– আপু তোমার জামাই নাকি মেজর! আমি শুনেছি মেজররা নাকি অনেক বেশি রাগী হয়!
ফিসফিসিয়ে বলা কথাটা কানে আসতেই হকচকিয়ে তাকালো নিশি।
– তোকে কে বলেছে এসব?
– আম্মু আব্বু কথা বলছিল তখন শুনেছি আমি আর তোমাকে দেখতে আসার পর যে কল আসায় বাইরে গিয়েছিল না? তখন আমি বাইরে ছিলাম, সে ফোন নিয়ে বলছিল ‘মেজর সাজিদ মাহতাব স্পিকিং’
তাহলে?
নিশি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই লোকটা সেনাবাহিনীর লোক? তাই তো তার চলাফেরা আচরণ অন্যরকম লেগেছিল নিশির কাছে কিছুটা স্ট্রেট ফরওয়ার্ড তবে আন্দাজ করতে পারেনি। ভেবেছিলো হয়তো খুব পাংচুয়াল।
নিশির ছোট বোন নিধি তাকে ধাক্কা দিয়ে বললো,
– কি হলো আপু? কি ভাবছ?
নিশি শক্ত কণ্ঠে বললো,
– কিছু ভাবছি না আর ওনি আমার জামাই হয়েছে নাকি যে “তোমার জামাই” বলছিস?
– কেন আম্মু আব্বু তো অনেক খুশি পছন্দ হয়েছে তাদের। এমনিতে ভাইয়াটা সুন্দর আছে!
– এই মেয়ে তোর পড়ালেখা নেই? সারাদিন টইটই করছিস কেন? আর এসব কথা তোর ভাবতে হবে না যা!
নিধি মুখ বাকিয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে দরজায় উকি দিয়ে বললো,
– এটা কিন্তু সত্যি মেজররা অনেক রাগী হয়!
– তবে রে তোকে…
বলেই নিশি তেড়ে যেতেই নিধি এক দৌঁড়ে নিজের রুমে ছুটেছে।
ও হলো ❝হুমায়রা আনান নিশি❞
আজ নিশিকে দেখতে এসেছিল পাত্র পক্ষ। কথাবার্তা যতদূর এগিয়েছে মনে হচ্ছে বিয়েটা হয়ে যাবে। এর আগে নিশিকে তেমন কোনও পাত্র দেখতে আসেনি। নিশি পর্দা করে চলে। তাই সে সেরকম কাউকেই বিয়ে করবে জানিয়েছে তাই এর আগে যেই দুজন পাত্র পক্ষ এসেছিল তারা অর্ধেকে ফিরে গিয়েছে কারণ তাদের উচ্চবিলাসী চওয়াপাওয়া এবং আধুনিক চালচলন চাই। পরশুদিন জানায় একটা পাত্র আসবে এবং তার মা সাথে বোন কিংবা খালা কে যেন আসবে সাথে। নিশি রাজি হয় এবং আজ এসেছে। নিশি একবারই চোখ তুলে তাকিয়েছে তবে তার চালচলন দেখে কিছুটা তেমন মনে হলেও তিনি যে ‘মেজর’ এটা জানতো না সে। ছোট বোন লাবিবা আনান নিধি এসে মাত্রই এই কথাটা বলল। দেখতে আসলে সে তখন শুধু এক পলক দেখেছিল। লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারেনি এখন “মেজর” শব্দটা শোনার পর থেকেই তার চোখে ভাসছে কড়া মেজাজের, কর্কশ কণ্ঠের কোনো এক অফিসারের ছবি। সে একটা ঢোক গিলে ভাবল থাক যা নসিবে আছে সেটা হবে ইনশাআল্লাহ রব যা করবেন সেটাই মঙ্গল!
রাতে ডিনারে সবাই একসাথে খাচ্ছে। হঠাৎ নিশির বাবা বলে উঠলেন,
– বলতে একদম ভুলে গিয়েছি সন্ধ্যায় ওরা যাওয়ার পর ওরা আলোচনা করেছে বুঝলে? রাতে ফোন দিয়েছিল আমায়। আমি নামাজে যাওয়ার আগে কল এসেছিল ভেবেছিলাম এসে বলব একদম ভুলে গিয়েছি
নিশির খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। নিধি আর নিশি এক পলক নিজেদের চওয়াচাওয়ি করলো।
নিশির মা তাড়া দিয়ে বললেন,
– কি বললেন উনারা বলুন না?
