লেখিকা:তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
পর্ব :০৩
দুপুরের সময়। বাইরে গরমের কারণে জা’ন যায় যায় অবস্থা! ডক্টর আযলান আজওয়াদ মাত্রই ওয়ার্ড রাউন্ড শেষ করে নিজের কেবিনে ফিরেছেন। এসি-র ঠান্ডা বাতাসটা গায়ে লাগতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলের ওপর রাখা একটা ফাইলের দিকে হাত বাড়ালেন তিনি। ঠিক তখনই কেবিনের দরজায় কোনো নক না করেই হুট করে একজন ভেতরে ঢুকে পড়ল। আযলান ভ্রু কুঁচকে মাথা তুলতেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চেনা অবয়বটা দেখে মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে তুললো।
– সামিয়া তোকে বারবার বলেছি না? আমার কেবিনে নক করে ঢুকবি!
এই কথা সামিয়া নামক মেয়েটাকে প্রভাবিত করলো বলে মনে হলো না। উল্টো মেয়েটার মুখে চওড়া হাসি। পরনে এপ্রোন, গলায় ঝুলছে স্টেথোস্কোপ। মেয়েটির নাম ডক্টর সামিয়া রহমান। আযলানের মেডিকেল লাইফের বন্ধু এবং বর্তমানে এই হসপিটালেই গাইনোকোলজি ডিপার্টমেন্টে কর্মরত। অন্য কারো সাথে না হোক আযলানের সাথে তার গায়ে পড়া স্বভাব।
সামিয়া এগিয়ে এসে আযলানের টেবিলের সামনের চেয়ার টেনে বসে পড়ল। তার চোখে একরাশ ভালোলাগা আর অধিকারের ছোঁয়া। সে ব্যাগ থেকে একটা লাঞ্চ বক্স বের করে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বলল,
– নক করার ফর্মালিটি বন্ধুদের মধ্যে থাকে না ডক্টর আহিল! আর এলাম কারণ জানি তুই একা থাকলে লাঞ্চ করতে ভুলে যাবি। আজ মা নিজ হাতে তোর পছন্দের বিরিয়ানি রান্না করে পাঠিয়েছেন। চল, একসাথে লাঞ্চটা করা যাক।
আযলান সামিয়ার বাড়িয়ে দেওয়া লাঞ্চ বক্সটার দিকে একপলক তাকিয়ে একটা নিশ্বাস ফেলল। মেয়েটার এই অতিরিক্ত অধিকার খাটানো বা গায়ের পড়া স্বভাবটা তার খুব একটা পছন্দ নয়, তবে পুরোনো বন্ধু বলেই সে তিতা মুখে হলেও মেনে নেয়।
চেয়ারের ব্যাকরেস্টে পিঠ ঠেকিয়ে আযলান গম্ভীর গলায় বলল,
– তোর মায়ের হাতের বিরিয়ানি পছন্দ করি তার মানে এই না যে তুই প্রতিদিন লাঞ্চের দোহাই দিয়ে আমার চেম্বারে এসে নিয়ম ভাঙবি। পেশাদারিত্ব আর বন্ধুত্বের মাঝে একটা লাইন থাকা উচিত, সামিয়া।
সামিয়া আযলানের এই রাশভারী কথায় মোটেও দমে গেল না। সে চামচটা আযলানের দিকে এগিয়ে দিয়ে আলতো হেসে বলল,
– আহিল, তুই সারাক্ষণ নিজেকে এভাবে নিয়মের বেড়াজালে বন্দি করে রাখিস কেন বলতো? একটু রিল্যাক্স কর। এই নে, খাওয়া শুরু কর।
আযলান কিছু বলবে তার আগেই আবার নক পড়লো। আযলান ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এই সময় কে এসেছে? আযলান গলা উঁচিয়ে “কাম ইন” বলতেই গুটি গুটি পায়ে ভেতরে এলো তুহি। ওকে দেখে আযলান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছে। হঠাৎ কিছু মনে করার ভঙ্গিতে বললো,
– জান্নাতুল?
