গল্প: চলো না আজ এ রূপকথা তোমাকে শোনাই (০৭)

লেখনীতে:প্রিয়াংশি চৌধুরী

পর্বসংখ্যা:০৭

দুপুরের অগ্রভাগেই আজ প্রিহার স্কুল ছুটি ঘোষণা করেছে। অসময়ের এই ছুটি যে কতটা আনন্দের, তা কেবল স্কুলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরাই বোঝে। তাই বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে স্কুলের গেট পেরিয়ে বেরিয়ে আসে প্রিহা। হাসি, কথা আর দুষ্টুমির মাঝেই হঠাৎ নেমে আসে অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়। পাশের একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের নিচ দিয়ে হাঁটছিল সে। ততক্ষণে বাকি বন্ধুরা তাদের বাড়ির রাস্তায় চলে গিয়েছে। এইটুকু পথ প্রিহাকে একাই ফিরতে হয়। এমনিতে প্রীষান ড্রপ করে নেয় প্রতিদিন কিন্তু আজকের অপ্রত্যাশিত ছুটির কথা সে জানে না। তাই প্রিহা একাই যাচ্ছিলো বাড়ির পথে।

হঠাৎই উপরের নির্মানকৃত বিল্ডিং থেকে আছড়ে পড়ে এক প্রকাণ্ড ইট। সোজা এসে পরে প্রিহার ডান পায়ে। মুহূর্তেই তীব্র ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে যায় তার। প্রিহার আর্তনাদের অসহনীয় শব্দ বাতাস কাঁপিয়ে ওঠে। সাহস করে ইট সরাতেই দেখা যায় পায়ের সামনের অংশ থেঁতলে গেছে, রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে।

ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিপজ্জনক বুঝে কোনোমতে কয়েক কদম এগিয়ে রাস্তার ধারের ফাঁকা জায়গায় থাকা একটি ঢালুর ওপর বসে পড়ে প্রিহা। যে রাস্তায় সে এসেছে, সেখানে ভারী যানবাহনের আনাগোনা অথচ মানুষের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। ব্যথা আর অসহায়ত্বে চোখ ভিজে ওঠে তার। অনবরত ব্যাথামিশ্রিত অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে তার গাল বেয়ে। এই অবস্থায় কী করবে, কোথায় যাবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। পা নিয়ে এক কদম এগোনোর শক্তিও আর নেই। ব্যথা যেন ক্রমশ আরও ধারালো হয়ে উঠছে।

ঠিক তখনই সেই পথ দিয়েই গাড়ি চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে যাচ্ছিল কায়রা। সদ্য ড্রাইভিং শেখা, তাই মনোযোগে ঘাটতি নেই। হঠাৎ ঢালুর ওপর বসে থাকা এক কিশোরী মেয়ের দিকে চোখ পড়ে তার। যে কান্নায় ভেঙে পড়া, অসহায় লাগছে। সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে নেমে আসে কায়রা।

দূর থেকেই চিনে ফেলে মেয়েটাকে। কায়রা মেয়েটাকে দেখে বলে উঠে,
“আরে, এটা প্রীষান স্যারের বড় ছানা’টা না!”

আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে প্রিহার পাশে দাঁড়ায় সে। থেঁতলে যাওয়া পা আর গড়িয়ে পড়া রক্ত দেখে কায়রার বুক কেঁপে ওঠে। হাঁটু গেড়ে বসে পার্স থেকে রুমাল বের করে যত্ন করে বেঁধে দেয় পায়ের ক্ষতস্থানে।

ব্যথায় কাতর প্রিহা মুখ তুলে তাকায়। দেখলো, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি অদ্ভুত সুন্দর, যার চোখে নিজের জন্য উদ্বেগ দেখতে পেলো। আঁতকে উঠে ভয়ার্ত স্বরে কায়রা বলে,
“পায়ের এই অবস্থা কীভাবে হলো? ই’স! আঙ্গুলগুলো থেঁতলে গেছে!”

