গল্প: রাগে অনুরাগে (০৮)

লেখিকা-জান্নাতুল ফারিয়া

প্রত্যাশা

 

পর্ব:০৮

~
পরপর দুইবার হাঁচি দিয়ে তনিমা টিস্যু দিয়ে নাকটা মুছলো।  তারপর ক্রুদ্ধ চোখে সে ফায়াজের দিকে তাকালো। ফায়াজ ইনোসেন্ট ফেস করে তনিমা কে বলল,

‘কি হয়েছে?’

তনিমা রাগান্বিত কন্ঠে বলল,

‘কাল রাতে বারবার তোকে বারণ করেছিলাম বৃষ্টিতে না ভিজতে কিন্তু তুই আমার কোন কথা শুনলি না। এখন হয়েছে তো, ঠাণ্ডায় আমার অবস্থা খারাপ। আর এই সব কিছু হয়েছে তোর দোষে বারবার বারণ করার পরও তুই আমার কোন কথা শুনলি না সেই ভিজলি।’

ফায়াজ তনিমার কথার পিঠে চোখমুখ কুঁচকে বললো,

‘তুই তো এমনিতেই অসুস্থ হোস কিছু থেকে কিছু হলেই অসুস্থ হয়ে যাস। আমিও তো কাল তোর সাথে ভিজলাম কই আমি তো অসুস্থ হলাম না। তাহলে তুই কেন অসুস্থ হলি?’

‘একদম বাজে কথা বলবি না আমি এমনিতে অসুস্থ হই না। আমি বারবার কালকে বলেছিলাম রাতে বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে কোন কথা আমার শুনিসনি, আমার ঠান্ডা লেগেছে তোর জন্য; মা যদি আমায় কিছু বলে তাহলে আমি তোর দোষ দিবো।’

ফায়াজ এবার দুষ্টু হেসে বলল,

‘আমি তো তোকে শুধু ছাদে ভেজার জন্য জোর করে ছিলাম কিন্তু তুই যে ছাদে গিয়ে আমার ইজ্জতের উপর হামলা  করেছিলি সেটা বুঝি কিছু না!’

তনিমা চোখ বড়ো বড়ো করে চেঁচিয়ে উঠে বললো,

‘কি?’

ফায়াজ দায়সারা ভাবে নিয়ে বলল,

‘এখন চেঁচিয়ে কি হবে যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে।’

তনিমা ডিভাইন থেকে উঠে ফায়াজের সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর তার চুল টেনে বললো,

‘একদম বাজে কথা বলবি না, কি হয়েছে কিছু হয়নি।’

তারপর সে কিছু একটা ভেবে আমতা আমতা করে বলল,

‘এক-একটু জড়িয়ে ধরলে কি হয়েছে? একটু জড়িয়ে ধরলেই কারো ইজ্জত লুটা হয়ে যায় না, বুঝেছিস?’

ফায়াজ এক ব্রু উঁচিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,

‘তাহলে এখন আমিও একটু জড়িয়ে ধরি, কি বলিস?’

তনিমা চোখ মুখ কুঁচকে দূরে সরে দাঁড়াল। কর্কশ গলায় বললো,

‘চুপ কর। এখন সব ফালতু কথা বন্ধ করে উঠে ফ্রেশ হো। আমি নিচে যাচ্ছি।’

ফায়াজ কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই তনিমা ছুটে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর জোরে একটা দম নিয়ে মনে মনে বলে, ‘কাল রাতে যে আমার কি হয়েছিল এক আল্লাহই জানে, কি দরকার ছিল ঐ অসভ্যটাকে জড়িয়ে ধরার। এখন ঐ ফাজিলটা আমাকে লজ্জা দিতে দিতে মেরে ফেলবে। উফফ!’

