লেখিকা:নাজনীন নাহার
part:05
জ্যোতি বাসায় প্রবেশ করে দেখে পরিবেশটা থমথমে হয়ে আছে। মা আসিয়া খান, জবা এবং জবার স্বামী রিয়াজ লাক্সার সবাই ড্রইংরুমে বসে আছে। জবা আর আসিয়া খান জ্যোতির দিকে তিক্ষনো দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে। জ্যোতি বুঝতে পারে সে কিছু করেছে হয়তো নাহলে প্রতিদিন জবা না হয় আসিয়া খানই দরজা খোলে আজ কাজে মেয়ে বানু দরজা খুললো। জ্যোতি বুঝতে পারছে না কি করেছে সে -‘একা একা গাড়ি ড্রাইভ করেছি তাই নয়তো?’ মনে মনে ভাবে।
ঝড়ের আগে যেমন শীতল বাতাস বয়ে যায় তেমন খান বাড়ির ড্রইং রুমে এখন শীতল বাতাস বোইছে। তার ভাবনার মাঝেই আসিয়া খান কোলন স্বরে ডাকে তাকে।
-‘ জ্যোতি এদিকে আসো।’
জ্যোতি গিয়ে মায়ের মুখোমুখি সোফায় বসে।
-‘ তোমায় ড্রাইভ করতে নিষেধ করেছিল তোমার বাবা ভুলে গেছো তুমি?’
-‘আসলে মা আজকে খুব ইচ্ছে করছিলো ড্রাইভ করার তাই।’
-‘ ইচ্ছে করলেই করতে হবে? এমন অনেক কিছু আছে যা আমাদের করতে ইচ্ছে করে কিন্তু করা যায় না। তোমার যদি কোনো ক্ষতি হতো তখন?’
জ্যোতির মধ্যে কোনো অনুসুচনা নেই সে সোজাসাপটা উওর দেয়-‘ক্ষতি হবে না মা, এক্সিডেন্ট তো করে এসেছি কিছু হয়েছে?’
জ্যোতির কথাটা শুনে জবা, আসিয়া খান রিয়াজ সবাই অবাক হলো। জবা জ্যোতির কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল-‘ তোর কিছু হয়নি তো?’
-‘কিছু হলে কি আসতে পারতাম।’
জ্যোতির এই গা-ছাড়া কথা শুনে আসিয়া খান রেগে গেল। সব কথার উওর এমন তেড়া তেড়া দেওয়ার মানে কি এই শিক্ষা তো সে দেইনি তার মেয়েদের কই জবা তো এমন ভাবে কথা বলে না জবার কথা শুনলে মনে হবে যেন মুখ থেকে মধু জড়ছে আর জ্যোতির কথা শুনলে মনে হবে নিমপাতার রস জড়ছে।
-‘ তুমি বেশ বেরে গেছো জ্যোতি কালকেই তোমার বিয়ে দিব আমি। ‘
কথাটা বলে আসিয়া খান চলে গেল নিজেট রুমে।
জ্যোতির খুব রাগ হলো কিছু হলেই শুধু বিয়ে দিব। এটা কোনো কথা হলো? তার মায়ের কাছে সব সমস্যার সমাধান যেন তার বিয়ে। বিয়েই যদি সব সমস্যার সমাধান হতো তবে মানুষের একটা বউ বা জামাই থাকতো না। তারা যখনই কোনো সমস্যায় পড়তো একটা করে বিয়ে করে নিতো আর তাদের জীবনসঙ্গী হতো একাধিক।
-‘গাড়ি কোথায়?’
-‘গুলশানে দুইয়ে ল্যাপপোস্টের সাথে ধাক্কা খেয়েছে। ‘
জবা আর কথা বারালো না ড্রাইভারকে কল করে গাড়িটা সার্ভিসংয়ে দিতে বলে।
জ্যোতি এখনো বসে আছে সেখানে, তার মা শেষে কি বলে গেলো?
– ‘ তোমার ফিলিংস কেমন শালিকা?’
জ্যোতি অবাক হয়ে বলে -‘ কিসের ফিলিংস? ‘
-‘মা বলল শোনোনি কাল বিয়ে তোমার। ‘
-‘বললেই হবে নাকি?’
