গল্প:প্রান সরোবরের তরঙ্গধ্বনি(০৪)

লেখিকা:জান্নাতরাহমানহৃদি

(পর্ব:০৪)

 (কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

গোধূলি সন্ধ্যা। ফয়সাল দাঁড়িয়ে আছে শুভ্রতার বাসার সামনে। শুভ্রতা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলো। হঠাৎ ওর চোখ যায় বাসার নিচে আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা আবছায়া অবয়বের দিকে। ছায়াটা পকেট থেকে ফোন বের করে একটা নম্বরে ডায়াল করে শুভ্রতাকে আশ্চর্য করে ওরই ফোন বেঁজে ওঠে। ফয়সালের নম্বর। তাহলে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা আর কেউ না ফয়সাল। শুভ্রতা এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে যায়। গেইট খুলে ফয়সালের সামনে দাঁড়ায়। পর পর প্রশ্ন ছুড়ে মারে, “এই সন্ধ্যা বেলা আমার বাসার সামনে?”

জবাব দেয় না ফয়সাল। হাতে থাকা টিফিন বক্সটা শুভ্রতার হাতে ধরিয়ে দেয়।

-“এসব কি?”

“চোখে ন্যাভা হয়েছে? দেখিস না খাবার। ভাবিস না আমি তোর প্রতি সিমপ্যাথি দেখাচ্ছি। এসব তোর আন্টি দিয়েছে।”

“বুঝলাম।”

-“হু এখন বাসায় যা মাথামোটা। কেউ দেখলে আবার উল্টাপাল্টা কথা রটাবে।”

-“খিলখিল করে হেসে ওঠে শুভ্রতা। তো তোর কি মনে হয়? কেউ কিছু বলে না? এই এলাকার প্রায় সবারই মুখে মুখে যে তুই আমার প্রেমিক।”

-“কে কি বলে সেসব আমি ভালো করে জানি। আপদত তোর বাসায় কেউ নেই। তাই আমি চাইনা অন্য কোনো বদনাম রটাক আমাদের নামে। দ্রুত বাসায় যা।”

-মাথা নাড়ায় শুভ্রতা। বাসায় ডুকতে নিয়ে আবার ফিরে থাকায়। এক হাত কানে ধরে বলে, “সরি মামা।”

হইছে ন্যাকামি বাদ দিয়ে বাসায় যাহ।’

শুভ্রতা আরও একবার সরি বলে বাসার দিকে পা বাড়ায়। বা সায় ডুকে টিফিন বক্স খোলে। একটা বাটিতে গরুর মাংস। আর একটা বাটিতে সাদা ভাত আর কয়েক পদের ভর্তা। শুভ্রতা খাবার নিয়ে বসে পরে ডাইনিং টেবিলে। আরেক হাতে ফয়সালের নম্বরে ডায়াল করে। ফয়সাল ফোন রিসিভ করে কানে ধরে, “ কি বলবি ঝটপট বলে ফেল।”

-“কেন তুই কি মাঠে নাঙল চালাতে যাবি? বেশি ব্যস্ত?”

-“আগামি এক সপ্তাহ তুই আমার সাথে কথা বলবি না।”

-“তো খাবার দিয়ে গেলি কেনো? বাইরে ফেলে দেই সব?”

-“তুই অলরেডী গ্রোগ্রাসে গিলছিস।”

-“কে বললো গিলছি? আমি টেষ্ট করে দেখছিলাম। সে যাই হোক রাগটা এবার অন্তত কমা। আমার প্রেমিক পুরুষ আমার সাথে রেগে আছে ব্যাপারটা ভালো লাগছে না।”

-“ড্রামা কম কর। ড্রামা করার মানুষ জুটিয়ে দিয়েছি না? তার সাথে গিয়ে ড্রামা কর।” পুনরায় বলেল, “ফোন রাখছি আমি। আর শোন তোর আব্বু ফোন দিয়েছিলো, তোকে ফোন ধরতে বলেছে।”

-“হুম।”

-“হুম কি? কথা বলিস তার সাথে। তোকে নিয়ে টেনশন করছে।”


“আমার সুর গুলো পায় চরন, আমি পাইনে তোমারে”

মৌমিতাদের বাসা থেকে গানের কন্ঠ ভেসে আসছে। এই সময়টাতে মৌ গান শেখে প্রতিদিন। মৌমিতার গানের টিচার ধমকে ওঠে মৌমিতাকে। সুরে টান হবে মৌ। মুখটাকে মলিন করে মৌ উত্তর দেয়, “স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান গুলোর সুর অনেক কঠিন। আমি শ্বাস ধরে রাখতে পারিনা।”

