গল্প: রাগে অনুরাগে (০৯)

লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা

~
বাড়িতেই পৌঁছেয় নিজের রুমে ছুটে গেল তনিমা। রুমের দরজাটা খুলেই জোরে একটা শ্বাস টানলো সে। নাকে এসে বাজল সেই পুরোনো ঘ্রাণ। তার রুমের জিনিসগুলোর মধ্যে সে একটা মিষ্টি ঘ্রাণ পেত সবসময়। আজও সে সেই ঘ্রাণটাই পাচ্ছে। ফায়াজ হাতের ট্রলিটা নিয়ে তনুর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো,

‘কিরে রুমে ঢুকছিস না কেন?’

তনিমা রুমে ঢুকল। ফায়াজও তার পেছন পেছন এলো। তনিমা গভীর দৃষ্টিতে তার রুমের জিনিসগুলো পরখ করে যাচ্ছে। ফায়াজ বিছানায় গিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। তার পাশেই বিশাল একটা টেডি রাখা। তনুর প্রিয় পুতুল। তনুর আঠারো তম জন্মদিনে ফায়াজই তাকে এটা উপহার দিয়েছিল। ফায়াজ টেডিটাকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজল। তারপর হঠাৎ মিনমিন করে বললো,

‘বউয়ের বুকে মুখ গুঁজে তো আর শোয়ার সৌভাগ্য আমার হবে না, তার টেডির বুকেই না হয় মুখ গুঁজে সেই ইচ্ছেটা পূরণ করে নিলাম।’

তনু তীক্ষ্ণ চোখে ফায়াজের দিকে তাকাল। বললো,

‘কিছু বললি?’

ফায়াজ মুখ তুলে তাকাল, তারপর ক্লান্ত কন্ঠে বললো,

‘না তোকে না টেডিকে বলছিলাম।’

তনিমা গোল গোল মুখ করে বললো,

‘ওও’

তারপর আবার থেমে গিয়ে জিগ্যেস করলো,

‘তা কি বলছিলি টেডিকে?’

ফায়াজ কাটকাট গলায় বললো,

‘ওটা আমার আর টেডির পার্সোনাল কথা তোকে বলা যাবে না।’

তনু তিক্ত কন্ঠে বললো,

‘বলতে হবেও না।’

তনু আলমারি খুলে তার পুরাতন একটা জামা বের করে ওয়াশরুমের কাছে যেতেই ফায়াজ তাকে ডাকল। তনিমা পেছন ফেরে তাকিয়ে বললো,

‘কি হয়েছে?’

‘তোর কালো কালারের যে টপসটা আছে ঐটা পর।’

তনিমা মাথা দুলিয়ে বললো,

‘জীবনেও না।’

ফায়াজ কপাল কুঁচকে বললো,

‘কেন না?’

‘এমনি আমার পরতে ইচ্ছে করছে না তাই পরবো না।’

ফায়াজ তপ্ত শ্বাস ফেলল, আর কথা বাড়াল না। তনিমা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল ফ্রেশ হতে।
.
.
রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে সকলে লুডু খেলতে বসেছে। ফিহা আর তনিমা এক টিম, ফায়াজ আর তানভীর এক টিম। প্রথম চালেই তনিমার ছয় উঠল। ফায়াজ তখন তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,

‘জানিস তো তানভীর যাদের আগে আগে ছয় উঠে তারাই কিন্তু হারে।’

তনিমা ভেংচি কেটে বলে,

‘আহারে! আমার ছয় উঠেছে বলে তোমাদের হিংসে হচ্ছে বুঝি। থাক বাচ্চারা কান্না করে না। তোমাদেরও ছয় উঠে যাবে।’

তনিমার কথা শুনে ফিহা হাসতে হাসতে কুটি কুটি। ফায়াজ তখন বেশ দাপট দেখিয়ে বললো,

‘রেডি থাক, আজকে তোদের হারিয়েই আমি দম নিবো।’

তনিমা হাত নাড়িয়ে বাতাস করার ভান করে বললো,

‘ওকে অল দ্যা বেস্ট।’

কিছুক্ষণ পর,

হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে দুই টিমের মাঝে। শুধু প্রয়োজন একটা কানার। যেই দলের এক উঠবে সেই দলই চিতবে। কিন্তু এই অসভ্য কানাটার তো কোন দেখাই নেই। আধ ঘন্টা যাবত তারা মেরেই চলছে তাও কানা উঠছে না, এমনিতে তো কানার বন্যা বয়ে যায় আর যখন প্রয়োজন পড়ে তখনই এর কোন দেখা মিলে না। দুই দলই ভীষণ বিরক্ত। এক পর্যায়ে কানা উঠল। চিতে গেল তনিমা আর ফিহা। দুজনেই এক সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল। যেন তারা লুডু না কোন বিশ্বকাপ চিতেছে। ফায়াজ তখন দায়সারা ভাব নিয়ে বললো,

‘এত খুশি হওয়ার কি আছে? তোরা বাচ্চা মানুষ তাই আমরা ইচ্ছে করে তোদের জিতিয়ে দিয়েছি। নাহলে তো আবার কান্না কাটি শুরু করতি। কি ঠিক বলিনি, তানভীর?’