কথাটা বলে জ্যোতি চলে গেল নিজের রুমে গিয়ে দরজাটা জোড়ে বন্ধ করলো।জবা, রিয়াজ শব্দে কেপে উঠলো কিন্তু কিছু বলল না জবা জানে তার বোনকে এখন কিছু বললে আবার কোথায় না কোথায় চলে যায়।
জ্যোতি রুমে এসে রাগে গদগদ করছে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। মুখটা একদম লাল হয়ে গেছে ফর্সা মানুষ যখন কোনো কিছুর জন্য খুব উওেজিত হয়ে পরে তারা লাল বর্ন ধারণ করে। জ্যোতির শরীর, হাত কাপছে যেন বড় কিছু হয়ে গেছে কিন্তু কিছুই তো হয়নি তার মা তো তাকে রোজই বিয়ের কথা বলে। আজ শুধু মা নয় তার দুলাভাইও বিয়ের কথা বলল তার মানে কিছু একটা হয়েছে বাসায় আর আজ জবাও কিছু বলেনি তার মাকে। সবসময় তো জ্যোতির বিয়ের কথা উঠলে জবা সোজা বলে দেয় ‘জ্যোতি যখন চাইবে তখনই ওর বিয়ে দিব আমারা’ তাহলে আজ বলল না কেনো?
জ্যোতি একটা লম্বা শাওয়ার নেয়। এখন কিছুটা ভালো লাগছে। প্রায় দুই-তিন ঘন্টা পরে দরজা খুলে বাইরে আসে জ্যোতি এসে দেখে জবা বসে আসে। জ্যোতি জানতো সবাই খেলেও জবা খাবে না জ্যোতিকে ছাড়া। জবা যতদিন এখানে থাকে প্রতিবার জ্যোতিকে নিয়ে খায়। জ্যোতি মাঝে মাঝে ভাবে এই মানুষটা আমার মা হলে কত ভালোই না হতো, মানুষ বলে বড় বোন দ্বিতীয় মা তার সাক্ষাৎ উদাহরণ যেন জবা। জবা দেখে জ্যোতি দাড়িয়ে আছে। জ্যোতিকে কাছে ডাকে, জ্যোতি গিয়ে বোনের কোলে কথা রেখে শুয়ে পড়ে যেনো এখানেই তার সব সুখ, তার সব চিন্তার সমাধান, তার ভালো থাকা। বাবা মারা যাওয়ার পর জ্যোতি একা একা থাকতো কারো সাথে কথা বলতো না মায়ের সাথেও না তখন জবা সপ্তাহের চার-পাঁচদিনই এখানে কাটাতো জ্যোতির সাথে। এখন বর্তমানে জ্যোতিকে এই একটা মানুষই বুঝে, জ্যোতির মা স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে কেমন যেন হয়ে গেছে মেয়েদের সাথেও তেমন কথাবার্তা বলে না।নিজের রুমে সারাদিন বসে থাকে আর শুধু জ্যোতিকে বিয়ের জন্য জোর। জবা সব সময় বলে যে অনার্স শেষ করার পরে বিয়ে দিবে কিন্তু তিনি মানতে না রাজ যেন জ্যোতিকে বিয়ে দিলেই তিমি মুক্ত আর কোনো দায়িত্ব থাকে না নিশ্চিন্তে স্বামী কাছে যেতে পারে। একটি মানুষের মৃত্যু পুরো পরিবারকে ওলট-পালট করে দিয়েছে।
-‘শোন জ্যোতি আমি তোর সাথে আছি সব সময়, সব পরিস্থিতে কখনো নিজেকে একা ভাবিসনা।’
জ্যোতির মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বললো কথা গুলো। জ্যোতি বোনের কথা শুনে বুঝতে পারে তার মায়ের শেষের কথাটা হয়তো সত্যি হতে দিবে না জবা। সেটা ভেবে একটু নিশ্চিন্ত হলো জ্যোতি।
