লেখিকা:জান্নাতুল ফারিয়া প্রত্যাশা
পর্ব:০৪
লোকটা বেরিয়ে গেছে। তবে মেহেরুন এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি আগের মতো। লোকটা তাকে হুমকি দিয়েছে? হ্যাঁ, হুমকি দিয়েছে। সামান্য তাকানোর জন্য এভাবে বলবে? আর সে অন্য পুরুষের দিকে কেন তাকাতে যাবে? বিয়ের আগেই যেখানে তাকায়নি এখন কেন ঘরে স্বামী রেখে সে অন্য পুরুষকে দেখবে? অবশ্য এখন থেকে এই স্বামীর দিকেও আর সে তাকাবে না ভালো মতো। বড্ড অহংকার লোকটার। তাকিয়ে থেকে সেই অহংকার আর বাড়াবে না।
ওয়াহীদ নামাজ শেষে এসে দেখল, মেহেরুন ঘুমিয়ে পড়েছে। গুটিশুটি মেরে একপাশে চুপটি করে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা। বিয়ের প্রথম রাত তাদের। মেয়েটাকে বড্ড জ্বালিয়েছে। তবে যতটুকু প্রতিক্রিয়া করবে ভেবেছিল তার কিছুটাও করেনি। বোঝা গেল, সে ভদ্র। আবার হয়তো নতুন বলে এখনই কিছু বলছে না। ওয়াহীদ মুচকি হেসে মেহেরুনের সামনে বসল। তার ঘুমন্ত, নিষ্পাপ মুখটাতে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘আজ থেকে ঠিক তোমার মৃত্যু অবধি আমি তোমায় জ্বালাব, মেয়ে। ভীষণ জ্বালাব। আর তারপরেই তোমার মুক্তি।’
মেহেরুনের মুখের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে চুপচাপ নিজের জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ল ওয়াহীদ। মেহেরুন তাকাল। হাসল অল্প। ভাবল, ‘আমাকে জ্বালাতে গিয়ে নিজে না আবার জ্বলে যান, ওয়াহীদ শিকদার।’
ঠিক আটটা। মেহেরুনের কানের ভেতর কেউ হরতাল করছে মনে হচ্ছে। ঘুমের মাঝেই বড্ড বিরক্তিতে কপালের চামড়া কুঁচকে রেখেছে সে। কিন্তু ফায়দা পাচ্ছে না কোনো। কারোর কর্কশ স্বর বড্ড তেতিয়ে তুলছে তাকে। উপায়ান্তর না পেয়ে চোখ মেলল। কষ্ট হলো বেশ। রাতে ঘুমিয়েছেই ছয়টার দিকে। দু’ঘন্টা ঘুমে কারোর পোষায়! মেহেরুন দেখল, তার সদ্য বিয়ে করা কাঠখোট্টা স্বামীটা দু’হাত পেছনে ধরে বুক টানটান করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। চোখ মুখ এমন যেন মাত্রই কোনো দেশে যুদ্ধ সেরে এসেছে। সে চোখ ডলতে ডলতে উঠে বসল।
‘আমাদের এখানে আটটার পর কেউ ঘুমায় না। আর বাড়ির বউদের তো আরো আগে উঠতে হয়। তাও নতুন বলে আজ ছাড় পেলে। কাল থেকে যেন আমার আর ডাকতে না হয়।’
‘সবে আটটা বাজে। ঘুমিয়েছি ছয়টায়।’
ওয়াহীদ ঘুরে ফোনটা হাতে নিয়েছিল সবে। মেহেরুনের দিকে ফের চেয়ে বলল,
‘কয় ঘন্টা ঘুমিয়েছো সেই হিসেব আমি জানতে চাইনি। কাল থেকে তুমি আমার আগে উঠবে।’
মেহেরুন তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বিছানা ছাড়ল। ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল, ‘তাহলে ঘুমাতেও যাব আপনার আগে।’
জবাব ওয়াহীদের কানে গেলেও সে বলল না কিছু। মোবাইল হাতে বেরিয়ে পড়ল চুপচাপ। নিচে মেহেরুনের ভাই সাদ আর ফিহা এসেছে। সাথে তাদের দাদি। মেহেরুন সেই খবর পেয়েই ছুটে গেল সেখানে। দু’কদম হেঁটে এখানে এসেছে তারা। অথচ মেহেরুন গিয়ে এত আহ্লাদ দেখাচ্ছে যেন কত দূর থেকে তারা এসেছে। ফিহা হাসল তা দেখে। বলল,
‘আপু, বাড়িটা তো আমাদের পেছনেই। আমরা তো আর মেহমান না।’
‘বললেই হলো। যতই হোক এটা আমার শ্বশুরবাড়ি আর তোরা হলি আমার বাপের বাড়ির মানুষ।’
এই বলে মেহেরুন নিজেও হাসল। দাদি বললেন,
‘তা মামুন আর নাত জামাই কই?’
