পর্ব:০৬
আসিফের জ্ঞান ফেরানো হয় । জ্ঞান ফেরার পর থেকে চুপ চাপ স্তব্ধ হয়ে বসে আছে খাটিয়ার সাথে মাথা ঠেকিয়ে । কি যেন ভেবে চলেছে এক মনে খাটিয়ার উপর শুইয়ে রাখা প্রাণ প্রিয় স্ত্রীর প্রাণহীন দেহের দিকে তাকিয়ে । সময় গড়াচ্ছে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে ধীরে ধীরে ।
আসিফ আবার হাঁটুতে ভর করে বসে । হাত বাড়ায় প্রাণহীন নিশ্চুপ হয়ে থাকা দেহের দিকে ।
হাত বুলায় কাফনের কাপড়ের উপর দিয়ে । এটা ওর স্ত্রী , ওর ভালোবাসা , ওর ভালো থাকার কারণ ।
গত কাল ও তো এই সময়ে দুজন এক সাথেই ছিল । কত কথা বললো , এতিম শিশুদের খাবার খাওয়ালো ।
বাড়ি ফেরার পথে কারে বসে ওর এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
আজ কেনো কথা বলছে না ? কেনো ওর এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে ঠিক করে দিচ্ছে না ? আসিফের একটু অসুস্থতায় তো ফারিন উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে , আসিফের একটু কষ্ট হলে ওরো কষ্ট হয় । আজ তো আসিফ কত অসুস্থ , কত কষ্ট হচ্ছে ওর । আজ কেনো ফারিন ওর কষ্ট দেখতে পাচ্ছে না ? ওর অসুস্থতায় কেনো উদ্বিগ্ন হচ্ছে না ?
আসিফ আবার কাফনের কাপড়ের মোড়ানো অংশ খুলতে শুরু করে । পাশেই ফারিনের বাবা দাঁড়িয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন । তিনি খপ করে ধরেন আসিফের হাত ।
_ হাত ছাড়ুন বাবা ।
_ তুমি বার বার এমন কেনো করছো আসিফ ?
_ ওর মুখ দেখবো আমি শেষ বারের মত ।
_ ওর মুখ তো বোঝা যায় না । মুখ দেখলেও বুঝতে পারবে না কিছু ।
কান্না গিলে থেমে থেমে বলেন কথা গুলো ।
_ তাও দেখবো আমি , শেষ বারের মত ছুঁয়ে দেবো ।
সরোয়ার আর আতিফ আসিফ কে ধরে । বোঝানোর চেষ্টা করে ফারিনের মুখ দেখার মত অবস্থায় নেই ।
আসিফ চোখ বন্ধ করে সব কথা শোনে ভাইয়ের ।
_ তাহলে হাত দেখবো । ওর হাত বের করো ।
আসিফের জেদের কাছে হার মানতে হয় । সকল পুরুষ মানুষ কে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয় । যারা ফারিনের শেষ গোছল করিয়েছে তাদের মধ্যে থেকে একজন কাফনের কাপড়ের ভেতর থেকে ফারিনের ডান হাত বের করে । হাত দেখার সাথে সাথেই শক্ত করে ধরে আসিফ । ঠান্ডা শক্ত হাত , ফর্সা হাত টা হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে ।
দুদিন আগে হাতে মেহেদী দিয়েছিল , এখনো স্পষ্ট রয়েছে সেই মেহেদী । হাতের তালুতে সুন্দর করে ইংরেজি অক্ষরে লেখা Love You Asif .
