পর্ব :০২
অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ফারিন । তাকাবে না এই অসভ্য অভদ্র পুরুষের দিকে । এখন ঢং করা হচ্ছে ওর সামনে ! শ*য়*তা*ন লোক একটা জীবনেও মাফ করবে না একে ।
ফারিনের মুখের দিকে মুখ উঁচু করে তাঁকিয়ে আছে আসিফ । দুই হাতে এখনো ধরে আছে দুই কান । চোখে মুখে ফুটে আছে অপরাধী ভাব । অপরাধীর ন্যায় পুনরায় বলে ,
_ সরি ।
ফারিন তবুও তাকায় না । আসিফ আবার বলে ,
_ সরি , সরি , সরি ভুল করে ফেলেছিলাম সেদিন মাফ করে দাও প্লিজ । সেদিন ভুল টা আমাদেরই ছিল কিন্তু তোমার কাছে মাফ না চেয়ে উল্টো তোমার সাথে বাজে বিহেভ করেছি , সরিও বলিয়েছিলাম ।
ফারিন অন্য দিকে তাকিয়েই মুখ ভেংচি কাটে । এখন সরি বলা হচ্ছে ! সেদিন বার বার বলেছিল আমার দোষ নেই , আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে । বজ্জাত লোক টা শোনেনি সেদিন । বন্ধুরা বোঝানোর চেষ্টা করলো ওদের কথাও শুনলো না । যা মনে হলো তাই বলে গেলো , করে গেলো । আর আজকে আসছে কান ধরে ডং করে সরি বলতে ! হুহ ।
আসিফ নববধূর দিকে তাকিয়ে থাকে । ওর বউ টা এত পাষাণ কেনো ? ওর দিকে একবার ফিরেও তাকাচ্ছে না। মানুষ মাত্রই তো ভুল , মানুষ ভুল না করলে কে করবে ?
_ বউ সরি ।
বউ সম্বোধন শুনে তড়িৎ গতিতে আসিফের দিকে তাকায় ফারিন । ব্যাটা কান ধরে অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে ।
_ সরি বউ, মাফ করে দাও না গো বউ ।
কি নির্লজ্জ লোকরে বাবা ! বিয়ে হয়েছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা , এর মধ্যেই কিভাবে কথা বলছে । লাজ লজ্জা নেই কি এর মধ্যে ?
_ সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি সরি ।
এক নিশ্বাসে বলে থামে আসিফ । সরি শব্দ গুলো আসিফ বললেও শ্বাস যেন ফারিনের বন্ধ হয়ে আসছিল। এক দমে কিভাবে বললো ?
আসিফ জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিচ্ছে । আর একটু হলেই শ্বাস আটকে ম*রে যেতো ।
কান থেকে হাত সরিয়ে ফারিনের দুই হাত চেপে ধরে । ফারিন হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দুই কদম পিছিয়ে যায় ।
_ সেদিন তুমি বাইকে ধাক্কা না দিয়ে যদি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ময়লার ড্রেনে ফেলে দিতে, কারের নিচে ফেলে দিতে তাহলে তোমাকে আমি কিছুই বলতাম না । কিন্তু বাইকে ধাক্কা দেওয়ায় আমার মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল । রাগে অন্ধ হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম । তাই অমন ব্যবহার করে ফেলেছিলাম ।
এতো টাই রেগে ছিলাম যে কারো কথাই আমার শুনতে ইচ্ছে করছিল না । দোষ তোমার ছিল না এটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না তখন । তাইতো অমন করে ফেলেছি ভুল হয়ে গেছে মাফ করে দাও না প্লিজ ।
ফারিন তবুও কিছু বলে না । ছেলে মানুষ বলেই এত রাগ থাকতে হবে নাকি ? সবাই বলছিল ওর দোষ নেই তবুও ওর সাথে কি ব্যবহার টাই না করেছিল বদ লোক টা ।
_ পা ধরে মাফ চাইতে হবে ? আচ্ছা তাই হোক তাহলে ।
বলেই ফারিনের পা ধরার জন্য উদ্যত হয় । ফারিন দ্রুত পিছিয়ে যায় , এগিয়ে যায় আসিফ ।
উপায় না পেয়ে আসিফের দুই হাত ধরে ফারিন ।
_ কি করছেন পাগল হয়েছেন নাকি ?
_ মাফ করছো না কেনো তাহলে ?
_ আচ্ছা মাফ করে দিয়েছি উঠুন এখন ।
_ সত্যি করেছো তো ?
_ হ্যাঁ সত্যি করেছি , আমি মিথ্যে বলি না । উঠুন এখন ।
আসিফ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু এতক্ষণ ধরে হাঁটুতে ভর করে থাকার কারণে পা ব্যাথা হয়ে গেছে ।
উঠতে গেলেই মনে হচ্ছে পা দুটো হ্যাং হয়ে গেছে । আহ্ কি ব্যাথারে , তবুও উঠে দাঁড়ায় । ফারিন বুঝতে পারে আসিফের পা ব্যাথা হয়ে গেছে । কতক্ষন ধরে এভাবে ছিল ব্যাথা তো করবেই ।
অফিসের হাত তখনো ফারিনের হাতের মুঠোয় ।
হাত ধরেই বেডে বসায় আসিফ কে । সেন্টার টেবিলের উপর থেকে পানি ভর্তি গ্লাস টা নিয়ে আসিফের হাতে দেয় পানি খাওয়ার জন্য । আসিফ নতুন বউয়ের দিকে তাকায় , আহা কী কেয়ারিং বউ ।
আসিফ গ্লাসের সব টুকু পানি শেষ করে । এটারই প্রয়োজন ছিল , গলা টা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল ।
আসিফ নিজেই সেন্টার টেবিলের উপর খালি গ্লাস রেখে দেয় । ফারিন নীচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেরুন রঙের লেহেঙ্গায় অপ্সরার মতন লাগছে ।ফারিন নার্ভাস সেটা বোঝা যাচ্ছে ।
মিনমিন করে বলে ,
_ পা ধরতে যাচ্ছিলেন কেনো ? পাগল হয়েছেন নাকি ?
আসিফ দুই হাতে ভর করে মেরুদন্ড সোজা করে বসে ।
_ ধরতে গিয়েছিলাম , ধরিনি তো ।
_ আমি না আটকালে তো ধরতেন ।
_ কে বলেছে ? আমি জানতাম তুমি আমাকে আটকাবে, আর না আটকালেও পায়ের কাছ থেকেই ফিরে আসতাম ।
বলেই দাঁত কেলিয়ে হাসে । ফারিন কিছু না বলে চুপ চাপ দাঁড়িয়ে থাকে । কি বদ লোক ভাবা যায় ?
আসিফ বেড থেকে উঠে দাঁড়ায় । এগিয়ে যায় আলমারির সামনে । চাবি দিয়ে আলামরির লক খুলে ভেতর থেকে ছোট একটা প্যাকেট বের করে । সেটা নিয়ে এসে দাঁড়ায় ফারিনের সামনে । প্যাকেট বাড়িয়ে দেয় ফারিনের দিকে ।
_ নাও এটা তোমার ।
ফারিন মুখ তুলে আসিফের মুখের দিকে তাকিয়ে হাতে থাকা প্যাকেটের দিকে তাকায় ।
_ কি এটা ?
_ কাবিনের টাকা ।
_ এগুলো নিয়ে আমি কি করবো ?
নিঃশব্দে হাসে আসিফ ।
_ এগুলো তোমার , এগুলোতে তোমার হক, তোমার অধিকার । তোমার যা ইচ্ছে করতে পারো , যাকে ইচ্ছে দিতে পারো আমার কোনো সমস্যা নেই ।
বলে নিজেই ফারিনের হাতে টাকা গুলো দেয় ।
ফারিন প্যাকেট টা হাতে নিয়ে বুঝতে পারে বেশ ভারী প্যাকেট । এখানে কত টাকা আছে ? ওর দেনমোহর কত ধার্য্য করা হয়েছিল ? বিয়ে পড়ানোর সময় কাজী বলেছিল তবে ফারিনের মনে নেই ।
_ খুলে দেখো ভেতরে টাকা আছে নাকি কাগজ ।
ফারিন প্যাকেটের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আসিফের মুখের দিকে তাকায় ।
_ খুলে দেখো ।
_ খুলতে হবে না ।
_ আরে খুলে দেখো টাকার বদলে কাগজও তো দিতে পারি । হাসবেন্ড বলেই কি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করবে নাকি ? খোলো খোলো ।
আসিফের জোরাজুরিতে প্যাকেট খোলে ফারিন । ভেতরে এক হাজার টাকার নোটের বান্ডিল চার টা আর পাঁচশ টাকার নোটের বান্ডিল দুটো ।
মোট পাঁচ লক্ষ টাকা আছে । ফারিনের চোখ বড় বড় হয় । দেনমোহর পাঁচ লক্ষ টাকা ধার্য্য করা হয়েছিল ? এই টাকা গুলো আসিফের নাকি ওর বাপের টাকা দিয়ে দেনমোহর পরিশোধ করলো ?
ফারিনের মনের কথা হয়তো বুঝতে পারলো আসিফ ।
_ এগুলো আমার টাকাই । আমার সামর্থ্য আছে এর থেকেও বেশি দেনমোহর পরিশোধ করার । কিন্তু বড়রা যা নির্ধারণ করেছে সেটাই দিয়েছি আমি । এই সব টাকা এখন থেকে তোমার । এই পুরো রুম টাও তোমার আর পুরো আমি টাও ।
শেষের চার টা বাক্য ফারিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বলে । আসিফ এত কাছে আসায় ফারিনের পুরো শরীর শিরশির করে ওঠে । শরীরের প্রত্যেক টা লোম খাড়া হয়ে যায় । হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায় । শরীর যেন কাঁপতে শুরু করে ।
_ আমি কি তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরতে পারি ?
আসিফের কথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে যায় ফারিনের গাল দুটো । কিছু না বলে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকে ।
_ নীরবতা সম্মতির লক্ষণ ধরে নেবো ?
ফারিন তবুও কিছু বলে না ।
আসিফ দ্রুত দুই হাতে বাহুডোরে আবদ্ধ করে ফারিন কে । শক্ত করে চেপে ধরে বুকের মাঝে ।
দুজনের হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক ভাবে ছুটছে । একে অপরের হার্টের ধুক ধুক শব্দ শুনতে পাচ্ছে স্পষ্ট ।
ফারিন কে জড়িয়ে ধরে রেখেই আসিফ বলে ,
_ প্রথম দেখায় তোমার সাথে ঝগড়া হয়েছিল যদিও তুমি করোনি আমিই করেছিলাম । আর সেটা প্রথম দেখাও ছিল না আগেও অনেক বার দেখা হয়েছিল তবে কথা হয়নি আর না আমরা জানতাম একে অপর কে ।
দ্বিতীয় বার ভার্সিটির গেটের বাইরে , ভুল করে তোমার পায়ের উপর মুখের পানি ফেলেছিলাম । তোমার সেদিনের নীরবতা আমাকে ভাবিয়েছে অনেক । বার বার তোমাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে । তৃতীয় বার ইচ্ছে করেই তোমার পায়ের উপর পানি ফেলেছিলাম কিন্তু আশ্চর্য্য হয়েছিলাম সেদিন অনেক বেশি । তুমি দেখেছিলে আমি ইচ্ছে করেই তোমার পায়ের উপর পানি ফেলেছি তবুও তুমি কিছু বলোনি । তোমার শান্ত দৃষ্টিতে তাকানো , নিকাবের ভেতরে মায়াবী দুই চোখে সেদিন নজর আটকেছিল আমার । তোমার ঐ শান্ত দৃষ্টিতে তাকানো , মায়াবী চোখ জোড়া আমার রাতের ঘুম কেড়ে নেয় । তোমার নীরবতা আমাকে আরো বেশি করে টানতে থাকে তোমার দিকে। অজান্তেই মুখ থুবড়ে পরি তোমার প্রেমে , জড়িয়ে যাই তোমার মায়ায় , তোমার ভালোবাসায় । তোমাকে একদিন না দেখলে উন্মাদের মত লাগতে শুরু করে , নিজেকে কেমন পা*গ*ল পা*গ*ল লাগতো । আমি বার বার ছুটে গিয়েছি তোমাকে এক নজর দেখবো বলে । কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম তোমাকে এভাবে দেখে আমার মন ভরছে না । তোমাকে দেখার পরেও আমার অস্থিরতা দূর হতো না । বার বার ইচ্ছে করতো তোমাকে একটু ছুঁয়ে দিতে , তোমার কাছে যেতে , তোমার ভালোবাসা পেতে কিন্তু তা ছিল অসম্ভব । আমি কল্পনাও করিনি তোমার মায়ায় এভাবে জড়িয়ে যাবো । মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তোমাকে আপন করে পাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠবো । আমাকে অনেক মেয়েই প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে এখন অব্দি । অনেক মেয়েকে ভালোও লেগেছে তবে কখনো প্রেমে পড়ার মত বা মায়ায় জড়ানোর মত ভালো লাগেনি । আমার প্রেম, ভালোবাসা , বিয়ে এসবের প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না কখনোই । কিন্তু তোমাকে তৃতীয় বার দেখার পর ধুম করেই প্রেমে পড়েছি , ভালোবেসেছি , মায়ায় জড়িয়েছি । তোমার এই মায়াবী চোখ জোড়া আমাকে উন্মাদ করেছে , আমার হৃদয় ব্যাকুল বানিয়েছে । তোমাকে পাওয়ার জন্য ছটফট করিয়েছে । তবে তোমাকে ধরা ছোঁয়া ছিল আমার সাধ্যের বাইরে ।
এতো টুকু বলে থামে । শ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করে ,
_ ভালোবাসার দাবি নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়ানোর সাহস আমার হয়নি । তোমার সাথে যা করেছি তার পর কিভাবে তোমার সামনে দাড়িয়ে বলবো ? আমি তোমাকে ভালোবাসি । এরকম বলার মুখ তো আমি রাখিনি । তাই আর তোমার সামনে দাঁড়ানোর সাহস হয়নি । তাই সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ের পর তোমাকে ভালোবাসার কথা জানাবো ।
তারপর আমি আব্বু কে বলে তোমার বাবা দাদার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাই , এবং তোমাকে জানাতে নিষেধ করি । প্রথমে ওনারা নাকচ করে দেন । তারপর আমি নিজেই যাই । ওনারা আমাকে চেনেন জানেন আমি কেমন ছেলে ! আমাকে ছোট থেকেই দেখে এসেছেন । অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, বুঝিয়ে বলার পর তারা রাজী হন । আর ফাইনালি আজ তুমি আমার শুধুই আমার । আজ তোমাকে অনন্ত কালের জন্য পেয়ে গেছি আমি । আর কেউ আলাদা করতে পারবে না তোমাকে আমার কাছ থেকে ।
আসিফের সব কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে ফারিন । ও কি ভেবেছিল আসিফের সম্পর্কে আর কি হলো ? ও ভাবতো আসিফ আবার ওর উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতো রোজ । সুযোগের অভাবে কিছু করতে পারতো না । কিন্তু আজকে ওর সব ধারণা , ভাবনা ভুল প্রমাণ হলো ।
আসিফ আরেকটু শক্ত করে বুকে চেপে ধরে বলে ,
_ আই লাভ ইউ ফারিন ।
নিশ্চুপে শোনে ফারিন । রাত বেড়ে সময় গড়িয়ে বারোটা পেরিয়ে গেছে ।
ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে করে চলছে ।
আসিফ ফারিন কে ছেড়ে দাঁড়ায় । দুই হাতে আগলে ধরে ফারিনের মুখ । ক্যান্ডেলের লাল আলো আর ড্রিম লাইটের নীল আলোয় অদ্ভুত রকমের সুন্দর লাগছে ফারিন কে । ফারিনের মায়াবী চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ মাশা আল্লাহ আমার বউ সবচেয়ে সুন্দর । আমার বউয়ের দিকে যেই ব্যাডা নজর দিবে ওই ব্যাডা সারা জীবন সিঙ্গেল থাকবে । আর যদি বিবাহিত থাকে তাহলে বউয়ের সাথে বড় সরো ঝামেলা বেঁধে থাকবে সারা জীবন ।
আসিফের কথা শেষ হতেই ফারিন হেঁসে ওঠে । কি সুন্দর সেই হাসি , যেন মুক্ত ঝরে পড়ছে ।
_ হাসলে তো তোমাকে আরো বেশি সুন্দর দেখায় ।
আসিফের ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে নেশালো কন্ঠে বলা বাক্য শুনে লজ্জায় দৃষ্টি নামিয়ে নেয় ফারিন ।
আসিফ ফারিন কে টেনে আবার বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে । আগের মতই নেশালো কন্ঠে বলে ,
_ মা*রতে চাও আমাকে ? এভাবে লজ্জা পেলে তো শেষ হয়ে যাবো আমি ।
লজ্জায় আসিফের বুকে মুখ লুকায় ফারিন ।
কি কি ভেবেছিল আর কি কি হচ্ছে !
