গল্প: দ্বিতীয় সূচনা (৪০)

পর্বঃ৪০[ রিসেপশন স্পেইশাল💖]

লেখনীতেঃআফসানা শোভা

[সবাই বেশি বেশি শেয়ার করে দেবেন।❣️]

সূর্য এখনো পুরোপুরি উদয় হয়নি পূর্ব অম্বরবক্ষে। চারদিকে এখনো জমাট বাঁধা অন্ধকারে ছেয়ে আছে ধরনী। দূরের মসজিদ হতে ভেসে আসছে মুয়াজ্জিনের সুমধুর কন্ঠে আজানের ধ্বনি। আবৃতি সদ্য গাঢ় হওয়া নিদ্রা ভঙ্গ করে বহু কসরত করে চোখের ভারী পল্লব পিটপিট করে খুলে তাকাল। ঘুমঘুম মস্তিস্ক পুরোপুরি সজাগ হতেই অনুভব করলো মাথা সহ পুরো মেয়েলি গতরে অসহ্য এক বিষ যন্ত্রণা ছড়িয়ে আছে। নিদ্রার ছোটে চোখদুটো ঢুলুঢুলু। রাত্তিরের শেষ প্রহরে একটু ঘুমিয়েছিল। তাই গাঢ় হয়ে এঁটে বসা চোখ দুটো খুলতে বেগ পোহাতে হচ্ছে আবৃতিকে। তবুও রোজকার অভ্যাসের তাড়নায় আজান শুনে আর ঘুমিয়ে থাকতে পারলনা। সহসা ব্যস্ত চিত্তে উঠতে নিল। বিধিবাম নিজেকে সুতোবিহীন আবিষ্কার করে ধড়ফড়িয়ে উঠল। রুদ্ধশ্বাসে ঐক্যের শরীর থেকে বেডসিটটা ছিনিয়ে নিজেকে ঢেকে নিল। ঐক্য একটু নড়েচড়ে পুনরায় ঘুমে তলিয়ে গেল। আবৃতি বড় বড় শ্বাস নির্গত করে। ভীষণ লজ্জার তোড়ে ফুলেফেঁপে উঠল খরগোশের ন্যায় আদুরে গালদুটো। এক অবর্ণনীয় রোমাঞ্চে শিহরিত হলো সমগ্র কায়া। আড়ষ্ট নজর তুলে পাশে তাকাল গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকা ঐক্যের দিকে। বেচারা দিন দুনিয়া ভুলে ঘুমাচ্ছে। আবৃতি আরক্তিম মুখে মুচকি হাসল। আলগোছে মাথাটা নামিয়ে বড্ড সাহস করে একটা ভেজা চুমু খেল ঐক্যের সিগারেট পোড়া কালচে ওষ্ঠে। ঐক্য ঠোঁট কুঁচকে নড়েচড়ে উঠল। আবৃতি তড়িৎ মেঝে থেকে শাড়িটা তুলে গায়ে জড়িয়ে ওয়াশরুমে ছোটে। এই লোকটার সামনে এই অবস্থায় পড়লে সেরেছে।

গোসল সেরে মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে বের হয়ে দেখে ঐক্য এখনো ভসভস করে ঘুমুচ্ছে। যেন সাত জন্মের ঘুম আজকেই ঘুমিয়ে নিচ্ছে। আবৃতির আর ইচ্ছে করলনা গভীর ঘুমটা ভাঙ্গিয়ে দিতে। তাই একা একাই নামাজ পড়ে নিল। নামাজ পড়া শেষে জায়নামাজটা ড্রয়ারে ভাজ করে রেখে আবৃতি পিছু ফিরতেই ভড়কে গেল। বিছানার হেডরেস্টে ঐক্য মাথা এলিয়ে নির্নিমেষ এদিকেই চেয়ে আছে। সহসা আবৃতি লজ্জায় আইঢাই করে উঠে। মাথা থেকে নামাজের হিজাবটা খুলে রেখে মৃদু স্বরে বললো,

