Story: Cry Or Better Yet Beg(01)

    (বাংলা অনুবাদ)

Author : Solche

পর্ব ১

_______

বসন্তের এক শুরুর দিনে ছোট্ট একটি মেয়ে ডাকবাহী গাড়িতে চড়ে এসে পৌঁছাল। তখন বিকেলের শেষ ভাগ, আর বিল রেমার গোলাপের চারা রোপণে ব্যস্ত ছিল।

“আপনি কি মিস্টার বিল রেমার?” মেয়েটি সতর্কভাবে জিজ্ঞেস করল। বিল কিছুটা হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার উচ্চারণ ছিল খুবই মসৃণ, কিন্তু তবুও তার কথার ভঙ্গিতে কিছু একটা অস্বাভাবিক ছিল।

“হ্যাঁ, আমি বিল রেমার।” সে উত্তর দিল।

মেয়েটি দেখল, বিল তার হাত থেকে মাটি ঝেড়ে ফেলছে এবং খড়ের টুপিটা খুলে ফেলছে। তার প্রশস্ত টুপির ছায়া সরে যেতেই যখন রোদে পোড়া মুখটি স্পষ্ট হয়ে গেলো, তখন সে একটু কেঁপে উঠল। এই প্রতিক্রিয়া বিলের কাছে নতুন কিছু ছিল না। তার রুক্ষ চেহারা এবং বড় গড়ন দেখে প্রথমবার মানুষ সাধারণত এমনই প্রতিক্রিয়া দেখায়।

“তুমি কে?” সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল। সেই ভ্রুকুটি তাকে দেখতে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলল।

“হ্যালো, আঙ্কেল বিল। আমার নাম লায়লা লিউয়েলিন। আমি লোভিটা থেকে এসেছি।” সে পরিষ্কার এবং ধীরে কথা বলল।

লোভিটা…

এবার বিল বুঝতে পারল কেন তার উচ্চারণ অদ্ভুত লাগছিল। “তুমি কি সীমান্তের বর্ডার লাইন পার হয়ে একাই বার্গ পর্যন্ত চলে এসেছ?”

“হ্যাঁ। আমি ট্রেনে এসেছি।” সে উত্তর দিল। অস্বস্তিকর হাসি দিয়ে সে নিজের ভঙ্গিমা অস্বাভাবিকভাবে সোজা করে নিল।

যে ডাকপিয়ন তাকে নিয়ে এসেছিল, সে এগিয়ে এসে বলল, “আহা, দেখছি সে ইতিমধ্যেই আপনার সঙ্গে দেখা করে ফেলেছে, মিস্টার রেমার।”

“ঠিক সময়েই এলে,” বিল বলল। “মেয়েটিকে এখানে নিয়ে এলে কেন?”

ডাকপিয়ন হাসিমুখে বলল, “স্টেশনের সামনে তাকে একা লাগেজ নিয়ে হাঁটতে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম সে কোথায় যাচ্ছে, তখন সে বলল যে সে হেরহার্ট পরিবারের মালি মিস্টার বিল রেমারের খোঁজে এসেছে। আমি যেহেতু এখানে ডাক দিতে আসছিলাম, তাই তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলাম।”

তারপর সে বিলের হাতে একটি চিঠি দিল। খামের ওপর দেখা যাচ্ছিল যে এটি বিলের দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের কাছ থেকে এসেছে, যারা প্রতিবেশী দেশ লোভিটায় বাস করে। বিল সঙ্গে সঙ্গে খামটি ছিঁড়ে চিঠি পড়তে শুরু করল। সেখানে একটি অনাথ শিশুর গল্প বলা ছিল, যাকে একের পর এক আত্মীয় আশ্রয় দিয়েছিল, কিন্তু তাদের কেউই তাকে বেশিদিন রাখেনি, কারণ তারা এতোই গরিব ছিল যে তাকে আর লালন-পালন করতে পারেনি। সেই শিশুটির নাম ছিল লায়লা লুয়েলিন। সুতরাং, মনে হলো তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটিই সেই অনাথ, যার কথা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সে হতবুদ্ধি হয়ে হেসে উঠল এবং গজগজ করে বলল,

“ধুর স্বার্থপর মানুষজন। খবরটা তো বেশ দ্রুতই ছড়িয়ে পড়েছে।”