ফারিনের ঠান্ডা শক্ত হয়ে থাকা হাতে অসংখ্য চুমু খায় ।এক হাত দিয়ে ধরে অন্য হাত দিয়ে ফারিনের হাতের উপর হাত বুলায় । আবার চুমু খায় । দুই হাতে শক্ত করে ধরে রাখে ।
দুই মিনিট, চার মিনিট , ছয় মিনিট এভাবেই দশ মিনিট পেরিয়ে যায় আসিফ ছারে না ফারিনের হাত ।
সবাই ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও পারে না । যেই ছাড়াতে আসে তার উপরেই গর্জে উঠছে ।
ফারিনের হাত ধরে রেখেই তাকায় ছেলের দিকে । কাদতে কাদতে ছেলের অবস্থা নাজুক ।
আসিফ ছেলে কে কাছে ডাকে , ভয়ে কাছে আসে না ফারাজ । যদি মারে ? সবাই কে কিভাবে ধমাচ্ছে । আসিফ আবার ডাকে ছেলে কে ।
_ বাবার কাছে আসো আব্বা । কিছু বলবো না আসো ।
দাদীর কোল থেকে নেমে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে বাবার কাছে । এক হাতে ছেলে কে জড়িয়ে ধরে আসিফ । তারপর চুমু খায় , অনেক আদর করে ।
বুকে চেপে ধরে নরম গলায় বলে ,
_ মায়ের মুখ দেখেছো ?
দুদিকে মাথা নাড়ায় ফারাজ ।
_ কেনো ?
কাদতে কাদতেই বলে ,
_ দেখতে দেয়নি ।
_ কে দেখতে দেয়নি ?
_ সবাই ।
_ এখন দেখবে ?
_ হুম ।
_ তোমার মায়ের কি হয়েছে জানো ?
_ এক্সিডেন্ট করে মরে গেছে ।
বলেই জোড়ে কেঁদে ওঠে ফারাজ । বাবার বুকে মুখ গুঁজে দুই হাতে বাবার পরনের পোশাক খামচে ধরে । ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে চুমু খায় আসিফ । এতক্ষণ ওর চোখে পানি ছিল না , ছেলের কান্না দেখে চোখ দুটো টইটুম্বুর হয়ে যায় ।
_ মায়ের হাত ধরবে ?
_ হুম ।
_ ধরো তাহলে ।
বাবার বুক থেকে মুখ তোলে ফারাজ । তাকায় খাটিয়ায় শুয়ে থাকা মায়ের দিকে । ছোট ফারাজ বুঝতেও পারছে না ওর জীবন থেকে কি হারিয়ে গেলো ! মা ডাকার মানুষ টা আর থাকবে না এই পৃথিবীর বুকে । কেউ আর আদর করে খাইয়ে দেবে না । মায়ের বুকে ঘাপটি মেরে ঘুমোনো হবে না আর । আহা যেই মানুষ টা ওকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো সেই মানুষ টা আর নেই । আর কোনো দিন ভালোবাসবে না । মিষ্টি স্বরে ডাকবে না "বাবা ফারাজ দুষ্টামি করে না খাবার খেয়ে নাও । তোমার বাবা দেখলে কিন্তু বকা দেবে " । মা কে জ্বালাতন করার অপরাধে বাবার কাছে আর বকা খেতে হবে না । মাকে আঘাত করার অপরাধে বাবার হাতেও মার খেতে হবে না । গত কাল সন্ধ্যার পর থেকে বদলে গেছে ছোট্ট ফারাজের জীবন । মাকে জড়িয়ে ধরে কত কাঁদলো, ডাকলো অথচ মা উঠলো না । আদর করলো না , কোলে নিলো না ।
ফারাজের হাতে ফারিনের হাত ছোঁয়ায় আসিফ । মায়ের ঠান্ডা শক্ত হাত ছুঁতেই কেঁপে ওঠে ফারাজ । দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বাবার বুকের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নেয় । ভয়ার্ত কন্ঠে বলে ,
_ আম্মুর হাত এমন কেনো আব্বু ?
_ কেমন আব্বু ?
_ ঠান্ডা শক্ত , আম্মুর হাত তো নরম তুলতুলে আর গরম গরম থাকে । এমন কেনো হয়েছে ?
_ তোমার আম্মু আমাদের ছেড়ে চলে গেছে যে সেজন্য।
আম্মু কে মিস্ করছো ?
_ হুম , আম্মু উঠছে না কেনো ? আম্মু কে উঠতে বলো ।
_ তুমি ডাকো , তুমি ডাকলে তো তোমার আম্মু সব সময় সাড়া দেয় ।
_ ডেকেছি অনেক কিন্তু ওঠেনি । সবাই বললো আর উঠবে না । আম্মু নাকি চাঁদের দেশে চলে গেছে ।
আম্মু তো এক্সিডেন্ট করে মরে গেছে না ? মানুষ মরে গেলে ওর ওঠে না আব্বু ?
