গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (৩৫)

পর্বঃ৩৫

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]

 

 

— আহান?

দুজন কপোত কপোত-কপোতী নিজেদের ভালবাসার রঙিন দুনিয়ায় নির্বিঘ্নে বিভোর ছিল। ওদের প্রেমময় মুহুর্তে বিঘ্ন ঘটিয়ে হঠাৎ যেন ডাকাত হানা দেয়।
দু’জন আঁতকে উঠে ছিটকে দু’দিকে সরে গেল।
দীপ্ত অস্বস্তি নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। এভাবে বিঘ্ন ঘটানোর কোন ইচ্ছে ছিলনা। কিন্তু হুট করে অন্য কোন প্রতিক্রিয়া মাথায় আসেনি। ঐশী পারেনা মাটির সাথে মিশে যেতে। দীপ্ত অপ্রস্তুত হেসে বললো,

— দুপুরের খাবার জন্য ডাকতে এসেছিলাম।

আহান ঘাড় চুলকে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,

— হ্যাঁ আসছি৷

তারপর পাশে তাকিয়ে দেখে ঐশী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আহান ক্ষীণ স্বরে বললো,

— সি ইজ মাই ফিয়ন্সে।

দীপ্ত মৃদু হেসে বললো,

— আই নো। বোথ অফ ইউ কাম প্লিজ। অপেক্ষা করছি।

এই বলে দীপ্ত ত্রস্ত পায়ে সামনে এগিয়ে গেল। বলতে গেলে একপ্রকার পালিয়ে গেল। ঐশী লাজে মরি মরি গলায় আহাজারি করে বললো,

— ইশ উনি কি ভাবলেন আমাদের নিয়ে?

আহান ভাবলেশহীন গলায় বললো

— এখানে কিছু ভাবার কি আছে? ইটস নরমাল। ইউ আর মাই ফিয়ন্সে, মাই প্রপার্টি।

ঐশী গালদুটো কাঁপে লজ্জার তোড়ে। চারদিকে এলোমেলো চোখের পাতা ফেলে বললো,

— আমি আপনার প্রপার্টি কবে হলাম?

— যবে থেকে এই হৃদয় জোরপূর্বক নিজের দখলদারিত্বে নিলে।

ঐশী মুচকি হাসলো। বললো,

— হয়েছে হয়েছে। এখন চলুন৷ আপনার মুখে এসব ফিল্মি ডায়ালগ মানায় না৷

— তুমি এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?

— কি এড়িয়ে গেলাম।

আহান অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে বললো,

— দেখ ঐশী আমি যা বলার ক্লিয়ারলি বলছি। বিয়ের জন্য এক বছর অপেক্ষা করা ঠিক হবেনা। অন্তত আমার জন্য।

ঐশী বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো,

— কেন? এখানে ঠিক না হওয়ার কি আছে?

— বিকজ ইটস এবসুলেটলি ইম্পসিবল ফর মি টু ওয়েট ফর আ ইয়ার।

ঐশী বেকুব বনে গেল। আহানের কথার আগামাথা কি ওটাই এখনো বুঝে উঠতে পারছেনা৷ এক বছর ওয়েট করতে পারবেনা? কিন্তু কেন? ও ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

— সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি আপনি এক বছর কেন ওয়েট করতে পারবেন না? মেজর কোন সমস্যা?

— সমস্যা হচ্ছে আমি পুরুষ৷ আর পুরুষ মানুষ বৌ ছাড়া থাকতে পারেনা।

আহান জড়তা হীন গলায় স্পষ্ট করে বললো।
ঐশী বিস্ময়ে থ বনে গেল। মুখটা হা হয়ে গেল আপন শক্তিতে। মুখে যেন কেউ দুটো পেরেক মেরে দিয়েছে ওমন ভাবেই দুই ঠোঁট একে অপরের সাথে চেপে কেবল বিড়বিড়িয়ে এটুকু বললো,

— আপনি পাগল হয়ে গিয়েছেন৷

এই বলে রুদ্ধশ্বাসে এক প্রকার ছুটে পালাল আহানের সামনে থেকে। এই ডাক্তার পাগল হয়ে গিয়েছে। এর চিকিৎসা দরকার। কিন্তু স্বয়ং ডাক্তারের চিকিৎসাই বা করবে কোন ডাক্তার?