_ থাক আর লজ্জা পেতে হবে না । একটু লজ্জা বাঁচিয়ে রাখো একটু পরের জন্য । তখন তো বোধহয় ছুঁয়ে দিতেই গোলে যাবে , যা লজ্জাবতী তুমি ।
ফারিন এক হাতে শক্ত করে খামচে ধরে আসিফের শেরওয়ানি ।
এভাবে লজ্জা দিতে হবে কেনো ?
_ লেহেঙ্গা চেঞ্জ করে ফ্রেস হয়ে নাও , রাত শেষ হয়ে গেলো ।
বলেই আসিফ ফারিন কে ছেড়ে দেয় ।
নিজের টাওয়েল ট্রাউজার নিয়ে এগিয়ে যায় ওয়াশরুমের দিকে । যাওয়ার আগে রুমের লাইট অন করে দিয়ে যায় । মুহূর্তেই ফকফকা হয়ে যায় পুরো রুম। ফারিন আবারো পুরো রুমে নজর বুলায় । বেশ শৌখিন ভাবে সাঁজানো গোছানো রুম টা ।
ফারিন হেঁটে এগিয়ে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায় । নিজেকে ভালো ভাবে দেখে আয়নায় । সত্যি আজকে ওকে অনেক সুন্দর লাগছে । নিজেকে নিজেই চিনতে পারছে না আজ । লেহেঙ্গা আর জুয়েলারিতে সৌন্দর্য্য বেড়েছে বহু গুণে । ফারিন নিজেকে দেখে নিজেই আবার হাসে । মুগ্ধ হচ্ছে বার বার ।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েই জুয়েলারি খুলতে শুরু করে । আস্তে আস্তে সব গুলো খুলে নেয় ।
দোপাট্টা খুলে সোফার উপরে রেখে দেয় ।
সুটকেস খুলে একটা হালকা লাল রঙের শাড়ি নেয় সাথে ব্লাউজ পেটিকোট ।
সোজা হয়ে দাড়াতেই ওয়াশরুম থেকে উদাম গায়ে বেরিয়ে আসে আসিফ । ভেজা চুল গুলো কপাল ময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ।
ঘোর লাগা দৃষ্টিতে ফারিনের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ বউ এই রূপ চেঞ্জ করো নাহলে পাগল হয়ে যাবো । নিজেকে কিন্তু কন
বাকি কথা শেষ করার আগেই ফারিন লজ্জায় দ্রুত ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে যায় আসিফ কে পাশ কাটিয়ে ।
আসিফ ওয়াশরুমের বন্ধ ডোরের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ আল্লাহ আমার বউ টা এতো সুন্দর কেনো ?
,
,
দুজনেই নফল নামাজ আদায় করে নেয় ।
জায়নামাজে বসে থেকেই একে অপরের দিকে তাকায়। দৃষ্টির মিলন হতেই চোখ নামিয়ে নেয় ফারিন । ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আসিফ । লাল শাড়িতে এখনো অসম্ভব রকমের সুন্দর লাগছে । বউয়ের তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠ জোড়া টানছে ওকে ।
দুজনেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় ।
জায়নামাজ ভাঁজ করে আলমারিতে তুলে রাখতেই আসিফ রুমের লাইট অফ করে ড্রিম লাইট অন করে । ক্যান্ডেল গুলো প্রায় শেষের দিকে , নিভে যাবে খুব শীগ্রই ।
ফারিন আলমারি লাগিয়ে পেছন ফিরতেই আসিফ ওকে পাঁজা কোলে তুলে নেয় । বেডের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ফিসফিস করে বলে ,
_ ধৈর্য্যের বাধ ভেঙ্গে গেছে বউ ।
আসিফের নগ্ন বুকে মুখ লুকায় ফারিন । লোকটা এত ঠোঁট কাটা কেনো ? আর এত দ্রুত পাঞ্জাবী ও খুলে নিয়েছে । আবার বলে কিনা ধৈর্য্য শেষ !
ফারিন কে বেডে শুইয়ে দিয়ে সোজা হয়ে ওর উপরে শুয়ে পড়ে । আসিফের সুঠাম দেহের নিচে চাপা পড়ে ফারিনের ছিমছাম গড়নের দেহ টা ।
দুজনের শ্বাসের গতি অস্বাভাবিক । আসিফের গরম শ্বাস আছড়ে পড়ছে ফারিনের চোখে মুখে । ফারিনের চোখ জোড়া বন্ধ , তিরতির করে কাপছে ওষ্ঠ জোড়া ।
কিয়ৎক্ষণ কাঁপতে থাকা ওষ্ঠ জোড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের ওষ্ঠ দারা চেপে ধরে ফারিনের ওষ্ঠদয় ।
একটু পরেই আবার ছেড়ে দেয় আসিফ । ফারিনের ঘাড়ে মুখ গুজে বলে ,
_ এভাবে মরার মত পড়ে থাকলে বাসর বাসর ফিলিংস হয় নাকি ? রেসপন্স করো বউ ।
বলে নিজেই খুলে নেয় ফারিনের গায়ের বস্ত্র । আবার চেপে ধরে ফারিনের ওষ্ঠদয় ।
আপনা আপনি ফারিনের দুই হাত খামচে ধরে আসিফের চুল ।
গভীর ভাবে ডুবে যেতে থাকে একে অপরের মাঝে ।
প্রথম বারের মতন মিলন ঘটে একে অপরের ।
______________________
ফজরের আযানের ধ্বনি কানে ভেসে আসতেই ঘুম ছুটে যায় ফারিনের । নড়া চড়া করার চেষ্টা করলে বুঝতে পারে আসিফ আস্টেপিস্টে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে ।
নড়া চড়া করার চেষ্টা করলেও লাভ হয় না , সাপের মত পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে চার হাত পা দিয়ে । ফারিনের মাথা ঠেকে আছে আসিফের নগ্ন বুকে ।
আসিফের শ্বাস ভারী , গভীর ঘুমে বিভোর বোঝা যাচ্ছে। ফারিনের রাতের কথা স্মরণ হতেই লজ্জায় মরি মরি অবস্থা । হৃদস্পন্দন বাড়তে শুরু করে আবার । চোখ খিঁচে বন্ধ করে নেয় ।
চলবে...........
( কেমন হয়েছে অবশ্যই মতামত জানাবেন সবাই )
বউয়ের থেকে বেশি কষ্ট যেন ওর নিজের হচ্ছে । ইচ্ছে করছে বউয়ের সব কষ্ট ন্যানোসেকেন্ডে লাঘব করে দিতে ।
বেডে শুয়ে ব্যাথায় কাতরালেও একটু পর পর ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আসিফের দিকে তাকায় ফারিন ।
ব্যাথা হচ্ছে ওর কিন্তু কষ্ট পাচ্ছে আসিফ । বেচারার চোখে মুখে যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট ।
বউয়ের এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে টেনশনে প্রেশার হাই করে ফেলেছে । মাথা ঘুরিয়ে ঠাস করে আছড়ে পড়েছিল হসপিটালের ফ্লোরে ।
নার্স ঔষুধ পানি খাইয়ে বেডে বসিয়ে রেখে গেছে তারপর ।
দুই পরিবারের সবাই উপস্থিত আছে হসপিটালে । আজ ফারিনের ডেলিভারির পেইন উঠেছে ।
মাঝ খানে পেরিয়ে গেছে আড়াই বছর ।
এই আড়াই বছরে ফারিনের সাথে উচু গলায় কথা বলেনি আসিফ । বউয়ের সাথে রাগারাগি , ধমকাদমকি , বা কোনো কিছু নিয়ে মনোমালিন্য হয়নি কখনোই । ফারিন যথেষ্ট শান্ত স্বভাবের মেয়ে , তাই দুজনের বন্ডিং অসাধারণ । আর আসিফ ও নিজেকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে নিয়েছে । একদম বউ পাগল হয়ে গেছে । বাড়ির সবাই ওকে বউ পাগল বলেই ডাকে , তাতে আসিফের কোনো ভাবান্তর হয় না । বরং এতে আরো খুশিই হয় । ওর বন্ধুরাও ওকে বউ পাগলা বলে ডাকে । যেই আসিফ দিনের পর দিন বাহিরে কাটাতো বন্ধুদের সাথে, সেই আসিফ এখন এক দিনের জন্যও বউ ছাড়া কোথাও যায় না । বউ না গেলে ওকে একদিনের জন্য ধরে বেঁধেও কোথাও নিয়ে যাওয়া যায় না । যেই আসিফ শেষ রাত অব্দি বন্ধুদের সাথে ঢাকার রাস্তায় বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়াতো, সেই আসিফ এখন রাত নয়টার পর এক মিনিট বাড়ির বাইরে থাকে না ।
দুনিয়া উল্টে গেলেও ও বাইরে থাকবে না বউ ছাড়া । বাড়ি ফিরবেই নয়টার মধ্যে যেভাবেই হোক ।
বাংলাদেশের যেসব পর্যটক স্থানে বাইক নিয়ে যাওয়া যায় , সেই সব স্থানে বাইকে করে বউ কে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে আসিফ । ফারিন যেতে না চাইলেও জোর করে নিয়ে গেছে । রাইড না করে থাকতে পারবে না আবার বউ ছাড়াও থাকতে পারবে না । তাই বউ কে সাথে নিয়েই ঘুরে বেরিয়েছে বাংলাদেশের প্রত্যেক টা জেলায় । বিয়ের পরে বাড়িতে থাকার থেকে বাহিরেই কেটেছে বেশি দুজনের । আসিফ শুধু বাংলাদেশে ঘুরে বেড়ায় না , অনেক বার ইন্টারন্যাশনাল ট্যুর দিয়েছে । বিয়ের পর বউ কে নিয়ে তিন টা ইন্টারন্যাশনাল ট্যুর দিয়েছে ।
আসিফ আগে বাইক নিয়ে ট্যুরে গেলেও আস্তে আস্তে ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরের প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়েছে ।
আসিফের নেশা টুর দেওয়া , বাইক রাইড করা , বাইক স্ট্যান্ট করা , বিভিন্ন পর্যটক স্থানে ঘুরে বেড়ানো , সেসব ভিডিও ধারণ করা । তার পর সেই ভিডিও গুলো ইডিট করে নিজের ফেসবুক পেজ , ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা । আসিফ একজন ইউটিউবার , সাথে ফেসবুকার , অনেক আগে থেকেই মিডিয়ায় আছে ও , সেই কলেজ লাইফ থেকেই । আগে বাইক রাইড করার সময় ব্লগ তৈরি করতো ছোট ছোট । সেগুলো ইডিটিং ফিডিটিং করে ইউটিউব, ফেসবুকে আপলোড করতো । আস্তে আস্তে ফ্যান ফলোয়ার বারে। সকলের কাছে পরিচিত হয় রাইডার আসিফ আরমান নামে ।
ইউটিউব , ফেসবুক পেজে ফলোয়ার সাস্ক্রাইবার বাড়তে থাকে হু হু করে ।
ভিডিও আপলোড করার পর পরই প্রত্যেক ভিডিও তে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ হয় এখন ।
আসিফের ইউটিউব চ্যানেলে সাস্ক্রাইবার 10 মিলিয়ন প্লাস বর্তমান , ফেসবুক পেজে ফলোয়ার 3 মিলিয়ন প্লাস ।
বিয়ের আগে ইউটিউব চ্যানেলে সাস্ক্রাইবার ছিল 6 মিলিয়ন প্লাস । আড়াই বছরে 10 মিলিয়ন প্লাস হয়ে গেছে । আসিফের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে । ওর কাছে কয়েক ব্র্যান্ডের নামি দামি বাইক আছে । যেগুলো নিজের টাকায় কিনেছে । প্রথম বাইক টা শুধু বাবার টাকায় কিনেছিল । বাইকের নেশার সাথে সাথে বউ নেশাও ধরেছে । নিজের থেকে বউ আর বাইকের বেশি যত্ন করে ।
আসিফ বাইক রাইডের পাশাপাশি বাইক স্ট্যান্ট করে । যার জন্য ওর জনপ্রিয়তা আরো বেশি । ইয়াং জেনারেশন বাইকার আসিফ আরমান বলতে পাগল । সবাই ওর মতো হতে চায় ।
আসিফ বউ কে সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে ব্লগ তৈরি করলেও ওর কোনো ব্লগে ওর বউ কে দেখা তো দূরের কথা ওর বউয়ের ভয়েজ ও কেউ কোনো দিন শোনেনি।বউ কে ক্যামেরার সামনে কখনোই আনে না । ফারিন আগে থেকেই বোরকা হিজাব পরেই চলা ফেরা করে , এখনো তাই করে । বউ কে নিয়ে রাইডে বের হলেও বোরকা হিজাব পরিয়ে নিয়েই বের হয় । ওর বউ কে কেউ দেখুক আসিফ চায় না ।
ফারিন বিয়ের কয়েক দিন পর বুঝতে পারে ওর ভার্সিটির মেয়েরা কেনো আসিফ আরমানের উপর ক্রাশ নামক বাঁশ খেয়ে বসে আছে ! ওর জন্য মেয়েরা কেনো পাগলামি করে ! কেনো সবাই জানটুস জানটুস বলে ফ্যানা তুলে ফেলে মুখে ! আর আসিফ কে কেনই বা নিয়মিত ভার্সিটিতে দেখা যেতো না ! শুধু পরীক্ষা আর ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস থাকলেই ভার্সিটিতে তার আগমণ ঘটতো । আর মেয়েরা উপচে গিয়ে পড়তো ওর উপর । শুধু কি মেয়েরা ? ছেলেরাও দৌড়ে গিয়ে সেলফি বন্দী হতো আসিফের সাথে আর ওর বন্ধুদের সাথে ।
আর আসিফ কেনই বা সারাদিন বাইক আর বন্ধুদের নিয়ে টই টই করে বাউন্ডুলের মত ঘুরে বেড়াতো !