আশে পাশে যে কয়েক জন আছে সবাই শুনছে বাবা ছেলের কথপোকথন ।
_ মানুষ কেনো মরে যায় আব্বু ?
ছেলের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না আসিফ ।
একজন এসে আসিফের হাতের মুঠোয় থেকে ফারিনের হাত ছাড়িয়ে নেয় । কাফনের কাপড়ে আচ্ছাদিত করে দেয় আবার ।
দুই হাতে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে বসে রইলো আসিফ । মুখে কান্নার শব্দ না হলেও চোখ দিয়ে বিরতিহীন পানি গড়িয়ে পড়ছে ।
কানে ভেসে আসে মসজিদের মাইকের এলান ।
বাদ আসর ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে ফারিনের জানাজা ।
কত সময় গড়িয়ে গেছে আসিফের জানা নেই । একটু পরেই কানে ভেসে আসে আসরের আযানের ধ্বনি । মোয়াজ্জিনরা আজান দিচ্ছেন । আজকের আযানের ধ্বনি আসিফের কানে সূমধুর লাগছে না ।
করুন শোনাচ্ছে এই আযানের ধ্বনি । ওর কষ্টে কি মোয়াজ্জিনদের কষ্ট হচ্ছে ? সেই জন্য কি এমন করুন সুরে আযান দিচ্ছে ? নাকি আসিফের কানেই শুধু করুন শোনাচ্ছে ?
আর অল্প সময়ের অপেক্ষা তার পর ওর ফারিন আর থাকবে না এই পৃথিবীর বুকে । শায়িত হবে অন্ধকার কবরে । ফারিন কিভাবে থাকবে ওই অন্ধকার কবরে ?
আর ভাবতে পারছে না আসিফ । মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে । চোখ বন্ধ করে জোড়ে শ্বাস টেনে নেয় । আসরের নামাজ আদায় করতে হবে । ছেলে কে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় ।
কোনো কথা না বলে ছেলেকে কোলে নিয়ে পা বাড়ায় বাড়ির ভেতরের দিকে । ওর পেছন পেছন ওর তিন বন্ধ আর আতিফ যায় ।
কি করতে চাইছে কে জানে ? মাথা তো ঠিক নেই । জ্ঞান ফেরার পর থেকে কেমন যেন হয়ে আছে । উল্টা পাল্টা কিছু না আবার করে বসে ।
চার জন আসিফের পেছন পেছন ওর রুমে প্রবেশ করে। আসিফ ফারাজ কে বেডের উপর দার করিয়ে পরনের সব পোশাক খুলে দেয় । নিজের গায়ের পোশাক ও খুলে নেয় ।
ছেলেকে নিয়ে প্রবেশ করে ওয়াশরুমে । ওয়াশরুমের ডোরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে চার জন । আসিফ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না । ও নিজের মত ছেলে কে গোসল করায় । টাওয়েল দিয়ে পেঁচিয়ে রুমে নিয়ে আসে আবার । বেডের উপর দার করিয়ে ভালো ভাবে গা মুছিয়ে দেয় । গায়ে লোশন দিয়ে দেয় । শীতের জামা কাপড় পরিয়ে দেয় আবার । বেডে বসে থাকতে বলে নিজের পোশাক নিয়ে প্রবেশ করে ওয়াশরুমে ।
কয়েক মিনিট পরেই বেরিয়ে আসে শাওয়ার নিয়ে ।
প্যান্টের সাথে সাদা পাঞ্জাবী পড়েছে । পাঞ্জাবী টা ফারিন কিনে দিয়েছিল । দাড়ায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে । দ্রুত তৈরি হয়ে নেয় । আতরের কড়া ঘ্রাণ চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরে টেনে নেয় । ছেলের গায়েও আতর দিয়ে দেয় । ছেলের মাথায় সাদা টুপি পরিয়ে দিয়ে নিজেও পড়ে ।
ছেলে কে কোলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে । ওর পেছন পেছন চার জন বেরিয়ে যায় ।