— পাপা?

— বলো আম্মাজান।

ওয়াফা চারদিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করে বললো,

— কানে কানে শোন।

ঐক্য ভ্রুকুটি করে মেয়ের দিকে চেয়ে হেসে দিল৷ তারপর মাথাটা নিচু করে ওয়াফার মুখের কাছে কানটা পাতলো৷ ওয়াফা চারদিকে সাবধানী নজর ফেলে ঐক্যর কানের কাছে একদম ফিসফিস করে বললো,

— তুমি বলেছিলে না সুইটি আন্টিকে আমার মাম্মাম বানিয়ে দেবে? কবে দেবে?

মেয়ের নিষ্পাপ আর্জিতে ঐক্য অপ্রস্তুত হলো ভীষণ। সামনে তাকিয়ে দেখল আবৃতি বাচ্চাদের সাথে ডুবে আছে। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে ঐক্য মেয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। ওয়াফার সরল আঁখি দুটোতে আশার হিড়িক। ঐক্য সেই নিষ্পাপ চোখ দুটিতে চেয়ে ক্ষীণ গলায় বললো,

— দেব মা। পাপাকে একটু সময় দাও।

— কখন? কালকে দেবে?

ঐক্য কি উত্তর দেবে বুঝতে পারলনা। মেয়েকে তো কথা দিয়েছে তার সুইটি আন্টিকে খুব সুন তার মাম্মাম বানিয়ে নিয়ে আসবে। ঐক্য চোখ ঘুরিয়ে আরেকবার চাইল আবৃতি নামক রমনীটির পানে। যে অদূরে ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে বাচ্চাদের সাথে। ব্যস্ত কাজ বলতে বাচ্চাদের সাথে আজ নিজেও বাচ্চা বনে গিয়েছে। ঐক্য সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে মেয়ের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে শুধাল,

— তোমার সুইটি আন্টিকেই লাগবে?

ওয়াফা চকচক দৃষ্টিতে দ্রুত গতিতে উপরনিচ মাথা নাড়াল। বিগলিত হেসে বললো,

— হ্যাঁ পাপা সুইটি আন্টিকেই লাগবে।

ঐক্য মেয়ের খুশিতে মাখামাখি পবিত্র মুখখানার দিকে চেয়ে বললো,

— এনে দেব। জলদি সুইটি আন্টি তোমার মাম্মাম হয়ে আসবে।

ওয়াফা খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলল,

— সত্যি?

ঐক্য আলতো হেসে মেয়ের গালে হাত রেখে বললো,

— সত্যি।

ওয়াফা আনন্দে আটখানা হয়ে ঐক্যকে জড়িয়ে ধরলো। ঐক্য আলতো হেসে পাল্টা মেয়েলে আগলে নিল। ওয়াফা ওর বুক থেকে মাথা তুলে টকাস টকাস করে ঐক্যের কপাল থেকে পুরো মুখে কয়েকটা চুমু দিল।

— থাংকস থাংকস পাপা।

ঐক্য নিজেও মেয়ের কপালে স্নেহের পরশ বুলিয়ে বললো,

— ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম আম্মাজান। যাও খেল।

ওয়াফা ছুটে ফের বাচ্চাদের জটলায় যোগ দিল। ওকে ছুটে আসতে দেখে আবৃতি বলটা রেখে জিজ্ঞেস করলো,

— কি কথা হচ্ছিল পাপা সাথে?