প্রিহা কষ্ট চেপে উত্তর দেয়,
“পাশের কনস্ট্রাকশন বিল্ডিংয়ের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম… হঠাৎ একটা ইট এসে পায়ে পড়ে যায়।”

কায়রা দৃঢ় উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে,
“দেরি করা ঠিক হবে না। চলো, তোমাকে হসপিটালে নিয়ে যাই।”

প্রিহা মাথা নাড়িয়ে বলে,
“না, আপু… কিছু মনে করবেন না। অপরিচিত কারও সঙ্গে এভাবে যেতে পারবো না।”

কায়রা মৃদু হেসে মনে মনে ভাবলো, স্যারের ছানাপোনারা এই অবস্থাতেও নীতিবাক্য ভুলে যায়নি। তাই হালকা ঠোঁট উল্টে বলে,
“কেন, আমাকে দেখে কি ছেলেধরা মনে হচ্ছে?উ’প’স, মেয়েধরা!”

প্রিহা হেসে ফেলে কান্নার মাঝেও। উত্তর দেয়,
” না, আপু। আপনাকে খুবই হাই ক্লাস ফ্যামিলির মেয়ে মনে হচ্ছে। তবুও… আমি এভাবে যেতে পারবো না।”

কায়রা ফোন বের করে তার হাতে দেয় আর বলে,
“ওকে’হ! যেতে হবে না আমার সাথে। তোমার বাবাকে ফোন করে ডেকে নাও। “

আর দেরি না করে প্রিহা বাবার নম্বরে ডায়াল করে। প্রীষানও রিসিভ করে ভারী স্বরে বলে,
“আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন? “

“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমি প্রিহা, পাপা। “

“প্রিন্সেস, এটা কার নাম্বার? তুমি ঠিক আছো তো?”

“একটা আপুর ফোন থেকে কল করেছি। আমি ঠিক আছি। বড় রাস্তার মোড়ে এসো একটু। ছোট একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। চিন্তা করো না।”

“এক্ষুনি আসছি, সোনা। অপেক্ষা করো। ওখানেই থাকো।”

ফোন কেটে গেলে প্রিহা কায়রার দিকে ফোন ফেরত দিয়ে মৃদু হেসে বলে,
” থ্যাংকস, আপু।”

কায়রা ঠোঁট উল্টে বলে,
“আমাকে আপু না বলে আন্টি ডাকো। আপু ডাকটা ভালো লাগছে না।”

প্রিহা বিস্ময়ে তাকায়। কোনো অল্পবয়সী মেয়ে নিজে থেকে আপু না বলে আন্টি ডাকতে বলছে দেখে অতিকায় চমকালো প্রিহা। কায়রার দিকে জহুরি নজর বুলিয়ে বলল,
“আন্টি কেন ডাকবো? আপনি বড়জোড় আমার থেকে সাত-আট বছরের বড় হবেন। সে অনুযায়ী, আমার আপু থাকলে তার সমান’ই হতেন। আমার ভাই আর আমার বয়সে ছয় বছরের পার্থক্য।”

কায়রা আপু শুনে একটু বেজার হলেও হেসে বলে,
“তুমি তো বেশ ইন্টেলিজেন্ট! আমাকে দেখেই পারফেক্টলি বয়স আন্দাজ করে ফেললে। উম’ম, আ’ম ইমপ্রেসড!”

প্রিহা শান্ত স্বরে বলে,
“ইন্টেলিজেন্ট কি না জানি না, তবে মানুষের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে বুঝতে পারি আদতে মানুষটার স্বভাব কেমন? এইটা আমার একধরনের গুন বলতে পারেন।”

কায়রা কৌতূহলী হয়ে ওঠে বলে,
“তাহলে বলো তো, আমাকে কেমন মনে হলো? আর হ্যাঁ, তুমি আমায় আন্টি এবং তুমি বলেই ডেকো প্লিজ। যেইভাবে আপনি আপনি করে ডাকছে,নিজেকে বুড়ো লাগছে!”