লোভিটায় তার কোনো আত্মীয়ই তাকে আর রাখতে পারেনি। যদিও বিলের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুবই দূরের, তবুও তার অবস্থাই অন্যদের তুলনায় কিছুটা ভালো ছিল। তাই ছোট মেয়েটিকে বিলের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে তারা এটাও লিখেছিল যে যদি বিলের পক্ষে তাকে লালন পালন করা সম্ভব না হয়, তাহলে সে তাকে কোনো অনাথ আশ্রমে দিয়ে দিতে পারে।

“এই লোকগুলো মরলেই বাঁচি। যাই হোক না কেন, কীভাবে তারা এত ছোট একটা মেয়েকে একা এত দূরে পাঠাতে পারে?” সে বিড়বিড় করে বলল, চিঠিটা মুচড়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে। পুরো পরিস্থিতিটা বুঝে ওঠার পর তার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। অনাথ বাচ্চা মেয়েটিকে এক আত্মীয় থেকে আরেক আত্মীয়ের কাছে এভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেন সে একটা বোঝা, যতক্ষণ না আর কোনো আত্মীয় অবশিষ্ট ছিল যে তাকে রাখতে পারবে। তারপর তাকে শুধু একজন দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের ঠিকানা দিয়ে, যে কিনা অন্য দেশে থাকে, সেখানেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেন তাকে নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়েছে।

ঠিক তখনই মেয়েটি, যে এতক্ষণ চুপচাপ বিলকে দেখছিল, বলল,

“মাফ করবেন, আঙ্কেল বিল। আমি আসলে এত ছোট নই। কয়েক সপ্তাহ পর আমার বারো বছর হবে।” সে যতটা সম্ভব পরিণতভাবে কথা বলার চেষ্টা করছিল, এবং নিজেকে লম্বা দেখানোর জন্য একটু পায়ের গোড়ালি তুলেও দাঁড়িয়েছিল।

বিল আরও হতবুদ্ধি হয়ে আবার হেসে উঠল। সে এত ছোট ছিল যে প্রথমে বিল তার বয়স দশের মতো ভেবেছিল। অন্তত এটা জেনে সে খুশি হলো যে মেয়েটির বয়স তার ধারণার চেয়ে একটু বেশি। শেষ পর্যন্ত যে ডাকপিয়ন মেয়েটিকে নিয়ে এসেছিল, সে চলে গেল, আর বাগানে তাদের দু’জনকে একা রেখে গেল। বিল মাথায় হাত দিয়ে ঈশ্বরের কাছে পথনির্দেশনা চাইল। যদিও মেয়েটির মৃত বাবার সঙ্গে তার দূর সম্পর্ক ছিল, তবুও গত বিশ বছরে তার সঙ্গে তার দেখা হয়নি। অথচ এখন সেই দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মেয়েকে তাকে লালন-পালন করতে দেওয়া হয়েছে। এই ছোট্ট মেয়েটি, আর বিধুর বিল রেমার!

যদিও বসন্তের শুরুতে আবহাওয়া এখনো বেশ ঠান্ডা ছিল, তবুও মেয়েটির পরনে ছিল খুবই পাতলা পোশাক। তাকে বেশ শুকনো দেখাচ্ছিল। তার চেহারায় সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ছিল তার বড় সবুজ চোখ এবং সোনালি চুল, যা দেখতে যেন সোনার সূতার মতো।

বিল দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাল যে সে তাকে লালন পালন করতে পারবে না। তখন তার মনে হলো, একমাত্র অন্য উপায় হলো তাকে কোনো অনাথ আশ্রমে পাঠানো, যা ভাবতেই তার খারাপ লাগল। সে আবার চুপচাপ সেই আত্মীয়দের গালাগাল দিল যারা এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মেয়েটি একটু কেঁপে উঠল, কিন্তু তবুও সাহসী মুখভাব বজায় রাখল। তবে সে তার কাঁপা হাত লুকাতে পারল না, কিংবা তার নিচের ঠোঁট, যা কামড়াতে কামড়াতে লাল হয়ে গিয়েছিল।

“আমার সঙ্গে এসো।” মাথা নাড়িয়ে বলল বিল, হাঁটা শুরু করতে করতে। “আগে খাই, তারপর আমি বিষয়টা ভেবে দেখব।” তার সংক্ষিপ্ত কথাগুলো সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে গেল।

লায়লা, যে আসার পর থেকে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল, এবার তার পেছনে হাঁটা শুরু করল। প্রথমে তার হাঁটা ছিল ধীর এবং দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু ধীরে ধীরে তার পদক্ষেপ হালকা ও আনন্দময় হয়ে উঠল।