তুহির পুরো নাম জান্নাতুল ফেরদৌস তুহি। হসপিটালের ল্যাব টেকনোলজিস্ট হিসেবে তুহিকে চেনে, তবে তার পুরো নামটাই হসপিটালের অফিসিয়াল রেকর্ডে ব্যবহার হয়।
তুহি একটু হেসে বললো,
– জ্বি স্যার আমি।
আযলান ওকে বসতে বললো। তুহি এগিয়ে আসলে চোখে পড়লো সামিয়াকে। সাথে সাথে তার কপালে ভাঁজ পড়লো। এই ডক্টরকে সে চিনে। সারাক্ষণ আযলান স্যারের সাথে ঘেঁষে থাকার চিন্তা! ও বসতেই আযলান শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
– হঠাৎ আমার কেবিনে?
তুহি বিনীতভাবে একটু হেসে বলল,
– আসলে একটা রিপোর্ট দেখানোর ছিলো স্যার।
তুহির কথা শেষ হওয়ার আগেই পাশে বসা সামিয়া হুট করেই ফুঁসে উঠল। কর্কশ গলায় বলে উঠল,
– আই ক্যান্ট বিলিভ দিস! আপনি কি হসপিটালের ল্যাব টেকনোলজিস্ট হয়ে এইটুকু ম্যানার্সও জানেন না যে এটা ডক্টরদের লাঞ্চ টাইম? পেশেন্ট দেখার একটা নির্দিষ্ট শিফট আছে, যখন-তখন এভাবে কেবিনে ঢুকে পড়াটা বড্ড আনপ্রফেশনাল!
সামিয়ার এমন চড়া আর অপমানজনক সুর শুনে তুহির ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে রাগে থমথম করে উঠল। নিজের কাজ নিয়ে এরকম কথায় তার কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। ইচ্ছে করল কড়া ভাষায় মুখের ওপর জবাব দিতে, “আপু, আপনি গাইনোকোলজির ডক্টর হয়ে এই চাইল্ড স্পেশালিস্টের কেবিনে বসে প্রতিদিন লাঞ্চের নামে যে আদিখ্যেতা করেন, সেটা কতটা প্রফেশনাল?”
কিন্তু তুহি অনেক কষ্টে নিজের রাগটা হজম করল। এই মহিলাকে তার একটুও সহ্য হয়ে না। তবুও ডক্টর বলে সম্মান করে চলে। আযলান কঠোর চোখে সামিয়ার দিকে তাকালো তারপর তুহিকে বললো,
– হ্যাঁ জান্নাতুল আপনি বলেন।
– স্যারি স্যার, আমি জানি এটা আপনার ব্রেক টাইম। কিন্তু পেশেন্ট একটা ছোট বাচ্চা, তার অবস্থা বেশ খারাপ। তাই আমি নিজেই ল্যাব থেকে রিপোর্টটা জেনারেট হওয়া মাত্র নিয়ে এসেছি।
– সমস্যা নেই। কার পেশেন্ট এটা?
– স্যার আপনারই। কিন্তু রোগী আজ আসতে পারে নি তাই আমিই এলাম।
– ওহ আচ্ছা রোগীর নাম কি? রিপোর্টটা দেন।
তুহি রিপোর্টটা এগিয়ে দিয়ে বললো,
– রোগীর নাম আদনান।
রিপোর্টটা নিতেই নামটা কানে ঠেকলো আযলানের। সে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চুপ হয়ে গেল। রিপোর্ট চেক করে কিছুক্ষণ পর সে সামিয়ার দিকে তাকালো, যে এতক্ষণ ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিলো।
– তুই কি এখানে বসে থাকার জন্য এসেছিস? তোর রোগী নেই?
সামিয়া বোধহয় অপমান বোধ করলো একজন ল্যাব টেকনোলজিস্টের সামনে তাকে এভাবে বলাটা! সামিয়া উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
– রোগী আছে কিন্তু সেটা সময় মতো। বেটাইমে রোগী বা রোগীর রিপোর্ট আমি দেখি না!