কায়রার দিকে কয়েক সেকেন্ড গভীরভাবে তাকিয়ে থেকে প্রিহা বলে,
“আচ্ছা, তুমি করেই বলছি। তোমাকে দেখে আমার যা মনে হলো, তুমি বয়সে বড় হলেও ম্যাচুউরড নও। ধীর-স্থির নও চঞ্চল এবং দুরন্ত মেয়ে। তবে কিছুক্ষেত্রে তুমি ম্যাচুউর হয়ে যাও। নরম মন থাকলেও, কঠোর দিকও আছে। আর নিজের প্রতি প্রচুর আত্মবিশ্বাসী।”

কায়রা হা করে শুনলো প্রিহার সব কথা। কি ঝরঝর করে তার স্বভাব বলে দিলো এই বাচ্চা মেয়ে! ভুল তো বলেনি। ছানাদু’টো বাপের মতোই বুদ্ধিমা’ন! কায়রা বলল,
“একদম ঠিক চিনেছো, আমাকে। রিয়েলি ইমপ্রেসিভ।”

ততক্ষণে প্রীষান গাড়ি নিয়ে চলে এসেছে। গাড়ি থেকে নেমে এসে প্রিহাকে বসে থাকতে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। প্রীষান বলে,
” আল্লাহ! পায়ে কী হয়েছে?”

প্রিহা বাবাকে আশ্বস্ত করে বলে,
“অস্থির হয়ো না, পাপা। ইট পরেছে পায়ে। তাই বসেছিলাম এখানে। তখন এই আন্টি আমাকে সাহায্য করেছে তোমাকে ফোন করতে। “

প্রীষান পাশে এতক্ষণ দেখেনি। প্রিহার কথায় ঘুরে তাকিয়ে দেখে কায়রাকে। কায়রা তো আগে থেকেই তাকিয়ে বাবা-মেয়েকে দেখছিলো মন ভরে। প্রীষান রাগী চোখে তাকিয়ে বলে,
” তুমি এখানে কি করছো? “

প্রিহা অবাক হয়ে দু’জনকে দেখেই বলে,
“তোমরা কি পরিচিত, পাপা!”

প্রীষান সংক্ষেপে উত্তর মেয়েকে উত্তর দেয়,
” স্বল্প পরিচিত। স্টুডেন্ট হয়। “

কায়রা হাসলো আলতো। অতপর প্রিহাকে বলিষ্ঠ বাহু দ্বারা কোলে তুলে নিলো প্রীষান। প্রীষান বেশ শক্ত-সামর্থ্য পুরুষ। তাই কোনো কিছু না ভেবে মেয়েকে কোলে নিয়েছে অনায়াসেই। যাওয়ার আগে প্রথমবারের মতো কায়রাকে অতি নিরেট স্বরে ধন্যবাদ জানালো প্রীষান। যতই হোক, মেয়েটাকে সাহায্য করেছে। আর কায়রা এতটুকুতেই খুব খুশি হলো। প্রিহাকে গাড়িতে বসিয়ে প্রীষান গাড়ি স্টার্ট দিতেই প্রিহা গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল,
“আন্টি, একদিন আমাদের বাসায় আসবে কিন্তু। তোমার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লেগেছে। “

কায়রাও হেসে হাত নারিয়ে বলল,
“অবশ্যই, আসবো। আমাকে তো আসতেই হবে। সাবধানে যেও, বাই।”

প্রিহাও প্রতিউত্তরে বাই বলা মাত্রই প্রীষান গাড়ি ছাড়লো। গাড়ি সরে গেলে কায়রা দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। কায়রার হেয়ালি কথা কর্ণগোচর হয়েছিলো প্রীষানের। তবে চুপ থেকেছে মেয়ের কথা ভেবে। কায়রাকে জাস্ট সহ্য করতে পারে না প্রীষান, একেবারেই না। জেনেশুনে নিজের পায়ে কুড়াল কেও কি করে মারে, তা এই মেয়ের থেকে শেখা উচিত। অতি অবান্তর একটি মেয়ে! নিরর্থক ফ্যান্টাসি নিয়ে পরে আছে, যা অবাস্তব, অসম্ভব। গাড়িটা দৃষ্টিসীমানা পেরিয়ে যাওয়ার পর কায়রা দু-হাত মাথার পেছনে হালকা হেসে বলল,
“ভালোবেসে কতই না নির্লজ্জ উপাধি পাচ্ছি! তো কি, ভালোবাসা ছাড়ছি না, স্যার। “

এরপর কায়রা নিজের গাড়িতে বসে ড্রাইভিং করতে করতে সুমধুর কন্ঠে দু’লাইনের গানের সুর তোলে যা বাতাসে ভেসে যায়,