“এতটুকুই খাবে?” বিল ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, মেয়েটি তার প্লেটে যে অল্প পরিমাণ খাবার নিয়েছে সেটার দিকে তাকিয়ে।

“হ্যাঁ। আমি খুব অল্পই খাই, সত্যি।” সে হাসতে হাসতে উত্তর দিল।

বিল আগের চেয়ে একটু বেশি বিরক্ত হয়ে উঠল। “শোনো, বাচ্চা, আমি কিন্তু কম খাওয়া বাচ্চাদের একদম পছন্দ করি না।”

মেয়েটির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল এই কঠিন কথায়। সে তার হাতার ভাঁজ তুলে রেখেছিল, ফলে তার সরু কব্জিগুলো টেবিল ল্যাম্পের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

“তোমাকে যা দেওয়া হয়, তা ভালো করে অনেকটা খাওয়া উচিত, একটা গরুর মতো।” সে বলল। তার মুখ আরও কঠোর হয়ে উঠল।

মেয়েটি কিছুক্ষণ ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, ধীরে ধীরে চোখ পিটপিট করতে করতে কথাগুলো ভেবে দেখল। তারপর সে আরেক টুকরো মাংস আর এক টুকরো রুটি তুলে তার প্লেটে রাখল, এবং খুব তাড়াতাড়ি খেতে শুরু করল যেন আসলে সে বেশ ক্ষুধার্তই ছিল।

“হয়তো আমি ঠিক গরুর মতো খেতে পারব না, কিন্তু আমি ভালোই খাই, আঙ্কেল।” সে বলল, ঠোঁটে রুটির টুকরো লেগে থাকা অবস্থায় হেসে।

“হ্যাঁ, এখন সেটা পরিষ্কারভাবেই দেখতে পাচ্ছি।” সে হেসে উত্তর দিল, এক চুমুক বিয়ার পান করতে করতে। “তুমি কি আমাকে ভয় পাও না?” এরপর সে ইচ্ছা করে ভয়ঙ্কর একটা মুখভঙ্গি করে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

কিন্তু লায়লা একদম চোখ না সরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“না,” সে উত্তর দিল। “আপনি এখনো আমার ওপর চিৎকার করেননি। আপনি আমাকে এত ভালো খাবার দিয়েছেন। এসবের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি মনে করি আপনি একজন ভালো মনের মানুষ।”

আগে সে কেমন জীবন কাটিয়েছে, যে এত সাধারণ জিনিসেও সে কৃতজ্ঞ হয়ে যায়? এই চিন্তাটা বিল রেমারের মুখে তেতো স্বাদ এনে দিল, তাই সে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য এক গ্লাস ভর্তি করে বিয়ার ঢালল। চিঠিতে লেখা ছিল, মেয়েটির মা অন্য একজনের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল, তার মেয়ে আর স্বামীকে ছেড়ে। এতে তার বাবা এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে সে মদে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে মারা যায়। এরপর মেয়েটিকে এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আরেক আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠানো হয়। এইসব ভেবে বিল বুঝতে পারল, তার জীবন মোটেও সহজ ছিল না। তবুও, সে মনে করল, এই মেয়েটিকে বড় করে তোলার দায়িত্ব তার নেওয়া সম্ভব নয়। বিয়ার খেতে খেতে সে ঠিক করল, আগামী সপ্তাহের মধ্যে সে সিদ্ধান্ত নেবে মেয়েটির ব্যাপারে কী করবে।

“শুনেছ? মপ্রাসাদের গার্ডেনার, মিস্টার রেমার নাকি একটা ছোট মেয়ের দেখাশোনা শুরু করেছে!” এক তরুণ দাসী দৌড়ে এসে স্টাফদের বিশ্রামকক্ষে ঢুকে ঘোষণা করল। ঘরের সবাই তার দিকে তাকাল।

“একটা মেয়ে? মিস্টার রেমার? আমি বরং বিশ্বাস করব যে সে একটা সিংহ বা হাতির দেখাশোনা করছে।” এক চাকর মজা করে হেসে বলল।