-“এর জন্যই তোমাকে বারবার ট্রাই করতে হবে মৌ। গাইতে গাইতে সহজ হয়ে যাবে।”

মৌ অলস ভঙ্গিতে বসে বলল,
“গান টান শিখতে ইচ্ছে করে না। একটা বিয়ে করেন স্যার, আপনার বিয়ে খাই। কতকাল ধরে কোনো বিয়ের দাওয়াত খাই না মনটা উদাস উদাস লাগছে।”

-“গানের মধ্যে আমার বিয়ের কথা কোথা থেকে ডুকালে?”

“বিয়ে সব কিছুর মধ্যে ডুকানো যায় স্যার। আমি তো শুধু গানের মধ্যে ডুকালাম। আমার এক আত্মীয় মরা বাড়িতে বিয়ের কথা ডুকিয়েছিলো।”

-“তোমার শিক্ষকের সাথে বিয়ের মতো একটা পরামর্শ করতে তোমার লজ্জা লাগছে না মোটেও?”

“আসলে লজ্জা জিনিসটা ঠিক আমার মধ্যে আসে না স্যার। বলুনতো এখানে আমার কি দোষ? এটা কি কোনো ধরনের রোগ স্যার? লজ্জা আনার মতো কোনো ঔষধ থাকলে সাজেষ্ট করুন তো।”

পিটপিট করে মৌয়ের দিকে তাকায় অনুপম। তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে, “দোষটা আসলে তোমার না। বয়সটা তোমার দোষের।”পুনরায় বলে, যাই হোক বিয়ের দাওয়াত একটা দিতে পারি তোমায়। এই মাসের শেষের দিকে আমার বড়দার বিয়ে। তোমার দাওয়াত।

-“অশোকদার বিয়ে? অশোকদাও বিয়ে করে ফেলতেছে। বাকি আছি শুধু আমি আর সালমান খান।”

“তুমি আর সালমান খান বাকি আছো মানে কি? আমাকে চোখে বাঁধছে না তোমার? শুধু আমি কেন, হাজার হাজার মানুষের বিয়ে করা বাকি।”

“স্যার! যে হারে সবাই বিয়ে করে নিচ্ছে আমার বাবা তো আমার জন্য ছেলেই খুঁজে পাবেনা।”

“তোমার জন্য ছেলে খুঁজে না পেলে আমি খুঁজে দিতে হেল্প করবানি। এবার চুপ করো।”

-“আর একটা প্রশ্ন করি স্যার?”

-“আচ্ছা করো।”

-“অশোকদার বিয়ে হচ্ছে কার সাথে?”

-“তোমাদের সাথেই পড়াশোনা করে। অনুপ্রভা নাম।”

-“অনুপ্রভা? আপনারা আর মেয়ে খুঁজে পাননি? অনুপ্রভা কেন?”

-“তুমি রেগে যাচ্ছো কেন? অনুপ্রভার মধ্যে সমস্যা কি?”

-“সমস্যা নেই। বিয়ে টপিক বাদ দেই আমরা। আপনি গান ধরেন।”


আশিকের বাবা প্রবাসে থাকেন। তিন মাসের ছুটিতে বাড়িতে এসেছেন। ছুটি প্রায় শেষ। আশিকেরা দুুই ভাই বোন। বড় বোন আয়েসা তার বিয়ে হয়ে গেছে শশুর বাড়িতে থাকেন। আশিকের বাবা অনেক রাগী স্বভাবের মানুষ। বিদেশ থেকে আশার পর থেকেই তিনি খেয়াল করছেন আশিক ঠিক মতো পড়াশোনা করে না। রাত বিরাতে বাহিরে থাকে। গত পরশু ওর রুমে গিয়ে সিগারেটের প্যাকেট ও পেয়েছেন। আশিকের মা আমেনা বেগম কে বকাঝকা ও করেছেন বেশ। তিনি সন্তানদের মানুষ করতে পারেননি। হেনতেন অনেক কিছু। ছেলে আজকেও সকাল বেলা বাসা থেকে বেড়িয়েছে এখন বাঁজে রাত আটটা অথচ তার বাসায় আসার খবর নেই। ফারুক সাহেব লাঠি নিয়ে দরজার সামনে বসে আছেন। আশিক দরজায় পা রাখতেই ফারুক সাহেব তেড়ে আসেন। আমেনা বেগম দ্রত এসে আটকান তাকে। ফারুক সাহেব আমেনা বেগমের দিকে আঙুল তাক করে বলেন,

