গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (৩৪)

পর্বঃ৩৪

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

 

[কার্টেসি ব্যতিত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।⛔]

 

 

সময় এক অদ্ভুত চক্র। সময়ের চাকা ঘুরে চলে গিয়েছে তার আপন নিয়মে। সময়ের সাথে নাকি মানুষের সব ক্ষত,কষ্ট, শোক সেরে যায়। আসলেই কি তাই? না বিষয়টা আসলে তা নয়। সময় কখনো পৃথিবীর কারো দুঃখ,কষ্টের উপশম হতে পারেনা। সময় কেবল একটা কাজই করতে পারে আর সেটা হলো সময় দুঃখকে অভ্যস্ততায় পরিণত করে। ধ্রুবর মৃত্যুর আজ নিয়ে ছয়দিন পেরিয়ে গিয়েছে। তা নিয়ে এই পৃথীবির বিশেষ কিছু যায় আসেনি। পৃথিবী তার আপন নিয়ম অনুসরণ করেই চলছে৷ রোজ প্রভাতে নিয়ম করে এই পৃথিবী আলোকিত হয় আবার নিয়ম করে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।

— মাম্মাম আমরা কোথায় যাচ্ছি?

মেঝেতে বসে আরশানকে জুতো পরাতে থাকা আবৃতি এক পলক চোখ তুলে তাকাল। আরশান চোখে এক রাশ কৌতুহল নিয়ে চেয়ে আছে তার মায়ের মুখে। আবৃতি কিছুক্ষণ ছেলের শুকনো মুখটা চেয়ে চেয়ে দেখে। তারপর নিরেট স্বরে বললো,

— একটা কাজে৷

আরশান ফের কৌতুহলী গলায় জিজ্ঞেস করলো,

— কি কাজ?

— গেলেই দেখতে পারবে বাবা।

— তোদের হয়েছে?

আহান রুমে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করে। আবৃতি নিজের হ্যান্ডপার্সটা নিয়ে বললো,

— হ্যাঁ হয়ে গিয়েছে চল।

.

আহানের বাইকটা একটা এতিম খানার সামনে থামে। আবৃতি তাকিয়ে দেখে অনাথ আশ্রমটার সামনের গেইটে বড় বড় করে লেখা,

“চৌধুরী ফাউন্ডেশন এন্ড অরফানেজ”

আবৃতি বাইক থেকে নেমে মাথায় ওরনা টানে। কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

— আহান এই এতিম খানাটা?

— এটা ঐক্য ভাইয়াদের। ঐশীর বাবা ওয়াসিম চৌধুরী জীবদ্দশায় করে গিয়েছিলেন। শুনেছি বিভিন্ন জেলায় ওনাদের আরো বেশ কয়েকটা ট্রাস্ট আছে। এগুলো এখন ঐক্য ভাইয়া পরিচালনা করেন।

আবৃতি স্মিত হাসলো। এমন সামাজিক ওয়েল ফেয়ার সংস্থাগুলো আবৃতির কাছে খুব সম্মানের। এই সংস্থাগুলো না থাকলে হয়তো এই অনাথ বাচ্চাগুলোকে রাস্তাঘাটে ভিক্ষা করে বেড়াতে হতো। মনে মনে ওয়াসিম চৌধুরী মানুষটার প্রতি সম্মানে আবৃতির হৃদয় বিগলিত হয়। বলে,

— এমন মহত্ত্বের কর্ম কয়জনে করে যেতে পারেন?

