গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (৩৮)

পর্বঃ৩৮

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

[সবাই শেয়ার করে দেবেন।❤️]

 

 

 

একটা অদ্ভুত সুন্দর কনে বিদেয়ের সাক্ষী হয়ে রইল বিয়েবাড়ির উপস্থিত সকল সদস্যরা। সচারাচর কনে বিদেয়তে সবার নেত্র অশ্রুসিক্ত থাকলেও আবৃতির বেলায় সবার চোখে অশ্রু না এসে বরং মুগ্ধতা টইটম্বুর করছে। আবৃতির একটা হাত তখনো ঐক্যের হাতের মুঠোয়। আরেকটা হাত ওয়াফা আঁকড়ে ধরে আছে। তেমনিভাবে ঐক্যের আরেকটা হাতের মুঠোয় বন্দি আরশানের নরম হাতটা। বাচ্চাটা এত খুশি, যেন কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে। এমন নয়নাভিরাম দৃশ্যে কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারে? জাহানারা দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছেন। না কাঁদছেন না ভদ্রমহিলা। কিন্তু অবাধ্য চোখ দুটো ঠিকই ভরে উঠেছে। আহান হাসিমুখে আবৃতির লাগেজগুলো তুলে দিল গাড়িতে। আবৃতি একবার পিছু ফিরে তাকাল। মায়ের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই জাহানারা মুচকি হাসলেন। আবৃতি ঢোক গিলে উগলে আসা কান্না রোধ করে নিজেও হাসল। আবৃতির হঠাৎ ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কিন্তু ও কাঁদতে চাইছেনা। কেন কাঁদবে ও? আদতে ওর কাঁদার দিন শেষ। এরপর আবৃতি একটা জীবন পাবে, যেই জীবনে ও প্রাণ খুলে হাসবে, বাঁচার মতো বাঁচবে। আহান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বললো,

— বেস্ট অফ লাক আবৃতি। যা, তোর আকাঙ্খিত সংসার তোর জন্য অধীর অপেক্ষায়!

আবৃতি কান্না চোখে হাসল। আহান ঐক্যের উদ্দেশ্য বললো,

— ভাইয়া আমার বোন আর ভাগ্নেকে আপনার কাছে আমানত স্বরূপ দিলাম। ওদের খেয়াল রাখবেন।

ঐক্য মুচকি হেসে বললো,

— চিন্তা করোনা৷ ওরা আজ থেকে আমার। আর ঐক্য চৌধুরী নিজের মানুষদের সবসময় বুকে আগলে রাখবে। আমি বেঁচে থাকতে কোন আঁচ ওদের উপরে আসতে দেব না। আই প্রমিজ।

আহান ঠোঁট কামড়ে ধরে ঠেলে আসা অশ্রু রুখতে। ঐক্য কারের দরজা খুলে দাঁড়ায়। আবৃতি একপলক সবার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে গাড়িতে উঠে বসে। ওয়াফা আরশান আবৃতির পাশ ঘেঁষে বসে। ঐক্য সবাইকে সালাম দিয়ে বিদেয় নেয়। তারপর নিজেও উঠে বসে স্ত্রী-সন্তানের পাশে। ঐশী জাহানারাকে সালাম দিয়ে বিদেয় নেয়। এক পলক আহানের দিকে চেয়ে পরের গাড়িতে উঠে বসে। ইশ সবাই শশুর বাড়ি আসে, আর ও শশুরবাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। এত দুঃখ ও কই রাখবে? পরপর ছয়টা গাড়ি শা শা করে ধুলো মাড়িতে চোখের পলকে আড়াল হয়ে যায় খন্দকার বাড়ির মরচে ধরা লোহার গেইট পেরিয়ে।