নিজেকে নিজে এক গাদা গালি দিতে দিতে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামল তনু। ড্রয়িং রুমের সোফায় জেঠীমাকে দেখে তনিমা তার শাড়ির আঁচলটা টেনে মাথায় দেয়। তারপর প্রসন্ন হেসে জেঠীমার সামনে গিয়ে তাকে সালাম দেয়। সালামের জবাব দিয়ে জেঠীমা সোজা হয়ে বসলেন। তীক্ষ্ণ চোখে দেয়ালে থাকা বড় ঘড়িটার দিকে তাকালেন। অতঃপর গম্ভীর স্বরে বললেন,

‘যাক, কিছুটা উন্নতি হয়েছে তাহলে!’

তনিমা ফিচেল হাসল। বললো,

‘নাস্তায় কি খাবেন, জেঠীমা?’

জেঠীমা পান চিবুতে চিবুতে বললেন,

‘আমি যা খেতে চাইবো তাই খাওয়াবে নাকি? রান্না পারো তুমি?’

তনিমা জিভ দিয়ে তার শুকনো ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে বললো,

‘বলুন কি খাবেন, আমি চেষ্টা করবো।’

তাচ্ছিল্যের হাসি দিলেন শেফালী খাতুন। নাকের পাল্লা ফুলিয়ে কাটকাট গলায় বলে উঠলেন,

‘থাক। আমার জন্য আর তোমাকে কষ্ট করতে হবে না। তোমার শ্বাশুড়ি মা আছেন উনিই সব করে দিবেন। আর শুনো, এখন যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেডি হও। তোমার পরিবারের মানুষজন তো আজকে আসবেন। তাই একটু সেজে গুজে থাক, নয়তো আবার উনারা তো বলবেন উনাদের মেয়েকে দিয়ে সারাদিনই শুধু আমরা কাজই করিয়েছি। এখন আর দাঁড়িয়ে না থেকে রুমে যাও।’

তনিমা প্রতিত্তর করলো না। বেড়াল পায়ে রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
.
.
দুপুর দুইটার দিকে তনিমার পুরো পরিবার ফায়াজের বাড়িতে এলো। মা-বাবা আর ছোট ভাইকে পেয়ে তনিমার যেন খুশির অন্ত নেই। মাকে জড়িয়ে ধরে অল্প বিস্তর কেঁদেও ফেলেছে সে।
.
ডাইনিং টেবিলে খেতে বসলেন সকলে। তনিমা তার শাশুড়ি মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে উনাকে খাবার সার্ভ করতে সাহায্য করছে। জেঠীমা তখন বলে উঠলেন,

‘এই রিনা তুমিও বসো। আমাদের নতুন বউ আছে না ওই আমাদের আজ বেরে খাওয়াবে।’

তনিমা আম্মুর মুখে হাসি ফুটে উঠল। উনি বললেন,

‘হ্যাঁ তো বেয়ান, আপনিও বসে পড়ুন। তনিমা আছে তো।’

মায়ের কথার তালে তাল মিলিয়ে তনিমাও এবার বললো,

‘হ্যাঁ মা, বসে পড়। আমি সবাইকে খাবার দিচ্ছি।’

রিনা রহমান প্রথমে রাজি না হলেও পরে সবার জোরাজুরিতে রাজি হয়ে যান। তনিমা নিজ হাতে সকলের প্লেটে ভাত আর তরকারি দেয়। হঠাৎ শেফালী খাতুন গলা উঁচু করে বলেন,

‘ও কি বউ, মাছের বড় মাথাটা তুমি আমাকে কেন দিলে? ওটা তোমার বাবাকে দাও। উনি এই বাড়ির অতিথি। অতিথিদের সবসময় ভালো খাবারটা আগে দিতে হয়, বুঝেছো?’

তনিমা উপর নিচ মাথা হেলিয়ে বললো,

‘জ্বি।’

তনিমার বাবা তখন হেসে বললেন,

‘আরে আপা সমস্যা নেই তো। আমি তো মুরগীর রোস্টই শেষ করতে পারছি না। আবার এত বড় মাথা খাবো কি করে?’