— হুম। এই সংস্থাগুলোর পেছনে ঐক্য ভাইয়া প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা ইনভেস্ট করেন।

আবৃতি ক্ষীণ হেসে বলে,

— এই জন্য হয়তো ঐক্য চৌধুরী মানুষটা এত অমায়িক আর বন্ধুত্বপূর্ণ৷ কথায় বলে ‘যেমন বাপ তেমন ছেলে’। একজন আদর্শ পিতার আদর্শ সন্তান উনি৷ সন্তানরা যে পিতার ছায়া অনুসরণ করে।

বলতে বলতে আবৃতি হারিয়ে গেল আনমনে। আহান কিছু বলতে নিয়েও থেমে গেল।

— মামু ভেতরে চলোনা৷

আহান বললো,

— হ্যাঁ আবৃতি ভেতরে যা।

— আচ্ছা তোকে যা বললাম নিয়ে আয় যা।

আরশানের হাত ধরে ভেতরে ঢুকে ওরা দেখে দীপ্ত হাত দিয়ে খাবার দায়িত্বে থাকা লোকদের এটা সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছে। আবৃতির বুক ছিঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়। আজ এই এতিম খানায় ধ্রুবর নামে মিলাদ পড়ানো হবে। দীপ্ত সকালে কল করে অনুরোধ করছিল যেন আবৃতি আরশানকে নিয়ে একটু আসে এখানে। আবৃতি ফেলতে পারেনি ধ্রুবর অনুরোধ। তাই সাথে করে নিয়ে এসেছে। চাইলে ও আহানের সাথেই পাঠিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু আবৃতি চায়না কেউ ধ্রুবর মৃত্যু নিয়ে আরশানের সামনে কিছু বলুক। ধ্রুবকে ওইদিন দেখে আরশান সারাটা সময় কেঁদেছে। কাঁদতে কাঁদতে একপর্যায়ে বাচ্চাটার নাভিশ্বাস উঠে যায়। আবৃতির পাগল পাগল লাগছিল আরশানের কান্না দেখে। কিছুতেই পারছিল না বাচ্চাটার কান্না থামাতে। আবৃতি নিরুপায় হয়ে কেবল ছলছল চোখে ছেলের কান্না দেখে গেল।
পরে ঐক্য বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে যায়। আবৃতি পিছু পিছু নিচে এসে দেখে আশ্চর্যজনক ভাবে আরশানের কান্না থেমে গিয়েছে। ঐক্য কি বলেছে সেদিন আরশানকে আবৃতি জানেনা। কিন্তু এর পর আজ পর্যন্ত আরশানকে আর কাঁদতে দেখা যায়নি। ওদেরকে দেখে দীপ্ত ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে আসে। দীপ্তকে দেখে আরশান ওর আধো স্বরে সালাম দেয়,

— আসসালামু আলাইকুম চাচ্চু৷

সালাম দেওয়ার অভ্যাসটা আরশানের বুঝ হওয়ার পর থেকেই আবৃতি গড়ে তুলেছে। তাই পরিচিত কারো সাথে দেখা হলেই আরশান সালাম দিতে ভুল করেনা৷ দীপ্ত আলতো হেসে ওকে কোলে তুলে নিল। আরশানকে কোলে নিতেই মনে হলো যেন ধ্রুব ওর সঙ্গে আছে। বাচ্চাটার মুখের আদল যে হুবহু তার ভাইয়ের ন্যায়৷ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দীপ্ত আরশানের গালে চুমু খেয়ে বলে,

— ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছে আমাদের আরশান বাবা?

— ভালো আছি চাচ্চু। তুমি ভাল আছ?

দীপ্ত মলিন হাসলো। আর ভালো! বাসার অবস্থা খুবই করুণ। কাউকেই সামলে রাখা যাচ্ছেনা। ধ্রুবর মা এখনো ছেলে শোক সামলে উঠতে পারেন নি। এখনো ছেলে ছেলে করে বুক চাপড়ে চাপড়ে কাঁদেন৷ দীপ্তর ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করেনা। ঘরে ফিরলেই হয়তো মাকে আহাজারি করতে দেখবে নয়তো তার ভাইয়ের রেখে যাওয়া মাত্র কয়েকদিন বয়সের ছোট্ট মেয়েটার গলা ছিঁড়ে কান্নার আওয়াজ শুনতে পাবে। বাচ্চাটাকে কিছুতেই রাখা যাচ্ছেনা। ক্ষিদের চোটে সারাক্ষণ তারস্বরে চিল্লিয়ে কাঁদে। সোনিয়া অনেক চেষ্টা করেও একটু ফর্মুলা মিল্ক বাচ্চাটাকে খাওয়াতে পারেনা। একটা ব্যাথাতুর শ্বাস ছেড়ে দীপ্ত নিশ্চল আওয়াজে বললো,