হেরহার্ট্ড পরিবারের গার্ডেনার বিল রেমার ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার ফুল চাষে ছিল জন্মগত প্রতিভা। এই প্রতিভার কারণে তার খিটখিটে স্বভাব আর অসামাজিক আচরণ সত্ত্বেও তিনি বিশ বছর ধরে তার চাকরিটি ধরে রেখেছিলেন। তিনি সবার সঙ্গে একইভাবে আচরণ করতেন, হোক সে হেরহার্ট্ড পরিবারের সদস্য, বা তার সহকর্মী। তবুও পরিবারটি তাকে গভীরভাবে বিশ্বাস করত। আর তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন ফার্স্ট লেডি ডাউয়াজার হেরহার্ট্ড। ফুলের প্রতি তার ছিল অদ্ভুত ভালোবাসা, তাই বাগানের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে তার অসীম সহনশীলতা ছিল। এমনকি প্রাসাদের পেছনের জঙ্গলে বিলকে যে কটেজটি দেওয়া হয়েছিল, সেটাও ছিল তারই অংশের জায়গা।

বিল খুবই সাধারণ জীবনযাপন করত। সে বাগানে কাজ করত, আর নিজের কটেজে বিশ্রাম নিত। মাঝে মাঝে সহকর্মীদের সঙ্গে পান করা ছাড়া, তার বেশিরভাগ সময় কাটত গাছপালা আর ফুলের সঙ্গেই। তার স্ত্রী অসুস্থতায় মারা যাওয়ার পর দশ বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে, তবুও তাকে খুব কমই অন্য কোনো নারীর সঙ্গে দেখা যেত। আর এখন সেই পাথরের মতো মুখের মানুষটাই নাকি একটি ছোট মেয়েকে দেখাশোনা করছে?

যখন সবাই ঠিক করছিল যে এই গুজবটা নিশ্চয়ই মিথ্যা, তখন জানালার পাশে দাঁড়ানো এক দাসী চিৎকার করে উঠল, “আরে! মনে হচ্ছে এটা সত্যি! ওদিকে তাকাও!” সে জানালার বাইরে আঙুল দিয়ে দেখাল, চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠেছে।

সবাই দৌড়ে জানালার কাছে গেল। তারা যা দেখল, তাতে তারা ঠিক ততটাই অবাক হলো। বাগানের দূর প্রান্তে বিল তার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঝুঁকে কাজ করছে। আর তার ঠিক পেছনে হাঁটছে একটা ছোট একটা মেয়ে। ঠিক গুজবের মতোই। তার সোনালি চুল বেণি করে বাঁধা, আর হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে দোলকের মতো দুলছে।

____

“আমি এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি।” কেউ মেয়েটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেই বিল একই কথা বলত। “সে এখানে থাকতে পারবে না, তাই আমাকে অন্য কোনো সমাধান ভাবতে হবে।” এভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করতে করতে বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম চলে এল। এরই মধ্যে লায়লা লুয়েলিন ধীরে ধীরে এই নতুন ঠিকানার অংশ হয়ে উঠল, আর কর্মচারীরা অভ্যস্ত হয়ে গেল তাকে বাগান আর জঙ্গলে ব্যস্তভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখতে।

“মনে হচ্ছে সে একটু বড় হয়েছে।” শেফ মোনা জানালার বাইরে তাকিয়ে নিজেই হেসে বলল। লায়লা কটেজের পেছনের জঙ্গলে হাঁটছিল, চারপাশে জন্মানো বিভিন্ন ধরনের ভেষজ আর ফুল দেখছিল।

“তার এখনো অনেকটা বড় হওয়া বাকি।” বিল উত্তর দিল। “তার বয়স অনুযায়ী সে এখনো ছোট।”

“আরে ধুর, বিল। বাচ্চাদের বড় করা গাছ লাগানোর মতো না। তারা এক সকালে হঠাৎ পুরো বড় হয়ে যায় না।” মোনা মাথা নেড়ে বলল, তার ঝুড়িটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে।

“ওটার ভেতরে কী আছে?” বিল জিজ্ঞেস করল।

“কুকিজ আর কেক।” সে উত্তর দিল। “গতকাল প্রাসাদে একটা টি-পার্টি হয়েছিল।”

“আমি মিষ্টি জিনিস পছন্দ করি না।”

“তাতে কী? এগুলো লায়লার জন্য।” মোনা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল। এতে বিলের গাঢ় ভ্রু কুঁচকে গেল। মেয়েটির এখানে থাকা তো সাময়িক হওয়ার কথা ছিল, তবুও এমন এক সময়ে এসে গৃহের কর্মচারীরা তার দেখাশোনা করা শুরু করে দিয়েছে। তারা বিলকে জিজ্ঞেস করত মেয়েটি কেমন আছে, তার জন্য খাবার নিয়ে আসত, আর মাঝে মাঝে তাকে দেখতেও চলে আসে। এগুলো বিষয় মিস্টার বিল রেমারের কাছে অস্বস্তিকর লাগতো।