মনটা কথা শোনেনা,
তোর কাছে ছুটে আসে….
তাইতো পড়ে আছি,
তোর পাড়ার আশেপাশে…

*********************
বিকেলের আলো সোনালি হয়ে উঠছে ক্রমশ। প্রীষান প্রিহাকে নিয়ে হসপিটালে গিয়ে ট্রিটমেন্ট করিয়ে বাসায় নিয়ে এসেছে বিকেলে। প্রিহাকে প্রীষান কোলে করে আনছে তা দেখে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে প্রীতিষা।
“ভাইয়া, প্রিহার পায়ে কি হয়েছে? আর তোমরা এভাবে কোথা থেকে এলে?” — উদ্বিগ্ন স্বরে বলল প্রীতিষা।

প্রীষান শ্বাস ফেলে বলে,
“ইট পড়ে পা থেতলে গিয়েছিলো। আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। হসপিটালে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে, হাড়ে সামান্য ক্ষয় হয়েছে কিন্তু ভাঙেনি। আস্তে আস্তে সেরে যাবে। ”

প্রীতিষা অবলীলায় প্রিহার পাশে বসে গেল। প্রিহার হালকা হেসে বলে,
“মণি, আমি ঠিক আছি। সেরে যাব। তুমি প্যানিক করো না।”

প্রীতিষা প্রিহার মাথা বুকে ঠেকিয়ে বলল,
“ভাইয়া, আমি রান্না করে রেখেছি। তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো। আর প্রিহা, তোকে আমি খাইয়ে দিচ্ছি। বসে থাক তুই।”

প্রীষান মাথা নাড়িয়ে ঘরে চলে গেল। প্রীতিষা ভাইয়ের জন্য টেবিলে ভাত বেড়ে রাখলো, উপরে ঢাকনা দিয়ে। আরেকটা প্লেটে প্রিহার জন্য ভাত এনে সোফায় বসে প্রিহাকে খাওয়াতে খাওয়াতে বলল,
“ভেবেছি আজ তোকে নিয়ে কেনাকাটা করতে যাব। নবীন বরনের জন্য চুরি,গাজরা কিনব। এ কি হয়ে গেলো বলতো?”

প্রিহা খেতে খেতে হালকা গলায় বলল,
“তুমি একটা কাজ করো, প্রীভানকে নিয়ে চলে যাও। না হলে তো আমিই যেতাম।”

প্রীতিষা হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“না থাক, যেতে ইচ্ছে করছে না।”

প্রিহা অচঞ্চল ভঙ্গিতে বলল,
“মণিই! তুমিও না সত্যি! এখন কি এই ছোট্ট ব্যাপারের জন্য সব বন্ধ করে রাখবে? যাও, তুমি কেনাকাটা করে এসো।”

ততক্ষণে প্রীষান ড্রেস চেঞ্জ করে সাদা শার্ট আর আরামদায়ক ট্রাউজার-প্যান্ট পরে ঘর থেকে বের হলো। তার চওড়া কাঁধ আর শক্তপোক্ত দেহের ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায় দিনের ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও সে অচঞ্চল। মুখে লেগে থাকা পানির কনা তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। একটা চেয়ারের উপর তোয়ালেটা রেখে খাবার টেবিলে বসে পরে। আপাতত, খুব জোড় খিদে পেয়েছে তার। পিঠ সোজা রেখে পা একটু আরামপ্রদভাবে ছড়িয়ে বসে ব্যস্ত ভঙ্গিতে খাওয়া শুরু করে। চোখে সামান্য অবসাদ, কিন্তু মুখে সবসময়ের মতো শান্তি ও স্বাভাবিকতা। খাওয়ার মাঝেই বলল,
“কি কেনাকাটা করার কথা হচ্ছে?”

প্রীতিষা উঠে প্রিহার কাছে আরেকটু ভাত নিয়ে এল। বলল,
“কাল আমাদের ভার্সিটিতে নবীনবরণ। আজ প্রিহার সঙ্গে কেনাকাটা করার কথা ছিল, কিন্তু হয়তো ভাগ্যই চাইল না।”

খেতে খেতে প্রীষান হেসে বলল,
“প্রীভানকে নিয়ে চলে যা। তুই বাড়িতে বসে থাকলে কি ওর পা ঠিক হয়ে যাবে?”

