লেখিকা:রাহি চৌধুরী তোহা
পর্ব :১১
খান বাড়ির সকাল টা আজ অন্য রকম।
ব্যস্ততার মধ্যে কাটে এই সকাল। বড়ির পুরুষদের অফিস যাওয়া, ছেলেমেয়েদের স্কুল কলেজ যাওয়া, তাদের নাস্তা তৈরি করা ইত্যাদি ইত্যাদি
খান বাড়ির টেবিলে সবাই এসে উপস্থিত।
বাড়ির করতিরা সবাইকে পরোটা তুলে দিচ্ছে। আর বাকিরা খাচ্ছে।
খাওয়ার মাঝে শরিফ খান শুভর উদ্দেশ্যে বলে „“ আজ কি ফ্রি আছো? ”
শুভর নির্লিপ্ত জবাব„“ না ”
” যদি কাজের মাঝে একটু ফ্রি হও তাহলে তোমার দাদিকে একটু গ্রামে রেখে এসো ”
” আমার এখন সময় নেই ”
এনিশা খান বললেন „“ আহা লাগবে না আমি একাই যেতে পারবো। শুধু শুধু ছেলেটা টানছিস কেন? ”
শরিফ খান মায়ের উদ্দেশ্যে বলে „“ তা বললে হবে? এতো দূরের পথ আপনি একা যাবেন? আমারও আজ মিটিং আছে! শাহাদাতের আজ ক্লাইনদের সাথে মিটিং আছে ”
সাব্বির শরিফ খানের কথায় জবাব দেয় „“ বড় আব্বু আমি রেখে আসি? ”
” তোমার আজ কাজ নেই? ”
” হ্যাঁ আছে তো। দাদিকে গ্রামে রেখে আমি এসে আফিসে যাবো ”
ছেলের কথায় শাহাদাত খান বলেন„“ হ্যাঁ তুমিই যাও। আর সময় মতো চলে এসো ”
ভাইয়া, আব্বু, চাচ্চুর কথা এতোক্ষণ নিরব দর্শক দেখছিল শিখা। সে খেতে খেতে দাদির উদ্দেশ্যে বলে „“ না গেলে হয় না? ”
এনিশা খান মিষ্টি হেসে বললেন „“ না রে আমার শহরে ভালো লাগে না আমি গ্রামেই ঠিক আছি ”
আসলে এনিশা খান গ্রামে থাকে। তারা স্বামী মারা গেছে গ্রামে এবং দাফন করা হয়েছে গ্রামে। তাই স্বামীর সৃতি নিয়ে সে মরতে চায়।তাই সে গ্রামে থাকে তার স্বামীর সৃতি নিয়ে। অবশ্য মাঝে মাঝে খান বাড়ির সদস্যরা গ্রামে যায়। আবার এনিশা খান ঢাকা আসেন।
শুভর খাওয়া শেষ হতেই বেচিনের দিকে যেতে যেতে লুমিনার উদ্দেশ্যে বলে „“ তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করা হসপিটাল যাবো ”
লুমিনা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
সাব্বিরেরও খাওয়া শেষ সেও বেচিনের দিকে যেতে থাকে।
এক এক করে খান বাড়ির সকল সদস্যদের খাওয়া শেষ এখন তিন জন বাকি আছে আকলিমা খান এবং তার ঝা আমেনা খান এবং সাব্বিরের বউ সিনথিয়া। তারা কিছুক্ষণ পর যখন বাড়ির সবাই যে যার কাজে চলে যাবে তখন তারা একসঙ্গে খাবে।অবশ্য সিনথিয়া কে একসঙ্গে খাওয়ার জন্য সবাই বলে কিন্তু সিনথিয়া তাদের সাথে খেতে বসে না বলে ” আমি বাড়ির বউ আমার দায়িত্ব বলতে কিছু আছে আপনারা খান আমি আম্মাদের সাথে পরে খেয়ে নিবো ”
তো তার কথায় আর কেউ বেশি জোর করে না।
১৫ মিনিটের ভিতরে সবাই কাজের জন্য হল রুমে এসে দাড়ায়।
শরিফ খান সে যাবে আদালতে, শাহাদাত খান যাবে অফিসে, সাব্বির যাবে এনিশা খানকে গ্রামে রেখে আসতে, শুভ লুমিনা যাবে হসপিটাল, মিলি শিখা যাবে কলেজ।
সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।।
উপর থেকে এনিশা খান সাদা এবং সোনালি পাইরের একটা শাড়ি পরে আস্তে আস্তে নিচে আসছে।
সবাই তার অপেক্ষায় ছিল।
তিনি নিচে আসতেই শরিফ খান এবং আকলিমা খান এগিয়ে গিয়ে সালাম করলো। এনিশা খান তাদের দু হাত ভরে দোয়া করলো।
আকলিমা খান বললেন „“ ঠিকমতো ঔষধ খাবেন। আর পৌঁছে ফোন করবেন। ”
সঙ্গে শরিফ খান বললেন „“গাড়িতে সাবধানে যাবেন আম্মা। পৌঁছে সাথে সাথে ফোন করবেন। না হলে কিন্তু চিন্তা করবো।”
এনিশা খান মৃদু হেসে বললেন,“আচ্ছা আচ্ছা, এত চিন্তা করার কিছু নেই। আমি কি আর ছোট আছি নাকি?”
আমেনা খান ও শাহাদাত খান এসে সালাম করলো।
শাহাদাত খান বলেন „“ আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আপনি এইভাবে চিন্তা করতেন এখন আমরা বড় হয়েছি এখন আপনার চিন্তা করি ”
আমেনা খান একটা বক্স এনিশা খানের হাতে দিয়ে বলে „“ পথে এটা খেয়ে ঔষধ খাবেন। আর ভালো মন্দ সব জানাবেন ”
” আচ্ছা জানাবো জানাবো। তোমরা আমার যা খেয়াল রাখো তাতেই তো আমি সুস্থ আর ঔষধের প্রয়োজন হয় না। ”
শুভ এগিয়ে এসে দাদিকে জরিয়ে দরে বলে „“ ভালো থেকো নিজের খেয়াল রেখো ”
এনিশা খান আদরে হাত ভুলিয়ে দিতে দিতে বলে „“ নিজের খেয়াল রাখিস।”
শুভ হুম বলে এনিশা খানকে ছেড়ে দেয়।
শিখা মিলি এসে জরিয়ে দরে। দুজনেকে জরিয়ে দরে এনিশা খান বলেন „“ ভালো থেকো দুজনে ”
শিখা মিলি বলে „“ তুমিও ভালো থেকো। নিজের যত্ন নিও আর খুব শীঘ্রই ফিরে আসবে ”
” আসবো আসবো ”
এনিশা খানকে সালাম করে সিনথিয়া এনিশা খান মন ভরে দোয়া করে দিলো। লুমিনাও তাদের দেখা দেখি সালাম করলো।
সাব্বির ব্যস্ত কন্ঠে বলে „“ কই তাড়াতাড়ি আমার দেড়ি হচ্ছে। ”
সবাই বাড়ির মেন দরজার সামনে যায়।
এনিশা খান যেতে যেতে বলেতে থাকে„“ মেয়ে গুলোর সাথে দেখা হলো না। আসলে তোমরা বলে দিও আর আমি পরে ফোনে কথা বলে নিবো ”
শাশুড়ীর কথায় দুই বউ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
সাব্বির গিয়ে গাড়িতে উঠে দরজা খুলে দেয় এনিশা খান গাড়িতে উঠে বসে জানালার কাচ নামিয়ে বাড়ির দিকে তাকায়। বাড়ির সবার মুখে কি মায়া ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না তার কিন্তু সে যে তার স্বামীর বাড়ি থেকে মরতে চায়।
এনিশা খান হাতের ইশারায় টাটা দেয় সবাই তাকে টাটা দেয়।
সাব্বির গাড়ি ছেড়ে দেয় মিনিটের মধ্যে গাড়ি খান বাড়ির চোখের আড়ালে হয়ে যায়।
শরিফ খান নাতিকে ছেলে বউয়ের কোলে দিয়ে সেও গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে যায় কোর্টের উদ্দেশ্যে।
শাহাদাত খানও গাড়ি নিয়ে চলে যায় অফিসের উদ্দেশ্যে।
শিখা মিলি গাড়িতে উঠতে গাড়ি ড্রাইভার নিয়ে চলে কলেজের দিকে।
শুভ লুমিনা চলে যায় হসপিটালের উদ্দেশ্যে।
বাড়িতে রয়ে যায় তিনজন ব্যক্তি আকলিমা খান, আমেনা খান, সিনথিয়া।
—
কলেজ মাঠে গোল হয়ে বসে আছে রিক্তা, শিখা, আরশি, নাহিদা, রাফি, নাইম, রাজ, কবিতা তাদের পুরো গেং বসে আছে। মুল কারন রিক্তা তিনটা ক্লাস করার পরেই তার মাথা ব্যথা উঠেছে। সে ক্লাস করতে পারছে না তাই ক্লাস থেকে বেড়িয়ে যায়।
পিছনে পিছনে বাকিগুলো। ওইযে কথায় আছে না সঙ্গ দোষে লোহা বাসে। রিক্তা ক্লাস করবে না দেখে বাকি গুলোও করবে না।
রিক্তা মাথা ব্যথায় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।
কবিতা আস্তে করে বলে „“ আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকবো? ”
