Golpo:Augustina(02)

লেখিকা:নুসরাত জাহান তীব্রতা

পর্ব:০২

 

 

 

— ম্যাম একটা কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে। আপনার যে ব্রেন টিউমার হয়েছে সেটা কে জানি পাবলিশ করে দিছে। এটা নিয়েই এখন ঝামেলা চলছে। ডিরেক্টর আপনার উপর মারাত্মক রেগে আছে। আপনি জলদি আসুন।”

সাহিলের কথায় রেইন দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মুখের ঘোমটাটা ভালো করে দিয়ে এদিক ওদিক দৃষ্টিপাত করে।‌ এই মিডিয়ার জগতটা তার কাছে অনেক শখের।‌বহু পরিশ্রমের পর নিজের নামের পাশে অভিনেত্রী আর মডেল কন্যা ট্যাগ লাগাতে পেরেছে সে।‌এই অভিনয় জগতটা তার কাছে অনেক মূল্যবান। পরিবার পরিজন হারিয়েছে অভিনেত্রী হতে গিয়ে। এখানেও শান্তি পায় নি। সে যখন আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হতে শুরু করলো তখনই তার শত্রুর অভাব পরলো না। যে যেভাবে পারে তাকে নিচে নামানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল।‌ তাই নিজের বড় একটা অসুখ ব্রেন টিউমার হলেও লুকিয়ে রেখেছিল যাতে ক্যারিয়ারে এফেক্ট না পরে।

— ম্যাম কোথায় হারিয়ে গেছেন?

সাহিলের কথায় রেইন সম্বিত ফিরে পায়। চোখের পানি মুছে কাটকাট কন্ঠে জবাব দেয়,

— আমাকে নিয়ে যাও।

— আপনি ঠিকানা বলুন আমি এখনই আসছি। “

— আমি চিনি না এ জায়গা ।

— আচ্ছা তাহলে আমি লোকেশন ট্র্যাক করে আসছি। আপনি এতোক্ষণ ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন। সাবধানে থাকবেন ম্যাম। আমি যত দ্রুত সম্ভব আসছি।

— ওকে।

কল কেটে সামনে তাকাতেই দেখে একজন লোক রুটি আর চা খাচ্ছে। লোকটার খাওয়া দেখে রেইনের লিব্রর কথা মনে পরে।‌ ছেলেটা তার কাছে খাবার চেয়েছিল আর সে নিজের রাগ তার উপর দেখিয়েছে। লিব্রর জন্য না চাইতেও খারাপ লাগছে তার। মনের কুঠুরিতে অপরাধবোধ জেকে ধরেছে তাকে। তবে এখন তার ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। তাকে এখন তার টিমের কাছে যেতে হবে। রেইন মনে মনে ঠিক করে ঝামেলা মিটিয়ে পরে লিব্রকে এখান থেকে নিয়ে যাবে।

৪.

বাংলাদেশ নিউজ চ্যানেলগুলোতে রমরমা খবর , “বাংলাদেশের সুপারস্টার অভিনেত্রী ও মডেল ঝিনুক জাহান রেইনের ব্রেন টিউমার হয়েছে। তবে কি এবার আমরা হারাতে চলেছি একটা সুপারস্টারকে !”

কেউ কেউ খুশি হচ্ছে, কেউ আবার সান্ত্বনা দিচ্ছে আবার কেউ দুঃখ পাচ্ছে।

মিডিয়ার লোকেরা ঘেরাও করে ফেলেছে একাডেমিক ভবন, ডিরেক্টরের বাড়ি, রেইনের বাসা। উদ্দেশ্য যদি একবার তাদের দেখা পাওয়া যায়। নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে কালকে রাত থেকে অপেক্ষা করছে। কেউ কেউ লাইভ চালু করে রেখেছে যদি সেন্সিটিভ বিষয় ধরা পরে। বাংলাদেশ ছড়িয়ে এখন এই খবর আন্তর্জাতিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পরেছে। বিভিন্ন চ্যানেলে এ নিয়ে শোকবার্তা প্রকাশ করছে। কেউ কেউ আবার ভুয়া নিউজ তুলে ধরে লাইক, ভিউ কামাচ্ছে।

ফ্যান ফলোয়ার, মিডিয়ার লোক পুরো ঘেরাও করে ফেলেছে। সকলের মুখেই কৌতুহল আর উদ্বেগ। রাস্তাঘাট ব্লক করে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। পুলিশ, বডিগার্ড তাদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

সকলের কন্ঠে একই প্রশ্ন,

” আসলেই কি তরুণ অভিনেত্রীর এতো বড় রোগ হয়েছে? আর হলেই এমন লুকিয়ে রেখেছে কেন? কি রহস্য আছে এখানে?