গাড়িগুলো চোখের আড়াল হতেই জাহানারা ঝরঝর করে কেঁদে দিলেন। এতক্ষণ যাবত বহু কষ্টে আবৃতির সামনে নিজের কান্না আটকে রেখেছিলেন। আহান ওনাকে বুকে আগলে নিলেন। জাহানারা ছেলের বুকে মাথা ঠেকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। আহানের চোখ দুটো টলমল করে উঠে। জন্ম থেকে একইসাথে বেড়ে উঠা বোনটার জন্য হৃদয় পোড়ে। এবার যদি তার বোনটা একটু সুখের নাগাল পায়। তাহলে এই জীবনে আহানের আর আফসোসের কিছু রইবেনা।

জোবায়দা চৌধুরী অধীর আগ্রহে বসে ছিলেন ওদের ফিরে আসার। হঠাৎ কয়েকটা গাড়ির হর্ণ কর্ণধার হতেই তিনি শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তটস্থ ভঙ্গিতে সবাইকে বললেন,

— এসে গিয়েছে। ওরা এসে গিয়েছে। কাকলি, পান মিষ্টির ঢালাটা নিয়ে এসো।

ততক্ষণে সবাই বৌ দেখতে ভিড় জমিয়েছে সদর দরজায়। গাড়ি থেকে নেমে সর্বপ্রথম বাচ্চা দুটোকে কোলে করে নামায়। তারপর নিজের ডানহাত বাড়িয়ে দেয় আবৃতির দিকে। আবৃতি এক পলক ঐক্যের হাসিমুখে চেয়ে নিজের মেহেদী রাঙা হাতটা রাখে ওই খসখসে হাতে। ঐক্য মুচকি হেসে আবৃতিকে গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করে। ঐক্যের ফ্রেন্ডের বৌ এগিয়ে এসে বলে,

— ভাবিকে কোলে নিয়ে বাড়িতে ঢুকুন ভাইয়া।

আবৃতি অপ্রস্তুত হলো বেশ। ঐক্য মুচকি হেসে টুপ করে আবৃতিকে কোলে তুলে নিল। আবৃতি লজ্জায় হাসফাস করে ঐক্যের কটি মুঠো করে আঁকড়ে ধরে। ওয়াফা, আরশান খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠে। বাচ্চাদের কাছে বিষয়টা বেশ আনন্দের ঠেকছে। ঘরের সামনে আসতেই বিশাল এক বাহিনী পথ রোধ করে দাঁড়ায়। ঐক্য আবৃতিকে কোল থেকে নামিয়ে মৃদু হেসে শুধায়,

— আপনাদের কি হলো আবার?

— দাঁড়াও নতুন বৌ নিয়ে এসেছো। একটু মিষ্টি মুখে দাও।

জোবায়দা চৌধুরী মিষ্টির ট্রেটা নিয়ে আসতে আসতে বললেন। ছেলের পাশে আবৃতিকে আর ওয়াফা, আরশানকে দেখে ওনার চোখ জুড়িয়ে গেল। আবেগে টলটল করে উঠল ভেতরটা। মনে মনে কয়েকবার মাশাল্লাহ পড়ে নিলেন উনি। আলতো হেসে ওদের স্বামী-স্ত্রীকে একটু মিষ্টিমুখ করিয়ে দিলেন। তারপর স্মিত হেসে বললেন,

— আসো মা। আজ থেকে এই সংসার, এই বাড়ির মানুষগুলো, এই বাড়ির প্রতিটা ইট তোমার। দোয়া করি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই বাড়িটাই যেন তোমার শেষ ঠিকানা হয়।

আবৃতি মাথা নিচু করে ঢোক গিললো। ঐক্য ফিচেল হেসে আবৃতির হাত আঁকড়ে নিল। আবৃতি চোখ তুলে তাকাল ঐক্য মৃদু হেসে অস্ফুট স্বরে বলে,