– আরে এত অস্থির হচ্ছো কেন? আমাদের মেয়ে কি কোনদিক দিয়ে কম নাকি যে ওদের উপর ভিত্তি করে মেয়ের জীবন নির্ভর করবে?
– না তা নয়, কিন্তু মেয়ে মানুষ তো…
নিশির বাবা এক গাল হেসে বললেন,
– আরেহ ওদের পক্ষ থেকে একদম গ্রিন সিগন্যাল! আমাদের নিশিমনিকে ভীষণ পছন্দ করেছে তারা!
– আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ! আমারও তো ছেলেটাকে ভীষণ ভালো লেগেছিল যেমন মার্জিত চালচলন তেমন অমায়িক ব্যবহার।
– তা আর বলতে? ওর প্রফেশনটাও ভালো কিন্তু দেখো ওর মধ্যে অহংকারের ছিটেফোটা নেই!
নিশি বুঝল যা ভেবেছে তাই। এই দেখাশোনার প্রথম থেকেই সবার অতি আগ্রহ দেখে মনে হয়েছিল বিয়েটা বোধহয় এবার হয়েই যাবে! অবশ্য তার কাছে খারাপ লাগে নি সকলে যখন ওর সাথে কথা বলেছে তখন খুব ভালো ব্যবহারই লেগেছে।তবে যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে তার ব্যাপারে কিছুই জানে না। কথা হয়নি শুধু আব্বু আম্মুর সাথে কথা হওয়াটুকুই শুনেছে।
তার ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে তার বাবা জিজ্ঞেস করলো,
– এই দেখো নিশিমনি কিছুই বলছে না! তুমি রাজি তো মা? দেখো তোমায় আমরা জোর করবো না তুমি যা চাইবে সেটাই হবে। তোমাকে সারাজীবন আমার কাছে রেখে খাওয়ানোর সামর্থ্যও আল্লাহ তায়ালা আমাকে দিয়েছেন তাই তুমি যেটা বলবে ওইটাই হবে মা!
বাবার কথায় নিশির চোখে পানি এলো। তার বাবা তাকে যে কতটা ভালোবাসে সেটা তো সে জানেই। সে চোখের পানি আড়াল করে মাথা নিচু করে ছোট্ট করে বললো,
– তোমাদের যেটা ভালো মনে হয় সেটাই করো। তোমাদের পছন্দই আমার পছন্দ।
নিশির বাবা মা মৃদু হাসলেন।
– তাহলে কাল সকালেই ওনাদের জানিয়ে দিবো। দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করবো কারণ সাজিদ জানিয়েছিল সে খুব ঝাকঝমক করে বিয়ে করতে ইচ্ছুক নয়। সুন্নত মোতাবেক বিয়ে করে নিয়ে যাবে নিশিকে।
– আমি জানি নিশিকে সাজিদ ভালো রাখবে আগলে রাখবে ইনশাআল্লাহ আমাদের চিন্তা করতে হবে না।
– তাই যেন হয় সুফিয়া! মেয়েটাকে যোগ্য একজনের কাছে দিতে পারলেই শান্তি।
নিধি চোখের ইশারায় নিশিকে কিছু বলে বাবাকে বললো,
– আচ্ছা আব্বু? ওই যে ভাইয়াটা কথায় চাকরি করে?
– সাজিদ? ও তো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর। তোমাদের জানানো হয়নি তাই না? তবে মানুষ হিসেবে খুব সিম্পল মনে হয়েছে আমার কাছে।
‘মেজর’ শব্দটা বাবার মুখে শোনার পর নিশির মনের ভেতর একটা চিনচিনে ভয় কাজ করতে লাগলো। সে মনে মনে ভাবল,
“একজন মেজর কি আসলেই সিম্পল থাকতে পারে? যদি কথায় রেগে যান?”
খাওয়াদাওয়া শেষ করে রুমে গিয়ে এশার নামাজ সেরে নিলো। মনে শুধু একটাই দোয়া,
“আল্লাহ যদি মানুষটা আমার জন্য কল্যাণকর তবেই সবকিছু সহজ করে দাও। আমার মনেও কোনও দ্বিধা দ্বন্দ্ব রেখোনা”
নামাজ শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল নিশি। সে কি আদৌ একজন মেজরের জীবনসঙ্গিনী হওয়ার যোগ্য? পরক্ষণেই ডিসিপ্লিন নিয়মকানুন স্ট্রেইট ফরওয়ার্ডের কথা মাথায় আসলেই ভেতরে একটা ভয় কাজ করছে তার। প্রথমবার কথা এতটা এগিয়ে যাওয়ার নার্ভাসনেসটা যেন আরো বেড়ে গিয়েছে।
এরমধ্যে হাজির হলো নিধি।
– আপু? আয়নায় কি দেখছো? সুন্দর লাগছে কিনা? হুমমম সামনে তো সুন্দর লাগতে হবে তোমার বিয়ে বলে কথা!
নিশি মেকি রাগ দেখিয়ে বললো,
– বেশি পেকেছিস না তুই? দাঁড়া আব্বুকে বলে তোর ফোনটা নিয়ে নিবো।
নিধি মুখ কালো করে বললো,
– এই যা! আমার ফোনটা কি দোষ করলো!
নিশি চুপ করে আছে। নিধি চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো,
– এই আপু? আমি ভাবছি অন্য কথা! শুনেছি ওরা নাকি ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে দৌড়াতে যায়। তোকেও কি সাথে নিয়ে যাবে? না মানে নাটক সিনেমায় দেখেছি আরকি…
নিশি হেসে ফেলল এই পর্যায়ে। নিধি তার থেকে তিন বছরের ছোট, পিঠাপিঠিই বলা চলে আর একটা মাত্র বোন তাই খুনশুটিও বেশি।
নিশি উঠে ছোট বোনের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে একটু বড়দের মতো করে বলল,
– দেখ নিধি, একেকজনের ব্যক্তিত্ব একেক রকম হয়। পেশা দিয়ে তো আর মানুষ বিচার করা যায় না। আর আব্বু যখন ওনার ওপর ভরসা করেছেন, নিশ্চয়ই কিছু দেখে করেছেন। আব্বু আম্মু এই পর্যন্ত আমাদের জন্য যা করেছেন কোনোটাই কি খারাপ পড়েছে?
নিধি দুদিকে মাথা নাড়লো।
– তাহলে এটাও আম্মু আব্বু যা ভালো বুঝবে সেটাই মেনে নিবো। বুঝলি? এবার যা শুয়ে পর। কাল তোর পরীক্ষা আছে না?
_______________
পরেরদিন সকালটা কাটলো অদ্ভুত ব্যস্ততায়। নিশির বাবা ড্রইং রুমে চা নিয়ে বসলেন। তারপর ফোন দিলেন কাউকে। নিশির রুম থেকে সবটায় শোনা যাচ্ছে।
– জ্বি, মোস্তাফা ভাই! আমাদের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ সম্মতি আছে।
– …
– আলহামদুলিল্লাহ!
ব্যাস, কথা এখানেই পাকা হয়ে গেল। পুরোদিন নিশির বিয়ে নিয়ে ওর মা বাবার হুলস্থুল চলল কারণ তাদের দিক থেকে জানিয়েছে খুব দ্রুত ডেট ঠিক করবেন।
রাত দশটা বেজে গিয়েছে। নিশি তখন পড়ছিলো হঠাৎ যান্ত্রিক ফোনটি বেজে উঠে। সে হাতে নিয়ে দেখে আননোন নম্বর। এতো রাতে তুলবে কি তুলবে না ভেবে রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
– আসসালামু আলাইকুম, আমি কি হুমায়রা আনান নিশির সাথে কথা বলছি?
নিশি জড়তা নিয়েই উত্তর দিলো,
– ওয়াআলাইকুমুস সালাম, জ্বি…
– আমি সাজিদ মাহতাব বলছি।