"তুই আমার বেস্টফ্রেন্ড হয়ে আমার বয়ফ্রেন্ডকে কীভাবে বিয়ে করতে পারলি নায়লা? তোর বিবেকে একটুও বাধলো না?"
তানিজার কথা শুনে নায়লা বিদ্রুপ করে বলে,
"কে তোর বেস্টফ্রেন্ড? আমি? সিরিয়াসলি? তোর মতো একটা মেয়েকে এই নায়লা কোনো দিন বেস্টফ্রেন্ড ভাবেই নি। আর কি বললি তুই? তোর বয়ফ্রেন্ডকে বিয়ে করতে আমার বিবেকে বেধেছে কিনা? বিশ্বাস কর তাহেরকে বিয়ে করতে আমার বিবেকে একটুও বাধেনি।"
"নায়লা তুই আমার বেস্টফ্রেন্ড—
নায়লা তানিজাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
"তোর বেস্টফ্রেন্ড আমি কোনো কালে ছিলাম না। আর তাহের নিজে আমাকে প্রোপোজ করেছিল।"
"তুই জানতি আমরা একে অপরকে ভালোবাসি।"
"তুই ভালোবাসতি, তাহের বাসতো না। আগে হয়তো বাসতো কিন্তু এখন বাসে না। তোর মতো একটা আনস্মার্ট ক্ষ্যাতকে কোনো ছেলেই ভালোবেসে বিয়ে করতে চাইবে না। তাহেরকে দেখেছিস কেমন স্মার্ট? ওর পাশে তোকে মানায়? তাহেরের পাশে আমাকে মানায়, এই নায়লাকে, তোকে না।"
তানিজার দু'চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। নিজের বেস্টফ্রেন্ডের কথা গুলো বিশ্বাসই করতে পারছে না, তাহের কীভাবে ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারল? এভাবে ঠকালো ওকে?
নায়লার পাশে এসে দাঁড়ায় তাহের। হাতে গোলাপ ফুল। তানিজা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও নিজ হাতে গোলাপটা নায়লার কানে গুঁজে দেয়। নায়লার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলে,
"সুন্দর লাগছে তোমাকে।"
নায়লা মুচকি হেসে তানিজার দিকে তাকায়।
তানিজা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তাহেরের দিকে।
এই তাহের কিনা এককালে ওর জন্য মরিয়া হয়েছিল! ওর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য পিছন পিছন ছুটত! মানুষ এতটা পরিবর্তন হয়? এত বাজেভাবে ঠকায়? একটুও লজ্জা নেই, নেই কোনো অনুশোচনা। ও সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও এমন কাজ কীভাবে করছে? মিনিমাম লজ্জা বোধের কারণেও তো একটু সংযত করতে পারে নিজেকে।
নায়লা ঘাড়ের উপর থাকা চুল গুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়। তানিজার চোখ নিজে থেকেই নায়লার ঘাড়ের উপর পড়ে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে লাভ বাইটের দাগ। তানিজা দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। ঘৃণা হচ্ছে দু'জনকে দেখে, তার চেয়েও বেশি ঘৃণা হচ্ছে নিজেকে। পরিবারের পর এই দু'জন মানুষকে বেশি ভালোবেসেছিল, আর এই দু'জনেই ওকে ঠকিয়ে দিল।
তাহের তানিজাকে বলেছিল ওর জব হয়ে গেলেই তানিজার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবে। কিন্তু তাহের করলো কী? জব হয়ে যেতেই নায়লাকে বিয়ে করে নিল।
তানিজা নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে তাহেরের দিকে তাকিয়ে বলে,
"তাহের, তুমি না ভালোবাসতে আমাকে, জব হয়ে গেলেই নাকী বিয়ে করবে আমাকে? আমি নিজে থেকেই এসেছিলাম তোমার জীবনে?"
