্বল হাসি হেসে বলল,
“চিন্তা করো না। আমার লো আইরনের সমস্যা আছে তো, তাই হঠাৎ হঠাৎ এমন মাথা ঘুরে যায়। এখন ঠিক আছি আমি।”

কাবির প্রীতিষার ব্যাগ থেকেই চুপচাপ পানির বোতল এগিয়ে দিল। প্রীতিষা ছোট ছোট চুমুকে পানি খেল। কাবির কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। ভয়টা তখনো বুকের ভেতর জমে আছে। কিছুক্ষণ আগেও সে ভেবেছিল, এই বুঝি কিছু হয়ে গেল! এখনো নিজের হৃদস্পন্দন কানে বাজছে তার। এত কাছে দাঁড়িয়ে, অথচ শব্দহীনভাবে সে শুধু প্রার্থনা করল, প্রীতিষা যেন সবসময় ঠিক থাকে। কারণ, এখন সে একা নয়। তার সাথে কাবিরও জড়িয়ে।

চলমান…….

 

হাই পাঠক!

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x