কথাটা এখন অবধি কেউ জানে না। এইতো কয়েক ঘন্টা আগে, সারা নিজেও জানতো না এ খবর। কাল রাতে প্রেগন্যাসি টেস্ট এর রিপোর্ট যখন হাতে পেলো।
দেখলো রেজাল্ট প্রজেটিভ, সে থেকে যেন মাথায় আসমান ভেঙে পরলো তার। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক কতক্ষন তার হিসেব নেই সারার।
।
সারার পাশে বসে আছে আদ্র, যার সাথে আজ বিয়ে হচ্ছে তার ।। সারা ঘাড় কাত করে আড়চোখে একটু তাকালো আদ্রের দিকে।
বুকটা কেমন ধুক করে উঠলো তার,
আচ্ছা বিষয়টা সবাই জামাজানি হলে কি হবে? বিয়েটা ভেঙে যাবে নিশ্চয়ই। আর হলেও কি এ নিষ্পাপ অনাগত ফুলটাকে পৃথিবীতে আসতে দিবে সকলে ? পৃথিবীতে আসার আগেই হয়তো তাকে খু*ন করে দিবে। তাইনা?
এস ভাবনার মাঝে হঠাৎ মনে হলো।।আর দেরি করা চলবে না, পাশে বসা মানুষটাকে এখনই জানাতে হবে সবটা । নয়তো বড্ড বড় ভুল হয়ে যাবে জীবনে।
আর সময় নষ্ট না করে সবটা সাহস সঞ্চয় করে সারা আদ্র এর কানের কাছে মুখটা এগিয়ে দিলো। চোখের ইশারায় বুঝালো সে কিছু বলতে চায়।
কম্পিত গলায় ফিসফিস করে খুলে বললো সবটা,
" আমি প্রেগন্যান্ট,,,,,,
কথাটা যেন বো*মার মতো বিস্ফোরণ হলো আদ্র চৌধুরীর কানে। মুহুর্তে তার মুখের ভাব পরিবর্তন হয়ে এলো। চোয়াল শক্ত, মুখ লালচে হয়ে আসছে। চোখ জোড়া গোল করে তাকিয়েছে সারার দিকে,
যত দ্রুত আদ্রের মুখের ভঙ্গি পরিবর্তন হয়েছিল ঠিক ততো দ্রুত আবার তা স্বাভাবিক হয়ে গেলো। রেগে আগু*ন হয়ে যাওয়া শক্ত চোয়াল এখন স্বাভাবিক।
সারা ভেবেছিল আদ্র বিয়েটা করবে না এ কথা শোনার পর। কিন্তু অবাক করা বিষয় এইযে আদ্রের মধ্যে এ বিষয়টা নিয়ে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে লক্ষ করেনি সারা
।
বিয়েটা নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ হলো।
তবে কি আদ্র কথাটা মজা ভেবে নিয়েছে? সারা দ্বিতীয় বারের মতো কথা বলার সুযোগ পায়নি আদ্রের সাথে।
_________
গাড়ি এসে থামলো চৌধুরী বাড়ির সামনে।
সারাকে বরণ করা হলে, আদ্রের বোন অনি সারাকে আদ্রের ঘরে নিয়ে বসিয়ে দিলো । তার পর বেরিয়ে গেলো তারা।
একা রুমে বসে বসে আদ্রের বিশাল বড় রুমটা দেখতে ব্যস্ত সারা।
চোখ জুড়িয়ে গেলো সারার। মনের মতো ঘর, কিন্তু ঘরের মালিকটা মনের মতো নয় ভাবতেই একটা দীর্ঘ শ্বাস ত্যাগ করলো সারা।
প্রাক্তন প্রেমিক লাহামের সাথে ঠিক এমন একটা ঘরে বাস করার স্বপ্ন দেখতো সে।
লাহামের কথা মনে করে পেটে হাত চলে গেলো নিজের অজান্তেই । আজ দু মাস হলো, মানুষ টা নিখোঁজ। কতো চেষ্টা করেছে যোগাযোগ করার, কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো।
কালো অতীত মনে পরতে গিয়েও পরলো না। তার মাঝেই ঘরে প্রবেশ করলো আদ্র। আদ্রকে ঘরে আসতে দেখে নড়েচড়ে বসেছে সারা।
অপেক্ষা করলো আদ্র কখন এসে খাটে বসবে। মিনিট খানেক অপেক্ষা করতে আদ্র এসে খাটেট কোনায় বসতেই একটা ডাক্তারের রিপোর্ট সামনে এগিয়ে দিলো আদ্রর।
" আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না হয়তো।আমি মজা করে বলিনি ঐ কথা। এটা দেখুন। আমি সত্যি পেগন্যান্ট।
আদ্র, এক পলক তাকালো, সারার হাতে থাকা কাগজের দিকে, আর একবার তাকালো সারার মুখের দিকে।
এর পর কাগজ টা হাতে নিয়ে বেডের পাশে টেবিলের উপর টা টেখে দিলো।
" ইন্টারেস্ট নাই এসব দেখার।
সারা অবাকের শেষে প্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো
" ইন্টারেস্ট নেই মানে। এমন একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আপনি হেয়ালি করছেন? এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই আপনার? আপনার কি যায় আসে না এসবে?