— ওয়েলকাম মিসেস চৌধুরী। আপনার সংসারে আপনাকে সুস্বাগতম।

আবৃতি জল চাপা চোখে তাকাল । সংসার! আজ থেকে এই সংসারটা তার? আজ থেকে আবৃতিরও একটা সংসার হবে, একটা নিজের মানুষ হবে। যেই মানুষটার উপর শুধু তার অধিকার থাকবে। আবৃতি ঐক্যের হাত ধরেই পদার্পণ করল ওর নতুন সংসারে। জাহানারা আরশানকে কোলে তুলে ওর আদুরে মুখটায় অজস্র চুমু খেল। ঐক্যের ফুফু আরশানকে দেখে একটু নাখোশ হলেন। আজকে বিয়ের দিনেই বাচ্চাটাকে সাথে দেওয়ার কি দরকার ছিল? আরশান এত অপরিচিত মানুষজন দেখে এতক্ষণ একটু ভীত হয়ে ছিল। জাহানারা কোলে নিতেই বাচ্চাটা একটু সহজ হলো। জাহানারার গলা জড়িয়ে চারপাশের চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা উৎসুক নেত্রে অবলোকন করছে। ঐশী আর ঐক্যের দুটো কাজিন মিলে আবৃতিকে ঐক্যের রুমে নিয়ে গেল চেইঞ্জ করে দিতে। ওয়াফাও নাচতে নাচতে সাথে চললো৷ বিয়ে বাড়ি থেকে এই পর্যন্ত একবারের জন্যেও আবৃতির আঁচল ছাড়েনি মেয়েটা। ঐক্য আরশানের পাঞ্জাবির উপরের কটিটা খুলে দিল। জোবায়দা চৌধুরী সবার জন্য ঠান্ডা সরবত আর আরশানের জন্য হালকা কিছু স্নাকস নিয়ে আসতে বলেন। সরবত খেয়ে ঐক্য আরশানকে জোবায়দা চৌধুরীর কাছে রেখে ব্যস্ত পায়ে নিজের রুমের উদ্দেশ্য হাঁটা ধরে। চটজলদি চেইঞ্জ করে ওকে রিসেপশনের সবকিছু আরেকবার চেইক করতে হবে। বিয়েটা সাদামাটাভাবে হলেও ঐক্য, আবৃতির রিসেপশনটা বড় করে আয়োজন করা হয়েছে।

রুমে ঢুকে ঐক্য অবাক হয়ে যায়। ঐক্যকে দেখে তাড়াহুড়ো করে অপ্রস্তুত আবৃতি পিছনে ফিরে যায়। ওর শাড়ি চেইঞ্জ করা হচ্ছিল। ঐক্য অপ্রস্তুত বোধ করলেও দ্রুত নিজেকে দ্রুত সামলে নেয়।

— ভাইয়া, কিছু বলবে?

ঐক্য সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে,

— শাওয়ার নেব ভাবছি। খুব গরম লাগছে।

বলে আবৃতির দিকে আরেক পলক তাকিয়ে কাভার্ডটা খুলে নিজের পোশাক নিল। ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো,

— লেফ্ট সাইডে ওর প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে। যা যা দরকার নিয়ে নিস।

ঐক্য ওয়াশরুমে ঢুকতেই আবৃতি এতক্ষণ আটকে রাখা শ্বাসটা ছাড়লো। লজ্জায় তোপে ওর ফর্সা মুখটা লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে বুকে শাড়ির আঁচল একপাশে পড়ে আছে। ইশ লোকটা ওকে এই অবস্থায় দেখে নিল! কি লজ্জা কি লজ্জা!

ওয়াশরুমে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত মেয়েলী সুবাস নাসারন্ধ্রে এসে বাড়ি খেল ঐক্যর। ঐক্য চোখ ঘুরিয়ে গোটা ওয়াশরুমটা পরখ করে। বেসিনের উপরের সেলফটায় দেখে ওর নিত্য প্রয়োজনীয় জেন্টস প্রোডাক্ট গুলোর পাশে সদর্পে স্থান নিয়েছে নতুন কিছু মেয়েলি কসমেটিকস প্রোডাক্ট। ঐক্য ঠোঁট কামড়ে হাসল নিজে নিজে। ও তো ভুলেই গিয়েছে আজ থেকে নিজের জীবনের পাশাপাশি বাথরুমেও নিজের ঘাঁটি গেড়েছে এক রমনী৷ রমনীটা ঐক্যের বৌ।

