পর্ব:০২
লেখা – আসফিয়া রহমান
অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
৪.
ফোনের অনবরত কর্কশ রিংটোনে ঘুমটা ছুটে গেল শুভর। বিরক্ত হয়ে কলটা রিসিভ করল ও,
— হ্যালো!
— আমার কল ধরছো না কেন বেইব?
শুভ্র বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ করল,
— কটা বাজে দেখেছো? ঘুমোতেও দেবে না নাকি!
— নটা বাজে। এখনো ঘুমাচ্ছ তুমি?
— হ্যাঁ ঘুমাচ্ছি! আজকে যে শুক্রবার সেটা ভুলে গেছো?
— না ভুলিনি। আজকে বিকালে আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে শুভ্র?
— না! কাজ আছে আমার…
— শুক্রবারে কী কাজ তোমার? আজকে তো অফিস বন্ধ!
— অফিস ছাড়াও আমার আরো কাজ আছে তমা। ডিস্টার্ব করোনা তো! ঘুমাতে দাও…
তমা আর কিছু বলার আগেই কলটা কেটে দিল শুভ্র। উফ্! ছুটির দিনটাতেও শান্তি নেই। সাত সকালে জ্বালানোর জন্য ফোন দিয়েছে!
বালিশে মুখ গুজে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করল শুভ্র। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আর ঘুম এলো না।
ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসতেই দেখল ওর বাবা আজিজ সাহেব চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছেন।
“কি ব্যাপার আজকে তুমি এত সকাল সকাল?”
বাবার খোঁচাটা গায়ে না মেখে শুভ্র রান্নাঘরে গেল মাকে খুঁজতে।
“আম্মু…”
“কিরে উঠে পড়েছিস! কফি দেবো?”
“হ্যাঁ…”
পেছন থেকে সোনালী বেগমকে জড়িয়ে ধরল শুভ্র।
সোনালী বেগম হাসলেন, “কি ব্যাপার? আমার ছেলেটা আজকে সকাল সকাল বাচ্চামো করছে যে…?”
“বড় হতে ইচ্ছে করে না আম্মু… ছোটবেলাই ভালো ছিল।”
সোনালী বেগম ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শোনো ছেলের কথা! বিয়ে করার বয়স হয়ে গেছে, কদিন পরে নিজেই বাচ্চার বাপ হয়ে যাবি আর এখন বলছিস নিজেই বাচ্চা হয়ে থাকতে চাস!”
“ও আর ওর বাচ্চা দুটোকেই ওর বউ একসাথে পালবে, সমস্যা কী?” আজিজ সাহেব ফোড়ন কাটলেন মাঝখানে।
“কোনো সমস্যা নেই!” মাকে ছেড়ে শুভ্র টেবিলে এসে বসলো, “আমার বউয়ের যদি সমস্যা না থাকে তাহলে আর কার কী সমস্যা!”
আজিজ সাহেব গম্ভীর মুখ করে খবরের কাগজ ভাঁজ করে রাখলেন, “বউ কোথায় পাবে? তোমার মাকে মেয়ে দেখতে বলেছ?”
শুভ্র কফিতে চুমুক দিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল,
“না…”
সোনালী বেগম কফির মগ শুভ্রর সামনে দিয়ে বললেন,
“ভাবছি মেয়ে দেখা শুরু করব। বয়স তো কম হলো না! কবে পর্যন্ত শুধু ঘুমাবে আর অফিস করবে?
শুভ্র বিরক্ত হলো এবার, “আম্মু, সকাল সকাল আবার এসব বিয়ে-শাদী নিয়ে পড়লে কেন! বিয়েটা কি পড়াশোনার মতো? সময়মতো পরীক্ষা দিতে হবে?”
আজিজ সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “পড়াশোনার মতো না হলেও দায়িত্ব তো বটেই! সময়মতো না করলে পরে অনেক ঝামেলা, বুঝলে?”
