লেখিকা: ফাতেমা তুজ নৌশি
পর্ব:০৪
অনেক খুঁজে পুনরায় বই এনেছে শিমাত। তবে এবার বই আনতে তার ভীষণ রকমের কষ্ট হয়েছে। পাশের গ্রামে কলেজ থাকায় সেখানে হেঁটেই চলাফেরা করেছে। তবে এত গুলো বই নিয়ে আসাটা খুব কষ্টের। সে হাঁপিয়ে গিয়েছে। তাকে পানি দেবার মতো কেউ নেই। অথচ বিনি পাশেই বসে আছে। নিজ থেকে উঠেই পানি আনল শিমাত। বিনি ইদানীং ওকে আরো দেখতে পারে না। নিজের ঘরে বই গুলো রেখে কাজে লেগে পড়ে শিমাত। বিকেলে পাশের পাড়ায় যাবে। সেখানে ওর বান্ধবী আছে। ওর থেকে নোটস নিতে হবে। কত কিছু পড়িয়েছে কলেজে। এসব নতুন জিনিস না বুঝে কি পড়া যায়? তবু কিছু করার নেই। শিমাত কাজ করছিল ওমন সময় পাশের বাসার ভাবি,শিলা এল। হাতে মিষ্টি।
“চাচি,মিষ্টিটা রাখেন।”
বিলকিস মিষ্টি নিতে নিতে বললেন,”কিসের মিষ্টি গো?”
“রিতুর বিয়ে ঠিক হইছে।”
“তা, ছেলে কি করে?”
“শহরে চাকরি করে।”
“ও, ভালোই তো।”
শিলা বেশি কিছু বলল না। শিমাতের কাছে এল। শিমাত তখন সবজি কাটছে।
“বই পেয়েছ?”
“হ্যাঁ ভাবি।”
বিনি ভীষণ মনোযোগে ফোন চাপছে। শিলা আঁচল থেকে এক হাজার টাকা বের করে বলল,
“এটা রাখো।”
“ছি, ছি। আমি এটা রাখতে পারব না ভাবি।”
“রাখো। কাজে লাগবে।”
“না ভাবি।”
“আরে রাখো বোন।”
শিমাত কিছুতেই রাখবে না। শিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“এটা রাখতে পারতে শিমাত।”
শিমাতের খুব লজ্জা লাগছে। ও নত হয়ে বলল,”প্রয়োজন পড়লে তোমার কাছে যাব ভাবি। এখন রাখতে পারব না।”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
শিলা কিছু সময় বসে থেকে চলে গেল। শিমাত সবজি কেটে বিলকিসের কাছে দিয়ে আসল। তারপর উঠান ঝাড়ু দিতে লাগল। বিনি কলা খেয়ে খোসাটা এদিকে ফেলল। যা লাগল শিমাতের শরীরে। শিমাত পেছন ফিরে বলল,”এভাবে না ফেলে কাছে এসেও তো ফেলা যায় বিনি।”
ভেংচি কাটল বিনি। শিমাত কিছু বলল না। এই মেয়েটাকে কিছু বলেও লাভ নেই। ভাত রান্না শেষ হয়েছে। বিনির খুব ক্ষিধে পেয়েছে। সে দুবার চেচামেচি করল।
“এত খাই খাই না করে কাজে হাত লাগা।”
“আমি কেন কাজ করব? কাজ করলে আমার হাত নষ্ট হবে না?”
বিরক্ত হলেন বিলকিস। দ্রুত রান্না চাপিয়ে বললেন,”শিমাত, মরিচ গাছে দেখ তো মরিচ হয়েছে কী না। আর বাগান থেকে কিছু ফল নিয়ে আয়।”
শিমাত ঝাড়ু রেখে মরিচ এনে দিল। তারপর লাঠি আর বালতি নিয়ে গেল বাগানে। বিশাল বাগানটায় রকমারি ফল রয়েছে। কোনো কালেই ফল কিনতে হয় না ওদের। বিনিও ওর পেছন পেছন এসেছে। শিমাত এক পলক তাকিয়ে বলল,”তুই কেন এলি?”