ওয়াশরুমের দরজার খট করে শব্দ হতেই আবৃতি চমকে উঠে। শাওয়ার নিয়ে ঐক্য বাথরুম থেকে বের হয়ে অবাক হয়ে যায়। পুরো রুমে আবৃতি সম্পূর্ণ একা। খানিকটা অপ্রস্তুত হলেও ঐক্য দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। মৃদু হেসে শুধায়,

— তুমি একা কেন? ওরা সবাই কোথায়?

আবৃতি আনত মুখে ইতস্ততভাবে শাড়ির আঁচল কচলাতে কচলাতে মিহি স্বরে বললো,

— ওরা সবাই ফ্রেশ হতে গিয়েছে।

ঐক্য এবার জড়তা ভুলে পূর্ণ মনোযোগী দৃষ্টিতে আবৃতির আপাদমস্তক তীক্ষ্ণ চোখ বুলাল। বিয়ের সাজ বদলে একটা গাঢ় খয়েরী রঙা মসলিন শাড়ি পরনে আবৃতির। কানে গলায়,হাতে সোনার গহনা পরানো হয়েছে। ওর দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ঐক্যের দু-চোখ ধাঁধিয়ে উঠে। দৃষ্টিতে অপার মুগ্ধতার জোয়ার নিয়ে বিরবির করে বলে,

— তোমাকে দেখতে বৌ বৌ লাগছে।

আবৃতি চকিতে মাথা তোলে। আবৃতির বিভ্রান্ত দৃষ্টি দেখে ঐক্য নিজেকে শুধরে নেয়। বৌকে আবার কিভাবে বৌ বৌ লাগে? বোকা বোকা হেসে ঐক্য শুধরে ফের অস্ফুটে বলে,

— ইয়ে মানে বলতে চেয়েছিলাম তোমাকে খুব মিষ্টি দেখাচ্ছে।

ঐক্যের এমন নেশাভরা চাহনিতে নিমিষে নিভে গেল আবৃতি। অস্থির নেত্রে এদিকসেদিক তাকাল। ইচ্ছে করলো এক ছুটে পালিয়ে যেতে ঐক্যের দৃষ্টির তোড় থেকে বাঁচতে। আবৃতি আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখে ঐক্যের পরনে একটা কালো পাঞ্জাবী। শ্যামলা বলিষ্ঠ শরীরটায় আঁটসাঁট হয়ে লেগে আছে পাঞ্জাবীটা। না চাইতেও অবাধ্য চোখজোড়া তুলতে বাধ্য হয়। ঐক্যের সাথে চোখাচোখি হতেই লাজে গালদুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। ঐক্য ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসে আবৃতির কান্ডে। দুষ্টমি মাখা কন্ঠে বলে,

— দেখার হলে সরাসরি দেখতে পারো। এভাবে লুকিয়েচুপিয়ে দেখার কি আছে।? তোমার কাছে হালাল সার্টিফিকেট আছে আমাকে দেখার।

আবৃতির ইচ্ছে করলো মাটি ফাঁক হয়ে যাক,আর ও সেখানে ঢুকে যাক। এই যন্ত্রণাময় অনুভূতি গুলো ওর কাছে সম্পূর্ণ নতুন। এত লজ্জা পেতে হয় বুঝি একটা নতুন বৌকে? ঐক্যের মাথায় হঠাৎ দুষ্ট বুদ্ধি চাপলো। চপল পায়ে ভেজানো দরজাটা শব্দ তুলে আটকে দিল। সেই শব্দে আবৃতির হৃদপিণ্ড লাফিয়ে উঠে। হতবাক বৃহৎ নেত্রে সেদিকে তাকিয়ে বিরবিরিয়ে আওড়ায়,

— দরজা আটকালেন কেন?

