মাহতিম আর কায়নাত হলরুমে দাঁড়িয়ে মাহতিমের মা-বাবার জন্য অপেক্ষা করছিল। ৫ মিনিটের মাথায় মাহতিমের মা বাবাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা যায়। কায়নাতের চোখ সেদিকেই আটকে যায়। কায়নাত দেখছে মাহতিমের মা কে। যার পড়নে শুভ্র রংয়ের শাড়ি আর ছাই রংয়ের ব্লাউজ। চুলগুলো খোপা করা। গলায় ডায়মন্ডের একটা পেন্ডেন্ট। কানে ডায়মন্ডের দুল। গায়ের গড়ন অনেক ফর্সা। চেহারায় বয়সের ছাপ নেই। টানা টানা হরিণা চোখ । চোখে হালকা কাজল দেওয়া। ঠোঁটে লিপ জেল দেওয়া। ঠোঁটের ওপরে একটা ছোট তিল। সিড়ি দিয়ে নামার ভাবভঙ্গি বলে দিছে তার লাইফস্টাইল অতন্ত শালীন ও মার্জিত। কায়নাত যেন মুগ্ধ হয়ে গেলো। মাহতিমের মা স্বাভাবিকের থেকেও বেশি সুন্দরী। এবার কায়নাতের নজর গেল মাহতিমের বাবার দিকে। মাহতিমের বাবাকে দেখেই কায়নাত বুঝে গেলো মাহতিমের বাবা বিদেশি। মাহতিমের বাবা দেখতে অনেকটা হলিউডের নায়ক Steve Rogers এর মতো। তবে মুখে হালকা দাড়ি আছে। নাকটা একদম সরু। ঠোঁটগুলো গোলাপি বর্ণের। জোড়া ব্রু। চোখের মণি নীল রংয়ের । মাহতিমের বাবার পড়নে একটা হোয়াইট টি-শার্ট আর গ্রে কার্গো প্যান্ট। মাহতিমের বাবা আর মা ওদের সামনে এসপ দাড়ালো। মাহতিমের মা কায়নাতের মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার চোখ বুলালো। তারপর মেইডকে ডেকে বলল — Show them their room (ওদের রুমটা দেখিয়ে দাও)
— okh mam (ঠিকাছে ম্যাম)
মেইড কায়নাতের দিকে তাকিয়ে বলল — come with me mam
কায়নাত একবার মাহতিমের বাবা আর মায়ের দিকে তাকালো। মাহতিমের মা কায়নাতের দিকে তাকিয়ে বললো — অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছ। যাও ফ্রেশ হয়ে খেতে এসো।
কায়নাত একটু আমতা করে বলল — ম্যাম আম কিভাবে বলবো
— ম্যাম বলতে হবে না। আন্টি বলতে পারো। আর যা বলবে নির্দ্বিধায় বলো। বাড়িটাকে নিজের বাড়ির মতোই মনে করো।
— আসলে কুহু ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স এর কারণে গরুর দুধ খেতে পারে না বাসায় কি অ্যালমন্ড মিল্ক বা কোকোনাট মিল্ক আছে?
মাহতিমের মা খানিকটা অবাক হয়ে বলে — ওর ল্যাকটোজ ইনটোলারেন্সের সমস্যা আছে?
— জি আন্টি
— আসলে মাহতিমেরও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের সমস্যা আছে যার কারণে ও যখনি লন্ডন আসে তখনি বাসায় কোকোনাট মিল্ক এনে রাখা হয়।
— ওহ। আসলে কুহুকে রাতে খাওয়ানোর জন্য জিজ্ঞেস করেছিলাম
— জিজ্ঞেস করে খুব ভালো করেছো। যতদিন আছো এ বাড়িটাকে নিজের বাড়ি মনে করবে যা লাগবে আমাকে বলবে।
— ঠিকাছে আন্টি।
মাহতিম বলল — বাকি কথা পরে বলো তোমরা কুহুকে ফ্রেশ করিয়ে খাওয়াতে হবে তাড়াতাড়ি ওর রাতে মেডিসিন আছে।
কায়নাত মাহতিমের কাছ থেকে কুহুকে নিতে গেলে মাহতিম বলে ওঠে — চলো রুম পর্যন্ত।
মেইড এর পেছন পেছন কায়নাত আর মাহতিম সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে থাকে।
মাহতিমের বাবা মাহতিমের মা কে বলতে থাকে — I feel like I've seen this girl somewhere before ( আমার মনে হচ্ছে আমি এই মেয়েটাকে আগেও কোথাও দেখেছি)
— মাহতিম তেমাকে কিছু বলেনি?