— উঠে গিয়েছেন? তাহলে শাওয়ার নিয়ে নামাজটা পড়ে নিন বাসায়।

ঐক্য মনে হয়না শুনেছে। ও এখনো হা করে আবৃতিকে দেখছে। আবৃতি ঐক্যের এমন দৃষ্টি থেকে বাঁচতে কাজ করার বাহানায় এটা সেটা তুলছে, আবার রেখে দিচ্ছে।
আজকের সকালটার মতো সুন্দর দৃশ্য বিগত বছরে ঐক্যের জীবনে আসেনি। সদ্য ঘুম ভাঙ্গতেই একটা মোহনীয় দৃশ্যের সাক্ষী হলো ওর দুচোখ। ঘুম ভাঙ্গা লাল চোখে ঐক্য নিষ্পলক তাকিয়ে রইল আবৃতির আরক্তিম মুখ, কোমর ছুঁই ছুঁই ভেজা চুল আর পিটপিট করে নড়তে থাকা বড় বড় চোখের পাপড়ি। বড় ইচ্ছে হলো ওই পাপড়িগুলো হাত দিয়ে একটুখানি ছুঁয়ে দিতে। হালকা গোলাপিবর্ণের শাড়িটায় কি স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে তার বৌকে। ঐক্যের নেশাক্ত চাহনী নিজের শরীরে অনুভব হতেই আবৃতি হাঁসফাঁস করে উঠে লাজে। না তাকিয়েও বুঝতে পারল মানুষটার জ্বলজ্বলে দৃষ্টি স্থির ওর উপরেই। ঐক্যের এমন দৃষ্টি থেকে বাঁচতে আবৃতি কি করবে না করবে ভেবে হঠাৎ রুমে থাকা মিনি ফ্রিজটা খুললো। এতক্ষণ নেশাগ্রস্তের ন্যায় তাকিয়ে থাকা ঐক্যের সম্বিৎ ফিরে। ধড়ফড়িয়ে উঠে আবৃতিকে মানা করার সুযোগটাও পেলনা। এর আগেই যা হওয়ার হয়ে গেল।
ফ্রিজটা খুলতেই আবৃতির চক্ষু চড়কগাছ। পুরো ফ্রিজ ভরতি নামীদামী বিদেশী ব্র্যান্ডের মদের বোতল। ঐক্যের নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে হলো। এগুলো রুম থেকে সরাতে কিভাবে যেন ভুলে গিয়েছিল। এখন কি হবে? আবৃতি যদি রাগ করে ওর উপর? ও তো জানেনা ঐক্য কি পরিমাণ নেশাখোর৷ আবৃতির শান্ত মেজাজাটা চটে গেল সাজিয়ে রাখা এলকোহলের বোতল গুলো দেখে। এই লোকটা নেশা করে? সিগারেটের নেশা আছে এটা সম্পর্কে আবৃতি অবগত৷ কিন্তু এই লোক যে মদখোর সেটা তো জানা ছিলনা। ফ্রীজটার সামনে থেকে সরে আবৃতি সোজাসাপটা ঐক্যের দিকে ঠান্ডা চোখে তাকাল। বৌয়ের শানিত দৃষ্টি ঠাহর করে ঐক্য একটা শুষ্ক ঢোক গিলে। আবৃতি বাজখাঁই গলায় জিজ্ঞেস করে,

— আপনি যে পিওর মদখোর আগে জানতাম না তো?

ঐক্য মুখটা চোরের মতো করে মিনমিনিয়ে বললো,

— ওই মাঝে মাঝে একটু আকটু খাওয়া হয় এজ আ ড্রিকংস।

— ছিঃ আবার গর্ব করে বলছেন? এসব অখাদ্য গিলেই তো ঠোঁট দুটো এত কালো।

— তোমার চুমু খেতে ঘেন্না লেগেছে কাল?

হঠাৎ এই পরিস্থিতিতে এমন একটা প্রশ্নটা আবৃতি আশা করেনি। এক প্রকার বিষম খেল বেচারী৷ চোখ দুটো ধারণ করল প্রকট আকার। ও কি বুঝিয়েছে, আর এই লোক কি বুঝে নিয়েছে। একটা বিরক্তিকর নিঃশ্বাস ছেড়ে আবৃতি মদের চকচকে বোতল গুলো সব একে একে বের করতে লাগল। ঐক্য ধড়ফড় করে নেমে আসে বেড থেকে। আবৃতি ওকে দেখে কুন্ঠায় নুইয়ে যায়। ঐক্যের পরনে তখন কেবলমাত্র একটা ঢিলেঢালা শর্টস৷ ঐক্য ভয়ে ভয়ে শুধায়,

— এগুলো কি করবে তুমি?

আবৃতি ভাবলেশহীন গলায় বললো,

— আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে ফেলব।

ঐক্য চোখ বড় বড় করে বললো,

— কিহ? আবৃতি তুমি জানো এগুলো কত এক্সপেন্সসিভ?