জেঠীমা উচ্ছল হেসে বললেন,

‘না পারলেও খেতে হবে বেয়াই। মেয়ের বাড়িতে এসেছেন না খেয়ে আপনার উপায় নেই। দাও দাও বউ বাবাকে মাছের মাথাটা দাও।’

________________________________

‘তুই যাবি না আমাদের সাথে?’

পুরুষালী কন্ঠটা কানে যেতেই ফিহা পেছন ফেরে তাকাল। তানভীরকে দেখে সে মিষ্টি হাসল, বললো,

‘নিয়ে যাবে আমায়? মাকে বলেছিলাম আমি তোমাদের সাথে যাবো, কিন্তু মা তো বারণ করে দিল।'(মন খারাপ করে)

তানভীর হেসে বললো,

‘আপু আন্টিকে বুঝিয়েছে। আন্টিও এখন রাজি। তাড়াতাড়ি গিয়ে তৈরি হয়ে নে আমরা একটু পরেই বেরিয়ে পড়ব।’

ফিহা খুশিতে লাফিয়ে উঠে। দৌঁড়ে এসে তানভীরকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে নিজেকে সামলে নেয়। তানভীর বড় বড় চোখ করে ফিহার দিকে তাকাতেই বেচারি লজ্জা পেয়ে দ্রুত ছাদ থেকে নিচে নেমে যায়। তানভীর তখন মুচকি হেসে বলে,

‘পাগলীটা!’
.
.

সবাই একে একে গাড়িতে গিয়ে বসলো। তনিমার খুশি যেন আর ধরে না। আবার নিজের বাড়িতে যাবে সে। নিজের বাড়ি মানেই আলাদা ভালোবাসা, আলাদা প্রশান্তি। এই প্রশান্তি পৃথিবীর আর কোথায় নেই। এক গাড়িতে তনিমার মা বাবা উঠল। অন্য গাড়িতে ফায়াজ, তনিমা, ফিহা আর তানভীর উঠল। ফায়াজ ড্রাইভিং সিটে বসেছে তার পাশে তানভীর। ফিহা আর তনিমা পেছনে বসেছে। সবাইকে বিদায় জানিয়ে ফায়াজ ড্রাইভ শুরু করলো।
.
ফিহা যেন গল্পের ঝুলি নিয়ে বসেছে। তার পকপকরে সকলের কানে ধরলেও কেউ কিছু বলছে না। আর তার পাশে বসা মেয়েটা হাঁচি দিতে দিতে নিজের অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে। তনিমার নাকটা টুকটুকে লাল হয়ে আছে। বারবার টিস্যু দিয়ে নাক মুছছে। ফিহা আর তানভীর দুজনেই খেয়াল করলো বিষয়টা। ফিহা এবার কিছুটা চিন্তিত কন্ঠে তনিমাকে বললো,

‘কি হয়েছে, ভাবি? তোমার কি ঠান্ডা লেগেছে?’

তনিমা অসহায় ভাবে মাথা নাড়াল। ফিহা ঠোঁট চেপে হেসে তনিমার কানে কানে বললো,

‘ভোর বেলা গোসল করলে তো এমন একটু আধটু ঠান্ডা লাগবেই।

তনিমা ব্রু কুঁচকে বললো,

‘মান?’

ফিহা দুষ্টু হেসে বললো,

‘মানে তোমার ঠান্ডা লাগার পেছনে যে ভাইয়ার হাত আছে সেটা আমি বেশ বুঝতে পারছি। ভাইয়ার জন্যই তো তোমাকে ভোরে উঠে গোসল করতে হয়েছে, আর যার ফল এই ঠান্ডা। ইশ, ম্যারিড লাইফটা কি কষ্টের তাই না?'(অসহায়ের মতো মুখ করে)

তনিমার আর বুঝতে বাকি রইল না ফিহা কি বুঝাতে চাইছে। তনিমা তখন ক্ষিপ্ত কন্ঠে ফিহাকে বললো,

‘ভাইটার মতোই ফাজিল হয়েছিস?’

চলবে..

0 0 votes
Article Rating
Loading spinner
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x