— what !
— এটাই সেই মেয়ে
— 12 years passed ( ১২ বছর কেটে গেছে)
— so what? ( তো কি)
— nothing but she is married. ( কিছু না কিন্তু ও বিবাহিত)
— she got divorced ( ওর ডিভোর্স হয়ে গেছে)
— oh great maybe Mahtim still get a chance ( ওহ হয়তো তাহলে মাহতিমের এখন একটা সুযোগ আছে)
— maybe yes ( হয়তো হুম)
পর্ব :১০
মেইড পাস চেপে ঘরের দরজাটা খুললো। মাহতিম রুমে ঢুকেই রুমের বাতি জ্বালিয়ে কুহুকে অনেক আলতো করেই কুহুকে বেডে শুইয়ে দেয় যাতে কুহুর ঘুম ভেঙে না যায়। যখন কুহু কে বেডে শুয়ে উঠতে নিল তখনই কুহু ঘুমের ঘোরে মাহতিমের হাতটা ধরে বিড়বিড় করে বলল — বাবা যেওনা তুমি কেন চলে গেছো যখন এসেছ আমার কাছে আমার সাথে থেকে যাও আম্মু তোমার সম্পর্কে আমাকে কিছুই বলেনি এমনকি আমি তোমার নামটাও জানিনা কেন বলেনি আমি তাও জানিনা প্লিজ পাপা ছেড়ে যেও না থেকে যাও?
কুহুর কথাটা শোনার পর কায়নাত এর বুক ধক করে ওঠে । একটা অজানা ভয় ঘিরে ধরে। কায়নাত যেন এই সময়টারই ভয়ে ছিল। কুহু কখনো কারো সামনে নিজের কষ্টগুলো তুলে ধরে না। এমনকি কায়নাতকে প্রশ্ন পর্যন্ত করেনা যে কুহুর বাবা কই? সবার ফ্যামিলির মতো কুহুর ফ্যামিলি নয় কেন?
কুহুর কথা শুনে মাহাতিম যেন মূর্তি হয়ে গেল। জেলিফিশ ঘুমের ঘোরে মাহাতিমকে বাবা বলে ডেকেছে। মাহাতিম কায়েনাতের দিকে তাকায়। খেয়াল করে কায়নাতের চোখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। চোখে অশ্রু কণা জমেছে। টানা টানা সুন্দর ওই চোখ গুলোতে অশ্রু কণা দেখে মাহাতিম মনে মনে বলল — আল্লাহ একবার তুমি তাকে দিলানা অন্য কাউকে দিয়ে দিলা আর আমি জানতেও পারলাম না কাকে দিলা আজ ১২ বছর পরে তাকে তার পাঁচ বছরের মেয়ের সাথে দেখছি আর সেই বাচ্চা মেয়েটা আমাকে বাবা বলে ডেকেছে। আল্লাহ আমি জানি তুমি চাইলেই সব হয়। তুমি তাকে একবার অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছো এইবার তাকে আমার নামে কের দাও। আমি ওই বাচ্চা মেয়েটার মুখে নিজেকে বাবা ডাক শুনে অনেক শান্তি পেয়েছি কায়নাতকে না পাওয়ার দুঃখ খানিকটা কম কম লাগছে। এতদিন আশা ছিল না কিন্তু আজ আবার আশাগুলো ঘিরে ধরেছে আমাকে । আল্লাহ এইবার তুমি তাকে আমার করে দাও। আল্লাহ এইবার তুমি আমাকে নিরাশ কইরো না। কুন ফায়াকুন বলে দাও। মাহতিমের হঠাৎ খেয়াল হলো চোখে অশ্রু কণা রা আবার চলে এসেছে। মাহতিম কেউ খেয়াল করার আগেই নিজের ডান হাতের পৃষ্ঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলে।
