গল্প: প্রেম সমাচার (০৫)

লেখিকা:হুমায়রা মুর্তজা

পর্ব — ৫

One often meets his destiny on the road he takes to avoid it…অর্থাৎ যে নিয়তি থেকে পালাতে মানুষ পথ বদলায়,

সেই পথের মোড়েই সে নিয়তির দেখা পায়।নীতির জীবনে তেমনই কিছু ঘটতে চলেছে হয়তো-বা। আকস্মিক সম্মুখীন হওয়া, সম্পুর্ণ বিপরীতমুখী নীরব এবং নীতি উভয়ই তাদের নিয়তি সম্পর্কে বেখেয়াল। ধরত্রীতে সমীকরণ ব্যতীত কোনো সম্পর্কের সুত্রপাত হয়না। মানুষ জীবনের সমীকরণ মেলাতে না পারলেও স্রষ্টার নির্দেশিত নিয়মে তারা ঠিকই মিলে যায়। এমনই হয়তো কোনো সম্পর্কের সমীকরণ মেলাতে নীরব এবং নীতির আজকের সাক্ষাৎ। নয়তো অজানা-অচেনা দু’জন মানুষ একসঙ্গে মিলে যাবে কেন আচানক!

বর্তমানে তাদের গন্তব্য আখাউড়া রেলওয়ে জংশন। নীতিকে ফেলে যাওয়া ট্রেন এবং নীতির জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলে আসা নীবরের ট্রেন সেখানে দাঁড়াবে প্রায় আধাঘন্টা। তাদের হাত যথেষ্ট সময় রয়েছে। বাস কিংবা দ্রুতগামী কোনো মটরযান পেলে অনায়েসে তারা পৌছে যেতে পারবে সেখানে। চৌকস মস্তিকের লেফটেন্যান্ট নীরব সাফওয়ান তার মস্তিকের অভ্যন্তরে হিসেব ছক কষে ফেলেছে । আজ কোনোভাবে ট্রেনে পৌছাতে পারলে সে বাকি পথ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকবে।প্রয়োজনে আইডি কার্ডের ব্যবহার করে চালকের পাশে বসে যাবে বাকিটা পথ। তবুও এই ভাঙা রেডিওকে নিজের সঙ্গে রাখবেনা। পুরো কেবিন এই বাচালটাকে ছেড়ে দেবে। মস্তিষ্কের নিউরন আজ বুঝি দুটো বেশি ডে ড হয়েছে এই মেয়েটার জন্য!

পাশাপাশি হাঁটার সময় নীরবের মনে হলো আশপাশটা বড্ড শান্ত। টুপটাপ ঝরে পড়া শিশিরের মিহি শব্দও কর্ণগোচর হচ্ছে। পুরুষালি কঠিন হৃদয়ে উঁকিঝুকি দেয় বেখেয়ালি মনের আশকারা। ঠিক ওর পাশে হেঁটে আসা মেয়েটি হয়তো এতটাও অসহ্য নয়। কিংবা সে কোনো সিক্রেট মিশনেও নেই। বরং নেহাৎ বোকা, ফটকা চালাক এক রুপবতী তরুনী বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে বেখেয়াল, বিয়ের ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছে। নিজের মধ্যে অন্যরকম রোমাঞ্চকর অনুভুতির সাক্ষাৎ পেলো নীরব৷ মিলিটারির কড়া ট্রেনিং-এর মধ্যে থাকা নীরবের জীবনে প্রেম বিষয়ক কোনো অনুভূতি আগমনের সুযোগ ছিলোনা কখনোই। এই রমনীর সঙ্গে ওর বৈবাহিক সম্পর্ক হতে পারে! তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হলোনা নীরবের বেখেয়ালি মনের অনুভূতিরা। কারণ হিসেবে সমস্ত নীরবতা চুরচুর করে ভেঙে উঠলো এক তরুনীর কণ্ঠস্বর এবং নীরব সাফওয়ান আঁছড়ে পড়লো বর্তমানে।