আবৃতি নাক ফুলিয়ে বলে,

— জানতে চাইনা।আমি শুধু জানি এই অখাদ্যের বোতলগুলো আমার স্বামীর শরীরের জন্য হানিকর।

আবৃতি প্রবল অধিকার মিশিয়ে বললো। ঐক্য স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল আবৃতির নির্লিপ্ত মুখটায়। মেয়েটা এইমাত্র কি বললো? আমার স্বামী?

আবৃতি গজগজ করতে করতে বোতলগুলো সব রুমে থাকা বিনে ছুঁড়ে ছুঁয়ে ফেললো। ঐক্য বৌয়ের রণচণ্ডী রূপ দেখে আর মানা করার সাহস পেল না। অসহায় চোখে নিজের বহু বছরের সঙ্গী গুলোকে অবহেলায় ডাস্টবিনে ছুঁয়ে ফেলা দেখল।

**

সকাল ছয়টা। চৌধুরী ভিলার সবাইকে বেশ ব্যস্ত দেখাচ্ছে। অন্যসময় এই সময়টায় ভিলায় নিস্তব্ধতা বিরাজ করলেও আজ পরিবেশ ভিন্ন। কারণ আজ ঐক্য, আবৃতির রিসেপশন। ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখল ওয়াফা,আরশান পুরো হলরুমে ছোটাছুটি করছে। ওদের খিলখিল হিাসির শব্দ ঝংকার তুলছে পুরো বাড়িটায়। আবৃতি অবাক হলো ওদের এত তাড়াতাড়ি উঠে যেতে দেখে।অন্যদিন স্কুলের সময় হলে এরা ঘুম থেকে উঠতেই চায়না। কিন্তু আজ দেখ সাতসকালে নিজেরা নিজেরা উঠেই বাড়ি মাথায় তুলছে। আবৃতি স্মিত হেসে ধীর পায়ে মাথায় ঘোমটা টেনে রান্না ঘরের দিকে এগোয়। ভেতরে ঐক্যের বড় মামী কাকলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুয়াদের রান্নায় তদারকি করছিলেন সকালের নাস্তার জন্য। আবৃতি ইতস্ততভাবে সালাম দিল,

— আসসালামু আলাইকুম বড় মামুনি।

কাকলি ফিরে তাকালেন। দরজার সামনে হালকা গোলাপিবর্ণ শাড়ি পরনে মাথায় ঘোমটা টানা গোলগাল মিষ্টি চেহারার মেয়েটাকে দেখে ওনার চোখ জুড়িয়ে গেল। মনে মনে মাশাল্লাহ পড়ে নিলেন তিনি।গোলগাল, মিষ্টিমুখের আবৃতিকে ওনার খুব পছন্দ হয়েছে। ৷

— না ঐক্যর পছন্দের তারিফ করতেই হয়।

বিরবির করে বললেন তিনি৷

— আমি কিছু সাহায্য করব মামুনি?

আবৃতি নম্র স্বরে বললো। কাকলি সপ্রতিভ হলেন। ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটিয়ে বললেন,

— না মা তার দরকার নেই। খিচুড়িটা হয়ে গিয়েছে। আর মাংসের ঝোল আরেকটু গাঢ় হয়ে এলেই নামিয়ে ফেলব। তোমারই রান্নাঘর। সারাটা জীবন পড়ে আছে।

আবৃতি মুচকি হাসল। বললো,

— আমি আরশান, ওয়াফার জন্য এক প্লেট নিয়ে যাই?

— ওমা এটা জিজ্ঞেস করার কি আছে? তোমার বাচ্চাদের জন্য তুমি খাবার নেবে।

আবৃতি মৃদু হেসে একটা প্লেটে গরম গরম খিচুড়ি বেড়ে নিল। তারপর দুটো ডিম পোচ করে নিল।

— মাংস নেবে না?

— না, আসলে অতিরিক্ত তেল ঝাল খেয়ে ওরা হজম করতে পারবে না।

— হুম৷ ঠিকই বলেছ। বাচ্চা মানুষ এত ভারী খাবার হজমে সমস্যা হবে।

আবৃতি প্লেটটা নিয়ে চলে যেতেই রিমলা মুখ খুলে,

— খালাম্মা দেখছেন নতুন বৌ? যেমন মুখের ছিঁড়ি, তেমন আচার- ব্যবহার। কথা হুনলেই কলিজা ঠান্ডা হইয়া যায়। আর ঐক্য বাবার আগের বৌটা,বাপরে সারাদিন খালি চিল্লাপাল্লা করতো। কামে একটু উনিশ-বিশ হইলেই এত গাইল্লাতো বাবাগো বাবা।

কাকলি সায় মিলিয়ে বললেন,

— ঠিকই বলেছ। মেয়েটার বাচনভঙ্গি বেশ সাবলীল। আর দেখতেও বেশ। বৌ মানুষ একটু গোলগাল মিষ্টি আদলের না হলে চোখে আটকায় না। মাহিরার মতো অত লম্বা মেয়ে দেখতে ভাল লাগে না।

.