শেষ কথাটা তুহির দিকে তাকিয়ে বললো। তুহি চুপ করে শুনলো শুধু। এমনিতেই এই মহিলা আযলান স্যারের গায়ে পড়ে থাকে যেটা দেখলেই মাথা খারাপ হয়ে যায় তার। আযলান শান্ত স্বরে বললো,
– এই প্রফেশনে টাইম বেটাইম বলে কিছু নেই সামিয়া। ইমার্জেন্সি বলে কয়ে আসে না আর আমাদের প্রয়োজনটাও হয় ইমার্জেন্সিতে। মানুষের সেবা প্রয়োজনেই করতে হয় তোর সুবিধা মতো করলে তো হবে না।
সামিয়া আর কিছু বললো না। থমথমে মুখে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। তুহি মনে মনে দারুণ হেসে নিলো। আযলান কিছু বলবে এমন সময় তুহির ফোন বেজে উঠলো। আযলান সেদিকে তাকাতেই তুহি স্ক্রিনটা অফ করে দিয়ে বললো,
– স্যরি। আপনি বলুন।
আযলান তাকাতেই শুধু N ওয়ার্ডটা দেখতে পেলো কে কল করেছে আর মাথা ঘামালো না। সে ঠান্ডা স্বরে বললো,
– পেশেন্ট আপনার কে হয়?
– বোনের ছেলে।
অকপট উত্তর তুহির। আযলান ভ্রু কুঁচকে বললো,
– আপনার বোন আসলো না কেন তাহলে?
তুহি একটু ইতস্তত করে বলল,
– আসলে স্যার, আদনানের জ্বরটা আজ সকাল থেকে আবার একটু বেড়েছে। শরীরটা বেশ দুর্বল। এই রোদের মধ্যে অসুস্থ বাচ্চাটাকে নিয়ে হসপিটালে টানাটানি করতে বারণ করলাম।
তুহির কথায় আযলানের কাছে নওমির কথাগুলোও বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো এখন। সে নিজের ব্যক্তিত্বের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করলো,
– আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
– জ্বি স্যার নিশ্চয়ই!
– আপনার বোনের হাসব্যান্ড কোথায়? মানে ওনি কি ওনাদের সাথে থাকেন না?
তুহি একটা তাচ্ছিল্যের দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে মুখে ভীষণ স্বাভাবিক একটা অবয়ব ফুটিয়ে তুলল। একটু নিচু গলায় বলল,
– না স্যার ওই কাপুরুষটা ওদের সাথে থাকে না। বাচ্চাটা দুনিয়াতে আসার আগেই ওদের সংসার ভেঙেছে। বাচ্চা যে আছে এটা জানে কি যা কে জানে!
এই কথা শুনে পুরুষ হিসেবে তার অবচেতন মনে এক ধরণের কৌতূহল বা হয়তো এক চিলতে সূক্ষ্ম বিরক্তি জাগল। সে মনে মনে ভাবল, “দায়িত্বজ্ঞানহীন পুরুষের অভাব নেই দুনিয়ায়! যে নিজের সন্তানকে এভাবে ফেলে চলে যায়, সে কেমন বাবা!”
কিন্তু মুখে বললো,
– কিন্তু আপনার বোন যে বললো সে বেঁচে নেই?
– ও এই পরিচয় মনে রাখতে চাই না বলে সবাইকে এটা বলে।
আযলান আর কথা বাড়ালো না। সে প্রেসক্রিপশন এগিয়ে দিয়ে বলল,
– কিছু মনে করবেন না, আসলে আমাদের হসপিটালের একটা সেফটি প্রটোকল বা লিগ্যাল বিষয়ের ব্যাপার থাকে সেটা তো জানেনই। কাল ওনার ওরকম অস্বাভাবিক আচরণ দেখে আমার কিছুটা খটকা লেগেছিল।
– জ্বি বুঝতে পেরেছি স্যার।
– আমি ওষুধ সব লিখে দিয়েছি। আপনাকে বুঝাতে হবে না আই গেস?