ঐক্য আবৃতির দিকে এক পা এক পা এগিয়ে আসতে আসতে হাস্কি স্বরে বললো,

— কেন তুমি বোঝনি কেন দরজা আটকালাম?

ঐক্যকে নিজের দিকে অগ্রসর হতে দেখে আবৃতির কলিজা পানি ইতোমধ্যে শুঁকিয়ে গিয়েছে। তুতলে জিজ্ঞেস করে,

— কে..ন আটকালেন?

আবৃতির ভয়ার্ত মুখটা দেখে ঐক্য মনে মনে হাসলেও বাইরে মুখটা স্বাভাবিক রাখলো। ভাবলেশহীন গলায় বললো,

— বাসর করতে।

আবৃতির মাথাটা চক্কর কেটে উঠে বিহ্বলতার তোড়ে। অবিশ্বাস্য চোখে একচোট বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল ঐক্যের নির্লিপ্ত হাসিহাসি মুখটায়। ঐক্য তখনো একটু একটু করে এগিয়ে আসছে। আতঙ্কে বুক কাঁপছে আবৃতির। ভীত পায়ে পেছাতে পেছাতে ততক্ষণে বেডের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। ঐক্য একদম সন্নিকটে আসতেই আঁতকে উঠে পেছাতে গিয়ে সোজা দপ করে বিছানায় উল্টে পড়ে। ঐক্য হু হা করে ঘর কাঁপিয়ে হেসে দেয়। আবৃতির ভীতসন্ত্রস্ত মুখটা এত আদুরে দেখতে লাগছিল যে ওকে আরেকটু ভয় পাইয়ে দিতে ঐক্য বিছানায় উঠে হুট করে আবৃতির উপর ঝুঁকে শুয়ে পড়ে। আবৃতির অন্তরাত্মা বুঝি এবার ওকে ছেড়েই পালাল। দৈবাৎ বেচারী চোখমুখ খিচে নেয়। মেয়েটার এত ঘনিষ্ঠে এসে আচমকা ঐক্যের ভাবভঙ্গি বদলে গিয়ে সেথায় ভর করলো অত্যাশ্চর্য এক অনুভূতি। প্রথমবার আবৃতির এত কাছে নিজেকে আবিষ্কার করে মন-মস্তিস্কে সব তালগোল পাকিয়ে গেল। ঘোর লাগা চোখে খানিকক্ষণ মেয়েটার রক্তিম ভীত শুভ্র মুখটায় চেয়ে হারিয়ে ফেললো নিজেকে। শরীরের প্রতিটা কোষে ছড়িয়ে পড়লো অদ্ভুত এক অনুভূতির জোয়ার। মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো লাগামহীন আসক্তি। আবৃতি এখনো চোখ খিচে বুজে আছে। ওর তিরতির করে কম্পমান লালচে ওষ্ঠপানে তাকিয়ে ঘোরের মাঝেই ঐক্য নিজের কালচে ওষ্ঠ নামিয়ে আনল। দু’জোড়া একে অন্যতে বিলীন হবে এমন সময় দরজায় ডাকাতের মতো করাঘাত হানা দেয়। সমন্বয়ে কয়েকজন নিরন্তর দরজা ধাক্কিয়ে যাচ্ছে। যেন দরজাটা ভেঙ্গে ফেলেই ওরা ক্ষান্ত হবে। বাইরে থেকে উচ্চস্বরে শোনা যাচ্ছে ঐক্যের বন্ধুদের অশান্ত গলা,

— কিরে ভাই? বাসর ঘর সাজানোর আগেই বাসর সেরে ফেলছিস নাকি? দেখি দরজাটা খোল। আমরা ফুল নিয়ে এসেছি। ফুল ছাড়া বাসর করলে তোর পাপ হবে পাপ৷ নাকি আমাদের ট্রিট দেবার ভয়ে এত তাড়াহুড়ো?