কায়নাত বলে ওঠে — আমি আপনার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি ফ্রেশ হয়ে কুহুকে নিচে আসছি। আর দয়া করে ওর কথায় কিছু মনে করবেন না।
মাহতিম খুব শান্ত স্বরে বলল — না না, কোন সমস্যা নেই
কুহুর ছোট্ট ছোট্ট হাতের মুঠো থেকে মাহতিম নিজের হাতটা ছাড়িয়ে উঠে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। মাহাতিম চলে যেতেই কায়নাত বেডের উপর ধপাস করে বসে পড়লো। কানা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। কায়নাত অস্বস্তিতে নিজের জ্যাকেটটা খুলে বেডের একপাশে রাখল । কায়নাথ নিজের ডান হাত গলায় দিয়ে মাথা এদিক-ওদিক ঘুরাতে ঘুরাতে গলায় হাত বুলাতে লাগলো। আজকের দিনটায় কেমন যেন হয়ে গেছে। বারবার সবাই কাইনাতের অতীত কায়নাতের সামনে নিয়ে আসছে । প্রথমে মাহতিম কানাতকে প্রশ্ন করেছে — কুহুর বাবা কোথায়? আর এখন কুহু মাহতিমকে বাবা বলে ডেকেছে।
— আম্মু
কায়নাত কুহুর ডাক শুনে কুহুর দিকে তাকিয়ে বলে — চলো ফ্রেশ হই
কুহু শোয়া থেকে উঠতে উঠতে বলে — আমরা না প্লেনে ছিলাম?
— আপনি ঘুমিয়ে থাকতে থাকতে আমরা চলে এসেছি
— ওহ
কায়নাত কুহুকে নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে কুহুকে ফ্রেশ করে আর নিজেও ফ্রেশ হয়ে নেয়। কুহু ফ্রেশ হয়ে একটা ব্ল্যাক টি-শার্ট আর ব্ল্যাক ট্রাউজার পরে নেয়। কায়নাত হোটেলে থাকবে সেই অনুযায়ী টি-শার্ট আর ট্রাউজার এনেছে। কায়নাত একটা ওভার সাইজ শার্ট আর প্যান্ট পড়লো। কায়নাত ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখলো মাহতিমের মা বেডে বসে কুহুর সাথে গল্প করছে। মাহতিমের মায়ের ড্রেস পুরাই চেঞ্জ। মাহতিমের মা একটা চকচকা থ্রি কোয়ার্টার হাতা শার্ট আর পাজামা পরে আছেন। দেখতে অনেক সুন্দর লাগছে।
— আন্টি আপনি
— তাড়াতাড়ি খেতে চলো। কুহুরতো আবার মেডিসিন আছে
কায়নাত কুহুর দিকে তাকিয়ে বলল — জ্বি
মাহতিমের মায়ের সাথেই কায়নাত আর কুহু নিচে নামে। সার্ভেন্টস রা অলরেডি খাবার সাজিয়ে ফেলেছে টেবিলে। মাহতিম আর মাহতিমের বাবা সোফায় বসে একসাথে কিছু নিয়ে আলাপ করছে। মাহতিমের মা কায়নাতকে আর কুহুকে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে দেয় তারপর নিজে নিজের আসনে বসে পড়ে। মেইড রা খাবার সার্ভ করা শুরু করে দেয় একে একে সবার জন্য। কুহু টেবিলে দুধের জটা দেখে বলে ওঠে — আমি খাবো না
কায়নাত কপাল খানিকটা কুচকে কুহুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে — এই কি খাবে না?