– না স্যার আমি বুঝবো। আজ আসি।
– জ্বি
তুহি সালাম দিয়ে বের হয়ে গেল কেবিন থেকে। তুহি কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোরে আসতেই একটা লম্বা শ্বাস ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। এদিকে কেবিনের ভেতরে আযলান একা হতেই একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বাচ্চার বাবার পরিচয় নিয়ে তার মনের ভেতরের খটকা আর সন্দেহটা তুহির কথায় পুরোপুরি কেটে গেছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধপ করে চেয়ারের ব্যাকরেস্টে পিঠ ঠেকালো। তার ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। মনের গভীরে জমে থাকা এক বি’ষাক্ত অতীত যেন তাকে আবার অবাধ্য করে দিল। নিজের অজান্তেই সে বিড়বিড় করে উঠল,
– দুনিয়ার সব ঠ’কে যাওয়া মানুষের গল্পগুলো কেন যেন একই রকম হয়!
আযলান শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো খানিকক্ষণ। তারপর নিজের বুকের ভেতর চেপে রাখা ক্ষ’তটার ওপর হাত রেখে সে আবার বিষণ্ণ সুরে বলল,
– অথচ দুনিয়ার নিয়মটা কত অদ্ভুত! যে ঠ’কায়, সে দিব্যি ভালো থাকে, নিজের মতো করে বেঁচে থাকে। আর যে ঠ’কে যায়, সে সারাজীবন সেই দহন বুকে নিয়ে একা একা পু’ড়ে ম’রে। ঠিক যেমনটা আমি প্রতিদিন ম’রছি…
আযলান নিজের ওপরই তীব্র বিরক্ত হয়ে মাথাটা ঝাঁকাল। জোর করে নিজের মন থেকে সমস্ত চিন্তা ঝেড়ে ফেলে টেবিল থেকে লাঞ্চ বক্সটা টেনে নিয়ে চামচটা হাতে তুলে নিল।
.
নওমি তাকিয়ে আছে আদনানের দিকে। বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে দুই বছরের ছোট্ট আদনান। জ্বরের ঘোরে বাচ্চার ফর্সা মুখটা কেমন লালচে হয়ে আছে। ছেলেটাও হয়েছে বাবার মতো। চেহারা যে কেউ দেখলে বলবে বাবা আর ছেলে একই। এই নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই! বিছানার এক পাশে বসে আছে তুহি। সে নওমিকে বললো,
– যা এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়। কি যে গরম পড়ছে!
নওমি পানি এনে বলল,
– ডক্টর কি বললো? রিপোর্ট ভালো তো?
– হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ সব ঠিক। আর যেই ওষুধ দিয়েছে এগুলো রেগুলার খাওয়াবি তাহলেই হবে।
– আচ্ছা।
– বলেছিলাম আমার বাসায় ওঠ! শুনিস না কেন আমার কথা?
– না আপু তুমি আমাকে যা সাহায্য করেছো সেটা অনেক! আপন মানুষগুলোও এতটা করেনি আমার জন্য।
– তাই তো বোন মানতে পারিস না।
– আপু প্লিজ!
– আচ্ছা হয়েছে। তোকে এসব বলেও লাভ নেই…
হতাশার শ্বাস ছেড়ে বলল তুহি। নওমি আমতা আমতা করে বললো,
– ইয়ে ডক্টর কিছু জিজ্ঞেস করেছে?
তুহি না জানার ভান করে বললো,
– কিসের ব্যাপারে?
– আদনানের বাবার..
– উহু। জিজ্ঞেস করেছিল তোদের সাথে থাকে নাকি। আমি ধুয়ে এসেছি ওই কাপুরুষকে।
– মানে?
– মানে হলো ডাক্তারের সামনে ভালোমত ধুয়েছি। সামনে তো আর পেলাম না ধোয়ার জন্য!
– কি বলেছো তুমি?