“তোমার উচিত তার জন্য কিছু নতুন কাপড় কেনা। আর একটু বড় হলে তার স্কার্ট হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছাবে না।” মোনা জিভে টোকা দিয়ে বলল, জানালা দিয়ে লায়লাকে একটা পাখির পেছনে দৌড়াতে দেখে। বিল তার কথার বিরোধিতা করতে পারল না। বাচ্চাদের সম্পর্কে সে কিছুই জানত না, তবুও এটুকু স্পষ্ট বুঝতে পারছিল যে মেয়েটির কাপড় আর ঠিকমতো মাপসই হচ্ছে না। মোনা চলে যাওয়ার ঠিক আগে আবার জানালার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হাঁ করে উঠল।

জানালার দিকে দৌড়ে গিয়ে সে চিৎকার করে বলল, “ওহ আমার! হায় ঈশ্বর! ওকে দেখো!” বিল শান্তভাবে সে যে দিকে ইশারা করছিল, সেদিকে তাকাল। লায়লা যে পাখিটাকে তাড়া করছিল, সেটা গিয়ে গাছের একটা ডালে বসেছে, আর লায়লা সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত গাছে উঠতে শুরু করেছে। একেবারে কাঠবিড়ালির মতো চটপটে আর অনায়াস ভঙ্গিতে।

“হুম, গাছে ওঠার ব্যাপারে ওর বেশ দক্ষতা আছে।” বিল নির্লিপ্তভাবে মন্তব্য করল।

মোনা তার দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকাল। “বিল! তুমি জানতেই যে সে গাছে উঠতে ভালোবাসে, আর তুমি তাকে সেটা করতে দিয়েছ? এটাই কি তোমার মতে বাচ্চা মানুষ করার উপায়?”

“দেখতেই তো পাচ্ছ, সে ভালোভাবেই শক্তপোক্ত হয়ে বড় হচ্ছে।”

“তুমি ওই মেয়েটাকে একেবারে টমবয় বানিয়ে তুলছ! হায় ঈশ্বর।” মোনা জোরে অভিযোগ করল। কিন্তু বিল জানালার দিকে তাকিয়েই রইল, তার কথা প্রায় শুনছেই না।

লায়লা একটা ডালের ওপর বসে গাছের মাথার কাছে উড়তে থাকা পাখিগুলো দেখছিল। গত কয়েক মাস ধরে হেরহার্ট এস্টেটে থাকার সময়েই এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে লায়লার চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে অগাধ কৌতূহল আছে। ফুল আর গাছগাছালি, পাখি আর পোকামাকড়, যাই তার চোখে পড়ে, সেটাই তার কৌতূহল আর বিস্ময় জাগায়। একদিন, যখন সে রাতের খাবারের জন্য ফেরেনি, বিল তাকে খুঁজতে জঙ্গলে গিয়েছিল। সেখানে সে তাকে নদীর ধারে বসে থাকতে দেখেছিল, জলচর পাখির এক ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে। সেই দৃশ্যে সে এতটাই মুগ্ধ ছিল যে বিল তার নাম বারবার ডাকলেও সে খেয়ালই করেনি।

মোনা কিছুক্ষণ আরও জোরে জোরে বিলকে বকাবকি করল, তারপর শেষ পর্যন্ত চলে গেল। বিল মাথা ঝাঁকিয়ে কানে বাজতে থাকা মোনার বকুনির প্রতিধ্বনি দূর করার চেষ্টা করল, তারপর ধীর পায়ে তার কটেজের পেছনের দিকে হাঁটল। লায়লা তাকে দেখামাত্র হাত নাড়িয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

“আঙ্কেল!”

তারপর সে যেভাবে দ্রুত গাছে উঠেছিল, ঠিক তেমন দ্রুত নেমেও এল, এবং ছুটে এসে বিলের সামনে দাঁড়াল। তার গায়ে ছিল একেবারে সাধারণ, ধূসর রঙের একটি পোশাক। শুধু স্কার্টটাই তার জন্য ছোট হয়ে যায়নি, হাতার দৈর্ঘ্যও কম হয়ে গিয়েছিল। বুঝতে পারে যে ডিউক হেরহার্টের সামনে এমন পুরোনো, অন্যের দেওয়া পোশাক পরে তাকে দাঁড় করানো ঠিক হবে না। বিল শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিল তাকে নতুন পোশাক কিনতেই হবে।

তারা যখন কটেজের পেছনের দরজায় পৌঁছাল, বিল হঠাৎ ঘুরে তাকে বলল, “ভিতরে গিয়ে প্রস্তুত হয়ে নাও। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।”

সে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, তারপর হঠাৎ ভয় মিশ্রিত অভিব্যক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ক-কিন্তু, কেন, আঙ্কেল?”