বাচ্চাদের ভরপেট খাইয়ে তৈরী করে দিয়ে আবৃতি রুমে আসল খাবার নিয়ে। ঐক্য তখন পুরোপুরি তৈরী হয়ে নিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শরীরে পারফিউম মাখছে। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট স্যুটে বেশ সুদর্শন দেখতে লাগছে বলিষ্ঠ গতরের দীর্ঘদেহী শ্যামবর্ণ ঐক্যকে। আয়নায় আবৃতিকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে ঐক্য ফিচেল হেসে বলে,

— মিসেস চৌধুরী? ভেতরে আসতে পারেন। এটা আপনারই কক্ষ।

আবৃতি হালকা চমকে উঠে। দ্রুত নিজেকে ধাতস্থ করে রুমে ঢুকে বললো,

— খাবারটা খেয়ে নিন। ঠান্ডা হয়ে যাবে।

আবৃতি ডিভানের সামনের সেন্টার টেবিলটায় খাবারের ট্রে টা রাখল। ঐক্য শার্টের হাতা গুটিয়ে ডিভানে বসল।

— তুমি খেয়েছ?

আবৃতি প্লেটে খাবার বাড়তে বাড়তে বললো,

— না। এখন খাব।

— দাঁড়াও।

আবৃতি হাত থামিয়ে অবুঝ চোখে তাকায়। ঐক্য বললো,

— এক প্লেটেই বাড়ো। একসাথে খেয়ে নিই।

আবৃতির চোখের ভারী পল্লব গুলো কেঁপে উঠে। ঢোক গিলে মৃদু কম্পমান হাতে প্লেটে বেশি করে খাবার বেড়ে নেয়।

— খাইয়ে দাও৷

— হ্যাঁ?

আবৃতি চমকে তাকায়। ঐক্য হালকা হেসে বলে,

— ওয়াফা, আরশান দেখি খুব মজা করে তোমার হাতে খাবার খায়। আমিও একটু দেখি আসলে তোমার হাতে খেতে কেমন?

স্বামীর আবদারে আবৃতি জোরপূর্বক হাতের কম্পন রুখে খিচুড়িতে মাংস মেখে ঐক্যের মুখের সামনে তুলে ধরে। ঐক্য হা করে খাবারটা গিলে নিল। খাবারটা চিবুতে চিবুতে বললো,

— উম, আসলেই এখন বুঝলাম আমার বাচ্চারা এত মজা করে তোমার হাতে খায় কেন? আসলেই অনেক টেস্ট বৌয়ের হাতের খেতে।

আবৃতি লজ্জায় লাল হয়ে খাবার মাখানোয় মনোযোগ দিল।

— তুমি খাচ্ছ না কেন।

আবৃতি নিজেও এক লোকমা মুখে তুলে বললো,

— খাচ্ছি।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঐক্য জুস খেতে খেতে বললো,

— এখানে দুটো লেহেঙ্গা আছে আবৃতি। তোমার যেইটা পছন্দ ওটা পরবে আজকে হু? একটু পর মেকআপ আর্টিস্ট আসবে তোমাকে সাজাতে।

আবৃতি দেখল বেডের উপরে দুটো লেহেঙ্গা রাখা। একটা গাঢ় ল্যাভেন্ডার আর একটা হালকা মেরুন রঙের লেহেঙ্গা বিছানার উপর মেলে রাখা। আবৃতি হাত কচলাতে কচলাতে বললো,

— আপনি একটা চুজ করে দিন না।

ঐক্য কিছুক্ষণ নিবিড় মনোযোগে লেহেঙ্গা দুটো দেখল। তারপর মেরুন রঙা লেহেঙ্গাটা হাতে ছুঁয়ে বললো,

— এটা পরবে।

আবৃতি আয়নার সামনে লেহেঙ্গাটা নিজের গায়ে ধরে বললো,

— এটা ভাল লাগবে?