এতো টা ফেমাস হওয়ার পরেও আসিফের মধ্যে কোনো অহংকার বা সেলিব্রেটি হিসেবে যে আলাদা একটা ভাব থাকে সেটা ছিল না কখনোই । আর পাঁচ টা সাধারণ ছেলের মতই ছিল চলা ফেরা । ফুটপাতের টং এর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খাওয়া , বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি করা । তাইতো ফারিনের মনে হয়েছে এই ছেলে বাউন্ডুলে । ঠিক মত পড়াশোনা করে না , কোনো কাজ কর্ম করে না , সারাদিন শুধু টো টো করে ঘুরে বেড়ায় দেশের এমাথা থেকে ওমাথা ।
আসিফের ব্যাপারে অনেক কিছু জানলেও এটা জানতো না আসিফ একজন ব্লগার, ইউটিউবার ।
যেই মেয়েরা আসিফ আরমান কে নিয়ে কথা তুলতো তাদের কাছ থেকে সরে আসতো সব সময় । এই আসিফ আসিফ শুনতে ইচ্ছে করতো না , আর না ওর বিষয়ে জানতে আগ্রহী ছিল ।
আসিফ যেই পরিমান ফারিন কে ভালোবাসে , ওর যত্ন করে তা দেখে ফারিন মাঝে মধ্যে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে । এই আসিফের ব্যাপারে কত কিছু ভেবেছিল , বিয়ের পরেও বন্ধু আর বাইক নিয়ে পড়ে থাকবে , ওকে বাড়িতে ফেলে সারাদেশ ঘুরে বেড়াবে । বাড়িতে একটা বউ ওর অপেক্ষায় থাকবে সেটাও ভুলে যাবে ।
কিন্তু সেসব কিছুই হয়নি , আসিফ এখন বন্ধু আর বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও বউ কে সাথে নিয়েই বের হয় । ওর বন্ধুর বউ রাও যায় সাথে ।
রাত নয়টার পর তো জীবনেও বাইরে থাকবে না । বাড়িতে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ বউয়ের সাথেই চিপকে থাকে । বেচারি জামাইয়ের জ্বালায় বাড়ির মানুষদের সাথেও ঠিক ভাবে সময় কাটাতে পারে না ।
পাগলের মতো ভালোবাসে ফারিন কে । ফারিন বলতেই পাগল । ফারিনের নাম স্মরণ হতেই আসিফের ঠোঁটে অটোমেটিক হাসি ফুটে ওঠে । বউয়ের জন্য কি না করেছে আসিফ ? যা যা করা সম্ভব সব করেছে ।
ফ্যামিলি কেও অনেক ভালোবাসে । সকলের জন্যই আসিফ নিজের সাধ্য অনুযায়ী করেছে , করছে , ভবিষ্যতেও করবে ।
,
,
ছোট ভাইয়ের অবস্থা দেখে বড় ভাই আতিফ আয়মান ঠোঁট চেপে হাসে । ভাই কে ধরে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে । শুয়ে থাকতে বললেও শুতে রাজি নয় আসিফ । অন্য কেবিনে ওকে নিতে চেয়েছিল কিন্তু আসিফ বউ কে ছেড়ে অন্য কেবিনে যাবে না । ওর জেদের কাছে হার মেনে ফারিনের কেবিনেই নিয়ে আসা হয়েছে ।
আর ওকে ধরেই দাঁড়িয়ে আছে বড় ভাই । কে জানে ছেড়ে দিলে হয়তো মাথা ঘুরে ঠাস করে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো ।
একটু পরেই ফারিন কে ওটিতে নেয়া হবে । একটা সার্জারি চলছে এখন , ওটা শেষ হলেই ফারিন কে নেয়া হবে ওটিতে ।
নরমাল ডেলিভারি পসিবল নয় ফারিনের । বেবি তুলনামূলক বেড়ে উঠেছে । তাই সিজার অপারেশন করতে হবে ।
,
,
ফারিন কে ওটি তে নিয়ে যাওয়ার জন্য নার্স আসে । আসিফ তখন বউয়ের হাত ধরে বসে আছে । যেখানে ব্যাথায় যন্ত্রণায় বউয়ের হাত পা কাপবে সেখানে ভয়ে কষ্টে ওর হাত পা ঠকঠক করে কাপছে । ফারিন কে কি সাহস দেবে ? উল্টো ফারিন ওকে সাহস দিচ্ছে ।
বাড়ির সবাই বুঝাচ্ছে ফারিনের কিছু হবে না , কিন্তু কে শোনে কার কথা ?
ওর মুখে এক বুলি , "তোমাকে বার বার বলেছিলাম এখনই বেবি নেওয়ার প্রয়োজন নেই আরো কয়েক বছর যাক । আমার কথা শুনলে না , এখন কি হবে ?
বেচারি ফারিন হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না ।
কোনো ছেলে মানুষ বউয়ের ডেলিভারির সময় এত ভয় পায় আগে দেখেনি । ওর বিয়ের পর ওর বড় জায়ের দ্বিতীয় সন্তান হলো , কই ওর ভাসুর তো এমন করেনি ! এক মায়ের পেটের ভাই দু'জন অথচ দুজনের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক । নিঃসন্দেহে ওর ভাসুরের চেয়ে ওর হাসবেন্ড শক্ত হৃদয়ের পুরুষ । কিন্তু এই শক্ত হৃদয়ের পুরুষ মানুষ টা ওর প্রেগন্যান্সির পর থেকে কি যে শুরু করেছে !
ফারিন সকলের কাছে আবারো মাফ চায় , সকল কে দোয়া করতে বলে ওর আর বেবির জন্য । শেষ বারের মত আসিফ কে সাহস দেয় , আশ্বাস দেয় ওর কাছে ফিরে আসবে ।
ফারিন কে ওটির ভেতরে নিয়ে চলে যায় ।
আসিফের শ্বাস যেন আটকে আসছে । হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেছে । হাত পা আরো বেশি ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করে । চোখ দুটো আবারো ঘোলা হয়ে আসে । সারিবদ্ধভাবে রাখা চেয়ারে বসে পড়ে । ওর পাশে এসে বসে আতিফ । ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে ভরসা দেওয়ার মত করে বলে ,
_ রিল্যাক্স হ , এত ভয় পাচ্ছিস কেনো ? কিছুই হবে না ইনশা আল্লাহ । ফারিন আর বেবি দুজনেই সুস্থ্য স্বাভাবিক ভাবেই ফিরে আসবে ।
আসিফ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায় ।
_ বউ টা তো তোমার না , তুমি বুঝবে কিভাবে কেমন লাগে ?
_ এমন ভাবে বলছিস যেনো আমার বউয়ের বাচ্চা হয়নি ! আমার বউয়েরও দুজন বাচ্চা হয়েছে ।
_ তোমার বউ কে তুমি বেশি ভালোবাসোনি তাই আমার মত অবস্থা হয়নি তোমার । ভালোবাসলে ঠিক আমার মতই অবস্থা হতো তোমার ।
_ মাথার সব পোকা নড়ে গেছে নাকি তোর ? উল্টা পাল্টা কথা বলছিস কেনো ? বউয়ের জন্য টেনশন করতে করতে পাগল হয়ে যাসনি তো আবার ?
_ আমি পাগল হইনি , পাগল তোমরা সবাই ।
_ দুনিয়ার কোনো ছেলে কে দেখেছিস তোর মত অবস্থা হতে ?
_ ভাইয়া চুপ করো না টেনশন হচ্ছে তো ।
_ আরেহ টেনশন কমানোর জন্যই তো কথা বলছি ।
আর আমার ভাই অনেক সাহসী একজন পুরুষ মানুষ । সে নিজের আজরাঈল নিজের সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় , সে কেনো আজ এত ভয় পাচ্ছে ?
_ ভাইয়া গো বউয়ের জায়গায় আমি থাকলে জীবনেও ভয় পেতাম না ।
_ ছি ছি ছি কি বলছিস তুই এসব ? তুই প্রেগনেন্ট হবি ?
কটমট করে তাকায় আসিফ । ওর টেনশনে জান যায় যায় অবস্থা আর ওর ভাই ওর সাথে মজা নিচ্ছে ।
দাঁত কিড়মিড় করে বলে ,
_ আমি এমন কিছু বলিনি , আমি বলেছি ফারিনের বদলে আমি ওটিতে থাকলে জীবনেও এত ভয় পেতাম না । যে কোনো কারণেই ওটিতে থাকতাম , এক্সিডেন্ট বা অন্য কোনো কারণে । সব সময় শুধু উল্টা পাল্টা কথা , যাও তো আমার কাছ থেকে ।
আসিফ নিজেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় । বাড়ির সবাই অধীর আগ্রহে ওটির ডোরের দিকে তাকিয়ে আছে । আসিফ ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকে ।
কয়েক মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পরেই একজন নার্স সাদা টাওয়েলে পেছানো নবজাতক শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে আসে ওটির ভেতর থেকে । আসিফ ওদিকেই তাঁকিয়ে ছিল , নার্স কে দেখেই স্থির হয়ে দাঁড়ায় । নার্স এসে দাঁড়ায় ওর সামনে । বাড়ির সবাই ঘিরে ধরে ।
আসিফ হাত বাড়িয়ে বেবি কে কোলে তুলে নেয় । কোলে নিয়েই আগে বেবির পা*ছায় দুটো চর মা*রে আলতো ভাবে । নার্স সহ বাড়ির সকল সদস্য বড় বড় চোখ করে তাকায় ।
আসিফ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ আট টা মাস আমার বউ কে অনেক জ্বালিয়েছিস সেজন্য এই দুটো চর তোর শাস্তি ।
কথা শেষ করে ছেলে কে বুকে জড়িয়ে ধরে পরম ভালোবাসায় । নার্সের দিকে তাকিয়ে ফারিনের কথা জিজ্ঞেস করে । নার্স জানায় ফারিন ঠিক আছে , তারপর আবার ভেতরে চলে যায় ।
মনে মনে হাসে আসিফের কাণ্ড দেখে , সদ্য জন্ম নেওয়া সন্তান কে আগে আদর না করে শাস্তি দিয়ে নিলো বউ কে জ্বালাতন করায়।
আসিফের কথা শুনে সবাই ড্যাব ড্যাবিয়ে তাঁকিয়ে আছে ওর দিকে। এই ছেলে কোন মাটি দিয়ে তৈরি ?