শুভ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “দায়িত্ব, দায়িত্ব… সবকিছুতেই শুধু দায়িত্ব! আমি কি রোবট নাকি?”
সোনালী বেগম মুচকি হেসে ছেলের দিকে তাকালেন, “বিয়ের নাম শুনলেই তোর ব্যাটারি ডাউন হয়ে যায়, শুভ্র?”
শুভ্র গম্ভীর মুখে কফিতে চুমুক দিলো, “এখনই তো ছুটির দিনেও শান্তিতে ঘুম জোটে না! সকাল সকাল ফোন দিয়ে একজন ঘুম ভেঙে দিল, এখন আবার তোমরা…!”
আজিজ সাহেব ভ্রু উঁচিয়ে তাকালেন,
“কে ফোন দিয়েছিল?”
শুভ্র একটু কেশে এড়িয়ে গেল,
“কেউ না… অফিসেরই কল।”
সোনালী বেগম সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেললেন,
“শুক্রবারে আবার অফিস থেকে কল করে নাকি? কে মেয়েটা, নাম বল দেখি!”
শুভ্র চুপ করে রইল। এরই মধ্যে টেবিলে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠল— “তমা কলিং…”
আজিজ সাহেব ও সোনালী বেগম দু’জনেই একসাথে বলে উঠলেন, “ওহ্, এই হলো সেই ‘অফিসের কল’?”
শুভ্র মাথায় হাত দিয়ে বিড়বিড় করল,
“একেই বলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা…”
তারপর ফোনটা হাতে তুলে বিরক্ত মুখে বলল, “সকাল সকাল তোমরা আমার পিছে পড়লে কেন বলতো!”
আজিজ সাহেব হাসি চেপে বললেন, “আচ্ছা, এখন ধরো না ফোনটা! শুনি অফিসে কোন সমস্যা হয়েছে নাকি…”
শুভ্র ফোনটা সাইলেন্ট করে টেবিলে উল্টো করে রাখল, “ধরতে ইচ্ছে করছে না, একটু শান্তিতে কফি খেতে দাও তো!”
আজিজ সাহেব গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন,
“হুম্, ফোন না ধরলে পরে কিন্তু অফিস… মানে তমা… আরও রাগ করবে!”
শুভ্র বিরক্ত হয়ে চোখ বড় বড় করল, “আব্বু! প্লিজ!”
সোনালী বেগম হেসে উঠলেন, “আরে, আমরা কিছু বলিনি তো! কিন্তু মা হিসেবে আমার অধিকার আছে জানার, কে বারবার কল দিচ্ছে আমার ছেলেকে।
ঠিক তখনই ফোনটা আবার কেঁপে উঠলো। শুভ্র ফোনটা উল্টে দেখল এবারো স্ক্রিনে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে— “তমা কলিং…”
আজিজ সাহেব খোঁচা মারলেন, “এবার না ধরলে মনে হয় বাড়িতেই চলে আসবে!”
শুভ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করল, “একদম সিনেমার ভিলেনের মতো হয়ে গেছো তোমরা…”
ফোনটা হাতে তুলে অবশেষে রিসিভ করল শুভ্র।
— হ্যালো…
ওপাশ থেকে তমার ক্ষিপ্ত গলা,
— এতক্ষণে ফোন ধরলে? কী করছো তুমি? তখন ওভাবে কল কেটে দিলে কেন?
শুভ্র এক চোখে বাবা-মাকে আরেক চোখে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে ফেঁসে গেল একেবারে। ও গম্ভীর গলায় বলল,
— তোমাকে না বললাম আমি ঘুমাচ্ছি, ডিস্টার্ব কোরো না। আবার কল দিয়েছো কেন?
— তুমি কি আবার আমাকে ইগনোর করছো, শুভ্র?