তাহের গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে,
"ভালো.... বাসতাম কিন্তু এখন বাসি না। মানুষের মন পরিবর্তন হতে কতক্ষন? নিজে থেকে তোমার জীবনে এসেছিলাম আবার নিজে থেকেই চলে গেলাম। তোমাকে আগে ভালো লাগলেও এখন লাগে না।"
তানিজা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। নায়লার দিকে তাকিয়ে বলে,
"তোর জন্য যে আমাকে ঠকিয়েছে সে একদিন অন্য কারো জন্য তোকেও ছেড়ে দিতে দু'বার ভাববে না। আমার সঙ্গে করা অন্যায়ের ফল তোরা দু'জনেই ভোগ করবি, দেখে নিস।"
কথা গুলো বলে আর এক মুহুর্তও দাঁড়ায় না তানিজা। হাঁটা শুরু করে রিকশার দিকে। গভীর কালো চোখ জোড়া দিয়ে জলপ্রপাতের ন্যায় জল গড়িয়ে পড়ছে। বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। গত তিনটা বছর ধরে যাকে ভালোবাসলো সে আজ অন্য কারো।
তানিজা তো সবসময় বলতো বিয়ের আগে প্রেম ভালোবাসায় জড়াবে না। কিন্তু কী যেন হয়ে গেল একদিন। ওর পেছন পেছন ভালোবাসার দাবি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো তাহেরের ভালোবাসা মেনে নিল। মন প্রাণ উজাড় করে তাহেরকে ভালোবাসলো। আর সেই তাহের ওকে ঠকিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছে।
কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে তানিজার। চিৎকার করে কাঁদতে পারলে ভালো লাগতো কিন্তু তানিজা তো চিৎকার করে কাঁদতে পারে না। নিজের কষ্ট গুলোও কাউকে বলতে পারে না, বোঝাতেও পারে না। সবসময় চুপচাপ আর শান্ত স্বভাবের মেয়ে, কখনো ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছায় কাউকে দুঃখ-কষ্ট দেয় না। ওর সঙ্গে কেন এমন হলো? হারামে জড়াতে না চেয়েও কেন জড়িয়ে গিয়েছিল? কেন ভুলে গেল বিবাহ বহির্ভূত প্রেম-ভালোবাসা নিষিদ্ধ? হারামে না জড়ালে তো আজ এত কষ্ট পেতে হতো না। এই কষ্ট না কাউকে বলতে পারবে আর না সহ্য করতে পারবে। বুকের ভেতরটা যেন ফেটে যাচ্ছে। (গল্পের লেখক সানা শেখ। গল্পের পরবর্তী পার্ট আগে আগে পেতে সানা শেখ পেজটি ফলো দিয়ে রাখবেন সবাই।)
________________
তানিজা বাড়িতে ফিরে আসে। কলেজ ছুটি হয়েছিল অনেকক্ষণ আগেই। নায়লা আর তাহেরের সঙ্গে কথা বলতেই দেরি হয়ে গেছে বাড়িতে ফিরতে।
কলিং বেল চাপতেই যাবে বুঝতে পারে দরজা খোলা, তাই আর কলিং বেল চাপে না। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে প্রবেশ করতেই থ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। বাড়িতে এত মানুষ কেন?
তানিজাকে দেখে ওর মা আর ভাবী এগিয়ে আসে দ্রুত। তানিজার ভাবী তানিজার হাত ধরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে বলে,
"এত দেরি হলো কেন আজকে? কখন থেকে সবাই কল করছি, ফোন বন্ধ। ফোনের কী হয়েছে?"
"ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়িতে এত মানুষ কেন?"
"ওনারা তোমাকে দেখতে এসেছেন। এখন দ্রুত রুমে চলো।"
ভাবীর কথা শুনে তানিজা চমকে ওঠে। পা দুটো আপনাআপনি থেমে যায়। ভাবীর দিক থেকে চোখ সরিয়ে পাশে থাকা মায়ের মুখের দিকে তাকায়। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হতে চাইছে না এখন।
"কী হলো? চলো।"
তানিজা নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে বলে,
"মা...মানে? কী বলছেন এসব?"