কুহু জগের দিকে আঙুল তাক করে বলে ওঠে — ওই কোকোনাট মিল্ক নামক ঔষধের নামে বিষ আমি খেতে চাই না।
— ওইটা বিষ না কুহু।
— ঠিকাছে মানলাম। কিন্তু আমরা বেড়াতে এসেছি তাই আমি এটা স্কিপ করতে চাই
মাহতিম বলে ওঠে — হুম একদিন স্কিপ করলে কিছু হবে না কুহু। তুমি বলো তুমি কি খেতে চাও
— ম্যাংগো খাবো
মাহতিমের মা সার্ভেন্টসদেরকে আদেশ দিলো — আম কেটে আনতে
পর্ব ১১ (১)
আকাশটা পরিষ্কার নীল, আর মৃদু বাতাস বইছে। সকালটা ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তিময় ।
চারপাশের পুরনো লাল ইটের বাড়িগুলোর জানালা থেকে এখনো পর্দা সরেনি । হ্যাম্পস্টেডের
সেই ঐতিহ্যবাহী পাথরের বাঁধানো সরু রাস্তা দিয়ে দুটি মানব । মাহতিমের পরনে ছিল কালো
একটা ওভারসাইজ টি-শার্ট আর কালো একটা ট্রাউজার আর কুহুর পরনে একটা হলুদ ফ্রক ,
পায়ে ক্রোকস । এই সকালে কুহুকে হ্যাম্পস্টেডের ধূসর পটভূমিতে ঠিক যেন ফুটে থাকা এক
টুকরো বসন্তের ফুলের মত লাগছিল । কুহু খুব চঞ্চল। সে তার ছোট হাত দিয়ে রাস্তার ধারের
বাগানের ফুল গুলো দেখছিল আর মাহতিমকে নানা প্রশ্ন করছিল । মাহতিম কুহুর ছোট
কোমল হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরেছিল । হ্যাম্পস্টেডের
শান্ত মোড়গুলোতে কোন গাড়ির আওয়াজ নেই শুধু মাহতিম আর কুহুর পায়ের শব্দের
প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে । রাস্তার কোনে থাকা একটা পুরনো লাল রঙের টেলিফোন বুথের
কাছে এসে থামল কুহু অবাক চোখে বুথের দিকে তাকিয়ে মাহতিমকে জিজ্ঞেস করল ~ এটা
কি জাদুর বাক্স ? মাহতিম কুহুর সামনে হাঁটু গেড়ে কৌশলে বসে তারপর হেসে বলল ~ না
এটা অনেক আগেকার দিনের চিঠির মত কথা বলার যন্ত্র । কথা শুনে চোখ বড় বড় করে
হাসলো কুহু । মাহতিম উপলব্ধি করলো মাহতিম এর কাছে এই স্নিগ্ধ সকালে তাদের এই
সামান্য হেঁটে বেড়ানো আর ছোট ছোট কথোপকথনের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত
হার মানবে । মাহতিম কাজের চাপে ভুলেই গিয়েছিল প্রকৃতির মাঝে এভাবে প্রিয়জনের হাত
ধরে হাঁটলে কত শান্তি পাওয়া যায় । হ্যামস্পস্ট্যাডের এই সকালটা মাহতিমের জন্য একটা
সুন্দর স্মৃতি হয়ে রইল যা মাহাতিম কখনো ভুলবে না ।
কায়নাত ঘুম থেকে উঠে দেখল বিছানা খালি পাশে কুহু নেই । বুকটা ধক করে উঠলো। এই
অচেনা জায়গায় কোথায় খুঁজবে কুহু কে ! কায়নাত বিছানা থেকে নেমে ঘরের দরজা খুলে
খোপা করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে তাড়াহুড়ো করে নাম ছিল তখনই চোখ গেল বাড়ির সদর
দরজার দিকে। দেখলো মাহতিম আর কুহু একসাথে প্রবেশ করছে । এক মুহূর্ত দেরি না করে
সিঁড়ি দিয়ে তড়িঘড়ি করে নেমে দৌড়ে সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে কুহু কে খপ করে
বুকে টেনে নিলো কায়নাত। মাহতিম অবাক হয়ে কায়নাত দেখছে । একটা ওভার সাইজ গ্রে
রঙা টি-শার্ট আর সাদা ট্রাউজার পড়া । দেখেই বোঝা যাচ্ছে কায়নাত মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। চুলগুলো এলোমেলো করে খোঁপা করা । কপালের উপর কিছু চুল নৃত্য করছে । মুখটা দুশ্চিন্তায় ফ্যাকাসে হয়ে গেছে । আখি যুগলের কোনায় অশ্রু কনা জমেছে । চোখে অশ্রু কণা চিকচিক করছে । ফর্সা হওয়ার কারণে গালটা লাল হয়ে গিয়েছে খানিকটা । মাহতিম কায়নাতকে বলল ~ কুহু সকালবেলা আমার রুমে এসে আমাকে জাগিয়েছে এবং বলেছে আম্মু তো ঘুমাচ্ছে চলো তুমি আর আমি একটুখানি বাহিরে ঘুরে আসি । আমি কুহুর কন্ডিশনের কথা চিন্তা করে কুহুকে না করিনি ।
মাহতিমের কথা শুনে কায়নাত মাহতিমের দিকে তাকিয়ে বলল ~ আমাকে একবার বললে কি কোন সমস্যা হতো ?