আরশিও বলে „“ হ্যাঁ চল বাসায় চলে যাই? ”
নাইম ওদের কথা বলে „“ দেখছিস না রিক্তা উঠে দাড়াতে পারছে না ”
এবার শিখা বলল „“ এভাবে বসে থাকলে তো সমাধান হবে না। ”
তখন রিক্তা ফোন ভাইব্রেট করে উঠে। রিক্তা ফোন বেড় করে ওদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে „“কেউ একজন কথা বল ভাইয়া ফোন করেছে ”
সবাই একে অন্যারে দিকে চাওয়া চায়ি করে। নাহিদা বিরক্ত হয়ে বলে „“ বাল এমন না করে ফোন টা ধর। ”
কবিতা „“ তুই ধর না ”
নাহিদা রিক্তার হাত থেকে ফোন নিয়ে শিখার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে„“ কথা বল কোনো না শব্দ করবি না তাহলে মেরে গাঙ্গে ফেলে দিবো ”
নাহিদার থ্রেট শুনে শিখা ভয়ে ভয়ে ফোন রিসিভ করে কানে ধরে „“ আসসালামু আলাইকুম! ”
” ওয়ালাইকুম সালাম বোনু শোন”
” আমি শিখা। ”
” বোনু কই? ”
” রিক্তার প্রচুর মাথা বেথা করছে তাই কলেজ মাঠে বসে আছি ”
” হঠাৎ মাথা বেথা?”
” জানি না তিনটা ক্লাস করার পর থেকেই মাথা ব্যথা করছে বলছে ”
” তোমরা এখন কই? ”
“আমরা কলেজ মাঠে ”
” আমি যেতে পারবো না আমি গাড়ি পাঠাই বোনুকে সেটায় করে বাড়ি চলে যেতে বলো ”
” একটা কথা বলবো? ”
“জ্বি বলো ”
” কালকে রিক্তাকে একটু হসপিটালে নিয়ে যেতে পারবেন? ”
” আমার তো সময় নেই কাল তুমি একটু বোনুর সাথে যেও ভাইয়ার হসপিটালে আমি নামিয়ে দিয়ে আসবো আর ভাইয়ার সাথে কথা বলে রাখবো ”
” ভাইয়ার সাথে কথা বলে আমাকে জানিয়েন আমি যাবো ”
“আচ্ছা এখন আমি গাড়ি পাঠাই ”
” আচ্ছা আল্লাহ হাফেজ ”
“আল্লাহ হাফেজ ”
শিখা ফোন কেটে রিক্তার দিকে এগিয়ে দেয়।
রাফি জিজ্ঞেস করে „“ হ্যাঁরে শিখা কি বললো? ”
” বলেছে কাল রিক্তাকে হসপিটালে নিয়ে যাবে সে সময় পাবে না তাই রিক্তার সঙ্গে আমার যেতে হবে। তোরা কেউ যাবি? ”
আরশি বলল „“ ওরা কেউ যাবে না কি জানি না কিন্তু আমি যাবো ”
নাহিদাও বলে„“ আমিও যাবো ”
কবিতাও বলল „“ আমি যেতাম কিন্তু আমার আম্মু জানলে প্রবলেম হবে তাই যাবো না তোরা যা ”
নাইম বলল „“ আমি যাবো না আমার কাল কোচিং আছে ”
নাহিদা বলল „“ আচ্ছা আর কারো যাওয়া লাগবে না তোরা কলেজে থাক স্যার জিজ্ঞেস করলে সত্যি টা বলবি ”
সবাই মাথা নাড়ায়।
এরমধ্যেই একটা গাড়ি এসে কলেজের মাঠে থামে সেদিকে সবাই তাকায়। রিক্তা ভালো করে খেয়াল করতেই দেখে ওদের গাড়ি তাই ব্যাগ নিয়ে দাড়িয়ে বলে „“ গাড়ি চলে আসছে আমি যাই তোরাও চলে যা ”
শিখা উঠে দাড়িয়ে বলে „“ চল তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি ”
সব গুলো উঠে দাড়ায়। সবাই রিক্তার পিছন পিছন যায়৷
রিক্তা গাড়িতে উঠে দরজা লাগিয়ে কাঁচ নামিয়ে ওদের টাটা দেয় সঙ্গে সঙ্গে সবাই টাটা দেয়।
ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দেয় বাকিরা সবাই যে যার রাস্তায় চলে যায়
চলবে…..