" নাহ । তোমার কোনো বিষয়েই আমার কোনো রকম ইন্টারেস্ট নেই, শুধু এ বিষয়ে নেই এমন টা না। বিয়েটা করেছি বিজনেস এর প্রয়োজনে। তোমার জীবনে আগে পরে কে ছিল কে আসবে আই ডোন্ট কেয়ার। এসব নিয়ে ভাববার মতো সময় আমার হাতে নেই।
কথাটা বলেই গা ছাড়া ভাব নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতে লাগলো আদ্র,
সারা হতাশার সুরে বললো,
" বাচ্চা টা কি এবরেশন করাতে হবে আমায় ?
আমার বাচ্চা টা মে*রে ফেলতে বলছেন?
কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো আদ্র,
" আজব মেয়ে মানুষ তো আপনি ,
আমি কখন বললাম এবরেশন করতে।
আদ্রের একেকটা কথা একেক রকমের অদ্ভুত লাগছে সারার কাছে।
অবাকের সুরে আবার জিগ্যেস করলো,
" তাহলে, যতোদিন খুঁজে না পাবো বাচ্চার বাবাকে, ততোদিন এ বাচ্চার পরিচয় কি হবে? কার পরিচয়ে পৃথিবীতে আসবে সে? কি হবে এ বাচ্চার?
আদ্র বাকা হাসলো,
" এমন দু চার দশটা বাচ্চার পরিচয় বহন করতে কোনো অসুবিধে আমার হবে না।
বিয়ে যখন করেছি বাচ্চার পরিচয় ও দিতে পারবো।
সারা গোল গোল চোখ করে দেখছে আদ্রকে। কৃতজ্ঞতার সুরে বললো,
" ধন্যবাদ আপনাকে, বেশি না যতোদিন পর্যন্ত আমি ওরে খুঁজে না পাবো ততোদিন শুধু পরিচয় দিয়েন। ওরে খুঁজে পেলে আমি চলো যাব৷ ততোদিনে আপনার বিজনেস ডিল ও সম্পূর্ণ হবে নিশ্চয়ই। আর আমি নিজে চলে গেলে তখন আর আপনার সমস্যা হবে না। কারন আমি তো নিজে থেকে চলে যাব সবাই জানবে।
আদ্র আবারও বাঁকা হাসলো,,,,,
সারার সাথে কথা বলার ইচ্ছে করলো না তার। পাশঘুরে শুয়ে পরলো বিনাবাক্যে
সারা ও বিয়ের বেনারসি পাল্টে এসে আদ্রের পাশে গুটিশুটি মে*রে শুয়ে পরলো। হাতের মুঠোয় ছোট ছু*রি টা খুব শক্ত করো ধরে শাড়ির আঁচলের নিচে লুকিয়ে নিয়ে শুয়ে পরলো সে।
ছেলে মানুষের সাথে এক দন্ড বিশ্বাস নেই,৷ ইন্টারেস্ট নেই বলে যে আবার ইন্টারেস্ট দেখাতে আসবে না তার কি গ্যারান্টি।
______________
চৌধুরী বাড়ির নাস্তার টেবিলে বসে আছে আকরব চৌধুরী, কারিমা চৌধুরী এবং কায়েশ চৌধুরী , হেমা চৌধুরী । যারা সম্পর্কে আদ্র এর বাবা মা এবং দাদা দাদু হয়।
একজন সার্ভেন্টকে কায়েশ বললো,
" আদ্র এবং তার নতুন বউকে নাস্তার জন্য ডেকে আসো,
সার্ভেন্ট গিয়ে সারা আর আদ্রকে নাস্তার টেবিলে আসতে বললে তারা দুজনই নেমে এলো রুম থেকে।
গরম গরম পরোটা, গরুর কলিজা ভুনা,
পাউরুটি কলা, দুধ এনে সাজানো হলো টেবিল।
গরুর কলিজা ভুনার গন্ধে গা গুলিয়ে আসছে সারার। অনেক চেষ্টা করলো নিজেকে সামলে নেওয়ার। কিন্তু পারছে না, পেটের ভিতর নাড়িভুড়ি যেন ধলা পাকিয়ে বের হয়ে আসতে চাইছে। সহ্য করতে না পেরে সারা দৌড়ে বেসিনের সামনে গিয়ে গলগল করে বমি করতে লাগলো।
তার এহেন কান্ডে উপস্থিত সকলে হতভম্ব। খাবার টেবিল ছেড়ে সকলে উঠে আসলো সারার কাছে। বসে রইলো কেবল আদ্র চৌধুরী।