আসিফ নিজেই ছেলের কানের কাছে মুখ নিয়ে আজান দেয়।
কি যে আনন্দ হচ্ছে ওর। এতক্ষণের টেনশন যেন এক নিমিষেই গায়েব হয়ে গেছে। বেবি ও ঠিক আছে ওয়াইফ ও ঠিক আছে। বাবা হওয়ার কি যে সুখকর অনুভূতি। নিজের রক্ত , নিজের অস্তিত্ব , নিজের সন্তান কে ছুঁয়ে দেখা পৃথিবীর সব আনন্দ কে হার মানায়।
ওর সন্তান কিভাবে ওর বুকের সাথে লেপ্টে আছে। একটুও কাদঁছে না। বেবি কি বুঝতে পারছে ও ওর বাবার কোলে রয়েছে এখন? ওর বাবা ওকে আদর করছে ? বুঝতে পারছে কি কিছু ? ড্যাব ড্যাব করে তাঁকিয়ে আছে তো বাবার মুখের দিকে । হয়তো বুঝতে পারছে এটাই ওর বাবা ।
আসিফ ছেলে কে বার কয়েক ডাকে বাবা বাবা বলে । ছেলে বাবার মুখে বাবা ডাক শুনে এদিক ওদিক চোখ ঘুরায় দ্রুত । ছেলের রিয়াকশন দেখে হাসে আসিফ ।
আসিফের কোল থেকে একে একে সবাই কোলে নেয় বেবি কে ।
বেবি বেশ বড় সরো হয়েছে , নাদুস নুদুস । কোলে নিলে কোল ভর্তি মনে হচ্ছে । কারো নজর না লাগুক ।
,
,
ফারিন কে কেবিনে শিফ্ট করা হয় । সাথে সাথেই আতিফের মেয়ে আনজারা বয়স আট বছর , ও ছোট মায়ের কাছে নালিশ জানায় ।
_ ছোট মা চাচ্চু বাবু কে মে*রে*ছে পা*ছায় ।
চোখ বড় বড় করে তাকায় ফারিন । এই লোক নিজের বলা কথা ঠিকই পালন করেছে তাহলে । এই ছোট ছেলে কে সত্যি সত্যিই মে*রে*ছে !
বেবি পেটে থাকা অবস্থায় যখন কিক মা*র*তো ব্যাথায় ককিয়ে উঠতো ফারিন । প্রচুর পরিমাণে নড়াচড়া করতো , সেই সঙ্গে একের পর এক কিক মে*রে*ই যেতো । ব্যাথায় যখন ফারিনের মুখের রঙ পরিবর্তন হয়ে যেতো , তখন আসিফ কটমট করে ক্ষেপাটে দৃষ্টিতে ফারিনের উচুঁ পেটের দিকে তাকিয়ে থাকতো । আর বলতো ,
_ তুই শুধু একবার দুনিয়ায় আয় তারপর দেখ তোর কি অবস্থা করি আমি । আমার বউ কে কষ্ট দেওয়া ? একটু পর পর কিক মা*রা ? রাতে ঠিক মত ঘুমোতেও দিস না। তুই দুনিয়ায় আসলে আগে তোর পা*ছায় দুটো দেবো তারপর বাকি সব কিছু । বজ্জাত ছেলে তোর একা কত জায়গা লাগে ? একাই তো আছিস একটু চুপ চাপ থাকতে পারিস না ? ওখানে তো আরেক টা অংশীদার নেই যার সাথে তুই জায়গা নিয়ে বিবাদ করিস , ঠ্যালা ঠেলি করিস , এই টুকু আমার এই টুকু তোর । তুই আমার জায়গায় আসবি না , তুই আমার জায়গায় আসবি না এরকম তো কোনো ব্যাপার নেই । তার পরেও তোর কিসের লাইত্থা লাইত্থি আসে হ্যাঁ ? ফুটবল খেলিস পেটের ভেতরে ? ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ হচ্ছে ওখানে ? আরেক টা কিক মারবি তো পেটের ভেতরে ঢুকে তোকে মা*র*বো ।
ছেলে সাথে সাথেই আরেক কিক মা*র*তো । লাস্ট দুই টা মাস অনেক কষ্ট করেছে ফারিন । বেবির তুলনামুলক ভাবে ওজন বেড়ে যাওয়ায় অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে ফারিনের । ঠিক মত খেতে না পারা , রাতে ঘুমোতে না পারা , পস্রাব ঠিক মত করতে না পারা ।
রাতে শোয়ার পর বেবি যখন পেটের উপরের দিকে উঠে আসতো তখন ব্যাথায় চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসতো ফারিনের । আর ওর কষ্ট দেখে আসিফের চোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়তো ।
উচু পেটে হাত বুলিয়ে আদর করে চুমু খেয়ে বলতো ,
_ বাবা একটু চুপ হয়ে থাক না , মাকে এত কষ্ট দিচ্ছিস কেনো ? মায়ের কষ্ট হচ্ছে তো বাবা , নিজের জায়গায় থাক না , এদিক ওদিক কেনো চলে জাস ?
আসিফ রাতের পর রাত জেগেছে ফারিনের সাথে । আধশোয়া হয়ে ফারিন কে নিজের বুকে ঘুম পারিয়েছে। পেটের উপর হাত রেখে বেবির মুভমেন্ট অনুভব করেছে। প্রচুর নড়াচড়া করতো সাথে জোড়ে জোড়ে কিক মা*র*তো । ছেলে কে কোনো ভাবেই বোঝাতে পারতো না "বাবা তুই নড়া চড়া কর কিন্তু কিক মা*রি*স না । কিক মা*র*লে মা ব্যাথা পায় ।
,
_ তুমি সত্যি সত্যিই বাবু কে মে*রে*ছো ?
_ মা*র*বো না ? আমার বউ কে দিনের পর দিন কষ্ট দিয়ে এসেছে , ওকে তো জেলে ভরে দেওয়া উচিত মায়ের উপর নির্যাতন করার কারণে ।
আসিফের কথা শুনে কেবিনে উপস্থিত সবাই হেঁসে ওঠে। ফারিন নিজেও হাসে । পাগল লোক একটা ।
শীতে ঠকঠক করে কাপছে ফারিন । দুটো কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে ফারিন কে , তবুও ওর শীত কমছে না। একটা টাওয়েল হাতে নিয়ে ফারিনের মাথায় আলতো ভাবে পেঁচিয়ে ধরে রাখে আসিফ । শরীর পুরো বরফের ন্যায় ঠান্ডা হয়ে গেছে ।
___________________
কেটে যায় আরো চার টা বছর ।
আসিফ ফারিনের ছেলে ফারাজ । আসিফের মতোই চঞ্চল প্রকৃতির দুরন্ত ছটফটে । তিন ভাই বোন মিলে সারা বাড়ি মাথায় তুলে রাখে ।
বাপ ছেলের মধ্যে যেমন রয়েছে ভালোবাসা তেমনি রয়েছে শ*ত্রুতাও । এমনিতে ছেলে কে জান প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসে আসিফ । ছেলে যখন যা বলে , যা চায় , যেভাবে যা বলে সব কিছুই করে আসিফ । পারলে ছেলে কে নিজের কলিজা বের করে দিতেও প্রস্তুত ।
কিন্তু ছেলে যদি ভুল ক্রমেও ওর বউ কে কিছু করে তখন ছেলে হয় ওর জাত শ*ত্রু । ওর সব চেয়ে বড় শ*ত্রু ওর নিজের ছেলে ।
এই ছেলের অভ্যাস খুবই খারাপ , কথায় কথায়
কা/ম/ড় বসায় । ওর প্রাণ প্রিয় বউ টাকে কত শত বার যে কা/ম/ড় দিয়েছে হিসেব নেই । ইঁদুরের মত ছোট ছোট ধারালো দাঁত ক্যাচ ক্যাচ করে কা/ম/ড়ে র*ক্ত বের করে দেয় । বজ্জাত ছেলে একটা , মাঝে মধ্যে আসিফের ইচ্ছে করে ছেলের দাঁত গুলো তুলে নিতে । যেন কাউকে কা/ম/ড় দিতে না পারে বিশেষ করে ওর বউ কে ।
কিন্তু মায়া করে আর তুলতে পারে না দাঁত গুলো । ছেলে কে কত ভাবে বোঝায় কা/ম/ড় যেন না দেয় । কত ঘেন্না দেখায় , ভয় দেখায় , মাঝে মধ্যে ভীষণ রাগ দেখায় । তবে কোনো কিছুতেই কোনো লাভ হয় না ।
বিকেলে ছেলে কে বেডে বসিয়ে খাবার খাওয়াতে শুরু করে ফারিন । আসিফ ওয়াশরুমে রয়েছে । ফারাজ একটু আগেই ঘুম থেকে উঠলো । আসিফ ওকে ফ্রেস করিয়ে রেখে ওয়াশরুমে প্রবেশ করেছে নিজে ফ্রেস হওয়ার জন্য ।
কয়েক লোকমা খাবার খাওয়ার পর আর খাবেনা বায়না ধরে । ভালো ভাবে ছেলে কে বুঝিয়ে সুঝিয়ে খাওয়াতে চায় ফারিন । বাড়ির অন্য সকল সদস্যদের সামনে থাকলে খেতেই চায় না । লাফিয়ে উঠে চলে যায় তাদের কাছে । শুধু মাত্র আসিফ সামনে থাকলে চুপ চাপ খায় ।
জোর করে খাওয়াতে গেলেই কব্জির উপরে ছোট ছোট দাঁত দিয়ে কা/ম/ড় বসায় জোড়ে ।
ছেলের মুখ থেকে হাত ছড়ানোর চেষ্টা করেও পারে না ফারিন । ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে ওঠে।
ফারিনের চিৎকার শুনে দ্রুত ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে আসিফ । বেডের দিকে তাকাতেই চোয়াল শক্ত হয় ।
আসিফ দৌড়ে বেডের কাছে এসেই সজোড়ে ছেলের পিঠে চর বসায় ।
চর খেয়ে মায়ের হাত ছেড়ে দেয় ফারাজ । বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিকট শব্দে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ।
হতভম্ভ হয় ফারিন , এই টুকু ছেলে কে কেউ এত জোড়ে চর দেয় ?
দ্রুত ছেলে কে ধরতে যায় তার আগেই আসিফ ফারিনের হাত টেনে ধরে থামিয়ে দেয় । তাকায় ফারিনের হাতের দিকে , এত জোড়ে কা/ম/ড় দিয়েছে যে র*ক্ত বেরিয়ে এসেছে ।
চোখ মুখ শক্ত করে তাকায় কান্নারত ছেলের দিকে ।
সজোড়ে ধমক দিয়ে বলে ,
_ আরেক টা চর দেবো নাকি ? চুপ কর তারাতারি ।
_ ওকে মা"র"লে কেনো ? আবার ধম*কাচ্ছো !
_ মা*রবো না কি করবো তাহলে ? শ"য়*তা*ন বদ ছেলে একটা , কি জোড়ে কা/ম/ড় টা দিয়েছে , রক্ত বেরিয়ে এসেছে । ওর নামে তো মামলা করা উচিত ।
ফারিন ছেলে কে ধরতে যায় আবার । আসিফ ফারিন কে থামিয়ে দেয় আবারো । বউ কে বুকে জড়িয়ে ধরে ছেলের দিকে রাগী চোখে তাঁকিয়ে বলে ,
_ একদম ধরবে না ওকে । যার পেটের ভেতরে বেড়ে উঠলো , যার শরীর চুষে চুষে খেয়ে বড় হলো তাকেই কা/ম/ড়ে কা/ম/ড়ে জখম করে শুধু । কত বড় সাহস, আমার বউ কে কা/ম/ড় দেয় ! আজ পর্যন্ত এত বছরেও বউয়ের গায়ে ফুলের টোকা দেয়নি আমি , আমার সেই বউ কেই চার টা বছর ধরে কা/ম/ড়া/য় । ওর দাঁত আজ সব তুলে নেবো আমি । এই চল ডেন্টিস্টের কাছে ।
চলবে.............
( ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক কমেন্ট করবেন সবাই )
পর্ব:০৪
ফারিন আর ফারাজ এর চিৎকার শুনে বাড়ির উপস্থিত সবাই আসিফের রুমে চলে আসে ।
বেডের দিকে তাকিয়ে দেখে, আসিফ বউ কে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে রাগী দৃষ্টিতে।
ফারাজ দুজনের দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে চিৎকার করে কান্না করছে । ফারিন আসিফের কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইছে তবে পারছে না ।
আসিফের মা দ্রুত পায়ে নাতির কাছে এসে দাঁড়ায় । হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলায় ।
এতো গুলো মানুষের সামনেও আসিফ ফারিন কে ছারে না ।
আসিফের মা আঞ্জুমান আরা বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ কি হয়েছে ওদের দুজনের ? এভাবে চিৎকার করছে কেনো ?
খেঁকিয়ে উঠে আসিফ বলে ,
_ তোমার শ*য়*তা*ন বদ রা*ক্ষ*স নাতি আমার বউ কে কা*ম*ড় দিয়েছে । কা*ম*ড় দিয়ে র*ক্ত বের করে দিয়েছে দেখো ।
বলেই ফারিনের হাত ধরে মায়ের সম্মুখে ধরে । আঞ্জুমান আরা বেগম ফারিনের হাতের দিকে তাকায় ।অনেক টা জায়গা জুড়ে দাঁত দাবিয়ে দিয়েছে , র*ক্ত জমাট বেঁধে গেছে, একটু র*ক্ত বেরিয়েও এসেছে ।
আহারে অনেক ব্যাথা করছে বোধহয় ।
আবার তাকায় নাতির মুখের দিকে । এখন কান্নার বেগ কমেছে ।
_ ফারাজ কাদঁছে কেনো ? ওকে কি করেছিস ?
ফারিন বলে ,
_ আপনার ছেলে আমার ছেলের পিঠে মেরেছে । ধরতেও দিচ্ছে না , ধরে রেখেছে আমাকে ।
ততক্ষণে রুমের ভেতর চলে এসেছে সবাই । আসিফের দাদি , ভাবী , ভাই , ভাইয়ের ছেলে মেয়ে । আসিফের বাবা বাড়ীতে নেই , ব্যবসার কাজে বাহিরে রয়েছেন ।
আতিফ ফারাজের টিশার্ট উপরে তুলে পিঠের দিকে তাকায় । পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ পড়ে আছে পিঠে । কি জোড়ে মেরেছে ।
আসিফের মুখের দিকে তাকায় , চোখ মুখ শক্ত করে তাঁকিয়ে আছে ছেলের দিকে ।
_ এভাবে মেরেছিস কেনো ছেলে টা কে ? পুরো পিঠ লাল হয়ে গেছে ।
_ ওর পিঠের ছাল যে তুলে নেয়নি এটাই তো অনেক । আমার বউয়ের হাতে কা*ম*ড় দিয়ে যে র*ক্ত বের করে দিয়েছে সেটা চোখে পড়ছে না তোমার ?