— নীরব সাহেব আপনি সবসময় এমন গম্ভীরমুখে থাকেন? আপনার চিন মাসল গুলোকে মাঝেসাঝে একটু স্ট্রেচিং করবেন। ফ্রিজ হয়ে যাবে ওগুলো। আমি আপনাকে কিছু ইয়োগা শিখিয়ে দিতে পারি। এতে করে অনায়েসে আমি হাসতে পারবেন। মনে হচ্ছে মাসল গুলো সব আটকে গিয়েছে। ক্যান ইউ বিলিভ ইট নীরব সাহেব? আমরা চাতালগাওএর স্টেশনে আটকা পড়ে আছি? সুনসান রাত, অজানা গ্রাম! যেন কোনো হরর ফিল্ম! আচ্ছা এখানে আচার পাওয়া যাবে কোথায় বলুন তো? আমার না আচার খেতে মন চাইছে। পঞ্চগড় থেকে নাকি হিমালয়ের মাসতুতো ভাই কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন পাওয়া যায়। হাতছানি নিয়ে বাংলার মানুষকে ডাকে। এবার দেখেই আসবো। যাচ্ছিই তো। প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে বর্ডার বিষয়টি ডিসগাস্টিং। আচ্ছা আপনি গিয়েছেন কখনো ওদিকটাই? আমার অনেকদিনের শখ আমি হানিমুনে যাবো বরফের দেশে। তারপর পাতলা শিফন শাড়ি পরে বরফ নিয়ে পোজ দিয়ে ছবি তুলবো। ফেসবুকে দেবো। আমার বান্ধবীরা সব জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। আমার না স্পোর্টস জার্নালিস্ট হবার শখ ছোট বেলা থেকে জানেন? তারপর প্রতিবেদন করতে যেয়ে ক্রিকেটারের সঙ্গে প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে, হানিমুন, বাচ্চা! ইশশ ভেবেই আমার গাঁয়ে কাঁটা দিচ্ছে। এখন আপনি ই বলুন নীরব সাহেব? আমার এত এত প্ল্যান পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিয়ে আমাকে সরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে জোর করে দাদু বিয়ে দিয়ে দেবে! এটা মানা সম্ভব? কেন? আমি মানবো কেন? আমার নীতি বিরুদ্ধ এসব কাজবাজ আমি করিনা ভাই।যাই হোক আমার সঙ্গে আমি থলথলে ভুড়িওয়ালাকে বিয়ে কোরবো না।না মানে না। ইটস নো। বিগ নো। এন ও..

ফের তপ্ত শ্বাস ফেললো নীরব।ওর কানে যেকটা ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া বাস করতো এতক্ষণে তারা নির্ঘাত আত্নহত্যা করেছে। কেন সে ট্রেন থেকে নেমে এলো! হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় নীরব। সেধে এই কোন আপদ ঘাড়ে তুলে নিয়েছে সে !

নীরবকে এগিয়ে যেতে দেখে চেঁচালো নীতি,

— হ্যালো? এংরি ইয়াং ম্যান? আবার রেগে গেলেন কেন? ভাই আপনি কি প্রেগন্যান্ট? নয়তো এত মুড সুইং হচ্ছে কেন আপনার? বলছি চলার ফাঁকে কথা বলার প্রয়োজন আছেনা? নয়তো সময় কাটবে কিভাবে?

হাঁটতে হাঁটতে আচমকা থামলো নীরব। গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

— আপনি কখনো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখিয়েছেন ? আই থিংক ইউ নিড ইট ব্যাডলি মিস নীতি। আপনাকে উঠিয়ে চিড়িয়াখানায় রাখা উচিত। এমন অরিজিনাল পাগল সহস্রবছর পর জন্মে। সরকারের উচিত আপনার ব্রেইন সংরক্ষণ করা।

একনাগাড়ে কথা গুলো বলে থামলো নীরব৷ তার কান মাত্র দুটো। আর সেখানে এই মেয়ে যা শুরু করেছে তাতে একটা অলরেডি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এমন সাংঘাতিক মেয়েকে সে অলরেডি বিয়ের জন্য হ্যাঁ বলে দিয়েছে। কোন পাগলে কামড়েছে তাকে? চটজলদি পকেট থেকে ফোন বের করে নীরব। ছেলেমানুষী করে মোটেও জীবন নষ্ট করা যাবেনা! ফোন চেক করতেই থমকালো। কুঁচকে গেলো ভ্রুদ্বয়। মোবাইলটা বন্ধ হলো কেন? খানিকক্ষণ আগেও অন ছিলো! আজ সব মুসিবত নীরবের ঘাড়ে এসে পড়ছে কেন?