তানভীর মাথা হেলিয়ে বললো,

‘হ্যাঁ হ্যাঁ একদম ঠিক।’

তনিমা আর ফিহা পেট চাপড়ে হাসতে থাকে। তনিমা হেয়ালির সুরে বলে,

‘হেরে গেলে মানুষ কত কিছুই বলে নিজেকে সান্তনা দেওয়ার জন্য। থাক আমরা কিছু মনে করি না।’

ফায়াজ সরু চোখে তনিমার দিকে তাকালে তনিমা ভেংচি কাটে সঙ্গে সঙ্গে ফায়াজ ঠোঁট পাওট করে তাকে চুমু দেখায়। তনিমা যেন বিষম খায় তাতে। ব্রু কুঁচকে রাগি চোখে তার দিকে তাকাতেই ফায়াজ বাঁকা হেসে বলে,

‘আচ্ছা, তোদের আরো খেলতে ইচ্ছে করলে খেল। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে আমি ঘুমোতে যাচ্ছি।’

ফায়াজ চলে যেতেই তানভীর বললো,

‘ভাইয়া যখন চলে গিয়েছে আর খেলে কি হবে। আমিও গিয়ে শুয়ে পড়ি।’

তনিমা বললো,

‘আচ্ছা যা। আমরাও শুয়ে পড়ব।’

সবাই যার যার মতো নিজেদের রুমে চলে গেল।

তনিমা রুমে গিয়ে দেখল ফায়াজ নেই। বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখল, ফায়াজ গ্রিলের সাথে হেলান দিয়ে আকাশ দেখছে। তনিমা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর বললো,

‘তোর না ঘুম পেয়েছে? তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? শুতে যা!’

ফায়াজ ফিরে তাকাল তার দিকে। প্রসন্ন হেসে বললো,

‘মিথ্যে বলেছিলাম।’

‘কেন?’

তনিমার কথার জবাবে ফায়াজ কিছু বললো না। তার গভীর দৃষ্টি আবারও ঐ কালো আকাশে নিবদ্ধ হলো।

‘আজও বোধহয় বৃষ্টি হবে। মেঘ ডাকছে, বিদ্যুত চমকাচ্ছে।’

‘এইসব আমার পছন্দ না।’

তনিমা বললো। ফায়াজ স্মিত হেসে বললো,

‘তবে আমার কিন্তু ভীষণ পছন্দ। কেমন নিস্তব্ধ চারপাশ, বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ। কর্ণকুহুরে সুরের মতো বাজতে থাকে। তোর তো এইসব পছন্দ না। এই জন্যই তো তুই এত নিরামিষ। তোর মধ্যে রোমাঞ্চকর কোন ব্যাপারই নেই। কেমন যেন পানসা পানসা।’

তনিমা তেড়ে এলো ফায়াজের দিকে। কপট রাগ দেখিয়ে বললো,

‘ও তাই তো। আমি তো এখন তোর কাছে পানসা হবোই। বেশ তো যা না যা তোর ঐ লিজার কাছে ও কিন্তু খুব রোমান্টিক। তোর সাথে এত রোমান্স করবে এত রোমান্স করবে যে তুই জীবনেও আর রোমান্সের র ও মুখে আনবি না।’

রাগে যেন ফেটে পড়ছে তনিমা। ফোসফোস করে নিশ্বাস ফেলছে। ফায়াজ তার দিকে তাকাল। মেয়েদের রাগলে খুব সুন্দর লাগে। উঁহু, বউদের রাগলে খুব সুন্দর লাগে। কেমন একটা গিন্নি গিন্নি ভাব চলে আসে ওদের মধ্যে। তখন খুব করে বলতে বলতে ইচ্ছে করে, ‘শুনছো গিন্নি, তোমায় আজ খুব সুন্দর লাগছে গো!’

ফায়াজকে চুপ থাকতে দেখে তনিমা তেজ দেখিয়ে বললো,

‘কি হলো? এখন কিছু বলছিস না কেন?’