আবৃতি জিজ্ঞেস করল। আসলে ও ঐক্যের এটেনশন চাইছে। প্রতিটা মেয়েই চায় তার স্বামী তার প্রতি একটু বেশিই নজর দিক। আবৃতি চকচকে চোখে আয়নায় ডিঙ্গিয়ে ঐক্যের দিকে চেয়ে আছে উত্তরের আশায়।
ঐক্য হঠাৎ ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ ঘষল আদুরে বেড়ালের মতন৷ আবৃতির মোমের মতো গালে এবার লজ্জার লাল আভা ফুটে উঠল। টসটসে মেদুর গালদুটো ফুলেফেঁপে উঠল। ঐক্য ঘোর লাগা কন্ঠে বিরবিরিয়ে বললো,

— এই দুনিয়ায় এমন কোন রঙ বা পোশাক নেই যে আমার বৌকে মানাবে না। তুমি এতটাই সুন্দর আবৃতি!

আবৃতি লজ্জায় আরক্তিম নত মুখে বললো,

— হুম, বেশি বেশি। আমি এতটাও সুন্দর না।

ঐক্য ওকে আরো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বললো,

— আফসোস। তোমাকে যদি বোঝাতে পারতাম আমি কতটা মুগ্ধ তোমার রূপে। তাহলে বুঝতে তুমি কতটা সুন্দর!

আবৃতি সলজ্জে মুচকি হাসে।

— ভাইয়া। ভাবিকে সাজাতে এসেছে। দেখি দরজা খোল।

ঐক্য চমকে উঠে। ওর হাতের বাঁধনে আবৃতি মুচড়ে উঠে,

— দেখি ছাড়ুন আমায়।

ঐক্য কপাল কুঁচকে বিরক্তিকর শ্বাস ছেড়ে বললো,

— উফ, এরা আমাকে শান্তিতে একটু রোম্যান্স করতেও দেবে না।

আবৃতি ঐক্যের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে,

— যান তো৷

ঐক্য আবৃতির কানে ফিসফিস করে বললো,

— এখন যাচ্ছি কিন্তু রাতে ছাই দিয়ে ধরব।

আবৃতির কানদুটো গরম হয়ে উঠে। ঐক্য গালে জিব ঠেকিয়ে হেসে হেলেঢুলে দরজা খুলে দেয়৷ দরজা খুলতেই ঐক্য দেখে ডজন খানিক মহিলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই মহিলা গুলো এক প্রকার আতঙ্ক ঐক্যের নিকট। ঐক্য হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়ে। বিয়ে শেষ, বাসর শেষ। কিন্তু এরা যেন লেজই ছাড়তে চাইছেনা। মনে বিরক্ত হলেও মুখে মেকি হাসি ঝুলিয়ে বললো,

— আপনারা?

ঐক্যর কাজিনের বৌ সরু গলায় বললো,

— ভাইয়া দিন দুপুরে দরজা আটকে আছেন? রাতে কি দু’জন বসে বসে মশা মেরেছেন?

সবাই ঠোঁট টিপে মিটিমিটি হাসল। ঐক্য যেন বিষম খেল। বুঝলো অতিসত্বর এখান থেকে কেটে পড়তে হবে। নাহয় যেটুকু মান-ইজ্জত বেঁচে আছে, সেটুকুও খোয়াতে হবে। ও মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,

— তোমরা যাও না। আবৃতি ভেতরেই আছে। আমি দেখে আসি বাচ্চারা কি করছে।

এই বলে ঐক্য একপ্রকার কেটে পড়ল। ওর যাওয়ার পানে অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল আবৃতি। এবার এরা আবৃতিকে চেপে ধরবে। অশ্লীল, অশ্লীল কথা বলে ওর কানের পোকা নাড়িয়ে ফেলবে। হলোও তাই আবৃতিকে চেইঞ্জ করতে গিয়ে কালচে বর্ণ ধারণ করা কামড়ের দাগগুলো দেখে ভাবি সমাজের একজন দুষ্ট হেসে বললো,

— কি ব্যাপার আবৃতি? তোমাদের রুমে কি বিড়াল আছে?

আবৃতি অবুঝ গলায় শুধাল,

— বিড়াল? কই নাতো। কেন ভাবি?

উনি রয়েসয়ে বললেন,

— না মানে তোমার শরীরে দেখি খামচির দাগ, কামড়ের দাগ। তাই ভাবলাম কোন বিড়াল কামড়ে দিয়েছে নাকি।

আবৃতির মাথাটা চক্কর কেটে উঠে। ইচ্ছে করছে এদের সামনে থেকে একছুটে পালিয়ে যেতে।

— আরে ভাবি এগুলোকে বলে কি জানি? ওহ লাভ মার্ক।

আবৃতি দুকান চেপে ধরে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠে,

— আল্লাহর দোহাই লাগে চুপ করুন আপনারা। একটু রেহাই দিন।

.