আসিফ ছেলে কে নিয়ে সোজা মসজিদে আসে নামাজ আদায় করার জন্য । মসজিদ ওদের বাড়ির পাশেই । দুই মিনিট লাগে হেঁটে যেতে । ইতি মধ্যে মসজিদে অনেক মানুষ চলে এসেছে নামাজ আদায় করতে । আসিফ ছেলে কে নিয়ে দ্বিতীয় কাতারে শামিল হয় ।
বাড়িতে যত পুরুষ মানুষ ছিল সবাই নামাজ আদায় করতে মসজিদে উপস্থিত হয়েছে ।
নামাজ শুরু হয় , আবার শেষ ও হয় ।
সকলের মোনাজাত শেষ হয় আসিফের মোনাজাত শেষ হয় না । টপ টপ করে ঝরছে চোখের পানি । ছেলে টা বাবা কে অনুকরণ করে মোনাজাত ধরে বসে আছে।
সময় গড়ায় আসিফ ডুকরে কেঁদে ওঠে । মোনাজাত শেষ করে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আবার ।
কান্নার কারণে আসিফের শরীর বার বার ঝাঁকি দিচ্ছে ।
যারা যারা মসজিদে উপস্থিত আছে সবাই তাঁকিয়ে দেখছে আসিফ কে ।
এলাকার বেশির ভাগ মানুষ জানে আসিফ কতটা বউ পাগল ছেলে । এলাকার ছোট বড় সবাই ওকে বউ পাগলা রাইডার বলে ডাকে এখন । ওর বন্ধুরা ছড়িয়েছে এই নাম ।
আজ আসিফের প্রাণ প্রিয় বউ টা বেঁচে নেই । কেউ অনুমানও করতে পারছে না আসিফের মনের অবস্থা । ওর মনের ভেতর কেমন অনুভূতি হচ্ছে কাউ বুঝতে পারছে না । এক মাত্র আসিফ আর ওর আল্লাহ তায়ালা জানেন ওর মনের ভেতরের অনুভূতি ।
কান্না বন্ধ হয় , সিজদা থেকে ওঠে । হাত দিয়ে চোখ মুখ মুছে নেয় । ছেলে কে আবার কোলে নিয়ে বাহিরের দিকে পা বাড়ায় । মসজিদের এত গুলো মানুষ ওর দিকে তাকিয়ে আছে সেদিকে ওর খেয়াল নেই ।
বাড়িতে ফিরে আসে । গিয়ে দাঁড়ায় খাটিয়ার সামনে ।
ধরা গলায় বলে ,
_ দেখো ফারিন তোমার পছন্দের পাঞ্জাবী পড়েছি , আতর দিয়েছি । কেমন লাগছে আমায় ? এই ঘ্রাণ তো তোমার ভীষণ পছন্দের তাইনা ?
উত্তর দেয় না ফারিন ।
জানাজা পড়ানোর জন্য খাটিয়া নিতে আসে ।
আসিফ কে জানানো হয় খাটিয়া ঈদগাহ ময়দানে নিয়ে যাবে ।
আসিফ ছেলে কে আদর করে ওর দাদীর কোলে তুলে দেয় । বলে যায় ওর ছেলের খেয়াল রাখতে ।
আসিফ খাটিয়ার ডান পাশে দাঁড়ায় । বাম পাশে দাঁড়ায় ফাহাদ ।
পেছনের এক পাশে ফারিনের বাবা আর কাকা । অন্য পাশে আসিফের বাবা আর আতিফ । বড় ভাইয়ের সামনে দাঁড়ায় আরাফাত ।
খাটিয়া কাঁধে তুলে নেয় সবাই । কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে দুই পরিবারের সবাই । কয়েক কদম গিয়েই দাঁড়িয়ে যায় আসিফ । সবাই কে খাটিয়া নামাতে বলে । খাটিয়া নামায় সবাই । কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে আসিফ বলে ,
_ এত ওজন কেনো খাটিয়া ? আমি বহন করতে পারছি না এই ভর । আমার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে যেতে নিয়েছিল ।
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আসিফের মুখের দিকে । যেই ছেলে একাই দুই'শো, আড়াই'শো কেজির বাইক উচু করে ফেলে সেই ছেলে এই খাটিয়ার ভর বহন করতে পারছে না ? তাও এত গুলো মানুষ ও সাথে বহন করছে ।
_ পাথরের মত ওজন এই খাটিয়ার । এতো ওজন দিয়ে এই খাটিয়া কে বানিয়েছে ?
কেউ কোনো কথা বলে না ।
মাঝ খান থেকে ফাইয়াজ এসে দাঁড়ায় আসিফের সামনে ।
খাটিয়া আবার তোলা হয় । আসিফের কাছে তবুও আগের মতোই ভারী লাগছে । মনে হচ্ছে খাটিয়ার উপর কয়েক টনের পাথর তুলে রাখা হয়েছে ।
বহু কষ্টে খাটিয়া কাঁধে নিয়ে মসজিদের পাশে ঈদগাহ ময়দানে নিয়ে আসে ।
কাতারে কাতারে শামিল হয় শত শত মানুষ । মেয়ের জানাজা পড়াবেন ফারিনের বাবা ফয়সাল শিকদার । প্রথম কাতারে শামিল হয়েছে দুই পরিবারের সবাই ।
জানাযার নামাযে শত শত মানুষের ঢল নেমেছে । ঈদগাহ ময়দানে জায়গা হচ্ছে না ।
আসিফের যত পরিচিত মানুষ জন আছে সবাই এসেছে ওর ওয়াইফের মৃ*ত্যু*র সংবাদ শুনে । আশে পাশের এলাকা থেকেও অনেক মানুষ এসেছে ।
জানাজা শেষ হয় । ফারিনের খাটিয়া কাঁধে নিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে আসে সবাই । বাড়ির বাগানে কবর খনন করা হয়েছে ।
সকলের সিদ্ধান্তে আসিফের জন্যই বাড়িতে খনন করা হয়েছে ।
কবরের পাশে খাটিয়া রাখা হয় ।
ফারিন কে তুলে কবরে রাখতে যাবে সেই মুহূর্তে আসিফ হঠাৎ করেই ভায়োলেন্স হয়ে ওঠে । কিছুতেই ফারিন কে কবরে নামাতে দেবে না । সবাই কে ঠেলে ঠুলে খাটিয়ার কাছ থেকে সরিয়ে দেয় ।
_ আমার ফারিন কে কেউ ধরবে না । ও থাকবে না এই অন্ধকার করবে । ও একা একা কিভাবে থাকবে ? এই শীতের মধ্যে এভাবে থাকলে শীত করবে না ওর ? ওকে আমি রুমে নিয়ে যাবো । আমার ফারিন আমার সাথে আমার রুমে থাকবে আগের মতোই ।
_ পাগল হয়েছিস ভাই ? ওকে দাফন করতে দে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ।
_ কার দাফন হবে ? কোনো দাফন টাফন হবে না । আমার ফারিন কে আমি এখানে রাখতে দেবো না ।
বলেই খাটিয়া থেকে ফারিন কে তোলার জন্য উদ্যত হয়। আতিফ সরোয়ার আর শামীম তিনজনে মিলে আসিফ কে টেনে সরিয়ে নিয়ে আসে খাটিয়ার কাছ থেকে । আসিফ নিজের সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে তিন জনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় । সরোয়ার আবার ধরতেই ওর বুকে পাঞ্চ করে । ব্যাথা পেয়ে ঝুঁকে পড়ে সরোয়ার ।
আসিফের খ্যাপাটে পনা দেখে সবাই হা হয়ে আছে । শান্তি মত কি মেয়ে টাকে দাফন ও দেওয়া যাবে না ? আসিফ যেরকম শুরু করেছে মনে হচ্ছে না দাফন সম্পন্ন করতে দেবে ।
কয়েক জন মিলে ফারিন কে তুলে কবরে নামানোর জন্য উদ্যত হতেই গর্জন করে সেদিকে ছুটে যেতে নেয় আসিফ । আতিফ আসিফ কে শান্ত করতে না পেরে সজোড়ে ওর গালে চড় বসায় ।
চড় খেয়ে আসিফের খ্যাপাটে পনা আরো বেড়ে যায় ।
আবার গর্জে ওঠে "ওই" বলে ।
বলেই দুহাতে ভাইয়ের গলা চেপে ধরে শক্ত করে । ঠেলে পেছনের দিকে নিয়ে যায় কয়েক হাত ।
আসিফের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ওর উপর ভূত ভর করেছে । মানসিক ভাবে আনস্ট্যবল হয়ে পড়েছে তা স্পষ্ট ।
একটু পরেই ছেড়ে দেয় ভাইয়ের গলা । ভাই কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে । আতিফ নিজেও জড়িয়ে ধরে ছোট ভাইয়ের পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্তনা দেয় ।
কাদতে কাদতে নিচে বসে পড়ে আসিফ । ওর সাথে আতিফ নিজেও বসে নীচে ।
কাদতে কাদতে বলে ,
_ ফারিন কে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো ভাইয়া ? ফারিন হীন দুনিয়া আসিফের জন্য না । ফারিন হীন দুনিয়ায় আসিফ কিভাবে বেঁচে থাকবে ভাইয়া ? ফারিন কে একবার ফিরে আসতে বলো না ভাইয়া । ও যা বলবে সব শুনবো আমি । ওর কথার একটুও হের ফের করবো না আমি । আমি বাইক চালাবো না আর , ও যা চাইবে সেটাই হবে । ওকে শুধু একটা বার ফিরে আসতে বলো ।
_ শান্ত হ ভাই , অসুস্থ্য হয়ে যাবি আবার ।
_ ফারিন আমাকে ছেড়ে একা একা কিভাবে চলে গেলো ? ও আমাকে কেনো নিলো না ? ও তো জানতো আসিফ ওকে ছাড়া এক দন্ড থাকতে পারে না । ওকে ছেড়ে আমি এখন বাকি জীবন কিভাবে কাটাবো ?
বলেই ভাইকে ছেড়ে খাটিয়ার দিকে তাকায় । দেখে ফারিন কে কবরে নামানো হচ্ছে ।
আসিফ চিৎকার করে উঠতে নিতেই ছয় সাত জন মিলে ওকে চেপে ধরে রাখে ।
আসিফ আহত সিংহের ন্যায় গর্জন করতে থাকে আর ওকে ছেড়ে দিতে বলে । দেখতে দেখতে ওর চোখের সামনে ফারিন কে কবরে শায়িত করা হয় ।
_ আমাকেও আমার ফারিনের সাথে কবর দিয়ে দাও তোমরা । আমি ফারিন হীন দুনিয়ায় থাকতে পারবো না। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে , আমার বুকে কষ্ট হচ্ছে । আমার ফারিন কে ওখান থেকে তোলো নয়তো আমাকেও কবর দিয়ে দাও ওর সাথেই । আমার কথা কেনো শুনছো না তোমরা ? ফারিন কে ওখান থেকে তোলো এই শীতের মধ্যে ফারিনের ঠান্ডা লাগবে । ওখানে ব্ল্যাঙ্কেট নেই , লেপ নেই , তোষক নেই । ফারিন কে ওখানে রাখবে না ।
বাবার কান্না দেখে ছোট্ট ফারাজ ও কান্না করছে জোড়ে জোড়ে ।
ফারিনের দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত আসিফ একই বাক্য বলে যায়।
_ আমাকেও ফারিনের সাথে দাফন করে দাও তোমরা । আমি এত কষ্ট সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারবো না । ফারিন আমার ফারিন আমার ফারিন । ফারিন আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে । আমার কষ্ট হচ্ছে , শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ।
পুরো টা সময় ওকে চেপে ধরে রাখে ছয় সাত জন মিলে।
দাফন সম্পন্ন হতেই দোয়া করে সবাই ।
আসিফ কে ছেড়ে দিতেই দৌড়ে গিয়ে ফারিনের কবরের উপর থেকে মাটি সরাতে শুরু করে হাত দিয়ে । কয়েক জন ধরে আবার থামায় ওকে ।
উন্মাদের মতো আচরণ করছে এখন । অতি শোকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেনি তো ?