শুভ্র এক হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরল,
— প্লিজ তমা…
সামনে বসে থাকা বাবা-মার দিকে তাকালো ও। আজিজ সাহেব কাগজে মুখ গুঁজে রেখেছেন। আর সোনালী বেগম কান খাড়া করে রেখেছেন এদিকেই। শুভ্র গলা নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,
— ইগনোরের কথা আসছে কোথা থেকে! আমি আসলেই ঘুমাচ্ছিলাম!
আজিজ সাহেব জোরে কেশে উঠলেন এবার।
শুভ্রর মুখ লাল হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ফোনটা কানে চেপে উঠে দাঁড়াল ও, তাড়াহুড়ো করে চলে গেল বারান্দায়।
৫.
অনিন্দিতার প্রতিদিন তাড়াতাড়ি ওঠার অভ্যাস। কিন্তু আজ এখনো মেয়েটা ওঠেনি দেখে রাবেয়া বেগম মেয়ের ঘরে এলেন ডাকতে। গালে হাত স্পর্শ করতেই চমকে উঠলেন তিনি। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। তড়িঘড়ি করে জলপট্টি দেবার ব্যবস্থা করলেন। ওষুধের বক্স খুজে দেখলেন জ্বরের ঔষধ নেই। ছোট ছেলে অর্ককে পাঠালেন ফার্মেসিতে থেকে ঔষুধ আনতে।
অর্ক ঔষধ আনতে আনতে অনিন্দিতাকে ডেকে তুললেন তিনি। কিছু না খেয়ে তো ঔষধ খাওয়া যাবে না। জলপট্টি দিয়ে গায়ের তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে। অনিন্দিতাকে খাইয়ে দিতে দিতে রাবেয়া বেগম জিজ্ঞেস করলেন, “কালকে ভিজলি কি করে বলতো? যাওয়ার সময় বারবার বললাম ছাতাটা নিয়ে যা, কথা তো শুনিস না একটাও!”
“যাওয়ার সময় তো আকাশ খারাপ ছিল না। শুধু শুধু ছাতা নেব কেন!” খেতে খেতে জবাব দিল ও।
তারপর আবার বলল, “মা, আমার ডান পায়ের নুপুরটা হারিয়ে গেছে…”
“কি করে হারালো?”
“জানি না। যাবার সময়ও তো ছিল… রাতে বাসায় এসে দেখি নেই। কোথাও পড়ে গেছে মনে হয়…” অনিন্দিতা ঠোঁট উল্টালো।
“প্রীতিকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিস, ওর বাসা পড়েছে কিনা?”
“না, এটা তো মাথাতেই আসেনি! আচ্ছা, আমি জিজ্ঞেস করবো।”
খাওয়া শেষ হতে হতেই অর্ক ঔষধ নিয়ে এলো, “আপু, তোমার ঔষধ…”
ঔষধটা খেয়ে অনিন্দিতা আবার শুয়ে পড়ল। মাথা ব্যথা করছে। রবিবারে ভার্সিটিতে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেবার ডেট আছে। সেগুলো শেষ করতে আবার ওর আরেক বান্ধবী ইরার বাসায় যেতে হবে। প্রীতিও আসবে সেখানে। তখনই বরং প্রীতিকে জিজ্ঞেস করা যাবে নুপুরটা ও পেয়েছে কিনা।
৬.