_ ওর সাথে ওর তুলনা ?
_ কেনো তোমার ভাতিজা মানুষ ,আমার বউ মানুষ না ?
আতিফ কিছু না বলে চুপ হয়ে যায়। এই বউ পাগলের সাথে কথা বলে লাভ নেই। বউ কে কা*মড় দিয়েছে বলে ছোট ছেলে টা কেই মেরেছে ।
ফারিন আসিফ কে ঠেলে নিজের থেকে সরানোর চেষ্টা করে বলে ,
_ ছাড়ো, মাথা খারাপ হয়েছে তোমার পাবনায় নিতে হবে। ছাড়ো আমাকে।
_ আমার মাথা একদম ঠিক আছে , কোনো সমস্যা হয়নি। এই ছেলে কে আর একবারও খাওয়াবে না তুমি। সেদিনের মত হাত দিয়ে খাবি নয়তো সারাদিন না খেয়ে থাকবি বদ ছেলে। ভালো বুঝে খাওয়াতে গেছে , না খেয়ে উল্টো তোর বাঁদরামি শুরু হয়েছে।
বাবার রাগী স্বরে বলা কথা শুনে আবার কেঁদে ওঠে ফারাজ। মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে কাঁদে। ফারিন ছেলে কে কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেও আসিফ নিতে দেয় না। এই ছেলে কে শাস্তি না দিলে জীবনেও ঠিক হবে না।
ওর বউ কে কা*ম*ড়ে কা*ম*ড়ে আধমরা বানিয়ে ফেলবে। শুধু মা কে কা*ম*ড়া*য় না বড় ভাই বোন কেও কা*ম*ড়া*য় । রা*ক্ষ*স ছেলে খাবার খেতে চায় না অথচ বাড়ির সবাই কে কা*ম*ড়ে কা*ম*ড়ে খেতে চায়।
ছেলের শাস্তি বরাদ্দ করে আসিফ ।
_ আজকে রাতে তুই আমার বউয়ের কাছে ঘুমাতে পারবি না। খেতেও পারবি না। কি খাবি, কোথায় যাবি যা ।
বাবার কথা শেষ হতেই আরো জোরে কেঁদে ওঠে ফারাজ । মা কে ছেড়ে সে এক রাত ও থাকতে পারবে না। মা খাইয়ে না দিলে খাবারও খাবে না ।
আতিফ দাদীর দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ আমাদের বংশে এরকম বউ পাগলা আর কে ছিল ? বউ কে একটু কা*ম*ড় দিয়েছে বলে চার বছরের ছেলে কে এভাবে মারলো ।
আসিফ কিছু বলবে তার আগেই দাদি বলে ,
_ আর কার মত হবে ? তোর দাদার মতোই হয়েছে ।
_ আমার দাদা এমন বউ পাগলা ছিল ?
_ এমন না এর থেকেও বেশি ছিল ।
_ কিভাবে ?
_ তখন তোর বাপ চাচারা ছোট ছিল । তোর মেজো চাচা দুষ্টামি করতে গিয়ে ভুল করে আমার উপর ছোট একটা ফুলদানী ফেলে দিয়েছিল । সেটা আবার তোর দাদা দেখেছিল । তারপর তোর চাচা কে মানে আমার সাত বছরের ছেলে কে হাত পা বেঁধে বারো ঘণ্টা রুমের মধ্যে আটকে রেখেছিল । ওকে রুমের ভেতর আটকে রেখে রুম তালা দিয়ে রুমের বাইরে বসে ছিল , কেউ যেন ওই রুম থেকে ওকে বের করতে না পারে ।
ঝগড়া করেও ওকে রুম থেকে বের করতে পারেনি কেউ । পুরো বারো ঘণ্টা পর ছেলে কে রুম থেকে বের করে রাম ধমক দিয়ে বলেছিল "দ্বিতীয় বার তার বউয়ের কিছু করলে হাত পা ভেঙ্গে দেবে । তার পর থেকে অনেক দিন ভয়ে ছেলে আমার কাছেই আসতো না । তারপর একবার তোর ছোট চাচা খাবার খাবে না বলে রেগে ভাতের থালা ছুঁড়ে ফেলেছিল । তখন ওর বয়স আট বছর । তোর দাদা ছেলের পিঠে ধুম ধাম তিন টা লাগিয়ে দিয়েছিল । ভাত ফেলেছে সেজন্য না , ওই ভাত তখন আমার পরিষ্কার করা লাগতো সেজন্য । ছেলের ঘাড়ে ধরে ওই ভাত পরিষ্কার করিয়েছিল তোর দাদা ।
দাদীর কথা শেষ হতেই লম্বা এক শ্বাস টেনে নেয় আতিফ । মায়ের কোল থেকে ভাতিজা কে নিজের কোলে তুলে নেয় । পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে ,
_ বেঁচে গেছিস বাবা , এখন আর কাদিস না ।
তারপর ভাইয়ের দিকে তাকায় ।
_ দোষ তো আমার ভাইয়ের না , দোষ ওর র*ক্তে*র ।
তারপর ভাইয়ের কাঁধে চাপড় দিয়ে বলে ,
_ সরি ভাই , না বুঝে এত দিন তোকে অনেক কিছু বলে ফেলেছি । এই স্বভাব যে আমাদের বংশ পরম্পরা আমি জানতাম না । এই বংশের ছোট ছেলেরা হয় বউ পাগলা। আমার দাদা ছিল তার বাপের ছোট ছেলে , সে ছিল বউ পাগলা , শুধু পাগলা না মারাত্মক পাগলা । আবার আমার দাদার ছোট ছেলে মানে আমার ছোট চাচা সেও কিন্তু বউ পাগলাই । ছোট চাচাতো ভাই টা ভুল করে চাচী কে ধাক্কা দিয়ে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল । সে জন্য চাচা তার ছেলে কে ধরে পুকুরে চুবিয়েছিল ।
সেই হিসেবে তো তুই কিছুই করিসনি ভাই ।
সরি ভাই সরি ।
বলেই ভাতিজা কে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় ।
কি আর করবে বাকি সবাই ও বেরিয়ে যায় ।
আসিফ রাগে গজগজ করতে করতে এন্টিসেপটিক এনে ফারিনের ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দেয় । তারপর একটু মলম লাগিয়ে দিয়ে, একটা পেইন কিলার খাইয়ে দেয় ।
ফারিন কিছু বলে না , এই পাগল যা যা করে তাই করতে দেয় । খালি বাটিতে পানি এনে ফারিনের এটো হাত ধুইয়ে দেয় । সব শেষে আবার জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে । কত বড় সাহস ওর বউ কে কা*ম*ড় দেয় !
কলিজা টা জ্বলছে ভীষণ ভাবে , বুকে ব্যাথা করছে ।
ফারিন নিজেও দুই হাতে জড়িয়ে ধরে আসিফের কোমড় । আসিফের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ শুধু শুধু ছেলে টা কে মারলে কেনো ? ছোট মানুষ বোঝে কি কিছু ? বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে ।
আসিফ কিছু না বলে বউয়ের মাথা বুকে চেপে ধরে ।
ওর যা খুশি হয়ে যাক কিন্তু বউয়ের চুল পরিমাণ কষ্ট হলে ওর হুশ থাকে না ।
যখন দেখলে ফারাজ ফারিনের হাতে কামড় দিয়ে ধরে আছে আর ফারিন হাত ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে আর চিৎকার করছে । তা দেখেই ওর শরীরের রক্ত টগবগিয়ে ওঠে । রাগে ক্ষোভে ফুঁসে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ছেলে কে মেরে বসেছে ।
আহারে ছোট ছেলে টা কত ব্যাথা পেয়েছে ।
একটু খারাপ লাগলো আসিফের ।
,
,
সময় গড়ায় , বিকেল গড়িয়ে ধরণী অন্ধকারে তলিয়ে গেছে ।
আসিফ সেই যে বিকেল থেকে ফারিন কে নিয়ে রুমে বসে আছে রুম থেকে আর বের হয়নি, আর না ফারিন কে বের হতে দিয়েছে ।
ফারাজ ও আর ভয়ে বাবা মায়ের কাছে আসেনি ।
ফারিন আজ ভীষণ বিরক্ত আসিফের উপর । কি শুরু করেছে তখন থেকে । না নিজে বের হচ্ছে আর না ওকে বের হতে দিচ্ছে । ছেলে টা কি করছে কে জানে ! বিকেলে খেয়েছে কি ? রাত হয়ে গেছে নিশ্চই অনেক খিদে পেয়েছে ।
_ ছাড়বে নাকি আমাকে ?
_ কি করবে তুমি ?
_ ফারাজ কে খাওয়াবো ।
_ ওকে কেনো খাওয়াবে ? এক দিন না খেয়ে থাকলে মরবে না । বদ ছেলেটার একটা শিক্ষা হওয়া উচিত ।
_ আমার ছেলে কে একদম বকাবকি করবে না তুমি ।
_ উম্ নিজের ছেলের জন্য খুব দরদ তাইনা ? তোমার ছেলে যে আমার বউ কে কষ্ট দেয় তখন আমার কষ্ট হয় না বুঝি ?
_ আল্লাহ কোন পাগলের কপালে আমাকে রেখেছিলে ? নিজের ছেলের সাথে কেমন ব্যবহার দেখেছো ?
আসিফ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে ,
_ এই ছেলে ভালো না , চলো আরেক টা ছেলে নিয়ে আসি ।
_ এক ছেলে কেই হিংসের শেষ নেই আবার আরেক ছেলে ? এই জনমে ভুলেও আর ছেলে মেয়ের নাম মুখে নেবে না । গত পাঁচ টা বছরে আমার শিক্ষা হয়ে গেছে । বাবু পেটে থাকে আমার আর কষ্ট হয় তোমার । বুকের দুধ খায় আমার তাতেও কষ্ট হয় তোমার । রাতে ছেলে মাকে জড়িয়ে ধরে একটু ঘুমাবে সেটাও সহ্য হয় না তোমার । ছেলে কে টেনে নিয়ে বেডের আরেক পাশে রেখে আসো । ছোট বাচ্চারা একটু দুষ্টামি করেই , মাকে একটু জ্বালাবই , তোমার জন্য সেটাও করতে পারবে না। কেমন বাবা তুমি ?
_ দুনিয়ার যত অকাজ আছে সব করুক তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই । কা*ম*ড়ে খা*ম*চে আমার শরীর থেকে মাংস তুলে নিক তাতেও আমার কোনো সমস্যা নেই । পুরো বাড়ির জিনিস ভাংচুর করে দিক সমস্যা নেই, আমি আবার কিনে নিয়ে আসবো । ও যা যা করতে চায় করবে , যা এনে দিতে বলবে তাই এনে দেবো । কিন্তু আমার বউয়ের গায়ে সামান্য ফুলের টোকা দিলেও ওর হাত ভেঙ্গে দেবো আমি ।
_ এত ভালোবাসো কেনো আমাকে ?
_ জানিনা , শুধু জানি আমি তোমাকে ভালোবাসি । তোমার কিছু হলে আমি সহ্য করতে পারি না । আমার অন্তর জ্বলে , বুকে কষ্ট হয় , শ্বাস আটকে আসে ।
_ এত বেশি ভালো বাসতে নেই বাইকার মশাই ।
_ কেনো ?
_ বেশি ভালোবাসলে হারিয়ে যায় তারাতারি ।
হঠাৎ আসিফের মুখে অন্ধকার নেমে আসে । শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফারিন কে । ঘাড়ে মুখ গুজে চুপ হয়ে যায়। আর একটা কথাও বের করে না মুখ দিয়ে ।
ফারিন বুঝতে পারে ভুল বাক্য বলে ফেলেছে ।
এখন কয়েক ঘণ্টা আসিফের মুখে আর হাঁসি দেখা যাবে না , কোনো কথাও বলবে না ।
ফারিন আসিফের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ,
_ কি হলো কথা বলছো না কেনো ? সরি ভুল হয়ে গেছে আর কখনো এমন কিছু বলবো না । এই ওঠো তাকাও আমার দিকে । বলছি তো ভুল হলে গেছে , আর কখনো বলবো না এই ধরনের কথা । আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না । কারো সাধ্য আছে নাকি আসিফের কাছ থেকে তার ফারিন কে কেড়ে নেবে ?
ওঠো না প্লিজ , কথা বলো ।
আসিফ ওঠে না । আরেকটু শক্ত করে ধরে ফারিন কে ।
"বেশি ভালোবাসলে হারিয়ে যায় তারাতারি " বাক্য গুলো ওর উপর প্রভাব ফেলেছে । বেশি ভালোবাসলে কি আসলেই হারিয়ে যায় ?
_ কথা বলছো না কেনো ? বলছি তো আর কখনো বলবো না এরকম কিছু । ছেলে মেয়ে এনে দেবো যত জন লাগে তোমার । এক হালি পূরণ করে দেবো ওঠো এখন ।
আসিফ ফারিনের ঘাড়ে মুখ গুজে রেখেই বলে ,
_ লাগবে না , কাউকে লাগবে না । কোনো ছেলে মেয়ে চাই না আমার । এক ছেলে নিয়েই আমার সব সখ আল্লাদ পূরণ করবো আমি । আমার আর কোনো সন্তান চাই না । আমি ভুলিনি ওই দিন গুলোর কথা । আমি তোমাকে আর কোনো কষ্ট পেতে দেবো না ।
_ একটু কষ্ট সহ্য না করলে বাবা মা হওয়ার মত স্বর্গসুখ অনুভূতি কোথায় পাবো ?
