গল্প: রাগে অনুরাগে (১০)

লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা

১০

~
মাথার উপর জানলাটা দিয়ে রোদের ঝলমল আলো তনিমার চোখে মুখে আছড়ে পড়ল। একটু নড়ে চড়ে উঠে চোখ পিটপিট করে তাকাল সে। চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক হতেই সে নিজেকে ফায়াজের বাহুডোরে আবিষ্কার করলো। তনিমা মুচকি হাসল। প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিল। ফায়াজের শরীর থেকে মিষ্টি এক ঘ্রাণ পেল সে। তনিমা মাথাটা উঁচু করে ফায়াজের মুখের কাছে তার মুখ নিয়ে আলতো করে কপালে চুমু দিল। তারপর আবারও তার বুকে মুখ লুকালো।

ঘড়িতে নয়টা বাজে,

‘বাগানের লাল গোলাপটা আমাকে দেবে, তানভীর ভাই?’

ফিহার অনুরোধের কন্ঠ। তানভীর প্রসন্ন হেসে বললো,

‘তুই চেয়েছিস, আর আমি না দিয়ে পারি?’

লজ্জায় রাঙা হলো ফিহা। মাথা নিচু করে মুচকি হাসল। তানভীর ফুলটা ছিড়ে এনে ফিহার হাতে দিল। ফিহা ফুলটা হাতে নিয়ে খুশি মনে বললো,

‘ফুলটা কেন নিয়েছি জানো?’

‘কেন?’

ফিহা মিটমিট করে হেসে বললো,

‘প্রপোজ করতে।’

তানভীর ভীষণ অবাক কন্ঠে বললো,

‘প্রপোজ?’

‘হু, আমি এই ফুলটা দিয়ে একজনকে প্রপোজ করবো। তবে এখন না। আরো কিছুদিন পর। ফুলটা যখন একদম শুকিয়ে যাবে তখন আমি এই শুকনো ফুল দিয়ে তাকে প্রপোজ করবো।’

ফিহার কথা শুনে তানভীরের মুখ কালো হয়ে যায়। কপালের চামড়া তার কুঁচকে যায়। সে কিছুটা রাগ নিয়ে বলে,

‘তা কাকে প্রপোজ করবি শুনি?’

ফিহা দাঁত কেলিয়ে হেসে বললো,

‘সেটা তো তোমাকে বলা যাবে না।’

তানভীরের এবার ভীষণ রাগ হতে লাগল। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে এল তার। ফিহার সাথে আর কোনো কথা না বলে সে বড় বড় পা ফেলে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। তানভীরের লুকানো রাগ ফিহা ঠিকই টের পেয়েছে। তানভীর যেতেই সে হেসে ফেলে। হাতের ফুলটাতে চুমু খেয়ে তানভীরের যাওয়ার পথে তাকিয়ে বললো,

‘আই লাভ ইউ।’

খাবার টেবিলে খেতে বসেছে সবাই। তনিমার মা সবাইকে নাস্তা এগিয়ে দিচ্ছে। তনিমার বাবা ফায়াজের সাথে কোনো এক বিষয়ে কথা বলছে যার প্রতি তনিমার কোনো আগ্রহ নেই। এই মুহুর্তে সে ব্যাপক ক্ষেপে আছে। ঘুম থেকে উঠেই ফায়াজ তাকে জ্বালানো শুরু করেছে। ঐ কাল রাতে আবার সে একটু জড়িয়ে ধরেছিল না। এখন তো ফায়াজ তাকে পেয়ে বসবেই। সুযোগই তো খুঁজে সবসময় কিভাবে তনিমাকে অপদস্থ করা যায়, চেতানো যায়। তনিমা মুখ ভার করে বসে আছে। তার উল্টো পাশের বরাবর চেয়ারটাতে তার ভাই তানভীরও মুখ ভার করে বসা। নামমাত্র রুটিটা মুখ দিয়ে চিবুচ্ছে পারছে না এই রুটির বদলে ঐ মানুষগুলোকে তারা চিবুতে। তনিমার বাবা খেয়ে আগে আগে অফিসে চলে গেলেন। ফায়াজ আর বাকি সবাই ধীরে সুস্থে খাচ্ছে। তাদের খাওয়ার মাঝখানেই ফিহা বলে উঠে,

‘কি হয়েছে বলতো? তোমাদের ভাই বোনের মুখ এমন বাংলার পাঁচের মতো হয়ে আছে কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে ভাবি? আর তানভীর ভাইয়া তোমারও বা কি হলো?’

তনিমা তানভীর তখন এক সঙ্গেই বলে উঠে,

‘কিছু না।’

দুজনেই এক জন অন্য জনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে। তনিমা মেকি হেসে বললো,

‘না আসলে তেমন কিছু হয়নি ফিহা। মাথাটা একটু ধরেছে তো তাই।’

ফিহা রুটিতে জ্যাম লাগাতে লাগাতে বললো,

‘কাল রাতেও বুঝি ঘুম হয়নি তোমার?’

কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিন জোড়া চোখের তীক্ষ্ণ পরখ তার উপর নিবন্ধ হলো। সবার এমন দৃষ্টিতে ফিহা থতমত খেয়ে গেল। বোকা বোকা হাসি দিয়ে বললো,

‘ন-ন না মানে, এতটা পথ জার্নি করে এসেছো তো তাই বোধ হয় ভাবির ঘুমটা ঠিক মতো হয়নি। এইজন্যই মাথাটা ধরেছে। তাই না ভাবি?’