“এত ভয় পেও না। আমরা শুধু শহরে যাচ্ছি তোমার জন্য কিছু কাপড় কিনতে।” সে গলা পরিষ্কার করে ঘাড়ের পেছনটা চুলকালো, তারপর যোগ করল, “ডিউক হেরহার্ট্ড শিগগিরই আসবেন। তুমি এইভাবে তার সামনে যেতে পারবে না।”

“ডিউক? উনিই কি এই এস্টেটের মালিক?”

“ঠিক তাই। এখন গ্রীষ্মের ছুটি, তাই সে বাড়ি ফিরছে।”

“গ্রীষ্মের ছুটি? ডিউক কি স্কুলে যায়?” লায়লা মাথা কাত করে, চোখ ছোট করে জিজ্ঞেস করল।

বিল হেসে তার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিল। “ডিউকের বয়স মাত্র আঠারো। তার তো স্কুলে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।”

“কি?! তার বয়স আঠারো? আর সে একজন ডিউক?”

লায়লার এই প্রতিক্রিয়া বিলের এতটাই ভালো লাগল যে সে আগের চেয়েও জোরে হেসে উঠল। সে আবার তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। তার খসখসে আঙুলের ছোঁয়ায় মেয়েটার চুল তুলোর মতো নরম লাগছিল।

রাজধানী থেকে আসা একটি ট্রেন কার্লসবার স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে পৌঁছাল। আগে থেকেই অপেক্ষা করে থাকা কর্মচারীরা সুশৃঙ্খলভাবে ফার্স্ট ক্লাস বগির দরজার সামনে গিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক লম্বা, ছিপছিপে গড়নের এক সুদর্শন তরুণ ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মে পা রাখল।

“স্বাগতম, ইউর গ্রেস।” বাটলার হেসেন বলল। ভদ্র অভিবাদনের পর সে এবং অন্য সব কর্মচারী সম্মানের সঙ্গে মাথা নত করল। সুশ্রী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ম্যাথিয়াস হালকা মাথা নেড়ে তাদের অভিবাদনের জবাব দিল। তার লালচে ঠোঁটে ছিল হালকা, কিন্তু অমায়িক এক হাসি।

হেরহার্ট্ড পরিবারের কর্মচারীরা তখনই নড়াচড়া শুরু করল, যখন ম্যাথিয়াস কয়েক পা সামনে এগোলেন। আশেপাশে থাকা লোকজন দ্রুত সরে গিয়ে তাদের পথ করে দিল। ম্যাথিয়াস দৃঢ় ও দ্রুত পদক্ষেপে প্ল্যাটফর্মের পুরোটা হেঁটে গেলেন। স্টেশন থেকে বের হয়ে সামনে তার জন্য অপেক্ষা করা গাড়িটা দেখে সে হালকা হাসলেন এবং বললেন, “একটা ঘোড়ার গাড়ি।”

“আ… জি, ইউর গ্রেস। লেডি ডাউয়াজার হেরহার্ট্ড গাড়ির ওপর ভরসা করেন না।”

“আমি জানি। উনার কাছে গাড়ি মানে অশোভন আর বিপজ্জনক লোহার টুকরো ছাড়া কিছু না।”

“আমি দুঃখিত। পরের বার আমি—”

“না। মাঝে মাঝে এভাবে পুরোনো পদ্ধতিতে চলতে আমার আপত্তি নেই।” বলে ম্যাথিয়াস শান্তভাবে গাড়িতে উঠে বসলেন। তার লম্বা হাত-পা, যেগুলো এই বয়সেও একটু লম্বাটে ও পাতলা, ধীর এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নড়ছিল। সে গাড়িতে উঠতেই গাড়িটি চলতে শুরু করল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘোড়াগুলো দৌড়াতে শুরু করল। শহরের চত্বর আর ব্যস্ত বাজার এলাকা পার হয়ে গেলে গাড়ির ভেতরটা তুলনামূলকভাবে শান্ত হয়ে গেল। ম্যাথিয়াসের লাগেজ বহনকারী আরেকটি গাড়ি কিছুটা দূরত্ব রেখে পেছন থেকে অনুসরণ করছিল, যার সোনালি প্রতীক রোদে ঝলমল করছিল।

চলবে……?

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x