_ চাই না আমার আর স্বর্গসুখ অনুভূতি । আমি এই অনুভূতি পেয়ে গেছি আমার সন্তান , আমার রক্ত , আমার বাবা কে যেদিন প্রথম কোলে নিয়েছিলাম সেদিনই । আমি আমার এক আব্বা কে নিয়েই এক জীবন পাড় করে দেবো ।
_ একটু আগেই না বললে তোমার আরেক টা ছেলে চাই।
_ এমনি বলেছি । কোনো ছেলের দরকার নেই আর । তুমি আর ফারাজ হলেই এই জীবন পাড় হয়ে যাবে ।
_ ওঠো এখন , হাত মুখ ধুয়ে নীচে চলো খাবার খেতে ।
আসিফ ফারিন কে ছেড়ে উঠে বসে । কয়েক মিনিটেই চোখ দুটো কেমন হয়ে গেছে আসিফের । ফারিন নিজেও উঠে বসে ।
,
,
ফ্রেস হয়ে নীচে নেমে আসে দুজন । ফারাজ আর আশিক বাইক চালাচ্ছে ড্রইং রুমে । ফারাজের পেছন পেছন ঘুরছে আতিফ , কখন আবার বাইক নিয়ে পড়ে যায় , কোথায় গিয়ে ধাক্কা খায় বলা যায় না ।
আশিক কে আগেই মিনি বাইক কিনে দিয়েছিল আসিফ , এখন আবার ছেলে কেও কিনে দিয়েছে ।
নিজের মত বাইকার বানাবে দুজন কেই ।
আসিফ কে দেখেই বাইক থামিয়ে মুখ কাচুমাচু করে নেয় ফারাজ । এখন কি ওকে আবার মারবে বকবে ? কিন্তু ও তো আর দুষ্টামি করেনি , মাকেও বিরক্ত করেনি। বিকেলের পর থেকে একদম শান্ত হয়ে আছে ।
ফারাজ কে আগেই খাইয়ে দিয়েছে আঞ্জুমান আরা বেগম । আজকে খাওয়ার সময় আর বায়না ধরেনি মায়ের কাছ থেকে ছাড়া খাবে না ।
বাচ্চাদের খেলতে দিয়ে বাড়ির বড়রা ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে খাবার খাওয়ার জন্য ।
খাওয়া শেষ হয় । যে যার রুমে এগিয়ে যায় ।
আসিফ ফারিন কে রুমে পাঠিয়ে দেয় জোর করে ।
তারপর আসিফ এগিয়ে যায় বাবা মায়ের রুমের দিকে। অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে । ফারাজ শান্ত ছেলের মত বেডে বসে আছে চুপ চাপ ।
আসিফ বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় । হাত বাড়িয়ে দেয় ছেলের দিকে । ফারাজ মাথা নাড়িয়ে না বলে যাবে না সে । পিছিয়ে যায় দুই হাত ।
_ আব্বা আসো ।
আবার দুদিকে মাথা নাড়ায় ।
_ ঘুমাবে না ? চলো রুমে যাই ।
_ যাবো না ।
_ কেনো ?
_ তুমি মেরেছো , বকা দিয়েছো , আবার মারবে বকা দেবে । যাবো না তোমার কাছে ।
ছেলের কথা শুনে আসিফের ভীষণ খারাপ লাগে, কষ্ট হয় । বুকের মধ্যে কেমন ছ্যাত করে ওঠে । নিজেই বেডের উপর উঠে ছেলে কে টেনে কাছে নিয়ে আসে । বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে অসংখ্য চুমু খেতে খেতে রুম থেকে বেরিয়ে যায় । আসিফের বাবা মা এতক্ষণ চুপ চাপ দেখছিল বাপ ছেলে কে ।
ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে ,
_ অনেক ব্যাথা পেয়েছিলে আব্বা ?
ঠোঁট উল্টে কাদো কাদো স্বরে বলে ,
_ হুম অনেক ।
_ সরি আব্বা আর কখনোই মারবো না ধমক ও দেবো না। তুমিও তো তোমার আম্মু কে কত জোড়ে কা*ম*ড় দিয়েছিলে । ব্যাথা পেয়ে কাদল তো তোমার আম্মু । রক্ত বের করে দিয়েছিলে । তোমার আম্মু কাঁদলে তো আমারো খুব বেশি কষ্ট হয় , ব্যাথা লাগে বুকে ।
_ আর কা*ম*ড় দেবো না ।
_ সত্যি ?
_ প্রমিজ আর কা*ম*ড় দেবো না ।
_ বেশি কামড় দিতে ইচ্ছে করলে আমাকে দিও সমস্যা নেই তবে আম্মু কে বা অন্য কাউকে দেবে না কিন্তু ।
_ আচ্ছা ।
_ কি খেয়েছো রাতে ?
_ ডাল , মুরগির গোশত আর ডিম ।
_ তোমার ছোট্ট পেটে এত কিছুর জায়গা হলো ?
_ আমার পেট বড় , আর ইট্টু ইট্টু করে খেয়েছি ।
_ মাকে কিন্তু আর জ্বালাবে না আব্বা ।
_ আচ্ছা জ্বালাবো না ।
_ আমার সাথে আগামী কাল বাইক রাইডে যাবে ?
_ কোথায় ?
_ আশে পাশেই ।
_ আম্মু যাবে ?
_ আম্মু কে রেখে যাবো । আমরা তো ঘুরতে যেয়ে আইসক্রিম খাবো , আম্মু গেলে তো খেতে দেবে না ।
_ আমি কিন্তু দুটো ভ্যানিলা আইসক্রিম খাবো ।
_ চার টা কিনে দেবো ।
_ ইয়ে কি মজা , লাভ ইউ বাবা ।
_ লাভ ইউ ভেরি মাচ আব্বা ।
কথা শেষ করে ছেলে কে আবার চুমু খায় আসিফ । ফারাজ নিজেও বাবা কে চুমু খায় ।
,
,
পরের দিন সকালে খাবার খেয়ে রুমে ফিরে আসে বাপ ব্যাটা । আনজারা আর আশিক কে কিন্ডার গার্টেনে নিয়ে গেছে ওদের মা ।
ফারিন মেডের সাথে ডাইনিং টেবিল গুছিয়ে রুমে ফিরে আসে । রুমে এসে দেখে ফারাজ ব্ল্যাক প্যান্ট, শার্ট, লেদারের জ্যাকেট , সুজ পড়ে রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে ।
আসিফ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে তৈরি করতে ব্যাস্ত । ব্ল্যাক প্যান্ট , হোয়াইট শার্ট তার উপর দিয়ে ব্ল্যাক লেদারের জ্যাকেট পড়েছে , জ্যাকেটের চেইন খোলা ।
আসিফ এমনিতেই ভীষণ হ্যান্ডসাম তারপর উপর আবার এই লুক , বরাবরের মতো নজর আটকে যায় ফারিনের ।
আসিফ পুরোপুরি তৈরি হয়ে বউয়ের দিকে তাকায় । বউ আর ছেলে দুজনেই ওর দিকে তাকিয়ে আছে হা করে ।
দুজনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আবার ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখে নেয় । মনে মনে বলে ,
_ নিজেকে এমন ভাবে তৈরি করো যেন বউ বাচ্চা এভাবেই হা করে তাকিয়ে থাকে ।
আহা আমার এই সুদর্শন হওয়া স্বার্থক ।
ফোন, ওয়ালেট , বাইকের চাবি পকেটে ভরে নেয় । ছেলের হেলমেট ছেলের হাতে দেয় ।
_ আব্বা তুমি যেতে থাকো আমি আসছি এক মিনিট পর ।
ফারাজ রুমে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেই হেলমেট পড়ে নেয়।
হেলমেটের গ্লাস এক আঙ্গুল দিয়ে নামিয়ে ভাব নিয়ে বলে ,
_ আ'ম ড্যাসিং বয় ।
বলেই আরেক দফা ভাব নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় । ছেলের কান্ডো দেখে ফারিন আসিফ দুজনেই হাসে ।
এই পুঁচকে ছেলের এখনই কত ভাব , স্টাইল । বড় হলে কি হবে আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন ।
ছেলে চলে যেতেই আসিফ ফারিন কে চেপে ধরে ।
অনেকক্ষণ পর ছেড়ে দিয়ে নিজের হেলমেট নিয়ে, হাত দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে রুম থেকে বেরিয়ে যায় ।
ফারিন ওড়না দিয়ে ঠোঁট গাল মুছে নেয় ।
তারপর এগিয়ে যায় বেলকনিতে ।
একটু পরেই বেরিয়ে আসে আসিফ । গ্যারেজ থেকে নিজের বাইক বের করে নিয়ে আসে । ফারাজ কে সামনে বসিয়ে দেয় । ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের বেলকনির দিকে তাকায় । ফারিন দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দুজনের দিকে । আসিফ ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দেয় ফারিনের দিকে । তারপর নিজেও চায় একটা । ফারিন কে চুপ চাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দুই হাত জোড় করে রিকুয়েস্ট করে । জাস্ট একটা চুমু দিয়ে দিতে বলে ।
ফারিন জানে, না দেওয়া পর্যন্ত আসিফ এমন করতেই থাকবে । কখন আবার কে দেখে ফেলে তারপর আবার লজ্জায় পড়তে হবে ।
নিজেও একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে মারে । আসিফ আরেক টা চায় । ফারিন দেয় আরেক টা । আসিফ কিস্ ক্যাচ ধরে বুকের বা পাশে চেপে ধরে লম্বা শ্বাস টেনে নেয় ।
হাত দিয়ে ফারিন কে টা টা দেখায় । তারপর ছেলে কে নিয়ে গেট পেরিয়ে বেরিয়ে যায় ।
ফারিন রুমে ফিরে আসে । চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে বেডে । ফারিন বুঝতে পারে না আসিফ ওকে এত বেশি ভালো বাসে কেনো ? কেউ বউ কে এত বেশি ভালো বাসতে পারে ?
আসিফ কে না দেখলে ফারিন জীবনেও বিশ্বাস করতো না । ফারিন নিজেও বোধহয় আসিফ কে ওর মত করে ভালোবাসতে পারে না ।
আসিফ বাড়ির প্রত্যেক টা মানুষ কে ভীষণ ভালোবাসে। তার মধ্যে বউ আর বাইক এই দুজন কে সব চেয়ে বেশি ভালোবাসে । এই দুজন ওর দুই আত্মা ।
আসিফের সাথে কাটানো সুন্দর মুহূর্ত গুলো ভাবতে শুরু করে ফারিন । এই রঙ্গিন দুনিয়ার সব কিছুই রঙ্গিন রঙ্গিন লাগে ।
বিয়ের আগে যেমন ঘর বন্দী বাড়ি বন্দী হয়ে থাকতো । ইচ্ছে থাকলেও দূরে কোথাও যেতে পারতো না ।
বিয়ের পর ঠিক ততটাই মুক্ত পাখির ন্যায় হয়ে গেছে ।
যেখানে ইচ্ছে সেখানেই যেতে পারে , মুক্ত পাখির ন্যায় খোলা আকাশের নীচে উড়ে বেড়ায় বরের হাত ধরে ।
ফারিন কে যেই ব্যাপার টা সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে সেটা হলো আসিফের ভালোবাসা , কেয়ারিং ।
আসিফ অসম্ভব কেয়ারিং মনোভাবের একজন মানুষ ।
ওর মত ছেলে লাখে একটা ।
__________________
মাঝ খানে আরো দুই মাস পেরিয়ে যায় । শীতের প্রকোপ বেড়ে চলেছে আগের তুলনায় ।
জানুয়ারি মাস চলছে ।
আজ আসিফের জন্ম দিন । জন্ম দিন উপলক্ষে ওর বন্ধুরা ওর জন্য একটা সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছে ।
যদিও আসিফ এই জন্ম দিন পালন করে না কখনোই ।
বাড়িতে কোনো রকম অনুষ্ঠান ও করে না ।
শুধু মাত্র মায়ের হাতের ভালো মন্দ নানান পদের রান্না হয় ।
এই দিন টায় আসিফ এতিম শিশুদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয় ।
এমনিতেও আসিফ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সব সময় দান সদকা করে । গরীব অসহায় মানুষ দের সাহায্য করে । এতিম খানা , আশ্রমে টাকা দান করে । কিন্তু এই দিন টায় একটু বেশি বেশি করে ।
বিকেল বেলা ব্যস্ততা শেষে বাড়ি ফিরে আসে সবাই ।
কিছু সময় জিরিয়ে নেয় । একটু পরেই আবার বের হতে হবে । বন্ধুরা কি সারপ্রাইজ রেখেছে ওর জন্য কে জানে ? সেখানেও যেতে হবে ।
আসিফ বেডে গা এলিয়ে দিয়ে শুতেই ঘুমিয়ে যায় । গত রাতে সারারাত ঘুমায়নি , আর আজ সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত হয়ে গেছে ।
ফারিন ফ্রেস হয়ে স্টাডি টেবিলের সামনে বসে চেয়ার টেনে । র্যাপিং পেপার , সেলো ট্যাপ আরো যা যা প্রয়োজন সব নিয়ে বসেছে আসিফের জন্য গিফট্ প্যাকিং করতে । গত কালকেই করে রাখতো তবে আসিফের জন্য সময় হয়ে ওঠেনি ।
এখন যেহেতু ঘুমিয়ে গেছে তাহলে নিশ্চিন্তে গিফট্ প্যাকিং করা যাবে । এখন না করলে আর করতেই পারবে না ।
ফোনের কর্কশ শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় আসিফের । চোখ মুখ কুঁচকে বেড হাতড়ে ফোন হাতে নেয় । নাম্বার না দেখেই কল রিসিভ করে কানে ধরে ।
একটু পর শোয়া থেকে উঠে বসে রুমের চারো দিকে নজর বুলায় । তারপর বেড থেকে নেমে দাড়ায় । ঢুলু ঢুলু পায়ে এগিয়ে যায় ফারিনের কাছে ।
ফারিন তখন গিফট্ বক্স টা আলমারিতে তুলে রাখছিল দ্রুত । ফারিনের হাতে গিফট্ বক্স দেখে চোখ হাত দিয়ে ডলে আবার তাকায় ।
ঘুম জড়ানো গলায় বলে ,
_ কি লুকাচ্ছো ?