ওয়াফা হা করে মুখ খুলতে নেবে এর আগেই ঐক্য আঁতকে বড় বড় পা ফেলে পেছন থেকে এসে ওয়াফার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। একটা ভ্যাবলা মার্কা হাসি দিয়ে বললো,

— আবৃতি ক্রিকেট খেলবেন?

হঠাৎ এমন অদ্ভুত কথায় আবৃতি বিষম খেল একপ্রকার। গোলগোল চোখে ঐক্যের দিকে চেয়ে
অতি দ্রুত নিজেকে সামলে অবাক গলায় বললো,

— ক্রিকেট?

ঐক্য ঘাড় চুলকে বোকা বোকা হেসে বললো,

— হ্যাঁ চলুন না বাচ্চাদের সাথে এক ম্যাচ খেলা যাক।

আবৃতি ইতস্তত ভাবে বললো,

— কিন্তু ইয়ে মানে…

ঐশী সবেই খাওয়া শেষ করে এসেছিল। ঐক্যের কথাটা কানে যেতেই ও তড়াক লাফিয়ে উঠে বললো,

— ভাইয়া তুমি ক্রিকেট খেলবে? ওও ওয়াও। কি দারুণ আইডিয়া।

আরশান শুনে বেশ উচ্ছ্বসিত হলো। কারণ ক্রিকেট ওর ভীষণ পছন্দের একটা খেলা।

— ক্রিকেট? আমিও খেলব। মাম্মাম আমিও খেলব।

— কিন্তু আমি কি ক….

ঐশী কথা কেড়ে নিল। অনুরোধ করে বললো,

— আপু প্লিজ মানা করোনা। চলো সবাই মিলে খেলা যাক। দারুণ একটা সময় কাটবে। বাচ্চারা তোমরা খেলবে তো?

বাচ্চাগুলো ক্রিকেট খেলার কথা শুনে চাপা উল্লাসে ফেটে পড়ল। ঐশীর কথাটায় তড়িৎ সবাই সায় জানিয়ে একযোগে চেঁচিয়ে বললো,

— হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা খেলব।

আবৃতি পড়ল মহা বিপাকে। এই বয়সে এখন ও খেলবে কিনা ক্রিকেট? গাঁইগুই করে কিছু বলতে নেবে এর আগেই আহান হাসতে হাসতে ফোঁড়ন কেটে বললো,

— ঐক্য ভাইয়া আপনি এই ভীতুর ডিমটাকে ক্রিকেটের অফার করছেন? চেহারা দেখেছেন যেন এখনই কেঁদে দেবে।

আহানের টিটকিরি শুনে আবৃতির নাকের ডগা কেঁপে উঠে। সময়, পরিস্থিতি ভুলে তেড়ে যায় আহানের দিকে। রোষানলে ফেটে পড়ে বলে,

— আমি খেলব৷ অবশ্যই খেলব৷ ঐক্য সাহেব চলুন । দেখা যাক কার কত দম।

আরশান, ওয়াফা খুশিতে হাতাতালি দিল। এতদিন নিজেরা খেলেছে। এখন তাদের মাম্মাম, পাপাও খেলবে। এটা সম্পূর্ণ নতুন একটি অভিজ্ঞতা তাদের নিকট। ঐশী উৎসুক গলায় বলে উঠে,

— তাহলে দুটো টিম করে নেওয়া যাক। এক টিম হবে ছেলেদের নিয়ে আরেক টিম হবে মেয়েদের নিয়ে। তোমরা কি বলো?

আহান টিটকিরি করে বললো,

— তোমরা আলাদা টিম করে কি করবে? পারবে আমাদের সাথে?

