লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
পর্ব:০৭
~
রাত এগারোটা,
আকাশে আজ মেঘ জমেছে। বর্ষার মেঘ। একটু পরই হয়তো ঝমঝম করে ঝরে পড়বে এক পশলা বৃষ্টি। বাতাসের সেই কি দাপট। কালো মেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশের চাঁদের রূপালি আলোর ছিটে ফোটাও পাওয়া যাচ্ছে না। বাইরের দিকটাও আধারে ঢাকা। শহরের বুকে এমন নিস্তব্ধতা বড্ড বেমনান।
তনিমার নিস্তব্ধতা মোটেও পছন্দ না। নিজে যেমন চঞ্চল তার কাছেও চাঞ্চল্যকর সব জিনিস পছন্দ। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেঘ দেখতে দেখতে তনিমা এবার বিরক্ত হলো। বারান্দার দরজার সামনে গিয়ে রুমে উঁকি দিয়ে দেখল, ফায়াজ বিছানার এক কোণে লেপটপ নিয়ে বসা। তনিমা ছোট ছোট চোখে তার দিকে তাকাল। লেপটপের দিকে ঝুঁকে খুব মনোযোগ দিয়ে কি যেন করছে। তনিমা তাকিয়ে রইল। হঠাৎ করেই সে ফায়াজকে ডেকে উঠল,
‘ফায়াজ!’
ফায়াজ কিছুটা বিস্মিত হয়ে তনিমার দিকে তাকাল, বললো,
‘কিছু বলবি?’
তনিমা বেশ কিছুটা সময় নিয়ে বললো,
‘একটু আগে না আমাকে লিজা কল করেছিল।’
ফায়াজ এবার একটু নড়ে চড়ে বসল। কপালের উপর খানিকটা ভাঁজ ফেলে বললো,
‘কেন?’
‘তোর আর আমার বিয়ের কারণ জানার জন্য। লিজা নাকি তোকে পছন্দ করে, সেটা তুই জানতি?’
ফায়াজের কপালের ভাজ চওড়া হলো। ব্রু যুগল কুঁচকে এলো তার। তনিমাকে বললো,
‘মানে? কি বলছিস তুই? লিজা কোন দুঃখে আমাকে পছন্দ করতে যাবে?’
তনিমা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বিরক্তির সুরে বললো,
‘সেটা আমি কি করে বলবো? সে আজকে আমাকে ফোন দিয়ে এসব বলেছে। তার নাকি তোকে খুব পছন্দ। আমি নাকি তোদের মাঝখানে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। আমার তখন খুব রাগ হয়েছে জানিস তো। তাই ইচ্ছে মতো ওকে কথা শুনিয়ে দিয়েছি। ভার্সিটিতে থাকতে তো কম ছেলের পিছে ঘুরে নাই এখন আবার আসছে আমার জামাইয়ের দিকে নজর দিতে। তাই এমন ওয়াশ দিয়েছি না আর জীবনেও তোর নাম মুখে নিবে না।’
কথাটা বলে তনিমা বিশ্ব জয়ের হাসি দিল। ফায়াজ হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল তার মুখ পানে। তনিমা যখন বুঝল ফায়াজ হা করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে তখন সে চোখ মুখ কুঁচকে বললো,
‘কি হয়েছে? এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?’
ফায়াজ বাঁকা হেসে উঠে দাঁড়াল। এক পা এক পা করে তনিমার কাছে এগিয়ে যেতে লাগল। ফায়াজের চোখ মুখ দেখে তনিমা বড় বড় চোখ করে বললো,
‘কি হয়েছে তোর? আমার কাছে কেন আসছিস?’
ফায়াজ তনিমার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বারান্দার দরজার দুপাশে দুহাত রেখে তনিমার মুখের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
‘আর ইউ জেলাস বেবি?’
তনিমার চোখ অক্ষিকোটর থেকে যেন বেরিয়ে আসবে। সে দরজার সাথে ঠেসে দাঁড়িয়ে আছে। ফায়াজের চোখ মুখের ভঙ্গিমা স্বাভাবিক না। অসভ্যটার মাথায় কিছু একটা চলছে। তনিমা জোর গলায় বললো,
‘না মোটেও না। আমি কেন জেলাস হতে যাবো। আমি তো তোকে স্বামী হিসেবে মানিই না। তাহলে.. তাহলে আমি শুধু শুধু কেন জেলাস হবো? ঐ লিজা তোকে পছন্দ করলে আমার কি? আমি তো শুধু ওকে একটু ভয় দেখানোর জন্য এসব বলেছি। কোন জেলাস টেলাস ফিল করি না বুঝেছিস?’
ফায়াজ ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো,
‘সিরিয়াসলি?’
তনিমা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
‘হ-হুম’
ফায়াজ এবার আরো কিছুটা এগিয়ে গেল তার দিকে। তনিমা এবার শক্ত হয়ে যায়। ফায়াজের তপ্ত নিঃশ্বাস তার মুখের উপর আছড়ে পড়তেই সে যেন জমে বরফ হয়ে গিয়েছে। হৃৎপিণ্ডের হৃৎস্পন্দনও অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গিয়েছে। ফায়াজ আরও কিছুটা এগিয়ে আসতেই তনিমা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তনিমার এমন ভয়ার্ত চোখ মুখ দেখে ফায়াজ মুচকি হেসে তার মুখের উপর ফুঁ দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তনিমা চোখ মেলে তাকায়। হুট করেই ফায়াজকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজে দূরে সরে দাঁড়ায়। হৃৎস্পন্দনের গতি এখনো কমেনি। বুকের বা পাশে হাত রেখে তনিমা জোরে জোরে দুটো নিশ্বাস নেয়। তনিমার অস্থিরতা ফায়াজ ঠিকই টের পায়। সে অধর ছড়িয়ে মৃদু হাসি দিয়ে তনিমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
‘কি হয়েছে, তনু? এত অস্থির হয়ে পড়লি যে?’