মাহতিম উত্তরে বলল ~ আপনি ঘুমাচ্ছিলেন তাই আপনাকে জাগাইনি ।
কায়নাত কথায় ঝাঁঝ মিশিয়ে বলল ~ আমার মেয়েকে নেক্সট টাইম আমাকে না বলে কোথাও নিয়ে যাবেন না
~ ও ঠিক আছে আমি এরপর থেকে আর এই ভুলটা করবো না
~ আমি এই মুহূর্তে আপনার বাসা ছেড়ে হোটেলে উঠবো । আমি এখানে আর থাকতে পারবো না।
কুহু কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে উঠলো ~ হোয়াই আম্মু?
কায়নাত কুহুর দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল ~ একটা অচেনা জায়গায় এসে অচেনা একজনের সাথে তুমি সকাল সকাল বাইরে চলে গেলে ? এখন কারণ জিজ্ঞাসা করছো ? তোমাকে আমি এমনটা করতে বলেছিলাম ?
মাহতিম কুহুর পক্ষ নিয়ে বলতে গেল........
পর্ব ১১ (২)
মাহতিম কুহুর পক্ষ নিয়ে বলতে লাগলো ~ কুহু আমার অচেনা কেউ নয় আর না আমি কুহুর জন্য অপরিচিত তাই এভাবে বলার দরকার নেই
কায়নাত মাহতিমের দিকে না তাকিয়েই বলল ~ আমি এত কথা জানতে চাইনি
কায়নাত বসা থেকে দাঁড়িয়ে কুহুকে কোলে নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো তখনই মাহতিমের মা কায়নাতকে পিছন থেকে ডেকে বলল ~ চলো খেতে চলো
কায়নাত একটা জোরপূর্বক হাসি দিয়ে বলল ~ না আন্টি খাব না কিছু
~ কুহু তো খাবে ওর তো মেডিসিন আছে
কায়নাতের হুট করে মনে পড়ে যায় কুহুর কন্ডিশনের কথা আবার মাথায় ঘুরছে এক অন্য দুশ্চিন্তা যা কাউকে জানাতেও পারছে না । কায়নাত কুহুর দিকে তাকালো আর কুহু কায়নাতের দিকে । কুহু বিনা বাক্যে আকুতি করছে এখানে থেকে যাওয়ার জন্য কুহুর আকৃতি ভরা মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে কায়নাত বলে ওঠে ~ ঠিক আছে আমরা থাকবো
কুহু খুশি হয়ে নিজের ছোট ছোট কোমল হাতের আদলে কায়নাতের মুখটা নিয়ে কায়নাতের গালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দেয়। কায়নাত মুচকি হাসি দিয়ে কুহুর গালেও নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দেয়।
মাহতিম এতক্ষণ ওদেরকে মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছিল এখন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয় । মাহতিম কিছুক্ষণের জন্য ভেবেছিল কায়নাতকে এখানে রাখতে পারবে না। তাছাড়া মাহতিমের কোন অধিকার নেই কায়নাতকে আটকানোর। ১২ বছর ধরে ভালবাসলেই তো আর সব সম্ভব না তাও আবার সেই ভালোবাসাটা ছিল এক তরফা। আর যেখানে ১২ বছর না দেখে একজন ভালোবাসে গেছে আর অন্যজন জানতেও পারেনি।
কুহু হঠাৎ করেই বলে ওঠে ~ আম্মু জানো আজকে কি হয়েছে ?