ঐশী লজ্জায় ফোনটা হাতে নিয়ে চলে গেল। বাগানে হাঁটতে হাঁটতে ভাবল ছিঃ ছিঃ এনারা কি বলছেন এসব? ওর বিয়ের পরও কি ওকে এসব ছিঃ মার্কা কথা শুনতে হবে? ভাবতেই ঐশীর কানদুটো কেঁপে ওঠে। ইশ ও তো লজ্জায় মরেই যাবে। ওর ভাবনার মধ্যেই দুটো হাত ওর নির্মেদ সরু কোমর আঁকড়ে চিলের মতো ছোঁ মেরে বাড়ির পেছন দিকটায় নিয়ে গেল। হঠাৎ আক্রমণে হতবিহ্বল ঐশী চিৎকার টুকু করারও সময় পেলনা৷ কম্পমান বক্ষে ভয়ে ভয়ে খিঁচে রাখা চোখ দুটো পিটপিট করে খুলতেই ওর সামনে একটা ঝাপসা অবয়ব এবার স্পষ্ট হয়। এই অবয়বটা ঐশীর সবচেয়ে নিরাপত্তার, ভালবাসার। যার কাছে থাকলে ঐশীর একচুলও বাঁকা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মানুষটা ওর ভালবাসা। ঐশী বড় বড় কয়েকটা শ্বাস টেনে নিয়ে বললো,

— এভাবে কেউ টেনে আনে? আমি কত ভয় পেয়েছিলাম।

আহান বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে ঐশীর আপাদমস্তক নজর বুলাল। একটা সি ব্লু কালারের সারারা পরনে। আহানের ওষ্ঠকোণে বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠে। ঐশী চোখ প্রকট হয়। ও আঁতকে উঠল একপ্রকার। এই লোকটা হাসছে কেন? ওকে কি জোকারের মতো দেখাচ্ছে?
খেয়াল করেছে কোন অনুষ্ঠানে যেখানে আহানের উপস্থিতি থাকবে সেখানে ঐশী সবসময় আহানের পছন্দের রঙটাই নিজের শরীরে জড়াবে। আহান মনে মনে তৃপ্ত হলো এই ভেবে হাজারো প্রবঞ্চকের ভিড়ে ও সঠিক মানুষটিকেই পেয়েছে। ঐশী অস্থির চিত্তে বললো,

— আমাকে কি সুন্দর লাগছেনা?

আহান দু’পাশে মাথা নাড়াল। ঐশী আপাদমস্তক নিজেকে দেখে কাঁদোকাঁদো স্বরে বললো,

— কেন কি সমস্যা? আমি তো বেশি মেকআপও করিনি।

আহান ঠোঁট কামড়ে হেসে ঐশীর কাঁধ আঁকড়ে ধরে হেঁচকা টান মারে। অতর্কিতে ঐশী আহানের বুকে এসে পড়ে। হঠাৎ ঐশীর পুরো শরীরটা তিরতির করে কেঁপে উঠে আহানের এহেন গভীর স্পর্শে। আহান একহাত ঐশীর কোমরে জড়িয়ে আরেকহাতে ঐশীর রক্তিম মেদুর গালে স্লাইড করে নেশাক্ত দৃষ্টি ফেলে ফিসফিসিয়ে বলে,

— তোমাকে এত বাজে দেখাচ্ছে যে ইচ্ছে করছে টুপ করে খেয়ে ফেলি৷

ঐশী লজ্জায় আইঢাই করে উঠে। তুতলে বলে,

— প্লি..জ ছা..ড়ুন আহান।

— কেন ছাড়ব?

— কেউ দেখে ফেলবে।

— দেখলে কি হবে?

ঐশী অসহায় গলায় বলে,

— আমরা এখনো বিয়ে করিনি।

— তো আমি তো দু’পায়ে তৈরী৷ তোমার ওই খচ্চর ভাইটা তো নিজে আমার বোনকে বিয়ে করে নিয়েছে। কিন্তু আমাকে নিজের বোন দিচ্ছে না।

ঐশী আনত মুখে ঠোঁট টিপে হাসে। ওরা নিজেদের মধ্যে এতটাই বিভোর ছিল যে, কেউ একজন অগ্নিদৃষ্টিতে ওদের দেখছে খেয়াল-ই করলোনা দু’জনে।

— মাম্মাম? দরজা খোল মাম্মাম?