বিকেল নাগাদ কিছুটা সুস্থ বোধ করতেই অনিন্দিতা ইরার বাসার দিকে বেরোল।
দু’বার বেল বাজতেই ইরা দরজা খুলল। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, “ওহো! অসুস্থ মেয়েও চলে এলো! সত্যিই তোমার ডেডিকেশন দেখে অবাক হই।”
অনিন্দিতা হাসল, “আরে, অ্যাসাইনমেন্ট না দিলে স্যার রেহাই দেবে? জ্বর-টর ওনার কাছে কোনো অজুহাতই না! তাছাড়া এমনিতেও জ্বরটা কেটে গেছে। তবে মাথা ধরেছে।”
“তাহলে তোকে আগে গরম চা খাওয়াবো, তারপর অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বসবি।” বলে ইরা টেনে ভেতরে নিল ওকে।
ঘরের ভেতরে যেতেই দেখা গেল প্রীতি বসে আছে বই নিয়ে। মাথা তুলে অনিন্দিতাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকালো,
“অসুস্থ শরীরে না আসলে চলছিল না? কারো একটা কথা যদি তুমি শোনো! কাল কত করে বললাম, অনু গাড়িটা নিয়ে যা, কোন কথাই শুনলো না সে! হনহন করে বেরিয়ে গেল! শেষে কি হলো? বৃষ্টির মধ্যে পড়ে জ্বর বাঁধিয়ে বসলেন।”
অনিন্দিতা হাসলো, “এসে থেকে দম নেবার সুযোগও দিবি না নাকি! এসে এখনো বসতে পারলাম না, আর তোর অভিযোগের লিস্ট শুরু হয়ে গেছে…”
ইরা ওদের দুজনার দিকে তাকালো, “প্রীতি, ওকে অন্তত বসতে তো দে! বেচারার শরীর ভালো না।”
তিনজনেই গোল হয়ে বসল ওরা। টেবিলের উপর বই, নোট আর ল্যাপটপ ছড়ানো। ইরা ট্রেতে ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এলো।
প্রীতি চায়ে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “কিরে, তোর আরেক পায়ের নুপুর কই?”
অনিন্দিতা মুখ কুঁচকে বলল,”হারিয়ে গেছে! কাল রাতে বাসায় এসে দেখি নেই।”
প্রীতি ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবল, “গতকাল যখন আমার বাসা থেকে বের হচ্ছিলি তখন তো দেখলাম তোর পায়ে ছিল। পরে রাস্তায় পড়ে গেছে নাকি?”
“তাই বোধহয়…”
ইরা হেসে বলল, “বাহ! এত দামি জিনিসটা হারাল মুখে এতটুকু দুঃখ নেই দেখি!”
অনিন্দিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ” দুঃখ নেই কে বলল… কিন্তু এখন মাথা ব্যথা করছে ভীষণ, তাই ওটা নিয়ে বেশি ভাবতে পারছি না।”
ইরা অনিন্দিতার কপালে হাত রেখে ভ্রু কুঁচকাল, “আরে, এখনো তো জ্বর আছে! অথচ তুই এসেই আবার পড়াশোনা করতে চাইছিস!”
ইরার কথা শুনে প্রীতিও কপালে হাত রেখে দেখল সত্যিই জ্বর আছে। ও মুখ গম্ভীর করে বলল, “অনু, তোর জ্বর এখনো পুরোপুরি যায়নি। এটা নিয়ে পড়তে বসলে অবস্থা আরও খারাপ হবে।”
অনিন্দিতা হেসে মাথা নাড়ল, “আরেহ্, এমন জ্বর নিয়ে আমি অসুস্থ হই না। একটু মাথা ধরেছে, এর জন্যই এমন লাগছে।”
ইরা বিরক্ত হয়ে ট্রে নামিয়ে রাখল, “সবসময় জেদ করবি না তো অনু! তোকে বলেছি রেস্ট নিতে, তুই রেস্ট নিবি ব্যাস! আয় আমার সাথে…”
প্রীতিও যোগ করল, “একদম ঠিক বলছে ইরা। কাল কথা না শুনেই এমন জ্বর বাধিয়েছিস, আজ আবার সেই একই কান্ড করতে চাইছিস?”
অনিন্দিতা এবার বিরক্ত স্বরে বলল, “আরে কী শুরু করলি তোরা! আমি ঠিক আছি। অ্যাসাইনমেন্টটা শেষ করি, তারপর যা ইচ্ছা করবি।”
ইরা ওর হাত টেনে দাঁড় করালো। প্রীতিও দেরি করল না। উঠে দাঁড়িয়ে অনিন্দিতার ব্যাগটা তুলে নিল,
“চল, গেস্ট রুমে।”
অনিন্দিতা ভ্রু কুঁচকালো, “আরে, এ তো দেখছি আচ্ছা জ্বালা হলো! আমাকে আইসোলেশনে পাঠাতে চাইছিস তোরা?”