আবৃতি ব্যগ্র হাতে নিজের ওরনাটা কোমরে বেঁধে নিল। আহানকে আঙুল তুলে শাসিয়ে বললো,

— ডোন্ট জাজ আ বুক বায় ইটস কভার। তোরা ছেলে বলে ভাবিস না কেবল তোরাই খেলাধুলাতে পটু। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন লিস্টে কিন্তু মেয়েদেরও নাম আছে।

ঐশী আহানের দিকে তাকিয়ে বাজখাঁই গলায় বললো,

— আগে তো খেলা শুরু করুন, তারপর নাহয় বিচার করবেন।

আহান ঐশীর দিকে চেয়ে মিটিমিটি হেসে বললো,

— ওকে দ্যান লেটস সি।

.

আশ্রমের সবগুলো বাচ্চা দুই দলে বিভক্ত হয়ে যথাক্রমে মেয়ে বাচ্চারা আবৃতিদের দলে আর ছেলে বাচ্চারা ঐক্যদের দলে যোগ দিল। আরশান, ওয়াফা দুজন চোখ গরম করে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। তারা এখন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ওয়াফা আবৃতির ওরনার কাঁছা ধরে ঘুরঘুর করছে। আর আরশান ব্যাট নিয়ে ঐক্যের পিছু পিছু হাঁটছে। ভাব এমন আবৃতি, ঐক্য ওদের গুরু আর ওরা তাদের বাধ্যগত শিষ্য। ঐক্য শরীর থেকে পাঞ্জাবিটা খুলে রাখলো। ভেতরে একটা সাদা পোলো টিশার্ট দৃশ্যমান। সবাই বলে শ্যামলা গায়ের বরণে সাদা বেমানান। কিন্তু আবৃতি ঐক্যকে দেখে আজ আরেকবার আবিষ্কার করলো উজ্জ্বল শ্যামলা বরণ মানুষকেও সাদা মানায়, ভীষণভাবে মানায়। হঠাৎ ঐক্যের দৃষ্টি আবৃতির নিষ্পলক দৃষ্টিতে মিলে গেল। আবৃতি অপ্রস্তুত হয়ে সবেগে চোখ সরিয়ে নিল।
এক ভালোলাগার আবেশ খেলে গেল ঐক্যের হৃদয়ে। মুচকি হেসে এগিয়ে আসলো সংলগ্ন মাঠটিতে। ঐশী আবৃতির কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিসফিস করে বললো,

— আপু, ভাইয়া দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলে। স্টুডেন্ট লাইফের চ্যাম্পিয়নের ট্রফি দিয়ে রিডিং রুমের সেলফ ভরতি এখনো। কোনভাবেই আমরা জিততে পারবনা।

আবৃতি মুখ লটকে বললো,

— আর তোমার হবু স্বামী? সেও কম কিসে? লেখাপড়াতে যেমন প্রতিভাধর, স্পোটসেও তেমন পারদর্শী। আমরা হারব নিশ্চিত।

ঐশী ঠোঁট চেপে মুচকি হাসলো। এক পশলা ভালোলাগা আর গর্বের মৃদু হাওয়া হৃদয়ে বয়ে গেল।
আহানকে নিয়ে কেউ কোন প্রশংসা করলে ইদানীং অটোমেটিক ওর মুখে হাসি ফুটে উঠে। পুরো মেডিকেল কলেজ থেকে হসপিটালে সরব এখন আহান ঐশীর বাগদানের খবরটায়। ওইদিন খবরটা শুনে সবাই একপ্রকার আকাশ থেকে পড়েছিল। ফ্রেন্ডস ব্যাচের কেউ কেউ খবরটায় ঐশীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে আবার কেউ আড়ালে ফুঁসেছে। আহান স্যার পুরো ক্লাসের ক্রাশ বলে কথা। একটু হিংসে তো হবেই। ঐশী নিজের অভিব্যক্তি লুকিয়ে মৃদুস্বরে বললো,