— আমিও ভাল আছি বাবা।

তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আবৃতির দিকে চেয়ে বলে,

— ভালো আছেন ভা..?

আবৃতি না বোঝার মতো করে সহজ গলায় জবাব দিল,

— জি ভালো আছি৷ তুমি কেমন আছ?

যদিও দীপ্তর অবস্থা ওর শুকনো চোখমুখ দেখেই ঠাহর করা সম্ভব যে ও কেমন আছে। কিন্তু তবুও সৌজন্যতা রক্ষায় প্রশ্নটা করা৷ দীপ্ত বিষাদ মাখা কন্ঠে বললো,

— ভালোটা আর বোধহয় কোনদিন থাকা হবে না আমাদের।

আবৃতি অস্থির চিত্তে এদিক সেদিক তাকাল। দীপ্তকে স্বান্তনা দেওয়ার কোন ভাষা আবৃতির কাছে নেই। কখনো কখনো মানুষ এমন অবস্থায় নিপাতিত হয় যে তখন স্বান্তনাও একটা প্রহসনের মতো ঠেকে। আহান আবৃতিকে নামিয়ে দিয়ে কোথাও একটা গিয়েছিল। ফিরে এলো বেশ কিছু বিস্কুটের প্যাকেট আর কলার ছঁড়া নিয়ে। খাবারগুলো আবৃতির হাতে দিয়ে আহান বলে,

— তোরা ভেতর হয়ে আয়। আমি এদিকটায় আছি। কাজ হলে আমায় একটা টেক্সট করলেই আমি চলে আসব গেইটের সামনে।

এই বলে আহান চলে যায়। এই পরিবারের কারো সাথেই আহান তেমন কথা বলেনা আবৃতির ডিভোর্সের পর থেকে। দীপ্ত প্রশ্ন নিয়ে তাকালে আবৃতি ক্ষীণ কন্ঠে বলে,

— আশ্রমের বাচ্চাদের জন্য দীপ্ত। এসেছি যখন বাচ্চাগুলোকে সামান্য কিছু খাবার দিতে চাই।

— ঠিক আছে। ভেতরে চলো তোমরা।

অরফানেজের মূল অফিস পেরিয়ে ওরা ভেতরে ঢুকে। ভেতরে একটা বড় খেলার মাঠ আছে। এই মাঠটাকে ঘিরেই বাচ্চাদের আবাসন ভবনগুলো। আবৃতি চারদিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে পড়ে। কেননা এই অরফানেজটার পরিধি বেশ বিস্তৃত। অনেকগুলো ভবন, বাচ্চাদের খেলার জন্য এত বড় মাঠ, আর নানা রকম খেলার সামগ্রী দিয়ে  অরফানেজটার বিশাল মাঠটা সজ্জিত। দীপ্ত অরফানেজের ম্যানেজারের সাথে কথা বলছিল। আবৃতি আরশানের হাত ধরে এদিক সেদিক হেঁটে হেঁটে দেখছিল। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মাঠের একদম পেছনের দিকে চলে গেল। সেখানে যেতেই আবৃতির চলন্ত পদযুগল থামতে বাধ্য হয়। কেননা সেখানে স্বয়ং ঐক্য চৌধুরী উপস্থিত। আবৃতি হয়তো জানেনা প্রতি শুক্রবারে ঐক্য ওয়াফাকে নিয়ে এই অরফানেজটায় আসে। আবৃতি অবাকতা মিলিয়ে উল্টে বিমোহিত হয়ে যায় সামনের দৃশ্য দেখে।