প্রিহা তা শুনে বাবার সাথে তাল মিলিয়ে হালকা হেসে বলল,
“এইটাই এতক্ষণ ধরে বোঝাচ্ছিলাম, মণিকে।”

প্রীতিষা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রিহা প্রীভানকে ডেকে বলল, “প্রীভ! বাইরে আয়। সারাদিন এত গেম খেলিস, একটু বাইরে বের হ, গাধা!”

প্রীভান বের হয়ে আসতেই নিজের আপুকে দেখে চমকে উঠে। কিছু বলতেই যাবে তার আগে প্রিহা দ্রুত বলে উঠল,
“কিচ্ছু হয়নি, ছোট্ট এক্সিডেন্ট, জাস্ট রিল্যাক্স। আগে আমার কথা শোনা, মণিকে নিয়ে মার্কেটে যাহ। কিছু কেনাকাটা করবে মণি।”

প্রীভান প্রিহার পাশে বসে স্বাভাবিক ভাবে বলল,
“সে না হয় যাবো। তোর কিছু লাগবে না? তোর জন্য কি আনবো বল! চকলেট খাবি? ডার্ক চকলেট আনবো? তোর তো পছন্দ!”

প্রিহা ভ্রু উঁচিয়ে হেসে বলল,
“বাবাহ! বোনের প্রতি এত কেয়ারিং ভাব দেখাচ্ছিস যে? ঝগড়ার মুড নেই নাকি আজ!”

প্রীষান খেতে খেতে বাচ্চাদের খুনসুটি দেখছিল, আর হাসছিলো আড়ালে। এত বড় হয়েছে, তাও এরা শোধরাবে না।

প্রীভান নিজের কলার উঁচিয়ে বলল,
“তুই আমাকে যতটা খারাপ ভাবিস, আমি ততটাও খারাপ নই। আর মণি, তুমি চেঞ্জ করে এসো, আমি বসলাম।”

প্রীতিষা আর দেরি না করে ঘরে গিয়ে পরলে নীল রঙের নরম কটনের কুর্তি আর অফ হোয়াইট প্যান্ট। কুর্তিটা কোমর থেকে হালকা ভাঁজ হয়ে নেমে এসেছে, তার চলার সঙ্গে মৃদু নরম ঢেউ খেলছে। লম্বা চুলগুলো সে একটি নীল রঙের ফ্লাফি রাবার ব্যান্ডে বাঁধল। আর এই কুর্তিটা গতমাসে নিজের টিউশনের টাকা থেকে কিনেছিলো। তবে সেভাবে আর পরা হয়নি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে হালকা বোল্ড করে কাজলের রেখা টানলো। তার সাজ-সজ্জা ছিল পরিমিত, তবুও নজর কাড়া। দুই প্রান্ত থেকে গায়ে জড়ানো চাদর তাকে এক ধরনের কোমল আবরণ দিয়েছে। শীতে চাদর ছাড়া বের হওয়াই যাবে না। আর সবশেষে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় হাতে নিল ছোট্ট পার্স।
প্রীতিষা প্রীভানকে বলল,
“চল রেডি, আমি।”

প্রীভানও উঠে দাঁড়ালো। এরপর প্রীতিষা প্রীভানকে নিয়ে বেরোতে বেরোতে বলল,
“ভাইয়া, প্রিহা, আমরা এলাম।”

প্রীষান শান্ত স্বরে বলল,
“সাবধানে যাস। আর সন্ধ্যার আগে ফিরবি।”

প্রীতিষা হালকা মাথা নাড়ল,
“ওকে, ভাইয়া।”

—————————

প্রীতিষা একে একে শহরের ছোট-বড় সবরকম দোকানগুলোতে ঘুরছিল, প্রতিটি চুড়ির প্রতি চোখ আটকে রাখলেও মন মতো কোনো চুড়ি খুঁজে পাচ্ছিল না। নীল শাড়ি আর গাজরা কিনে কিনেছে সেই কখন! অথচ চুড়ি খুঁজতে গিয়ে যেন তার ধৈর্যের পরীক্ষা শুরু হলো। প্রীভান পাশে হাঁটতে হাঁটতে হালকা হতাশা নিয়ে বলল,
“মণি, বুঝেছি… তোমার পছন্দসই চুড়ি এই পৃথিবীতে নেই।”