– বললাম কাপুরুষটা তোদের সাথে থাকে না। আদনানের কথাও বোধহয় জানে না।
নওমি সরে এসে আদনানের মাথার কাছে বসলো। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এসেছে। সেই ঝাপসা চোখে ভেসে উঠছে তার অন্ধকার অতীতের খণ্ডাংশ।
❝নূরজাহান নওমি❞ বাবা মায়ের আদরের সন্তান। কিন্তু বয়স যখন বারো বছর তার জীবনে নেমে আসে চরম অন্ধকার। হঠাৎ হারিয়ে ফেলে তার মাকে। বাবা মায়ের আদরের মেয়ে হুট করে মাকে হারিয়ে বুঝতে পারেনি কি হারিয়েছে। তার মা হার্টের রোগী ছিলো একদিন অসুস্থ হয়ে হুট করে মা’রা যান তিনি। প্রথমদিকে সকলে শোকে আচ্ছন্ন থাকলেও পরবর্তীতে সবার মধ্যে পরিবর্তন আসে। নওমির বাবার উপর জোর করা হয় দ্বিতীয় বিয়ে করার। নওমির বাবা রাজি ছিলেন না। তিনি ছিলেন নওমির মায়ের প্রতি আসক্ত। এক নারী ছাড়া জীবনে অন্য দ্বিতীয় নারী ছিলো না। এরপর নওমির দাদি বারবার জোর করার পরও যখন মানছিলো না তখন সকলে ওনাকে বলেছে ছোট মেয়েটার দেখা শোনার জন্য হলেও একজন লাগবে। নওমি তখন এসব সম্পর্কে জানতো না। এক পর্যায়ে নওমির বাবাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজি করিয়ে ফেলে। এরপর শুরু হলো অন্যরকম জীবন। নতুন একজন সদস্য আসলো। তার মন মতো চলতে হলো। নওমির ভালো করে মনে আছে, সেই নতুন সদস্যের আগমনের পর থেকেই তার জীবনের চেনা পথটা কিভাবে পাল্টে যেতে শুরু করলো। তার সৎ মা প্রথম প্রথম সবার সামনে খুব ভালোবাসার নাটক করলেও, আড়ালে নওমির প্রতি তার আচরণে এক ধরণের সূক্ষ্ম অবহেলা আর তাচ্ছিল্য স্পষ্ট হয়ে উঠত। বাবার সামনে যে নওমি ছিল আদরের রাজকন্যা, বাবার অলক্ষ্যে সেই নওমিই হয়ে উঠত এক বাড়তি বোঝা। আর দাদুর বাড়ির মানুষগুলোও ধীরে ধীরে কেমন যেন পর হয়ে গেল। এক সময় পাল্টে গেল বাবাও। সে না চাইতেও সৎ মায়ের প্রতিটা সত্য মিথ্যে সন কথা বিশ্বাস করতো। মায়ের অভাবটা নওমি প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা নিঃশ্বাসে টের পেতো।
অবহেলা আর একাকীত্বের সেই অন্ধকার গলিপথ পেরিয়ে নওমি যখন বড় হচ্ছিল, তখনই তার ধূসর জীবনে প্রথম আলোর মতো এসেছিল ❝আযলান আজওয়াদ আহিল❞।
তখন সবে উনিশে পা দিয়েছিলো নওমি। একদিন আহিলের বাবা নওমিকে দেখে পছন্দ করে। পরদিন আহিলের মা আর আহিলকে নিয়ে চলে এলো প্রস্তাব নিয়ে। আহিল তখন ছাব্বিশ বছর বয়সী এক তরুণ, যে সদ্য ইন্টার্নশিপ করে হসপিটালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে জয়েন করেছে। প্রথম দেখায় ওই মায়াবী আর কিছুটা বিষণ্ণ নীল চোখের মেয়েটাকে ভালো লেগে গিয়েছিল আযলানের। নওমি দেখেছিল এই বিয়েটা ভাঙার অনেক চেষ্টা করেছিল তার সৎ মা! কারণটা সে জানে না! বিয়ে ঠিক হওয়ার পর নওমি ভেবেছিল, নিজের ভাঙা মনে আযলানের মতো এক টুকরো শক্ত আশ্রয় পেয়ে সে বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী নারী। সত্যিই হয়েছিল তাই, আযলানের তীব্র অধিকারবোধ আর আগলে রাখার ক্ষমতা নওমিকে তার সব হারানো অতীত ভুলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে সেই ভালোবাসার মানুষটাই সবচেয়ে বেশি আঘা’ত দিতে শুরু করে! পাল্টে যেতে থাকে সকল অনুভূতি!
চলবে…..