‘সকালে বের হয়েছিল, দাদি। বলতে পারছি না কোথায় গিয়েছেন।’
‘কাজে গেছে হয়তো। তুই কিন্তু এখানে লক্ষী মেয়ের মতো থাকবি, মেহেরুন। জামাই আর শ্বশুরের সাথে ভালো ব্যবহার করবি। তারা যেন কেউ কোনো অভিযোগ করতে না পারে। দাদি তো পাশেই আছি। এখন মা-বাপও আছে এখানে। তাই বইলা ঘন ঘন আবার বাপের বাড়িতে যাওয়া যাবে না। লোকে মন্দ বলব। বুঝছিস, মাইয়া?’
দাদি আগের যুগের মানুষ। যেমন দেখে এসেছে তেমনই বোঝাবে। মেহেরুন তাকে প্রসন্ন করতে বলল, ‘হু, বুঝেছি। বাড়িতে মা-বাবা আর চাচি কী করছে?’
দাদি চলে গেলেও ফিহা আর সাদ অনেকক্ষণ থাকল সেখানে। আগের মতোই বাড়ির বড়ো ব্যালকনিটাতে গিয়ে একসাথে ছবি তুলল তারা। সেখানটা বেশ সাজানো-গোছানো বলে ছবি ভালো আসে। গাছ থেকে কয়েকটা পেয়ারা ছিঁড়ে সাদ আর ফিহাকে দিল মেহেরুন। এরপর বসল এসে তাদের পাশে। ফিহা হেসে বলল,
‘আমরা কত এখানে এসেছি, ঘুরেছি। অথচ কখনো কি ভেবেছিলে, এটাই তোমার শ্বশুরবাড়ি হবে।’
মেহেরুন ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলল, ‘ভাবিনি। দুঃস্বপ্নেও না।’
‘ভালো লাগছে না বলো? কত সুন্দর বাড়ি, পরিপাটি, গোছানো। বেশি মানুষ নেই, কোনো ঝামেলা নেই, নেই কোনো হৈ-চৈ। বরটাও তো মাশা-আল্লাহ। তোমার কী ভাগ্য, তাই না?’
মেহেরুন ফিহার দিকে তাকাল। সে মনোযোগ দিয়ে আশপাশটা দেখছে। ফিহা তার থেকে দেড় দুই বছরের ছোট। তাই বলা যায়, প্রায় একসাথেই বড়ো হওয়া তাদের। মেহেরুন একটু সময় নিয়ে বলল,
‘আমাদের চোখের দেখা সবসময় সত্য হয় না, ফিহা। এমন অনেক বিষয়, অনেক ঘটনা থাকে যা সবসময় চোখের আড়ালেই থেকে যায়। তাই সবকিছু নিজের মতো করে ভেবে নিতে নেই।’
ফিহা জিজ্ঞেস করল, ‘কেন? তুমি কি এখানে ভালো নেই?’
‘ভালো থাকা বলতে তুই কী বুঝিস, বলতো? বিয়ের পর একটা সুন্দর, গোছানো বাড়ি আর সুদর্শন বর পেলেই বুঝি ভালো থাকা হয়ে যায়? আমি এখনই এই উত্তরটা দিব না। বয়স হয়েছে, তোরও তো বিয়ে হবে কয়দিন পর। তখন এই উত্তরটা তুই এমনিতেই পেয়ে যাবি।’
মেহেরুন উঠল। ফিহা মুখ গোমড়া করে বলল, ‘তুমি কি রেগে গিয়েছ, আপু?’
মেহেরুন ফিরল। হাসল। বলল, ‘তোদের উপর কি রাগতে পারি? যাওয়ার সময় এখান থেকে আরো কয়টা পেয়ারা পেড়ে নিয়ে যাস তো। মা আর চাচিকে দিবি।’
ফিহা আর সাদকে নিয়ে উঠোনে নেমে এল মেহেরুন। ফিহার ওড়ানার মাঝে অনেকগুলো পেয়ারা। মেহেরুন বলল, ‘ইফতারের পর আবার আসিস।’
সাদ বলল, ‘আসব। তুমি এখন আমাদের সাথে চলো না। বাড়িতে আমাদের একা একা ভালো লাগে না।’
‘সবাই তো আছে। একা একা কোথায়?’
‘তুমি তো নেই।’
মেহেরুন হেসে বলল, ‘পাশেই আছি। ছাদে উঠিস। দেখা হবে।’
সাদও হেসে মাথা নাড়ল। এরপর চলে গেল তারা দুজন। মেহেরুন দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। ঘরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। পুরো বাড়িতে সে একা। খালা আছে যদিও। কিন্তু সেও এখন নিজের ঘরে ঘুমাচ্ছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশপাশটা দেখল। পরিচিত পরিবেশে দাঁড়িয়েও কেমন একটা অস্বস্তি লাগছে যেন। হয়তো তার নতুন একটা পরিচয় হয়েছে বলে। হয়তো এই বাড়ির বউ হয়েছে বলে।
মেহেরুনের ভাবনা ফুরাল গাড়ির হর্ণের শব্দে। চেয়ে দেখল ভদ্রলোকের গাড়িটা ঠিক তার সামনে। কালো গ্লাস ভেদ করে পিঙ্গলবর্ণ চোখ জোড়া তাকেই দেখছে। পেছনের দরজা খুলে মামুন শিকদার বেরিয়ে এলেন। মেহেরুনের সামনে এসে তার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘হাঁটতে বের হয়েছিলে, মা?’
‘না, বাবা। দাদি এসেছিলেন ফিহা আর সাদকে নিয়ে। ওদের বিদায় জানাতে এসেছিলাম।’
‘আচ্ছা, আচ্ছা।’
তিনি ভেতরে চলে গেলেন এরপর। মেহেরুনও ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিল ভেতরে যাওয়ার জন্য। চেয়েছিল লোকটার মুখোমুখি না হতে। তবে পারল কই আর। ঠিকই ডাক পড়ল তখুনি। মেহেরুন পা থামাল। তবে ঘুরে দাঁড়াল না আর। ওয়াহীদ এগিয়ে এল। ঠিক মেহেরুনের পিঠের কাছটায় এসে থামল। ধীর গলায় বলল,
‘বাড়ির বউরা যখন তখন বাড়ির বাইরে বের হয়না। আর মাথায় কাপড় ছাড়া তো একদমই না। আমি যেন আর না দেখি।’
ওয়াহীদ তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে গেল। মেহেরুন দাঁতে দাঁত চেপে কতক্ষণ চেয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলল, ‘আরো একশো বার বের হব। দেখি কী করতে পারেন।’
মেহেরুন ভেতরে ঢুকে বসার ঘরে বসল গিয়ে। ভেবেছিল গোসলটা সেরে ফেলবে। কিন্তু লোকটা এখন ঘরে, সে ও ঘরে এখন যাবে না। গেলেই আবার কোনো একটা বাজে কথা বলে মেজাজ খারাপ করবে তার।
‘মেহেরুন।’
চোখ বুজল মেহেরুন। ঠিক ডাক পড়েছে আবার। তার একদমই ওই ঘরে যেতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে বরং থম মেরে এখানেই বসে থাকতে। কিন্তু সম্ভব হলো কই! লোকটার গলার স্বরে তেজ না থাকলেও যে শীতলতা আছে সেটাই মেহেরুনকে উপর অবধি নিয়ে গেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ডাকছিলেন?’
গায়ের পাঞ্জাবীটা খুলে রাখা ওয়াহীদের। শুধু সাদা গেঞ্জি পরনে। লোকটার শক্ত পোক্ত পেশীবহুল হাতযুগল দৃশ্যমান। মেহেরুন সেই দৃশ্য দেখে চোখ নামাল সঙ্গে সঙ্গেই। নয়তো বজ্জাত লোকটা রাতের মতো আবারও উল্টা পাল্টা কিছু একটা বলে বসবে।
‘স্বামী ঘরে ফিরলে স্ত্রীকে তার খোঁজ খবর নিতে হয়, কী লাগবে না লাগবে এগিয়ে দিতে হয়—এই সামান্য জিনিসগুলোও কি শিখিয়ে দিতে হবে?’
‘বলুন কী লাগবে?’
‘সবকিছু আমাকে বলে বলে কেন করাতে হবে? এখন গোসলের সময়, গরম পানি হয়েছে আমার?’
মেহেরুন বিস্মিত হয়ে বলল, ‘এই গরমেও আপনি গরম পানি দিয়ে গোসল করবেন?’
‘হ্যাঁ, করব। যাও গরম পানি করে নিয়ে এসো।’
মেহেরুন ঘুরে দাঁড়াল। মনে মনে ভাবল, ‘এই গরমেও যার গোসল করতে গরম পানি লাগে তার তো চব্বিশ ঘন্টা মাথা গরম থাকবেই। অস্বাভাবিক কিছু না।’ ভেবে নিজে নিজেই হাসল সে। এরপর গেল রান্নাঘরে।
‘গরম পানির জন্য আসছেন, খালা। হইয়া গেছে। দাঁড়ান, আমি দিয়া আসি।’
‘উনি কি সবসময় গরম পানি দিয়ে গোসল করেন?’
‘জি। বারো মাসই ছোট আব্বার গরম পানি লাগে।’
খালা পানির পাতিল নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে গেলেন। মেহেরুন তাকে সাহায্য করতে চাইলেও তিনি বললেন, এসবে তিনি অভ্যস্ত। ঘরে অনুমতি নিয়ে ঢুকতে গেলেই ওয়াহীদ বাধ সাধল,
‘আপনি কেন, খালা? মেহেরুন কোথায়?’
মেহেরুন পেছনেই। ওয়াহীদের দৃষ্টি পড়তেই সে কপাল কুঁচকে বলল,
‘তুমি থাকতে খালা কেন পানি নিয়ে উপরে এলেন, মেহেরুন?’
খালা কাচুমাচু করে বললেন, ‘খালার তো অভ্যাস নাই, আব্বা। সিঁড়ি দিয়া গরম পানির পাতিল নিয়া উঠার সময় যদি পড়ে টড়ে যান, তাহলে তো আরেক বিপদ হইব।’
‘আপনাকে তো সেসব ভাবতে বলা হয়নি। আজ থেকে আমার সব কাজ ও করবে। আমার স্ত্রী, এইটুকু ও করতে না পারলে ওকে বিয়ে করলাম কেন?’
‘কাজ করার জন্য লোকের প্রয়োজন হলে কোনো কাজের মেয়ে নিয়ে আসতেন। অযথা আমাকে কেন বিয়ে করতে গেলেন?’
চলবে…