আবৃতি চট করে চোখজোড়া খুলে হত-বিহবল দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকায়। ঐক্য এখনো আবৃতির উপর শুয়ে নিজেও হতবুদ্ধিকর চোখে দরজার দিকে চেয়ে আছে। সুযোগ বুঝে আবৃতি ঐক্যকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। অতর্কিতে ঐক্য পাশে হেলে গেল। আবৃতি তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে উঠে এক ছুটে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। ঐক্য কতক্ষণ বোকার মতো চেয়ে উঠে দাঁড়ায়। দরজাটা তখনো ধাক্কিয়ে যাচ্ছে ওরা। ঐক্য বিরক্তির ভঙ্গিতে দরজাটা খুলে দেয়। দরজাটা খুলতেই সবাই সামনে হেলে পড়ে। যেন এতক্ষণ দরজাটার সাথেই লেগে ছিল। সোহান চারদিকে অনুসন্ধানি দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধায়,

— কিরে তুই যে একা? আমগো ভাবি কই?

ঐক্য মেকি শান্ত গলায় বলে,

— কেন? আমার বৌকে দিয়ে তোদের কি কাজ?

রাদ দাঁত কেলিয়ে হেসে বলে,

–আমাদের কোন কাজ নেই। কিন্তু বন্ধু হিসেবে তোকে সাহায্য করতে এলাম যেন তোর কাজটা তুই নির্বিঘ্নে করতে পারিস।

ঐক্য তাকিয়ে দেখে ওদের হাতে তাজা গোলাপ, রজনীগন্ধা, অর্কিডসহ নানান জাতের সতেজ ফুল। ফুলগুলো দেখে ঐক্য মুচকি হাসে। বন্ধুদের গোলগোল দৃষ্টি দেখে সহসা মুখটা আবার গম্ভীর করে নিল। বললো,

— বাসর সাজাবি তো?

ওরা সমন্বয়ে উপরনিচ মাথা নাড়ায়। ঐক্য ওদের কাঁধে ওদের কাঁধ চাপড়ে বললো,

— আগে চল তোদের ট্টিট দি। এরপর নাহয় ধীরে সুস্থে সাজাবি।

ট্রিটের কথা শুনে ওদের সবার চোখগুলো চকচক করে উঠে। হইহই করে বলে উঠে,

— ভাই তুই কত মহান? আল্লাহ তোকে আরো শ’খানেক বাচ্চার পিতা হওয়ার তৌফিক দান করুক।

— আমিন।

সবাই ফের সমস্বরে ‘আমিন’ বলে উঠে। ঐক্য ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়লেও মুখটা বহুকষ্টে স্বাভাবিক রাখল। এদের এখান থেকে বের করতে হবে। নাহয় তার লজ্জাবতী লবঙ্গ লতিকা আজ আর ওয়াশরুম থেকেই বের হবেননা।

**
ঐক্যের থেকে ট্রিট পেয়ে ওরা মহা আনন্দে বাসর ঘরটা সাজিয়ে দিয়ে গেল। তখন সবাই নিচে রাতের খাবার খেতে বসেছে। আবৃতি একটা চেয়ারে বসতেই পাশের চেয়ারে তড়িঘড়ি করে ওয়াফা বসে গেল। ঐক্য তা দেখে নিজে সরে গেল। ভেবেছিল বৌয়ের পাশে বসবে। কিন্তু মেয়ে তার সেই সুযোগটা দিলে তো। আবৃতির পাশের আরেকটা চেয়ার টেনে ঐক্য আরশানকে বসিয়ে দিয়ে অপরপাশে একদম আবৃতির মুখোমুখি চেয়ার টেনে নিজে বসল। ঐক্যের সাথে চোখাচোখি হতেই আবৃতি হাসফাস করে উঠে লাজে। একটু আগের বেডরুমের দৃশ্যগুলো মনে পড়তেই একটা শুকনো ঢোক গিলে। ঐক্য তা দেখে ঠোঁট চিপে হাসে। বুয়ারা সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দেয়। বাচ্চাদের জন্য আলাদা খাবার রান্না করা হয়েছে রাতে। অতিরিক্ত তেল, মসলাযুক্ত খাবার ওদের জন্য ঠিক নয়। তাই আবৃতি আগেই ঐশীকে বলে রেখেছিল। বাচ্চাদের প্লেটে ভাত দিতে নিলে আবৃতি বাধ সাধল। ক্ষীণ স্বরে বললো,