— সমস্যা নেই আপু। আমরা আমাদের বেস্টটা দেব।

আবৃতি বিপরীতে মুচকি হাসল। কে হারল, কে জিতল তাতে কি এসে যায়। আজ বহুদিন বাদে ওর নিজেকে হালকা হালকা লাগছে,খোলা আকাশের মুক্ত পাখি মনে হচ্ছে এই বাচ্চাগুলোর সান্নিধ্যে এসে। এই সময়টা কেবল ও উপভোগ করতে চায়। পুরো আশ্রমের ম্যানেজমেন্ট,বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা খালারাও সবাই মাঠের চারদিকে চেয়ার নিয়ে গোল করে বসেছে খেলা দেখবে বলে। আশ্রমে প্রতিদিন বাচ্চারা নানারকম খেলাধূলায় মেতে থাকলেও আজ আশ্রমের মালিক স্বয়ং নিজে মাঠে নেমেছে। দুইদল দুপাশে দাঁড়িয়ে টস করা হলো। টসে প্রথমে মেয়েরা জিতল। মেয়ে বাচ্চারা সবাই লাফিয়ে উঠে সমন্বয়ে চিৎকার করে উঠল। ঐক্যএই ফাঁকে আশ্রমের ম্যানেজারকে দিয়ে একটা ট্রফিও আনিয়েছে বিজয়ীদলের জন্য। সাথে নানা রকম গিফট সামগ্রী। মেয়েদের দলে ফার্স্ট ব্যাটিং করবে আবৃতি। আর বোলিং করবে ঐক্য। আবৃতি ব্যাটটা রেখে গলা থেকে ওরনাটা খুলে গলা বেয়ে কোমরে বাঁধল, তারপর খোলা চুলগুলোকে চূড়ো করে খোঁপায় বেঁধে নিল। অতি সামান্য দেখতে কাজটা কিন্তু আবৃতির সম্মুখে বল হাতে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকা ঐক্য মনে হলো দুটো হার্টবিট মিস করলো। অভিভূত নেত্রে হা করে গিলে নিল আবৃতির সাধারণ কাজ গুলো। যবে থেকে মেয়েটাকে নিভৃতে অন্য নজরে দেখা শুরু করেছে, তবে থেকে ঐক্যের হৃদয় ফের আন্দোলিত হয় অনুভূতিতে! মেয়েটার সাধারণ কাজগুলোতেও ঐক্য দূর্বলতা অনুভব করে। কিন্তু আবৃতির সেদিকে নজর নেই। ও ভীষণ ঘাবড়ে আছে খেলাটা নিয়ে। ক্রিকেটে ও যে খারাপ তেমন না। কিন্তু ক্রিকেটে অলওয়েজ চ্যাম্পিয়ন লিস্টের শীর্ষে অবস্থান করা ঐক্য চৌধুরীর বিপক্ষে খেলতেই ওর যত ভয়। তার উপর বাচ্চাগুলো ভীষণ উৎসাহ নিয়ে আছে। বিশেষ করে ওয়াফা। বাচ্চা মেয়েটা খেলাটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে নিয়েছে। ওর বাচ্চামন ট্রফিটাকে ওয়াল্ড কাপ ধরে নিয়েছে ইতোমধ্যে। যেভাবেই হোক ও ট্রফিটাকে জিততে চায়। সেই নিয়ে আগ্রহের অন্ত নেই। আবৃতির মন সায় দিচ্ছেনা বাচ্চাটার মনটা ভেঙ্গে দিতে৷ খেলাটা বাচ্চাগুলোর কাছে বিশেষ কিছু৷ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে আবৃতি বুকে সাহস সঞ্চার করে ব্যাট হাতে নিল। ঐক্য মৃদু হেসে বলটা শূণ্যে ছুঁড়ে আবার হাতে ক্যাচ করে নিল। আবৃতির ঘামে ভেজা লালচে মুখটা ও খুব উপভোগ করছে। মেয়েটা খুব ঘাবড়ে আছে মনে হচ্ছে। হুইসেল বাজতেই ঐক্য পজিশন নিয়ে বোলিং করল। আবৃতি প্রথমেই ছক্কা হাঁকাল। তারপর খেলাটা দীর্ঘ দু’ঘন্টা স্থায়ী হলো।

.