“কেন আসতে পারি না? বাগান কি তোর একার?”
এক দিকে বাগানটা ওর একার ই। বিনি তো ওর বাবার সন্তান নয়। তবু ও কিছু বলল না। বিনি একটা পেয়ারা নিয়ে খেতে লাগল। শিমাত বিভিন্ন ফল পেরে নিচ্ছে। শিমাত পুরো সময় ওর পেছন পেছন ঘুরল। এক পর্যায়ে শিমাত বিরক্ত হলো।
“কি?”
বিনি কিছু বলল না। শিমাত ফল গুলো তুলে নিয়ে চলে যাবে ওমন সময় বিনি বলল,”মা কাল নানা বাড়ি যাবে। তুই ও যাবি।”
“আমি কেন যাব?”
“যাবি না কেন?”
শিমাত কিছু বলল না। বিনি ওর বাহু টেনে বলল,”বল কেন যাবি না?”
“তারা আমায় পছন্দ করে না।”
“শোন, তুই যাবি।”
“না রে। আমি যাব না।”
“না তুই যাবি। যেতে হবে।”
বিনির কথাতে অবাক হলো শিমাত। হুট করে এই মেয়ে এমন কেন বলছে?
“কি হলো বল যাবি।”
“তুই জোর করছিস কেন?”
বিনি তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না। একটু ভেবে বলল,”যাবি মানে যাবি। এত বুঝি না।”
“আমি যাব না। তুই যা।”
“আহ, তুই বুঝতেছিস না। মা অত রাস্তা একা যাবে। ভয় হবে না?”
বিনির নানা বাড়ির পথটা কম নয়। আসলেই ভয়ের বিষয়। বিনি এবার বলল,”তুই মা কে বলবি সাথে যেতে চাস।”
“আম্মা বকা দিবে।”
“দিবে না। উল্টো খুশি হবে।”
শিমাত কিছু একটা ভাবল। তারপর বলল,”তুই একা থাকবি?”
“তো?”
“তোর না ভয় করে?”
“সেটা ব্যাপার না। তুই যাচ্ছিস তাহলে।”
শিমাত কিছু বলল না। বিনি চলে গেল। ওর দিকে তাকিয়ে থাকল শিমাত। অথচ ওর মস্তিষ্কে কিছুই যাচ্ছে না। হুট করে এত ভালো কেন হচ্ছে বিনি?
রাত জেগে পড়াশোনা করবে শিমাত। তাই রাতের খাবার লেট করে খেল। বিনি মায়ের সাথে ঘুমায়। তবে মা রাতে লাইট দেখতে পারেন না। তাই তাদের মাঝে কলহ লেগে যায়। রাগে গজগজ করতে করতে শিমাতের ঘরে এল বিনি। শিমাত বই পড়ছে। কানের সামনে এসে ফোন চালাচ্ছে। শিমাতের প্রচন্ড বিরক্ত লাগছে। তবে কিছু বললেই বিনি ফুসে উঠবে।
“সাউন্ড কমা।”
বিনি আগুন চোখে তাকাল। শিমাত বলল,”সাউন্ড একটু কম কর।”
“কেন? জ্বলে যাচ্ছে তোর?”
“আশ্চর্য শিমাত! আমি শুধু সাউন্ড কম করতে বলেছি।”
“এসব তোর ফালতু কথা। আমি বুঝি না মনে করেছিস?”
পাশের ঘর থেকে বিলকিস হুংকার দিয়ে উঠলেন।
“কি হইছে তোদের? ঘুমাতেও পারব না আমি?”
শিমাত দমে গেল। বিনি ভেংচি কেটে ফোন চালাতে লাগল। শিমাত উপায় না পেয়ে কানে তুলো দিয়ে বসল।
পরদিন ভোরে উঠে নাস্তা বানালেন বিলকিস। সাহায্যের জন্য শিমাতকেও উঠতে হলো। অন্য দিকে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে বিনি। তাকে ডাকা হলো।
“সকাল সকাল ঘেউ ঘেউ করতেছিস কেন?”