ফায়াজ হাতটা এগিয়ে তনিমার কানের পিছে কিছু ছুল গুঁজে দিয়ে তপ্ত কন্ঠে বললো,

‘তোকে খুব সুন্দর লাগছে তনু।’

অবাক হলো তনিমা। দুই ব্রুয়ের মাঝে লম্বালম্বি দুইটা ভাজ পড়ল। চোখ মুখ স্বাভাবিক করে বললো,

‘চোখে কি রঙিন চশমা পরেছিস যে আমাকে হঠাৎ করেই খুব সুন্দর লাগতে শুরু করেছে।’

ফায়াজ অধর ছড়িয়ে হাসল, বললো,

‘তুই বরাবরই সুন্দরী। ভীষণ সুন্দরী। তাই তো তোর এই রূপে মুগ্ধ হয়ে আমি বার বার..’

তনিমা অতি আগ্রহ সমেত বললো,

‘বার বার কি?’

ফায়াজ কথা ঘুরিয়ে বললো,

‘কিছু না। আমার ঘুম পাচ্ছে চল ঘুমাতে যাই।’

তনিমার রাগে শরীর রি রি করে উঠে। খবিশটা কোন ভাবেই স্বীকার করতে চায় না। এত কিসের সমস্যা ওর? বলে দিলেই তো পারে যে সে তাকে ভালোবাসে। তা না খালি শুধু কথা প্যাচায়। তনিমা রাগে দপ করে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। ফায়াজও এক পলক তনিমার দিকে তাকিয়ে তার পাশে শুয়ে পড়ল।

রাত দুটো হবে হয়তো,

তনিমার হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ মেলে তাকায় সে। হুট করেই কেন যেন তার খুব ভয় লাগতে শুরু করে। পাশ ফেরে ফায়াজকে দেখে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তনিমা তার হাতে গুঁতা দেয়। ফায়াজ নড়ে না। তনিমা আবারো একটা গুঁতা দিয়ে আস্তে করে ডাকে, ‘ফায়াজ।’ এবারও সে নড়ল না। তনিমা এবার জোরে চিৎকার দিয়ে ডেকে উঠে, ‘ফায়াজ’। সঙ্গে সঙ্গে দরফরিয়ে উঠে বসে ফায়াজ। তনিমার দু গালে হাত রেখে অস্থির কন্ঠে বলে উঠে,

‘কিরে কি হয়েছে? কোন সমস্যা? শরীর খারাপ লাগছে? পেটে ব্যাথা করছে? নাকি অন্যকিছু? কি হয়েছে বল আমায়?’

তনিমা অসহায় কন্ঠে বলে,

‘না এগুলো কিছু না।’

‘তাহলে?’

ফায়াজের প্রশ্ন। তনিমা বললো,

‘আসলে আমার ভয় করছিল, তাই তোকে ডেকেছি।’

ফায়াজ অগ্নি দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। তনিমা অসহায়ের মতো হেসে বললো,

‘আসলেই খুব ভয় লাগছিল। তুই উঠছিলি না বলেই এত জোরে চিৎকার দিয়েছি। সরি।’

ফায়াজের রাগে তনিমাকে এই মুহুর্তে গিলে ফেলতে ইচ্ছে করছে। আরেকটু হলেই তার দম বেরিয়ে যেত। এইভাবে কেউ কাউকে ডাকে? ফায়াজ অপর পাশে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়ল। তনিমা তার গা ঘেঁষে শুয়ে বললো,

‘এদিকে ফির না। আমার ভয় করছে তো।’

ফায়াজ ফিরলো না। তনিমা এবার তার আরও কিছুটা কাছে গিয়ে শুলো। ভূতকে যে তনিমা ভীষণ ভয় পায় সেটা ফায়াজ জানে। এটা তার ছোট বেলার সমস্যা। অবাস্তব একটা জিনিসের উপর তার ফোবিয়া। এমনিতে সব ঠিক আছে তবে হুট করেই কোন কারণ ছাড়া সে ভয় পেতে থাকে। যেই সেই ভয় না একেবারে মারাত্মক লেভেলের ভয়। ফায়াজ কথাগুলো ভেবেই তনিমার দিকে ফিরল। সঙ্গে সঙ্গে তনিমা তার বুকের সাথে মিশে গেল। যেন এইখানটায় তার জন্য সব থেকে নিরাপদ স্থান। ফায়াজও মুচকি হেসে ভীষণ শক্ত করে তনিমাকে তার বাহুডোরে মিশিয়ে নিল।

চলবে..

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x