আবার কেউ কেউ বলছে,

— রেইন কি তবে পালিয়েছে? কোথায় সে? গত ১২ ঘন্টা ধরে নিখোঁজ সে। তবে কি গা ঢাকা দিয়েছেন তিনি?

রকিং চেয়ারে বসে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে একজন তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে সামনের স্কিনে। যেখানে রেইন সম্পর্কিত তথ্য তুলে ধরছে একেরপর এক। মুখে তার তৃপ্তির হাসি।

সিগারেটটা পায়ের নিচে পিষে পাগলের মতো হাসতে থাকে। চিৎকার করে বলে,

— ঝিনুক তোর ক্যারিয়ার এখন কোথায় যায় আমিও দেখবো। তোকে যদি পথে না বসিয়েছি তাহলে আমিও রায়ান চৌধুরী না। আমাকে অপমান করেছিস না ! তোর জীবন আমি ধ্বংস করে দিবো। তুই আমার সবকিছু শেষ করে দিয়েছিস। আমি বাবা মায়ের আদর পাইনি শুধু তোর জন্য! হ্যাঁ হ্যাঁ শুধু তুই দ্বায়ী।‌ আমি তোকে ছাড়বো না। নিজে ধ্বংস হলেও তোকে ধ্বংস করবো আমি। “

অন্ধকার ঘরে বসে বিশ্রিভাবে হাসতে থাকে এক যুবক।‌তার হাসিতে নেই কোন মুগ্ধতা আছে শুধু একঝাঁক হিংস্রতা। মদের বোতলটা হাতে তুলে এক চুমুকে সম্পূর্ণ শেষ করে। সর্বাঙ্গ কালো পোশাকে আবৃত মানব এবার ঝিনুকের মায়াবী মুখশ্রীতে নজর বুলায়।‌ কতক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। সময় ফুরায় তবে তার নজর একবিন্দু নড়চড় হয় না।

দরজায় কড়াঘাতে মনযোগে ব্যাঘাত ঘটে। মুখে বিরক্তিকর একটা ভাঁজ সৃষ্টি হয়।

— কাম ইন।

অনুমতি পেয়ে দরজা ছেলে পাতলা গড়নের একটা ছেলে প্রবেশ করে। হাতের ফাইলটা বসে থাকা ব্যাক্তিটার হাতে দিয়ে চুপ করে দাঁড়ায়।

ব্যাক্তিটা গম্ভীরমুখে ফাইলটা দেখে উঠে দাঁড়ায়।‌চেয়ারের উপর থেকে কোটটা নিয়ে দৃঢ় পায়ে বেরিয়ে যায়। তার পিছু পিছু অ্যাসিস্ট্যান্ট ছেলেটাও বের হয়ে যায়।

৫.

ফ্রান্সের প্যারিস । আইফেল টাওয়ারের সামনের মাঠকে বলে ” Champ de Mars”।‌ মাঠের ডানপাশেই বিশাল বড়ো রাজপ্রাসাদের মতো একটা বাড়ি । ফ্রান্সের ভাষায় যাকে বলে ” শাতো ” । বাড়িটার নেইম প্লেটে বিশাল ইংরেজিতে লেখা, ” Chateau de Arthur ” ছয়তলা বিশাল ক্রিম কালার বাড়িটি পাথরের কারুকাজে সজ্জিত। ব্যালকনিগুলো কালো লোহার । গেইট স্পেশালে ভাবে তৈরি করা।‌ গেটের দুপাশে মার্বেলের দুটি কলাম। বাড়ির সামনে সাদা পাথরের বাউন্ডারি। বাড়ির ছাদে উঁচু একটা দুর্গ। ফ্রান্সের বেশিরভাগ বাড়িগুলোতে ছাদে দুর্গ আছে যেখানে কয়েকজন বসে চা খাওয়া যায়।