ফারিন হেসে বলে ,
_ সেটা রাতেই জানতে পারবে ।
_ এখন জানলে কি সমস্যা ?
_ রাতে জানলে কি সমস্যা ?
_ কোনো সমস্যা নেই । বউ আমার কি গিফট্ লুকিয়ে রাখলো সেটা জানার জন্য মন টা ছটফট করবে এই আরকি । যাই হোক তৈরি হয়ে নাও বের হবো , সরোয়ার ফোন করেছিল দ্রুত যেতে বললো ।
_ আমি যাবো না , তুমি যাও ।
_ কেনো ?
_ ভালো লাগছে না ।
_ না যেতে হবে ।
_ কাছেই তো তুমি একাই যাও ।
_ না না তোমাকে যেতেই হবে । তুমি না গেলে আমিও যাবো না ।
_ বাচ্চাদের মত জেদ করছো কেনো ?
_ না প্লীজ চলো , দ্রুত ফিরে আসবো । চলো না বউ প্লীজ ।
_ যেতেই হবে ?
_ হ্যাঁ ।
_ কারে করে যাবো তাহলে ।
_ আচ্ছা ।
বলেই ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায় ।
ফারিন আলমারি থেকে দুজনের জন্য ড্রেস বের করে নেয় । ওরা দুজনেই যাবে , ফারাজ যাবে না সাথে ।
এই ঠাণ্ডার মধ্যে আর ফারাজ কে নেবে না , ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যাবে । আবার ফারাজ দ্রুত ঘুমিয়েও যায় । তাই ওকে রেখেই যাবে ।
দুজনেই তৈরি হয়ে নেয় । ফারিন ব্ল্যাক বোরকা হিজাব পড়ে নেয় । বোরকার উপর দিয়ে জ্যাকেট পড়ে নেয় ।
ব্ল্যাক হিজাব পরিহিতা রমণীকে দেখতে বেশ কিউট লাগছে আসিফের কাছে । চেহারার উজ্জ্বলতা বেড়েছে আগের চেয়ে । দিন দিন বয়স না বেড়ে কমছে বোধহয়।
আসিফ জড়িয়ে ধরে ফারিন কে ।
_ সব সময় এমন জড়িয়ে ধরো কেনো ?
_ তোমাকে জড়িয়ে ধরলে শান্তি লাগে মনে , বুকে , অন্তরে । ইচ্ছে তো করে সব সময় জড়িয়ে ধরে রাখি ।
_ ছাড়ো আর চলো সন্ধ্যা হয়ে গেলো । আবার ফিরতে হবে ।
আসিফ প্রয়োজনীয় সব কিছু নিয়ে নেয় ।
হেলমেট হাতে নিতেই ফারিন বলে ,
_ হেলমেট নিচ্ছো কেনো ?
আসিফ হেঁসে বলে ,
_ বাইক নিয়ে যাই প্লীজ , তোমাকে বাইকের পেছনে বসিয়ে ঘুরতে ভালো লাগে ।
আসিফ এমন ভাবে কথা গুলো বলে যে ফারিন না করতে পারে না আর ।
দুজনেই রুম থেকে বেরিয়ে আসে । নিচে নেমে আসতেই দেখে ফারাজ খেলছে । ফারিন ছেলে কে আদর করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রেখে যায় যেন ও ফিরে না আসা পর্যন্ত দুষ্টামি না করে । বাধ্য ছেলের মত মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে ফারাজ । আসিফ নিজেও ছেলেকে আদর করে সকলের কাছে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ফারিন কে নিয়ে ।
নিজের বর্তমান প্রিয় বাইক প্লাস প্রেমিকা নিনজা কে বের করে গ্যারেজ থেকে । বাইক টা আসিফের জন্য লাকী । এই বাইক টার জন্যই ওদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল । প্রথমে ঝগড়া তারপর প্রণয় । যদিও প্রণয় টা আসিফের একপাক্ষিক ছিল ।
বাইক টা এখনো আগের মতোই রয়েছে । এখন আর এটা খুব বেশি ইউজ করা হয় না । নতুন আরেক টা বাইক কিনেছে সেটাও নিনজা , ব্ল্যাক কালার ।
নিজের গাউন বোরকা টা ধরে বাইকের পেছনে উঠে বসে ফারিন । আসিফের মাথায় হেলমেট থাকলেও ফারিনের নেই । কাছেই যাচ্ছে তাই আর হেলমেট পড়ার প্রয়োজন মনে করেনি কেউ । আসিফ পড়েছে কারণ চেকিং হলে আবার পুলিশ ধরবে সেজন্য ।
_ চেপে বসো না , এভাবে বসলে কি বোঝা যায় নাকি যে পেছনে বউ আছে ? শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসো ।
_ স্প্রিড কিন্তু বাড়াবে না । ত্রিশের উপর স্প্রিড তুললে যাবো না আমি ।
_ ত্রিশের নিচেই রাখবো , জড়িয়ে ধরে বসো এখন ।
ফারিন জড়িয়ে ধরে বসে আসিফ কে ।
_ হ্যাঁ এবার ঠিক আছে ।
বাইক স্টার্ট দিয়ে গেট পেরিয়ে বেরিয়ে আসে ।
গতি সীমা ত্রিশে রেখেই এগিয়ে যায় বন্ধুদের দেওয়া ঠিকানায় ।
অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পর একটু ওয়েট করে আসিফ । একটু পরেই ওদের সাথে যোগ দেয় রায়হান । ওর সাথে ওর বউ ও আছে ।
ওর বউ বাপের বাড়ি গিয়েছিল সেখান থেকেই ধরে নিয়ে আসলো বন্ধুদের কথায় ।
চার জন এগিয়ে যায় আবার ।
রায়হানের কথায় বাইকের স্প্রিড বাড়ায় । ফারিনের চিল্লাচিল্লিতে আবার কমায় ।
_ আর একবার স্প্রিড বাড়ালে আমি নেমে যাবো মাজ রাস্তায় ।
_ সরি আর বাড়াবো না ।
_ মনে থাকে যেন ।
_ একশ পার্সেন্ট মনে থাকবে ।
_ কত থাকে সেটা তো দেখলাম এত বছর ধরে ।
আসিফ আর কিছু বলে না ।
ফারিন সাথে থাকলে স্প্রিড গতি সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে । দূরে কোথাও ট্যুরে গেলে পঞ্চাশ থেকে সত্তরে চলে যায় ।
আর একা থাকলে একশ থেকে একশ বিশে ।
ওদের সামনে থেকে ওভার স্প্রিডে ছুটে আসা একটা বাইকের ধাক্কা লেগে যায় আসিফের বাইকের সাথে । ছিটকে পড়ে বাইক দুটো সহ বাইকের চার জন মানুষ । রায়হানের বাইকের উপর এসে পড়ে একজন , রায়হান ও পড়ে যায় বাইক নিয়ে ।
মুহূর্তেই রাস্তায় হৈচৈ পড়ে যায় । আসিফ গিয়ে পড়েছে রাস্তার পাশে । নিজের আঘাতের কথা ভুলে ওর বউ কে খুজতে শুরু করে । ফারিন কোথায় পড়লো ? ওর আশে পাশে নজর বুলায় কিন্তু ফারিন নেই । একটু দূরে রায়হান রায়হানের বউ আর একটা ছেলে পড়ে আছে । রায়হান উঠে ওর বউ কে টেনে তোলার চেষ্টা করছে , ছেলে টা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে । আসিফ সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে রোডের মাঝ খানে তাকায় ।
আর সাথে সাথেই ওর মস্তিষ্কে বিস্ফোরণ ঘটে । হাত পা অসার হয়ে আসে । পুরো শরীর অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপতে শুরু করে । এক পা ও সামনে আগাতে পারে না। ফারিনের নাম ধরে আকাশ বাতাস কাপিয়ে চিৎকার করে ওঠে আসিফ ।
পর্ব:০৫
হসপিটালের আইসিইউ এর বেডে জ্ঞান ফিরতেই আসিফ অনুভব করে ওর মাথায় অসম্ভব রকমের যন্ত্রণা হচ্ছে । চোখ বন্ধ রেখেই মাথা এদিক সেদিক নাড়ায় । ব্যাথায় যন্ত্রণায় মাথা ফেটে যাচ্ছে যেন । দুই হাতে মাথার চুল মুঠো করে ধরে ডেকে ওঠে ,
_ ফারিন ।
ফারিনের নাম স্মরণ হতেই ফট করে চোখ খুলে তাকায়। ওর ফারিন কই ?
আশে পাশে নজর বুলায় । চারো দিকের পরিবেশ দেখে বুঝতে পারে এটা আইসিইউ । ও আইসিইউ তে ভর্তি ? কি হয়েছে ওর ? হাত পা উচু করে দেখে , নারা চারা করে । না সবই তো ঠিক আছে , তাহলে আইসিইউ তে ভর্তি করেছে কেনো ? মাথায় কি হয়েছে ? মাথায় এত অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে কেনো ?
স্মরণ হয় এক্সিডেন্ট হয়েছিল । এক্সিডেন্টের কথা স্মরণ হতেই উতলা হয়ে ওঠে । ফারিন কোথায় ? ধড়ফড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে ।
মুখ দিয়ে জোত জোড়ে শব্দ বের হয় তত টুকু জোরেই ফারিনের নাম ধরে ডাকে । ভেতরে থাকা নার্স দৌড়ে আসে ওর কাছে ।
_ এভাবে উঠছেন কেনো ? আপনি অসুস্থ্য , শুয়ে থাকুন।
_ আমার বউ কোথায় ? ওকে কোথায় রেখেছেন ?
_ আছে , আপনি শান্ত হোন আমি আসছি এক্ষনি ।
নার্স দ্রুত বেরিয়ে যায় আইসিইউ থেকে । আসিফ বেড থেকে নেমে দাড়ায় । মাথা যন্ত্রণায় সোজা করে রাখা দায় । চোখ খুলে রাখতেও কষ্ট হচ্ছে । ডান হাতের দিকে চোখ যায় । হাতে ক্যানুলা লাগানো রয়েছে । বাম পায়ে ও ব্যথা করছে । সেসব মালুম না করে নিভু নিভু দৃষ্টিতে এগিয়ে যায় ডোরের দিকে । প্রচণ্ড মাথা ব্যাথার কারণে কোনো কিছুই ভালো ভাবে স্মরণ হচ্ছে না । ওর কি হয়েছিল ? ও তো রাস্তায় ছিল ।
ডোর ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতেই চোখ যায় সারিবদ্ধ ভাবে রাখা গাঢ় নীল রঙের চেয়ার গুলোর দিকে ।
চেয়ারে ওর বড় ভাই আতিফ আর সরোয়ার বসে আছে। ভালো ভাবে তাকায় , ফারিন কোথায় ? ফারিন নেই ? কোথায় গেছে ? ফারিন ও কি হসপিটালে ভর্তি ? কোন কেবিনে আছে ?
শরীর টেনে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে দাড়ায় ভাইয়ের সামনে। ওকে দেখতেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় আতিফ । ওর চোখ দুটো লাল টুকটুকে হয়ে আছে । চুল গুলো উস্কখুস্ক , মলিন চেহরা । দেখে মনে হচ্ছে কেঁদেছে অনেক । ছোট ভাই কে স্নে দেখেই দ্রুত ওকে ধরে ।
_ তুই ঠিক আছিস ভাই ?
_ ঠিক আছি কিন্তু মাথায় প্রচণ্ড রকমের যন্ত্রণা হচ্ছে ।
_ উঠে আসলি কেনো ?
_ ফারিন কোথায় ? ও ঠিক আছে ?
ফারিনের নাম শুনতেই আতিফের মলিন মুখ আরো মলিন হয়ে শুকিয়ে যায় । নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে বলে ,
_ ফারিন বাড়িতে আছে , ঠিক আছে ও ।
_ ফারিন বাড়িতে ?
_ হ্যাঁ ।
স্বস্তির নিশ্বাস নেয় আসিফ । যাক ওর ফারিন ঠিক আছে । পরমুহুর্তেই কিছু মনে হতেই বলে ,
_ ফারিন বাড়িতে কি করছে ? আমাদের তো এক্সিডেন্ট হয়েছিল । ও আঘাত পায়নি ?
_ না ফারিন ঠিক আছে একদম ।
আসিফ হেসে বলে ,
_ আচ্ছা তাহলে বাড়িতে চলো তারাতারি ।
চারো দিকে নজর বুলিয়ে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায়।
_ এখন কয়টা বাজে ?
_ দুপুর দুইটা ।
পাশ থেকে বলে সরোয়ার ।
ঘাড় ঘুরিয়ে সরোয়ারের দিকে তাকায় আসিফ ।
অবাক কন্ঠে বলে ,
_ দুপুর দুইটা ? কত তারিখ আজ ?
_ সাতাশ তারিখ ।
আসিফ যেন আকাশ থেকে পড়ে । বিস্মিত হয়ে বলে ,
_ পুরো বিশ ঘণ্টা অজ্ঞান হয়ে ছিলাম ?
_ হ্যাঁ ।
_ এই কারণেই কি মাথায় এত যন্ত্রণা হচ্ছে ?
কেউ কিছু বলে না ।
_ আমি আইসিইউ তে ভর্তি রয়েছি , বিশ ঘণ্টা ধরে অজ্ঞান । বাড়ি থেকে আর কেউ আসেনি আমাকে দেখতে ?