ইরা হাসল এবার, “আইসোলেশন না, রেস্ট! তুই এক্ষুনি গিয়ে শুয়ে পড়বি, বাকিটা আমরা সামলে নেব। নো চাপ!”
তারপর আর সময় নষ্ট না করে অনিন্দিতার হাত ধরে গেস্ট রুমের দিকে নিয়ে গেল। অনিন্দিতা ওদের দিকে তাকিয়ে অসহায় দৃষ্টি দিল, “তোরা দেখি সত্যিই আমাকে সিরিয়াস রোগী বানিয়ে ফেললি…”
গেস্ট রুমে এসে অনিন্দিতা বিছানায় শুয়ে পড়ল। মাথা ভারী হয়ে আছে, চোখ আধো বুজে আসছে। ইরা কম্বল টেনে দিল ওর গায়ে।
প্রীতি বলল, “শোন, আমরা ওই রুমে আছি। দরকার হলে কল দিস। তবে এখন একটুও নড়াচড়া করবি না।”
অনিন্দিতা হালকা গলায় বিড়বিড় করল, “তোরা না বুঝেই আমাকে জোর করছিস…” বলেই চোখ বুজে ফেলল ও, মাথাব্যথায় চোখ খুলে রাখা যেন দায় হয়ে পড়েছে।
৭.
কলিংবেল টিপতেই ভেতর থেকে পায়ের শব্দ এলো। মুহূর্ত পরেই দরজা খুললেন সুস্মিতা বেগম।
“আরে! শুভ্র! তুই?”
শুভ্র মৃদু হাসল, “কেমন আছো খালামনি? আম্মু পাঠালো আমাকে… এই যে ধরো, কি কি জানি হাবিজাবি পাঠিয়েছে তোমার বোন…”
“তোর মাকে আর কী বলবো! এসব না করলে তো ভদ্রমহিলা আবার শান্তি পান না! ভেতরে আয় তুই…”
শুভ্রর হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে সুস্মিতা বেগম ভেতরে গেলেন।
শুভ্র ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “এই বর্ষাতেও গরম কমছে না! আবহাওয়াও তিড়িং বিড়িং শুরু করেছে, উফ্!খালামণি আমি ফ্রেশ হতে যাচ্ছি… টুকটুকি কই?”
“ওর বান্ধবীরা এসেছে। সেখানে ব্যস্ত। তুই ফ্রেশ হ আগে…”
শুভ্র মাথা নেড়ে গেস্ট রুমের দিকে এগোল। কিন্তু দরজা ঠেলে ভেতরে পা দিতেই ভূত দেখার মত চমকে উঠলো ও। ও কি ভুলে অন্য কোথাও চলে এসেছে নাকি?