নীরবের অতগুলো কথা মাথায় প্রসেস করতে খানিক সময় নেয় নীতি। এই হুলোটা ওকে পাগল বলেছে বোঝার পর ক্ষেপে গেলো সে। তারপর কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগে নীরব বললো,

— আপনাকে পাগল বলেছি সেইজন্য রেগে গিয়েছেন তাইনা?

দাঁত কটমট করে আগুন চোখে নীরবের দিকে চেয়ে উপর নীচ মাথা নাড়ালো নীতি। ঠোঁট টিপে হেসে বললো,

— আই নিউ ইট। পাগলকে যদি পাগল বলা যায় তাহলে তারা আরও বেশি রেগে যায়। যেমন আপনি রেগে গেলেন।

— হোয়াট রাবিশ! আমি পাগল! আর আপনি কি? নিজেকে কি টম ক্রুজ মনে করছেন? একশান মুভির হিরো? জী না

মোটেও না। সবসময় কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বয়ে বেড়ানো এক কিম্ভূত লোক আপনি। আমারই ভুল।আপনার কাছে সাহায্য চেয়ে সবচেয়ে বড় ভুল করে ফেলেছি। আমি নাকে খত দেবো। প্রয়োজনে রেইল লাইন ধরে হেঁটে বাসায় ফিরে যাবো। তাও আপনার হেল্প নেবো না। একটু সাহায্য চাইলাম আর অমনি সুযোগ নিয়ে খোঁচা দিচ্ছেন? আমি নিজের খেয়াল রাখতে পারি। আই হ্যাব মাই পেপার স্প্রে।

বলেই উলটো দিকে হাঁটা শুরু করে নীতি। তবে কিছুটা যাবার পরই বুঝলো বড়ই ভুল করে ফেলেছে সে। কেননা একটু আগে ঘুষি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা লোকটা বেশ কয়েকজন সঙ্গী-সাথী জুটিয়ে ফিরে এসেছে ইতোমধ্যে। তাদের হাতে বড়লাঠি। আরেকজনের হাতে আবার একটা চা *কু। একটা ঢোক গিলে দু কদম পিছিয়ে গেলো নীতি। জোর করে হাসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ছুটে এসে দাঁড়ালো নীরবের পেছনে।বললো,

— নীরব সাহেব। এবারের মতো আরেকবার ঢিসুম টিসুম করুন। আমি আপনাকে দোয়া দেবো আপনার সুন্দরী বউ হবে। আপনাকে পাগলের মতো ভালোবাসবে৷ আপনি উঠতে বললে বসবে। আর বসতে বললে উঠবে৷ আপনার সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে না। আপনার বউ আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে।

নীতির অত কথাতেও অনড় দাঁড়িতে রইলো নীরব। ফের চেঁচালো নীতি,

— ফ্রিজ হয়ে গেলেন কেন নীরব সাহেব? দোয়া পছন্দ হয়নি? আপনি পারবেন তো মারামারি করতে? দেখুন? আমি আপনাকে একটু হেল্প করতে পারি। কিন্ত এরা পুরো গ্যাং নিয়ে এসেছে। চাকুও আছে। আমি বরং পেপার স্প্রেটা আপনাকে ধার দিই? আপনি ওদের কাছে গিয়ে চোখে মেরে আসুন।বাকিটা আমি সামলে নেব। নীরব সাহেব? শুনছেন? চিন মাসলের সঙ্গে আপনার বডি মাসল ফ্রিজ হলো নাকি?