মেক-আপ আর্টিস্ট আবৃতির মাথায় দোপাট্টাটা সেট করছিল। আপাতত রুমে কেউ এলাউড না। কিন্তু বন্ধ দরজার বাইরে ওর ছানাদের হাঁকডাকে আর টেকা গেলনা৷ সহসা আবৃতি অনুরোধের স্বরে বললো,

— আপু, প্লিজ ওদের ঢুকতে দিন

— ম্যাম আপনার সাজ অলমোস্ট কম্প্লিট।

— না প্লিজ। ওরা কেঁদে ফেলবে।

— আচ্ছা মলি দরজা খুলে দে।

পাশের হেল্পার আর্টিস্ট উঠে দরজা খুলে দিতেই একপ্রকার হুড়মুড় করে ঢুকল ওয়াফা, আরশান। আবৃতি ওদের দেখে মুচকি হাসল। ওয়াফা, আরশান তাদের মাম্মাকে দেখে চকচক চোখে বললো,

— মাম্মাম? ইউ লুকিং সো প্রিটি৷

রুমের সবাই মুচকি হাসল ওদের পাকা পাকা কথায়। আবৃতি ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটিয়ে ওদের কাছে ডাকল। ওরা ছুটে আসতেই আবৃতি দুজনকে জড়িয়ে কপালে সস্নেহে চুমু খেল।

— আমার কলিজাদেরও খুব খুব প্রিটি দেখতে লাগছে মাশাল্লাহ৷

— কই আমার মেয়ে আর নাতি নাতনি কই?

চেনা পরিচিত,পরম আপন কন্ঠটি কর্ণধার হতেই আবৃতি সপ্রতিভ হল৷ নিজের মাকে হাসিমুখে রুমে ঢুকতে দেখে আবৃতির চোখ জোড়া ছলছল করে উঠে। মাত্র একদিন হয়েছে মা নামক মমতাময়ীকে ছেড়ে আসার। কিন্তু আবৃতির কাছে মনে হচ্ছে সহস্র যুগ পার হয়েছে। আবৃতি সব সাজগোছ ছেড়ে ফেলে ছুটে গিয়ে জাহানারার বুকে আছড়ে পড়ে ফুফিয়ে উঠে। জাহানারা মেয়েকে বুকে আগলে ধরা গলায় বললেন,

— কেমন আছিস মা?

আবৃতি অশ্রুসিক্ত স্বরে বলে,

— জানিনা মা৷ একদিকে নতুন করে সব ফিরে পাওয়ার সুখ, অন্যদিকে তোমাকে ছেড়ে আসার দুঃখ। মেয়েদের জীবন এমন কেন মা?

জাহানারা চোখ মুছে মেয়েকে বুক থেকে তুলে বললেন,

— এটাই মেয়েদের প্রকৃত জীবন মা৷ আল্লাহ মেয়েদের
তৈরী করেছেন ত্যাগের মূর্ত প্রতিক হিসেবে।

— আর এই ত্যাগেই কিন্তু নারী জীবন মহিমান্বিত।

রুমে ঢুকতে ঢুকতে দারাজ গলায় বললেন জোবায়দা চৌধুরী। জাহানারা চোখের পানি মুছে বললেন,

— আসুন আপা৷

জোবায়দা চৌধুরীর হাতে একটা গহনার বাক্স। জাহানারা নাতি-নাতনীদের আদর করে বিছানা বসলেন। জোবায়দা চৌধুরী বাক্সটা খুলে বিছানায় রাখলেন। একটা সোনার হার জ্বলজ্বল করছে সেখানে। জোবায়দা চৌধুরী বললেন,

— দেখো তো মা পছন্দ হয়েছে কিনা? এটা আজকে পরবে তুমি। আমার তরফ থেকে তোমার জন্য তোহফা।

আবৃতি নম্র স্বরে বললো,

— আম্মু। এসবের কি প্রয়োজন। এতগুলো জুয়েলারী আমি কখন পরব?