-“তোমার শাসনের অভাবেই ছেলেপেলে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষ করতে পারো নি তুমি।”

কিছু হলেই ফারুক সাহেব সবসময় স্ত্রীকে বকাঝকা করেন। আমেনা বেগম কি কম চেষ্টা করেন ছেলেপেলেদের ঠিকমতো মানুষ করতে? ছেলে কথা না শুনলে সে কি করবে? ছেলের উপর তার রাগটা তড়তড় করে বাড়তে লাগল। “নিজেই এবার ঠাস করে আশিকের গালের উপর চড় বসালেন। রাগী স্বরে বললেন, তোমাদের কারণে সবসময় আমাকে বকা শুনতে কেনো হবে? সময় আছে এখনো, শুধরে যাও আশিক।”

আশিকের বরাবরই রাগটা খুব বেশি। বাবা আসা অব্দি থেকে শুধু তার। পিছনেই পরে আছে। আশিক বাবার উপর রাগ। দেখিয়ে আর বাসায় ঢুকলো না। রাগে রাগে হনহন করে আবার বেড়িয়ে গেলো দরজায় লাথি মেরে।


শুভ্রতা একটা সাদা শাড়ি পরেছে। হাতের দাগ ডাকার জন্য একটা চুড়িদার ব্লাউজ পরেছে। লম্বা চুল গুলো ছেড়ে দেওয়া। চোখের নিচে গাঢ় কাজল। সেজেগুজে কতক্ষণ ধরে বসে আছে। অথচ কাব্যর কোনো খোঁজ নেই। শুভ্রতাকে যে ফোন দেওয়ার কথা ছিলো আদতে সেটাই বোধহয় মনে নেই তার। শুভ্রতা এবার ধৈর্য্য হারিয়ে বসে। হাত থেকে কাঁচের চুড়ি গুলো খুলতে নেয়। তখনি তার ফোন বেঁজে ওঠে। শুভ্রতার বিরক্তি ভাব সরে গিয়ে ঠোঁটের কোণে দেখা দেয় সচ্ছ হাসির রেখা। তড়িঘড়ি করে ফোনটা রিসিভ করে। ফোনের ওপাশে বসে আছে কাব্য। পরনে তার একটা কালো সার্ট। হাতাদুটো ফোল্ড করা। সিলভার কালারের একটা ঘড়ি চকচক করছে বাম হাতে। মাথাভর্তি চুল। গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি । শুভ্রতার হার্টবিট মিস হলো। একধ্যানে বসে রইলো সে। ওপাশ থেকে গুরুগম্ভীর স্বরে ভেসে আসল “ পর্যবেক্ষণ করা শেষ?”

“শুভ্রতার ধ্যান ভাঙে। কুন্ঠিত বোধ করে সে। লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলে। গাল দুটো রক্তিম হয়ে ওঠে। শুভ্রতা ভাবনায় পরে তার জীবনে এমন লজ্জা কোনদিন পেয়েছিলো নাকি।”

শুভ্রতার এহেন দশা দেখে কাব্য প্রশ্ন করল,
“আপনি কি লজ্জা পাচ্ছেন শুভ্রতা?”

“উহু।”

-“ ওহ, তাহলে আপনার গাল দুটোতে মেকআপ বেশি হয়ে গেছে। একটু ধুয়ে আসুন প্লিজ।”

-“আমি মোটেও মেকআপ করিনি।”

এরিমধ্যে বাহিরে কলিংবেলের শব্দ হওয়ায় শুভ্রতা উঠে দরজাটা খুলে দেয়। মৌ এসেছে। শুভ্রতা মৌয়ের কানে ফিসফিস করে শুধায়, “সোজা ভিতরের রুমে চলে যা।”

-“ঠিক আছে সুন্দরীতমা! তোমাকে পরে দেখছি। চোখ টিপ মেরে ভিতরের রুমে চলে যায় মৌ।”

শুভ্রতা আবার এসে ফোনের সামনে বসে। কাব্য মোহনীয় দৃষ্টিতে বলে,

“সফেদ শাড়িতে আপনাকে শুভ্রপরী লাগছে। শাড়ি কি আপনি আমার জন্য পরেছেন?”

