লেখিকা:নাজনীন নাহার
part:04
জ্যোতি পরদিন সকালে তৈরি হয়। প্রথমে হসপিটালে যাবে তার পরে ভার্সিটিতে। হসপিটালে যেতে চেয়েছিল না জবা বার বার বলছিল ‘ আর একবার দেখে আয় নাহলে খারাপ দেখায়’ তাই বোনের কথায় যাচ্ছে নাহলে কালকে ঋভান যে ব্যবহার করেছে জ্যোতি কখনোই ওর সামনে যেত না। যদিও ঋভানের দাদি কিন্তু একদম অমন না তিনি খুব মিষ্টি ভাবে কথা বলে।
বাসা থেকে বের হয়ে জ্যোতি ড্রাইভারকে সিটি হসপিটালে যেতে বলে।
জ্যোতি মনে মনে-‘ এই মি. মির্জা কিন্তু খুব রুড আমায় কাল কি ইগনোরটাই না করলো সিরিয়াসলি আমায় ইগনোর করলো। আল্লাহ তুমি দেখ ওনার সাথে যেন দেখা না হয় আজ।’
এসব ভাবতে ভাবতে এসে পড়ে হসপিটালে। ড্রাইভার বলে-‘ জ্যোতি মা এসে গেছি হসপিটাল।’
-‘আচ্ছা কাকা আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন আমি আসছি।’
হসপিটালে প্রবেশ করে জ্যোতি দেখে ঋভান রিসিপশনে কিছু একটা করছে আর তার পাশে দাড়িয়ে আছে আর একজন পুরুষ। সামনের দিকে তাকাতেই দেখে এদিকে হেঁটে আসছে ঋভানের দাদি তার দুই হাত ধরে আছে দুই জন মহিলা, জ্যোতি তাদের কাউকেই চেনে না। জ্যোতি কথা বলার জন্য সামনে এগিয়ে গেল-‘দাদি কেমন আছে, শরীর সুস্থ লাগছে এখন?’
জ্যোতিকে দেখে আয়শা মির্জা বলল-‘এখন ভালো আছি। তুমি কাল আমায় না বলেই চলে গেছিলে কেনো? আমি তোমায় খুঁজেছি পাইনি।’
জ্যোতি কি বলবে বুঝতে পারছে না। এদিক ওদিক তারিয়ে বলল- ‘ আপনি ঘুমচ্ছিলেন তাই আর ডাকিনি আপনায়। আপনার নাতি এসেছে তারপরই আমি গেছি। ‘
একটু থেকে আবার বলল -‘ কালকে বলে যেতে পারিনি তাই আজ আবার আসলাম আপনায় দেখতে।’
আয়শা মির্জা জ্যোতির সাথে কথায় মেতে উঠেছে। তার যে শরীর পুরোপুরি ঠিক হয়নি তা যেন তার খেয়ালই নেই।
জ্যোতিকে অনেক্ক্ষণ যাবত ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দুটি চোখ। এ যেন জহুরির চোখ, জহুরি যেমন সোনা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে ঠিক তেমন। আর সেই চোখ জোড়া হলো আয়শা মির্জার বড় পুত্রবঁধু ঋনা মির্জা। তিনি যে জ্যোতির দিকে তখন থেকে তাকিয়ে আছে তা জ্যোতির নজর এড়ালো না। জ্যোতির খুব অশস্থি লাগছিল। জ্যোতি মনে মনে ভাবছে -‘ উনি আমার এমন ভাবে দেখছে কেনো, আমার ড্রেসে কিছু হলো নাকি আমার ফেসে!’