আবৃতির মুখে আম্মু ডাকটা এত মধুর শুনতে লাগল। প্রকৃত অর্থেই আজ ওনার নিজেকে শাশুড়ী মনে হচ্ছে। মাহিরা সবসময় ওনাকে আন্টি আন্টি ডাকত। কয়েকবার আম্মু ডাকতে বলার পরেও মাহিরা কর্ণপাত করেনি। কিন্তু এই একদিনেই মেয়েটা ওনাকে কত অকপটে আম্মু ডাকছে। মনে হচ্ছে ঐক্য, ঐশীর মতো মেয়েটাও ওনার আরেকটা সন্তান। জোবায়দা চৌধুরী গলা ঝাড়লেন,

— অলংকার নারীর সৌন্দর্যের প্রতিক মা। আমার এতগুলো গহনা আলমারীতে পড়ে থেকে কি করবে? এগুলো আমার ঘরের বৌয়ের গলায়ই শোভা পায়।

এই বলে গহনাগুলো নিজের হাতেই উনি আবৃতিকে পড়িয়ে দিলেন। ওয়াফা, আরশান নানুমনির কোলে বসে বিমোহিত ডাগরডাগর চোখে তাকিয়ে দেখছে সেজেগুজে পুতুল বনে যাওয়া তাদের মাম্মামকে।

— মাশাল্লাহ, কারো নজর না লাগুক।

— ভাবি আসো। আউটডোর ফটোস্যুট করতে হবে।

ঐশী চপল পায়ে রুমে ঢুকে বললো। ওয়াফা, আরশান তটস্থ ভঙ্গিতে আবৃতির দুহাত আঁকড়ে ধরল। ঐশীকে দিলনা ধরতে। সবাই শব্দ করে হাসল।

হলরুম ইতোমধ্যে জমে উঠেছে নানা অতিথিদের সরগরমে। ঐক্যের বিজনেস ক্লাইন্ট থেকে শুরু করে বেশ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ওদের রিসেপশনে। একজন সাকসেসফুল বিজনেসম্যান হওয়ার সুবাদে মিডিয়ার লোকজনের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ঐক্য পকেটে হাত গুঁজে ওর একজন পার্টনারের সাথে কথা বলছিল। হঠাৎ হলরুমের লাইটগুলো সব নিভে গেল। সবার সাথে সাথে ঐক্যের নজর তরিৎ স্থির হয় সিঁড়ির কাছে জ্বলে উঠা স্পট লাইট বরাবর। ওয়াফা,আরশান প্রফুল্ল মুখে আবৃতির দুহাত আঁকড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে । ঐক্যের দৃষ্টিতে যেন গোটা পৃথিবীর শীতলতা ভর করল দৃশ্যটা দেখে। জীবনে কখনো ভেবেছিল এমন সুন্দর একটা দৃশ্যের সম্মুখীন ও হবে? গাঢ় মেরুন রঙা লেহেঙ্গাটায় আবৃতিকে দেখে ঐক্য মনে হয় দুটো হার্টবিট মিস করল৷ বৌয়ের মাত্রারিক্ত সৌন্দর্যে ওর বুকে আরেকবার চিনচিনে ব্যাথা জাগল। পাশ থেকে রাদ কনুই দিয়ে গুঁতো মারল,

— ভাই, যা ভাবিকে এগিয়ে আন৷ পরে ভ্যাবলাকান্তের মতো হা করে চেয়ে থাকিস।

বন্ধুর গুঁতো খেয়ে ঐক্যের চৈতন্য ফিরে। গলা খাঁকারি দিয়ে সিঁড়ির কাছে এগিয়ে এসে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয় আবৃতির দিকে। আবৃতি আনত চোখ যুগল তুলে এক পলক ঐক্যকে দেখল। তারপর নিজের হাতটা রাখে ঐক্যের হাতে৷ আহান ফটোগ্রাফারের মাথায় চাটি মেরে ক্যামেরাটা ছিনিয়ে নেয়,

— ভাই ছবি তুলছেন না কেন? দেখছেন না কি সুন্দর একটা সিনারি?

আহান নিজেই এই অবস্থায় ওদের কয়েকটা ছবি তুললো। স্টেজে উঠেও ঐক্য সম্মোহনী দৃষ্টিতে আবৃতির আগাগোড়া নজর বুলাল।

— আরে ভাইয়া এদিকে ক্যামেরার দিকে তাকান। বৌকে পরেও দেখতে পারবেন।

আবৃতি লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিল। ওর এবার কান্না পাচ্ছে। আর কত লজ্জায় পড়তে হবে? ঐক্য বিব্রত হয়ে গলা ঝেড়ে ক্যামেরার দিকে তাকাল। আবৃতি দাঁতে দাঁত চেপে চাপা গলায় বললো,

— আপনাকে আমি দেখে নেব। আপনার জন্য কাল থেকে আমাকে লজ্জায় লজ্জায় খাবি খেতে হচ্ছে।

বেচারা ঐক্য বুঝলনা বৌ তার রাগ করেছে কেন?

চলমান……

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x