— ওদের আমি খাইয়ে দেব একসাথে। এক প্লেটেই বেশি করে ভাত বেড়ে দিন।

বুয়া তাই করলো। আবৃতি ওদের পছন্দের দুটো লেগপিস নিয়ে ভাত মাখাল। লোকমা তুলতেই ওয়াফা আরশান দুজনেই হা করলো। আবৃতি কাকে দেবে বুঝতে পারলনা। আরশান বললো,

— ওয়াফা মনিকেই দাও মাম্মাম।

আবৃতি মুচকি হাসলো। তার বাচ্চাটা এত বুঝদার। আবৃতি নিজের কায়দায় ওদের খাইয়ে দিল। টেবিলের সবাই মুগ্ধ চোখে চোখ জুড়ানো দৃশ্যটা উপভোগ করলো। ঐক্যের ফুফুও দৃশ্যটায় মুগ্ধ না হয়ে পারলেন না। খাওয়াদাওয়ার পাঠ চুকতেই ঐশী আর ঐক্যের কাজিনরা মিলে আবৃতিকে রুমে নিয়ে আসলো। ঘড়িতে তখন রাত বারোটার কাঁটা শেষের পথে। বাচ্চারা জোবায়দা চৌধুরীর রুমে আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে ক্লান্তিতে।
রুমে প্রবেশ করতেই আবৃতির পায়ের তলা শিরশির করে উঠে। সমগ্র রুম জুড়ে সতেজ কাঁচা ফুলের ছড়াছড়ি। বেড থেকে শুরু করে ফ্লোরটাও বাদ পড়েনি। ফুলের অকৃত্রিম সুবাসে ছেয়ে আছে গোটা কক্ষ। বেডসাইড টেবিলে কয়েকটা সুগন্ধি মোম জ্বালিয়ে রাখা। এত সুন্দর রুমটা, মনে হচ্ছে যেন কোন রূপকথার রাজ্যে এসে পড়েছে আবৃতি।

— বাব্বাহ! বাসর ঘর তো হেব্বি সাজানো হয়েছে। এবার শুধু বৌটাকে হেব্বি করে সাজাতে হবে। তাহলেই এই বাসরের সাজ স্বার্থক। কিগো নতুন বৌ কি বলো?

ঐক্যের মামাতো ভাইয়ের বৌ আবৃতির কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বললো। আবৃতি আড়ষ্টতায় জমে গেল। লজ্জায় আইঢাই করে উঠে সবার এক একটা কথায়। ঐশী ঠোঁট টিপে হেসে বলে,

— তোমরা কি ভুলে গিয়েছ একটা বাচ্চা মানুষও এখানে আছে?

সোহানের বৌ চোখ কপালে তুলে বলে,

— ওমা তাই নাকি। তা বাচ্চা আপু, আহান ভাইয়া কি আপনাকে আদর করতে এসে ফিডার ধরিয়ে দেয় হাতে?

ঐশী লজ্জায় লাল হয়ে বললো,

— যাহ!

অট্টহাসির রোল পড়ে গেল গোটা কক্ষে। ঐশী আবৃতির লাগেজটা খুলে সবগুলো শাড়ি বের করলো। দুটো প্যাকেট আলাদা করে রাখা। ওগুলো খুলতেই আবৃতির মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। প্যাকেটটার ভেতরে দুটো ভিন্ন রঙের রাতের পোশাক। আবৃতি লজ্জায় অন্যদিকে ফিরে যায়। ঐক্যের কাজিনের বৌ টিটকিরি করে জিজ্ঞেস করে,

— কি আবৃতি? কোন শাড়িটা পড়বে? নাকি নাইটি পড়বে?