তনিমা ফিচেল কন্ঠে বললো,

‘খুব পেকেছিস কিন্তু।’

ফিহা ভয়ে ভয়ে তার ভাইয়ের দিকে তাকায়। ফায়াজ ক্রুব্দ দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। ফিহা কাঁদো কাঁদো মুখ করে উঠে দাঁড়াল। বললো,

‘আমার খাওয়া শেষ, আমি রুমে যাচ্ছি। তোমরা খাও।’

রান্নাঘর থেকে তখন তনিমার আম্মু বেরিয়ে এলেন। ফিহাকে বললেন,

‘কি খাওয়া শেষ। কিছুই তো খেলি না। এই পাউরুটিগুলো আগে শেষ কর। তারপর উঠবি।’

ফিহা ভীত সন্ত্রস্ত মন নিয়ে আবারও ফায়াজের পাশের চেয়ারটায় বসল। ফায়াজের ঠান্ডা প্রতিক্রিয়া দেখে ফিহা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
.

বিছানার এক কোণে হেলান দিয়ে বসে ফায়াজ টিভি দেখছে। তার পাশেই তানভীর বসা। টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ চলছে। দুজনের চোখের পলক এবার আর পড়বে না। গভীর মনোযোগ তাদের টিভির পর্দায় নিবদ্ধ। হুট করেই তখন কোথ থেকে তনিমা চলে এল। ছো মেরে ফায়াজের হাত থেকে রিমোটটা নিয়ে টিভিটা বন্ধ করে দিল। ফায়াজ আর তানভীরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। কড়া দৃষ্টিতে তনিমার দিকে তাকাল ফায়াজ। ধমকে উঠে বললো,

‘টিভি অফ করলি কেন? দেখছিস না আমরা খেলা দেখছি।’

‘অনেক দেখেছিস, আর দেখতে হবে না। এখন উঠে গিয়ে রেডি হো। আমার সাথে বাইরে যাবি।’

ফায়াজ চোখে মুখে বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে তুলে বললো,

‘কই যাবি?’

‘মার্কেটে।’

ফায়াজের মেজাজ যেন এবার তুঙ্গে উঠে যায়। সে তেতিয়ে উঠে বলে,

‘এই মেয়ে দুপুর বারোটায় কোন বেক্কলে শপিং করতে যায়?’

‘কেউ যায় না, কিন্তু আমি যাবো। এখন আর কোনো কথা বাড়িয়ে চলতো তাড়াতাড়ি।’

ফায়াজ রাগে ফোসফোস করতে করতে বলে,

‘ধুর যা তো এখান থেকে। এখন আমি কোথাও যেতে পারবো না। বিকেলে বেরুবো। যা এখন।’

তনিমা বললো,

‘মা বলেছে। তুই যদি এখন আমার সাথে শপিং এ না যাস, তাহলে আমি মাকে ফোন করে সব বলবো। তোর নামে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলবো। তোর জেঠীমাকেও বলবো। বাবাকেও বলবো। সবাইকে বলবো। তারপর সবাই তোকে ধরে ইচ্ছেমতো ওয়াশ দিবে।’

ফায়াজ দাঁত কটমট করে তনিমার দিকে তাকায়। তনিমা গা জ্বালানো এক হাসি দিয়ে বলে,

‘ভালো ছেলের মতো তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও বাবু। আমরা এখনি শপিং এ যাচ্ছি।’

ফায়াজ রাগে ফেটে যাচ্ছে। তানভীর তনিমাকে কিছু বুঝাত গিয়েও পারলো না। তনিমার এক ধমকে সে ভেজা বেড়াল।

______________

শপিং ব্যাগ গুলো গাড়ির পেছনে রেখে ফায়াজ গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসলো। তনিমা তার পাশে বসতেই সে বললো,

‘এত সাবান, শ্যাম্পু তো বিদেশ থেকেও কেউ আনে না। এত সাবান, শ্যাম্পু দিয়ে কি করবি তুই?’

তনিমা মৃদু হেসে বললো,

‘বিয়ের পর নতুন জামাইকে এই বাজারগুলো করতে হয়। এটা নাকি নিয়ম। মা’ই ফোন করে আমাকে বলেছে তোকে দিয়ে এই জিনিসগুলো কেনানোর জন্য। তাই তোকে নিয়ে এখানে এসেছি। নাহলে আমারও কোনো ইচ্ছে ছিল না এই দুপুর বেলা টই টই করে শপিং করতে আসতে।’

ফায়াজ তপ্ত শ্বাস ফেলল। লুকিং গ্লাসটা হালকা নাড়াচাড়া করে গাড়িটা স্টার্ট করলো।

পথের মাঝখানেই শুরু হলো বৃষ্টি। বর্ষার মেঘ বলে কয়ে আসে না। জানলা দিয়ে বৃষ্টির পানি আছড়ে পড়ছে তনিমার চোখে মুখে। ফায়াজ গ্লাস দুটো তুলে দিল। তনিমা তখন ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো,

‘কি হলো, গ্লাস তুললি কেন?’

‘ভিজে যাচ্ছিলি তো।’

‘সমস্যা নেই। নামা গ্লাস। আমি ভিজব।’

তনিমার কথামতো ফায়াজ গ্লাসগুলো নামিয়ে দেয়। সা সা করে বাতাসের সাথে ছুটে আসা বৃষ্টির পানিগুলো তনিমাকে ভিজিয়ে চলছে। ফায়াজেরও এক পাশ ভিজে গিয়েছে। তাও তনিমা গ্লাস তুলতে দিবে না। চোখ বুজে সিটে হেলান দিয়ে বসে সে।  ছুটন্ত বৃষ্টির কণাগুলো এখন সে উপভোগ করবে। হঠাৎ করেই চোখ মেলে তাকায় তনু। বাইরে কিছু একটা দেখে সে চেঁচিয়ে উঠে। লাফিয়ে উঠে বলে,

‘গাড়ি থামা, গাড়ি থামা; আমি নামবো।’

চলবে..

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x