” শাতো দে আর্থার ” বিল্ডিং থেকে আইফেল টাওয়ার ৫ মিনিটের দূরত্বে। ছাদ থেকেই আইফেল টাওয়ার দেখা যায় ।

আর্থার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই আরেকটা বিলাসবহুল বাড়ি আছে। যার নাম ” Chateau de twins” । পাঁচতলা এই বিল্ডিং দেখলেই বোঝা যায় কতটা উচ্চবিত্ত পরিবার এরা।‌ ফ্রান্সের রাজধানী সেই সাথে আইফেল টাওয়ারের জন্য প্যারিসকে বড়লোকি শহর মনে করা হয়। সেখানে আইফেল টাওয়ারের আশেপাশে থাকা বিল্ডিংগুলোকে মানুষ রাজপ্রাসাদের চোখে দেখে। অন্যান্য শহর থেকে এখানে সবকিছুর দাম অনেক বেশি।

টুইনস বিল্ডিংয়ে দুর্গে বসে একমনে বই পরছে সুদর্শন এক যুবক। পরনে তার কালো হাফ হাতার টিশার্ট আর কালো ব্যাগি প্যান্ট। চোখে চশমাটা ঠিক করে সরু চোখে বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। চাঁদের আলো সরাসরি ছেলেটার মুখশ্রীতে পরছে।‌আশেপাশের কোন কিছু নিয়ে তার কোন ধ্যান জ্ঞান নেই। কফির মগে চুমুক দিয়ে হেডফোনটা কানে লাগিয়ে বই বন্ধ করে হেলান দিয়ে চোখটা বন্ধ করে। হুট করে মেয়েলি চিকন কন্ঠস্বর ভেসে আসে। বিরক্তিতে চোখ মেলে তাকায় সুদর্শন যুবকটা।

সামনে থাকা মেয়েটা করুন চোখে তাকিয়ে আছে। চিকন রিনরিনে কন্ঠস্বরে ফ্রান্সিস ভাষায় বলে,

— লিওন প্লিজ রাজি হয়ে যাও না।

ছেলেটা বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে বলে,

— তোমার সমস্যা কি নোয়া? আমি বললাম তো আমি পারবো না।

— লিব্র তো তোমার আপন জমজ ভাই হয় তাহলে কীভাবে তুমি তার এতো বড় ক্ষতি মুখবুজে সহ্য করবে?

ছেলেটা এবার মেয়েটাকে ধমকে উঠে,

— কোন খু’নি আমার ভাই হতে পারে না। আমার মায়ের খু’নিকে এই লিওন আ্যরন কোন সাহায্য করবে না।নোয়া তুমি চলে যাও। বিরক্ত করো না।”

— লিওন প্লিজ। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি তুমি লিব্রর হয়ে গানটা গাও।‌এমন না যে তুমি গান গাইতে পারো না। তুমি তো খুব ভালো গান গাও তাহলে লিব্রর বদলে গাইতে সমস্যা কি? কর্নসার্টের মানুষজন অপেক্ষা করছে। লিব্রর এখনও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি লিওন। লিব্র আজকে গান না গাইলে আর কখনোই কোন কর্নসার্ট করতে পারবে না। ওকে রেড কার্ড দেওয়া হবে এমনকি ওর পাইলট লাইফও রিস্কে পরবে। ‘

— ভালোই তো খোঁজখবর রাখো দেখছি ভালোবাসার মানুষের। তা তার খবর কোথায়? এতো বেআক্কেলে কেন?

বিদ্রুপ স্বরে কথাগুলো বললেও নোয়ার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠে। লিব্রকে সে অনেক ভালোবাসে। তবে কখনো বলতে পারেনি সাহস করে। তবে তার ধারণা লিব্রও তাকে ভালোবাসে।

— লিওন চলো না। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি। তুমি যদি লিব্রর বদলে গান গাও তাহলে তুমি আমার কাছে যা চাইবে তাই পাবে।

— সিউর?

— ড্যাম।

— ওকে।

লিওন বাঁকা হাসি হেসে উঠে গেলেও নোয়ার মুখে করুন হাসি ফুটে ওঠে।

( কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ )

 

চলবে…….

ছোট হওয়ায় জন্য দুঃখিত 😿 সবাই একটু রেসপন্স করবেন দয়া করে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x