“উম হতে পারে আবার না- ও হতে পারে।”

কাব্য হাসল ঠোঁট বিস্তর করে,
“কিন্তু আমি আপদত ধরে নিলাম আপনি আমার জন্যই পরেছেন। পুনরায় বলল, আপনাকে দেখে এখন আমার একটা কবিতা মাথায় ঘুরছে।”

“কি কবিতা? আপনার নিজের লেখা? আপনি কবিতা লেখেন?”

“আস্তে আস্তে শুভ্রতা। আপনি তো দেখছি প্রশ্নের ভান্ডার নিয়ে বসেছেন। কবিতা আমার লেখা না, ফেসবুকে দেখেছিলাম দু লাইন মনে আছে।”

“আচ্ছা সরি।”

“সরি কেনো? বোকামেয়ে, এর মধ্যেই মন খারাপ করে ফেলেছো? দেখি হাসো তো। না হাসলে কবিতা শুনাবো না।”

“শুভ্রতা ফিচেল হাসল। আচ্ছা বলুন এবার।”

কাব্য তাকালো সরাসরি শুভ্রতার চোখের পানে। গভীর তার দৃষ্টি। শীতল কন্ঠে বলতে শুরু করল,

“কাজল চোখের মেয়ে,
আমার দিবস কাটে বিবস হয়ে,
তোমার চোখে চেয়ে।”

লাইন দুটো শেষ করে শুভ্রতাকে বলল, “ ঝটপট কমপ্লিমেন্ট দেন কেমন হয়েছে।”

“আপনার মতো হয়েছে।”

“আমার মতো বলতে? এই ওয়েট, আপনি কি বলতে চাচ্ছেন আমার কবিতা আমার মতোই বিচ্ছিরি হয়েছে?”

“আপনি বিচ্ছিরি কাব্য?”

“হ্যা।”

শুভ্রতা ফোনের দিকে আর একটু এগিয়ে গেলো। কন্ঠ খাঁদে নামিয়ে জবাব দিলো -“ আপনি অসম্ভব রকমের সুন্দর কাব্য।”

“শুভ্রতার মতো?”

“শুভ্রতা মুখটা মলিন করে জবাব দিলো,
, “না আপনি শুভ্রতার মতো কালো নন।”

“এটা দ্বারা কি বুঝাতে চাইলেন ফর্সা মানেই সুন্দর?”

“আমার ধারনা তাই বলে।”

“তাহলে আপনি ভুল ধারনায় আছেন। লেবু খান।”

“লেবু খাবো কেনো? লেবু খেলে মানুষ সুন্দর হয়?”

“কাব্য হাসল। সুন্দর হয় কিনা জানি না, তবে নেশা কেটে যায়।”

“শুভ্রতা হতবিহ্বল। মানে? আপনার কি আমাকে দেখে নেশাখোর মনে হচ্ছে?”

“উহু! নেশাখোর মনে হবে কেনো? আপনি নিজেই তো একটা নেশা।”

“আপনার কথা আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে কাব্য। একটু বুঝিয়ে বলুন প্লিজ।”

“ছোট মানুষের এত বুঝে কাজ নেই।”

“ওহহহহ! আচ্ছা শুনুন।”

“শুনছি।”

“আপনি আমাকে আপনি করে ডাকেন কেনো? নিজেকে বয়স্ক লাগে।”

“আপনি তো বয়স্কই। সাদা শাড়িতে একদম বিধবা বিধবা লাগছে।”

“চোখ বড় করে তাকালো শুভ্রতা। কি বললেন আপনি?”

“রিলাক্স! যেভাবে তাকাচ্ছো মনে হচ্ছে খুুন করে ফেলবে। পুনরায় বলল,, তুমি করেই ডাকবো! কিন্তু শর্ত আছে, তোমাকেও আমায়, তুমি করে ডাকতে হবে।”

“ট্রাই করবো।”

“আচ্ছা! এখন ঘুমিয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়ে গেছে।”

“এতক্ষণে সময়ের দিকে খেয়াল আসে শুভ্রতার। রাত দু’টে বেঁজেছে। শুভ্রতা চেচিয়ে ওঠে। আল্লাহ আমার কাল আটটায় কোচিং আছে। সকালে উঠতে পারবো নানে। রাখুন আপনি।”

চলবে……

( আজকের পর্ব টা আমার কাছেই কেমন একটু খাপছাড়া লাগছে। যাই হোক হ্যাপি রিডিং)

Leave a Comment