তনিমা ঘুরে ফায়াজের দিকে তাকাল। ফায়াজের চোখে মুখে দুষ্টুমির রেশ এখনও রয়ে গেছে। তনিমা ব্রু কুঁচকে কড়া গলায় বললো,
‘কিছু হয়নি। আর আমি অস্থিরও হচ্ছি না। আর শোন, এমন হুট হাট করে একদম কাছে আসবি না।’
ফায়াজ তনিমার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসে বললো,
‘কেন বেবি? কাছে আসলে কি হয়?’
তনিমা চেঁচিয়ে বলে উঠে,
‘আমি আসতে বারণ করেছি মানে আসবি না। কি হয় না হয় এত কিছু তোর জানতে হবে না। না মানে না ই। বুঝেছিস?’
ফায়াজ কোন জবাব না দিয়ে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল তনিমা। শুকনো ঢোক গিলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর ফায়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘লাইট টা অফ করে দে। আমার ঘুম পাচ্ছে।’
কথাটা বলে সে অন্য পাশে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়ল। ফায়াজ হঠাৎ তাকে ডেকে উঠল,
‘বাইরে বৃষ্টি পড়ছে তনু!’
তনু খেয়াল করলো। হ্যাঁ বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ তার কানেও আসছে। সে তখন ফায়াজের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘হ্যাঁ পড়ছে হয়তো।’
‘ভিজবি?’
তনু যেন আকাশ থেকে পড়ল। অবাক হওয়ার কন্ঠে বললো,
‘পাগল হয়েছিস? এত রাতে বৃষ্টিতে ভিজবি? ঠান্ডায় মারা পড়বি।’
ফায়াজ উচ্ছল হেসে বললো,
‘কিছু হবে না। চল ছাদে যায়। একসাথে বৃষ্টিতে ভিজবো।’
তনিমা যেন বিপদে পড়ে গেল। কি করবে বুঝতে পারছে না। তারও যে একদমই ইচ্ছে নেই তা না। তারও ইচ্ছে করছে বৃষ্টিতে ভিজতে। তার প্রিয় মানুষটাকে সাথে নিয়ে রাতের বৃষ্টি বিলাস করতে। কিন্তু ঠান্ডার ভয়ে রাজি হতে পারছে না।
.
পা টিপে টিপে ছাদে উঠল দুজন। ফায়াজের জোরাজুরিতে তনিমা আর থাকতে পারলো না। তাই দুজনেই ছাদে চলে এলো বৃষ্টির স্বাদ নিতে। ছাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়েই তনিমা দেখল আষাঢ়ি কান্না। বর্ষার প্রাণবন্ত ঝরে পড়া। সে ছুটে গেল ছাদের মাঝখানটাই। দু হাত দু দিকে ছড়িয়ে বৃষ্টির ফোটাগুলো গায়ে মাখতে লাগল। ফায়াজও তার পাশে এসে দাঁড়াল। নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইল তার দিকে। চারদিকের অন্ধকারের মাঝে সে যেনো তনিমার অবয়বটা দেখতে পাচ্ছে। ফায়াজও এবার তনিমার মত দুহাত দুদিকে প্রসারিত করলো। বৃষ্টির পানিতে ভিজে তারা টইটম্বুর। বেশ কিছুক্ষণ পর তনিমা চোখ মেলে তাকালো। বৃষ্টি ভেজা চোখগুলো দিয়ে ফায়াজের দিকে তাকালো। ফায়াজ দুইহাত পকেটে পুরে মাথাটা কিছুটা উপরে করে বৃষ্টির পানির স্বাদ নিচ্ছে। তনিমা চেয়ে রইলো। একরাশ মুগ্ধতা বিরাজ করছে তার সেই চাহনিতে। আলতো হাতে সে ফায়াজের গাল ছুঁল। ফায়াজ মিটমিট করে তনিমার দিকে তাকালো। তনিমার মুখটা স্পষ্ট নয়। তবুও সে দেখতে লাগলো। তনিমাকে আলতো হাতে কাছে টেনে নিল। বৃষ্টি এখনো সমান তালে ঝরে পড়ছে। বৃষ্টির তোড়ে চোখের পাল্লা মেলে রাখা মুশকিল। তবুও দুই জন চেয়ে রইলো দুইজনের দিকে। তনিমা তার ভেজা হাত দিয়ে ফায়াজের কপাল, নাক, ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। হুট করেই ফায়াজকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো। মুচকি হাসলো ফায়াজ। তনিমাকে তার বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তনিমার ভেজা শরীরে যেনো উষ্ণতা ছড়িয়ে গেলো। অস্থির মনটা নিমিষেই শান্ত হয়ে গেলো। এই বৃষ্টিময় আলিঙ্গনে তনিমা প্রেম খুঁজে পেলো। খুঁজে পেলো ফায়াজের অব্যক্ত ভালোবাসা। আজ আকাশে চাঁদ না থাকলেও ঐ মেঘ মল্লারে ঢাকা কালো আকাশটা তাদের বৃষ্টিময় প্রেমের সাক্ষী হলো।
চলবে..