আবৃতি অসহায় গলায় বলে উঠে,

— ভাবি প্লিজ রেহাই দিন।

উনি হাসতে হাসতে বললো,

— আচ্ছা আচ্ছা আর লজ্জা পেতে হবেনা। কিছুটা বাঁচিয়ে রাখো রাতের জন্য। দেখ এখান থেকে কোনটা পরাব?

এতগুলো শাড়ির মধ্যে আবৃতির চোখ গিয়ে আটকাল শুভ্র রঙা সিল্কের শাড়িটার উপর। হাত দিয়ে শাড়িটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল। সোহানের বৌ শাড়িটা হাতে নিয়ে বললো,

— এটা পড়বে? একদম সঠিক শাড়িটাই বাছাই করেছ। এটা পড়লে তোমাকে হেব্বি লাগবে দেখবে। ঐক্য ভাইয়া হয়তো বেহুশও হয়ে যেতে পারে।

বলে ঠোঁট টিপে হাসল। আবৃতি বুঝলনা ওর কথার মানে। ও শুধু স্বামীর পছন্দের রঙটাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আবৃতির হুশ ফিরে শাড়িটা পরানোর পর। শাড়িটা পরিয়ে হালকা পাতলা সাজিয়ে আবৃতিকে আয়নায় সামনে দাঁড় করালো ওরা। আবৃতি নত চোখ তুলে নিজেকে দেখেই একটা ধাক্কার মতো খেল। কেননা অত্যন্ত পাতলা শাড়িটা নামমাত্র ওর নারী শরীরটা আড়াল করে রেখেছে। আপাদমস্তক নিজেকে দেখে আবৃতি হতবাক গলায় বলে উঠে,

— এসব কি? সবই তো দে…

আবৃতি কথাটা গিলে নিয়ে ফের অস্থির কন্ঠে বলে,

— ভাবি এই শাড়িটা প্লিজ চেইঞ্জ করুন।

ওরা মেকি অবাক হওয়ার ভান ধরে বললো,

— ওমা কেন? এখন তো ফুল সাজ কমপ্লিট। এখন খোলা যাবেনা।

আবৃতি অস্থির কন্ঠে বলে,

— কিন্তু…

আবৃতি পুরো কথা সম্পূর্ণ করতে পারেনা এর আগেই ঐশী হুড়মুড় করে বাইরে থেকে এসে বলে,

— এই এসো এসো তোমরা। ভাইয়াকে নিয়ে এসেছে ওর ফ্রেন্ডরা। গেট ধরতে হবে। চলো চলো।

ওরা তটস্থ পায়ে উঠে আবৃতিকে বললো,

–বেস্ট অফ লাক।

এই বলে চপল পায়ে ছুটলো গেট ধরতে। ওদের ব্যস্ত ভঙ্গিমা বলে দিচ্ছে যেন জীবনে গেট ধরার মতো বড় কোন কাজ আর নেই। পেছনে রেখে গেল নিদারুণ লজ্জার তোড়ে মরিমরি আবৃতিকে। আবৃতি একটা শুকনো ঢোক গিলে আরেকবার নিজেকে আয়নায় দেখল। লজ্জায় দুহাতে মুখটা ডেকে ফেললো। ইশ এই অবস্থায় লোকটা ওকে দেখলে আজ ও মরেই যাবে!

চলমান…….

(আসসালামু আলাইকুম পাঠক। আজ বিশাল এক পর্ব দিয়েছি। গত পর্বে আপনাদের রেসপন্স দেখে আমি আপ্লুত। তাই গিফট দিলাম আজকের বড় পর্ব। এরকম রেসপন্স পেলে কষ্ট করে গল্প লিখাটাও সার্থক মনে হয়। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স। ❤️🤍)

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x