"এত অবাক হওয়ার কী হয়েছে? ছেলেপক্ষ এসেছে তোমাকে দেখার জন্য।"
এর মধ্যে ঘটক এগিয়ে এসে বলেন,
"আর তৈরি করাতে হবে না আলাদা করে। এভাবেই নিয়ে আসো।"
আরো চমকে ওঠে তানিজা। এভাবেই দেখবে মানে? ওর চোখ দিয়ে তো কিছুক্ষণ আগেই পানি পড়েছিল, এখনো হয়তো চোখের পানির দাগ রয়ে গেছে গালে।
"কী হলো? নিয়ে চলুন মেয়েকে।"
"এভাবে? তৈরি করিয়ে নিয়ে আসলে ভালো হতো না?"
"আর কী তৈরি হবে? কিচ্ছু করতে হবে না, নিয়ে আসুন।"
তানিজার ভাবী শাশুড়ি মায়ের মুখের দিকে তাকায়, তারপর তাকায় শ্বশুর আর হাজব্যান্ডের দিকে।
তানিজার বাবা তানভীর শেখ বলেন,
"নিধি, তানিজাকে নিয়ে আসো।"
তানিজার ভাবী নিধি তানিজাকে নিয়ে সোফার দিকে পা বাড়ায়। তানিজা শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিধি ঘুরে তাকিয়ে বলে,
"কী হলো? চলো।"
তানিজা মৃদু স্বরে বলে,
"মুখটা ধুয়ে আসি।"
"ওনারা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন, যাওয়ার জন্যও তাড়াহুড়ো করছে। চলো।"
তানিজার কোনো কথা আর শোনা হয় না। ওকে টেনে নিয়ে আসা হয় সোফার কাছে। সকলের সামনে সোফায় বসানো হয় ওকে। তানিজা নিচের দিকে দৃষ্টি নামিয়ে রাখে। পরনে কালো রঙের সাধারণ একটা বোরকা, হিজাবটাও কালো রঙের, মাস্ক পরা, সেটাও কালো রঙের।
নিধি সকলের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলে,
"আসলে ওর ফোনে চার্জ নেই তাই ফোন বন্ধ।"
পাশ থেকে একজন বলে,
"সমস্যা নেই, আমরা কিছু মনে করিনি। মেয়ের মাস্ক খুলুন।"
নিধি হাত এগিয়ে নেয় তানিজার মাস্ক খোলার জন্য। তানিজার শরীর থরথর করে কাঁপছে। চোখ দুটো পানিতে টুইটুম্বর হয়ে গেছে। ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে। সবাই যদি বুঝতে পেরে যায় ও কেঁদেছিল, কী হবে? কী বলবে?
মাস্ক খুলে ফেলে নিধি। তানিজা মাথা তোলে না। নিধি জোর করে ওর মুখ তুলে ধরে সকলের সম্মুখে।
সবাই দেখে তানিজাকে। ছেলের বাবা নাজিম উদ্দিন সরকার তানিজাকে বলেন,
"তোমার নাম কী মা?"
তানিজা কম্পিত স্বরে বলে,
"তানিজা তাসনিম।"
"বাবার নাম?"
"তানভীর শেখ।"
"ভাইয়ের নাম?"
"তন্ময় শেখ।"
"দাদার নাম?"
"মাহমুদুল শেখ।"
ঘটক হেসে বলেন,
"মেয়ে কিন্তু বোবা না ভাই।"
"তাইতো দেখছি।"
"আরো কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে করতে পারেন।"
"আর কী জিজ্ঞেস করব? এখনকার ছেলেমেয়ে শিক্ষিত, তাদের কিছু জিজ্ঞেস করার থাকে না।"
সবাই হাসে। ঘটকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলেন,
"মেয়ে তো মাশা-আল্লাহ, আপনার বর্ণনার চেয়েও বেশি সুন্দর।"
ঘটক নিজেও হেসে বলেন,
"বলেছিলাম না, মেয়ে নিখুঁত সুন্দরী। দেখতে যেমন সুন্দরী, চরিত্রও তেমন সুন্দর। আশেপাশে খোঁজ খবর নিয়ে দেখুন, কেউ বলতে পারবে না এই মেয়ের মধ্যে কোনো ভেজাল বা খারাপ কিছু আছে। যেমন শান্ত তেমন নম্র, ভদ্র, সভ্য একটা মেয়ে।"
নাজিম উদ্দিন সরকার তানিজার দিকে তাকিয়ে বলেন,
"কি মা আমার ছেলেকে দেখেছ?"