কায়নাত মুচকি হাসি দিয়ে বলে ওঠে ~ না বললে কিভাবে জানব
~ ব্লু আইস আর আমি লন্ডন ম্যারিয়ট হোটেল রেজেন্ট পার্ক ( London Marriott Hotel Regent park ) থেকে ইনভিটেশন পেয়েছি।
কায়নাত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ~ কিসের ইনভিটেশন ?
কুহু উত্তেজিত হয়ে বলে উঠে ~ ব্লু আইসের একটা ফ্রেন্ড সাবাস আমাদেরকে বলেছে আজকে যেহেতু ফাদার্স ডে তাই হোটেলে একটা অনুষ্ঠান আছে ব্লু আইস যেন যায় আর আমাকেও যাতে নেয় ।
কুহুর কথা শুনে কায়নাতের বুকটা ধপ করে ওঠে ~ ফাদার্স ডে
মাহতিম কায়নাতের কোল থেকে কুহুকে নিয়ে ডাইনিং এর দিকে হাঁটা শুরু করল। আর কায়নাত সেখানেই মূর্তির ন্যায় দাড়িয়ে রইল । কায়নাত এখানে থেকেও নেই নতুন কোন দুশ্চিন্তায় আছে। কায়নাত ঘুরে দেখল মাহতিম কুহুকে চেয়ারে বসিয়ে খাবার সার্ভ করছে। কায়নাত ডাইনিং এর দিকে গিয়ে মাহতিমের পাশে দাঁড়িয়ে বলল ~ আপনার সাথে একটু কথা ছিল
~ জি বলুন
~ এখানে কুহুর সামনে বলতে চাই না
~ ঠিক আছে
কুহু দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল ~ তোমরা খাবে না
কায়নাত কুহুর দিকে তাকিয়ে বলল ~ হ্যাঁ খাব
মাহতিম সার্ভেনদেরকে ইশারায় কুহুকে দেখতে বলে কায়নাতের সাথে পা বাড়ালো। কায়নাত আর মাহতিম কুহুর থেকে একটু দূরে সরে হলরুমে দাড়ায় । কায়নাত অনেকটা সিরিয়াস হয়ে বলে ~ কুহুর কন্ডিশনের অবস্থা দেখে আপনার কি মনে হয় অপারেশন কবে করা উচিত ?
~ আমি অবজারভ করেছি কুহুকে । কুহুর কন্ডিশন বাহির থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও অবস্থা ভিতরে ভিতরে ঠিক নেই । শুনতে কষ্ট লাগবে কিন্তু এটাই সত্য । আজকে ২১ জুন রবিবার আমরা কুহুর অপারেশন করব ২৫ জুন বৃহস্পতিবারে
~ ২৫ জুন
~ হুম তাড়াতাড়ি অপারেশন না করলে অবস্থা আরো খারাপ হবে
~ ঠিক আছে
কায়নাত নিজের চিন্তা ভাবনার মধ্যে ডুবে গেল । কায়নাতকে দেখেই মাহতিম বুঝতে পারল কায়নাত কুহু কে নিয়ে আবার চিন্তা করছে । মাহতিম সংকোচ কাটিয়ে কায়নাতের সামনে হাত নাড়ালো কায়নাতের মনোযোগ আনতে । নিয়মটা বোধহয় কাজে দিল । কায়নাত মাহতিমের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল কিছু বলবেন ?