দীর্ঘ দুই ঘন্টার খেলা শেষে দুই দলের রান সংখ্যা গণনা করতে বসা হলো৷ আবৃতি দাঁত দিয়ে নখ খুঁটছে। ওরা যে কোনভাবেই জিতবে না এটা সিওর। ওয়াফা বড় বড় নেত্রে উঁকিঝুকি মারছে। ঐক্য পাশে রান গণনা করা লোকটাকে চাপা গলা কিছু বললো। লোকটা একটু পরে দারাজ গলায় ঘোষণা দিল,

— আজকের ক্রিকেট ম্যাচটিতে বিজয়ী হয়েছেন টিম A।

ওয়াফা সহ মেয়ে বাচ্চাগুলো আনন্দে চিৎকার করে উঠে। আবৃতি ঐশী অবাক চোখে একে অপরের দিকে তাকায়। ঐশী তাকিয়ে দেখে দিয়ে আহান মিটিমিটি হাসছে। আবৃতি বুঝলো এসব ঐক্যের কারসাজি। ইচ্ছে করেই আবৃতিদের জিতিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবৃতি প্রশ্ন নিয়ে ঐক্যের দিকে তাকায়। পাশে থাকা আরশান একটু মন খারাপ করলো। যদিও বাচ্চাটা ক্রিকেটের তেমন কিছু বোঝেনা এখনো। ট্রফিটা নিয়মমাফিক বিজয়ী দলের হাতে তুলে দেওয়া হবে। আবৃতিদের ডাকা হলো ট্রফিটা হাতে তুলে নিতে। আবৃতি নিজ টিমের বাচ্চাগুলোকে নিয়ে সামনে এগিয়ে আসলো। ওয়াফার খুশি দেখে কে? জীবনে এই প্রথম এত বড় ট্রফি জিতেছে বলে কথা! ঐক্য স্মিত হেসে বললো,

— অভিনন্দন।

আবৃতি ঐক্যকে চাপা স্বরে শুধায়,

— হু? ইচ্ছে করে জিতিয়ে দিয়ে আবার অভিনন্দন?

ট্রফিটা আবৃতির হাতে দিতে চাইলে আবৃতি মানা করে বললো,

— আমাকে না। বাচ্চাদের হাতে দিন৷ বাচ্চরা আসো।

ওয়াফাসহ বাচ্চাগুলো ছুটে আসলো ট্রফিটা হাতে নিতে। আবৃতি পাশে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকা আরশান আর ওর টিমের বাচ্চাগুলোকে উদ্দেশ্য করে বললো,

— তোমরা দাঁড়িয়ে আছ কেন? আসো তোমরাও আসো। ট্রফিটা তো সবাই মিলেই জিতেছ।

বাচ্চাগুলো অবুঝ দৃষ্টিতে তাকাল। আরশান অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

— মাম্মাম আমরাও জিতেছি?

— হ্যাঁ তো বাবা। তোমরা সব বাচ্চারা জিতেছ৷ এসো ট্রফিটা হাতে নাও। মামু ছবি তুলবে।

এতক্ষণ পর আরশানের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠতে দেখা গেল। বাচ্চাগুলো সবাই খুশি মনে ট্রফিটা নিল। ঐক্য আরেকবার খুব বাজেভাবে দূর্বল হলো সম্মুখের অতি সুশ্রী দেখতল আবৃতি নামক মেয়েটিতে। না না মেয়েটার রূপে নয়, ব্যক্তিত্বে!