কারন সারার বমি করার কারন টা তার জানা আছে, এ সময় বমি পাওয়া টা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বাড়ির বাকিরা জানলে কি হবে,
সারা সোজা হয়প দাড়িয়ে আছে, মুখ তার রক্তিম বর্ণ ধারম করেছে। বিয়ের প্রথম দিন যদি শশুর বাড়ির লোকেরা জানতে পারে এমন বমি করার কারন, তাহলে কি হবে।
আল্লাহ কে ডালছে সারা। মনে মনে ভাবছে কি ভাবে বিষয় টা আড়াল করা যায়।
উপস্থিত সকলের মাঝে সর্ব প্রথম আদ্রর মা কারিমা বললো,
" সে কি বউমা সাধ সকালে এমন বমি করছো কেন।
কায়েশ চৌধুরী বললেন
" কাল সারা দিন ঠিক মতো খাওয়া হয়নি, গ্যাসের সমস্যা হয়েছে হয়তো।
উপস্থিত সকলে তাই ণেবে নিলো।
সারা ও মাথা নেরে কায়েশের কথায় সম্মতি জানাতে যাবে তখন সবাইকে থামিয়ে দিয়ে এক বড়সড় বিস্ফো*রণ ঘটালো হেমা,
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সারার দিকে তাকিশে প্রশ্ন করলো
" দাঁড়াও নাতবউ , তোমার মা*সিক হয়না কয় মাস হলো?
হেমার প্রশ্নে উপস্থিত সকলের মুখের ভাব ভঙ্গি পাল্টে গেলো। ছেলে ছেলের বউ স্বামী সকলের সামনে এ কেমন প্রশ্ন করলো হেমা। কায়েশ গলা কেশে হেমাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুরলো,
" এ কোমন প্রশ্ন করছো, এসব কি ধরনের কথা হেমা।
হেমা চৌধুরীর গলার সুর কঠিন।
" আমি যা বুঝতে পারছি তা তোমরা পারছো না। কারন আছে বলেই এমন প্রশ্ন করেছি,
কেন করেছি তা নাতবউ খুবই ভালো করে বুঝতে পারছে।
তাই না নাতবউ?
ভয়ে সারার গলা শুখিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। মাথা ঘুরছে। এ বুঝি পরে যাবে।
কি জবাব দিবে এখন সে।
বলবে এ বাচ্চা অন্য কারো।
কারিমা শাশুড়ী কে বললো,
" কেন বলছেন আম্মা? কি বুঝতে পারছেন আপনি?
" নাত বউ সন্তান সম্ভবা। আমার এ ৭০ বছরের অভিজ্ঞতা আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এটাই ধরা পরেছে।
বিশ্বাস না হলে এবার তোমারা ডাক্তার ডেকে পরীক্ষা করিয়ে দেখে নাও।
কারিমার মাথায় হাত উঠে গেলো। কি বলছে এসব। কাল মাত্র বিয়ে হলে। আর আজই সন্তান সম্ভবা। ছেলের বউয়ের সন্তান হবে শোনলে সকল মা কতো খুশি হয়। কিন্তু আজ যে চৌধুরী বাড়ির কেউ খুশি হতে পারছে না
" বাচ্চা? নতুন বউয়ের পেটে বাচ্চা? কি ভাবে কি। তিনি
দু কদম এগিয়ে এলো সারার দিকে,
এই মেয়ে এই বাচ্চা কার ?
কারিমার হুঙ্কারে কেঁপে উঠল সারা। কি বলবে এখন সে। ভয়ে ভয়ে তাকালো চেয়ারে বসে থাকা আদ্রর দিকে,
আয়েশ করে পরোটা চিবুচ্ছে, যেন শোনতেই পারছে না কিছু। চার পাশে কিছু হচ্ছে তাতে তার কিছু যায় আসে না।
কাল রাতে বলেছিল কোনো ইন্টারেস্ট নাই সারার প্রতি। আজ যেন তাই প্রমান দিচ্ছে।
কিন্তু রাতে তো বলেছিল বাচ্চার পরিচয় দিবে সে, তাহলে এখন কেন বলছে না কিছু,
সারা কি করে সামাল দিবে এখন এই পরিস্থিতি,