ভুল রুমে ঢুকে পড়েছে ভেবে দরজার দিকে ফিরতেই থেমে গেল ও। ঠিকই তো আছে! এটা তো খালামনিরই গেস্ট রুম।
তাহলে এই মেয়ে এখানে কোথা থেকে এলো? ভ্রু কুঁচকে গেল ওর। বিছানায় শুয়ে থাকা মুখটা চিনতে একটুও অসুবিধা হলো না।
“এটা তো সেই মেয়েটা! কাল রাতে ওর সাথে বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিল…”
শুভ্র অবাক হয়ে কিছুক্ষণ দরজাতেই দাঁড়িয়ে রইল। অনিন্দিতা তখন গভীর ঘুমে। শুভ্র পা টিপে টিপে বিছানার দিকে এগোলো। কাল রাতে মেয়েটাকে দেখে কেমন রাগী রাগী মনে হয়েছিল। এখন ঘুমন্ত অবস্থায় একটা ছোট্ট বাচ্চার মত লাগছে। ফর্সা নাকের ডগাটা লাল হয়ে আছে। মেয়েটার চোখের পাপড়িগুলো বেশ বড়।
শুভ্র অবচেতনে একটু ঝুঁকে তাকাল, নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল ওর, “কাল কেমন কঠিন গলায় কথা বলছিল, আর এখন দেখো! মুখে কাঠিন্যের কোনো ভাব নেই। একেবারে নিরীহ বাচ্চা।”
শুভ্রর চোখ কিছুক্ষণ আটকে রইল অনিন্দিতার মুখে।হাতটা অজান্তেই এগিয়ে গেল নাকের ডগায় লালচে রঙটা ছুঁয়ে দেখতে।
পিটপিট করে লাল চোখ মেলে তাকালো মেয়েটা। শুভ্র চমকে উঠে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
অনিন্দিতার চোখ লাল হয়ে আছে। জ্বরের ঘোরে আধভাঙা দৃষ্টিটা সরাসরি পড়ল শুভ্রর মুখে। ওর ঠোঁট নড়ে উঠল ফিসফিসে স্বরে, “আব্বু… তুমি এসেছো?”
শুভ্র ভ্রু কুঁচকালো। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল কিছুক্ষণ, “কী… কী বলছো তুমি?”
অনিন্দিতা ধীরে ধীরে কম্বলের নিচ থেকে হাতটা বাড়াল,
“মাথায় হাত বুলিয়ে দাও না আব্বু… ছোটবেলায় যেমন দিতে…”
শুভ্র হতভম্ব হয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। অনিন্দিতা আবার ডাকলো, “দেবে না, আব্বু?”
মেয়েটার কণ্ঠের অসহায় শূন্যতাটা উপেক্ষা করা কঠিন। বিছানায় বসে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ওর মাথায় হাত রাখল শুভ্র। আঙুলগুলো আলতো করে চুলে বুলিয়ে দিল।
অনিন্দিতা চোখ বন্ধ করে ফেলল তৎক্ষণাৎ। ঠোঁট নড়ল কাঁপতে কাঁপতে, “জানো আব্বু… তোমার দেওয়া নূপুরটা না… আমি… হারিয়ে ফেলেছি। খুঁজে পাচ্ছি না… তুমি কি রাগ করবে?”
কথাগুলো বলতে গিয়ে বন্ধ চোখের কার্নিশ বেয়ে জল গড়ালো মেয়েটার। শুভ্র এবার পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে চোখের জলটা মুছে দেয়ার আগেই আবার লাল চোখ মেলে তাকালো মেয়েটা।
“বলো না, তুমি রাগ করলে?”
শুভ্র দুদিকে মাথা নাড়ল। বোঝালো ও রাগ করেনি। অনিন্দিতা এবার ঠোঁট উল্টালো, “তাহলে তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরছো না কেন?”
শুভ্র এবার চোখ বড় বড় করে তাকালো। গলা শুকিয়ে এলো ওর। এ মেয়ে তো নিজের অজান্তেই সর্বনাশের খেলায় নেমেছে। নিজেও মরবে সাথে শুভ্রকেও মারবে!
অনিন্দিতা এখনো ঠোঁট উল্টে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে শুভ্র যদি ওকে এখন এই মুহূর্তে জড়িয়ে না ধরে তাহলে বাচ্চাদের মতো ভ্যা করে কেঁদে ফেলবে।
শুভ্র একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল, হাতটা অগোচরেই মুঠো হয়ে গেল ওর। কী করবে কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারল না। কীসের মধ্যে ফেঁসে গেল ও! ওর কি এখন খালামনি বা ইরাকে ডাকা উচিত?
To be continued…?
শুভ্র এখন কি করবে গাইজ? 🤔
গল্পটা কি আপনাদের ভালো লাগছে না? কোন রেসপন্স পাচ্ছি না আপনাদের তরফ থেকে! 🙂