— আপনার দোয়া আমার পছন্দ হয়নি মিস নীতি। তাই ফাইট করতে পারছিনা। তাছাড়া ওরা আমাকে বিরক্ত করেনি। আমার জন্য আসেনিও। এসেছে আপনার জন্য। সুতরাং প্রব্লেম টাও আপনার। আপনি বরং ফাইট করুন। আমি এঞ্জয় করি।

বলেই প্ল্যাটফর্মের বাইরে রাখা সিমেন্টের তৈরী বেঞ্চিতে বসলো নীরব। বেশ আয়েশ করে, পায়ের উপর পা তুলে।

হতবাক হয়ে নীরবের কান্ডকারখানা দেখতে থাকে নীতি। বিস্ময় নিয়ে বললো,

— এমন পরিস্থিতিতে আপনি মশকরা করেন আমার সঙ্গে? ওরা চলে এলো! কিছু করুন? ওই ভাই সাহেব? হ্যালো? আপনি হাত-পা গুটিয়ে এভাবে বসে থাকলে তো পুরুষজাতির চরিত্রে কলংক লেপ্টে যাবে। আপনি একজন সিগমা পুরুষ। আলমা মেইল। প্লিজ হাতে চুড়ি পরে বসে থেকে নিজের ইমেজ নষ্ট করবেন না। আমার মতো বিউটি উইথ শার্প এন্ড ফিয়ার্স ব্রেইনের মেয়ের সামনে আপনার ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে। দেখুন আমি কাউকে বলবো না আপনার জ্যাকেটের সিক্রেট। নীরব সাহেব আপনি আমার সেভিয়ার। সিগমা পুরুষের পারফেক্ট উদাহরণ। আপনার মতো সুদর্শন আজ পর্যন্ত আমি কাউকে দেখিনি। ইউ আর দ্যা বেস্ট।

তবে নীরব তখনও অনড় নিজ সিদ্ধান্তে। উপরুন্ত ওই লোক গুলো এসে চেপে ধরলো নীতিকে। মোচড়ামুচড়ি করতে থাকে নীতি। বললো,

— দেখ? তোদের কিন্তু আমি ওই টোকাই গুলোর পাশে ভর্তিও করবো না। হাসপাতালে যাবার মতো সময় পাবিনা। ছেড়ে দে বলছি..

নীরব সাহেব? ও.. নীরব সাহেব। আরে ভাই তোরা আমাকে ধরেছিস কেন? এইযে ভাই আপনাকে আমি ঘুষি মেরেছি? তো এসে আমাকে পাকড়াও করলেন কেন? ওই ব্যাটা হুলোকে ধরুন।

ঘুষি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া লোকটি চাইলেও নীরবের দিকে এগোচ্ছে না। ওর টার্গেট নীতি। কেননা একবার যেই ঘুষি খেয়েছে এতে চাপার দাঁত নড়ে গিয়েছে বেশ কয়েকটা। ওমুখো হবার কথা সে চিন্তাও করতে পারেনা। তাই এসে আগে ধরেছে নীতিকে। বাকি ছেলে পুলেও তাই-ই করেছে। নীরবের দিকে মোটেও এগোচ্ছে না কেউ। এই লোককে জব্দ করবে নীতিকে বাগে এনে। এমনই প্ল্যান তাদের। তবে মুখে বললো,

— ব্যাটা লইয়া আমাগের কাম নাই। নতুন আইটেম। আমরাই খামু। ওই লোকরে গোনার টাইম নাই। বাকি সবাই তাল মেলালো সমসুরে।

মোচড়ামুচড়ি করে নীতি নীরবকে উদেশ্যে করে বললো,

— শালা একটা মেয়েকে হেনেস্তা করছে আর তুই বসে বসে সিনারি দেখছিস? আমি নীতিপ্রিয়া শাহ একবার ছাড়া পাই? তোকে বদদোয়া দিলাম। তোর বউ হবে বিশ্ব বাচাল। সারাক্ষণ ঝগড়া করবে। তোর কানের পোকা মে রে ফেলবে। তোর বউ তোকে এত বিরক্ত করবে দেখিস তোর মনে হবে কচু গাছে ফা** নিতে। তুই জ্বলবি বিয়ের পর। জ্বলে-পুড়ে ছারখার হবি নীরব সাফওয়ান।

চলবে…..…

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x