প্রীতিষা ঠোঁট উল্টে হেসে বলল,
“এভাবে হতাশ করিস না। চল, আরেকটু দেখি। সামনে যেতে থাকি, আয়। ”

প্রীভান, প্রীতিষার পেছন পেছন হেঁটে হেঁটে হতাশ গলায় বলল,
“সামনে, সামনে করতে করতে পুরো টাঙ্গাইল শহর ঘুরলাম তোমার জন্য। কিন্তু… মণি, এবারও—”

প্রীতিষা প্রীভানকে পুরো কথা বলার আগেই সামনের দোকানের একটি চুরির বক্স দেখিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে,
“ওই দেখ, ওই চুড়িগুলো! দেখেছিস!”

প্রীতিষার চোখ হঠাৎ ঝলমল করতে লাগল। সামনে দোকানের কাঁচের বাক্সে ঝলমল করছে একবক্স নীল গাজরা চুড়ির সেট। তার শাড়ির রঙের সঙ্গে যেন পারফেক্টভাবে মিল। খুশির চোটে দৌড়ে সে এগিয়ে গেল। হৃদয় দ্রুত ধুকধুক করছিল, হাত দিয়ে স্পর্শ করবে তার ঠিক আগ মুহূর্তে,

হঠাৎ, আরেকটি নারীসুলভ কোমল সরু হাত তার আগেই চুড়ির বক্সটি তুলে নিল। প্রীতিষার চোখ বিস্ময়ে ফেটে গেল। চুপচাপ দোকানের ভিড়ের মধ্যে থেকে সে চুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল মলিন চোখে। আর মৃদু হৃৎকম্পে মনে হলো, কেও যেন তার একচ্ছত্র স্বপ্ন যত্ন করে ভেঙে দিলো। কেউ কি জানে তার চোখে কতটা উজ্জ্বল আশা জ্বলছিল ওই চুড়িগুলো দেখে?

প্রীতিষা তাকিয়ে দেখল, সামনে থাকা নারীটির কোলে বছর তিনেকের ছোট্ট ছেলে শিশু। শিশুর ছোট হাত দুটো মায়ের গলায় জড়িয়ে, চোখে কৌতূহল আর নির্ভেজাল আনন্দ নিয়ে দোকানের লাইটিং দেখছে সে। আর না বললেই নয়, সামনে থাকা নারীটিও অত্যন্ত সুন্দরী। যাকে বলে অনাবিল সৌন্দর্যের প্রকাশ্য রুপ। শাড়ী পরার ভঙ্গিটাও অতি নিখুঁত, মার্জিত। ফর্সা পাতলা গড়নের শরীরে কমলা রঙের শাড়ীটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। সেই নারীটিও প্রীতিষার দিকে তাকাল এবং হালকা বিজয়ের হাসি খেলল চোখে। মৃদু, কোমল কণ্ঠে মিষ্টি হেসে বলল,
“একটু যে দেরি করে ফেললে তুমি!”

#চলমান…….

{⚠️ আপনারা যারা গল্পটি পড়ছেন তারা গল্প সম্পর্কে বেশি না দুই-তিন লাইনের মন্তব্য করুন, তবে গঠনমূলক। এইগুলো আমাকে লিখতে কতটা উৎসাহ করে আপনারা ভাবতে পারবেন না। গতপর্বে রেসপন্স করেছেন অনেকে, তাই দেখে আমি এই পর্বটি রাতেই লিখে ফেলেছি। যারা আমার গল্পে নিয়মিত, সুশ্রী মন্তব্য করেন এবং যাদের জন্য আমি লিখতে উৎসাহ পাচ্ছি, তাদের প্রতি মন থেকে ভালোবাসা…💝 💝}

[ কেমন লাগছে পর্বটি জানাবেন। গঠনমুলক মন্তব্য চাই সবার। সবাই রেসপন্স করবেন আশা করি। আর ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং। 🦋 🥀]

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments