গল্প:অনন্ত তোমার মা...
 
Notifications
Clear all

গল্প:অনন্ত তোমার মায়া(Writer: Sana sheikh)

Page 2 / 2

Posts: 26
Topic starter
(@sana-sheikh)
Joined: 5 months ago
  
পর্ব:০৬
 

আসিফের জ্ঞান ফেরানো হয় । জ্ঞান ফেরার পর থেকে চুপ চাপ স্তব্ধ হয়ে বসে আছে খাটিয়ার সাথে মাথা ঠেকিয়ে । কি যেন ভেবে চলেছে এক মনে খাটিয়ার উপর শুইয়ে রাখা প্রাণ প্রিয় স্ত্রীর প্রাণহীন দেহের দিকে তাকিয়ে । সময় গড়াচ্ছে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে ধীরে ধীরে । 
আসিফ আবার হাঁটুতে ভর করে বসে । হাত বাড়ায় প্রাণহীন নিশ্চুপ হয়ে থাকা দেহের দিকে । 
হাত বুলায় কাফনের কাপড়ের উপর দিয়ে । এটা ওর স্ত্রী , ওর ভালোবাসা , ওর ভালো থাকার কারণ । 
গত কাল ও তো এই সময়ে দুজন এক সাথেই ছিল । কত কথা বললো , এতিম শিশুদের খাবার খাওয়ালো । 
বাড়ি ফেরার পথে কারে বসে ওর এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিল। 

আজ কেনো কথা বলছে না ? কেনো ওর এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে ঠিক করে দিচ্ছে না ? আসিফের একটু অসুস্থতায় তো ফারিন উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে , আসিফের একটু কষ্ট হলে ওরো কষ্ট হয় । আজ তো আসিফ কত অসুস্থ , কত কষ্ট হচ্ছে ওর । আজ কেনো ফারিন ওর কষ্ট দেখতে পাচ্ছে না ? ওর অসুস্থতায় কেনো উদ্বিগ্ন হচ্ছে না ? 

আসিফ আবার কাফনের কাপড়ের মোড়ানো অংশ খুলতে শুরু করে । পাশেই ফারিনের বাবা দাঁড়িয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন । তিনি খপ করে ধরেন আসিফের হাত । 

_ হাত ছাড়ুন বাবা ।

_ তুমি বার বার এমন কেনো করছো আসিফ ? 

_ ওর মুখ দেখবো আমি শেষ বারের মত । 

_ ওর মুখ তো বোঝা যায় না । মুখ দেখলেও বুঝতে পারবে না কিছু । 

কান্না গিলে থেমে থেমে বলেন কথা গুলো । 

_ তাও দেখবো আমি , শেষ বারের মত ছুঁয়ে দেবো । 

সরোয়ার আর আতিফ আসিফ কে ধরে । বোঝানোর চেষ্টা করে ফারিনের মুখ দেখার মত অবস্থায় নেই । 
আসিফ চোখ বন্ধ করে সব কথা শোনে ভাইয়ের । 

_ তাহলে হাত দেখবো । ওর হাত বের করো । 

আসিফের জেদের কাছে হার মানতে হয় । সকল পুরুষ মানুষ কে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয় । যারা ফারিনের শেষ গোছল করিয়েছে তাদের মধ্যে থেকে একজন কাফনের কাপড়ের ভেতর থেকে ফারিনের ডান হাত বের করে । হাত দেখার সাথে সাথেই শক্ত করে ধরে আসিফ । ঠান্ডা শক্ত হাত , ফর্সা হাত টা হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে । 
দুদিন আগে হাতে মেহেদী দিয়েছিল , এখনো স্পষ্ট রয়েছে সেই মেহেদী । হাতের তালুতে সুন্দর করে ইংরেজি অক্ষরে লেখা Love You Asif . 

ফারিনের ঠান্ডা শক্ত হয়ে থাকা হাতে অসংখ্য চুমু খায় ।এক হাত দিয়ে ধরে অন্য হাত দিয়ে ফারিনের হাতের উপর হাত বুলায় । আবার চুমু খায় । দুই হাতে শক্ত করে ধরে রাখে । 
দুই মিনিট,  চার মিনিট , ছয় মিনিট এভাবেই দশ মিনিট পেরিয়ে যায় আসিফ ছারে না ফারিনের হাত । 
সবাই ছাড়ানোর চেষ্টা করলেও পারে না । যেই ছাড়াতে আসে তার উপরেই গর্জে উঠছে । 
ফারিনের হাত ধরে রেখেই তাকায় ছেলের দিকে । কাদতে কাদতে ছেলের অবস্থা নাজুক । 
আসিফ ছেলে কে কাছে ডাকে , ভয়ে কাছে আসে না ফারাজ । যদি মারে ? সবাই কে কিভাবে ধমাচ্ছে । আসিফ আবার ডাকে ছেলে কে ।

_ বাবার কাছে আসো আব্বা । কিছু বলবো না আসো ।

দাদীর কোল থেকে নেমে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে বাবার কাছে । এক হাতে ছেলে কে জড়িয়ে ধরে আসিফ । তারপর চুমু খায় , অনেক আদর করে । 
বুকে চেপে ধরে নরম গলায় বলে ,

_ মায়ের মুখ দেখেছো ?

দুদিকে মাথা নাড়ায় ফারাজ । 

_ কেনো ?

কাদতে কাদতেই বলে ,

_ দেখতে দেয়নি ।

_ কে দেখতে দেয়নি ?

_ সবাই ।

_ এখন দেখবে ?

_ হুম । 

_ তোমার মায়ের কি হয়েছে জানো ?

_ এক্সিডেন্ট করে মরে গেছে । 

বলেই জোড়ে কেঁদে ওঠে ফারাজ । বাবার বুকে মুখ গুঁজে দুই হাতে বাবার পরনের পোশাক খামচে ধরে । ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে চুমু খায় আসিফ । এতক্ষণ ওর চোখে পানি ছিল না , ছেলের কান্না দেখে চোখ দুটো টইটুম্বুর হয়ে যায় । 

_ মায়ের হাত ধরবে ?

_ হুম ।

_ ধরো তাহলে । 

বাবার বুক থেকে মুখ তোলে ফারাজ । তাকায় খাটিয়ায় শুয়ে থাকা মায়ের দিকে । ছোট ফারাজ বুঝতেও পারছে না ওর জীবন থেকে কি হারিয়ে গেলো ! মা ডাকার মানুষ টা আর থাকবে না এই পৃথিবীর বুকে । কেউ আর আদর করে খাইয়ে দেবে না । মায়ের বুকে ঘাপটি মেরে ঘুমোনো হবে না আর । আহা যেই মানুষ টা ওকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতো সেই মানুষ টা আর নেই । আর কোনো দিন ভালোবাসবে না । মিষ্টি স্বরে ডাকবে না "বাবা ফারাজ দুষ্টামি করে না খাবার খেয়ে নাও । তোমার বাবা দেখলে কিন্তু বকা দেবে " । মা কে জ্বালাতন করার অপরাধে বাবার কাছে আর বকা খেতে হবে না । মাকে আঘাত করার অপরাধে বাবার হাতেও মার খেতে হবে না । গত কাল সন্ধ্যার পর থেকে বদলে গেছে ছোট্ট ফারাজের জীবন । মাকে জড়িয়ে ধরে কত কাঁদলো, ডাকলো অথচ মা উঠলো না । আদর করলো না , কোলে নিলো না । 

ফারাজের হাতে ফারিনের হাত ছোঁয়ায় আসিফ । মায়ের ঠান্ডা শক্ত হাত ছুঁতেই কেঁপে ওঠে ফারাজ । দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বাবার বুকের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নেয় । ভয়ার্ত কন্ঠে বলে ,

_ আম্মুর হাত এমন কেনো আব্বু ? 

_ কেমন আব্বু ?

_ ঠান্ডা শক্ত , আম্মুর হাত তো নরম তুলতুলে আর গরম গরম থাকে । এমন কেনো হয়েছে ?

_ তোমার আম্মু আমাদের ছেড়ে চলে গেছে যে সেজন্য।
আম্মু কে মিস্ করছো ?

_ হুম , আম্মু উঠছে না কেনো ? আম্মু কে উঠতে বলো । 

_ তুমি ডাকো , তুমি ডাকলে তো তোমার আম্মু সব সময় সাড়া দেয় । 

_ ডেকেছি অনেক কিন্তু ওঠেনি । সবাই বললো আর উঠবে না । আম্মু নাকি চাঁদের দেশে চলে গেছে । 
আম্মু তো এক্সিডেন্ট করে মরে গেছে না ? মানুষ মরে গেলে ওর ওঠে না আব্বু ? 

আশে পাশে যে কয়েক জন আছে সবাই শুনছে বাবা ছেলের কথপোকথন । 

_ মানুষ কেনো মরে যায় আব্বু ? 

ছেলের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না আসিফ । 
একজন এসে আসিফের হাতের মুঠোয় থেকে ফারিনের হাত ছাড়িয়ে নেয় । কাফনের কাপড়ে আচ্ছাদিত করে দেয় আবার । 
দুই হাতে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে বসে রইলো আসিফ । মুখে কান্নার শব্দ না হলেও চোখ দিয়ে বিরতিহীন পানি গড়িয়ে পড়ছে । 

কানে ভেসে আসে মসজিদের মাইকের এলান । 
বাদ আসর ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে ফারিনের জানাজা । 
কত সময় গড়িয়ে গেছে আসিফের জানা নেই । একটু পরেই কানে ভেসে আসে আসরের আযানের ধ্বনি । মোয়াজ্জিনরা আজান দিচ্ছেন । আজকের আযানের ধ্বনি আসিফের কানে সূমধুর লাগছে না । 
করুন শোনাচ্ছে এই আযানের ধ্বনি । ওর কষ্টে কি মোয়াজ্জিনদের কষ্ট হচ্ছে ? সেই জন্য কি এমন করুন সুরে আযান দিচ্ছে ? নাকি আসিফের কানেই শুধু করুন  শোনাচ্ছে ? 
আর অল্প সময়ের অপেক্ষা তার পর ওর ফারিন আর থাকবে না এই পৃথিবীর বুকে । শায়িত হবে অন্ধকার কবরে ।  ফারিন কিভাবে থাকবে ওই অন্ধকার কবরে ? 

আর ভাবতে পারছে না আসিফ । মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে । চোখ বন্ধ করে জোড়ে শ্বাস টেনে নেয় । আসরের নামাজ আদায় করতে হবে । ছেলে কে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় । 
কোনো কথা না বলে ছেলেকে কোলে নিয়ে পা বাড়ায় বাড়ির ভেতরের দিকে । ওর পেছন পেছন ওর তিন বন্ধ আর আতিফ যায় । 
কি করতে চাইছে কে জানে ? মাথা তো ঠিক নেই । জ্ঞান ফেরার পর থেকে কেমন যেন হয়ে আছে । উল্টা পাল্টা কিছু না আবার করে বসে । 

চার জন আসিফের পেছন পেছন ওর রুমে প্রবেশ করে। আসিফ ফারাজ কে বেডের উপর দার করিয়ে পরনের সব পোশাক খুলে দেয় । নিজের গায়ের পোশাক ও খুলে নেয় । 
ছেলেকে নিয়ে প্রবেশ করে ওয়াশরুমে । ওয়াশরুমের ডোরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে চার জন । আসিফ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না । ও নিজের মত ছেলে কে গোসল করায় । টাওয়েল দিয়ে পেঁচিয়ে রুমে নিয়ে আসে আবার । বেডের উপর দার করিয়ে ভালো ভাবে গা মুছিয়ে দেয় । গায়ে লোশন দিয়ে দেয় । শীতের জামা কাপড় পরিয়ে দেয় আবার । বেডে বসে থাকতে বলে নিজের পোশাক নিয়ে প্রবেশ করে ওয়াশরুমে । 

কয়েক মিনিট পরেই বেরিয়ে আসে শাওয়ার নিয়ে । 
প্যান্টের সাথে সাদা পাঞ্জাবী পড়েছে । পাঞ্জাবী টা ফারিন কিনে দিয়েছিল । দাড়ায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে । দ্রুত তৈরি হয়ে নেয় । আতরের কড়া ঘ্রাণ চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরে টেনে নেয় । ছেলের গায়েও আতর দিয়ে দেয় । ছেলের মাথায় সাদা টুপি পরিয়ে দিয়ে নিজেও পড়ে । 
ছেলে কে কোলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে । ওর পেছন পেছন চার জন বেরিয়ে যায় । 

আসিফ ছেলে কে নিয়ে সোজা মসজিদে আসে নামাজ আদায় করার জন্য । মসজিদ ওদের বাড়ির পাশেই । দুই মিনিট লাগে হেঁটে যেতে । ইতি মধ্যে মসজিদে অনেক মানুষ চলে এসেছে নামাজ আদায় করতে । আসিফ ছেলে কে নিয়ে দ্বিতীয় কাতারে শামিল হয় । 

বাড়িতে যত পুরুষ মানুষ ছিল সবাই নামাজ আদায় করতে মসজিদে উপস্থিত হয়েছে । 

নামাজ শুরু হয় , আবার শেষ ও হয় । 
সকলের মোনাজাত শেষ হয় আসিফের মোনাজাত শেষ হয় না । টপ টপ করে ঝরছে চোখের পানি । ছেলে টা বাবা কে অনুকরণ করে মোনাজাত ধরে বসে আছে। 
সময় গড়ায় আসিফ ডুকরে কেঁদে ওঠে । মোনাজাত শেষ করে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আবার । 
কান্নার কারণে আসিফের শরীর বার বার ঝাঁকি দিচ্ছে । 
যারা যারা মসজিদে উপস্থিত আছে সবাই তাঁকিয়ে দেখছে আসিফ কে । 
এলাকার বেশির ভাগ মানুষ জানে আসিফ কতটা বউ পাগল ছেলে । এলাকার ছোট বড় সবাই ওকে বউ পাগলা রাইডার বলে ডাকে এখন । ওর বন্ধুরা ছড়িয়েছে এই নাম । 
আজ আসিফের প্রাণ প্রিয় বউ টা বেঁচে নেই । কেউ অনুমানও করতে পারছে না আসিফের মনের অবস্থা । ওর মনের ভেতর কেমন অনুভূতি হচ্ছে কাউ বুঝতে পারছে না । এক মাত্র আসিফ আর ওর আল্লাহ তায়ালা জানেন ওর মনের ভেতরের অনুভূতি । 

কান্না বন্ধ হয় , সিজদা থেকে ওঠে । হাত দিয়ে চোখ মুখ মুছে নেয় । ছেলে কে আবার কোলে নিয়ে বাহিরের দিকে পা বাড়ায় । মসজিদের এত গুলো মানুষ ওর দিকে তাকিয়ে আছে সেদিকে ওর খেয়াল নেই । 

বাড়িতে ফিরে আসে । গিয়ে দাঁড়ায় খাটিয়ার সামনে । 
ধরা গলায় বলে ,

_ দেখো ফারিন তোমার পছন্দের পাঞ্জাবী পড়েছি , আতর দিয়েছি । কেমন লাগছে আমায় ? এই ঘ্রাণ তো তোমার ভীষণ পছন্দের তাইনা ? 

উত্তর দেয় না ফারিন । 
জানাজা পড়ানোর জন্য খাটিয়া নিতে আসে । 
আসিফ কে জানানো হয় খাটিয়া ঈদগাহ ময়দানে নিয়ে যাবে । 
আসিফ ছেলে কে আদর করে ওর দাদীর কোলে তুলে দেয় । বলে যায় ওর ছেলের খেয়াল রাখতে । 

আসিফ খাটিয়ার ডান পাশে দাঁড়ায় । বাম পাশে দাঁড়ায় ফাহাদ । 
পেছনের এক পাশে ফারিনের বাবা আর কাকা । অন্য পাশে আসিফের বাবা আর আতিফ । বড় ভাইয়ের সামনে দাঁড়ায় আরাফাত । 
খাটিয়া কাঁধে তুলে নেয় সবাই । কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে দুই পরিবারের সবাই । কয়েক কদম গিয়েই দাঁড়িয়ে যায় আসিফ । সবাই কে খাটিয়া নামাতে বলে । খাটিয়া নামায় সবাই । কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে আসিফ বলে ,

_ এত ওজন কেনো খাটিয়া ? আমি বহন করতে পারছি না এই ভর । আমার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে যেতে নিয়েছিল । 

সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আসিফের মুখের দিকে । যেই ছেলে একাই দুই'শো, আড়াই'শো  কেজির বাইক উচু করে ফেলে সেই  ছেলে এই খাটিয়ার ভর বহন করতে পারছে না ? তাও এত গুলো মানুষ ও সাথে বহন করছে । 

_ পাথরের মত ওজন এই খাটিয়ার । এতো ওজন দিয়ে এই খাটিয়া কে বানিয়েছে ? 

কেউ কোনো কথা বলে না । 
মাঝ খান থেকে ফাইয়াজ এসে দাঁড়ায় আসিফের সামনে । 
খাটিয়া আবার তোলা হয় । আসিফের কাছে তবুও আগের মতোই ভারী লাগছে । মনে হচ্ছে খাটিয়ার উপর কয়েক টনের পাথর তুলে রাখা হয়েছে । 
বহু কষ্টে খাটিয়া কাঁধে নিয়ে মসজিদের পাশে ঈদগাহ ময়দানে নিয়ে আসে । 
কাতারে কাতারে শামিল হয় শত শত মানুষ । মেয়ের জানাজা পড়াবেন ফারিনের বাবা ফয়সাল শিকদার । প্রথম কাতারে শামিল হয়েছে দুই পরিবারের সবাই । 

জানাযার নামাযে শত শত মানুষের ঢল নেমেছে । ঈদগাহ ময়দানে জায়গা হচ্ছে না । 
আসিফের যত পরিচিত মানুষ জন আছে সবাই এসেছে ওর ওয়াইফের মৃ*ত্যু*র সংবাদ শুনে ।  আশে পাশের এলাকা থেকেও অনেক মানুষ এসেছে । 

জানাজা শেষ হয় । ফারিনের খাটিয়া কাঁধে নিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে আসে সবাই । বাড়ির বাগানে কবর খনন করা হয়েছে ।  
সকলের সিদ্ধান্তে আসিফের জন্যই বাড়িতে খনন করা হয়েছে । 

কবরের পাশে খাটিয়া রাখা হয় । 

ফারিন কে তুলে কবরে রাখতে যাবে সেই মুহূর্তে আসিফ হঠাৎ করেই ভায়োলেন্স হয়ে ওঠে । কিছুতেই ফারিন কে কবরে নামাতে দেবে না । সবাই কে ঠেলে ঠুলে খাটিয়ার কাছ থেকে সরিয়ে দেয় । 

_ আমার ফারিন কে কেউ ধরবে না । ও থাকবে না এই অন্ধকার করবে । ও একা একা কিভাবে থাকবে ? এই শীতের মধ্যে এভাবে থাকলে শীত করবে না ওর ? ওকে আমি রুমে নিয়ে যাবো । আমার ফারিন আমার সাথে আমার রুমে থাকবে আগের মতোই ।

_ পাগল হয়েছিস ভাই ? ওকে দাফন করতে দে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে । 

_ কার দাফন হবে ? কোনো দাফন টাফন হবে না । আমার ফারিন কে আমি এখানে রাখতে দেবো না । 

বলেই খাটিয়া থেকে ফারিন কে তোলার জন্য উদ্যত হয়। আতিফ সরোয়ার আর শামীম তিনজনে মিলে আসিফ কে টেনে সরিয়ে নিয়ে আসে খাটিয়ার কাছ থেকে । আসিফ নিজের সর্ব শক্তি প্রয়োগ করে তিন জনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় । সরোয়ার আবার ধরতেই ওর বুকে পাঞ্চ করে । ব্যাথা পেয়ে ঝুঁকে পড়ে সরোয়ার । 
আসিফের খ্যাপাটে পনা দেখে সবাই হা হয়ে আছে । শান্তি মত কি মেয়ে টাকে দাফন ও দেওয়া যাবে না ? আসিফ যেরকম শুরু করেছে মনে হচ্ছে না দাফন সম্পন্ন করতে দেবে । 

কয়েক জন মিলে ফারিন কে তুলে কবরে নামানোর জন্য উদ্যত হতেই গর্জন করে সেদিকে ছুটে যেতে নেয় আসিফ । আতিফ আসিফ কে শান্ত করতে না পেরে সজোড়ে ওর গালে চড় বসায় । 
চড় খেয়ে আসিফের খ্যাপাটে পনা আরো বেড়ে যায় । 
আবার গর্জে ওঠে "ওই" বলে  । 
বলেই দুহাতে ভাইয়ের গলা চেপে ধরে শক্ত করে । ঠেলে পেছনের দিকে নিয়ে যায় কয়েক হাত । 
আসিফের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ওর উপর ভূত ভর করেছে । মানসিক ভাবে আনস্ট্যবল হয়ে পড়েছে তা স্পষ্ট । 
একটু পরেই ছেড়ে দেয় ভাইয়ের গলা । ভাই কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে । আতিফ নিজেও জড়িয়ে ধরে ছোট ভাইয়ের পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সান্তনা দেয় । 

কাদতে কাদতে নিচে বসে পড়ে আসিফ । ওর সাথে আতিফ নিজেও বসে নীচে । 
কাদতে কাদতে বলে ,

_ ফারিন কে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো ভাইয়া ? ফারিন হীন দুনিয়া আসিফের জন্য না । ফারিন হীন দুনিয়ায় আসিফ কিভাবে বেঁচে থাকবে ভাইয়া ? ফারিন কে একবার ফিরে আসতে বলো না ভাইয়া । ও যা বলবে সব শুনবো আমি । ওর কথার একটুও হের ফের করবো না আমি ।  আমি বাইক চালাবো না আর ,  ও যা চাইবে সেটাই হবে । ওকে শুধু একটা বার ফিরে আসতে বলো । 

_ শান্ত হ ভাই , অসুস্থ্য হয়ে যাবি আবার । 

_ ফারিন আমাকে ছেড়ে একা একা কিভাবে চলে গেলো ? ও আমাকে কেনো নিলো না ? ও তো জানতো আসিফ ওকে ছাড়া এক দন্ড থাকতে পারে না । ওকে ছেড়ে আমি এখন বাকি জীবন কিভাবে কাটাবো ? 

বলেই ভাইকে ছেড়ে খাটিয়ার দিকে তাকায় । দেখে ফারিন কে কবরে নামানো হচ্ছে । 
আসিফ চিৎকার করে উঠতে নিতেই ছয় সাত জন মিলে ওকে চেপে ধরে রাখে । 
আসিফ আহত সিংহের ন্যায় গর্জন করতে থাকে আর ওকে ছেড়ে দিতে বলে । দেখতে দেখতে ওর চোখের সামনে ফারিন কে কবরে শায়িত করা হয় । 

_ আমাকেও আমার ফারিনের সাথে কবর দিয়ে দাও তোমরা । আমি ফারিন হীন দুনিয়ায় থাকতে পারবো না। আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে , আমার বুকে কষ্ট হচ্ছে । আমার ফারিন কে ওখান থেকে তোলো নয়তো আমাকেও কবর দিয়ে দাও ওর সাথেই । আমার কথা কেনো শুনছো না তোমরা ? ফারিন কে ওখান থেকে তোলো এই শীতের মধ্যে ফারিনের ঠান্ডা লাগবে । ওখানে ব্ল্যাঙ্কেট নেই , লেপ নেই , তোষক নেই  । ফারিন কে ওখানে রাখবে না । 

বাবার কান্না দেখে ছোট্ট ফারাজ ও কান্না করছে জোড়ে জোড়ে । 

ফারিনের দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত আসিফ  একই বাক্য বলে যায়।

_ আমাকেও ফারিনের সাথে দাফন করে দাও তোমরা । আমি এত কষ্ট সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারবো না । ফারিন আমার ফারিন আমার ফারিন । ফারিন আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে । আমার কষ্ট হচ্ছে , শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে । 

পুরো টা সময় ওকে চেপে ধরে রাখে ছয় সাত জন মিলে। 
দাফন সম্পন্ন হতেই দোয়া করে সবাই । 
আসিফ কে ছেড়ে দিতেই দৌড়ে গিয়ে ফারিনের কবরের উপর থেকে মাটি সরাতে শুরু করে হাত দিয়ে । কয়েক জন ধরে আবার থামায় ওকে । 
উন্মাদের মতো আচরণ করছে এখন । অতি শোকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেনি তো ? 
একটু শান্ত হতেই ছেড়ে দেয় আবার । কবরের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে আসিফ । দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কবর খানা । বিরতিহীন ভাবে কান্না করতে থাকে হু হু করে । 

ফারিনের মৃত্যুতে সবাই যতটা না কষ্ট পাচ্ছে তার থেকে কয়েক গুণ বেশি কষ্ট পাচ্ছে আসিফের অবস্থা দেখে । 
একবার স্ট্রোক করেছে , এখন পাগলের মতন আচরণ করছে । ওর কিছু হয়ে যাবে না তো আবার ? 

হাসি খুশি পরিবার টায় হঠাৎ করেই দুঃখের আবির্ভাব ঘটল । গত কাল সকাল থেকে কত আয়োজন হলো এই বাড়িতে আজ সেই বাড়িতেই আয়োজন করে কান্না করছে সবাই । মানুষের কান্নার গুনগুন শব্দ , আসিফের হু হু করে কান্না , ছোট ছেলে টা মা হারিয়ে বাবার অবস্থা দেখে ভয়ে কান্না করছে জোড়ে জোড়ে । 

আস্তে আস্তে বাড়ি থেকে ভিড় কমে যায় । বাড়তি মানুষ সবাই চলে যায় বাড়ি থেকে । মাগরিবের আজান হচ্ছে। 
অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে ধরণী । 
আসিফের কান্না বন্ধ হয় না । 

পুরোপুরি অন্ধকার নেমে আসে ধরণীতে । নিয়ন আলোয় আলোকিত বাইরে টা । আসিফ কে কোনো ভাবেই বাড়ির ভেতর নেওয়া যায় না । কবরের উপর থেকে উঠছেই না । 

আস্তে আস্তে সবাই বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে । শুক্র বার থেকে সকলেই কান্নার উপরেই আছে । 
ফারিন এক্সিডেন্ট করে মারা গেলো , আসিফ স্ট্রোক করে আইসিইউ তে ভর্তি । সব কিছু মিলিয়ে সকলের অবস্থা ভীষণ খারাপ গেছে  । টেনশন , শোক , কান্না একেক জনের অবস্থা নাজেহাল এখন । সকলের বিশ্রামের প্রয়োজন , খাবারের ও প্রয়োজন । 

কিছু একটা স্মরণ হতেই আসিফ কবরের উপর থেকে উঠে বসে । তারপর বিনা বাক্যে এগিয়ে যায় বাড়ির ভেতরের দিকে । যেই কয়েক জন বাইরে ছিল তারাও ওর পেছন পেছন বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে । 

বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সবাই আলাদা আলাদা রুমে চলে যায় । 

আসিফ নিজের রুমে এসে চারো দিকে নজর বুলায় । আজকে ওর ফারিন নেই ওর রুমে । আর কোনো দিন ওর জন্য এই রুমে বসে অপেক্ষা করবে না ওর ফারিন । 

চোখের পানি মুছে আলমারির সামনে গিয়ে দাড়ায় । ফারিন কি গিফট্ দিতে চেয়েছিল ? 
আলমারি তন্ন তন্ন করে খুঁজে গিফট্ বক্স বের করে । 
তাড়াহুড়ো করে আনবক্সিন করে বক্স টা । খুলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা চিরকুট আর একটা প্রেগন্যান্সি কিট । 
কিটে দুটো লাল টকটকে দাগ স্পষ্ট । আসিফের হাত কাঁপতে শুরু করে থরথর করে । চিরকুটের ভাজ খোলে।

_ তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে আমি সব সময় প্রস্তুত রাইডার মশাই । অভিনন্দন তোমার দ্বিতীয় সন্তান আসছে তোমাকে জ্বালাতে । 

আসিফের হাতের সাথে সাথে শরীর ও কাপতে শুরু করে অস্বাভাবিক ভাবে । হাত থেকে চিরকুট আর প্রেগন্যান্সি কিট টা পড়ে যায় । 
কাঁপতে থাকা শরীর টেনে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায় । আয়নায় তাঁকিয়ে দেখে নিজেকে । 
চোখ যায় পাঞ্জাবির দিকে । ওর ফারিনের দেওয়া শেষ পাঞ্জাবি টা এভাবে নষ্ট করে ফেললো ! তাড়াহুড়ো করে পাঞ্জাবি খুলে নেয় । 
আলমারি খুলে একটা টিশার্ট বের করে পড়ে নেয় । 
চোখ যায় সিরিয়াল করে রাখা হেলমেটের দিকে । 
এই হেলমেটের জন্যই আজকে ওর ফারিন ওর কাছ থেকে হারিয়ে গেছে । যদি হেলমেট পড়ে থাকতো তাহলে হয়তো এমন কিছু হতো না । কোনো না কোনো ভাবে বেঁচে যেতো । ও কেনো ফারিন কে হেলমেট পড়তে বললো না ? কেনো হেলমেট ছাড়া ফারিন কে নিয়ে গেলো ? 
নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসে । এগিয়ে যায় স্টোর রুমের দিকে । স্টোর রুমের ডোর খুলে ভেতরে প্রবেশ করে । খুঁজে খুঁজে হ্যামার টা বের করে হাতে তুলে নেয়। তারপর বেরিয়ে আসে । এগিয়ে যায় কিচেনে । সেখান থেকে লাইটার নিয়ে, জেনারেটর রাখা রুমে যায় । সেখান থেকে হাতে তুলে নেয় ডিজেলের গ্যালন । 
তিন টা নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে । বাহির থেকে গেট লক করে দেয় , ভেতর থেকে যেন কেউ বের হতে না পারে সেজন্য । 

এগিয়ে এসে দাঁড়ায় গ্যারাজের সামনে । 
ওর প্রথম নিনজা কে দার করিয়ে রাখা হয়েছে । এটা নিয়েই শুক্র বারে বের হয়েছিল । খুব বেশি ক্ষতি হয়নি বাইকের । 
হাতের জিনিস গুলো রেখে বাইকের কাছে এগিয়ে যায়। বাইকের উপর হাত বুলায় । আহা শখের বাইক । বাইক টা গ্যারাজের সামনে থেকে একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে আসে । দার করায় ফাঁকা জায়গায় । 
হ্যামার তুলে ঠাস করে আঘাত করে বাইকের সামনে । মুহূর্তেই ভেঙ্গে যায় সামনের টুকু । একের পর এক আঘাত করতে করতে বলে ,

_ তুই আমার শখের বাইক  , তুই শখের বাইক হয়েও আমার শখের নারী কে কেড়ে নিয়েছিস । যেখানে আমার শখের নারী নেই সেখানে তুই কেনো থাকবি ? 
তোরো থাকার কোনো অধিকার নেই । 

বলেই আঘাত করতে থাকে বার বার । 
সেদিন বাইক না নিয়ে যদি ফারিনের কথা শুনে কার নিয়ে বের হতো তাহলে আজ ওর ফারিন আর ওর অনাগত সন্তান বেঁচে থাকতো । শখ করে শখের বাইক নিয়ে বের হয়েছিল আর শখের নারী কে হারালো । সব দোষ এই বাইকের । বাইকের জন্যই ফারিন কে অনাগত সন্তান কে হারাতে হয়েছে । 
বাইকের নেশা আজ ওর ফারিন নামক নেশা কে কেড়ে নিয়েছে ওর কাছ থেকে সারা জীবনের জন্য । 
সব দোষ বাইকের । না এই বাইক নিয়ে বের হতো , আর না ফারিনের কিছু হতো । 

ঠাস ঠাস শব্দে বাড়ির ভেতরের সবাই হকচকিয়ে যায় । সবাই দৌড়ে আসে ড্রইং রুমে । তবে ড্রইং রুমে কোনো শব্দ নেই , শব্দ আসছে বাহির থেকে ।

গেট খুলে বেরোনোর চেষ্টা করলে পারে না । গেট বাহির থেকে বন্ধ । 
পাশের কাঁচের জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই দেখে আসিফ হ্যামার দিয়ে বাইক ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো করছে । 
ভেতর থেকে সবাই ডাকাডাকি করে সেই ডাক আসিফের কান অব্দি পৌঁছায় না । 
ভাঙ্গা শেষ হলে ডিজেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় শখের বাইকের উপর । 

ফারিনের কবরের পাশে হাটু গেড়ে বসে কাদতে শুরু করে অঝোরে । কাদতে কাদতে উপুড় হয়ে মাথা ঠেকায় কবরে ।

 

(গল্প হলেও নির্মম বাস্তবতাকে ঘিরে) 

Loading spinner

Reply
Posts: 26
Topic starter
(@sana-sheikh)
Joined: 5 months ago
  
পর্ব:০৭ (অন্তিম পর্ব)
 

ফাহাদ বাড়ির ছাদে উঠে গাছ বেয়ে নিচে নেমে আসে। তারপর বাড়ির গেট খুলে দেয় । হুড়মুড়িয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সবাই । 

বাইকের আগুন ততক্ষণে প্রায় অর্ধেক কমে এসেছে । 
সবাই দৌড়ে এগিয়ে যায় আসিফের কাছে । 
আসিফ ফারিনের কবরের সাথে মাথা ঠেকিয়ে কাদঁছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে । ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে , শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে । বুকে অসহ্য রকমের যন্ত্রণা হচ্ছে । কি নিদারুণ সেই যন্ত্রণা । আসিফ যদি বোঝাতে পারতো কাউকে এই যন্ত্রণা । ওর বুক ফেটে যাচ্ছে । 
ফারিন কে ছেড়ে কিভাবে বেঁচে থাকবে ? নিজের সব টা দিয়ে যে ফারিন কে ভালোবেসে ছিল । ফারিন তো চলে গেল, আসিফ কে জিন্দা লাশ বানিয়ে চলে গেল। আসিফ কি কোনো দিন স্বাভাবিক হতে পারবে ? ফারিন হীন দুনিয়ায় বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবে কোনো দিন ? পারবে না , পারবে না আসিফ এভাবে বেঁচে থাকতে । 

আসিফের অবস্থা দেখে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। 
অনেক সময় পেরিয়ে যায় আসিফ কাদতেই থাকে । ওর কান্না কোনো ভাবেই বন্ধ হচ্ছে না । চোখের পানি ও ফুরাচ্ছে না । আসিফের পাশে বসে আতিফ । হাত রাখে ভাইয়ের মাথার উপর । হাত বুলিয়ে বলে ,

_ ভাই ওঠ , এভাবে কাদতে থাকলে তুই অসুস্থ্য হয়ে যাবি । নিজেকে সামলা , বাস্তবতা মেনে নে । ফারিনের হায়াত এই অব্দি ছিল । হায়াত শেষ তাই আল্লাহর বান্দী আল্লাহ নিয়ে গেছেন । 

পাশে এসে বসেন আঞ্জুমান আরা বেগম । তিনিও ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে ভেজা গলায় থেমে থেমে বলেন ,

_ বাবা শক্ত কর নিজেকে । এভাবে ভেঙ্গে পড়লে হবে না । তুই এভাবে ভেঙ্গে পড়লে , তোর কিছু হয়ে গেলে ফারাজের কি হবে ?  

মাথা তুলে সোজা হয়ে বসে আসিফ । মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ,

_ তোমরা তো আছো ওর জন্য । 

_ আমরা থাকলেই কি শুধু হবে ? ওর মা বেঁচে নেই , তুই ওর বাবা । তুই ছোট ছেলে টা কে নিজের কাছে না রেখে দূরে রয়েছিস । ছেলে টা কাদতে কাদতে ঘুমিয়ে গেছে । দুপুরেও খায়নি , রাতেও খায়নি । আমাদের কারো কাছে খাবার খাচ্ছে না , বার বার আম্মু আব্বু করছে । এভাবে ছেলে টাও অসুস্থ্য হয়ে যাবে বাবা । নিজের জন্য না হোক অন্তত ফারাজ এর জন্য নিজেকে শক্ত কর । 

আসিফ মায়ের দিকে ঘুরে বসে । মায়ের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নেয় । কেঁদে কেঁদে থেমে থেমে বলে ,

_ জানো আম্মু, আমি আবার বাবা হতাম । আমার দ্বিতীয় সন্তান ওর মায়ের পেটে ছিল । আমার ভালোবাসা , আমার দ্বিতীয় সন্তান দুজনেই আমাকে ছেড়ে চলে গেল। দুজনেই যখন ধরা ছোঁয়ার বাইরে তখন জানতে পারলাম আমি বাবা হতে চলেছিলাম । আমার সন্তান , আমার ওয়াইফ । 

বলেই জোড়ে শব্দ করে কেঁদে ওঠে আবার । কাদতে কাদতে উপুড় হয়ে মাটিতে মাথা ঠেকায় আবারও । 

কিছু সময় কাদার পর মাথা সোজা করে বসে আবার । 

_ আমাকে ছেড়ে কেনো চলে গেলো ওরা ? আমি কিভাবে বাঁচবো আম্মু ? আমার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে , বুক ফেটে যাচ্ছে । আমার দ্বিতীয় সন্তান কে আমি ছুঁতেই পারলাম না । আমার ওয়াইফ কে আমি নিজের কাছে রাখতে পারলাম না । আমি বাবা হিসেবে , হাজব্যান্ড হিসেবে ব্যার্থ । আমি আগলে রাখতে পারিনি ওদের ।

একটু দম নিয়ে লম্বা শ্বাস টেনে নেয় ।

_ ফারিন বাইকে যেতে চাইলো না কিন্তু আমি ওকে জোর করে নিয়ে গেলাম।  যদি ওর কথা শুনতাম বাইক না নিয়ে কার নিতাম তাহলে আজ আমার ওয়াইফ আর সন্তান দুজনই বেঁচে থাকতো । সব আমার দোষ , আমি দোষী । আমার জন্যই আমার সন্তান আর ওয়াইফ বেঁচে নেই । আমি কিভাবে নিজেকে ক্ষমা করব আম্মু ? আমি এভাবে কিভাবে বেঁচে থাকবো ? 

_ শান্ত হ বাবা এভাবে ভেঙে পরিস না তুই নিজেকে সামলা । ফারিনের হায়াত এই অব্দি দিয়েছিল আল্লাহ তায়ালা । হায়াত ফুরিয়ে গেলে আমরা কেউ ধরে বেঁধে কাউকে রাখতে পারব না । কে কতদিন পৃথিবীতে থাকবে তা আগে থেকে নির্ধারণ করা থাকে । নিয়তি কে মেনে নে । 

_ আমি তো মানতে পারছি না আম্মু ।  আমার কষ্ট হচ্ছে আমার ফারিন আমাকে ছেড়ে চলে গেল আমি কিভাবে নিজেকে ক্ষমা করব ? আমি কিভাবে বাঁচবো ?  আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে । এ পৃথিবীর শ্বাস ও এখন আমার কাছে বিষাক্ত লাগছে,  সবকিছু বিষাক্ত । 
সেদিন আমার জেদ করা উচিত হয়নি,  বাইক নেওয়া উচিত হয়নি আমার ।  আমি কেনো ফারিন কে হেলমেট পড়তে বললাম না ? কেন কেন কেন ? এই আফসোস , আক্ষেপ,  না পাওয়া নিয়ে আমি কিভাবে বেঁচে থাকবো ?

আসিফের কথা আর কান্না শুনে সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে । আসিফের প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারছে না সকলের চোখে বাঁধ ভাঙ্গা পানি । সকলেই যে তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। 

আসিফ বড় ভাইয়ের দিকে ঘুরে বসে। 

_ ভাইয়া গ্যারেজের চাবি কোথায়? গ্যারেজের চাবি দাও।

_ এখন চাবি দিয়ে কি করবি ভাই?

_ ওই পাঁচ টা কে বের করো।

_ পাগল হয়েছিস তুই? ও গুলো তোর কত স্বপ্নের, শখের বাইক।

_ স্বপ্নের আর শখের আগে ছিল এখন না । এই বাইক আমার জীবন থেকে আমার স্ত্রী সন্তান কে কেড়ে নিয়েছে । আমার ছেলের জীবন থেকে ওর মা ভাই-বোন কে কেড়ে নিয়েছে । আর কাউকে কেড়ে নিক আমি চাই না।

একটু শ্বাস টেনে নিয়ে আবার বলে ,

_ আমার জীবনের অভিশপ্ত বাইক গুলোকে জ্বালিয়ে দেব । ওদের আমি আর রাখবো না এই বাড়িতে। ওদের ছায়াও থাকবে না , ওদের অস্তিত্বও থাকবে না এ বাড়িতে। দ্রুত চাবি দাও।

_ চাবি কোথায় আমি জানিনা ভাই , চাবি আমার কাছে নেই । 

_ কার কাছে আছে ? আম্মু চাবি দাও তাড়াতাড়ি দাও ।

আঞ্জুমান আরা বেগম কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলেন,

_  আমার কাছে নেই বাবা । 

_ কার কাছে আছে তাহলে ?  কোথায় আছে আমাকে বলো আমি নিয়ে আসছি ? 

_ জানিনা কোথায় আছে ।

আসিফ বাসা থেকে উঠে দাঁড়ায় । হ্যামার  হাতে নিয়ে এগিয়ে যায় গ্যারেজের সামনে । দুই হাতে উঁচু করে ধরে হ্যামার । বারি দিতে উদ্যত হয় শাটারের তালার উপর । 
দৌড়ে এসে আসিফকে ধরে  ফাহাদ আর আতিফ । 
পাগলের মত আচরণ শুরু করে আসিফ । পুরো  উন্মাদ হয়ে যায় । কোনো ভাবেই সামলানো যায় না আর ওকে। 
অনেক কষ্টে চেপে ধরে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কিছুটা শান্ত করা হয় । এর মধ্যে ভেতর থেকে ভেসে আসে ফারাজের কান্নার শব্দ । গলা ছেড়ে আম্মু আম্মু বলে কান্না করছে । ছেলের কান্না শুনতে স্থির হয়ে যায় আসিফ । আসিফের দাদি ফারাজ কে নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে । 
দুজনের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেয় আসিফ ।
এগিয়ে যায় ছেলের কাছে । হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে বুকের মাঝে আগলে ধরে । 
আদর মাখা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

_  কি হয়েছে আব্বু ?

_ আম্মুর কাছে যাব । আম্মু কোথায়? আম্মু আসছে না কেন ? 

_ ভুলে গেছো তোমার আম্মু তো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে ।  ওই তো দেখো , মাটির নিচে কি সুন্দর ঘুমিয়ে আছে উঠছে না । তুমি তোমার আম্মুকে ডাকো তাহলে উঠবে ।  তোমার আম্মু কে আমি তো কত ডাকলাম উঠল না ।  তুমি ডাকলে নিশ্চয়ই শুনবে , তোমার আম্মু তো  তোমাকে অনেক ভালোবাসে । 

_ আমি ডাকলে উঠবে ?

_ হুম ।

আসিফ ছেলেকে কোলে নিয়ে এগিয়ে যায় ফারিনের কবরের কাছে । ছেলেকে কোলে নিয়েই বসে হাঁটু মুড়ে । 

_ দেখো ফারিন তোমাকে ছাড়া আমরা ভালো নেই । তোমার আদরের ছেলে তোমাকে ছাড়া ভালো নেই । আমি ভালো নেই , কেউ ভালো নেই, তুমি ফিরে আসো প্লিজ । কিভাবে থাকবো তোমাকে ছাড়া ?  তোমাকে ছাড়া তো ফারাজ খেতে চায় না ,  ঘুমোতে চায় না । ফারাজ তোমার জন্য কত পাগল , তোমাকে ছাড়া কিভাবে থাকবে ? আমি কিভাবে থাকবো ? প্লিজ ফিরে আসো  ফারিন । একটা বার ফিরে আসো ফারিন । তোমার সব কথা শুনব আমি । আমি জীবনেও আর বাইক চালাবো না , বাইকের অস্তিত্ব রাখবো না এ বাড়িতে, শুধু তুমি ফিরে আসো । 

কথা শেষ করে ঝর ঝর করে কেঁদে ওঠে আবার । 
বাবা কান্না থেকে ছোট্ট ফারাজ ও কাঁদে । 
কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ফারাজ বলে ,

_ আব্বু খিদে পেয়েছে । 

ছেলের মুখ পানে তাকায় আসিফ । মুখটা শুকিয়ে এতটুকুনি হয়ে গেছে । 

_ খিদে পেয়েছে আব্বু ?

_ হ্যাঁ আব্বু ।

আসিফ মায়ের মুখের দিকে তাকায় ।

_ খাবার আছে বাড়িতে খাবার ?

_ তোর ছোট কাকি দিয়ে গেছে । 

ছেলে কে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় । 

_ আমার ফারিন কে একা রেখে তোমরা কেউ কোথাও যাবে না । আমি ফারাজ কে খাবার খাইয়ে  আসছি ।

_ আচ্ছা যাবো না । 

বড় বড় কদম ফেলে এগিয়ে যায় বাড়ির ভেতরের দিকে। 
ফারিনের মা মেয়ের কবরের পাশে বসে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন । এতক্ষণ আসিফের জন্য বহু কষ্টে নিজেকে আটকে রেখেছিলেন । এখন আর পারলেন না। 

আসিফের অবস্থা ভালো না । দুদিন ধরে না খাওয়া । দুপুর পর্যন্ত স্যালাইনের উপর ছিল তার পর থেকে একফোঁটা পানিও আর শরীরে প্রবেশ করেনি । 
খাবার খেতে হবে , মেডিসিন খেতে হবে । 
বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় আতিফ । এগিয়ে যায় বাড়ির ভেতরে । 

বাকি সবাই তাঁকিয়ে রইলো ফারিনের কবরের দিকে । 
কেউ নিজেকে বুঝাতেই পারছে না ফারিন নেই । চিরো দিনের জন্য চলে গেছে এই রঙ্গিন দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে । 

আসিফ ছেলের জন্য প্লেটে ভাত নেয় । মাংস নিয়ে মাখিয়ে ছেলে কে খাওয়াতে শুরু করে । ক্ষুধার্ত ফারাজ বিনা বাক্যে খাওয়া শুরু করে । অন্য সময় হলে এখন ওকে কিছুতেই এই খাবার খাওয়ানো যেতো না ।

অল্প সময়ের মধ্যে খাওয়া শেষ করে ফারাজ । ঘুমে আর ক্লান্তিতে ছোট্ট ফারাজ এর চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে এসেছে । 
বাবার বুকে মাথা এলিয়ে দেয় । চোখ বন্ধ করে বলে ,

_ আব্বু ঘুম । 

ছেলে কে কোলে নিয়েই বেসিন থেকে হাত ধুয়ে নেয় । ডাইনিং টেবিল ক্রস করে যাওয়ার সময় সামনে দাড়ায় আতিফ । হাতে খাবারের প্লেট । প্লেটে ভাত আর করলা ভাজি । করলা ভাজি আসিফের ভীষণ পছন্দের । 

_ ভাত খেয়ে যা ভাই ।

_ খাবার আমার গলা দিয়ে নামবে না ভাইয়া ।

_ তোকে মেডিসিন খেতে হবে। মেডিসিন না খেলে যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে । বেশি না খেলেও অল্প খা । 

_ একটাও খাবো না । আমার ফারিন ও তো না খেয়ে আছে । ওকে ছেড়ে আমি কিভাবে খাবো ? ফারিন কে ছাড়া আমি খাইনা তুমি জানো না ? 

বলেই ভাই কে পাশ কাটিয়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় । প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে রইলো আতিফ । 
ওর ভয় হচ্ছে ভীষণ । ফারিন চলে গেলো , আসিফের যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে ফারাজ এর কি হবে ? ওরা যতই ওকে ভালোবাসুক বাবা মায়ের কমতি কোনো দিন পূরণ করতে পারবে না । 
প্লেট আর পানির গ্লাস হাতে নিয়ে এগিয়ে যায় আসিফের রুমের দিকে । 

আসিফের রুমে এসে দেখে ছেলে কে বুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে । ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে শরীর ঢাকা । নিশ্চুপ হয়ে বাবার বুকের সাথে লেপ্টে আছে ফারাজ । হয়তো ঘুমিয়েও গেছে । 
আসিফের চোখ থেকে গলগল করে পানি পড়ে বালিশ ভিজে যাচ্ছে । ফোপানোর কারণে একটু পর পর শরীর নড়ে উঠছে । 
আদরের ভাইয়ের অবস্থা দেখে কিছু বলতে পারে না আতিফ । নিজেও নিশ্চুপ হয়ে দাড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে । 

জীবনে কেনো এত কঠিন সময় আসে ? সাজানো গোছানো জীবন  হঠাৎ ঝরে কেনো এভাবে এলোমেলো হয়ে যায় ? প্রিয় মানুষ গুলো কেনো ছেড়ে চলে যায় ? এই কষ্ট কেনো সহ্য করা যায় না ? এই কষ্ট , যন্ত্রণা কেনো এত পিড়া দায়ক ?  

সময় গড়ায় ঘুমে বিভোর হয়ে যায় ফারাজ । ওর ভারী শ্বাস পড়তে শুরু করে । 
ছেলে কে ছেড়ে উঠে বসে আসিফ । ভাতের প্লেট হাতে এগিয়ে আসে আতিফ । বসে ভাইয়ের সামনে । 

_ তুই হা কর আমি খাইয়ে দিচ্ছি ।

_ তুমি খাও আমার খিদে নেই । 

_ দুদিন ধরে না খেয়ে আছিস তবুও খিদে নেই ?

_ নাহ্ , যেই বাইক আমার বাইকে ধাক্কা দিয়েছিল ওই বাইক আর ছেলে দুটো কোথায় ? 

_ বাইক ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে । যার বাইক সেই ছেলে টা ফারিনের মতোই স্পট ডেথ । ওর সাথের ছেলে টা হসপিটালে ভর্তি । ছেলেটার অবস্থা নাজুক । ভালো মন্দ কিছু হয়ে যেতে পারে । ডক্টর'রা  কোনো গ্যারান্টি দিতে পারছেন না । তোর সাথেই আইসিইউ তে ভর্তি ছিল । যেই ছেলে টা মা*রা গেছে সেই ছেলে বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান । কয়েক মাস আগেই বিয়ে করেছে । বউ টা নাকি দুই মাসের প্রেগন্যান্ট। 

চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস নেয় আসিফ । 

_ আর ট্রাক ড্রাইভার ?

_ ট্রাক ড্রাইভারের কোনো দোষ নেই । তবুও তাকে থানায় আটকে রেখেছে । সিএনজি ড্রাইভার কেও থানায় আটকে রাখা হয়েছে । তাদের দুজনের মধ্যে কারো দোষ নেই । তারা স্বাভাবিক গতিতেই যাচ্ছিল । হঠাৎ এক্সিডেন্ট এ বুঝতে সক্ষম হয়নি , ব্রেক ও করতে পারেনি । দোষ ছিল ওই বাইকারের কিন্তু সে তো বেঁচে নেই । নিজে ম'রেছে , অন্য কে মে'রেছে , সাথে কত গুলো জীবন অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে গেছে । 

ভাইয়ের সব কথা শোনে আসিফ । তারপর বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় । চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে , মাথা চক্কর দিচ্ছে । 
ভাইয়ের ডাক উপেক্ষা করে বেরিয়ে যায় রুম থেকে । 
দ্রুত পায়ে বেরিয়ে আসে বাড়ির বাইরে । 

সবাই কে বাড়ির ভেতর পাঠিয়ে দেয় । ওর জেদের কাছে হেরে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে সবাই । হাজার বলেও ওকে ভেতরে নিয়ে আসতে পারেনি । 

শীত জেঁকে বসেছে । হিম শীতল ঠান্ডা বাতাস । মশার ভন ভন শব্দ । নিশাচর ভবঘুরে পানির ডাক । রাস্তার নেড়ি কু*কু*রের ঘেউ ঘেউ । ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে । 
আসিফের পাশে একটা মশার কয়েল জ্বালিয়ে দেয় আতিফ । তারপর ভাইয়ের পাশেই বসে থাকে । 
ওকে কোনো ভাবেই ভেতরে পাঠাতে পারেনি আসিফ । 

আসিফের পায়ে জুতো নেই , গায়ে পাতলা একটা ফুল স্লিভ টিশার্ট । ঠান্ডা বরফ হয়ে আছে পুরো শরীর । 
জ্যাকেট জুতো কোনো কিছুই পড়াতে পারেনি আতিফ। 

আসিফ নিশ্চুপ হয়ে কবরের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে । কি কি কল্পনা করছে , ভাবছে কে জানে ? 
আচমকা কবরের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে । ফারিনের নাম ধরে চিৎকার করে কাদতে শুরু করে । 

ছেলে মানুষের ভেঙ্গে পড়া মানায় না । তাদের কাদতে নেই । তাদের দুঃখ , কষ্ট প্রকাশ করতে নেই । 
তারা কষ্ট প্রকাশ করতে পারে না । তাদের বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না । কিন্তু আসিফ তাদের ব্যতিক্রম । ও নিজের মধ্যে চেপে রাখতে পারছে না এত কষ্ট যন্ত্রণা । ফারিন কে হারানোর কষ্ট যন্ত্রণা ওকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে । নিজেকে কোনো ভাবেই কন্ট্রোল করতে পারছে না । পারছে না নিজেকে শক্ত রাখতে । পারছে না কান্না গুলো কে ভেতরে চেপে রাখতে ।

ওর কান্নার শব্দে আশে পাশের বাড়ির অনেকে বেলকনি থেকে তাঁকিয়ে আছে ওর দিকে । লাইটের ফকফকা আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে আসিফ নামক বউ পাগল পুরুষ মানুষ টা কে,  বউয়ের কবরের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছে আর হাউমাউ করে কান্না করছে । 
পাশে বসে একটু পর পর চোখ মুছছে তার বড় ভাই । 

বিচ্ছেদ এত যন্ত্রণার কোনো ? হারিয়ে ফেলার কষ্ট এত বেশি কেন? আহা শখের নারী । এক বউ পাগল পুরুষ আজ তোমার জন্য সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে গেছে । 
________________

মাঝ খানে আরো দু'দিন পেরিয়ে যায় । 
আসিফ আগের মতো এখনো ফারিনের কবরের পাশেই বসে থাকে , দাঁড়িয়ে থাকে , হঠাৎ হঠাৎ জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে , হাউমাউ করে কাঁদে । কেউ ওকে হাজার বুঝিয়েও বাড়ির ভেতর নিতে পারেনি । 
আর না বাড়ির বাইরে নিতে পেরেছে । হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে অনেক বার কিন্তু নিতে পারেনি ।
মানসিক অসুস্থতা ক্রমশ বাড়ছে । নিজের প্রতি খেয়াল নেই । 
যেই ছেলে টা দিনে দুই বেলা শাওয়ার নিতো , কয়েক বার ড্রেস চেঞ্জ করতো , সেট করা চুল কখনো এলোমেলো হতো না , সব সময় পরিপাটি থাকতো ।
সেই ছেলেটাই দু'দিন পেরিয়ে গেছে শাওয়ার নেয় না , তিন দিন ধরে একই ড্রেস পরে আছে , চুল গুলো উস্কখুস্ক এলোমেলো । গায়ে ধুলো বালি লেগে আছে । 
দেখতে বদ্ধ উন্মাদ পাগলের মতন লাগে । 

অতি প্রয়োজনে শুধু বাড়ির ভেতর যায় । সময় মত ছেলে কে খাবার খাইয়ে দেয় । গোছল করায় , ঘুম পাড়ায় ।
 সময় মত ছেলের যত্ন করে খেয়াল রাখে শুধু নিজের যত্ন টাই নেই । 

বাড়ির সবাই ফারাজ কে বুঝিয়ে ওর ছোট ছোট হাত দিয়েই আসিফ কে অল্প অল্প খাবার খাওয়ায় । অন্য সবাই কে ধমকে টমকে সরিয়ে দিলেও ছেলে কে কিছু বলতে পারে না । ছেলে খাইয়ে দেয়, বাবা চুপ চাপ খায়। যত টুকু খেলে বেঁচে থাকবে সে টুকুই খায় । আতিফ জোর করে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মেডিসিন খাওয়ায় সময় মত । 

প্রায় মাগরিবের সময় হয়ে এসেছে । আসিফ উপুড় হয়ে বসে আছে ফারিনের কবরে মাথা ঠেকিয়ে । 

ছেলের অবস্থা দেখে বাবা মা কেঁদে কেঁদে শেষ । এই ছেলের কি হবে আল্লাহ তায়ালা ভালো জানেন । 
এই শীতের মধ্যে সারারাত বাইরে শুয়ে বসে থাকে । 
আতিফ জোর করে ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে দেয় শরীর উপরে । চাদর দিয়ে পেঁচিয়ে দেয় । একটু পর পর শরীরের উপর থেকে সব কিছু ফেলে দিয়ে গুমরে গুমরে কাঁদে । 

ওর ফারিন এই শীতের মধ্যে পাতলা সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত হতে শুয়ে আছে । ও কিভাবে দামী ব্ল্যাঙ্কেট চাদর গায়ে জড়িয়ে থাকবে ? 

আসিফের সাথে সাথে আতিফের ও সারারাত বাইরেই কাটে । আদরের ছোট ভাই কে বাইরে রেখে ও কিছুতেই নরম তুলতুলে উষ্ণ বেডে ঘুমোতে পারবে না । 
দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা আতিফের বউ নিশ্চুপে কাঁদে । হাজব্যান্ড আর দেবরের কষ্ট সহ্য হয় না তার । 

যে মরে গেছে সে তো গেছেই । আর যে বেঁচে থেকেও মরার মত বেঁচে আছে তার কষ্টই কারো সহ্য হচ্ছে না । ফারিনের বাবার বাড়ির মানুষ আসিফের অবস্থা মেনে নিতে পারছে না । মেয়ের জন্য যতটা কষ্ট হয় আসিফের জন্য তার থেকে বেশি হয় । জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছে ছেলে টা । চুপ চাপ থাকে আর একটু পর পর কাঁদে । 

বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে আতিফ । বসে ভাইয়ের পাশে । মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই মাথা তুলে তাকায় আসিফ । চোখ দুটো লাল টকটকে । রক্ত উঠে গেছে চোখে । এখন আর চোখ দিয়ে পানি পড়ে না । 

ভাই কে টেনে এনে জড়িয়ে ধরে আতিফ । বড় ভাই কে জড়িয়ে ধরে আবার হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে আসিফ। 

কিছু সময় অতিবাহিত হয় । আতিফ নিজেকে শক্ত করে।  লম্বা শ্বাস নিয়ে ভাই কে বলে ,

_ এভাবে আর কত ভাই ? তুই নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস সাথে ফারিন কেও । 

ভাই কে ছেড়ে সোজা হয়ে বসে আসিফ । 

_ কিভাবে ?

_ নিজের কি হাল করেছিস ? ফারিন তোকে এভাবে দেখে কষ্ট পায় না ? ফারিন তো সব সময় তোকে ড্যাসিং লুকে দেখতে চায় । তোর অবস্থা দেখে তো ওর কষ্ট হচ্ছে ।

_ কি করবো আমি ভাইয়া ?

_ নিজেকে শক্ত কর । ফারিন তোকে সব সময় যেভাবে দেখতে চাইতো সেভাবে থাক । ফ্রেস হয়ে নামাজ পড়ে ওর জন্য দোয়া কর । এভাবে না খেয়ে সারাদিন কাদলে তো ফারিনের কোনো উপকারে আসবে না । উল্টো তোর ক্ষতি হবে , ফারিন কষ্ট পাবে , ফারাজ বাবা কে হারাবে । নামাজ আদায় করে ফারিনের জন্য বেশি বেশি দোয়া কর । কোরআন তেলাওয়াত কর ফারিনের জন্য । 

আসিফ কিছু সময় চুপ থেকে বলে ,

_ ঠিক বলেছো ভাইয়া । আমি আসছি তুমি কিন্তু এখান থেকে যাবে না ।

_ আচ্ছা যাবো না ।

_ আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত বসে থাকবে । আমার ফারিন কে একা রেখে যাবে না কিন্তু ভাইয়া । 

_ যাবো না । 

আসিফ দ্রুত বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে । 

নিজের রুমে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ায় । 
পুরো রাস্তার পাগলের মতন দেখা যাচ্ছে । 
ড্রেস নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে প্রবেশ করে ।

শাওয়ার নিতে নিতেই মাগরিবের আজান হয়ে যায় ।

পরিপাটি হয়ে রুমেই নামাজে দাঁড়ায় । 
নামাজ শেষ হয় । মোনাজাত ধরে আবার কেঁদে ওঠে । এতো কান্না কোথা থেকে আসছে ওর ? কেনো নিজেকে শক্ত করতে পারছে না ? কেনো  মন কে বোঝাতে পারছে না ? কেনো বার বার ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাচ্ছে ? অবাধ্য চোখের পানি কেনো বাধ মানে না ? 

নামাজ শেষ করে কোরআন শরীফ খুলে সূরা ইয়াসীন তেলাওয়াত করতে শুরু করে । 
কোরআন তেলাওয়াত করতে করতেই এশার আজান হয়ে যায় । 
কোরআন শরীফ বন্ধ করে এশার নামাজ আদায় করে নেয় । তারপর রুম থেকে বেরিয়ে ছেলের কাছে এগিয়ে যায় । ফারাজ চুপ চাপ বিষন্ন হয়ে সোফায় বসে আছে। আতিফের বউ ওকে খাওয়ানোর বৃথা চেষ্টা করছে । ফারিনের বাবা মা ভাই সবাই ফিরে গেছে নিজেদের বাড়িতে । গত কাল এতিম শিশু গরীব দুখী মানুষ দের খাবার খাওয়ানো হয়েছে । 

আসিফ প্লেট হাতে নিয়ে নিজেই খাইয়ে দিতে শুরু করে ছেলে কে । বাবার হাতে চুপ চাপ খায় ফারাজ , টু শব্দও করে না । ফারাজ কে খাওয়ানো শেষ করে নিজেও কয়েক লোকমা খায় বেঁচে থাকার জন্য । মেডিসিন খেয়ে ছেলে কে কোলে নিয়ে রুমে ফিরে আসে । বেড ঠিক করে লাইট অফ করে ডিম লাইট অন করে । তারপর ছেলে কে নিয়ে শুয়ে পড়ে । 

দুদিন পর তিন দিনের দিন শাওয়ার নিয়েছে , নামাজ আদায় করেছে , অল্প খাবার খেয়েছে । মেডিসিনের সাথে স্লিপিং পিল দিয়েছে একটা ওর অগচরে । 
সব মিলিয়ে আসিফের চোখে ঘুম ভর করেছে ।
চোখ বন্ধ করতেই ঘুমে বিভোর হয়ে যায় । 

একটু একটু করে রাত বাড়ে । দুই বাপ ব্যাটা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে যেন আজ । মাঝ খানের তিন দিন ফারাজ কয়েক বার করে ঘুম থেকে উঠে কান্না করেছে বাবা মায়ের জন্য । 
আজকে বাবার বুকে ঘুমিয়ে একবারও উঠছে না । নড়া চড়াও করছে না । কেমন বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে । 
,
,
আতিফ ফারিনের কবরের পাশে বসে আছে । কথা বলছে ফারিনের সাথে । তবে ফারিনের দিক থেকে উত্তর আসছে না । আতিফ একাই বক বক করে চলেছে আর একটু পর পর চোখের পানি মুছছে । 
মেয়েটা কি সুন্দর করে ওকে ভাইয়া ডাকতো । কত খেয়াল রাখতো । নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতো । 

আতিফের বউ এসে দাঁড়ায় আতিফের পাশে । ছেলে মেয়ে ঘুমিয়েছে তারাতারি আর উঠবে না । 
দুজনেই বসে রইলো কবরের পাশে । মাথার উপর ঝুলছে এনার্জি লাইট । চাঁদের আলো আর লাইটের আলোয় ঝকঝক করছে ।

ফারিন কে একা রেখে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করার সাহস হচ্ছে না । আসিফ এসে যদি দেখতে পায় ওর ফারিন একা রয়েছে তাহলে তুলকালাম কান্ড বাঁধাবে ।

আতিফ জোর করে ওর বউ কে ভেতরে পাঠিয়ে দেয় । ছেলে মেয়ে ঘুম থেকে উঠে দেখতে না পেলে আবার কান্না করবে । 
___________________

আসিফের ঘুম ভাঙ্গে ভোরে । ছেলে কে বুক থেকে আলতো ভাবে সরিয়ে দেয় । ভালো ভাবে ঢেকে দিয়ে উঠে বসে । বেড হাতড়ে নিজের ফোন খুঁজে বের করে। টাইম দেখতেই দেখে ছয় টা বেজে গেছে । লাফিয়ে বেড থেকে নেমে দাড়ায় । দৌড়ে যায় বেলকনিতে । বাগানের দিকে তাকাতেই দেখে ওর ভাইয়া এখনো বসে আছে ফারিনের পাশে । স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয় । 
এক ঘুমে রাত পার হয়ে গেছে ? ঘুমালো কখন ? 
তাড়াহুড়ো করে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে । ফ্রেস হয়ে এসে কাযা নামাজ আদায় করে নেয় । ছেলের দিকে তাকিয়ে কোরআন শরীফ হাতে নিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় । 

ভাই কে ধন্যবাদ দেয় ওর ফারিনের পাশে সারারাত থাকার জন্য । 
আতিফ খুশি হয় , ওর ভাই টা যে একটা রাত ঘুমিয়েছে এটাই তো অনেক । 
আসিফ আতিফ কে ভেতরে যেতে বলে । আতিফ ও চলে যায় । 
ততক্ষণে বাহিরে পুরোপুরি আলো ফুটে উঠেছে । 
আসিফ কোরআন খুলে সূরা ইয়াসীন তেলাওয়াত করতে শুরু করে । 
ওর চোখের পানি তে কোরআন শরীফের পাতা ভিজে যায় । চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে । বার বার মুছেও লাভ হচ্ছে না । এভাবে কি তেলাওয়াত করা যায় ? তবুও জোর জুলুম করে এক ঘন্টা তেলাওয়াত করে । এর মধ্যে ফারিনের ভাই , বাবা , বড় ভাইয়ের দুই বছরের ছেলে , কাকা আর দাদা এসে দাঁড়ায় ফারিনের কবরের পাশে । 
কবর জিয়ারত করে সবাই । 
বেলা বেড়ার সাথে সাথে ওনারা বিদায় নিয়ে চলে যায়। পাশাপাশি এলাকা হওয়ায় রোজ সকালে এসে কবর জিয়ারত করে যায় । 

আসিফ নিস্পলক চোখে তাকিয়ে থাকে কবরের দিকে। এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় ওর ফারিন নেই কোথাও নেই । ওর মনে হয় এই সব কিছুই শুধু স্বপ্ন । ঘুম ভেঙ্গে গেলে সব কিছু মিথ্যে প্রমাণিত হবে । 
তাকিয়ে থাকতে থাকতে গুমরে কেঁদে ওঠে । 
কতক্ষন কাঁদে । কান্নারাই এখন ওর সব চেয়ে কাছের সঙ্গী । 
নিজেকে শান্ত করে কোনো রকমে । কবরের উপর হাত বুলিয়ে বলে ,

_ তোমার কাছে যাওয়ার জন্য কত দিন অপেক্ষা করতে হবে ফারিন ? আমি যে অপেক্ষা করতে পারছি না আর। তোমাকে ছেড়ে থাকতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে । তুমি ওই রুমে নেই , ওই রুমে গেলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে । বেডের দিকে তাকালে তোমার কথা মনে পড়ে । সব সময় তোমাকে মনে পড়ে । আমি কিভাবে তোমাকে ছাড়া বাঁচব ? আমার শ্বাস কবে ফুরাবে ? অপেক্ষারা কেনো দীর্ঘ হয় ? কেনো দ্রুত যায় না ? আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও । আমি থাকতে চাই না এখানে । 

একটু থেমে আকাশের দিকে তাকায় ।

_ হে আল্লাহ , আমার অপেক্ষা কে দীর্ঘ করো না । আমাকে আমার ফারিনের কাছে নিয়ে যাও দ্রুত । 
হে আল্লাহ , অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না কেনো ? 
 
আবার একটু থেমে শ্বাস টেনে নেয় ।

_ হে আল্লাহ , আমার ফারিন কে তুমি জান্নাতের উচু মোকাম দান করো । হে আল্লাহ , তুমি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু । আমার ফারিনের সমস্ত গুনাহ মাফ করো । ওর কবর একটুকরো জান্নাতে পরিণত করে দাও ।  আমার ফারিনের কবরের আযাব মাফ করো  । 
সব শেষে আমার অপেক্ষার প্রহর শেষ করো দ্রুত । 

চোখ দিয়ে টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ে পানি । ভেতর থেকে কান্নারা আবার ঠেলে বেরিয়ে আসছে । 
কিভাবে নিজেকে সামলাবে ? কত দিন অপেক্ষা করতে হবে ফারিনের কাছে যাওয়ার জন্য ? অনেক দিন নাকি অল্প দিন ? 

ফারিনের কবরের উপর আবার হাত বুলিয়ে মাথা ঠেকায় উপুড় হয়ে । সশব্দে বলে ,

_ ফারিন , আমার ফারিন । শুনতে পাচ্ছো ? আমার অপেক্ষা কবে শেষ হবে ? তুমিহীন দুনিয়ার বাতাস বিষাক্ত লাগে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয় । বুক ফেটে যায় । তোমার মায়া আমি কিভাবে কাটাবো ? তোমার মায়া তো কাটানো যাবে না কোনো দিন  , কারণ #অনন্ত_তোমার_মায়া । এই মায়া অনন্ত কালেও ফুরাবে না । এই আসিফ নিঃশেষ হয়ে গেলেও তোমার মায়া শেষ হবে না কোনো দিন । খুব শীগ্রই দেখা হোক আমাদের । 

আসিফের চোখ থেকে আবার উষ্ণ তরল গড়িয়ে পড়ে। 
অপেক্ষা ফারিনের কাছে যাওয়ার ।

~সমাপ্ত~

ভালো থাকবেন সবাই । গল্প কেমন হয়েছে অবশ্যই মতামত জানাবেন সবাই ।
গল্প পড়ে আপনাদের একেক জনের যেই অবস্থা ! বাস্তবে যখন একই ঘটনা ঘটে তখন তাদের কি অবস্থা হয় ভাবুন তো ! আসিফ ফারিনের মত শত শত মানুষ অকালে হারিয়ে যায় এভাবেই । বছরে কত শত যুবক বাইক রাইড করার সময় এক্সিডেন্ট করে মারা যায় হিসেব নেই । নিজেরা মরে সাথে অন্যদের নিয়েও মরে। আবার কাউকে চিরো দিনের জন্য পঙ্গু করে দিয়ে যায়। 
আমার এই ছোট্ট জীবনে আমি অনেক বাইক এক্সিডেন্ট করে মরতে দেখেছি , মারতেও দেখেছি ।
 মূল কারণ তাদের বেপরোয়া গতি । বাইক রাইড করার সময় হুশ জ্ঞান থাকে না রাইডার দের । রকেট , বুলেটের গতিতে ছুটে যায় বাইক নিয়ে । কারো হেলমেট থাকে আবার কারো থাকে না । হেলমেট না থাকার কারণে বাইকার দের বেশি মৃত্যু ঘটে ।
বাইক চালাবেন চালান তবে গতি সীমার মধ্যে থাকুন । ওভার স্প্রিডে বাইক চালানো পরিহার করুন । সব সময় হেলমেট ব্যবহার করুন । অল্প রাস্তার জন্য কোথাও গেলেও হেলমেট ব্যবহার করুন । 
নিজে বাঁচুন অন্য কেও বাঁচতে দিন ।
নিজে সুস্থ্য থাকুন অন্য কেও সুস্থ্য রাখুন ।

Loading spinner

Reply
Page 2 / 2
Share:

Loading spinner