_ সবাই এসেছিল একটু আগেই ফিরে গেছে । আবার আসতো বিকেলে , এখন যখন তোর জ্ঞান ফিরেছে তাহলে আর আসার প্রয়োজন নেই । আমরাই বাড়ি ফিরে যাই ।
এর মধ্যে ডক্টর এসে উপস্থিত হয় ওদের সামনে । আসিফ কে ঠিক ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে নেয় ।
অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে আসিফ কে সিটিস্ক্যান করতে নিয়ে যায় । সিটিস্ক্যান করার কারণ জিজ্ঞেস করলে আতিফ বলে , "মাথা ব্যাথা কেনো করছে সেটা জানার জন্যই ।
আসিফ আর কিছু বলে না । যত দ্রুত বাড়িতে যেতে পারবে তত দ্রুত ফারিনের কাছে যেতে পারবে ।
আসিফের সব রকম পরীক্ষা করা হয় দ্বিতীয় বার ।
রিপোর্ট আগের চেয়ে কিছুটা নরমাল ।
মেডিসিন লিখে দেয় , কিভাবে চলা ফেরা করতে হবে সব বুঝিয়ে বলে । জোড়ে চিৎকার করা , কান্না করা , মাথায় প্রেশার দেওয়া যাবে না । নিয়মিত মেডিসিন খেতে হবে । তিন দিন পর আবার হসপিটালে আসতে হবে । আসিফ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে , সব নিয়ম পালন করবে ।
সব শেষে হসপিটাল থেকে বের হয় তিন জন । আসিফের তর সইছে না বাড়িতে যাওয়ার জন্য । বিয়ের পর এই প্রথম বিশ ঘণ্টা ফারিনের কাছ থেকে দূরে রয়েছে । ফারিন ওর কাছে আসলেও ওতো দেখতে পায়নি ।
অভিমান হয়, ও হসপিটালে ভর্তি আর ফারিন বাড়িতে বসে আছে ? ওকে আইসিইউ তে ফেলে ফারিন কিভাবে বাড়িতে বসে আছে ? বাড়ি ফিরে কথা বলবে না ফারিনের সাথে ।
বাড়ির কাছাকাছি আসতেই আসিফের কানে ভেসে আসে একাধিক মানুষের কান্না হাহাকার আহাজারি ।
কার গেটের ভেতর প্রবেশ করতেই দেখে বাড়ি ভর্তি মানুষ । কার ভেতরে প্রবেশ করতে দেখে মানুষ জন ঠ্যালা ঠেলি করে রাস্তা ফাঁকা করে দেয় । কার এগিয়ে যায় সামনে । আসিফ বড় বড় চোখ করে আশে পাশে নজর বুলায় । এতো মানুষ জন কেনো ওদের বাড়িতে ? কার কি হয়েছে ? এভাবে কান্না করছে কারা ?
দ্রুত কারের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে । অনেকেই এগিয়ে আসে আসিফের সামনে । আসিফ ঘাড় ঘুরিয়ে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে ,
_ কার কি হয়েছে ভাইয়া ? বাড়িতে এত মানুষ জন কেনো ?
আতিফ বলতে পারে না কিছু । রক্ত লাল চোখ দুটো দিয়ে টুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে ।
উতলা হয়ে ওঠে আসিফ । অস্থির ভঙ্গিমায় আবার জিজ্ঞেস করে ,
_ কার কি হয়েছে ভাইয়া ? কথা বলছো না কেনো ? কাদঁছো কেনো তুমি ?
আতিফ ডান হাত তুলে বাড়ির ডান দিকে দেখায় ।
ওখান থেকেই কান্নার রোল ভেসে আসছে ।
আসিফ দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় সেদিকে । পেছন পেছন আতিফ ও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায় ।
মানুষের ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতেই আসিফের নজরে আসে একটা খাটিয়া । খাটিয়ার উপর ধবধবে সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত কেউ উত্তর দক্ষিণ লম্বা হয়ে শুয়ে আছে । খাটিয়ার পাশে তাকায় ।
ফারিনের মা , বোন , কাকি , দাদি কাদতে কাদতে মূর্ছা যাচ্ছেন । ফারিনের বাবা , চাচা , ভাই , দাদা জড়বস্তুর ন্যায় চেয়ারে বসে আছে । নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে খাটিয়ার দিকে । আসিফের মা ভাবী বাবার ও একই অবস্থা । সকলের অবস্থাই করুন । ফারাজ আসিফের কাকীর কোলে হেঁচকি তুলে কাদঁছে থেমে থেমে ।
এখানে দুই পরিবারের সবাই আছে শুধু ফারিন নেই । ফারিন কোথায় ? আশে পাশে নজর বুলায় কিন্তু ফারিন নেই কোথাও । চোখ যায় খাটিয়ার উপর । খাটিয়ার উপর কে শুয়ে আছে ? খাটিয়ার উপর থেকে চোখ সরিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায় আবার ।
_ ভাইয়া ফারিন কোথায় ? আর খাটিয়ার উপর কে শুয়ে আছে ?
আতিফ বলতে পারে না কিছু । দুই চোখ বেয়ে গল গল করে পানি গড়িয়ে পড়ে ।
_ কথা বলছো না কেনো ভাইয়া ফারিন কোথায় ?
আতিফ আবারো হাত উচু করে খাটিয়ার দিকে দেখায়।
আতিফের হাত অনুসরণ করে সেদিকে তাকায় আসিফ। মস্তিষ্কের ভেতর যেন আবারো বিস্ফোন ঘটে । পিছিয়ে যায় কয়েক কদম । আতিফ পেছন থেকে শক্ত করে ধরে ছোট ভাই কে ।
আসিফ নিজের চোখ বন্ধ করে নেয় । ধরা গলায় বলে ,
_ ভাইয়া তুমি মিথ্যে বলছো তাইনা ? মজা করছো আমার সাথে ? নাটক করছো সবাই তাইনা ? কথা বলছো না কেনো ? বলো মজা করছো আমার সাথে ?
আতিফ নিজেও ধরা গলায় বলে ,
_ না ভাই সব কিছু সত্যি । তোর ফারিন তোকে ছেড়ে , আমাদের ছেড়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে ।
গর্জন করে ওঠে আসিফ । ভাইয়ের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় । হুংকার ছেড়ে বলে ,
_ মিথ্যে কেনো বলছো ? আমার ফারিন আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারে না । তুমি হসপিটাল থেকে ফেরার সময় না বললে ফারিন আমার জন্য বাড়িতে অপেক্ষা করছে । তাহলে এখন মিথ্যে বলছো কেনো ?
_ তুই শান্ত হ ভাই , ডক্টর তোকে উত্তেজিত হতে নিষেধ করেছে । চিৎকার বন্ধ কর শান্ত হ ।
আসিফের মাথা ব্যথা হু হু করে বাড়তে থাকে ।
দুই হাতে খামচে ধরে মাথার চুল ।
হঠাৎ আসিফের চারো পাশ নীরব নিস্তব্দ হয়ে যায় । আশে পাশে যেন কেউ নেই , নেই কোনো কোলাহল , হই চৈ , কান্নার শব্দ । আসিফ সোজা হয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকায় খাটিয়ার দিকে । ওর ফারিন ওখানে শুয়ে আছে !
আসিফ এক পা এক পা করে এগিয়ে যায় খাটিয়ার কাছে ।
ওর সাথে সাথে এগিয়ে যায় আতিফ ।
গত কাল দ্রুত গতিতে ছুটে আসা বাইকের সাথে আসিফের বাইক ধাক্কা লাগার সাথে সাথেই ফারিন বাইক থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়েছিল । তখন সাথে সাথেই সেখান দিয়ে ট্রাক যাচ্ছিল , সেই ট্রাকের সাথে সজোড়ে বারি খায় ফারিন। ট্রাকের সাথে বারি খাওয়ার পর সিএনজির চাকার নিচে পড়েছিল । আর সেখানেই স্পট ডেথ।
ফারিনের মাথার খুলি গুড়ো গুড়ো হয়ে গেছে , মস্তিষ্ক বেরিয়ে গেছে প্রায় পুরোটা , রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছিল । চেহারা বিকৃতি হয়ে গেছে । চেহারা দেখে বোঝার জো নেই এটা কে ! পুরো শরীর অক্ষত আছে শুধু মাথাটাই ,
ফারিনের ওই অবস্থা দেখেই অফিস চিৎকার করে উঠেছিল । আর সাথে সাথেই স্ট্রোক করে পড়ে যায় । বড় ধরনের স্ট্রোক না হওয়ায় আর দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ায় বিশ ঘণ্টার মধ্যেই জ্ঞান ফিরে এসেছে । তবে আসিফের মস্তিষ্কে রক্ত ক্ষরণ হয়েছিল । এখন মস্তিষ্কের ভেতর রক্ত জমাট বেঁধে আছে । বেশি চাপ নিলে ওরো ভালো মন্দ কিছু হয়ে যেতে পারে । এক্সিডেন্টের কিছু ঘটনা আসিফের মস্তিষ্ক থেকে মুছে গেছে । তাই ফারিনের কি হয়েছিল সেটুকু ভুলে গেছে ।
আসিফ সবাই কে ঠেলে ঠুলে খাটিয়ার পাশে গিয়ে বসে। এখন আর কান্না করছে না , মুখ দিয়ে কোনো কথা ও বের হচ্ছে না । একদম নীরব হয়ে গেছে, ওর মাথার যন্ত্রণাও এখন অনুভব হচ্ছে না । সব কিছুই যেন শান্ত হয়ে গেছে , থমকে গেছে সময় । শুধু ও নিজে চলমান রয়েছে । কাফনের কাপড়ের উপর দিয়েই হাত বুলায় ।
নীচ থেকে উঠে দাঁড়ায় । ঝুঁকে গিয়ে ফারিনের মাথার কাছের কাফনের কাপড় মোড়ানো অংশ খুলতে শুরু করে । থাবা দিয়ে ওর হাত ধরে আতিফ । টেনে সরিয়ে নিয়ে আসে ওর হাত । দুদিকে মাথা নাড়িয়ে খুলতে নিষেধ করে ।
_ কেনো ?
_ তুই সহ্য করতে পারবি না ।
_ কেনো সহ্য করতে পারবো না ? আমার ফারিন কে আমি দেখবো , হাত ছাড়ো আমার ।
বলেই আতিফের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য টানাটানি শুরু করে ।
আতিফ আসিফ কে টেনে সরিয়ে নিয়ে আসে কিছুটা দূরে ।
_ ছাড়ো আমাকে , এভাবে টানাটানি করছো কেনো ?
_ তুই দেখবি না ফারিন কে ।
_ আমার বউ কে আমি দেখবো তুমি নিষেধ করার কে ? ছাড়ো আমাকে ।
_ দেখ ভাই তুই সহ্য করতে পারবি না ফারিনের মুখ দেখলে ।
_ কেনো কি হয়েছে আমার ফারিনের মুখে ?
_ ফারিনের মুখ থেঁতলে গেছে । চেহারা বোঝা যায় না । মাথার খুলি গুড়ো গুড়ো হয়ে গেছে । তুই ওর মুখ দেখলে নিজেকে সামলাতে পারবি না ।
_ আমি তাও দেখবো ।
বলেই আতিফ কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় নিজের সামনে থেকে । আবার এগিয়ে যায় খাটিয়ার কাছে । দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু বিন্দু । কাপা কাপা হাত বাড়ায় ফারিনের মুখের উপর দেয়া কাপড়ের দিকে। ফাহাদ এসে খপ করে ধরে আসিফের হাত ।
দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ও নিজেও নিষেধ মুখ দেখতে ।
সবাই জানে ফারিন আসিফের কাছে কি ছিল । ফারিনের মুখের অবস্থা দেখলে আবার স্ট্রোক করতে পারে । ওর ভালো মন্দ কিছু হয়েও যেতে পারে ।
_ হাত ছাড়ো ফাহাদ ।
_ ভাইয়া ওর মুখ দেখবেন না ।
_ কেনো দেখবো না ? ওর কাছে আমার অনেক প্রশ্ন আছে , অনেক কিছু জিজ্ঞেস করার আছে ।
_ মুখ না দেখেই জিজ্ঞেস করুন ।
_ না আমি মুখ দেখবো । ও তো এই মুখ দিয়েই বলেছিল আমাকে ছেড়ে যাবে না , তাহলে আমাকে ছেড়ে কিভাবে চলে গেলো ? ওকে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে । আমার হাত ছাড়ো এখন ।
_ ওর চোখ তো নেই , কিভাবে তাকাবে আপনার চোখের দিকে ? ওর তো মস্তিষ্ক নেই তাহলে কিভাবে উত্তর দেবে বুদ্ধি করে ? ও তো জীবিত নেই কিভাবে কথা বলবে আপনার সাথে ?
_ ফারিন জীবিত নেই ?
_ না ।
_ কেনো জীবিত নেই ? কেনো চলে গেলো আমাকে ছেড়ে ? ও জানে না , ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারি না ? ও জানে না, ওকে না দেখলে আমার শ্বাস আটকে আসে ? ও জানে না , ওকে ছাড়া এই আসিফ বাঁচবে না ? তার পরেও কিভাবে চলে গেলো ? ভাইয়া বললো ফারিন আমার জন্য অপেক্ষা করছে , এই ভাবে শুয়ে অপেক্ষা করছে আমার জন্য ?
বলতে বলতে হুহু করে কেঁদে ওঠে । আস্তে আস্তে কান্নার বেগ বাড়ে । একসময় গলা ছেড়ে চিৎকার করতে থাকে । খাটিয়ার উপর শুয়ে থাকা ফারিন কে ধরার জন্য ধস্তা ধস্তি শুরু হয় । কয়েক জন ওকে চেপে ধরে আটকে রাখে । আতিফ ভাই কে শান্ত করার চেষ্টা করে । চিৎকার করতে করতেই আসিফ দ্বিতীয় বারের মত অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়ে ।