এরমধ্যে ঋভান এসে বলল- ‘ চলো দাদু এখন যেতে হবে। ‘
ঋভানের কথা শুনে তার দাদু তার দিকে এক পলক তাকালো তারপর জ্যোতির গালে হাত দিয়ে বলল -‘ শোনো মেয়ে আমাদের বাসায় এসো কিন্তু। ‘
জ্যোতি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক উওর দিলো।
গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসলো জ্যোতি আয়শা মির্জা কে। তাকে বিদায় জানিয়ে জ্যোতি এসে নিজের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে এসে বসে। ড্রাইভার তা দেখে তারাহুরো করে গাড়ির কাছে এসপ বলে- ‘ মা তুমি তো এখনও নিখুঁত ভাবে ড্রাভ করতে পারো না। তুমি পিছনের সিটে বসো আমি তোমায় নিয়ে যাচ্ছি।’
জ্যোতি কিছু না বলে হাত বারায় ড্রাইভারের দিকে। ড্রাইভারও আর কথা না বাড়িয়ে চাবি দিয়ে দেয়। সে যানে জ্যোতিকে নিষেধ করে লাভ হবে না কোনো, সে তার ইচ্ছে মতোই করবে।
জ্যোতি গাড়ি স্মার্ট দিয়ে ভার্সিটির দিকে রওনা হয়। জ্যোতি যাওয়ার পর পরই ড্রাইভার জবাকে কল করে – ‘জবা মা, জ্যোতি মা তো নিজে ড্রাইভ করে ভার্সিটিতে চলে গেল, সে তো নিখুঁত ভাবে চালাতে পারে না। ‘
-‘ শিখে নিবে কাকা। কোনো কিছুই মানুষ নিখুঁত ভাবে পারে না, ভুল না করলে শিখবে কেমন করে। আর আজকে আপনি ছুটি নিয়ে নিন।’
কল কেটে দেয় জবা, কিন্তু ড্রাইভারের চিন্তা হচ্ছে, তিনি দশ বছর ধরে জ্যোতিদের গাড়ি চালায়। জ্যোতি একবার এক্সিডেন্ট করেছিল তখন জামশেদ খান বলে দিয়েছে জ্যোতি যেন আর কখনও গাড়ি না চালায়। জামশেদ খান মারা যাওয়ার পরে জ্যোতি আর কখনো ড্রাইভ করেনি আজ দুই বছর পরে জ্যোতি ড্রাইভ করছে। -‘ আল্লাহ যেন কোনো অঘটন না ঘটে, তুমি দেখো।’
জ্যোতি হাই স্পিডে ড্রাইভ করে ভার্সিটিতে ডুকলো। গাড়ি পার্ক করে ক্লাস রুমে প্রবেশ করে । এশার পাশের সিট টায় বসে। জ্যোতি খুব মনযোগ সহকারে করে ক্লাস করছে কিন্তু এশা দুষ্টমি করছে। জ্যোতির খাতা খুলে একটা একটা করে পৃষ্ঠা দেখছে, যেন জ্যোতি হাইস্কুলের নিব্বিদের মতো খাতায় কারো নাম লিখে রাখছে। ক্লাস শেষে বের হয় জ্যোতি আর এশা। জ্যোতি পার্কিং এর দিকে যেতে যেতে বলছে – ‘চল তোকে বাসায় ড্রপ করেদি।’
জ্যোতি ড্রাইভ করবে শুনে এশা একটু ভয় পেয়ে যায়। এশা জানে যে জ্যোতি একবার খুব ভয়াবহ একটা দুর্ঘটনা শিকার হয়েছিলে তা আবার নিজের দোষেই ।
-‘ তুই ড্রাইভ করবি? তাহলে যাবো না বাবা আমার এখনও বিয়ে হয়নি এতো তারাতারি আমি উপরে যেতে চাইনা।’
জ্যোতি হেসে বলল- ‘উপরে নয় নিচে যাবি চল।’
এশার হাত ধরে একপ্রকার টেনে নিয়ে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসায় তাকে।
ভার্সিটি থেকে বেশ অনেকটা দূরে চলে এসেছে এরই মধ্যে ঘটলো অঘটন। জ্যোতি গাড়িটা লাগিয়ে দিলো ল্যাম্পপোস্টে। কিন্তু তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। গাড়ির সামনেটা একদম ভেঙে গেছে। এশা চোখ বন্ধ করে “লাইলাহা ইল্লা আংতা সুবহানাকা ইনকুন্তুুম মিনাজ্জলিমিন” বার বার জব করতেই আছে। জ্যোতি গাড়ি থেকে বাইরে বের হয়ে এশার এমন কান্ডা দেখে হেসে দেয়।