আবৃতি নিজ হাতে বাচ্চাগুলোকে ঐক্যের আনা গিফট গুলো হাতে তুলে দিল। আজ বহুদিন বাদে আশ্রমে এমন সুন্দর একটা সময় কাটলো। ঐক্য ভেতর থেকে কেমন শান্তি শান্তি অনুভব করলো। প্রতি শুক্রবার ও আশ্রমে আসে, বাচ্চাদের সাথে সময় কাটায়, বাচ্চাগুলোর জনয় নানা রকম উপহার সামগ্রী নিয়ে আসে। কিন্তু আজকে কেন জানি অন্য রকম ভালো লাগায় মনটা ভরে গিয়েছে। আশ্রমের বাচ্চাগুলোরও আজ অন্যরকম উচ্ছ্বাসে মেতে আছে। এর কারণটা কি তবে আবৃতি?
ঐক্যের প্রখর অনুভূতি গুলো তারস্বরে চেঁচিয়ে জানান দিল,

— ইয়েস আজ এখানে আবৃতি উপস্থিত আছে। সময়টা স্পেইশাল না হয়ে পারে?

সবকিছু শেষ হতে হতে পশ্চিম অম্বরের সূর্যটা তার সারাদিনের দায়িত্বের অব্যাহতি দিয়ে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে চলেছে। আবৃতি আরশানকে হাতমুখ ধুইয়ে আহানের সাথে পাঠিয়ে দিল। আহান ঐশীকে চোখ দিয়ে শাসিয়ে দিয়ে বাইকে চেপে বসলো। ঐশী পাত্তা দিলনা। আবৃতি নিজেও হাতমুখ ধুয়ে বাচ্চাগুলোর থেকে বিদায় নিল। আশ্রমের সামনে ঐক্য নিজের কারের কাছে ওয়াফাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আবৃতি আশ্রম থেকে বের হয়ে ওয়াফাকে কোলে আদর করে বললো,

— আজ আসি মা।

ওয়াফার মুখটা আঁধার হয়ে গেল। ঐক্য খেয়াল করলো। আবৃতি একটা চুমু দিয়ে ওকে কোল থেকে নামিয়ে ঐক্যের উদ্দেশ্য ক্ষীণ হেসে বললো,

— আসি। ওয়াফাকে নিয়ে সাবধানে যাবেন৷

এই বলে আবৃতি আহানের বাইকের উদ্দেশ্য হাঁটা শুরু করলো। ঐক্য কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে কি যেন ভাবল৷ হঠাৎ পেছন থেকে মৃদুস্বরে ডেকে উঠল,

— আবৃতি?

আবৃতি ফিরে চাইল।

— জি?

— যাওয়ার আগে আমার জবাবটা দিয়ে যান।

আবৃতি এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল। ঐক্যের ওই অস্থির চোখ জোড়ায় নির্নিমেষ চেয়ে ক্ষীণ কন্ঠে শুধাল,

— আমার বিশ্বাসটা আমানত হিসেবে রাখতে পারবেন?

কথাটা প্রবল ধাক্কার মতো এসে লাগল ঐক্যের হৃদয়ের দরজায়। অবাক দৃষ্টি মেলে দেখল আবৃতির জড়তা বিহীন সুশ্রী পেলব আনন। ক্ষণকাল ব্যয়ে নিজেকে দারুণ ভাবে সামলে নিল ঐক্য। বুক ভরে শ্বাস টেনে আবৃতির কাজল পরা হরিণী দুটি চোখের ওপর নিজের স্থির দৃষ্টি রেখে দ্বিধাহীন অবিচল গলায় বললো,

— পারব।

— তাহলে কাল বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে আসুন।

এই বলে আবৃতি সামনে ফিরে নিরবে প্রস্থান নিল।

চলমান……

 

 

[আসসালামু আলাইকুম পাঠক গল্পটা সবার ফিডে পৌঁছায় তো? রিচ কমে যাওয়াতে হয়তো সবার ফিডে নাও যেতে পারে। সবাই কয়েকটা কমেন্ট করে রাখবেন এই পোস্টে তাহলেই আবার ফিডে পাবেন গল্প আসলে। ]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x