~ আজকে একটু আগে যখন বের হয়েছিলাম তখন জন্য আমার একটা জামা পছন্দ হয়েছে হোয়াইট কালার একটা ফ্রক ছিল আমি সেটা কিনে এনেছি জন্য তুমি যদি মাইন্ড না করো তাহলে জামাটা কুহু কি পড়তে পারবে ?
~ ড্রেসের প্রাইস কত?
~ আমি জানিনা
~ আপনাকে তারা বলেনি প্রাইস কত ?
~ বলবে কিভাবে কোন প্রাইস ট্যাগ ছিল না। আমি সবসময়ই ওই মার্কেট থেকে শপিং করি বেশিরভাগ সময়ই আম্মু আব্বুর জন্য করতে যাই আম্মু আব্বুর জন্য শপিং করি তাই আমি প্রাইস দেখতে চাই না এজন্য আমি মার্কেট ম্যানেজারকে বলে রেখেছি যাতে আমি যখন শপিং করতে যাব কোন ড্রেসে যেন কোন প্রাইস ট্যাগ না থাকে আমি সবচেয়ে দামি ড্রেসগুলো কিনব। এবারও যখন শপিং করতে গিয়েছি তাড়াতাড়ি করেছে আর আমি আজকে শুধু আমার জন্য শপিং করিনি বা আম্মুর জন্য শপিং করিনি আমি কুহুর আর তোমার জন্য কিনেছি। সাদা জামা কেনার সময় কুহু আর একটা সাদা ড্রেস পছন্দ করেছে যেটা তোমার জন্য ছিল পরে আমি সেটাও কিনে নিয়েছি
~ আপনি সেটার প্রাইস বলতে পারবেন ?
~ আমি আগেই বলেছি আমি জানিনা
কায়নাত এবার রেগে গেল তবুও নিজেকে কন্ট্রোল করে বলল ~ ড্রেসগুলো দিন আমি অনলাইন চেক করে নিচ্ছি
~ কি চেক করবে ?
~ অনলাইনে প্রাইস চেক করব
~ পাবা না
~ আমি পাব আমাকে দেন
~ আরে ধুর
কায়নাত রেগে কুহুর কাছে চলে গেল
মাহতিম সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে হাসতে বললো প্রাইজ আবার দেখিনি এটাও পসিবল দেখেছি আর সবচেয়ে দামি টাই কিনেছি কিন্তু আমার হচ্ছে না আমি তো চাই তোমার জিনিস কিনতে গিয়ে আমার আমেরিকান এক্সপ্রেস ও কম পড়ে যাক। এই মাহতিম কারাহান শুধু কায়নাতের।
কায়নাত ডাইনিং টেবিলে বসে বসে খাচ্ছে আর ভাবছে ~ লাইক সিরিয়াসলি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিউরোলজিস্ট কিভাবে এমন ইললজিক্যাল থিঙ্কিং করতে পারে? অবশ্য উনার কাছে এত টাকা আছে যে উনার কোন সমস্যা নেই । আগে যদি জানতাম তাহলে আমিও সাথে যেতাম আমার আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড দিয়ে আমাদের টা পে করতাম আর দেখতাম সে এমন অদ্ভুত ভাবে কিভাবে শপিং করে । এখন আনইজি লাগছে একে তো ওনার বাসায় আছি এখন আবার উনি শপিংও করেছে আমাদের জন্য ।
সকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামল। মাহাতিম সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ফোন স্ক্রল করছে। হিলের আওয়াজ শুনে মহাতিম সিঁড়ির দিকে তাকালো । দেখলো কায়নাত আর কুহু টার কিনে দেওয়া সাদা ফ্রক পরেছে। কায়ানাত পড়েছে তার কিনে দেওয়া লং গাউনটা। সাথে হাই হিল। চুলগুলো ছাড়া। চুলগুলো একপাশে কানের পেছনে গুজে ডায়মন্ড ক্লিপ দিয়ে আটকানো। কানে মুক্তার ইয়ারিং। সব সময়ের মতো হালকা মেকাপ করেছে। তোকে কাজল দেওয়া আর ঠোঁটে হালকা ম্যাট কালারের লিপস্টিক দেওয়া। মাহতিমের চোখ যেন কানাডার উপর থেকে সরছেই না । মাহতিম নিজেকে কন্ট্রোল করে কুহুর দিকে তাকালো । কুহুর চুল গুলোও ছাড়া । চুলগুলোতে কয়েকটা ক্লিপ লাগানো। পায়ে সাদা জুতা। কুহু কাইনাদের হাত ধরে নামছে।