“আম্মা ডাকে। নাস্তা করার জন্য।”
বিনি চোখ মুখ মুছে হাই তুলল। ঘড়ির কাটায় তখন ছয়টা বাজে। সে হুট করে হুড়োহুড়ি করে উঠল।
“মা, কখন যাবে?”
বিনির এতটা উল্লাস দেখে শিমাত একটু বিস্মিত বোধ করল। সে ঘর গুছাতে গুছাতে বলল,”আটটার আগেই বের হবে।”
“ও ঠিক আছে। তুই কিন্তু যাবি।”
“হুম।”
বিনির উল্লাসের কারণ পাচ্ছে না শিমাত। তবে হুট করেই ভয় জাগল তার বই গুলো যদি ফেলে দেয়? তাই সে বিনির কাছে এল।
“বিনি, বোন আমার বই গুলোর কিছু করবি না প্লিজ।”
প্রথমে বিনি বিরক্ত হলো। ক্রমেই হেসে বলল,”আরে না। কি করব। টেনশন করিস না তো। যা, মা কে দেখে শুনে নিয়ে যাবি।”
নাস্তা খাওয়া শেষে বাসন ধুতে নদীর পাড়ে এল শিমাত। সেখানে দেখল শিলাকে।
“কি গো শিমাত। এত সকালে আজ?”
“নানা বাড়ি যাব ভাবি।”
“নানা বাড়ি!”
“আম্মার বাবার বাড়ি।”
“ও তাই বল। আমি তো চমকে গিয়েছিলাম।”
কথায় কথায় শিমাত বলল,”ভাবি,বেনারসি শাড়ির দাম কেমন হয়?”
“কেন কিনবে নাকি?”
এ কথা বলে শিলা নিজেই মন খারাপ করে ফেলল। শিমাত বলল,
“তেমন না। আসলে শাড়ি গুলো খুব সুন্দর।”
“একেকটা একেক রকমের প্রাইজ হয়। চার পাঁচ হাজারেও পাওয়া যায়।”
“আচ্ছা।”
চার পাঁচ হাজার শব্দটা অনেক বিশাল শিমাতের নিকট। সে শাড়ির কথা মাথা থেকে ফেলে দিয়ে বাসন নিয়ে বাড়ি ফিরল। বিনি আজ কাজে লেগেছে। মায়ের সাথে গোছানোয় সাহায্য করছে। শিমাত পুরো অবাক হলো। বাসন রেখে এসে নিজের ঘরে এল। সেখানে কোনো ভালো জামা নেই। অনেক খুঁজেও পেল না। আশ্চর্য হলেও সত্য বিনি তার নিজের একটা জামা এনে দিল। শিমাত পুরোই বিস্মিত।
“তুই সত্যিই দিলি?”
“হুম। পর এটা। এমনিতেও আমার লাগে না।”
জামাটা দামী আর সুন্দর। শিমাত ভাবল হয়ত লাগে না বলেই দিল তাকে। সে জামাটা পরে তৈরি হলো। আজ চোখে কাজল দিল। তারপর হাল্কা করে লিপস্টিক ও দিল। এই টুকুতেই খুব সুন্দর লাগছে তাকে। বিলকিস ও তৈরি হয়ে গেছেন। যাওয়ার পূর্বে তিনি মেয়েকে বার বার বললেন,”সাবধানে থাকবি। আর ভয় পাবি না।”
বিনি যেন তাড়াহুড়ো করে বিদায় দিল ওদের। বাড়ির চৌকাঠ পেরোনোর সময় শিমাত একবার ফিরে চাইল। দেখতে পেল খুশিতে চিকচিক করছে বিনির মুখ। অথচ এর রহস্য শিমাতের অজানা।
চলবে….