ঐক্যকে ঘিরে বাচ্চাগুলো উল্লাসে মেতে আছে। ঐক্যের চোখে একটা কাপড় বেঁধে দিয়ে দিয়ে বাচ্চাগুলো ওর চারদিকে ছোটাছুটি করছে।

আবৃতিটর ঠোঁটের কোণ দুটো আনমনে দু’দিকে প্রসারিত হয়। আবৃতির হাতের মুঠোয় আরশান লাফিয়ে উঠে বলে,

— মাম্মাম মাম্মাম দেখ পাপা কানামাছি খেলছে। আমিও খেলব। মাম্মাম আমি যাই।

এই বলে আরশান সময় বিলম্বন না করে এক ছুট লাগায়৷ আবৃতির ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে যায় আরশানের কথা শুনে। হতবাক হয়ে বিরবির করে বলে,

— কি বললো আরশান এইমাত্র? পাপা বললোনা? নাকি আমি ভুল শুনেছি?

আরশান ছুটে গিয়ে ঐক্যের কোমর জড়িয়ে ধরে। বাচ্চারা সবাই থেমে যায় অপরিচিত একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখে। কিন্তু বহু চেনা  আরশানকে দেখেই ওয়াফা গদগদবচনে বললো,

— আরশান তুমি? তুমি কখন এসেছ? খেলবে আমাদের সাথে এসো এসো।

ঐক্য আরশান নামটা শুনেই চকিতে চোখের কাপড়টা টেনে সরিয়ে ফেলে। দেখে ওর কোমর আঁকড়ে ধরে দুটি নিষ্পাপ টলটলে চোখ হেসে তাকিয়ে আছে উপরের দিকে। ঐক্য মোলায়েম হেসে বললো,

— বাবা তুমি এখানে? কার সাথে এসেছ?

আরশান আঙুল তুলে পেছনে ইশারা করে।
ঐক্য মসৃণ কপাল গুটিয়ে আরশানের ইশারা করা সেদিকটায় তাকায়। দেখে অলিভ গ্রিণ কালারের একটা সাদামাটা সালোয়ার স্যুট পরিহিতা আবৃতি ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। মাথায় ওরনাটা দিয়ে ঘোমটা টানা। ঐক্য আরশানের হাতটা আঁকড়ে ধরে আবৃতির দিকে এগিয়ে যায়। ঐক্য আবৃতির সামনে আসতেই ও লজ্জায় খানিক গুটিয়ে যায়। ও এখনো বিভ্রান্ত হয়ে আছে তখন আরশান কি সত্যি ‘পাপা’ বললো নাকি ও শুনতে ভুল করেছে। ওয়াফা প্রত্যকবারের মতোই আবৃতিকে পেয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। আবৃতি ওকে আদর করে কোলে তুলে নেয়। ঐক্য অবাক গলায় শুধায়,

— মিস আবৃতি আপনারা এখানে?

আবৃতি জিভ দিয়ে নিজের শুষ্ক ঠোঁটগুলো ভিজিয়ে বলে,

— আসলে দীপ্ত আপনাদের এখানে আজ দুপুরে বাচ্চাদের জন্য একটা ছোটখাটো মিলাদের আয়োজন করেছে। তাই আমাকে অনুরোধ করলো যেন আরশানকে নিয়ে আসি৷ ও নিজের হাতে বাচ্চাদের পাতে খাবার তুলে দেবে৷

ঐক্য স্মিত হেসে বললো,

— ভাল করেছেন। সন্তানদের ওসিলায় পিতার অনেক গুনাহ মাফ হয়৷

আবৃতি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রসঙ্গ পাল্টায়। বলে,

— আপনি আজ এখানে?

–জুমা পড়ে প্রতি শুক্রবারে ওয়াফাকে নিয়ে এখানে আসা হয়। বিকেলে খেলাধুলা করে তারপর নিয়ে যাই। বোঝেনই তো বাচ্চা মানুষ খেলার সাথী ছাড়া থাকতে চায়না।

আবৃতি ওয়াফার গাল টেনে বললো,

— ভালোতো এখানে অনেক গুলো বাচ্চা। ওদের সাথে সময় কাটালে ওয়াফা মনির মন ভালো থাকবে।

— আপু?

দীপ্ত আসায় ওদের কথোপকথনে বাঁধা প্রাপ্ত হয়। আবৃতি দীপ্তর মুখে আপু ডাক শুনেও অবাক হলোনা।
দীপ্ত আর ও সময় বয়সী হবে। আগে ভাবী ডাকলেও এখন তো আবৃতি আর ওর ভাবীটি রয়ে যায়নি। তাই আপু ডাকটাই সমীচীন। দীপ্ত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,

— আপনারা আসুন। বাচ্চাদের খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। খালা ডাকছেন ডাইনিংয়ে৷

ঐক্য হাত ঘড়ি দেখে মাথা নাড়িয়ে বললো,

— হুম প্রায় দুটো বাজতে চললো। বাচ্চারা সবাই আস্তে ধীরে ডাইনিংয়ে গিয়ে বসো। একদম ছোটাছুটি করবেনা ঠিকাছে?

বাচ্চা সবাই ঐক্যের কথায় মাথা নাড়িয়ে সেই ছুটেই চলে গেল ডাইনিংয়ের দিকে৷ ওদের পিছু পিছু ওয়াফা আবৃতির হাত ধরে আর আরশান ঐক্যের হাত ধরে চললো। ওই সময়ের জন্য আবৃতি সাময়িকভাবে ভুলে বসলো আরশানের হঠাৎ ঐক্যকে ‘পাপা’ডেকে উঠা। কেনই বা বাচ্চাটা হঠাৎ করেই ঐক্যকে পাপা ডাকবে?

ডাইনিং এরিয়ায় এসে আবৃতি আরেকবার মুগ্ধ হলো অরফানেজটার ব্যবস্থাপনায়। একদম ঝাঁ তকতকে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ৷ বাচ্চাদের খাবার জন্য চেয়ার টেবিলের ব্যবস্থাসহ, বিশুদ্ধ সুপেয় পানির ইলেকট্রনিক ওয়াটার পিউরিপায়ারের ব্যবস্থা আছে। আবৃতি দেখলো বাচ্চাগুলো নিজেদের জন্য বরাদ্দ প্লেট নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের চোখমুখ চকচকে। কারণ আজ ওদের জন্য অনেক মজাদার খাবার দাবারের আয়োজন করা হয়েছে। যদিও ঐক্য প্রতি শুক্রবারে এখানে একটা গরু জবাই করে ওদের জন্য। কিন্তু আজ দীপ্ত এখানে বেশ বড় করে মিলাদের ব্যবস্থা করছে তার মৃত ভাইয়ের আত্নার মাগফেরাত কামনায়।
দীপ্ত আরশানের হাত ধরে খাবারের জায়গায় নিয়ে যায়। আবৃতিকে বলে আরশানের হাতে ধরে বাচ্চা গুলোর থালায় খাবার তুলে দিতে। আবৃতি মাথার ঘোমটাটা আরেকটু টেনে এগিয়ে আসে। ঐক্য গরুর মাংসের ডেকচির দায়িত্বে দাঁড়ায়৷ গরুর মাংস ও বেঁড়ে দেবে। এদিকে ওয়াফা মিষ্টির হাড়িটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। আবৃতি বুঝলো এদের এই কাজগুলোতে পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। আর তাতেই ওর ঠোঁটে হাসি খেলে গেল। যথাক্রমে বাচ্চাদের প্লেটে একে একে আবৃতি, আরশান, ওয়াফা আর ঐক্য খাবার তুলে দিল। বাচ্চারা খুশি মনে নিজেদের প্লেট ভরতি খাবার গুলো আঙুল চেটেপুটে খেল। আবৃতি বাচ্চাগুলোকে তৃপ্তি নিয়ে খেতে দেখে মনে মনে নিয়ত করলো এবার থেকে প্রতি শুক্রবার এই বাচ্চাদের জন্য ও সাধ্যমত কিছু খাবারের ব্যবস্থা করবে। বড় বোলে করে মাংস নিয়ে আবৃতি হেঁটে হেঁটে সেধে সেধে বাচ্চাদের প্লেটে মাংস তুলে দিল। অদূর হতে ঐক্য মোহনীয় চোখে সেই দৃশ্য পরখ করলো। আবৃতিকে নিগুঢ় দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে বিরবির করে বললো,

— ইন ফিউচারের সব গুলো শুক্রবার বাচ্চাগুলো যাতে আপনার হাতেই বেঁড়ে খেতে পারে মিস আবৃতি।

বাচ্চাগুলোর খাওয়া ঘনিয়ে আসলে অরফানেজের ব্যবস্থায় থাকা খালা ওদের সবাইকে জোর করে বসিয়ে দিল। আবৃতিরা সবাই এক টেবিলেই বসলো। দীপ্ত বললো,

— আপু। আহান বাইরে আছে না? দাঁড়াও আমি ডেকে নিয়ে আসছি। তোমরা খাওয়া শুরু করো।

দীপ্ত যেতেই কর্মচারীরা ওদের সামনে সবকিছু এনে রাখলো। বেশ অনেকগুলো আইটেম মেন্যুতে। ওনারা বেঁড়ে দিতে নিলে আবৃতি মানা করে বলে,

— আপনারা যান আন্টি। আমি বেঁড়ে দেব।

ওনারা সবাই মাথা নাড়িয়ে চলে গেলেন। আবৃতি ইতস্ততভাবে ঐক্যের প্লেটে পোলাও তুলে দিতে নিল। ঐক্য মানা করে বললো,

— না না সাদা ভাত দাও। পোলাও আমি খাইনা আবৃতি।

পোলাওয়ের চামচ ধরে রাখা আবৃতির হাতটা ঈষৎ কেঁপে উঠে। ঐক্য এমনভাবে বললো যেন হর হামেশাই আবৃতি ওকে ভাত তুলে দেয়। আর আপনি থেকে হঠাৎ তুমিটা আবৃতির কানে বড্ড বিঁধলো। আবৃতির অবস্থাটা টের পেয়ে ঐক্য কথা ঘোরাতে ঘাড় চুলকে বললো,

— এক্টুয়ালি পোলাওতে আমার এসিডিটির প্রভলেম হয়। তাই স্কিপ করি৷

আবৃতি নিজেও অতিদ্রুত নিজেকে সামলে নিল। পোলাওয়ের চামচটা রেখে ঐক্যের প্লেটে সাদা ভাত, গলদা চিংড়ী আর রোস্ট তুলে দিল। ঐক্য হেসে ভাত মাখালো। আবৃতির দিকে তাকিয়ে দেখলো নিজের প্লেটে বেশ অনেকটা পোলাও তুলে নিল। প্রায় দু’জন খাওয়ার মতো পোলাওয়ের পরিমাণ৷ ঐক্য অবাক হলো কেননা আবৃতির খাওয়া দাওয়া খুবই সীমিত খায়। ওকে আরো অবাক করে দিয়ে আবৃতি একে একে তিনটে চিংড়িমাছ, দুটো ডিম এবং তিনটে রোস্টের পিচ প্লেটে নিল। তারপর পোলাওটা মাখিয়ে নলা বানিয়ে সবার প্রথমে ওয়াফার মুখে ধরলো। ওয়াফা চোখ বড় বড় করে তাকায়। আবৃতি হেসে বলে,

— বলো ফার্স্ট কে হবে?

ওয়াফা সাথে সাথে লোকমাটা মুখে পুরে নিল। চিবুতে চিবুতে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বললো,

— আমি আমি৷

আবৃতি দ্বিতীয় লোকমাটা বানিয়ে আরশানের মুখের সামনে ধরলো। বললো,

— বলো দ্বিতীয় কে হবে?

— মাম্মাম আমি আমি।

বলে আরশান টুপ করে নলাটা পুরে নিল। আর ঐক্য নিজের খাওয়া ভুলে মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেই মনোহরী দৃশ্যটা অবলোকন করলো। এই নারী ঐক্যর মনের লোভ যে দিনদিন চক্রবৃদ্ধিহারে বাড়িয়ে দিচ্ছে তা কি জানে? আবৃতির সেদিকে ধ্যান নেই। ও পালাক্রমে এটা সেটা বলে ওদের খাইয়ে দিচ্ছে সাথে নিজেও খেয়ে নিচ্ছে। যেন এগুলোতে ও অনেক দিনের অভ্যস্ত!

.
.
.

ইরার অবস্থা এই ছয়দিনে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সেদিন অকষ্মাৎ ধ্রুবর মৃত্যু সংবাদটা শোনার পর ইরা কতক্ষণ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু ক্ষনকাল ব্যায়ে ওর মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে নিউরনে পৌঁছে যায় যে ‘ওর প্রাণপ্রিয় প্রেমিক স্বামী মৃত!’
ডাক্তার, নার্সরা মিলেও ইরাকে কিছুতেই সামলানো যাচ্ছিল না। ধ্রুবর মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর পুরোপুরি কন্ট্রোললেস হয়ে পড়ে। অপ্রকৃতস্থের মতো সবাইকে এটা সেটা ছুঁড়ে মারে। ভয়ে কেউ ওর কাছে এগোনোর সাহস করতে পারছিলেন না। ওর এক একটা আর্তচিৎকারে হসপিটালের ইট গুলো অব্দি যেন কেঁপে কেঁপে উঠে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গোটা কেবিনটা তছনছ হয়ে গেল। অত্যাধিক চেঁচামেচির কারণে ইরার তল পেটের সদ্য তাজা সেলাই ছিঁড়ে রক্ত ঝরা শুরু করে। ডাক্তাররা নিরুপায় হয়ে ঘুমের ইনজেকশন পুশ করতে বাধ্য হয়। ইরার মা হাউমাউ করে কাঁদছেন। হসপিটালে একাকী মেয়েকে নিয়ে এক অসহায় মায়ের আর্তনাদে সবার চোখের কোটরে পানি জমে। হাসপাতালে আসা বিভিন্ন মানুষ আফসোসে জর্জরিত সদ্য স্বামী হারা ইরাকে নিয়ে। একজন বড় দুঃখী গলায় বলছেন,

— আহারে মাইয়াটা কচি বয়সে জামাই হারালো। বাচ্চাটা দুনিয়ায় না আসতেই এতিম হলো। আল্লাহ এমন অবিচার কেন যে করলো মাইয়াটার সাথে?

ইরার আক্রমণাত্মক আচরণ দেখে ডাক্তারা বলছেন ইরার মারাত্মকভাবে মানসিক বিপর্যয় ঘটেছে। ইরার এই অবস্থায় সবথেকে ভুক্তভোগী ইরার নিষ্পাপ শিশু কন্যাটি৷ অবুঝ বাচ্চাটা পরিস্থিতি বোঝেনা, সারাক্ষণ আকাশ, বাতাস কাঁপিয়ে কাঁদে মায়ের বুকের এক ফোঁটা দুধের তৃষ্ণায়! কিন্তু ইরা নিজের জন্ম দেওয়া শিশু কন্যাটিকেও সহ্য করতে পারছেনা। ইরার মা, সোনিয়া এমনকি ডাক্তার, নার্সরা অব্দি ইরাকে সামলে বাচ্চাটাকে খাওয়াতে পারছেন না। ডাক্তাররা আশঙ্কা করছেন এভাবে চলতে থাকলে হয়তো খুব দ্রুত ইরা পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে।

— এক বছর আমি কিছুতেই ওয়েট করতে পারব না।

ঐশী ভাবলেশহীন গলায় বলে,

— তো আমি কি করব?

— কি করব মানে? তোমার ভাইয়াকে বলো যে…

ঐশী চোখ কপালে তুলে বললো,
— কি পাগল হলেন? আমি আমার ভাইয়াকে নাচতে নাচতে বলব আমি বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছি?

— জানিনা আমি। আমি কিছুই জানিনা। কিন্তু এক বছর আমার পক্ষে ওয়েট করা কোনভাবেই পসিবল না ব্যস।

ঐশী একটু এগিয়ে এসে একদম আহানের কাছাকাছি দাঁড়ায়। আহানের অস্থির লোচন দুটিতে চেয়ে রুদ্ধ কন্ঠে বলে,

— আমি চার চারটা বছর অপেক্ষা করেছি আহান৷ আর আপনি মাত্র এক বছর ওয়েট করতে পারবেন না?

আহান ঢোক গিলে চোখ সরিয়ে নিল। বল রয়েসয়ে,

— তোমার সবসময় কেন মনে হয় যে অপেক্ষাটা কেবল মাত্র তোমার জন্য বরাদ্দ ছিল?

ঐশী কপাল কুঁচকে শুধালো,

— কেন ছিলনা?

— না।

আহানের স্পষ্ট উত্তর। ঐশীর কপালের ভাঁজ মিলিয়ে গেল। আহারের সাদাটে মুখটায় চেয়ে হতবাক গলায় বললো,

— তাহলে?

আহান আরেকটু ঘনিষ্ঠ হলো। ঐশীর বুকটা সমানতালে ধুকপুক করছে। আহান ঐশীর কম্পিত হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। খুবই সাধারণ ছোট্ট সোনার আংটিটায় বুড়ো আঙুল ঘষে প্রগাঢ় হেসে বললো,

— হয়তো বিপরীত প্রান্তের মানুষটিও ততটা দহনে রোজ পুড়েছে যতটা তোমার ধারণাতেও নেই ঐশী।

বলে আঁকড়ে রাখা হাতের উল্টোপিঠে একটা নরম চুমু খায় আহান৷ আহানের হাতের মুঠোয় থাকা ঐশীর হাতটা সহ পুরো নাজুক শরীরটা একবার কেঁপে উঠে। নিজের কম্পিত নিম্ন ঔষ্ঠ কামড়ে ধরে অনুভূতি সামলানোর তাগিদে৷ ভারসাম্যহীন শরীরের ভার রাখতে ঐশী আহানকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা হাতে। আহান মেয়েটাকে স্বযত্নে নিজের বুকে ঠাঁই দেয় পরম নির্ভরতায়। মোহাবিষ্ট গলায় বলে,

— আমি আমাদের সম্পর্কটাকে খুব দ্রুত হালাল করে নিতে চাই ঐশী। আমি ভাইয়াকে বলব। দরকার হলে তোমার পড়াশোনার দায়িত্ব আমি আজ থেকে নিজের কাঁধে তুলে নিলাম৷ কিন্তু তোমাকে আমার আমার করে চাই চাই৷

চলমান…..

 

 

(গরমে পাগল পাগল লাগছে। রিচেইক করিনি। সকালে সময় করে করব। ভুলত্রুটি মার্জনা করবেন পাঠক। আর প্লিজ লাইক,কমেন্ট করবেন। হ্যাপি রিডিং। ❤️❤️)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x