তানিজা চুপ হয়ে থাকে। উনি হেসে বলেন,
"ছেলেকে দেখে নাও পছন্দ হয় কি-না।"
তানিজা ছেলের দিকে তাকায় না। নিধি জোর করে তানিজার মুখ তুলে ধরে ছেলের দিকে। তানিজা এক নজর তাকিয়েই দৃষ্টি নামিয়ে নেয়।
ছেলের গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের। বলিষ্ঠ গড়নের, লম্বায় প্রায় ছয় ফুট হবে বোধহয়। গায়ে ফরমাল সাদা শার্ট, পরনে কালো প্যান্ট। দু'গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। দৃষ্টি তীক্ষ্ম আর ধারালো, চোখ-মুখ গম্ভীর হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে জোর করে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কেমন একটা বিরক্তি ভাব ফুটে আছে চোখে-মুখে।
নাজিম উদ্দিন সরকার পাশে বসে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলেন,
"মেয়ের সঙ্গে আলাদা কথা বলতে চাইলে বলে আসো।"
ছেলে গম্ভীর স্বরে বলে,
"প্রয়োজন নেই।"
"সবসময় এমন করবে না। এই মেয়ে আমার পছন্দ হয়েছে, তোমার মায়েরও পছন্দ হয়েছে। একেই আমরা বাড়ির বউ করব। নিজের কথা বলবে মেয়ের মতামতও নেবে। যাও এখন।"
ছেলের কানের কাছে কথা গুলো বলে নিধির দিকে তাকিয়ে বলেন,
"ওদের দু'জনের আলাদা কথা বলার জন্য ব্যবস্থা করে দিন একটু।"
ছেলে বিরক্ত হয়ে বাবার দিকে তাকায়। বলছেই কথা বলতে চায় না।
নিধি তানিজার হাত ধরে সোফা থেকে তুলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে বলে,
"ভাইয়া আসুন।"
নাজিম উদ্দিন সরকার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন,
"যাচ্ছো না কেন? যাও।"
পাশ থেকে ছোটো ভাই বলে,
"লজ্জা পাচ্ছে বোধহয়, আমি সাথে যাব ভাইয়া?"
বড়ো ভাই গরম চোখে তাকাতেই ছোটো ভাই মুখ বন্ধ করে অন্য দিকে তাকায়। এখন দৃষ্টি দিয়েই ভস্ম করে দেবে ওকে।
ছেলেকে জোর করেই তুলে দেন নাজিম উদ্দিন সরকার। এত মানুষের সামনে কিছু বলতে না পেরে বাধ্য হয়েই বসা থেকে উঠে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়ছে।
সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই দেখে তানিজা আর নিধি দাঁড়িয়ে আছে। নিধি তানিজাকে বলে,
"তুমি ভাইটাকে নিয়ে ছাদে গিয়ে কথা বলো, আমি নিচে যাচ্ছি।"
নিধি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়। তানিজা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ওর পুরো শরীর তখনো কাঁপছে, বুকের ভেতর জোরে জোরে শব্দ হচ্ছে।
চোখ তুলে তাকাতেই দেখে ছেলে গম্ভীর হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সাথে সাথেই দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বলে,
"ছাদে আসুন।"
তানিজার কন্ঠ কাঁপছে। ও দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। ছেলেটা পেছন পেছন আসছে নাকী আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে লক্ষ্য নেই।
চলবে...........
নতুন গল্পটি কেমন লেগেছে অবশ্যই মতামত জানাবেন সবাই।