কায়নাত মাহাতিমের দিকে তাকালো । মাহাতিম পড়েছে ব্ল্যাক সুট আর পায়ে কালো শু। চুলগুলো ভালোভাবে সেট করা। চেহারাটা দেখতে অস্বাভাবিক সুন্দর। গায়ের রং একটু বেশি ফর্সা। হয়তো মাহতিমের বাবা বিদেশি এজন্য এরকম। মাহাদিমের চোখগুলো নীল। যেটা কায়েনাত বহুবার দেখেছে কিন্তু পাত্তা দেয়নি কিন্তু আজকে মাহতিমের চোখগুলো অস্বাভাবিক আকর্ষণীয় লাগছে। কায়নাতের চোখ যেন সরছে না । কায়নাত কোনমতে নিজেকে কন্ট্রোল করে চোখ সরিয়ে নিল। কয়নাথ মনে মনে বলল ~ আমি আমি ওনার দিকে কেমন অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে ছিলাম ভাগ্যিস একটুর জন্য খেয়াল করেননি । উনি যদি খেয়াল করত একটা বিব্রত কর পরিস্থিতিতে পরে যেতাম ।
কায়নাতের অজান্তেই মাটিমের নজরে সেটা পড়ে যায় । মাতিন খেয়াল করেছে কানাত কিভাবে মাহাতিমের দিকে তাকিয়ে ছিল। মাহতিম অনেক খুশি হয়েছে। কিন্তু সেটা কাউকে না বুঝিয়ে মাহাতিম সামনের দিকে হাটা দিল। তিনজনে একসাথে বের হয়ে মাতিমের গাড়িতে উঠলো। মাহতিম ড্রাইভিং সিটে বসেছে আর কায়নাত তার পাশের সিটে। কুহু পেছনে বসেছে। আধা ঘন্টার মধ্যে ওরা হোটেলে পৌঁছে গেল। ফাদার্স ডে উপলক্ষে অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে হোটেলটা। হোটেলের বড় হল রুমে পৌঁছানোর পরে দেখল ঈদের মধ্যে সবাই উপস্থিত হয়ে গিয়েছে। অনেক ফ্যামিলি। সবাই বিদেশী শুধু ওরাই বাংলাদেশী। । ওরা ঢুকতেই মঞ্চে ঘোষণা দেওয়া হয়। সব বাচ্চারা এখন তাদের বাবার সাথে ডান্স করবে সবচেয়ে ভালো যার পারফরম্যান্স ভালো হবে তার ফ্যামিলি আমাদের হোটেলের একটা ফ্যামিলি ডিনার ফ্রিতে করার সুযোগ পাবে। তারা আরো অনেক ধরনের সুবিধা পাবে। সবাই নিজেদের আসন গ্রহণ করা শুরু করে। সব বাচ্চারা নিজেদের বাবার সাথে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দেয় ডান্স করার জন্য। কুহুর মনটা মিনিটের মধ্যেই খারাপ হয়ে যায় সে কার সাথে নাচ করবে তার তো বাবা নেই। মাতিন ব্যাপারটা বুঝতে পারে। তাই হাঁটু গেড়ে কুহুর সামনে বসে কুহু কে নাচার জন্য অফার করে। কুহু সাথে সাথে রাজি হয়ে যায়। মাহাতিমার কুহু নাচতে চলে যায় আর কায়নাত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে । গান বাজানো হয় গানের তালে তালে মাহতিমের সাথে ডান্স করছে কুহু । হঠাৎ করেই কুহু মাহতিমকে বলে ওঠে ~ তুমি কি আমার বাবা হবে ?