একটু শান্ত হতেই ছেড়ে দেয় আবার । কবরের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে আসিফ । দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কবর খানা । বিরতিহীন ভাবে কান্না করতে থাকে হু হু করে ।
ফারিনের মৃত্যুতে সবাই যতটা না কষ্ট পাচ্ছে তার থেকে কয়েক গুণ বেশি কষ্ট পাচ্ছে আসিফের অবস্থা দেখে ।
একবার স্ট্রোক করেছে , এখন পাগলের মতন আচরণ করছে । ওর কিছু হয়ে যাবে না তো আবার ?
হাসি খুশি পরিবার টায় হঠাৎ করেই দুঃখের আবির্ভাব ঘটল । গত কাল সকাল থেকে কত আয়োজন হলো এই বাড়িতে আজ সেই বাড়িতেই আয়োজন করে কান্না করছে সবাই । মানুষের কান্নার গুনগুন শব্দ , আসিফের হু হু করে কান্না , ছোট ছেলে টা মা হারিয়ে বাবার অবস্থা দেখে ভয়ে কান্না করছে জোড়ে জোড়ে ।
আস্তে আস্তে বাড়ি থেকে ভিড় কমে যায় । বাড়তি মানুষ সবাই চলে যায় বাড়ি থেকে । মাগরিবের আজান হচ্ছে।
অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে ধরণী ।
আসিফের কান্না বন্ধ হয় না ।
পুরোপুরি অন্ধকার নেমে আসে ধরণীতে । নিয়ন আলোয় আলোকিত বাইরে টা । আসিফ কে কোনো ভাবেই বাড়ির ভেতর নেওয়া যায় না । কবরের উপর থেকে উঠছেই না ।
আস্তে আস্তে সবাই বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে । শুক্র বার থেকে সকলেই কান্নার উপরেই আছে ।
ফারিন এক্সিডেন্ট করে মারা গেলো , আসিফ স্ট্রোক করে আইসিইউ তে ভর্তি । সব কিছু মিলিয়ে সকলের অবস্থা ভীষণ খারাপ গেছে । টেনশন , শোক , কান্না একেক জনের অবস্থা নাজেহাল এখন । সকলের বিশ্রামের প্রয়োজন , খাবারের ও প্রয়োজন ।
কিছু একটা স্মরণ হতেই আসিফ কবরের উপর থেকে উঠে বসে । তারপর বিনা বাক্যে এগিয়ে যায় বাড়ির ভেতরের দিকে । যেই কয়েক জন বাইরে ছিল তারাও ওর পেছন পেছন বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে ।
বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সবাই আলাদা আলাদা রুমে চলে যায় ।
আসিফ নিজের রুমে এসে চারো দিকে নজর বুলায় । আজকে ওর ফারিন নেই ওর রুমে । আর কোনো দিন ওর জন্য এই রুমে বসে অপেক্ষা করবে না ওর ফারিন ।
চোখের পানি মুছে আলমারির সামনে গিয়ে দাড়ায় । ফারিন কি গিফট্ দিতে চেয়েছিল ?
আলমারি তন্ন তন্ন করে খুঁজে গিফট্ বক্স বের করে ।
তাড়াহুড়ো করে আনবক্সিন করে বক্স টা । খুলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা চিরকুট আর একটা প্রেগন্যান্সি কিট ।
কিটে দুটো লাল টকটকে দাগ স্পষ্ট । আসিফের হাত কাঁপতে শুরু করে থরথর করে । চিরকুটের ভাজ খোলে।
_ তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে আমি সব সময় প্রস্তুত রাইডার মশাই । অভিনন্দন তোমার দ্বিতীয় সন্তান আসছে তোমাকে জ্বালাতে ।
আসিফের হাতের সাথে সাথে শরীর ও কাপতে শুরু করে অস্বাভাবিক ভাবে । হাত থেকে চিরকুট আর প্রেগন্যান্সি কিট টা পড়ে যায় ।
কাঁপতে থাকা শরীর টেনে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায় । আয়নায় তাঁকিয়ে দেখে নিজেকে ।
চোখ যায় পাঞ্জাবির দিকে । ওর ফারিনের দেওয়া শেষ পাঞ্জাবি টা এভাবে নষ্ট করে ফেললো ! তাড়াহুড়ো করে পাঞ্জাবি খুলে নেয় ।
আলমারি খুলে একটা টিশার্ট বের করে পড়ে নেয় ।
চোখ যায় সিরিয়াল করে রাখা হেলমেটের দিকে ।
এই হেলমেটের জন্যই আজকে ওর ফারিন ওর কাছ থেকে হারিয়ে গেছে । যদি হেলমেট পড়ে থাকতো তাহলে হয়তো এমন কিছু হতো না । কোনো না কোনো ভাবে বেঁচে যেতো । ও কেনো ফারিন কে হেলমেট পড়তে বললো না ? কেনো হেলমেট ছাড়া ফারিন কে নিয়ে গেলো ?
নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসে । এগিয়ে যায় স্টোর রুমের দিকে । স্টোর রুমের ডোর খুলে ভেতরে প্রবেশ করে । খুঁজে খুঁজে হ্যামার টা বের করে হাতে তুলে নেয়। তারপর বেরিয়ে আসে । এগিয়ে যায় কিচেনে । সেখান থেকে লাইটার নিয়ে, জেনারেটর রাখা রুমে যায় । সেখান থেকে হাতে তুলে নেয় ডিজেলের গ্যালন ।
তিন টা নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে । বাহির থেকে গেট লক করে দেয় , ভেতর থেকে যেন কেউ বের হতে না পারে সেজন্য ।
এগিয়ে এসে দাঁড়ায় গ্যারাজের সামনে ।
ওর প্রথম নিনজা কে দার করিয়ে রাখা হয়েছে । এটা নিয়েই শুক্র বারে বের হয়েছিল । খুব বেশি ক্ষতি হয়নি বাইকের ।
হাতের জিনিস গুলো রেখে বাইকের কাছে এগিয়ে যায়। বাইকের উপর হাত বুলায় । আহা শখের বাইক । বাইক টা গ্যারাজের সামনে থেকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে আসে । দার করায় ফাঁকা জায়গায় ।
হ্যামার তুলে ঠাস করে আঘাত করে বাইকের সামনে । মুহূর্তেই ভেঙ্গে যায় সামনের টুকু । একের পর এক আঘাত করতে করতে বলে ,
_ তুই আমার শখের বাইক , তুই শখের বাইক হয়েও আমার শখের নারী কে কেড়ে নিয়েছিস । যেখানে আমার শখের নারী নেই সেখানে তুই কেনো থাকবি ?
তোরো থাকার কোনো অধিকার নেই ।
বলেই আঘাত করতে থাকে বার বার ।
সেদিন বাইক না নিয়ে যদি ফারিনের কথা শুনে কার নিয়ে বের হতো তাহলে আজ ওর ফারিন আর ওর অনাগত সন্তান বেঁচে থাকতো । শখ করে শখের বাইক নিয়ে বের হয়েছিল আর শখের নারী কে হারালো । সব দোষ এই বাইকের । বাইকের জন্যই ফারিন কে অনাগত সন্তান কে হারাতে হয়েছে ।
বাইকের নেশা আজ ওর ফারিন নামক নেশা কে কেড়ে নিয়েছে ওর কাছ থেকে সারা জীবনের জন্য ।
সব দোষ বাইকের । না এই বাইক নিয়ে বের হতো , আর না ফারিনের কিছু হতো ।
ঠাস ঠাস শব্দে বাড়ির ভেতরের সবাই হকচকিয়ে যায় । সবাই দৌড়ে আসে ড্রইং রুমে । তবে ড্রইং রুমে কোনো শব্দ নেই , শব্দ আসছে বাহির থেকে ।
গেট খুলে বেরোনোর চেষ্টা করলে পারে না । গেট বাহির থেকে বন্ধ ।
পাশের কাঁচের জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই দেখে আসিফ হ্যামার দিয়ে বাইক ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো করছে ।
ভেতর থেকে সবাই ডাকাডাকি করে সেই ডাক আসিফের কান অব্দি পৌঁছায় না ।
ভাঙ্গা শেষ হলে ডিজেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় শখের বাইকের উপর ।
ফারিনের কবরের পাশে হাটু গেড়ে বসে কাদতে শুরু করে অঝোরে । কাদতে কাদতে উপুড় হয়ে মাথা ঠেকায় কবরে ।
(গল্প হলেও নির্মম বাস্তবতাকে ঘিরে)