-‘ মরিসনি তুই এবার দোয়া পড়া বন্ধ কর’
এশা চোখ নিবুনিবু ভাবে খুলে দেখে সব কিছু স্বাভাবিক আছে আর তার সামনে জ্যোতি হাসি মুখে দাড়িয়ে আছে। জ্যোতিকে এমন খুশি দেখে এশা একপ্রকার অবাক হয়ে যায় এ কেমন মেেয় মাএ এক্সিডেন্ট করলো তাও এমন হাসছে যেনো কিছুই হয়নি এশা দরজা খুলে বাইরে বের হয়।
-‘আজ তো তুই আমায় উপড়ে পাঠিয়েই দিতি’
এশার কথার কোনো পাওা দেয় না জ্যোতি গাড়ির সামনের দিকে যেয়ে দেখে একদম ভেঙে চুড়ে গেছে আর কালো দোয়া উঠে যাচ্ছে।
– ‘গাড়ি তো মনে হয় না চলবে। ‘
-‘ আমি বলেছিলাম আমি যাবো না এখন কি করবো?’
-‘রিকশা নিয়ে বাসায় চলে যাবি আর কি?’
জ্যোতি কথাটা শেষ করতে পারলো কিনা তার আগেই তাদের সামনে একটা ব্লাক রোলস রয়েস থামলো। জানালার কাচ সরি একজন বলল- ‘এনি প্রবলেম?’
এশার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল সে সামনে যা দেখছে তা কি সত্যি নাকি সপ্ন। তাদের সামনে ঋভার আরশ মির্জা, এশা এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে। এশার এমন লুচু স্বভাব দেখে জ্যোতি বিরক্তি দিয়ে চোখ ঘুরালো জ্যোতির মনে পড়ে গেল আগের রাতের কথা এই লোকটা তাকে ইগনোর করছিলো তা সে ভুলেনি। ঋভানকে দেখে এশার চোখে মুখে খুশি ফুটে উঠলো কিছুক্ষণ আগে যে এক্সিডেন্ট হয়েছে তা তাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে না
– ‘ হ্যাঁ, প্রবলেম তো আছে আমাদের গাড়িটা মাএ ধাক্কা খেয়ে ভেঙে গেছে এখন আমরা বাসায় কিভাবে যাবো। ‘
ঋভান সহজ ভাবে বলল-‘ চাইলে লিফট নিতে পারো।’
জ্যোতি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল- ‘ No need’
ঋভান আর কথা না বলে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেলো। ঋভান আরশ মির্জা কি আর কোনো মেয়েকে সেদে নিয়ে যাবে নাকি নেহাৎ সে দিন জ্যোতি তার দাদুকে সাহায্য করছিলো তাই মানবতার খাতিরে লিফট দিতে চাইলো আর জ্যোতি সে সুযোগে তাকে ইগনোর করার প্রতিশোধটা নিয়ে নিলো।
এখন জ্যোতির কিছুটা শান্তি লাগছে কালকে এই লোকটা তাকে ইগনোর করছিলো অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলে। আজ সে তাকে তা ফেরত দিল।
এশার যেনো বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার ক্রাশ ঋভান তাকে মানে তাদের নিজে থেকে লিফট দিতে চাইলো আর এই জ্যোতি তাকে না বলে দিল। রাগে গাল ফুলিয়ে বসে আছে রাস্তার পাশে এরমধ্যে জ্যোতি দুইটা রিকশা নিয়ে এসে একটায় এশাকে যেতে বলল আর একটায় নিজে উঠে বসলো
– ‘ তুই রাগ করলে আমার কিছু করার নেই আমি কারো রাগ ভাঙাতে গেলে নিজেই রেগে যাই।’
রিকশাওয়ালাকে বলল -‘ মামা চলুন। ‘
চলবে…..