-‘আপু তুমি মাকে বুঝাও আমি এখন বিয়ে করতে চাই না। মাস্টার্স কম্পিট করবো তারপর বিয়ে। তুমিও তো মাস্টার্স কম্পিল করে বিয়ে করেছো, তুমি মাকে বুঝাও মা সেই আগেকার মানুষদের মনোভাব নিয়ে এখনো বসে আছে।’
-‘আমার জীবন আর তোর জীবন এক নয় জ্যোতি। তুই আর পাঁচটা মেয়ের মতো দুর্বল নয়, সব পরিস্থিতিতে নিজের শক্ত রাখায় ক্ষমতা সবার থাকে না যেটা তোর মধ্যে আছে। ভবিষ্যতে জন্য প্রস্তুত হ আরও অনেক কিছু সামলাতে হবে তোকে । আমাদের বাবা নেই বুঝতেই তো পাড়ছিস ‘
এই একটা জায়গায় জ্যোতির নিজেকে দুর্বল মনে হয় , ‘আমাদের বাবা নেই’ এটা সব থেকে অসহায় বাক্য জ্যোতির কাছে। প্রতিটি সন্তানের জীবনে বাবার ভুমিকা অপরিসীম। জ্যোতি মনে পড়ে সেই ছোট বেলার কথা যখন তার বাবার আঙুল ধরে জ্যোতি স্কুলে যেত। জ্যোতিকে প্রতিদিন নিয়ম করে জামশেদ খান স্কুলে ড্রপ করে দিতো শত ব্যাস্ততা থাকলেও এই কাজে তিনি নিয়জিত থাকত এবাং খুব আনন্দের সাথে করতো। একদিন আসিয়া খান বলে -‘ আজতো তোমায় তাড়াতাড়ি অফিস যেতে হবে তুমি যাও আমি জ্যোতিকে নিয়ে যাচ্ছি কিন্তু তিনি মানতে না রাজ, তার মেয়েকে সেই নিয়ে যাবে তার জন্য যদি কোম্পানি জলে ভেসে যায় যাক। জামশেদ খান যখন খুন ইম্পর্ট্যান্ট কাজে ব্যস্ত থাকতো তখন কারও কল রিসিভ করতো না এমন কি নিজের অর্ধাঙ্গিনীরও না। কিন্তু পরিস্থিতি যেমনই থাকুক জ্যোতির কল রিভিস করেনি এমনটা মনে পড়ে না জ্যোতির। জ্যোতি মনে হচ্ছে এই সেদিন সে তার বাবার একটা আঙুল ধরে হাটতে শিখেছে আর তার মধ্যেই তার বাবা এখন শুধু মাএ কল্পনায় জীবিত, বাস্তবের তার কোনো অস্তিত্ব নেই।
-‘চল খাবার খেয়ে নিবি।’
জ্যোতি উঠে খেতে বসে। জবা জ্যোতিকে খাবার বেরে দেয়। খাওয়া প্রায় শেষে জবা বলল
-‘ গিয়েছিলি হসপিটাল?’
-‘হ্যাঁ’
জবা আর কথা বাড়ালো না সে যেন এখন জ্যোতির সাথে বেশি কথা বলতে চাচ্ছে না জ্যোতি যেন তার কোনে লুকনো কথা কখন বের করে ফেলে। খাওয়া শেষ করে জ্যোতি নিজের রুমে চলে গেল। এর মাঝে জবাকে আসিয়া খান ডাকলো। জবা মায়ের রুমে গেলো ।
-‘ তোমার বোনকে বলেছে?’
-‘না মা যখন তারা আসবে তখন বুঝিয়ে বলবো। তখন আর কিছু করার থাকবে না এখন বললে শুধু শুধু ঝামেলা হবে।’
– ‘ঠিক আছে এই দায়িত্ব আমি তোমায় দিয়েছি আশা করে কোনো ভুল করবে না।’
-‘তুমি কি ভাবছো আমি কোনো ভুল করছি মা?’
-‘ তোমার অন্যান্য সিদ্ধান্তের উপর সন্দেহ থাকলেও তোমার বোনের বেপারে তুমি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিবে না জানি আমি সেটা।’
জবার মুখে এক ঝিলিক হাসি ফুটে উঠলো এটা ভেবে যে তার মা তাকে বিশ্বাস করে। তার নেওয়া সিদ্ধান্তের উপড় তার মায়ের কোনো সন্দেহ নেই।
চলবে…..